#লিটল_গার্ল
#পর্ব_৫
#আইজা_আহমেদ
(কপি পোস্ট নিষিদ্ধ )
নাজিম সাহেব দুই ভাই এক বোনের মধ্যে বড়। খানিকটা জেদি মানুষ তিনি। নিজের সিদ্ধান্তে কাউকে হস্তক্ষেপ করতে তিনি পছন্দ করতেন না। তাঁর বোন নাদিয়া বেগম নিজের সংসারে সুখে আছেন। নাদিয়ার একমাত্র ছেলে আহির, পরিবারের সবার প্রিয় । নাজিম সাহেবের একমাত্র মেয়ে রিদা আর ছেলে আয়াশ। আহির আর রিদার বয়স প্রায় সমান। ছোটবেলায় দু’জনের মধ্যে ছিল দারুণ বন্ধুত্ব। সময়ের সাথে সাথে তাদের সেই বন্ধুত্ব ভালোবাসায় পরিণত হয়। ছেলের খুশির জন্য একদিন তিনি সাহস করে বড় ভাই, নাজিম সাহেবের কাছে প্রস্তাবটা দিলেন। এতে পারিবারিক সম্পর্ক আরও গভীর হবে, নিজের ছেলেও খুশি, আর ভাইয়ের মেয়েও থাকবে নিজের কাছে, দুপক্ষেরই আনন্দ। কিন্তু নাজিম সাহেব না করে দিলেন, আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে দিবেন না। ভাইয়ের এমন কঠোর প্রত্যাখ্যান তার মন ভেঙে দিয়েছিল তাঁর। এভাবেই এক ভুল বোঝাবুঝি, ভাই-বোনের বন্ধনের মধ্যে অদৃশ্য প্রাচীর তুলে দিল। আর সেই প্রাচীর আজও অটুট।
রাত বারোটা ছুঁই ছুঁই। ছাদের ওপরে থাকা ছোট্ট লাউঞ্জটা অন্ধকার আধো আলোয় ভাসছে। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে আছে খালি গ্লাস, বোতল। আয়াশ চুপচাপ বসে আছে কোণের টেবিলে। দৃষ্টি তখন শূন্যে।পাশে আফনান টেবিলে কনুই রেখে মাথা টেকিয়ে রেখেছে, চোখ বন্ধ। হালকা আলোয় দেখা যাচ্ছে তার মুখটা লালচে হয়ে আছে, চুলগুলো এলোমেলো, আর গলার কাছে বোতাম খোলা। বাতাসে অ্যালকোহলের গন্ধ ভাসছে।
“আফনান।” আয়াশ বলে।
কোনো সাড়া নেই। আফনান কেবল একটা হালকা গুঙিয়ে ওঠে, তারপর আবার নিঃশব্দ। তখনই পেছনের লিফটের শব্দ শোনা গেল। ধীরে ধীরে দরজা খুলে আদ্র এগিয়ে এলো।
পরনে হালকা গ্রে শার্ট। নাকের পাশে সামান্য দাগ, কিন্তু মুখ শান্ত। আয়াশ টের পায়নি। আদ্র যখন এগিয়ে এসে টেবিলের পাশে দাঁড়াতেই হঠাৎ সে তাকাল, আর এক মুহূর্তও না ভেবে চেয়ারটা ঠেলে পিছিয়ে দাঁড়াল সে। আফনান তাকালো না, মাতাল অবস্থায় নিজের মধ্যে হারিয়ে আছে। আয়াশ মুখ শক্ত করে একবার আদ্রর দিকে তাকাল। মুখের ভাব বদলে গেল,চোখে তীব্র ঘৃণার ছাপ ফুটে উঠছে। একটা কথাও না বলে চুপচাপ চেয়ারটা সরিয়ে দ্রুত সেখান থেকে চলে গেল। আদ্র কিছুক্ষণ সেই খালি চেয়ারটার দিকে তাকিয়ে রইল। ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের ছোঁয়া। ধীরে ধীরে নিজের চেয়ারটা টেনে বসল। চোখ গেল আফনানের দিকে। আফনান তখনও টলছে। আদ্র পা দিয়ে আলতো করে ওর হাঁটুতে ঠেলা দিল।
“ওই, আফনান।”
আফনান বিরক্ত মুখে চোখ খুলে তাকাল। চোখ লাল, চেহারায় মাতাল ক্লান্তি।
“আবার ছেকা খেয়েছিস?”
আফনান ভাঙা গলায় হেসে ফেলল, হাসিটাও ম্লান। গলা ভার করে বলে উঠল,
“এক সপ্তাহ ধরে আমার ফোন তুলছে না, জানিস? আদরে আদরে বাঁদর বানিয়ে ফেলেছি মেয়েটাকে। এখন সে বাঁদর আমাকেই তাড়িয়ে দিল।”
আদ্রর ঠোঁটে কোনো হাসি নেই, শুধু কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। তারপর ধীরে জিজ্ঞেস করল,
“এখানে আয়াশ এসেছিলো কেন?”
আফনান চোখ পিটপিট করে কিছু বুঝতে চেষ্টা করল, তারপর কপাল কুঁচকে বলল,
“কী হয়েছে জানিস…. ”
বাক্য শেষ না করেই আফনান আবার মাথা নিচু করে ফেলল। গ্লাসে অবশিষ্ট অ্যালকোহলটা এক ঢোকে শেষ করে দিল, আর একটু পরই শরীরটা ঢলে পড়ল চেয়ারে। আদ্র কিছু বলল না। শুধু টেবিলের দিকে তাকিয়ে থাকে। একটা আঙুলে সিগারেটের ছাই ঝরিয়ে দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ে ধীরে। বাইরে হাওয়া তখন একটু জোরেই বইতে শুরু করছে। রাতটা আরও গাঢ় হয়ে এসেছে। রাস্তায় বাতিগুলোর আলো এখন ঝাপসা লাগছে, টেবিলের ওপর পড়ে থাকা গ্লাসটা ধীরে ধীরে গড়িয়ে নিচে পড়ার উপক্রম, ঠিক তখনই আফনান হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়।
কিন্তু উঠে পড়তেই দুলে যায় সে, ভারসাম্য রাখতে পারে না। এক পা সামনে বাড়াতেই প্রায় মাটিতে পড়ে যাচ্ছিল। আদ্র চট করে উঠে ধরে ফেলে তাকে, শক্ত হাতে।
“শা’লা, তোকে বলেছিলাম না সাথে একটা বডিগার্ড রাখ?”
আফনান মাথা তুলে তাকায়, চোখ দুটো লালচে, ঠোঁটে মাতাল হাসি।
“তুই আছিস না, আদ্র। বডিগার্ডের দরকার কী?”
আদ্র চোখ উল্টে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।দৃঢ় স্বরে বলে,
“বাড়ি যাবি, চল।”
আফনান কোনো উত্তর দেয় না, বরং হঠাৎ বলে ওঠে, “আদ্র….”
তারপর এক মুহূর্তেই আদ্রর গলা জড়িয়ে ধরে।
আদ্র মুহূর্তের জন্য থমকে যায়, দাঁতে দাঁত চেপে ধরে রাখে নিজেকে। বুকের ওপর আফনানের ভারী শরীরের চাপ। যদি আফনান মাতাল না থাকতো, এতক্ষণে ওর গালে দু’একটা জোরে থাপ্পড় দিতো।
“ছাড় তো।”
কিন্তু আফনান ছাড়ে না, বরং হেসে বলে,
“বিয়ে করেছিস, ট্রিট দিবি। বুঝেছিস? ট্রিট! বড় করে দিবি কিন্তু।”
আদ্রর চোখে বিরক্তি, ঠোঁট শক্ত করে চেপে ধরে। সে হাত বাড়িয়ে আফনানকে কাঁধে তুলে নেয়। আফনান হেসে যাচ্ছে এখনো, আধো ঘুমে জড়ানো কণ্ঠে বলছে,
“তুই আমার ভাই, আদ্র.. জানিস তো?”
আদ্র কোনো উত্তর দেয় না, শুধু পা বাড়ায়। দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে আসে। ঠান্ডা হাওয়া মুখে লাগছে। গাড়ির কাছে এসে দরজা খুলে আফনানকে ভেতরে বসায়, সিটবেল্ট লাগিয়ে দেয় নিজেই। আফনান তখনও হেসে যাচ্ছে।
আদ্র দরজাটা বন্ধ করে নিজের সিটে বসে ইঞ্জিন চালু করে। গাড়ি ধীরে রাস্তায় নেমে আসে। শহরের আলো টিমটিম করছে। আদ্র গাড়ি থামায় আফনানের ফ্ল্যাটের নিচে। এক হাতে দরজা খোলে, অন্য হাতে আফনানের কাঁধ জড়িয়ে টেনে বের করে। আফনান তখন কাঁধে মাথা ফেলে হোঁচট খেতে খেতে হাঁটছে।
“আফনান, সোজা হাঁট।”
“তুই… তুই বাড়ি যাবি না? ওয়ারিন তো অপেক্ষা করছে।”
আফনান জড়ানো গলায় বলে, চোখ কুঁচকে তাকায় আদ্রর দিকে। আদ্র কোনো উত্তর দেয় না। শুধু হাত দিয়ে দরজার লক খুলে তাকে ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়। ঘরটা অন্ধকার, শুধু জানালার পাশে একচিলতে আলো ঢুকেছে।
আদ্র ধরে আফনানকে টেনে নিয়ে গিয়ে ভিভানের ওপর শুয়ে দেয়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তার নিশ্বাসের ছন্দ ধীর হয়ে আসে।
আদ্র এক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। তারপর ধীরে ঘুরে পাশের বিছানায় বসে পড়ে। চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়ে বিছানায় , কিন্তু ঘুম আসে না। বুকের ভিতর ভার হয়ে আছে। কয়েক মুহূর্ত পর ঠোঁট নড়ে,
“তোকে ভালোবাসি না, ওয়ারিন। আমার মনে তোর জন্য কোনো অনুভূতি আসেনি।”
আদ্র চোখ বন্ধ করে। তাঁর একটু পরই হঠাৎ ধপাস করে একটা শব্দ হয়। আদ্র চমকে না উঠে শুধু চোখ খুলে তাকাল। আধো অন্ধকারে দেখল, আফনান ভিভান থেকে গড়িয়ে মেঝেতে পরে গেছে। আদ্র ইচ্ছে করেই উঠলো না। মেঝেতে পড়ে থাকা আফনানকে একবার দেখে আদ্র ধীরে মাথা ঘুরিয়ে বিছানার ওপাশে ফিরে শুয়ে পড়ল। অন্যেদিকে কেউ একজন যে তাঁর জন্য অপেক্ষা বুঝতেই পারলো না।
.
ওয়ারিন হাতে ফোনটা নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। রাত তো অনেক হয়েছে। আদ্রের নামটা ফোনের কন্টাক্ট লিস্টে অনেকবার চোখে পড়ছে, তবুও কল বাটনে চাপার সাহসটা হচ্ছে না। ফোন দিলে আদ্র যদি রেগে যায়? ফোনটা ওয়ারিন টেবিলের ওপর রেখে দিল। টেবিলে সাজানো খাবারগুলো ঠান্ডা হয়ে গেছে। পোলাও আর মুরগির স্টু। আদ্রের পছন্দের খাবার। কিন্তু সে এখনো আসেনি। ওয়ারিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ায়। জানলার পর্দা সরিয়ে বারান্দায় আসে। চাঁদের আলো ছড়িয়ে আছে পুরো বারান্দাজুড়ে। দূরের গাছগুলো নরম বাতাসে দুলছে। ওয়ারিন রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ায়। ছোট ছোট চুল বাতাসে মুখে এসে পড়ছে। চোখ তুলে আকাশের দিকে তাকায় আকাশ ভরা তারা, আর একটা চাঁদ। মনে হহচ্ছে চাঁদটাও আজ ঠিক ওর মতো, একা।
হঠাৎ ঠান্ডা কিছুর ছোঁয়ায় আদ্রর ঘুম ভেঙে গেল। চোখ খুলতেই বুঝল পানি। ভ্রু কুঁচকে উঠে বসল সে। চুল, গাল সব ভিজে গেছে।
সামনে দাঁড়িয়ে আছে আফনান, এক হাতে আধভর্তি পানির বোতল।
“সমস্যা কী তোর?”
“আমাকে ভিভানে রেখে তুই বিছানায় শুয়েছিস কেন?”
“এতে কী হয়েছে?”
আদ্রর গলা নিস্তেজ, কণ্ঠে আগ্রহ নেই, আফনানের করা প্রশ্নটা তার কাছে একেবারে গুরুত্বহীন। আফনানের চোখে ক্ষোভ ফুটে উঠল।
“তুই জানিস, আমি ভিভানে ঘুমাতে পারি না!উঠে দেখি আমি নিচে পড়ে আছি।”
“তো?”
আফনান এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। আদ্রর গলায় সেই আগের মতোই গা ছাড়া ভাব,কোনো কিছুরই মূল্য তার কাছে নেই। এই নির্লিপ্ত আচরণ সবচেয়ে বেশি জ্বালায় আফনানকে।
সকালের বাতাসে পর্দা দুলছে। ওয়ারিন টেবিলের পাশে বসে রোহানকে খাওয়াচ্ছে।ছেলেটা মুখ ঘুরিয়ে বারবার চামচ এড়িয়ে যাচ্ছে, ওয়ারিন হেসে মৃদু ধমক দেয়,
“রোহান, মুখ খোলো, এই তো শেষ।”
রোহান মুখ ফুলিয়ে তাকায়, তারপর ধীরে মুখ খুলে খায়। ওয়ারিনের মুখে ক্লান্তি, সারা রাত ঘরে ফেরেনি আদ্র।তার ঘুমও হয়নি ঠিকঠাক।
ওই সময় কিচেন থেকে বেরিয়ে এলেন মালিনী বেগম। মুখে চিন্তার ছাপ। চোখ একবার রোহানের দিকে, তারপর ওয়ারিনের দিকে।
ওয়ারিন রোহানকে বলছে, “গুড বয়, আরেকটা কামড়। এটাই শেষ।”
মালিনী বেগম চেয়ার টেনে বসলেন। আরিশা তখন খাচ্ছিলো। তিনি হালকা গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“আদ্র ফোন দিয়েছে?”
আরিশা চোখ তুলে তাকাল,
“হ্যা, সকালে দিয়েছিল। এখন অফিসে। আফনানের সঙ্গে ছিল রাতে।”
মালিনী বেগম কপালে হাত রাখলেন,
“এইভাবে বউ রেখে বাইরে থাকার মানে কী?
আজকে আসুক, বড় হয়ে গেছে বলে এসব করে বেড়াবে ?”
বলতে বলতে মালিনী বেগম উঠে দাঁড়ালেন,
কাপটা হাতে নিয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন। দুপুর গড়িয়ে বিকেল ছুঁই ছুঁই। রোদের ঘরের ভেতর নরম আলো পড়ছে। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আদ্র। হাতে ফাইল, মুখে ক্লান্তির ছাপ। ওয়ারিন হয়তো রুমের ভিতরে আছে, এজন্য দরজা লাগানো।
“ওয়ারিন।”
ওয়ারিন সবে শাড়িটা হাতে নিয়েছে। ঘুরতে যাবে ওরা। মুখে হাসি ফুটলো, সে তো ভেবেছিলো আজকেও হয়তো আসবে না। আদ্র এসেছে, এইটুকুতেই মনে স্বস্তি এলো। শাড়িটা পেঁচানোর সেই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো দীর্ঘসময় হয়ে গেল। ওয়ারিন যেভাবে নিজের হাতে শাড়িটাকে ধরছিল, তাতে মনে হচ্ছিল একটি কোমল লড়াই চলছে।
আদ্র এবার রুক্ষ গলায় বলে ওঠে, “কী হলো? দরজা খুলছিস না কেন?”
“আসছি, একটু দাঁড়ান।”
ওয়ারিন শাড়িটা যত দ্রুত সম্ভব আবার পেঁচানোর চেষ্টা করে। কিন্ত শাড়ি যে বেমানানভাবে ঝুলছে, পড়তে পড়তে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। ওয়ারিন জানে আদ্র ভাই ধৈর্যশীল নয়, একটু দেরি হলেই..। ওয়ারিন, শেষমেষ, কোনো মতে শাড়ি পেঁচিয়ে অস্থিরতা সামলে দরজা খুলে দেয়।
“এতক্ষন লাগে তো……”
আদ্র কথা শেষ করতে পারল না। ওয়ারিনের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ চুপ হয়ে গেল। ওয়ারিনকে এখন পুরো ভিন্ন রূপে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। শাড়ি ঠিকমতো পড়েনি। শাড়ি না, যেনো কোনো বস্তা হয়ে গেছে, ঝুলে ঝুলে তার দেহকে আবৃত করেছে।
চলবে…?
