Friday, June 5, 2026







শেষ বেঞ্চের মা পর্ব-১২

‎#শেষ_বেঞ্চের_মা
‎#আরেব্বা_চৌধুরী
‎#পর্ব_সংখ্যা_১২


‎আব্দুল হালিমের কথামতো নুরজাহানের দাফনের সমস্ত আয়োজন আশ্রমই বহন করলো। কাফনের কাপড়, জানাজার ব্যবস্থা, কবর খোঁড়া সবকিছু কোনো অভিযোগ ছাড়াই সম্পন্ন হতে লাগলো। নাহিদের কাছ থেকে একটি টাকাও নেওয়া হলো না। যেন আশ্রমটাই আজ মায়ের শেষ আশ্রয়, শেষ অভিভাবক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
‎নাহিদ ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে রইলো নিথর নুরজাহানের দিকে।
‎এই মানুষটাই কি সেই মা, যিনি একসময় ছেলের একবার “মা” ডাক শুনতে সারারাত জেগে থাকতেন?
‎যিনি চিঠির পর চিঠি লিখে নিজের বুকের আগুন কাগজে ঢেলে দিতেন?
‎সেবিকা ধীরে ধীরে নাহিদের পাশে এসে দাঁড়ালেন। কণ্ঠটা খুব শান্ত,
‎-খালা বলে দিয়েছেন… মৃত মানুষ ভাত খায় না।
‎এই কথাটা শুনেই নাহিদের বুকের ভেতর কিছু একটা বিকট শব্দে ভেঙে পড়লো।
‎সে বুঝে গেল, এই কথাটা শুধু ভাত নিয়ে নয়, এটা ছিল জীবনের সমস্ত প্রত্যাশা ছিঁড়ে ফেলার শেষ ঘোষণা।
‎নুরজাহানের দেহ জানাজার জন্য প্রস্তুত করা হলো।
‎সাদা কাফনে মোড়ানো শরীরটা দেখে নাহিদের মনে হচ্ছিল, মা যেন আরও ছোট হয়ে গেছেন, আরও নরম, আরও দূরের কেউ হয়ে গেছেন।
‎যে হাতে কোনোদিন সে মায়ের হাত ধরে হাঁটেনি, আজ সেই হাত দিয়েই কাফনের গাঁট ছোঁয়ার চেষ্টা করলো, কিন্তু স্পর্শ করতেও সাহস পেল না। আশ্রমের আঙিনায় জানাজা বসলো।
‎কিছু বৃদ্ধা জানালার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে রইলেন, কেউ ফিসফিস করে দোয়া পড়লেন, কেউ চোখের জল লুকাতে পারলেন না।
‎যে নুরজাহানকে সবাই “পাগল বুড়ি” বলতো, আজ তার জানাজার কাতারে দাঁড়িয়ে সবার বুকেই ভারী হয়ে এলো শূন্যতা। নাহিদ জানাজার কাতারে দাঁড়িয়েও কাঁদতে পারলো না। কান্না যেন তার ভেতরে জমাট বেঁধে আছে।
‎ইমামের কণ্ঠে দোয়ার শব্দ ভেসে আসছিল, আর নাহিদের কানে শুধু একটা কথাই বাজছিল,
‎“মা আর ভাত খাবে না, মা আর অপেক্ষা করবে না।”
‎দাফনের সময় নুরজাহানকে যখন কবরে নামানো হলো, নাহিদের পা দুটো হঠাৎই দুর্বল হয়ে এলো।
‎সে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো কবরের ধারে।
‎মাটি ছোড়ার শব্দে তার বুকের ভেতর জমে থাকা অপরাধবোধ চিৎকার করে উঠছিল।
‎শেষ মুঠো মাটি ফেলার আগে সে ফিসফিস করে বললো,
‎-মা, আমি দেরি করে ফেলেছি, তাই না?
‎কিন্তু উত্তর এলো না।
‎নুরজাহানের মতোই সেই প্রশ্নটাও চিরতরে মাটির নিচে চাপা পড়ে গেল।

‎সবাই একে একে চলে গেলেও নাহিদ কবরের পাশে বসে রইলো।
‎চারপাশ নিস্তব্ধ। শুধু বাতাসে কবরের মাটির গন্ধ, আর বুকের ভেতর হাহাকার।
‎নাহিদ ধীরে ধীরে কবরের মাটি ছুঁয়ে ফিসফিস করে বললো,
‎-মা… তুমি না একা ঘরে থাকতে ভয় পেতে। আজ ভয় লাগছে না তোমার?
‎আমি একটু বাইরে গেলেই তুমি দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে, চোখে পানি নিয়ে বলতে তাড়াতাড়ি ফিরিস বাবা।
‎আজ আমি চলে যাচ্ছি, তুমি তো আর কাঁদছো না মা, নাকি কাঁদছো, শুধু আমি শুনতে পাচ্ছি না?
‎কিছুক্ষণ থেমে কাঁপা গলায় আবার বললো,
‎-মা, তুমি কি আমায় খুব ঘৃণা করেছিলে? এখানে কি খুব কষ্ট হয়েছিলো তোমার? নাকি আমার বাড়ির চার দেয়ালের চেয়েও এই আশ্রমটাই তোমার কাছে নিরাপদ ছিলো?
‎আমি ভেবেছিলাম, কিছুদিন পর নিয়ে যাবো, সেই কিছুদিনই কি তোমার পুরো জীবনটা খেয়ে নিল মা?
‎নাহিদের চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া জল কবরের মাটিতে মিশে গেল।
‎কিন্তু মাটি চুপ করে রইলো। যেমন নুরজাহান জীবনের শেষ দিনগুলোতে চুপ করে গিয়েছিলেন, সব প্রশ্ন, সব অভিমান বুকে চেপে। অনেকক্ষণ পর সেবিকা এসে নাহিদকে নরম স্বরে ডাকলেন।
‎ফেরার সময় হয়েছে।
‎আশ্রমে ফিরে এসে সেবিকা নুরজাহানের ব্যাগপত্র গুছিয়ে নাহিদের হাতে তুলে দিলেন।
‎সাথে সেই খাতা, চিঠিতে ভরা, অপেক্ষায় ভরা, না-পাওয়া ভালোবাসায় ভেজা খাতা।
‎-খালা সবসময় এগুলো বালিশের নিচে রাখতেন, মরার আগের রাতেও আলো জ্বালিয়ে পড়ছিলেন।
‎নাহিদ ব্যাগটা হাতে নিতেই যেন বুকের ওপর পাহাড় নেমে এলো।
‎এই স্মৃতির ভার সে বইতে পারছে না। একটা জীবন্ত মাকে সে রাখতে পারেনি, আজ মায়ের সব স্মৃতি এক ব্যাগে ভরে বয়ে নিয়ে যেতে হচ্ছে।

‎বাড়ি ফিরে নাহিদ আর ভাত খেলো না।
‎নিশি বারবার বললো, একটু খেয়ে নাও, সারাদিন কিছু মুখে দাওনি।
‎নাহিদ মাথা নাড়লো, শব্দ বেরোল না।
‎কিছুক্ষণ পর যেন দম নেবার মতো করে ধীরে বললো,
‎-জানো নিশি, মা সত্যিই পাগল ছিলো, আমার পাগল।
‎আমি ছিলাম তার একমাত্র পৃথিবী। নিজের সবটুকু ঢেলে দিয়েছিল আমার দিকে।
‎নিজের দিকে ফিরে তাকানোরও সময় পায়নি সে।
‎তার দিন, তার রাত সবই আমাকে ঘিরে ছিলো।
‎গলা ভারী হয়ে এলো। কথা থামিয়ে আবার বললো,
‎-সেই আমি, আমি পারলাম না মাকে আগলে রাখতে।
‎এই ঘর, এই বাড়ি সব আজ ভীষণ ফাঁকা লাগছে নিশি।
‎যেন দেওয়ালগুলোও আমাকে প্রশ্ন করছে, একজন মা’কে রাখার মতোও জায়গা ছিলো না তোর?
‎নাহিদ জানালার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
‎-মা আমাদের মুক্তি দিয়ে গেলেন, একেবারে মুক্তি।
‎আর কোনো দাবি নেই, কোনো অপেক্ষা নেই, কোনো অভিযোগ নেই। এবার খুশি তো তুমি?
‎তুমি তো চাইতে তোমার সংসারটা তুমি তোমার মতো করে গুছাবে। তোমার জীবনে অন্য কারো হস্তক্ষেপ তোমার পছন্দ ছিলো না।

‎কণ্ঠটা এবার তেথে উঠলো,
‎-মা তো অন্য কেউ ছিলো না নিশি, এই সংসারটা তারও ছিলো। তবু আমরা তাকে বুঝলাম না।
‎আজ সে নেই বলেই সব এত শান্ত, কিন্তু এই শান্তিটা কেন যেন শ্মশানের মতো ভারী লাগছে।
‎নিশি চুপচাপ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। দরজাটা বন্ধ হতেই ঘরের ভেতর যেন বাতাসটাও থমকে দাঁড়ালো।
‎নাহিদ কিছুক্ষণ শূন্যের দিকে তাকিয়ে বসে রইলো। বুকের ভেতরটা এমন ভারী লাগছে, যেন নিঃশ্বাস নিলেই কষ্ট বাড়ছে।
‎অবশেষে ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে নিলো নুরজাহানের খাতাটা।
‎পুরোনো, মলিন, কোণাগুলো ভাঁজ হয়ে গেছে।
‎এই খাতাটা যে এতটা ওজনের হবে, তা নাহিদ কোনোদিন ভাবেনি।
‎কভারে আঙুল বুলাতেই বুকের ভেতরটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠলো।
‎মায়ের কণ্ঠটা কানে বাজলো,
‎-যখন তোর কথা খুব মনে পড়বে, তখন একটু একটু করে লিখে রাখবো এই খাতায়। মুখে বলতে পারলে তো কষ্ট হতো না।
‎নাহিদ প্রথম পাতাটা খুললো।
‎হাতের লেখা বেশ বড়। যেন প্রতিটা অক্ষর লিখতে গিয়ে বুকের ভেতরের কান্নাটা চেপে রাখা হয়েছে।
‎-আজ তোকে খুব মনে পড়ছে। জানি না ছেলেটা সময়মতো ভাত খেয়েছে কি না। ছোটবেলা থেকে তোর খাওয়া নিয়ে আমার ভয় যায় না।
‎নাহিদের চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।
‎সে পরের পাতাটা উল্টালো।
‎-আজ রাতে স্বপ্নে তুই এসেছিলি। বলছিলি, মা কষ্ট হচ্ছে? ঘুম ভাঙতেই বুকটা ফেটে গেল। স্বপ্ন আর বাস্তবের পার্থক্য বুঝতে পারি না এখন।
‎একটার পর একটা পাতা।
‎কোথাও কালির দাগ ছড়িয়ে গেছে, কোথাও অক্ষরগুলো আধা মুছে গেছে, হয়তো চোখের জলে।
‎-এই আশ্রমে সবাই মানিয়ে নিয়েছে। শুধু আমি পারি না। সংসারের গন্ধটা এখনও নাকে লেগে থাকে। তোর জামাকাপড় গুছানোর দিনগুলো খুব মনে পড়ে।
‎নাহিদের হাত কাঁপতে লাগলো।
‎খাতাটা ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠলো।
‎আরেক পাতায়,
‎-নাহিদ, তুই যদি কখনো ভাবিস আমি রাগ করে আছি, তবে জেনে নিস, মা কখনো সন্তানের উপর রাগ করে থাকতে পারে না। কষ্ট হয়, অভিমান হয়, কিন্তু ভালোবাসা কমে না। জানিস বাবা রাতে ঘুম আসে না। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ভাবি, তুই যদি হঠাৎ এসে বলিস মা চল বাড়ি যাই, আমি এক মুহূর্তও ভাববো না।
‎এই লাইনটার কাছে এসে নাহিদের দম আটকে গেল।
‎বুকের ভেতর থেকে হঠাৎ একটা চাপা শব্দ বেরিয়ে এলো।
‎শেষের দিকের পাতাগুলোয় লেখাগুলো আরও ছোট, আরও অস্পষ্ট।
‎-আজ আশ্রমের খাবার ভালো ছিলো, কিন্তু তোর হাতের ভাতের গন্ধটা কোথাও পেলাম না। মানুষ কি অভ্যাস ছাড়তে পারে নাহিদ?
‎নাহিদের হাত কাঁপতে লাগলো। চোখ থেকে টপটপ করে পানি খাতার পাতায় পড়তে লাগলো।
‎আরেকটা পাতা,
‎-আমার জীবনের হিসেব মিলিয়ে দেখলাম, সবটুকু তোর নামেই লেখা। নিজের জন্য কিছুই রাখিনি।
‎শেষ পাতাটা খুলতেই নাহিদের বুকটা পুরো ভেঙে পড়লো।
‎-যদি কোনোদিন এই খাতা তোর হাতে আসে, জানিস, তোর মা অভিযোগ নিয়ে মরেনি। শুধু একবার তোর বুকের ওপর মাথা রেখে বলতে চেয়েছিলাম, মা খুব ক্লান্ত।
‎খাতাটা আর ধরে রাখতে পারলো না নাহিদ।
‎বুকের সাথে চেপে ধরলো, ঠিক যেমন ছোটবেলায় জ্বর হলে মা তাকে জড়িয়ে ধরতেন।
‎মা, আমি তো এখন পড়ছি।
‎গলা ভেঙে গেল।
‎এত দেরি হয়ে গেল কেন মা, আমি কেন তখন বুঝলাম না।

‎নাহিদ ধীরে ধীরে পাশের ঘরটায় গেল।
‎তাহসান তখন ঘুম জড়ানো চোখে আধশোয়া। নাহিদ নিঃশব্দে তাকে কোলে তুলে নিল। শিশুটার উষ্ণ শরীর বুকের সাথে লেগে থাকতেই নাহিদের বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠলো, এই উষ্ণতার জন্যই কি সে মায়ের শীতল হাতটা ছেড়ে দিয়েছিল?
‎তাহসানের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে নাহিদ ভাঙা গলায় বললো,
‎-জানো? বাবা কত বড় কাপুরুষ ছিলো, খুব ভয় পেয়েছিলাম আমি। দায়িত্বের ভার বইতে ভয় পেয়েছিলাম। তাই সহজ পথটা বেছে নিয়েছিলাম।
‎তাহসান কিছুই বোঝে না, তবু নাহিদ বলতে থাকে,
‎-শোন বাবা, পুরুষ হতে গেলে একপাশে দাঁড়ানো যায় না। বাবা-মা, স্ত্রী, সন্তান এরা আলাদা আলাদা মানুষ, কিন্তু দায়িত্ব আলাদা না। একটাকে আগলে রাখতে গিয়ে আরেকটাকে ফেলে দিলে, শেষ পর্যন্ত কেউই থাকে না।
‎-তুমি বাবার মতো হইও না। কাউকে বোঝা মনে করো না। যে মানুষটা তোমাকে মানুষ করেছে, তাকে কখনো আলমারির পুরোনো জিনিসের মতো তুলে রেখো না।
‎তাহসানের ছোট আঙুল নাহিদের শার্ট আঁকড়ে ধরতেই চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারে না সে।
‎-দেখো বাবা, সময় যখন থাকে তখন মানুষ বুঝতে চায় না। ভাবে কাল ঠিক করে নেবো। কিন্তু কাল আসার আগেই সব শেষ হয়ে যায়। তখন শুধু স্মৃতি থাকে, আর এই অসহ্য আফসোস।
‎নাহিদ গভীর নিশ্বাস নেয়।
‎-আমি ভেবেছিলাম সব ম্যানেজ করছি। সংসারও, জীবনও। কিন্তু আজ বুঝছি, আমি কাউকেই ঠিকমতো আগলে রাখতে পারিনি। মা চলে গিয়ে আমাকে শিখিয়ে গেলেন, ভালোবাসা ফেলে রাখলে, সেটাও একদিন মানুষ ছেড়ে চলে যায়।
‎সে তাহসানের কপালে আলতো করে চুমু খেলো।
‎-তুমি বড় হয়ে শক্ত হও বাবা। কিন্তু পাথর হয়ো না। শক্ত হতে গেলে বুকটা বড় করতে হয়, মনটা না। মনটা নরম রাখো। নইলে আমার মতো একদিন সব হারিয়ে বসে থাকবে… আর বলবে, যদি আরেকটু আগে বুঝতাম!
‎তাহসান ঘুমের মধ্যেই বাবার বুকে মুখ লুকালো।
‎নাহিদ তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।

‎কেটে গেছে বেশ কিছুদিন।
‎নাহিদ এখন প্রায়ই আশ্রমে আসে। সেই পরিচিত পথ ধরে হাঁটে, যেখানে একসময় আসতে তার বুক ভেঙে যেত, এখন আর বুক ভাঙে না, শুধু ভারী লাগে। আশ্রমের পেছনের ছোট কবরস্থানটায় এসে সে চুপচাপ বসে পড়ে নুরজাহানের কবরের পাশে।
‎যে মানুষটাকে বেঁচে থাকতে একবার দেখতে আসার সময় হয়নি, মৃত্যুর পর তার কদর যেনো বহুগুণ বেড়ে গেছে। এই ভাবনাটা নাহিদের নিজের কাছেই অদ্ভুত রকম হাস্যকর লাগে। ঠোঁটের কোণে একচিলতে তিক্ত হাসি জমে ওঠে, মরা মানুষের প্রতি ভালোবাসা দেখানোটা যে কত সহজ!
‎নাহিদ হাঁটু গেড়ে বসে। কবরের মাটিতে ধীরে ধীরে হাত বুলায়। মাটিটা ঠান্ডা, নীরব। অথচ এই নীরবতার ভেতরেই যেনো মায়ের সব কথা জমে আছে।
‎ফিসফিস করে বলে ওঠে,
‎-মা, জানো আমি এখন খুব নিয়ম করে আসি। আগের মতো ব্যস্ততা নেই। সময়ের অভাবও নেই। শুধু তুমি নেই।
‎একটু থামে। গলার ভেতর কিছু আটকে আসে।
‎-তুমি বেঁচে থাকতে বলেছিলে, “একদিন তুই বুঝবি।” আমি হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলাম। আজ বুঝেছি মা, কিন্তু এই বুঝটা বড় দেরিতে এলো।
‎মাটিতে আঙুল দিয়ে অদৃশ্য রেখা আঁকতে আঁকতে বলে,
‎-আমি ভাবতাম তুমি চিরকাল থাকবে। তোমার অপেক্ষা, তোমার ক্ষমা সবই যেনো অটোমেটিক ছিলো। ভাবিনি কোনোদিন তোমার জন্য দেরি হয়ে যাবে।
‎মা, আমি এখনো তোমার জন্য অপেক্ষা করি জানো? ভাবি, যদি হঠাৎ পেছন থেকে ডাক দাও, নাহিদ তুই এসেছিস? দুপুরে কিছু খেয়েছিস তো বাবা?
‎দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে বুক চিরে।
‎-যে মানুষটা আমাকে জন্ম দিয়ে নিজের জীবন ফুরিয়ে দিলো, তাকে শেষ সময়ে এক গ্লাস পানিও খাওয়াতে পারিনি। আজ এই মাটির নিচে শুয়ে আছো, আর আমি এসে বলছি, মা আমি এসেছি।
‎নাহিদ কবরের মাটিতে কপাল ঠেকায়।
‎-ক্ষমা করো মা। জানি, তুমি ক্ষমা করেই রেখেছো। কিন্তু জানো, ক্ষমা পাওয়া আর নিজেকে ক্ষমা করা দুটো এক জিনিস না।
‎উঠে দাঁড়ানোর আগে শেষবারের মতো বললো,
‎-আমি আসবো মা। যতদিন বেঁচে আছি, ততদিন আসবো। হয়তো এই আসাটাই আমার শাস্তি, আর তোমার প্রতিশোধ।


‎নিশি বাপের বাড়ি গিয়েছে।
‎কিন্তু এই বাড়িটা আর আগের মতো তার নয়, না আদরে, না যত্নে। যে উঠোনে একসময় নিশির হাসির শব্দ লেগে থাকতো, সেখানে এখন নিঃশব্দ অভাব ঝুলে থাকে। কোণায় কোণায় জমে আছে পুরোনো আসবাব, ভাঙা চেয়ার, জং ধরা আলমারি তার মাঝখানেই বসে থাকেন সামিরা বেগম। যেনো মানুষ নন, ফেলে রাখা কোনো জিনিস।
‎ভাইয়ের ইনকাম ভালো, ঘরে টাকার অভাব নেই, তবু নিশি এলেই কেমন করে যেনো সবকিছুর টান পড়ে যায়। চাল কমে, তেল ফুরোয়, বাজারের হিসাব হঠাৎ ভারী হয়ে ওঠে। নিশির উপস্থিতিটাই যেনো তাদের কাছে এক অদৃশ্য বোঝা।
‎মেহরুন তো সুযোগ ছাড়ে না। কথার খোঁচায়, চোখের চাহনিতে, আচরণের শীতলতায় বারবার বুঝিয়ে দেয়, ‘তুমি এ বাড়ির কেউ না।’
‎সামিরা বেগমকেও সে কথা শুনাতে ছাড়ে না।
‎-এই বয়সে আর কত খাবে মানুষ? এত রান্নার দরকার কী? শুধু শুধু খাবার অপচয়।
‎মায়ের দিকে তাকিয়ে নিশির বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে, কিন্তু কিছু বলার শক্তি পায় না।
‎এই অভাব-অনটন চোখে দেখে নিশি কীভাবে বলবে, তার এটা দরকার, তানিয়া আর তাহসান ওটা খেতে চেয়েছে? নিজের প্রয়োজনগুলোও গিলে ফেলে সে। বাবার বাড়িতে থেকেও প্রতিটা দিন তাকে নিজের পয়সায় চলতে হয়। বাজার থেকে শুরু করে রান্না সবই যেনো তার দায়িত্ব।
‎আজকাল নিশি গেলে মেহরুন এমনভাবে হাত-পা ছেড়ে বসে থাকে, যেনো এই বাড়ির গৃহিণী সে নয়, নিশিই।
‎রান্নাঘরে নিশির একা একা দাঁড়িয়ে থাকা, হাঁড়ির ভেতর নেড়ে দেওয়া এসব দেখে তার মনে হয়, সে বুঝি বেড়াতে আসেনি, শ্রম দিতে এসেছে।
‎আজ আর পারলো না নিশি।
‎রাগ জমে ছিলো অনেকদিনের।
‎সে শক্ত গলায় বলে উঠলো,
‎-এখানে আসি কিসের জন্য বলো তো? একটু স্বস্তির জন্য। সেই স্বস্তিটাই যদি না পাই, তাহলে আসবো কেন? আর আসবো না।
‎কথাগুলো ছুরি হয়ে বেরিয়ে আসে।
‎-তোমরা থাকো তোমাদের মতো। আমি এলেই যেনো সবকিছু শেষ হয়ে যায়। চাল কমে, বাজার ফুরোয়, তোমাদের সংসার ভেঙে পড়ে এই দায়টা আর আমি নেবো না।
‎সামিরা বেগম মুখে আঁচল চেপে নিঃশব্দে কাঁদতে থাকেন। চোখের পানি গড়িয়ে পড়ে পুরোনো শাড়ির আঁচলে। কিন্তু মেহরুন সেই কান্নার দিকেও তাকায় না। যেনো এই কান্নাও তার কাছে অপ্রয়োজনীয় শব্দ।

‎চলবে,,,,,,,

গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ