#শেষ_বেঞ্চের_মা
#আরেব্বা_চৌধুরী
#পর্ব_সংখ্যা_০৭
নাহিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরে বললো,
-মানিয়ে নাও না নিশি, একটু সহ্য করো।
নিশি যেন মুহূর্তেই জ্বলে উঠলো।
-কি মানিয়ে নেব? বলো, ঠিক কি মানিয়ে নেব আমি? তোমার মা যদি আমাকে নিয়ে প্রতিটা মুহূর্তে ঠোকাঠুকি করে, অপমান করে সেটাই কি মানিয়ে নিতে বলছো?
নাহিদ কণ্ঠ নিচু করে বললো,
-তোমার মা এমন হলে তুমি কি করতে? ফেলে দিতে?
নিশির ঠোঁট কেঁপে উঠলো রাগে।
-আমার মা এমন না, আর কখনো এমন হবেনও না। আমরাও তো এক ভাই-বোন কই, আমার মা তো কখনো কারো সংসারে এমন অশান্তি আনেননি।
নাহিদ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে উত্তর দিলো,
-সবাই কি সমান হয় নিশি? সব মানুষ কি একই রকম? স্বভাব, সহনশীলতা, অভ্যাস সবই তো আলাদা হয়।
নিশি এবার কিছুটা কঠিন স্বরে বললো,
-সেজন্যই তো বলছি নাহিদ, তুমি সিদ্ধান্ত নাও। তুমি হয় উনাকে নিয়ে থাকো, না-হয় আমাদের নিয়ে থাকো। এভাবে দুই নৌকায় পা দিয়ে চলা যায় না।
নাহিদ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,
-নিশি কেনো এমন করছো? একটু মানিয়ে নিলে কি হয়?
নিশি তৎক্ষণাৎ রাগী চোখে তাকিয়ে কটমট করে বললো,
-কেনো? কেনো সব সময় আমাকেই মানিয়ে চলতে হবে নাহিদ? মানিয়ে নেওয়ার দায়িত্বটা কি শুধুই আমার?
নাহিদ ক্লান্ত গলায় বললো,
-অশান্তি না করে একটু মানিয়ে নিলে কি হয় তোমার? তুমি কি চাও না, দিন শেষে আমি একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস নেই? বিশ্বাস করো আমি মাঝখানে পড়ে যাচ্ছি, একদিকে মা অন্যদিকে তুমি।
নিশি শ্বাস টেনে বললো,
-তোমার মায়ের জন্যই তো সব সমস্যার শুরু। উনি যদি আমাকে একটু ভালোবাসা দিতেন নিজের মেয়ের নজরে দেখতেন, নিজের সীমা জানতেন তাহলে এমন কিছু হতো না।
নাহিদ নিচু স্বরে বললো,
-নিশি আমি সত্যি মনে করি মা মানসিকভাবে স্বাভাবিক নন। উনার বয়স, পরিস্থিতি সবকিছুই তাকে বদলে দিয়েছে।
নিশি তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললো,
-তার দায়ভার কি আমার?
নাহিদ শান্ত গলায় বললো,
-তোমার নয়, আমার।
-মানে? নিশির কণ্ঠে তীব্র অবাকভাব।
-নিশি তুমি তো জানো, আমার কোনো ভাই-বোনই বাঁচতো না। হয় গর্ভেই মরে যেতো, নয়তো জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই মারা যেতো।
আমার জন্মের পর আমার মা এতো খুশি হয়েছিলেন যে পুরো গ্রামে মিষ্টি বিতরণ করলেন, আমার বাবা ভীষণ সহজ সরল মানুষ।
এক চাচি মজা করেই বাবাকে বলেছিলেন, “এই শীতের রাতে যদি পুকুরে একশো একটা ডুব দিতে পারো, তবে ছেলে দীর্ঘজীবী হবে।”
সেই রাতে বাবা পুকুরে নেমে সত্যিই একশো একটা ডুব দিয়েছিলেন, যার ফলাফল রাতেই ভু ভু করে জ্বর এলো শরীরে।
সেই শরীর কাঁপানো জ্বর পুরো সাতদিন ছিলো। শুধু তাই নয় আমায় নিয়ে যে যেটা করতে বলতো মা বাবা সেটা করতেই প্রস্তুত ছিলেন।
আমি মা-বাবার অনেক আদরের ছেলে। আমার খাবারের থালা মা সব সময় ভরা রাখতে পছন্দ করতেন, আমার আগে কারোর খাওয়া ছিলো নিষিদ্ধ।
আমি বড় হবার পরেও বাবা আমাকে কোনো কাজের কথা বলতে পারতেন না; বাবা যদি কাজের কথা বলতেন, মা রেগে বলতেন,
-আমার ছেলে কাজ করবে কেনো? তুমি কি আমার ছেলেকে মেরে ফেলতে চাও?
আমি যদি নিজে থেকেও কোনো কাজ করি, মা তখন কেঁদে কেটে অস্থির হয়ে যেতেন।
আমি অসুস্থ হলেই মা পাগলের মতো আচরণ করতেন।
আমার ছোট ছোট অসুখে মা এটা সেটা মানত করতেন কখনো নজর লাগবে ভেবে পানি পড়া খাওয়াতেন, কখনো রাত জেগে মাথার কাছে বসে সূরা পড়ে ফু দিতেন।
মায়ের অনেক গহনা ছিলো; আমি যখন অসুস্থ হতাম, মা মসজিদে বা গরিব লোকদের মধ্যে কখনো নিজের নাকফুল, কখনো হাতের চুড়ি, কখনো গলার চেইন পর্যন্ত দিয়ে দিতেন।
মায়ের চোখে সেই মুহূর্তে গহনার কোনো মূল্যই থাকতো না, সামনে শুধু আমি, আমার নিঃশ্বাস, আমার সুস্থতা।
মনে আছে, একবার আমার খুব জ্বর হয়েছিলো। পুরো রাত জেগে মা আমার কপালে ভেজা কাপড় দিচ্ছিলেন।
আমার একটু তাপ কমলেই তিনি নিজের দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে কাঁদতে কাঁদতে বলতেন,
-হে আল্লাহ, আমার ছেলেটাকে তুমি রেখে দাও। তার বদলে আমাকে নিয়ে যাও, আমার জীবনটাই দান করলাম।
মায়ের সেই কণ্ঠ, সেই আর্তি আজও কানে বাজে।
আমার মা ছিলেন অনেক শিক্ষিত মানুষ, সেসময় লজে থেকে ইন্টার কমপ্লিট করেছেন। শুধু শিক্ষিতই নয়, তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিকও।
কুরআনের অনেক বড় বড় সূরাও তাঁর মুখস্ত ছিলো। কেউ কুরআন পড়লে তিনি না দেখেই ভুল ধরতে পারতেন।
এতোটুকু পর্যন্ত সব ঠিকই ছিলো,
তারপর থেকেই মা রোজ স্বপ্নে দেখতে লাগলেন আমি নাকি মারা যাবো।
রাতভর মা ঘুম ভেঙে কাঁদতেন, অস্থির হয়ে উঠতেন, পাগলের মতো বাড়ির এদিক ওদিক ছুটে বেড়াতেন।
বাবার সঙ্গে রোজ ঝগড়া করতেন,
”তুমি আমার ছেলেকে মেরে ফেলতে চাও!” এ কথাটা তিনি চোখ ধাঁধানো আতঙ্ক নিয়ে বারবার বলতেন।
কয়েকদিন পর তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন নাকি কেউ তাঁকে কিছু বলেছিলো তা আমরা কেউই জানি না।
কিন্তু সেদিনের পর মা যেন পুরোটাই বদলে গেলেন।
যে মানুষটা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ না পড়লে অস্থির হয়ে যেতেন, যে মানুষটার ঠোঁটে সবসময় কুরআনের আয়াত ঝরতো। সেই মানুষটাই হঠাৎ নামাজ শব্দটাই শুনতে চাইতেন না।
বলতেন, “আমি নামাজ পড়লেই আমার ছেলে মরে যাবে।”
কুরআন তিলাওয়াত তো দূরের কথা হাতে কুরআন নিতেও ভয় পেতেন।
আরও ভয়ংকর হলো, মা গোসল করা ছেড়ে দিলেন।
মাসে একদিন গোসল করেছেন কিনা তাও বলা মুশকিল।
বাবা, চাচি, ফুফু কেউ তাঁকে বোঝাতে পারতো না।
কারোর কথাই তাঁর কানে পৌঁছাতো না।
পরনের শাড়িটা ধীরে ধীরে নোংরা হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াতো,
চুল এলোমেলো, চোখ লাল, মুখ শুকনো, মাকে আর আগের সেই সুন্দর, পরিপাটি, শিক্ষিতা, ধার্মিক নারী হিসেবে চিনতেই পারা যেত না।
আমি তখনই বুঝলাম,
মা শুধু ভয় পেয়েছেন তা নয় মা ভেতর থেকে ভেঙে গিয়েছেন।
আমি অনেক যত্নে, অনেক বোঝানোর চেষ্টা করে, দিনের পর দিন তাঁর পাশে বসে কথা বলে, কখনো মমতা দিয়ে, কখনো ধৈর্য দিয়ে, তাঁকে ভয় থেকে টেনে বের করার চেষ্টা করতাম।
অবশেষে অনেক সময় পর মা সেই ভয়ানক ধারণা থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন। তবুও তাঁর চোখের সেই অসহায়তা, আমার জন্য তাঁর সেই শ্বাসরুদ্ধকর ভয়, আজও আমি ভুলতে পারি না।
এরপর বাবার বয়স বাড়তে লাগলো। চোখের কোণের ভাঁজগুলো গভীর হলো, হাতের শক্তি কমতে লাগলো। আগের মতো দিনমজুরের কাজ আর তেমন করতে পারতেন না। সংসার তখন খরচের বোঝায় ভারী, আর ঠিক সেই সময়ই বাবা চাইলেন ছেলেটা সামান্য হলেও কিছু একটা শিখুক, একটু কাজ করুক, ভবিষ্যতে নিজের ভরসা যেন নিজেই হতে পারে।
কিন্তু মায়ের কাছে আমি যেন দুধের শিশুই রয়ে গেলাম আজীবন।
কঠোর গলায় বললেন,
-আমার ছেলে কোনো কাজ করবে না। তার শরীর এসব নিতে পারবে না। তুমি যতটুকু পারো করো, আমি তাতেই সংসার চালিয়ে নেবো।
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্তভাবে বললেন,
-দেখো নুরজাহান, পড়ালেখার পাশাপাশি ও যদি গাড়ি চালানো শেখে, ভবিষ্যতে কাজে লাগবে।
নুরজাহান যেন বজ্রাঘাতে কেঁপে উঠে বললেন,
-আমার ছেলেকে মেরে ফেলতে চাও? রাস্তায় গাড়ির এক্সিডেন্ট হয়, তুমি কি জানো না?
বাবা ক্লান্ত চোখে বললেন,
-তাহলে ইলেকট্রিকের কাজ শিখুক।
এই কথায় নুরজাহান প্রায় চিৎকার করে উঠলেন,
-কারেন্টে শকড খেয়ে মরুক এইটুকুই কি বাকি ছিলো তোমার মুখে বলার?
বাবা স্থির স্বরে বললেন,
-তাহলে দোকানে বসতে দাও। অন্তত এটুকু কাজ করলে কোনো ক্ষতি হবে না। এভাবে তো সংসার চলবে না, নুরজাহান। আজ আছি, কাল থাকবো না। আমার পরে তখন কি করবে?
নুরজাহান চোখের পানি ফেলে বললেন,
-তখনও আমি নিজেই কাজ করবো। আমি কি কখনো আমার ছেলেকে একা ছাড়তে পেরেছি? যখন সে স্কুলে গেছে, কলেজে গেছে সব জায়গায় আমি তাকে নিয়ে গেছি। স্কুলে ঢুকিয়ে দিয়ে নিজে বেঞ্চে বসে অপেক্ষা করেছি ঘন্টার পর ঘন্টা। ছেলেমেয়েরা বাড়ি ফিরছিলো, কিন্তু আমি দাঁড়িয়ে থেকেছি যতক্ষণ না আমার ছেলে বেরিয়েছে।
মায়ের কথায় বাবা এভাবেই বার বার চুপ হয়ে যান।
এর বেশ কিছুদিন পর বাবা চলে গেলেন পরপারে। সংসারের উপর যেন হঠাৎই অন্ধকার নেমে এলো, কিন্তু মা সে অন্ধকারের কোনও ছায়াই আমাকে স্পর্শ করতে দিলেন না। ঘরে অভাব থাকুক বা না থাকুক, আমার খাবারের থালা সবসময় ভরাট থাকতো।
ভাত, ডাল, তরকারি, কখনো ডিম, কখনো মাছ যেন মা তার সমস্ত কষ্টের বদলে পাওয়া সুখ আমার থালাতেই ঢেলে দিতেন।
আমি তখন ভার্সিটিতে পড়ি। অন্য ছেলেমেয়েরা নিজেরাই ভার্সিটিতে আসে, গল্প করে, হাসে আর আমার পিছনে পিছনে মা হাঁটেন, আমার ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে। বন্ধুরা মুচকি হেসে বলতো,
”এই বয়সেও মা ভার্সিটিতে দিয়ে যায়?”
আমি সরে দাঁড়িয়ে চুপ করে থাকতাম, কখনো কখনো লজ্জায় মাকে আসতে বারণ করতাম।
আমাকে ভার্সিটি পৌঁছে দিয়ে মা সোজা বাড়ি ফিরে যেতেন না। পাড়ার চাচি-ফুফুদের যার যার ঘরে যেতেন, তাদের যেকোনো কাজ ঝাড়ু, বাসন, ভাত চড়ানো, বাচ্চা সামলানো যে যা বলতো সব মন থেকে করে দিতেন। কেউ ভাত দিতো, কেউ দুই মুঠো চাল-ডাল, কেউবা থালা ভরে ভাত তরকারি দিতো।
যে ঘরে সুগন্ধ ছড়াতো মাছ ভাজা বা মাংসের, মা নীরবে সেই উঠোনে গিয়ে দাঁড়াতেন। তারপর মৃদু স্বরে বলতেন,
-ভাবি, এই তরকারিটা আমার নাহিদের খুব পছন্দ একটু দেবেন? আজ ভার্সিটি শেষে পেট ভরে খাবে।
উনারা হাসিমুখেই দিতেন। মা তখন আঁচল পিঁচকে থালাটা ঢেকে নিতেন, যেন অমূল্য কিছু বয়ে নিচ্ছেন ঘরে।
ভার্সিটি ছুটির পর সবাই যখন নিজের বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে বাড়ির দিকে ছুটত, মা তখন রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আমাকে দেখার অপেক্ষায় থাকতেন মুখে যতই ক্লান্তির রেখা থাকুক, আমাকে দেখামাত্রই সেই মুখ আলোয় ভরে উঠত।
কেউ তাকে একটুখানি খাবার দিলে মিষ্টি, মুড়ি, ভাজাভুজির টুকরো মা কখনো নিজের মুখে তোলেন না। আঁচলের কোণে বেঁধে রাখতেন, বাড়ি ফিরে বলতেন,
-নাহিদ, এটা তোর জন্য এনেছি খেয়ে দেখ, খুব ভালো লাগবে।
আমার এক চাচাতো বোন মাকে খুব ভালোবাসতো, আবার খুব বকাও দিতো।
-চাচি, তুমি কি মানুষ নাকি ফেরেশতা? যা দেই সব ছেলের জন্য তুলে নিয়ে যাও। নিজের মুখে তো কখনো কিছু দাও না। আজ নিজের মুখে না দিয়ে যা ছেলের মুখে দিচ্ছো কাল সেই ছেলেই তোমার মুখের খাবারটা কেড়ে নেবে।
মা তখন শুধু হাসতেন নীরব, শান্ত, অব্যক্ত সেই হাসি।
মায়ের সেই হাসিটা ছিলো অদ্ভুত পরাস্ত নয়, অভিমানী নয়, বরং নিখাদ মমতার হাসি। যেন পৃথিবীর সমস্ত অভিযোগ, সমস্ত ব্যঙ্গ, ক্ষুধা-তৃষ্ণা, কষ্ট সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠতে জানেন তিনি, একটি ‘ছেলে’ নামক শব্দের প্রেমে।
চাচাতো বোনের বকুনির পরও মা থেমে যেতেন না।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে পথের দু’ধারে কারো ঘরে কলা পেকে গেলে মা দরজায় দাঁড়িয়ে বলতেন,
-ভাবি, দুটো কলা দাও তো আমার নাহিদ খাবে।
উনাদের সেই হাসি-মাখা চোখের সামনে মা সেই কলাগুলো আঁচলে বেঁধে নিতেন রোজকার মতোই।
পথে হাঁটতে হাঁটতে অনেকে বলতো,
-নুরজাহান, নিজের জন্যও তো কিছু রাখো!
মা তখন হেসে বলতেন,
-আমার পরে কেউ থাকবে না, তাই আমি আমারটুকু আগে থেকেই ছেলেকে দিয়ে রাখি।
মায়ের এই কথায় কেউ বিরক্ত হতো, কেউ মায়া পেতো, আবার কেউ চোখের আড়ালেই মাথা নেড়ে হতাশা প্রকাশ করতো। কিন্তু মায়ের জগৎ একেবারে একমুখী।
তিনি যেন পৃথিবীর মানুষ নন; তাঁর দিন-রাত, ঘুম-জাগরণ, হাসি-কান্না সবকিছুই একমাত্র নাহিদের চারপাশে ঘুরে বেড়াত।
ভার্সিটি ছুটির সময় মাকে দরজার সামনে খুঁটি মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতাম।
গরমের দুপুরে তাঁর শাড়ি ভিজে যেত ঘামে, শীতের সকালে হাত-পা জমে যেত ঠান্ডায়,
তবুও মা কখনো বসে থাকতেন না কারণ বসলে নাকি ঘুম এসে যাবে, আর ঘুমিয়ে পড়লে ছেলে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবে!
আর আমি?
আমি তখন এসব বুঝতাম না।
মনে হতো এত আদর, এত কান্না, এত মানত এগুলো কি সত্যিই প্রয়োজন ছিলো?
কোনো কোনো দিন ভার্সিটি থেকে ফিরতে একটু দেরি হলেই মায়ের মুখ বিবর্ণ হয়ে যেত।
দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় বলতেন,
ভেবেছিলাম, কিছু হয়েছে নাকি, তারপর আমার হাত ধরেই আঁচল দিয়ে মুখ মুছতেন যেন আমিই তাঁর শ্বাস।
চাচিরা বলতেন,
-নুরজাহান, নিজের জীবনটা এভাবে ছেলে-ছেলে করে কাটালে হবে?
মা বিন্দুমাত্র রাগ করতেন না। শুধু নরম স্বরে বলতেন,
-ও একা হলে আমি থাকতে পারবো না। আল্লাহ আমার সব সুখ দুঃখ এক জায়গায় দিয়ে দিয়েছেন সেটা আমার ছেলে।
এভাবে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, মায়ের এই অদ্ভুত, সীমাহীন, প্রায় পাগলামি-সন্ধানী ভালোবাসা চারদিকে ছড়িয়ে থাকতো। উনি কখনো নিজের মুখে খাবার তুলতেন না, নিজের অসুখ লুকোতেন,
কখনো রাত জেগে কাঁথার কোণা সেলাই করতেন শুধুই কাঁথা বিক্রি করে ছেলের ভার্সিটির খরচ দিবেন বলে।
আশপাশের মানুষ বলতেন,
-নুরজাহান, তোমার এই বাতিক একদিন তোমাকেই ধ্বংস করবে।
মা তখন সেই চিরচেনা সুখ-ভরা হাসিটা হেসে বলতেন,
-ধ্বংস হই বা বাঁচি, তাতে কি আসে যায়? আমার ছেলে বাঁচলেই আমার জগত পূর্ণ।
মায়ের এই ভালোবাসা এতটাই একাগ্র, এতটাই উন্মত্ত ছিলো যে মাঝে মাঝে মনে হতো,
তিনি যেন শুধু মা নন,
তিনি এক প্রবল ঝড় যার লক্ষ্য শুধু আমি।
আর তাঁর এই অতিরিক্ত ভালোবাসাই ধীরে ধীরে তাঁকে অন্যদের থেকে পৃথক করে দিলো।
মানুষ তাঁকে বুঝতো না, সমর্থন করতো না,
তবুও তিনি নিজের বিশ্বাসে অটল ছিলেন,
ছেলেই তাঁর পৃথিবী, ছেলেকে ঘিরেই তাঁর জীবন।
❝আপনারা যারা আমার পেজে নিয়মিত এক্টিভ থাকেন, তারা নিশ্চয়ই আমার মায়ের এক্সিডেন্টের বিষয়টি জানেন। তাই এই কয়েক দিন কোনো গল্প দিতে পারিনি। দয়া করে এই নিয়ে প্রশ্ন করবেন না। একটু সময় দিন সব ঠিক হলে আবার আগের মতোই লিখবো।❞
চলবে,,,,,
