#লিটল_গার্ল
#পর্ব_৩
#আইজা_আহমেদ
(কপি পোস্ট নিষিদ্ধ )
রুমের ভেতর ভারী ধোঁয়ার ঘ্রাণ। সিগারেটের কড়া ঘ্রান। জানালাগুলো বন্ধ, পর্দা টানা বাইরের আলো ঢোকে না। ঘরটায় শুধু একটা টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে, তার ম্লান আলোয় ওয়ারিনের মুখটা কেমন ফ্যাকাশে লাগছে । ওয়ারিন বিছানায় সিটিয়ে আছে, শরীরটা কাঁপছে । চোখদু’টো কান্নায় ফুলে গেছে। ঠোঁটের কোণে জমে আছে শুকনো র’ক্তের দাগ। সেই দাগের কারণ ঘরে বসে থাকা মানুষটা, আদ্র। সোফায় আধভঙ্গিতে বসে আছে সে, অন্ধকার আলোয় তার মুখটা কেমন অচেনা লাগছে । সিগারেটের আগুনে মাঝে মাঝে চোখ দু’টো ঝলসে উঠছে। চোখ লালচে, চোয়াল শক্ত। একটার পর একটা সিগারেট শেষ করছে, ধোঁয়াটা ছুঁড়ে দিচ্ছে ওয়ারিনের দিকেই।তার ডানহাতে ধরা সিগারেটের আগুনটা বারবার জ্বলছে নিভছে, আর প্রতিবার ধোঁয়া বের হচ্ছে কুণ্ডলির মতো।ওয়ারিন ঠোঁট চেপে রাখে, যাতে কাঁপা গলায় কোনো শব্দ বের না হয়। তার বুক ওঠানামা করছে দ্রুত, মনে হচ্ছে একটু নড়লেই হয়তো আদ্র আবার রেগে যাবে।
হাতদু’টো বিছানার চাদর আরও চেপে ধরে।
আদ্রর চোখ একবারও ওয়ারিনের দিক থেকে সরে না। সে ধোঁয়া ছাড়ে, তারপর হালকা কণ্ঠে বলে,
“চুপ করে বসে আছিস কেন?”
ওয়ারিন মুখ খোলে, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হয় না। ঠোঁটে ব্যথা, ভেতরে ভয়। চোখ নামিয়ে নেয় নিচের দিকে, তাকাতে ভয় হয়।
আদ্রর ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি খেলে যায়। সে সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে নিভিয়ে আরেকটা জ্বালায়। আগুনের আলোর ঝলকে মুহূর্তের জন্য তার মুখটা স্পষ্ট হয়। তখন আদ্রর ধারালো কণ্ঠে আসে,
“আমার বেডে বসার সাহস দিয়েছে কে?”
আদ্র তখনও তাকিয়ে আছে তার দিকে, নির্বিকারভাবে। যেনো কোনো কিছু ঘটেনি, কিছুই হয়নি। এবার আদ্র ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। আদ্রকে আবার কাছে আসতে দেখে ওয়ারিন কুঁকড়ে যায় আরও। আদ্র তার সামনে এসে থামে। ওর চোখে কোনো রাগ নেই, নির্লিপ্ত । সে এক হাত বাড়িয়ে ওয়ারিনের চিবুক ধরে মুখটা ওপরে তোলে।
“কথা বলছিস না কেন?”
ওয়ারিন চুপ। চোখে জল জমে ওঠেছে। এক মুহূর্তে আদ্রর ধৈর্য ভাঙে। তার আঙুলগুলো শক্ত হয়ে আসে, ওয়ারিনের গাল চেপে ধরে।তীক্ষ্ণ আঙুলের চাপ পড়তেই ওয়ারিন ব্যথায় মুখ কুঁকড়ে ফেলল। চোখ থেকে অশ্রু বেরিয়ে এল। ব্যথায় চোখ বন্ধ করে ফেলে।চোয়ালের চাপ এত শক্ত, মনে হচ্ছে নিচের হাড় পর্যন্ত ভেঙে যাবে।
“আমি একবার বলেছি, আমার নিয়ম ভাঙবি না। তবু বারবার সীমা টপকাচ্ছিস।”
আদ্রর চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, দাঁত চেপে রাগে তার কপালের শিরা ফুলে উঠেছে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তাঁর দিকে। ওয়ারিনের গাল তখনও আদ্রর মুঠোয়। আঙুলগুলো এতটাই শক্ত যে ওর নরম গালটায় দাগ পড়ে গেছে। ওয়ারিনের মুখটা মুঠোয় আটকে রাখা এক পাখির মতো। নড়তে পারছে না, শুধু শ্বাসটা ভারী হয়ে কাঁপছে। ওর ঠোঁটের র’ক্ত তখনও শুকোয়নি। চোখে জল টলমল করছে, কিন্তু ভয়ে কথা বেরোচ্ছে না। হঠাৎ কাঁপা কাঁপা গলায় বেরোয়, “ছাড়ুন, আদ্র ভাই…. ”
হাতের চাপ কমে না বরং আরও শক্ত হয়ে আসে।
“তোদের এত সাহস হলো কী করে? আমার সাথে এমন করার? ওই রিদা কে তো ছাড়বো না। আর তোকেও ছেড়ে দিবো ভাবিস না।”
ওয়ারিন কেঁপে ওঠে। তার হাতদু’টো কাঁপতে কাঁপতে আদ্রর হাত ধরতে যায়, চাপটা একটু হলেও কমায়। কিন্ত আঙুলগুলো পাথরের মতো শক্ত হয়ে আছে। আদ্রর ঠোঁটে কোণে তিক্ত হেসে বলে,
“দয়া করে তোকে বিয়ে করেছি, বুঝলি? দয়া।
আদ্র চৌধুরীর বউ হওয়ার তোর কোনো যোগ্যতা নেই।”
কথাগুলো ধারালো ছুরির মতো ওয়ারিনের বুক চিরে ঢুকে যায়। চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে অঝোরে, কিন্তু আদ্রর দৃষ্টি একটিবারের জন্যও নরম হয় না। সে গাল থেকে হাত সরিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। তারপর হঠাৎই হাত বাড়িয়ে টেনে নেয় ওয়ারিনকে। এতটাই জোরে যে ওর হাত থেকে চাদরটা ছিটকে পড়ে যায়। ওয়ারিন ভারসাম্য রাখতে না পেরে বিছানা থেকে ছিটকে ফ্লোরে পড়ে যায়।
পরবর্তী পর্ব পেতে পেজে ফলো দিয়ে রাখুন
https://www.facebook.com/share/179TsoqK6a/
আদ্র নিচু হয়ে তাকায়, “নিচে ঘুমাবি তুই।”
ওয়ারিন নিঃশব্দে নিচে বসে থাকে, ভয় আর অসহায়তা সবকিছু মিলে বুকটা পাথর হয়ে গেছে। আদ্র ধীরে ধীরে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু কয়েক কদম যেতেই হঠাৎ থেমে যায়। পেছন ফিরে তাকায়। চোখে সেই একই রাগ, কিন্তু ঠোঁটে বাঁকা হাসি। আদ্র এগিয়ে আসে কয়েক ধাপ,একদম কাছে। এতটা কাছে যে ওয়ারিন দেয়ালের সঙ্গে পিঠ ঠেকিয়ে যায়।
আদ্র নিচু গলায় বলে,”আজকে না, আমাদের বাসর।”
ওয়ারিনের চোখ বড় বড় হয়ে যায়, ঠোঁট শুকিয়ে আসে। আদ্র ধীরে ধীরে শার্টের বোতাম খুলতে শুরু করে। প্রতিটি বোতাম খুলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওয়ারিনের বুকের ভেতর ধুকপুকানি আরও বেড়ে যায়। চোখ বন্ধ করে ফেলে।ঠোঁট কাঁপছে, বুকের ভেতর দম আটকে আছে।
কিছুক্ষণ পর হঠাৎই ওর মাথায় কিছু নরম জিনিস পরে । চোখ খুলে তাকায় ওয়ারিন।
তার মাথায় আদ্রর শার্টটা পড়ে আছে।
বিভ্রান্ত চোখে তাকিয়ে দেখে। আদ্র তখন ওয়াশরুমের দিকে হাঁটছে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একবারও ফিরে তাকায় না। শুধু বলে,
“পরিষ্কার করে ঘুমা। ওই মেঝেতেই তোর জায়গা।”
দরজাটা বন্ধ হয়ে যায় ধীরে,ওয়ারিন হাত দিয়ে মাথা থেকে শার্টটা নামায়। আদ্রর গায়ের ঘ্রান লেগে আছে তাতে। সেই ঘ্রানটা যে ওর বুকের ভেতর কাঁটা হয়ে বিঁধে যাচ্ছে।
——-
সকালের আলো হালকা করে রুমে ঢুকছে। পর্দাগুলো আধখোলা, ব্যালকনির হাওয়া হালকা পর্দা উড়িয়ে নিয়ে আসছে ঠান্ডা স্রোত।
চোখে আলো পড়ায় ওয়ারিনের ঘুমটা ভেঙে গেল। চোখ খুলতেই চারদিকটা অচেনা ঠেকল তার। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো,সে কোথায় আছে? তারপরই সব মনে পড়ে গেল।
রাতের ঘটনাগুলো ঝাপসা ছবির মতো ফিরে আসে মাথায়। গলা শুকিয়ে যায়। একবার নিঃশ্বাস নিয়ে চারপাশে তাকায়। ব্যালকনির পর্দা পুরো সরানো। বাতাসে পর্দাটা দুলছে ধীরে ধীরে। বিছানার চাদরটা অগোছালো, বালিশের পাশে ভাঁজ পড়ে আছে। কিন্তু আদ্র ভাই নেই।
এক মুহূর্ত চুপচাপ তাকিয়ে থাকে সেই খালি বিছানার দিকে। তখন ওয়াশরুম থেকে হালকা পানির শব্দ আসে। ওয়ারিন সাবধানে উঠে দাঁড়ায়। গায়ের চাদরটা ঠিক করে নেয়, তারপর নিচের মেঝর চাদর আর বালিশটা তুলে রাখে।
বিছানাটাও গুছিয়ে রাখে। তারপর ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগোয়। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে একবার তাকায় ওয়াশরুমের দিকে। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নেয়, তারপর চুপচাপ রুম থেকে বেরিয়ে আসে।
ডাইনিং টেবিলটা সাজানো, সকালের আলো পর্দার ফাঁক গলে টেবিলের উপর পড়ে আছে। টেবিলের এক পাশে বসে আছে আরিশা, আদ্রর একমাত্র বড় বোন। আদ্রর বাবা নেই, গত তিন বছর ধরে সবকিছু নিজেই সামলাচ্ছে। গত কালকে বিয়ের কথা বলেছে মালিনী বেগম। রাত হয়েছে এজন্য আসেনি, আজকে আসলো। মুখে মেকআপের হালকা ছোঁয়া, চুল বাঁধা, পরনে সাদা সিল্কের কামিজ আর সোনালী ওড়না। পাশের চেয়ারে বসে ছোট্ট রোহান, তার চার বছরের ছেলে। এক হাতে চামচ নিয়ে বাটিতে ঠুকঠাক আওয়াজ করছে। মুখে দুধ লেগে আছে। আরিশার দৃষ্টি পুরো সময়টা ফোনের স্ক্রিনে আটকানো। নিউজফিডে ভেসে উঠছে একের পর এক হেডলাইন।
“এআর কোম্পানির চেয়ারম্যান আদ্র চৌধুরী বিয়ে করলেন এক এতিম মেয়েকে।”
আরিশার মুখটা শক্ত হয়ে আসে। ঠোঁট কামড়ে রাগ চেপে রাখার চেষ্টা করছে। স্ক্রিনে নিউজের নিচে হাজার হাজার মন্তব্য। এই মেয়েটা কে?চৌধুরী পরিবারের মান-সম্মান নষ্ট করে দিল। এতিম মেয়েকে বিয়ে করল কেন? আরও কতকিছু। আরিশার চোখে স্পষ্ট বিরক্তি। সমাজের এই বিচার, এই বিষাক্ত মন্তব্য ভালো লাগছে না। যেনো ওর ভাই কোনো বড় অপরাধ করে ফেলেছে। একটা দীর্ঘ ভারি শ্বাস ফেলে আরিশা ফোনটা টেবিলে রাখল। তখনই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামার শব্দ হয়। ওয়ারিন নিচে নামছে। রোহান হঠাৎই মুখ তুলে তাকাল। ওর ছোট্ট মুখে আনন্দের ঝিলিক। “আপু।”
ওয়ারিনের মুখে হাসি ফুটলো। নিচু হয়ে রোহানকে কোলে তুলে নিল।
“রোহান, নাস্তা খেয়েছ?”
রোহান গালে হাত দিয়ে বলল, “না, তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।”
ওয়ারিন হেসে ওর কপালে চুমু খেল।”তুমি তো একেবারে ভালো ছেলে।”
আরিশা তাদের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। ওয়ারিনের মুখে একটা সরলতা আছে। মেয়েটা কী সুন্দর করে হাসে। ততক্ষনে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নামে আদ্র । কালো ফরমাল প্যান্ট, সাদা শার্ট, হাতা গুটানো। চোখে সেই আগের মতোই তীক্ষ্ণ গম্ভীর দৃষ্টি। ও নিচে নামতেই রোহান চিৎকার করে উঠল,
“মামা।”
রোহানের সেই ডাকে আদ্রর ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটল। ও নিচু হয়ে ওর গালে হালকা চুমু দিল। “গুড মর্নিং, চ্যাম্প।”
তারপর চেয়ারে গিয়ে বসে পড়ল। টেবিলের সামনে প্লেট, ছুরি-কাঁটা, সব সাজানো। ওয়ারিন তখনও টেবিল থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। মাথা নিচু, হাত দু’টো আঁচলের কিনারা ধরে আছে টানটান করে। মুখে অস্বস্তি। আরিশা একবার ওয়ারিন আর আদ্রর দিকে তাকায়। কথা না বললেও তাদের মুখের অভিব্যক্তিই সব বলে দিচ্ছে। তাদের মধ্যে বোঝাপড়াটা একদমই ঠিক নেই।
“তুই দাঁড়িয়ে আছিস কেন, ওয়ারিন? বস।”
ওয়ারিন একটু ইতস্তত করল, কিন্তু ঠিক সেই সময় আদ্রর কণ্ঠস্বর এলো,
“খাবার টেবিলে শুধু ফ্যামিলিরা বসে।”
আরিশা হালকা ধমকের সুরে বলল,
“আদ্র, ওরা ছোট একটা ভুল নাহয় করেই ফেলেছে। ইগোতে বিষয়টা নিস না।”
আদ্রর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে রাগ চেপে রাখার চেষ্টা করলেও কণ্ঠে তীক্ষ্ণতা বেড়ে গেল,
“ছোট? সিরিয়াসলী, আপু? ১৯ আর ২৩ বছরের মেয়েরা ছোট?”
আরিশা চুপ। ও জানে, আদ্র রেগে গেলে তর্কে কোনো ফল হয় না। কিন্তু তবুও নরম গলায় বলে, “আচ্ছা, আপাতত মেনে নে।”
“আপাততও পারবো না।”
সে চেয়ারটা পিছনে ঠেলে উঠে দাঁড়াল। প্লেটের ওপর আধখাওয়া স্যান্ডউইচ, পাশে ঠাণ্ডা কফি।
আদ্রর চোখ একবারও ওয়ারিনের দিকে গেল না। সোজা বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। ওয়ারিন ঠোঁট কামড়ে তাকিয়ে রইল ওর পেছনের দিকে।
তখনই কিচেন থেকে মালিনী বেগম বেরিয়ে এলেন। হাতে এক গ্লাস আপেলের জুস, আদ্রর জন্য। কপালে হালকা ভাঁজ। সকালবেলার তাড়াহুড়ো আর অস্বস্তিকর, সব মিলিয়ে মুখে ক্লান্তির ছাপ। তিনি চারদিকে তাকালেন একবার। টেবিলে আধখাওয়া স্যান্ডউইচ, ঠাণ্ডা কফি, চেয়ার টানা অবস্থায় পড়ে আছে।
চোখ ঘুরে থামল আরিশার মুখে, তারপর বললেন, “আদ্র কই?”
আরিশা মৃদু শ্বাস ফেলে বলল,”চলে গেছে।”
মালিনী বেগম এক মুহূর্ত চুপ রইলেন।
হাতের জুসটা টেবিলে রাখলেন, বুঝে ফেলেছেন আবারও অকারণে মনোমালিন্য হয়েছে। এই ছেলেকে নিয়ে যে কী করবে।আরিশা তখন ওয়ারিনের দিকে তাকাল।
ওয়ারিন এখনো আদ্রর যাওয়ার দিকটার দিকে তাকিয়ে আছে।
“আর তাকিয়ে লাভ নেই, ওয়ারিন। তুই বস। ও অফিসে গিয়ে খেয়ে নেবে।”
ওয়ারিন চুপ করে চেয়ার টেনে বসে।
চলবে……??
