#লাভ_আফটার_ম্যারেজ
#আনাহিতা_তুলি
#পর্ব_৭
শুভ্র সকাল সকাল রেডি হয়ে নিচে নামল। আজ তার খুবই গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে অফিসে। জাহানারা ডাইনিংয়ে ব্রেকফাস্ট সাজাচ্ছে। শুভ্র চেয়ার টেনে বসতে বসতে মাকে শুধালো,
‘বাবা কোথায় আম্মু। এখনো রেডি হয়নি অফিসের জন্য? ’
জাহানারা কিছু বলার আগেই দেখা গেলো শাহিনুজ্জামান সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছে। তার মুখমণ্ডল বেজার হয়ে আছে। শুভ্রর সামনের চেয়ারটায় বসতেই সে তা লক্ষ্য করলো। বলল,
‘মুড অফ কেনো বাবা? কোনো সমস্যা?’
শাহিনুজ্জামান তিতিবিরক্ত হয়ে বলল,
‘না বাবা কোনো সমস্যা না। তোমরা যে যার নিজের মর্জি মতো চলবে; আর এদিকে বুড়ো বয়সে অফিসের সব দায়-দায়িত্ব আমাকে একাই সামলাতে হবে! আমার আর কি সমস্যা থাকতে পারে!’
শুভ্র হতাশ নিশ্বাস ফেলল। এটা ঠিক শাহিনুজ্জামানকে এই বয়সেও অফিসের দায়িত্ব সামলাতে হয়। কারন শুভ্র আর তার কয়েকজন বন্ধু মিলে নিজেদের একটি কোম্পানি শুরু করেছে। সে তার স্বপ্নের মতো করে তার কোম্পানিকে বাড়িয়ে তুলতে চায়; নিজের শ্রম আর মেধা দিয়ে। তাই তো বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করে; চাকরির দ্বারস্থ না হয়ে নিজের প্রচেষ্টায় কিছু করত চেয়েছে। এবং করছেও আর তাতে সঙ্গী হয়েছে তার কয়েকজন বন্ধুও।
‘বাবা আমি তো যতটুকু পারি তোমাকে হেল্প করি। তোমার বেশিরভাগ কাগজপত্রই আমি দেখে দেই। আর বাকিটুকু কষ্ট করে কয়েকটা দিন সামলে নাও। দুমাস পরেই তো শাওন আসছে দেশে। তারপর ও সবটা হ্যান্ডেল করে নিবে।’
শাহিনুজ্জামান গ্লাসে জুস ঢালতে ঢালতে বললেন,
‘হাহ্! আমি সেই আসাতেই থাকি! সে তো তোমারই ভাই; দেখা যাবে দেশে এসে বলছে— আমি এসব করতে পারব না বাবা। আমি নিজ থেকে অন্য কিছু করতে চাইছি।’
‘চিন্তা করো না। আমার সাথে ওর কথা হয়েছে; বলেছে ফিরে এসে তোমার অফিসেই বসবে। আর তুমি আমাকে খুঁচিয়ে কথা বলো কেনো? আমি তো যতটুকু পারি সময় করে তোমার কাজ গুলো দেখে দেই।’
জাহানারা এবার ভারিক্কি গলায় বললো,
‘তোমরা খাবার টেবিলটাকে কি কনফারেন্স রুম বানিয়ে দিয়েছো নাকি? খেতে বসেছ খাও; এখানে কাজকর্মের এতো কথা উঠাতে হবে কেনো!’
শাহিনুজ্জামান আর কিছু বলেনি। চুপচাপ খেয়ে গেলেন; এটা সত্যি শুভ্র তাকে তার কাজে হেল্প না করলে তিনি আরও হাঁপিয়ে উঠতেন। তাছাড়া এখন কিছু বললে স্ত্রীর পাঁচটা কথা শুনতে হবে।
শাহিনুজ্জামান বের হয়ে যেতেই শুভ্রও উঠে দাঁড়াল বের হতে। কিন্তু পথিমধ্যেই জাহানারা ডাক দিলেন,
‘শুভ্র শুন, তর সাথে দরকারি কথা আছে আমার।’
শুভ্র মায়ের ডাকে দাঁড়াল। শুধালো,
‘কি বলবে বলো। বাট একটু তাড়াতাড়ি বলো কেমন; নাহলে লেইট হয়ে যাবে।’
জাহানারা কঠোর গলায় বলল,
‘হোক লেইট। আগে আমার কথা শুন।’
শুভ্র বুঝতে পারছে মা এখন সিরিয়াস মুডে আছে তাই আর সে কথা বাড়ালো না। সোফায় আরাম করে বসে বলল,
‘ওকে। আমি বসেছি; এবার বলো তোমার অতি দরকারি কথা। শুনছি আমি।’
জাহানারাও ছেলের পাশে বসলেন। তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে বললেন,
‘তুই যে বিয়ে করেছিস; তর যে একটা বউ আছে; সেই খেয়াল আছে তর?’
শুভ্র অবাক না হয়ে পাড়লো না মায়ের এমন কথায়। বলল,
‘এটা আবার কেমন প্রশ্ন আম্মু! আমি ম্যারিড সেটা আমি ভুলে যাবো কেনো? অবশ্যই মনে আছে।’
‘তাহলে বিয়ের পর নতুন বউকে কিছু কিনে দিয়েছিস? তাকে নিয়ে এখনও অব্দি বাহিরে একটু ঘুরাঘুরি করেছিস? নাহ্। এর কিছুই করিসনি। তাই তোকে জিজ্ঞেস করলাম তর যে একটা বউ আছে, বিয়ে করেছিস সেটা মনে আছে কিনা!’
শুভ্র এবার কথা হারালো। সে আসলেই সত্যি গল্পকে নিয়ে এখনো অব্দি বের হয়নি; আসলে এখন অব্দি সুযোগই হয়নি। আর না কিছু কিনে দিয়েছে। তবে বলল,
‘ওর পরীক্ষা চলছিলো এই কয়দিন আম্মু। আজই শেষ হবার কথা।’
জাহানারা যেন এবার তিতিয়ে উঠলেন। বললেন,
‘তর কি কোনো কান্ড-জ্ঞান নেই শুভ্র? তোদের নতুন বিয়ে হয়েছে তাও অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ। কই একটু গল্পকে সাথে নিয়ে ঘুরবি; এটা-ওটা কিনি দিবি তা-না করে সারাক্ষণ শুধু কাজ আর কাজ। যখন পড়াশোনা করতি তখন বই নিয়েই ডুবে থাকতি। এজন্যই- না; তর জীবনে একটাও প্রেম হয়নি।’
শুভ্র যেনো বিস্ময়ে কথা বলতেই ভুলে গেলো। তার মনে হচ্ছে; পৃথিবীতে এই প্রথম কোনো মা তার ছেলের জীবনে একটাও প্রেম হয় নি দেখে আফসোসে আধখান হয়ে যাচ্ছে! শুভ্র মার সাথে আর তর্কে যেতে চায়নি; তবে একটা বিষয় ডিনাই করে বলল,
‘তুমি কিন্তু ভুল বলছো আম্মু। আমি পড়াশোনা ছাড়া অন্য কিছুই বুঝতাম না; এটা কিন্তু ভুল। আমার ঘরে এখনো ব্যাডমিন্টন খেলা আর ফুটবল খেলার সবমিলিয়ে পাঁচ টা টফি আছে। আচ্ছা এখন মূল কথায় আসো; বলো কি বলতে চাইছো?’
জাহানারা বিরক্ত হলো ছেলের কথায়। স্ট্রেইট গলায় আদেশ দিল,
‘কি করবি মানে! এখনো বলে দিতে হবে কি করতে হবে! আজকে তুই অবশ্যই গল্পকে নিয়ে ঘুরতে বেরোবি; শপিংয়ে যাবি। ভালো দেখে শপিং করে দিবি তাকে। বিয়ের পর আজও তর তরফ থেকে গল্পকে কিছু দেওয়া হলো না; তর লজ্জা হওয়া উচিত। আমার তো চিন্তা হচ্ছে তুই সংসারটা কিভাবে করবি! সারাক্ষণ তো দেখি ওসব কি অঙ্ক আর আঁখি ঝুকি নিয়ে পড়ে থাকিস।’
শুভ্র মায়ের এতো এতো অভিযোগ বানীতে হার মানলো। ঠোঁটের কোনে হাসিটা টেনে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
‘ আমারই ভুল। হয়েছে আর চিন্তা করতে হবে না। তোমার পুত্র বধূকে নিয়ে; তোমার পুত্র আজ ঘুরতে যাবে। শপিংও করে দিবে। আর বেঁচে থাকলে ইনশাআল্লাহ সুদূর ভবিষ্যতে তার একটি সুন্দর সংসারও দেখতে পাবে। এবার চিন্তা সরিয়ে একটু হাসি দাও তো প্রিটি লেইডি!’
জাহানারার মনটা খুশিতে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলো। এই চমৎকার ছেলেটিকে সে নিজের গর্ভে ধরেছে ভাবতেই চোখ দুটো খুশিতে চকচক করে উঠলো। শুভ্র এগিয়ে এসে মায়ের কপালে চুমু খেয়ে বেরিয়ে গেলো।
________________
বাড়ি থেকে আসার পরপরই গল্পর মিডটার্ম শুরু হয়েছিলো; যা আজকে শেষ হলো। ভার্সিটি থেকে ফিরেই সে হাত-পা ছড়িয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো। এই কয়েকদিনে তার পড়াশোনা নিয়ে মারাত্মক চাপ গেছে; এতোটা হতো না যদি ন সে মাঝখানে বিয়ের জন্য বাড়িতে আটকে থাকতো। এখন একটু রিলাক্স পেতেই তার চোখে ঘুম এসে হানা দিল; কেননা বিগত কয়েকদিন তার পরীক্ষার জন্য নির্ঘুম রাত কেটেছে। কিন্তু ঘন্টা তিনেক ঘুমানোর পরপরই তার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটলো ফোনের কর্কশ আওয়াজে। গল্প বেজায় বিরক্ত হলো। ফোনের ওপাশে থাকা ব্যাক্তিটিকে ভয়াবহ কিছু গালি দিতে ইচ্ছে হলো তার স্বাদের ঘুম ভঙ্গ করার জন্য। কিন্তু অতিরিক্ত ঘুমের জন্য একটা গালিও মনে হচ্ছে না দেখে বিরক্তি নিয়ে ফোন স্কিনে না তাকিয়েই কল রিসিভ করলো। ঘুম ঘুম গলায় বললো,
‘হ্যালো, হু’জ স্পিকিং?’
গল্পর এমন ঘুম ঘুম কন্ঠে শুভ্র যেনো থমকাল। বুঝতে পারলো ঘুমের ঘোরে ফোন রিসিভ করেছে। সে রাশ- ভারী গলায় উত্তর দিলো,
‘শুভ্র স্পিকিং।’
ওপাশ থেকে আবারও ঘুম জড়ানো গলায় আওয়াজ এলো,
‘শুভ্র টা আবার কে?’
শুভ্র যেনো বিস্ময়ে তাজ্জব বনে গেলো গল্পর এমন কথায়। এই মেয়ে ঘুমের ঘোরে নিজের বরকে চিন্তে পারছে না! সে বিস্মিত গলায় জবাব দিলো,
‘বাহ্! বিয়ের বারো দিনের মাথায় নিজের হাজব্যান্ডের নাম যে মেয়ে ভুলে যায়; সেই মেয়ে কেমিস্ট্রির মতো একটি জটিল বিষয়ে কীভাবে পড়াশোনা করে? ভাবনার বিষয় মিসেস তাহিয়াত!’
গল্পর ঘুম ছুটে গেলো ততক্ষণে। দপ করে উঠে বসে চোখের সামনে ফোন টা ধরতেই দেখে, শুভ্রর নামটা স্কিনে জ্বলজ্বল করছে। কি বলবে কিছুই খুঁজে পেলো না। ইতিউতি করে কন্ঠে ঘুমের রেশ কাটিয়ে বলল,
‘সরি। আসলে আমি ঘুমে ছিলাম তো তাই বুঝে উঠতে পারিনি।’
ওপাশ থেকে শুভ্রর নিরেট গলার আওয়াজ এলো,
‘কিন্তু এবার যে একটু ঘুম থেকে উঠতে হবে তাহিয়াত। আমরা বেরোবো কিছুক্ষণের মধ্যেই।’
গল্প অবাক হলো। এখন আবার কোথায় যাওয়ার কথা হচ্ছে! বলল,
‘বেরোবো? কিন্তু কোথায়?’
‘আমার সাথে একটু শপিংয়ে যেতে হবে। অ্যাই হোপ আপনার কোনো সমস্যা নেই। আমি কিছুক্ষণ বাদেই আপনার হোস্টেলের সামনে আসছি; রেডি হয়ে থাকবেন।’
কথাগুলো বলেই শুভ্র ফোন রাখল। গল্পর কেমন জানি লাগছে! অদ্ভুত এক্সাইটিং! আজ সে এই প্রথম শুভ্রর সাথে বের হবে; ভাবতেই অন্য রকম লাগছে।
গল্প একটা অলিভ-গ্রীন এর মধ্যে সুন্দর সেলোয়ার স্যুট পড়ে নিলো। সাজলো না মোটেই; সাজতে তার দ্বিধা লাগছে। এই দ্বিধা কেনো হচ্ছে সে নিজেও জানে না। তার চিন্তা ভাবনার মধ্যেই রুমে ডুকলো তার রুমমেট ফ্রেন্ড তুশি। গল্পকে এমন ঝকঝকে ড্রেসে দেখে বলল,
‘রুমের মধ্যে এমন নতুন ড্রেস পরে বউ হয়ে বসে আছিস কেনো? কোথাও যাচ্ছিস?’
গল্প ইতস্তত করে উড়নায় আঙুল পেঁচাতে পেঁচাতে বলল,
‘আসলে উনি আসবে; বলছে একটু শপিংয়ে যাবে তাই।’
তুশি ভ্রু নাচিয়ে বলল,
‘তর এই উনি টা কে?’
‘শুভ্র।’
তুশির চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেলো। মুহূর্তেই দ্বিগুণ খুশি নিয়ে বলল,
‘শুভ্র ভাই আসছে! তোকে নিয়ে ঘুরতে যাবে? আর তুই এমন জমিলা সেজে তার সাথে ঘুরতে যাবি? সিরিয়াসলি!’
গল্প আশ্চর্য হয়ে গেলো,
‘আমি জমিলা সেজে আছি? তর তাই মনে হয়?’
‘তা নয়তো কি? এটা তোদের ফাস্ট ডেট। কই একটা শাড়ি পড়বি; একটু ভালো করে সাজবি; তা না এমন সাদামাটা ভাবে যাচ্ছিস মনে হচ্ছে; মুদির দোকানে যাচ্ছিস নুডলস এর প্যাকেট নিতে!’
গল্প চুপ করে শুনে গেলো শুধু। তুশি আলমারি খুলতে খুলতে বলল,
‘তোকে এখন সুন্দর দেখে একটা শাড়ি পড়াবো জানু; তারপর একটু সাজাবো; দেন তুই বের হবি।’
গল্প এতোক্ষণ চুপ থাকলেও এবার উঠে এসে তুশিকে কাপড় ঘাটাঘাটি থেকে থামিয়ে বলল,
‘একদম না তুশি। আজ আমি শাড়ি পড়তে পারবো না বেইব। আমার এমনেতেই লজ্জা লাগছে উনার সাথে বের হতে। প্লিজ বুঝ একটু!’
তুশি গল্পর কথা বুঝলো কিছুটা। তবে তাকে শাড়ি না পড়ালেও সুন্দর করে একটু সাজিয়ে দিলো। সাজানোর পর গল্পর মুখটা উপরের দিকে তুলে মজার স্বরে বললো,
‘উফফ…বেইব তোকে যা লাগছে না! শুভ্র ভাই তো আজ নির্ঘাত হার্টফেল করবে তোকে দেখে! আমি ছেলে হলে তোকে নির্ঘাত ভুলিয়ে ভালিয়ে বিয়ে করে ফেলতাম। ওসব শুভ্র-টুভ্র কে কোনো চান্সই দিতাম না!’
বলেই চোখ টিপল তুশি। গল্প মিছেমিছি রাগ দেখিয়ে তুশির বাহুতে থাপ্পড় দিলো। তাদের হাসি-ঠাট্টার মধ্যেই শুভ্রর কল এলে গল্প দ্রুত পায়ে নিচে নামে।
শুভ্র গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। পড়নে কালো শার্ট আর কালো জিন্স হাতে একটা স্টাইলিশ ঘড়ি যা তাকে দুর্দান্ত স্টানিং একটা লুক দিচ্ছে। গল্প গেটের ফাঁকফোকড় দিয়ে তাই দেখছিল। মনে মনে বলল— বাহ্ আমার বর টা তো দারুণ কিউট!
গল্প এগিয়ে আসতেই শুভ্র তাকাল তার দিকে; ওমনি তার দৃষ্টি স্থির হলো। একটা অলিভ-গ্রীন এর সেলোয়ার স্যুট এক হাতে সবুজ কাচের চুড়ি; চোখে কাজল। শুভ্রর মন হুট করেই বলে উঠে— একেই বুঝি মায়াবতীর সংজ্ঞা বলে!
দুজনেই মনে মনে একে-অপরকে সংজ্ঞায়িত করলো কিন্তু কেউই শুনলো না কিছু। শুভ্রর ধ্যান ভাঙে গল্প চুড়ির টুংটাং আওয়াজে। নিজেকে সামলে নিয়ে গাড়িতে উঠলো।
শুভ্রদের গাড়ি টা এসে থামলো বিশাল একটা শপিং কমপ্লেক্সের সামনে। গাড়ি পার্কিং লটে রেখে তারা ভিতরে গেলো। উপরে উঠতে এস্কেলেটরে পা দিতেই হুট করেই গল্পর পা স্লিপ কাটে; ব্যাপার টা বুঝে উঠার আগেই চোখ খিঁচে সে শুভ্রর বাহুর কাছে শার্ট টা কামচে ধরলো। শুভ্রও তড়াক করে গল্পকে আগলে নিলো। এতো দ্রুত হলো সবকিছু যে দুজনের কেউই কিছু বুঝে উঠতে পারলো না। খানিক বাদেই গল্পর হুঁশ আসে শুভ্রর গলার আওয়াজে,
‘আপনি ঠিক আছেন? ব্যাথা পেয়েছেন কোথাও?’
গল্প ততক্ষণে একটু স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়াল। কি হয়েছে বুঝতে পেরে তাকে অস্বস্তি ঘিরে ধরলো; তারউপর নিজেকে শুভ্রর এতোটা কাছাকাছি দেখে লজ্জাও পেলো। ধরা গলায় বলল,
‘বুঝতে পারিনি; হুট করেই পা টা স্লিপ করে গেলো।’
বলেই শুভ্রর বাহুতে রাখা তার হাতটা সরিয়ে নিলো। কিন্তু শুভ্র খুব যত্নে তার বাম হাত টা নিজের মুঠোয় পুরে নিলো। নিরেট গলার বলল,
‘আবারও যাতে হুটহাট স্লিপ না কাটে সেজন্য সেফটি হিসেবে আমার হাতটা আপাতত ধরে রাখুন! ’
#চলবে…
#লাভ_আফটার_ম্যারেজ
#আনাহিতা_তুলি
#পর্ব_৮
শপিং শেষে গল্প আর শুভ্র পার্কিং লটের দিকে এগুলো। কেনাকাটা যা করার বেশিরভাগ শুভ্র নিজেই করেছে। গল্পর জন্য তিনটে শাড়ি বেশ কিছু কুর্তি আর যেটা সবচেয়ে স্পেশাল তা হলো গল্পর জন্য কিনা একটা স্বর্নে মোড়ানো ব্রেসলেট। গল্প বারবার করে না নিষেধ করে এতোকিছু না কিনতে; কিন্তু শুভ্র মানতে নারাজ। গল্প স্বীকার করতে বাধ্য যে শুভ্রর পছন্দ মারাত্মক। শাড়ি গুলোর মধ্যে একটা শাড়ি শুধু সে পছন্দ করেছে; আর নিতে চাইনি বলে বাকি গুলো শুভ্র পছন্দ করে। শুভ্র এক ফাকে গল্পর কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলে,—‘আপনি তো দেখছি বড্ড হিসেবি মিসেস আহম্মেদ। এখন থেকেই বরের পকেট বাছানো শুরু করে দিয়েছেন।’
শুভ্রর এই কথার পর সে আর কিছুই বলেনি। লোকটা কি তাকে কিপ্টে ভাবছে নাকি? সে মোটেও কিপ্টে না; যখন এতো ইচ্ছে শপিং করার তবে করুক সেও আর মানা করবে না।
শুভ্ররা গাড়ির কাছে আসতেই সাইড থেকেই একটা মেয়েলি গলার আওয়াজ আসে।
‘শুভ্র স্যার!’
শুভ্র আর গল্প দুজনেই দাঁড়ায়। বামদিকে তাকাতেই দেখে একটা মেয়ে ত্রস্ত পায়ে তাদের দিকেই ছুটে আসছে। মেয়েটার পড়নে জিন্স আর একটা লেডিস শার্ট। এসেই শুভ্রকে ভীষণ বিনয়ের সঙ্গে সালাম দিলো। গদগদ গলায় বলল,
‘স্যার ইট’স এ্যা সারপ্রাইজ ফর মি! আপনার সাথে শপিংমলে দেখা হয়ে যাবে ইমাজিন-ই করিনি।’
গল্প তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সবটা দেখছে। মেয়েটাকে তার একটুও ভালো লাগছে না; মনে হচ্ছে কথা বলার তালে তালে সে শুভ্রর গায়ে ঢলে পড়বে। আর মেয়েটি শুভ্রকে স্যার ই বা ডাকছে কেনো গল্পর বুঝে এলো না। মেয়েটি আবারও বলে উঠলো,
‘স্যার ওইদিন আপনি আমাকে যে টপিক টা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন; সেটা এখন আমার কাছে অনেক ইজি হয়ে গেছে। থ্যাঙ্ক ইউ স্যার এতো ভালো করে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য। ’
শুভ্র জোরপূর্বক হেসে ম্যানুয়ালি বলল,
‘এ্যাজ এ্যা টিচার হিসেবে এটা আমার দায়িত্ব নিহা।’
গল্প যারপরনাই অবাক হলো এটা বুঝতে পেরে যে শুভ্র টিচিং প্রফেশনে আছে! এই তথ্য টা আর অবগত ছিল না। নিহা হুট করেই শুভ্রর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গল্পকে দেখে অপ্রস্তুত হয়। দ্বিধান্বিত হেসে গল্পকে উদ্দেশ্য করে বলে,
‘স্যার উনি আপনার বোন? মাশাআল্লাহ কি কিউট!’
শুভ্র রীতিমতো বিষম খায় এটা শুনে। গল্পর চোখ গুলো কয়েক সেকেন্ডের জন্য বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়। সে শুভ্রর বোন? কি বলে এই মেয়ে! বউ থেকে সোজা বোন বানিয়ে দিল! তার সাথে কি শুভ্রর চেহার মিল আছে যে; তাদের দেখে ভাইবোন ফিল হবে? সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ঢঙ্গি মেয়েটিকে গল্পর ভয়াবহ কিছু গালি দিতে ইচ্ছে হলো। তার আগেই শুভ্র গলা ঝেড়ে তার কাঁধে হাত রাখল। এই প্রথম কোনো পুরুষালি হাত তার শরীরে অনেকটা অধিকার বোধ নিয়ে ছুলো। কাঁধে রাখা শুভ্রর হাতের দিকে তাকাতেই গল্প ভিতর থেকে একটু কেঁপে উঠলো। কানে আসলো শুভ্রর ভরাট গম্ভীর স্বর,
‘নো। মিট মাই ওয়াইফ মিসেস শেহজাদ আহমেদ।’
গল্প শরীর মন এক অদ্ভুত শীতলতায় জুড়িয়ে গেলো। তবে সামনে থাকা নিহার দিকে তাকাতেই দেখে মেয়েটার হাস্যজ্জোল মুখটি ইতিমধ্যে অমবর্ষার ন্যায় কালো হয়ে গেছে। ফ্যালফ্যাল করে সে শুভ্র আর তার দিকে তাকিয়ে আছে। অবিশ্বাস্য কন্ঠে বলল,
‘ওয়াইফ? স্যার আপনি ম্যারিড? না মানে কখনো বলেননি তো তাই!’
শুভ্র বিরক্ত হলো। সে কি তার পার্সোনাল লাইফ নিয়ে ক্লাসে স্টুডেন্ট দের সাথে ডিসকাস করবে নাকি? রিডিকিউলাস! তবে তা প্রকাশ না করেই বলল,
‘ইয়েস আ’ম ম্যারিড, এন্ড শী ইজ মাই ওয়াইফ। আর অবশ্যই আমি ক্লাসে আমার পার্সোনাল লাইফ নিয়ে কথা বলতে যাই না; যে বলব আমি ম্যারিড!’
নিহার চোখ দুটো টলমল করছে। পানি চলে আসতে পারে যেকোনো সময়। শুভ্র গল্পর হাত ধরে তার থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায়। শুভ্রর ধরে রাখা গল্পর হাতের দিকে তাকিয়ে নিহার মন বিষাদে ছেয়ে যায়। চোখ গুলো নিদারুণ ঝাপসা হয়ে যায়!!
শুভ্র গম্ভীর মুখে গাড়ি স্টার্ট করতেই গল্প কিছু একটা ভেবে বলে,
‘আপনি টিচিং প্রফেশনেও আছেন?’
শুভ্র অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
‘কেনো আপনি জানতেন না? আমি একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে গেস্ট টিচার হিসেবে সপ্তাহে একদিন ক্লাস নেই।’
‘মেয়েটি বুঝি আপনার ভার্সিটির স্টুডেন্ট!’
‘হ্যাঁ।’
গল্প কিছু একটা ভেবে বলে,
‘অ্যাই থিঙ্ক শী লাইকস ইউ।’
শুভ্র যেনো হুঁচোট খায়। বিস্মিত গলায় বলল,
‘হোয়াট? কি সব বলছেন?’
গল্প উৎসুক হয়ে বলল,
‘আপনি বোধহয় খেয়াল করেননি; আপনি যখন বললেন আমি আপনার ওয়াইফ। তখন তার মুখ অন্ধকার হয়ে গেছিল, চোখ গুলোও কেমন জানি টলটল করছিল।’
শুভ্র বিরক্তির শ্বাস ফেলে বলল,
‘এমন কিছুই না তাহিয়াত। আর হলেও আমার কিছু যায় আসে না। জাস্ট ইগনোর ইট!’
কথাগুলো বলেই শুভ্র ড্রাইভিং- এ মনোযোগী হলো। গল্প একটু অবাক হলো শুভ্রর রিয়াকশনে। এটা কোনো কথা একটা মেয়ে তাকে উদ্দেশ্য করে কষ্ট পাচ্ছে আর তিনি কিনা বলছেন— জাস্ট ইগনোর ইট!’ গল্প মনে মনে বলল, হাউ রুড শুভ্র! সে আবার দরদী মানুষ কিনা অন্যের দুঃখ তার খুব একটা সহ্য হয় না। শুভ্রকে তো আর পাঠাতে পারবে না। তাই মনে মনে মেয়েটির জন্য সমবেদনা পাঠালো।
_____________
শুভ্রদের গাড়ি টা এসে থামলো আভিজাত্যপূর্ন এক রেস্টুরেন্টের সামনে। গাড়ি থেকে নেমে শুভ্র ভীষণ খেয়ালে গল্পর হাতটা ধরে ভিতরের দিকে আগায়। গল্পর চোখ শুভ্রর ধরে রাখা হাতের দিকেই তাক করা। লোকটা আজ একটু পরপরই তার হাত ধরছে কোনো রকম বনিতা ছাড়াই। গল্প ভাবে তারা কি ধীরে ধীরে একে-অপরের জন্য সহজ হচ্ছে? এটাই তো হওয়া উচিত। দুজনের মধ্যে একজনকে তো প্রথমে সহজ হতেই হবে।
শুভ্র গল্পকে নিয়ে ভিতরে যেতেই তিন-চার জন ছুটে আসলো। একজন মেয়ে আর তিন জন ছেলে; মেয়েটির হাতে আবার একটি ফ্লাওয়ার বুকে। গল্প কিছুই বুঝতে পারছে না এরা আদতে কারা। তবে শুভ্র তাকে পরিচয় করিয়ে দিলো তার বন্ধুদের সাথে। শুভ্রর ফ্রেন্ড বুঝতে পেরে গল্প ধীর গলায় সালাম দিল। গল্পের সালামে জবাবে মেয়েটি আস্তে করে জবাব দিলেও বাকিরা এক সমন্বয়ে বলে উঠলো,
‘অলাইকুম…আসসালাম…. ভাবি।’
গল্প দারুণ ভরকালো একসঙ্গে সবার এমন রিয়াকশন দেখে। লজ্জাও পেলো বেশ; নিজেকে একটু গুটিয়ে নিলো শুভ্রর দিকে। শুভ্র গল্পকে লক্ষ্য করে আরাফ দের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল। গম্ভীর গলায় বলল,
‘তরা জিন্দেগীতেও শুধরাবি না ফাজিলের দল।’
ফাহিম প্রতিবাদ করে বলে উঠে,
‘এটা কিন্তু ঠিক না শুভ্র। তুই নতুন ভাবির সামনে আমাদের ফাজিল বলে অপমান করতে পারিস না! ভাবির সামনে আমাদের ইমেজ নষ্ট করবি না বলে দিলাম।’
শুভ্র তীক্ষ্ণ চোখে তার বন্ধুদের দেখে গেলো। আর এদিকে গল্প লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছে; শুভ্রর বন্ধু গুলো তাকে কথায় কথায় ভাবি ডাকছে; যা তাকে বেশ লজ্জা দিচ্ছে। তবে তাদের মধ্যে থেকে কেয়া আরাফের বাহুতে খিল বসিয়ে বলল,
‘থামবি তরা! মেয়েটা সবে আমাদের সাথে পরিচিত হলো। আর তরা কিনা তাকে অস্বস্তিতে ফেলছিস! সর তো এবার..’
কথাগুলো বলেই কেয়া গল্পর পাশে এসে দাঁড়ালো। গল্পর নুইয়ে রাখা মুখটা আদর করে উপরে তুলে শুভ্রকে বলল,
‘এটা তর বউ শুভ্র? কি কিউট রে একদম বাচ্চা বাচ্চা। এখন বুঝলাম শুভ্র এক দেখাতেই কেনো সোজা বিয়ের জন্য রাজি হয়ে গেলো!’
গল্প অপ্রস্তুত হাসল। তবে কেয়া নিজের পরিচয় দিয়ে আবারও বলল,
‘আমি কেয়া শুভ্রর ফ্রেন্ড। এখানে যারা আছে সবাই আমরা ফ্রেন্ড একদম স্কুল লাইফ থেকে ইউনিভার্সিটি লাইফ।’
গল্প ভীষণ অবাক হলো ওদের এতোদিনের ফ্রেন্ডশিপ শুনে। এটা আজকাল অনেক রেয়ার একটা বিষয়। তবে শুভ্রর আরেক বন্ধু ফাহিম আগ বাড়িয়ে বলে,
‘শুধুই যে বন্ধু তা কিন্তু নয়! এখন আবার বিজনেস পার্টনার।’
‘এ্যাই তরা কি আজ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই সব কথা সারবি; নাকি ওদেরকে বসতেও দিবি! এ্যাই শুভ্র ভাবিকে নিয়ে এদিকে আয়, বস।’
সাব্বিরের কথায় সবার টনক নড়ল। ব্যতিব্যস্ত হয়ে সবাই ওদেরকে জায়গা করে দিল। ওয়েটার এসে নানান পদের খাবার টেবিলে সাজিয়ে দিয়ে গেলো। গল্প প্রথমে ইতস্তত করলেও পরে কেয়ার বন্ধু সুলভ আচারনে দ্রুতই সহজ হয়ে যায়। মেয়েটা কে এতো মিশুকে আর প্রাণবন্ত লাগলো গল্পর; যে সে সহজেই কেয়ার সাথে মিশে যায়। অবশ্য শুভ্রর সবকটা ফ্রেন্ডই দারুণ মিশুকে এটুকু সময়ে গল্প তা বুঝে যায়। আরাফ কেয়ার হাজব্যান্ড এটা শুনে গল্প দারুণ পুলকিত হয়। তাদের জুটিটা গল্পর ভারী মিষ্টি লেগেছে কিছু সময়েই। কথায় কথায় কেয়া বলল,
‘জানো গল্প, আমার এক কাজিন ছিলো। সে একপ্রকার শুভ্রর দিওয়ানা ছিল। ছয় ছয়টা মাস ধরে বেচারি শুভ্রকে পটানোর কি চেষ্টা টাই না করেছে! কিন্তু যতবারই প্রপোজ করেছে ততবারই শুভ্র তাকে রিজেক্ট করেছে। আর ম্যালিসার তা নিয়ে কি কান্না!’
গল্প বেশ শকড কেউ তার বরকে এতোবার এতো সময় প্রপোজ করার পরেও কিনা তার মন গলল না! তবে পরক্ষণেই কিছু একটা ভেবে তার মন টা খুশি খুশি হয়ে উঠে। এদিকে কেয়ার কথা শেষ হতেই আরাফ আপসোস নিয়ে বলে উঠে,
‘আহারে! ম্যালিসা যদি শুভ্রর জায়গায় আমাকে লাইন মারত তাহলে নির্ঘাত আমি পটে যেতাম ভাই।’
কথাটা শেষ হতেই কেয়া চোখ গরম করে আরাফের দিকে তাকায়। বউয়ের এমব চাহনি দেখে আরাফ ঘাবড়ে যায়। কেয়া দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
‘তাই? তোমার তো দেখি তা নিয়ে আফসোসের শেষ নেই! আমাকে আগেই বলতে পারতে আমি ম্যালিসাকে বলতাম!’
বাকিরা সবাই মিটিমিটি হাসছে। আরাফ বোকা বোকা হেসে বলল,
‘আরে না, আমি তো জাস্ট কথার কথা বলেছি কেয়া জান। হে হে…।’
কেয়া টেবিলের নিচে আরাফের পায়ে তার হিল দিয়ে চেপে বলে উঠলো,
‘বাকি হিসেব বাসায় হবে জনাব।’
আরাফ কেয়ার হিলের চাপে ব্যাথায় চোখ খিঁচে নিলো। ফাহিম আর সাব্বির কেয়াকে আরেকটু ঘাঁটিয়ে বলল,
‘ওর একদম ভালো ক্লাস নিবি কেয়া। আমরাও দেখেছি ও কিন্তু তর কাজিনের সাথ ভাব জমানোর বেশ ট্রাই করত।’
কেয়ার রাগ বাড়লো। আরাফ বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
‘অ্যাই সোয়্যাইর তদের মতো বন্ধু থাকলে শত্রুর প্রয়োজন নেই। এখন বাজে কথা বন্ধ কর। ও কেয়ার কাজিন ছিলো বলেই ওকে ভালোভাবে ট্রিট করতাম। কেয়া জান, তুমি ওদের কথা একদম শুনো না। ওদের তো আর বউ নেই তাই আমাকে আর তোমাকে দেখে এখন জ্বলছে।’
গল্প অনেক কষ্টে নিজের হাসি চেপে রেখেছিল। কিন্তু আরাফের বলা শেষ কথাটায় হেসে ফেলে।
খাওয়া-দাওয়া হাসি- মজা আর আড্ডার পর সবাই যে যার গন্তব্যর দিকে বের হলো। হুট করেই গল্প খেয়াল করলো শুভ্রর গাড়ি টা পার্কিং লটে নেই। তাই জিজ্ঞেস করলো,
‘আপনার গাড়ি কোথায় শুভ্র? এখানেই তো ছিলো?’
‘গাড়িটা ড্রাইভার কাকাকে বলে এখান থেকে সরিয়ে
দিয়েছি।’
গল্প হতবাক হয়ে বলল,
‘তাহলে আমরা কীভাবে যাবো? এখন তো অনেকটা রাতও হয়ে গেছে!’
শুভ্র আলগোছে গল্পর হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললো,
‘চলুন হাঁটি তবে। দেখি রাস্তা কতদূর।’
শুভ্র আর গল্প রাস্তার ফুটপাত ধরে হাঁটছে। দুজনেই চুপচাপ। কেউই কোনো কথা খুঁজে পেলো না। হঠাৎই সামনে একটা ফুলের দোকান দেখে শুভ্র গল্পকে নিয়ে সেদিকে এগুলো। গল্প বেশ অবাক। এতো রাতে ফুলের দোকানে আসার মানে কি? শুভ্র কি এখন ফুল কিনবে নাকি? কিন্তু কার জন্য? তার চিন্তা ভাবনার মধ্যেই শুভ্র এক গোছা রজনীগন্ধা কিনে গল্পর হাতে ধরিয়ে দিলো। ভীষণ আশ্লেষে বলল,
‘এই নিশিতে আমার নিশিগন্ধার জন্য প্রকৃতির প্রদত্ত কিছু নিশিগন্ধা বরাদ্দ করা হলো।’
গল্প মুগ্ধ হলো। মিষ্টি হেসে বললো,
‘ধন্যবাদ এতো সুন্দর উপমার জন্য।’
ফুল দোকানিকে টাকা দিয়ে গল্পরা বেরিয়ে এলো। কিছুদূর হাঁটার পর শুভ্র একটা রিক্সা নিলো। শুভ্র গল্পর হাত ধরে রিক্সায় উঠতে হেল্প করলো। রাত তখন খুব বেশি না আবার কমও না। তবে আজ যেনো শহরটা অন্যদিনের তুলনায় একটু ছিমছাম গোছের লাগছে গল্পর কাছে। কেনো লাগছে সে তা নিজেও জানে না। পাশেই বসে আছে শুভ্র; একদম গা ঘেঁষে বসে। রিক্সায় দুজন বসলে এমনই গা লেগে থাকে একজনর সাথে আরেকজনের। গল্প এই প্রথম কোনো পুরুষের সাথে রিক্সায় উঠেছে যে তার বর। তার চিন্তা ভাবনার মধ্যেই টের পেলো তার হাত টা অন্য কারও মুঠোবন্দি। পাশে চেয়ে দেখে শুভ্র নিজের হাতের মুঠোয় তার হাতটা ধরে বসে আছে আপন মনে। পরপরই শুভ্রর গলার আওয়াজ এলো,
‘তাহিয়াত, আপনি জানেন আমি কেনো গাড়ি টা পার্কিং লট থেকে সরিয়ে দিয়েছি?’
গল্প মাথা নাড়িয়ে না বুঝালো। শুভ্র মুচকি হেসে বললো,
‘কারন আমার আপনার সাথে রাতের এই ঢাকা শহরের হলদেটে নিয়ন আলোয় রিক্সায় চড়ার ভীষণ ইচ্ছে হচ্ছিল। আমি আবার মনের ইচ্ছেকে খুব প্রায়োরিটি দেই। তাছাড়া গাড়িতে ছড়লে তো রাস্তা টা দ্রুতই শেষ হয়ে যেতো।’
শুভ্রর এমন অকপটে স্বীকারোক্তিতে গল্প মাথা নামিয়ে নিলো। তার কাছেও রিক্সায় ছড়তে বেশ লাগে কিন্তু আজ বিষয়টা বা পরিস্থিতি একদম অন্য রকম। হুড তোলা রিক্সায় শুভ্রর হাতে হাত আর তার দেওয়া রজনীগন্ধার সুবাস যেনো তার মন আলোড়িত করে তুলছে। মনটা থেকে থেকেই বলে উঠছে— এই চমৎকার পুরুষটি তর বর গল্প বিষয়টি আসলেই চমৎকার।
হুট করেই তার কাছে চারপাশের সবকিছু ফুলেল লাগতে শুরু করলো। নিশিগন্ধার মিষ্টি সুবাসে চারপাশটা মাতোয়ারা ঠেকল!!
#চলবে
