#লিটল_গার্ল
#পর্ব_২
#আইজা_আহমেদ
(কপি পোস্ট নিষিদ্ধ )
লস অ্যাঞ্জেলসের রাত। বাইরে আকাশে তারা ঝলমল করছে। বাড়ির চারপাশে সারি সারি গোল্ডেন লাইট গুলো জ্বলছে। বাড়ির ভিতর মানুষের কোলাহল। সবাই জানে, ঘোমটা দিয়ে বসে থাকা মেয়েটা রিদা। কিন্তু সত্যিটা শুধু একজনই জানে ঘোমটার আড়ালে বসে আছে রিদা নয়, বরং ওয়ারিন। ওয়ারিনের বুক ধকধক করছে। ঘোমটার নিচে নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছে। হাত কাঁপছে, চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু, চুপ করে আছে সে। এই মুহূর্তে শব্দ করারও সাহস পাচ্ছে না। যে বিয়ে তার জীবনের বাইরে থাকার কথা ছিল, সেই বিয়েই আজ তাকে শিকলের মতো বেঁধে ফেলেছে।রিদা তার নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য তাকে আগুনের মুখে ঠেলে দিয়েছে। রিদা পালিয়ে গেছে তার বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে। আর এখন তাকে পুতুলের মত বসে থাকতে হচ্ছে। তার মনে রিদার শেষ কথা এখনো বাজছে,”তুই বিয়েটা করে ফেল। আদ্র ভাই কিছু বলবে না। পরে সব ঠিক হয়ে যাবে, দেখিস।”
ওয়ারিন জানে, সব ঠিক হয়ে যাবে কথাটা কেবল রিদার মুখের বুলি। আদ্র তাকে কেমন চোখে দেখবে, তার সঙ্গে কেমন আচরণ করবে, কিছুই সে জানে না। ওয়ারিনের হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। ঘোমটার নিচে তার নিশ্বাস আরও ভারী হয়ে উঠছে। হুজুর কনের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তুমি কি আদ্র চৌধুরীকে তোমার স্বামী হিসেবে কবুল করছো?”
সবার চোখ কনের দিকে। মালিনী বেগমের মুখে প্রশান্তি, মহফুজা বেগম আর সুধা বেগমও তাকিয়ে আছে। কিন্তু ঘোমটার নিচে বসে থাকা মেয়েটার ভেতরে যে ভয়, অপরাধবোধ ঝড় বইছে।ওয়ারিনের গলা শুকিয়ে গেছে। মুখ খুলে শব্দ বের হয় না। তার বুকের ভেতরটা হাহাকার করছে। এত বড় মিথ্যা নাটক সে করতে পারবে না।
হুজুর আবার বললেন, “কবুল বলো।”
পাশে বসে থাকা সুধা বেগম নিচু স্বরে বলে উঠলেন, “ভয় পাচ্ছিস কেন রে? বলে ফেল।”
ওয়ারিনের হাত জোড় হয়ে আসে, কাঁপতে থাকে ঠোঁট। চোখ বন্ধ করে নেয় কয়েক সেকেন্ডের জন্য। তারপরই ডুকরে কেঁদে উঠে ওয়ারিন। চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছে, কণ্ঠ কাঁপছে, সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারছে না। এত বড় বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারবে না। পারছে না আর চুপ থাকতে। সবাই হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। অবশেষে কাঁপা কণ্ঠে বলে ফেলে,
“আমি… আমি রিদা নই… আমি ওয়ারিন।”
সবাই স্তব্ধ, অবিশ্বাসে চোখ বড়ো করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সুধা বেগম ধীরে ধীরে কাঁপা হাতে ঘোমটা সরালেন। কারও মুখে আর কোনো শব্দ নেই। সবাই তাকিয়ে আছে যাকে তারা এতক্ষণ ভেবেছিল রিদা। কিন্তু ঘোমটা সরাতেই দেখা গেল। ওটা রিদা নয়, ওটা ওয়ারিন। সুধা বেগম বিস্ময়ে বলে উঠলেন,
“হায় আল্লাহ! এ যে ওয়ারিন।”
মহফুজা বেগম উঠে দাঁড়ালেন। মুখে বিস্ময়, চোখে রাগের ছাপ। তিনি দ্রুত এগিয়ে এলেন ওয়ারিনের দিকে।
“তুই এখানে কেন?আর আমার মেয়ে কই? রিদা কোথায়? বল?”
ওয়ারিন নিচু হয়ে কাঁপা হাতে তার ওড়নার কোণা মুচড়ে যাচ্ছে। এতগুলো চোখ তার দিকে তাকিয়ে আছে। বিচারকের মতো, অভিযুক্তের মতো নয়। একটু পর সে মুখ তুলল, গলায় কান্না চেপে রাখা স্বর, “রিদা আপু আহির ভাইয়ের সাথে চলে গেছে।”
কিছুক্ষণের মধ্যে তখন দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়লেন মফিজ সাহেব, নাজিম সাহেব আর আদ্র। তিনজনের মুখে স্পষ্ট বিভ্রান্তি।
মফিজ সাহেব বললেন,”এখানে কী হচ্ছে?”
“রিদা পালিয়ে গেছে আহিরের সাথে।”
“আহিরের সাথে ?”
নাজিম সাহেবের কণ্ঠ কাঁপছে, গলায় অবিশ্বাসের সুর। মহফুজা বেগম ছটফট করে উঠলেন, “তুই মিথ্যা বলছিস কেন? বল, আমার মেয়ে কোথায়?”
পরবর্তী পর্ব পেতে পেজে ফলো দিয়ে রাখুন
https://www.facebook.com/share/16Fu3vyfkC/
ওয়ারিন কাঁপা গলায় আবার বলল, “আমি কিছু জানতাম না । রিদা আপু আমাকে অনুরোধ করেছিল। আমি এখানে….”
বাক্যটা শেষ করার আগেই মহফুজা বেগম চিৎকার করে বললেন,
“চুপ কর! তোর মুখ বন্ধ রাখ। তোকে এসবের জন্য এ বাড়িতে রেখেছি। আগে বললি না কেন?”
ওয়ারিনের চোখ বেয়ে পানি ঝরছে। কিন্তু কেউ তার চোখে সেই কান্না দেখতে চাইছে না।
তখনই দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আদ্র একবার চারপাশে তাকাল। মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। না রাগ, না অবাক হওয়া, একদম নির্লিপ্ত। মফিজ সাহেব ধীরে ধীরে বললেন, “এটা যদি সত্যি হয়, তাহলে আজকের বিয়ে….”
কিন্তু কথা শেষ হওয়ার আগেই আদ্রর শীতল কণ্ঠ এলো, “বিয়ের কাজ সম্পূর্ণ করো।”
সবাই থমকে থাকায়। কেউ বিশ্বাস করতে পারছে না। আদ্র এগিয়ে আসে।
“আমি যা বলেছি, তাই করো। রিদা নেই, কিন্তু এই বিয়ে অসম্পূর্ণ থাকবে না। ওয়ারিন আছে মানে বিয়ের আসর খালি নয়। আজ যা শুরু হয়েছে, তা শেষ হবে।”
আদ্র আর এক দন্ড ও দাঁড়ালো না দ্রুত পায়ে বেরিয়ে যায় রুম থেকে। মহফুজা বেগম নিঃশ্বাস নিতে পারছেন না ঠিকভাবে। তাঁর বুক ওঠানামা করছে, চোখে অবিশ্বাস তাঁর মেয়েটা, সেই রিদা, এমন কাজ করল? তিনি হঠাৎ ঢলে পড়লেন সোফায়। কপালে ঘাম জমেছে।
সুধা বেগম দৌড়ে গিয়ে তাঁকে ধরলেন।
“আপা, শান্ত হও। একটু পানি খেয়ে নাও।”
সুধা বেগম তাঁকে ধরে ধীরে ধীরে অন্য রুমে নিয়ে গেলেন, একটু শান্ত করা যায়।
ওয়ারিন বসে আছে একদম নিশ্চুপ, চোখ লাল, গাল ভেজা অশ্রুতে। ফর্সা মুখটা এখন কান্নায় লালচে হয়ে গেছে,গোলাপি ঠোঁট জোড়া কাঁপছে অবিরাম। মালিনী বেগম ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন।তিনি ওয়ারিনের সামনে বসে পড়লেন। মুখটা কান্নায় লাল হয়ে গেছে দেখে তাঁর মন নরম হয়ে গেল। একটু থেমে তিনি হাত বাড়িয়ে ওয়ারিনের গাল মুছে দিলেন। একটু থেমে, খুব নরম গলায় বললেন,
“তোর কোনো দোষ নেই। কিন্তু এখন যা করার, তা শেষ কর। তুই কান্না থামা, চোখ মুছ। এখানে তো তোর কোনো দোষ নেই। সবাই ভুল করে, কিন্তু এখন সময় নষ্ট করলে আরও খারাপ হবে। আদ্র যা বলেছে, সেটাই এখন সবচেয়ে ঠিক। ও রেগে আছে। এই মুহূর্তে, তুই সাহসী হ। কান্না বন্ধ করে কবুল বলে ফেল।”
ওয়ারিন স্তব্ধ। তার চোখ দরজার দিকে, যেদিক দিয়ে আদ্র বেরিয়ে গেছে। মনের ভেতরে এক ভয় আর একরাশ অনিশ্চয়তা। সে জানে না এই কবুল বলাটা ওর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে কিনা, গলা শুকিয়ে গেছে, ঠোঁট নড়ছে।
হুজুর ধীরে বলেন,”কবুল বলো।”
ওয়ারিনের ঠোঁট ধীরে ধীরে কাঁপল, কিন্তু শব্দ বেরোল না। বুকের ভেতর একটাই প্রশ্ন ঘুরছে, আমি কীভাবে বলব সেই শব্দটা, যেটা আমি কখনও উচ্চারণ করার জন্য প্রস্তুতই ছিলাম না। ওয়ারিন চোখ বন্ধ করে নিঃশব্দে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নেয়। তারপর, কাঁপা ঠোঁটে, চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রু মুছে, খুব আস্তে বলে, “কবুল।”
——
রাত প্রায় বারোটা বাজে। পুরো বাড়িটা নিস্তব্ধ, মালিনী বেগম ওয়ারিনকে নিয়ে ঢুকেছেন তাঁদের বাড়িতে কিছুক্ষণ আগেই। মুখে কোনো কথা নেই , শুধু চোখে এক ধরনের ক্লান্তি আর চিন্তার রেখা। আজ সারাদিনে কত কিছুই না ঘটেছে। মন যে এক মুহূর্তের জন্যও শান্তি পাচ্ছে না। আদ্র এখনও ফোন তুলছে না। বারবার কল দিচ্ছেন, কিন্তু সেই দিক থেকে কোনো উত্তর নেই। তিনি জানেন, তাঁর ছেলে যে রেগে গেছে। সেই নির্লিপ্ত চেহারার আড়ালে কতটা আগুন লুকিয়ে থাকে, তা তিনি ভালো করেই জানেন। নির্লিপ্ত, ঠাণ্ডা স্বভাবের ছেলেটা যখন নীরব হয়ে যায়, তখনই তিনি সবচেয়ে বেশি ভয় পান।
মালিনী বেগম একটা জামদানি শাড়ি এগিয়ে দিলেন, “এইটা পর, বউয়ের মতো থাকবি আজ। বাকিটা আল্লাহ্ দেখবে।”
ওয়ারিন কোনো কথা না বলে শাড়িটা হাতে নিল। সূক্ষ্ম নীলচে জামদানির কাজ, আলোয় ঝলমল করছে। কিন্তু তার চোখে কোনো আলো নেই। শাড়িটা পরে সে ধীরে ধীরে আদ্রর রুমে গেল। রুমে হালকা পারফিউমের গন্ধ। মনে হচ্ছে আদ্রর উপস্থিতি এখনও ঘরে আছে।
দরজাটা আলতো করে ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
রুমটা বেশ বড়। দেয়ালে ধূসর রঙের শেড, একটা বড় কাঁচের জানালা যেখান দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়েছে। ওয়ারিনের চোখ ধীরে ধীরে রুমজুড়ে ঘুরল। রুমের এক পাশে একটা বড় কাবাড, ভেতরে পরিপাটি করে সাজানো পোশাকগুলো দেখা যায়। টেবিলের ওপর ছড়ানো কিছু ফাইল। ডান পাশে কাঁচের বড় স্লাইডিং দরজা, যেটা খুললেই ব্যালকনিতে যাওয়া যায়।
ওয়ারিন ধীরে ধীরে বিছানার কাছে গেল, শাড়ির আঁচল ঠিক করে , তারপর চুল খুলে দিল। লম্বা কালো চুল কাঁধ পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ল সেখানে। রাত ১টা ছুঁই ছুঁই করছে।
ওয়ারিনের চোখ জানালার দিকে, কিন্তু মন অন্য কোথাও। বুকের ভেতর ধুকধুক করছে। সে জানে, আদ্রর চোখে আজ সে অপরাধী।
কিন্তু সে-ও তো কিছুই চায়নি। শুধু সাহায্য করতে চেয়েছিল। এখন সেই এক মুহূর্তের সিদ্ধান্ত তার সারা জীবনের ভাগ্য বদলে দিয়েছে।
চলবে…..?
