#শেষ_বেঞ্চের_মা
#আরেব্বা_চৌধুরী
#পর্ব_সংখ্যা_০৪
বন্ধ ঘরের ভেতর বেলা কয়টা বাজে তার ইয়াত্তা নেই নুরজাহান বেগমের।
তবে বয়সের ভারে আঁচ করতে পারছেন সন্ধ্যা নিশ্চয়ই পেরিয়ে গেছে অনেক আগেই।
মনের মধ্যে এক অজানা ভার জমে আছে,
ছেলে তো বলেছিলো বিকেলেই ফিরে আসবে, তবে এখনও ফিরলো না কেনো?
কিছুক্ষণ শুয়ে থাকার পর আবারও বিছানা ছেড়ে তাসবিহ হাতে নিলেন তিনি।
কিন্তু ক্ষুধার তীব্র জ্বালায় সেই তাসবিহের শব্দ ও মনকে শীতল করতে পারছে না।
সময়ের কাঁটা যেনো নিষ্ঠুরের মতোই এগিয়ে যাচ্ছে, নাহিদ এখনও ফিরছে না।
এদিকে তাহসান বায়না ধরে বসেছে আজ সে নানুর বাড়িতে রাত কাটাবে।
নিশি ধীরস্বরে ছেলেকে বোঝালো,
-দাদিকে একা বাসায় রেখে এখানে থাকা যাবে না বাবা, তোমার দাদি না থাকলে আমরা অনেক দিন থাকতে পারতাম।
তাহসান নির্ভেজাল কণ্ঠে বললো,
-তাহলে দাদিমা মারা গেলে আমরা এখানে এসে থাকতে পারবো?
তাহসানের নির্দয় সরল উত্তরে নাহিদের চোখ বড় হয়ে উঠলো।
কিন্তু নিশির কণ্ঠে তুচ্ছতার বিষ ঝরতে লাগলো,
-হ্যাঁ বাবা, এই বুড়ির জন্য কোথাও গিয়েও শান্তি পাই না, শান্তিতে দুটো দিন থাকতেও পারি না।
নাহিদ ভারী গলায় বললো,
-নিশি, তোমার কি মনে হচ্ছে না এবার তুমি বেশি বলে ফেলছো?
নিশি তাচ্ছিল্যের সাথে জবাব দিলো,
-কি বেশি বলেছি? বিয়ের পর থেকে ঘরবন্দী আমি! তুমি বলো, তোমায় নিয়ে ক’বার কোথায় বেড়াতে গিয়েছি? সবসময়ই বলেছো মা একা, মা একা! এমনকি নিজের বাপের বাড়িতেও দুদিনের জন্য আসতে দাও নি!
নাহিদ দাঁত চেপে বললো,
-বাড়ি চলো।
ঠিক তখনই সামিরা বেগম বেশ আদুরে স্বরে বললেন,
-রাত অনেক হয়েছে বাবা, খেয়ে যেয়ো। এতো রাতে নিশি গিয়ে আবার রান্না করে বাচ্চাদের খাওয়াবে কিভাবে?
শাশুড়ির কথার মান রাখতে নাহিদ আবারও সোফায় বসে পড়লো।
তার চোখের ভেতরের হতাশা, অনুশোচনা,
আর বুকের অজানা অপরাধবোধ পরক্ষণে তাকে আস্থির করে তুললো।
সময়ের সাথে সাথে ক্ষুধার জ্বালা যেন আরও তীব্র হয়ে উঠছিল নুরজাহান বেগমের। অন্য কিছু খুঁজে না পেয়ে আবার সেই ঠান্ডা ভাতের থালা হাতে নিলেন তিনি।
ঠান্ডা হয়ে পাথরের মতো শক্ত ভাত , আর দুপুরের কাঠফাটা রোদে গরম না করায় তরকারিটা টক হয়ে গিয়ে এমন এক অস্বস্তিকর গন্ধ ছড়াচ্ছে, যার সঙ্গে তাঁর বয়সী শরীরের পক্ষে লড়াই করাটাও দুষ্কর।
ভাত মুখে তুলতেই মনে হলো দম বন্ধ হয়ে আসে।
চোখের কোণে জমে থাকা হাহাকার নীরবে গড়িয়ে পড়লো বালিশে।
নিজেকে প্রশ্ন করলেন কোথায় গেলে একটু শান্তি মিলবে আমার?
রোজ রোজ কত মানুষ চলে যায়, অথচ আমি কেনো আজও টিকে আছি কৈ মাছের অবিশ্বাস্য প্রাণ নিয়ে?
থালাটা সরিয়ে হাত ধুয়ে এলোপাথাড়ি শুয়ে পড়লেন তিনি।
সময় যেন আয়ু বাড়িয়ে দিয়ে তাঁর সাথে নিষ্ঠুর খেলা খেলতে লাগলো।
শুয়ে শুয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনতে লাগলেন, হয়তো ছেলে আসবে, হয়তো দরজায় টোকা পড়বে।
অবশেষে সেই অপেক্ষারই সমাপ্তি হলো,
বাইরে দরজার শব্দ হতেই বুকের ভেতর কাঁপুনি উঠলো।
ছেলে এসেছে, আমার ছেলে এসেছে!
কিন্তু ঘরে কেউ প্রবেশ করলো না।
কেউ খোঁজ নিলো না এই বৃদ্ধা মানুষটা এতক্ষণ কী খেয়েছে কিংবা না খেয়ে মরেও গেছে কি না।
নাহিদ ফ্রেশ হয়ে জিরিয়ে আরও প্রায় ঘণ্টাখানেক পর মায়ের ঘরে এলো।
মা ডাকের শব্দ শুনেই নুরজাহানের বুক ভেঙে কান্না উথলে উঠলো।
ঠিক যেনো কোনো অবুঝ শিশু দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বাবা-কে দেখলে ঝাঁপিয়ে বুকে লেপটে ধরে তেমনই আকুলতা নিয়ে তিনি নাহিদের গলায় ঝুলে পড়লেন।
হৃদয়ের ভেতরে জমে থাকা কষ্ট, অপমান, ক্ষুধা সব একসাথে ঝড়ে বেরিয়ে আসছিলো অশ্রুর ধারায়।
নাহিদ নরম স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
-কিছু খেয়েছো?
তিনি মাথা নিচু করে শুধু ধীরে ধীরে না জানালেন।
নাহিদ নিজের রুমে গিয়ে নিশিকে বললো,
-মায়ের ক্ষুধা পেয়েছে, যাও কিছু খেতে দাও।
-দিচ্ছি।
-দিচ্ছি না, এখনই যাও।
-দেখছো না বাচ্চাদের কাপড় বদলাচ্ছি?
-ওটা আমি করছি, তুমি আগে যাও।
এটাই যেন প্রতিদিনের এই বাড়ির চিরচেনা অধ্যায়,
বৃদ্ধ মায়ের ক্ষুধা সবশেষে আসে।
নিশি দুটো পাউরুটি আর এক গ্লাস পানি হাতে নিয়ে নীরবে নুরজাহানের ঘরে প্রবেশ করলো।
-নিন, এগুলো খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন।
নুরজাহান ধীরে জিজ্ঞেস করলেন,
-আমার নাহিদ খেয়েছে?
নিশির মুখে বিদ্রূপের ছায়া ভেসে উঠলো,
-নাহিদের কথা খুব তো মনে পড়ে আপনার। আমাদের কথা কখনো মনে পড়ে? এটাই মা আর শাশুড়ির মধ্যে চিরন্তন পার্থক্য।
নুরজাহান অসহায় ভাবে নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
-বউমা, বিয়ের পর থেকে তুমি এই পার্থক্য খুঁজতে খুঁজতেই সংসারটাকে অশান্তিতে ভরিয়ে তুলেছো। তখন যদি মানিয়ে নেওয়া শিখতে পরিবারের সবার সাথে, পরিবার বলতে তো তেমন কেউ ছিলো না শুধু আমি আর নাহিদ। আমাকে যদি একটিবার মায়ের দৃষ্টিতে দেখতে আজ হয়তো আমাদের ঘরে এমন কষ্ট জমে থাকতো না।
নুরজাহানের কথায় নিশি আচমকা রেগে উঠলো,
-আপনি কি বলতে চাইছেন? আমি অলক্ষী? অপয়া?
-তুমি আমাকে ভুল বুঝছো বউমা,
নিশি আর একটা বাক্যও শুনলো না। খেপে উঠে ঝড়ের মতো নিজ রুমে গিয়ে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো।
রুমে ঢুকেই প্রচণ্ড অভিমানী কণ্ঠে নাহিদকে বললো,
-তোমার মা আমাকে অপয়া বলেছেন। আমার জন্যই নাকি এ সংসারে অশান্তি লেগে আছে। আমি যখন এতটাই বোঝা, অতটা দুর্ভাগ্য, তাহলে আমাকে ছেড়ে দাও, তুমি তোমার মায়ের সাথেই থাকো।
নাহিদ হতভম্ব হয়ে শুধুই বললো
-এ কেমন কথা নিশি?
-এই প্রশ্ন তুমি গিয়ে তোমার মাকে করো।
-অনেক সময় বয়স হলে মানুষ ভুল বলে ফেলে।
-না, তিনি ভুল বলেননি। তাঁর মস্তিষ্ক এখনও ঠান্ডা, সচেতন। কাকে কী বলে আঘাত দেওয়া যায় এই হিসেব তিনি খুব ভালো করেই জানেন।
সেই রাত নিশির কান্নায় বালিশ, চাদর, অন্ধকার সব যেন তার গলাটা চেপে ধরছিলো।
এদিকে অন্য ঘরে নুরজাহানেরও ঘুম আসে না।
দুই নারীর বেদনা একই রাতে আলাদা দুটি অন্ধকারে তুমুল ঝড় তোলে।
সকালের আলো ফুটতেই কলিং বেল বেজে উঠলো।
নাহিদ হালকা অবসাদ নিয়ে দরজা খুলে দাঁড়ালো। সেদিনকের সেই কাজের বুয়া এসে দাঁড়িয়েছে দরজার সামনে। নাহিদ জিজ্ঞেস করলো,
-কি হয়েছে?
বুয়া স্নিগ্ধ হাসি দিয়ে বললো,
-এদিক দিয়েই যাচ্ছিলাম, ভাবলাম চাচিকে একটু দেখে যাই।
নিশি মুখ কুঁচকে ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো,
-মায়ের থেকেও মাসির দরদ বেশি!
বুয়া কোনো উত্তর না দিয়ে মলিন হাসি দিয়েই কয়েক পা এগিয়ে নুরজাহানের রুমে গেলো।
কিছুক্ষণ কথা বলে বুয়া নাহিদকে খুব নরম স্বরে বললো,
-ভাইজান, এভাবে বন্ধ ঘরে মানুষকে আটকে রাখা উচিত না। কিছুক্ষণের জন্য হলেও বাইরে বের হতে দিন, একটু হাঁটাচলা করলে বাইরের আলো বাতাস দেখলে শরীর মন দুটোই ভালো থাকবে।
নিশি রাগে ফুঁসে উঠলো,
-তুমি কি ডাক্তার?
বুয়া মাথা নিচু করে বললো,
-ডাক্তার না। তবে এতোটুকু জ্ঞান তো মানুষের থাকা উচিত ভাইজানের মা বয়স্ক মানুষ। হাঁটাচলা বন্ধ করে দিলে মানুষ এমনিতেই প্রতিবন্ধী হয়ে পরে।
নিশি তুচ্ছতায় কেটে দিলো ওর কথা,
-তুমি কাজের বুয়া, কাজের বুয়ার সীমায় থাকো। বাড়ির সিদ্ধান্ত নেওয়ার লোক তুমি নও। তাছাড়া এ বাড়িতে আপাতত তোমার কোনো কাজ নেই। বেরিয়ে যাও।
বুয়া নিঃশব্দে দরজার দিকে হাঁটলো।
বের হবার আগে নুরজাহানের দিকে তাকিয়ে বললো,
-আসি চাচি, আসসালামু আলাইকুম।
ওই এক টুকরো সালাম যেন নুরজাহানের বুকের ভেতরে তীব্র শব্দে আঘাত করলো।
তার চোখ দুটো আবারও ভিজে উঠলো।
এ বাড়িতে কেউ তাকে বুঝে না, একটু খানি ভালোবাসে না, অথচ এই কাজের মেয়ে কত মায়ায় তাকালো।
নাহিদ চুপচাপ নিজের ব্যাগ তুলে নিয়ে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলো অফিসের পথে।
গতকাল নষ্ট তরকারির সাথে দুই লোকমা ভাত খেতে গিয়ে বোধহয় নুরজাহান বেগমের শরীরটা সহ্য করতে পারেনি।
পেটের মৃদু কষ্ট রাতভর বেড়েছে।
তবুও মুখ বন্ধ রেখেছেন তিনি নিশিকে বললে আরও অপমান, আরও কঞ্জুষে বঞ্চনা অপেক্ষা করছে এটাই তিনি জানেন।
কথা বললেই তো খাবারের জায়গায় পান্তা কিংবা পাতলা ডাল ঠেলে দেওয়া হবে, বুড়ো বয়সে কি এসব খাবার মুখে রোচে?
বাথরুমে যাওয়ার পথে হঠাৎই নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পেরে তিনি নিচেই অপমানজনক অবস্থায় পড়ে গেলেন।
বুকে ভীষণ কষ্ট, লজ্জা, অপমান সব মিলেমিশে কান্না আটকে রাখা কঠিন হয়ে গেলো।
তবুও নিজের ভেতরটা শক্ত করে নিজেই পরিষ্কার হওয়ার চেষ্টা করলেন।
পরিচ্ছন্ন হয়ে আলনা থেকে নিজের শাড়ি টেনে নামিয়ে নিচের অংশটা পরিষ্কার করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন তিনি -যেনো নিশি কিছু টের না পায়।
ঠিক তখনই দরজা খুলে ভেতরে এলো নিশি।
-নিচে বসে কি করছেন আপনি?
-না,কিছু না।
-কি খুঁজছেন?
-কিছু না।
নিশি চারপাশে তাকাতে তাকাতে মুখ বিকৃত করে বললো,
-এই দুর্গন্ধ আসছে কোথা থেকে? আপনি কি?
নুরজাহান বেগম মাথা নিচু করে চুপ হয়ে রইলেন।
বৃদ্ধ শরীরের লজ্জায় তার হাত কাঁপছে।
নিশি তাচ্ছিল্য মিশ্র স্বরে বললো,
-জানতাম আপনার পেটে বেশি তেলমশলা হজম হবে না। কিন্তু কে শুনে কার কথা! যেমন মা তার তেমন ছেলে! সে ভাবে আমি নাকি আপনাকে খেতে দেই না!
শুনুন আপনি এখানেই বসে থাকবেন, নড়াচড়া করবেন না। পুরো ঘর নোংরা করবেন না।আমি উপরের ফ্ল্যাটের কাজের বুয়াকে ডেকে আনছি।
নিশি বাইরে থেকে দরজা আটকিয়ে দিয়ে উপরের ফ্ল্যাটের আপাকে ফোন করে বললো এক ঘন্টার জন্য উনার কাজের বুয়াকে পাঠিয়ে দিতে, জরুরি কাজ আছে।
কাজের বুয়া আসতেই নিশি নুরজাহানের রুমের দরজা খুলে দিয়ে শুষ্ক স্বরে বললো,
-এই ঘর আর উনাকে একটু পরিষ্কার করে দাও।
বুয়া মুখ কুঁচকে বিরক্তি লুকাতে পারলো না।
-আমি পারবো না।
নিশি এবার গলা নিচু করলো,
-৩০ মিনিটের কাজ। তিনশো টাকা পাবে। ঘরটা একটু ধোয়ামোছা করে দিও, উনাকে গোসল করিয়ে শাড়িটা ধুয়ে ছাদে শুকাতে দিয়ে এসো। ব্যস, আর কিছু নয়।
অর্থের লোভে শেষে মাথা নেড়ে রাজি হলো বুয়া।
নাক-মুখ ঢেকে ধীরপায়ে এগিয়ে গেলো নুরজাহানের দিকে।
নুরজাহান স্থির দৃষ্টি নিয়ে সব দেখছিলেন,
নিজের অসহায়ত্বের এ ক্রূর নাটক, মানুষের চোখে সেই লুকোনো ঘৃণা, অপমান, বিতৃষ্ণা সব তিনি অনুধাবন করলেন।
চোখ নামিয়ে নিলেন নীরবে।
লজ্জা যেনো শরীরের প্রতিটি শিরায় শিরায় ছড়িয়ে গেলো।
বুয়া তাকে গোসলখানায় বসিয়ে রেখে প্রথমে পুরো ঘর পরিষ্কার করে নিলো।
এরপর ফিরে এসে নুরজাহানের হাত ধরে দাঁড় করালো,
-নিজের কাজ নিজে করতে পারেন না? হেঁটে বাথরুমে যাওয়ার মতো শক্তি ও কি আপনার পায়ে নেই?
গোসল করাতে করাতে হঠাৎ বুয়া ঠান্ডা স্বরে বললো,
-আপনার বউমা অনেক ভালো, তাই যতটা পারছে আপনাকে ঘরে রেখে সামলায়।
আবার বুয়া ডেকে ঘর ও পরিষ্কার করছে, আমি হলে তো এক মুহূর্তও ভাবতাম না মেরে দিয়ে বলতাম, মরে গেছে।
বুয়ার কথাগুলো যেন ধারালো ছুরির মতো কেটে গেলো বাতাসে।
নুরজাহান ভিতরে ভিতরেই গুঁড়ো হয়ে গেলেন।
আর সেই সবকথা,
ঠিক সেই ব্যবধানেই, বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা নিশির কানেও গিয়ে বাজলো বজ্রপাতের মতো।
চোখের পলকে তার মুখাভঙ্গি বদলে গেলো।
চলবে,,,,
