#লিটল_গার্ল
#পর্ব_৪
#আইজা_আহমেদ
(কপি পোস্ট নিষিদ্ধ )
অফিসের বিশাল গ্লাসওয়ালা কেবিনে বসে আছে আদ্র। বাইরে সকালের আলোয় শহরটা ঝলমল করছে। ডেস্কের ওপর ছড়ানো কিছু ফাইল, ল্যাপটপের স্ক্রিনে নিউজ পোর্টালের হেডলাইনগুলো ভাসছে।
আদ্রর আঙুল মাউসের ওপর থেমে থাকে এক মুহূর্ত, তারপর স্ক্রল করে নিচে যায়।
কমেন্ট সেকশনে একের পর এক গসিপ, উপহাস, আর অবমাননাকর বাক্য। চোয়াল শক্ত হয়ে আসে তার। এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস টানে, তারপর ঠাণ্ডা গলায় বলে ওঠে, “সোহেল।”
অ্যাসিস্ট্যান্ট সাথে সাথে দরজায় এসে দাঁড়ায়, “জী স্যার?”
আদ্র স্ক্রিনটা তার দিকে ঘুরিয়ে দেয়।চোখে-মুখে তীব্র রাগ।
“এগুলো দ্রুত ক্লিয়ার করবে। আজই।
আমি যেন আর এই বাজে খবর একটাও না দেখি। ফাস্ট।”
সোহেল এক মুহূর্ত থেমে বলে,
“জী, স্যার। কাজ চলছে, টিম হ্যান্ডেল করছে। সব নিউজ পোর্টাল থেকে নামিয়ে ফেলার প্রক্রিয়ায় আছে।”
আদ্র চুপচাপ তাকিয়ে থাকে স্ক্রিনে। আঙুলের ডগায় কলমটা ঘুরছে বারবার। চোখের কোণে চাপা ক্রোধ। এসির ঠাণ্ডা বাতাসেও কপালে ঘাম জমে। সে চেয়ারে হেলান দেয়, হাতের আঙুলে টান পড়ে। তখনই দরজাটা হঠাৎ জোরে খুলে যায়। রিসেপশনিস্টের কণ্ঠ বাইরে থেকেই শুনা গেল।
“স্যার, আপনি এভাবে ভেতরে….”
একটা লম্বা, ছেলে দ্রুত ভেতরে ঢুকে পড়ল। চোখ লাল, মুখে রাগের ছাপ। দরজা বন্ধ হতেই সে এক মুহূর্ত দেরি না করে এগিয়ে এসে আদ্রর কলার চেপে ধরল। গলার শিরা ফুলে উঠেছে তার। ছেলেটা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“তুই ওয়ারিনকে বিয়ে করেছিস কেন? জানতিস না আমি ওকে ভালোবাসতাম?”
আদ্রর চোখে কোনো ভয় নেই, কোনো অস্থিরতাও নেই। সে বরং শান্তভাবে তাকিয়ে আছে, ঠোঁটে হালকা বিদ্রূপের রেখা। যেন সে এই আগমনটা আগে থেকেই জানত। আদ্র শান্ত গলায় বলে,
“আমার কলার ছাড়, আয়াশ।”
আয়াশ ছাড়ে না। বরং আরও শক্ত করে ধরে, রাগে তার নিঃশ্বাস গরম হয়ে আদ্রর মুখে লাগে।
“তুই জানতিস, তারপরও করেছিস। তুই ওকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিস।কেন?”
আদ্র ধীরে ধীরে কলারটা নিজের হাত দিয়ে সরিয়ে নেয়। তারপর নিঃশব্দে বলে,
“আমি কেড়ে নেয়নি, বিয়েটা কিভাবে হয়েছে সেটা তুই নিশ্চয়ই জানিস।”
আয়াশ গর্জে উঠে বলে,
“তুই ওয়ারিনকে ডিভোর্স দিবি, আদ্র। আজই দিবি। শুনছিস? আজই।”
আদ্র কলার টেনে চেয়ারে বসে।
“আশ্চর্য! আমি ডিভোর্স দেবো কেন? বিয়ের মাত্র একদিন হয়েছে। বাসর রাতটা শুধু পার করলাম। এখনও তো সবে শুরু। ইশ, হানিমুনটাও তো রয়ে গেছে।”
আয়াশ চোখ বন্ধ করল। বুকের ভেতর যেনো কেউ পাথর চাপা দিয়েছে। নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। বিশ্বাসই করতে পারছে না, আদ্র এমন কিছু করতে পারে। যাকে নিজের থেকেও বেশি বিশ্বাস করেছিল, সে-ই তার ভালোবাসা কেড়ে নিয়েছে। ক্রোধে, অপমানে ওর পুরো শরীর কেঁপে উঠল। হাত দুটো মুঠো করে শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইল।
“তুই ভাবছিস, ও তোকে ভালোবাসবে?”
আদ্র উঠে দাঁড়াল ধীরে ধীরে, দুই হাত টেবিলে রাখল, চোখে-মুখে আত্মবিশ্বাসের ঝিলিক।
“ও আমাকে ভালোবাসবে কি না, সেটা আমার বিষয় না। আমার তাতে কিছু আসে যায় না।কিন্তু ও এখন আমার নাম এর অধীনে আছে। আপাতত এটা উপভোগ কর।”
আয়াশের চোখে জল চলে আসে, তবুও সে চোয়াল শক্ত করে বলে,
“এটা তুই একদম ঠিক করিসনি, ওয়ারিনকে আমাদের মাঝে এনে। এর ফল তোকে ভোগ করতেই হবে। দেখিস আদ্র, একদিন তুই নিজেই ওয়ারিনকে হারাবি। তোর অহংকারই তোর পতন হবে।”
“তোর কথা শেষ হয়েছে। এখন বেরো এখান থেকে।”
অফিসের বাইরে কয়েকজন কর্মী কাঁচের ওপার থেকে তাকিয়ে আছে, কারো সাহস নেই ঢোকার। আয়াশ দাঁড়িয়ে, বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। চোখে-মুখে তীব্র ঘৃণা।
“তুই নিজের লাভের জন্য ওয়ারিনের জীবন নিয়ে খেলছিস। ছেড়ে দে ওকে, না হলে….”
“না হলে কী করবি তুই?”
আয়াশ দাঁড়িয়ে ছিল ঠিক তার বিপরীতে। বুকটা উঠানামা করছে দ্রুত গতিতে। মুঠিবদ্ধ হাত কাঁপছে, আঙুলের শিরাগুলো ফুলে আছে।এক মুহূর্তের মধ্যেই হটাৎ এক কান্ড করে বসলো আয়াশ। তাঁর মুষ্টিবদ্ধ হাত গিয়ে পড়ল আদ্রর মুখে। একবার, দু’বার, তিনবার,
নাক ফেটে র’ক্ত বেরিয়ে আসে। আদ্র টলে গেল সামান্য, কিন্তু চোখে কোনো ভয় বা অস্থিরতা নেই। সে শুধু তাকিয়ে আছে আয়াশের দিকে, সেই একই ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে।বাইরে হৈচৈ পড়ে গেল।
“স্যার! কী হচ্ছে ভেতরে?”
দরজা খুলে দুইজন গার্ড ছুটে এল ভেতরে।
তারা আয়াশকে ধরে টানতে লাগল, কিন্তু সে এখনো ছটফট করছে, চেঁচিয়ে উঠছে। আদ্র ধীরে ধীরে টিস্যু তুলে নিল টেবিল থেকে। তার আঙুলে সামান্য রক্ত লেগে গেছে। শান্ত গলায় বলল, “তাকে বাইরে নিয়ে যাও।”
গার্ডরা আয়াশকে টানতে টানতে বাইরে নিয়ে গেল, কিন্তু আয়াশ চিৎকার করতেই থাকল,
“তুই ওর জীবনটা নষ্ট করছিস, আদ্র। তোকে আমি ছাড়বো না।”
দরজা বন্ধ হয়ে গেলে কেবিন আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আদ্র টিস্যুতে নাকের র’ক্ত মুছে নিল, গভীর নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর মাথা পেছনে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে রাখল কিছুক্ষণ। বুকের ভেতর ভার জমে আছে। আয়াশ রিদার ভাই। তিন মাস ধরে বিডিতে ছিল। আজকেই হয়তো এসেছে।
——–
নরম রোদে বাগানটা শান্ত। হালকা হাওয়া বইছে। টেবিলের ওপর সাজানো আছে চায়ের কাপ, বিস্কুটের প্লেট আর কিছু ফল। এই শান্ত পরিবেশের মাঝেই টেবিলের চারপাশে বসে আছে সবাই মালিনী বেগম, আরিশা, আর পাশে বসে আছে ওয়ারিন, রোহান তার কোলে মাথা রেখে বসে আছে। ছোট্ট মুখটা ভরা হাসি, সে চুপচাপ অপেক্ষা করছে ওয়ারিনের হাতে ছোলা কমলার টুকরো পাবে বলে। মালিনী বেগম একবার চায়ের কাপ নামিয়ে হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“আজকে অফিসে না গেলে কী হতো বল তো? খেয়েও গেল না। ছেলেটা দিন দিন কেমন হয়ে যাচ্ছে।”
“এত চিন্তা করো না, আম্মু। ও ছোট না। খিদে লাগলে নিজেই খেয়ে নিবে।”
আরিশা চায়ের কাপ নামিয়ে এবার ওয়ারিনের দিকে তাকাল।
“শুন ওয়ারিন, আদ্র কিছু বললে ভয় পাবি না।আর কিছু বললে চুপ করে থাকিস না। তোর চুপ থাকার জন্যই ও প্রশ্রয় পায়। পাল্টা উত্তর দিবি। দেখবি, তখন চুপ হয়ে যাবে।”
ওয়ারিন থমকে গেল। হাতের কমলাটা ওর আঙুলে থেমে রইল। সে নিঃশব্দে নিচে তাকিয়ে থাকে , তারপর ধীরে ধীরে কমলার একটি টুকরো তুলে রোহানের ছোট্ট হাতে রাখল। রোহান খুশিতে মুখে পুরে দিল সেই টুকরোটা, চোখ ভরা আনন্দে তাকাল ওয়ারিনের দিকে। কিন্তু ওয়ারিনের মুখে তখন অন্যরকম নীরবতা। আদ্রর চোখে তাকালেই তার বুক ধকধক করতে শুরু করে। সেই গম্ভীর মুখটা, ঠোঁটের কোণে জমে থাকা কঠিন রেখা, চোখে থাকা গভীর দৃষ্টি সবকিছু যে ওয়ারিনের মনের ভেতর টান সৃষ্টি করে। যা তাকে টেনে নেয় আদ্রর দিকে, অথচ সে চায় পালিয়ে যেতে। সে চায় না চোখে চোখ রাখতে, কিন্তু আবার সেই চোখের দৃষ্টি থেকে নিজেকে সরিয়েও নিতে পারে না।
ও বুঝে গেছে এই টানটা স্রেফ ভয় নয়, অপছন্দও নয়। এটা অন্যরকম এক অনুভূতি, যা ও চায় না প্রকাশ পেতে। কিন্তু যতই চাপা দিতে চায়, ততই তা জেগে ওঠে ওর ভেতরে, নিঃশব্দে, ধীরে ধীরে।
বাগানে হালকা বাতাস বইতে লাগল আবার। দূরে কোথাও মাগরিবের আজান শুরু হলো। মালিনী বেগম উঠে দাঁড়ালেন, “চলো সবাই ভিতরে, সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে।”
চলবে…….??
