#লিটল_গার্ল
#পর্ব_৮ (অন্তিম পর্ব )
#আইজা_আহমেদ
(কপি পোস্ট নিষিদ্ধ )
মিষ্টি সকালটা অন্য দিনের চেয়ে একটু বেশি কোমল আজ। জানালার ফাঁক দিয়ে সূর্যের সোনালি আলো ঢুকে পড়েছে, বাইরে পাখিরা ডাকছে, গাছের পাতায় ঝুলে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো আলোয় ঝিলমিল করছে। মালিনী বেগম বেরিয়ে গেছেন মার্কেটে। এখন কিচেনে দাঁড়িয়ে ওয়ারিনের হাত ব্যস্ত। রান্না করতে করতে মাঝে মাঝে তাকায় ঘড়ির দিকে,চামচে তরকারিটা তুলে স্বাদ নেয়। ঠোঁটে মিষ্টি হাসি ফোটে। ঠিক আছে। তারপর ঢাকনা দিয়ে দেয়, গ্যাসের আঁচ কমিয়ে দেয়।
“আদ্র…আদ্র….”
রাগে গজগজ করতে করতে ঘরে ঢোকে আয়াশ। রাগে চোখ লাল হয়ে আছে, হাতে মোবাইলটা শক্ত করে চেপে ধরে আছে। মুখে এখন আর সেই আত্মবিশ্বাস নেই। ভিডিওগুলো সবার হাতে পৌঁছে গেছে। মফিজ সাহেব শুধু ঠান্ডা গলায় বলেছিলেন,
“আজ থেকে তুই আমার ছেলে না। বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে। তোর মুখ আর দেখতে চাই না।”
এই একটাই বাক্য তার পৃথিবী ভেঙে দিয়েছে।
বাবা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, মা কাঁদতে কাঁদতে রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিয়েছিল। সব শেষ।
এই ক্ষোভে এখন চোখে শুধু একটাই মুখ ঘুরে বেড়াচ্ছে। চিৎকার শুনে কিচেন থেকে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে আসে ওয়ারিন। এপ্রোনটা খুলে হাত মুছতে মুছতে বলে,
“এভাবে চিৎকার করছেন কেন, আয়াশ ভাইয়া? কী হয়েছে?”
“ওই হামার’জাদা কই? আজ ওকে আমি ছিঁড়ে ফেলব!”
“মুখ সামলে কথা বলুন, আয়াশ ভাইয়া।”
আয়াশ তাচ্ছিল্যের হাসি দেয়, ঠোঁটের কোণে কাঁপুনি।
“তোর মুখ দিয়ে দেখি বুলি বের হচ্ছে ?”
ওয়ারিনের ঘৃণাভরা চোখে তাকায় আয়াশের দিকে। ভিডিওগুলো ও দেখেছে সবকিছু। সে
তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর কাঁপা কণ্ঠে বলে, “আপনার লজ্জা করে না? যে কাজ করেছেন, তা দেখার পরও মুখ দেখার সাহস হয় কীভাবে?”
আয়াশ টেবিলের উপর মুষ্টি মেরে আঘাত করে।
“সব ওই আদ্রর দোষ! ও আমার নামে ভিডিও ছড়িয়েছে!”
“আপনি নিজের ভুলের শাস্তি পাচ্ছেন, এতে অন্য কাউকে দায়ী করবেন না।”
আয়াশের মুখ পাল্টে যায় রাগে। ওয়ারিনের এই কথাগুলো ওর গায়ে বিষের মতো বিঁধে যাচ্ছে। হঠাৎ এক ধাপ এগিয়ে আসে, রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে আসে।
“তুই আমার সঙ্গে এমন করে কথা বলছিস? একবারে হাত কেটে ফেলব!”
আয়াশকে এখন পাগল লাগছে ওয়ারিনের কাছে। “আপনি মানুষ না, আয়াশ ভাইয়া। দানব হয়ে গেছেন।”
আয়াশের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। সে হাত তোলে। কিন্তু হাতটা আর নামাতে পারে না। আয়াশের শরীর হঠাৎ কাঁপতে থাকে, মুখ থুবড়ে গিয়ে মেঝেতে পড়ে যায়। ওয়ারিন স্তব্ধ হয়ে যায়। ধীরে ধীরে চোখ ঘুরিয়ে পিছনে তাকায় ও। সামনে দাঁড়িয়ে আছে আদ্র। ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে সে। মেঝেতে পড়ে থাকা আয়াশের দিকে তাকায়। ওয়ারিন এখন ও ভয় পাচ্ছে। আদ্র ওর সামনে এসে থামে, একবার ওর মুখের দিকে তাকায়। ওয়ারিনের চোখে ভয়ের সঙ্গে মিশে আছে নিশ্চিন্ততা। আদ্র নরম গলায় বলে,
“তুই ঠিক আছিস?”
ওয়ারিন কিছু বলতে পারে না, কেবল মাথা নাড়ে। কিছুক্ষন পর আয়াশকে পুলিশ এসে নিয়ে যায়।
——-
রাত নেমে এলে পৃথিবী এক অন্যরকম শান্ত রূপ ধারণ করে। চারদিকের কোলাহল স্তব্ধ হয়ে যায়, মানুষের ভিড় সরে গিয়ে জায়গা করে দেয় নিস্তব্ধতাকে। সেই নিস্তব্ধতার মাঝেই আকাশ ধীরে ধীরে খুলে দেয় তার অপার সৌন্দর্যের পর্দা। অসংখ্য তারার ঝিকিমিকি আলো ছড়িয়ে পড়ে। রাতের আকাশের দিকে তাকালে মনে হয়, এই বিশালতার নিচে মানুষ কত ছোট, কত ক্ষণস্থায়ী। তবুও এই ছোট জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত সেই অসীম আকাশের মতোই গভীর।
আদ্র ল্যাপটপ আলতো করে বন্ধ করল। নীল স্ক্রিনের আলো নিভে যেতেই ম্লান হয়ে গেল। ওয়ারিন বসে আয়নার সামনে চুল আচড়াচ্ছে। চুল কাঁধ ছুঁয়ে পিঠ বেয়ে নেমে এসেছে। আদ্র কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকল, তারপর ধীরে ধীরে ওর দিকে এগিয়ে গেল। ওয়ারিন আয়নার মধ্যে আদ্র কে দেখতে পেল। ওর পেছনে এসে দাঁড়ায় আদ্র। আয়নার ভেতর দুজনের প্রতিচ্ছবি পাশাপাশি। আদ্র চিরুনি টা আলতো করে ওয়ারিনের হাত থেকে নেয়। ওয়ারিন একটু থমকে তাকায়, তারপর মৃদু হেসে ফেলে।
আদ্র বলে, “বেণী করে দিবো?
ওয়ারিন ছোট্ট করে বলল,”দিন।”
আদ্রর আঙুলের ছোঁয়া ওয়ারিনের কাঁধ ছুঁয়ে পিঠের নিচে নামে। সে চুলগুলো আলতো করে ভাগ করে নেয় দুই পাশে, আঙুলের মাঝে নরম চুলগুলো বয়ে যায়। ওয়ারিনের বুকের ভেতর কেমন ঢেউ ওঠে। আদ্র নিচু গলায় বলে,
“চুলগুলো এত লম্বা হলো কখন?”
“আপনি খেয়াল রাখেন নি।”
মাথা নাড়লো আদ্র আসলেই খেয়াল করেনি। ওয়ারিন আয়নায় তাকিয়ে দেখে। আদ্রর কপালের পাশে ঝুলে পড়েছে কয়েকটা চুল, কপালের ঘামে লেগে আছে। সে ধীরে ধীরে বেণী বুনে চলছে, এক এক করে আলতো টান দিচ্ছে। ওয়ারিনের নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে গভীর হচ্ছে। বেণী প্রায় শেষের দিকে গেলে আদ্র চুলের ডগা একসাথে পেঁচিয়ে বলে,
“এইভাবে হলে হবে?”
ওয়ারিন হেসে বলে,”অনেক ভালো হয়েছে।”
আদ্রর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে। বেণীটা শেষ করে রাবার ব্যান্ড পরিয়ে দেয়। ওয়ারিন বিছানায় গিয়ে ধীরে ধীরে বসে পড়ে। ঘরটা টেবিল ল্যাম্পের আলোয় ভরে আছে। আদ্র ওয়ারিনের দিকে এগিয়ে আসে। ওয়ারিনের পাশে এসে থেমে যায়। এক মুহূর্তের জন্য তাকিয়ে থাকে তার মুখের দিকে। তারপর কোনো কথা না বলেই ধীরে ধীরে মাথাটা ওয়ারিনের বুকে রাখে। ওয়ারিন তাকায়।
আদ্রর শরীরের উষ্ণতা ছুঁয়ে যাচ্ছে। হৃদস্পন্দনের সঙ্গে মিশে যায় আদ্রর নিঃশ্বাসের তাল।
“মাথায় হাত বুলিয়ে দে। ”
ওয়ারিনের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে ওঠে। সে একটাও কথা না বলে, আস্তে করে আদ্রর চুলে হাত রাখে। আঙুলগুলো নরমভাবে চুলের ভেতর দিয়ে চলে যায়, আর আদ্র চোখ বন্ধ করে ফেলে। তার মুখের কোণে শান্ত ছায়া নামে। যেমন সব ঝড় পেরিয়ে অবশেষে সে আশ্রয় পেয়েছে।ওয়ারিনের মনটা হালকা হয়ে যায়। নরম কণ্ঠে নিজেকেই বলে,
“আর কিছু চাই না…আপনি থাকলেই আমি সম্পূর্ণ।”
এতদিনের ভয়, অনিশ্চয়তা। কিছুই যে আর নেই। এই মানুষটা, যাকে সে কখনও ভয় পেয়েছে, কখনও ভালোবেসেছে, আজ তার বুকে শিশুর মতো শান্ত হয়ে শুয়ে আছে। এই মুহূর্তটা কখনো ফুরিয়ে না যাক। সে সবথেকে খুশি এখন। তার পাশে আদ্র, মাথা রেখেছে তার বুকে। ওয়ারিন নিচে তাকায়, আদ্রর মুখটা শান্ত, নিশ্চিন্ত। চোখ বন্ধ। তারও হাত বুলাতে বুলাতে চোখ বন্ধ হয়ে আসে।
~সমাপ্ত~
