#লাভ_আফটার_ম্যারেজ
#আনাহিতা_তুলি
#পর্ব_১৫
‘তাহিয়াত রেডি হয়েছো? গাড়ি এসে পড়েছে তো।’
শুভ্রদের অফিসিয়াল কাজ গতকাল শেষ হয়েছে। তারা সবাই প্ল্যান করেছে আজ সারাদিন তারা শ্রীমঙ্গলের সৌন্দর্য উপভোগ করবে। কেয়া সাফ সাফ বলে দিয়েছে তারা পুরো এডভেঞ্চার এর ফিল নিতে চান্দের গাড়ি করে ঘুরাঘুরি করবে। কেয়ার কথায় সবচেয়ে বেশি উৎসাহ দেখিয়েছে গল্প। সেও চান্দের গাড়ি করে ট্রাভেল করতে চায়। তাই সবশেষে ঠিক হলো তারা চান্দের গাড়ি দিয়েই ঘুরতে বেরোবে।
শুভ্ররা প্রথমে গেলো লাউয়াছড়া চা বাগানে। শ্রীমঙ্গলের রাস্তা এতো সুন্দর চারপাশে শুধু সবুজ আর সবুজ গল্প পুরোটা সময় সেসব মুগ্ধ চোখে চেয়ে দেখেছে। আর এখন লাউয়াছড়া চা বাগানে এসে সে তার সৌন্দর্যে বিমূঢ় হয়ে রইলো খানিক সময়। এতো সুন্দর চারদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ আর তার উপরে নীল আকাশ। বাতাস যখন চা বাগানের উপর দিয়ে ছুটাছুটি করে তখন মনে হয় প্রকৃতি যেন তার রূপ দেখাতে মেতে উঠেছে –এ যেনো সবুজের সমুদ্র।
চা বাগান গুলো ছোট ছোট টিলার উপর। গল্প কখনো ট্র্যকিং করেনি এটা শুভ্র জানে; আর তাই তো গল্পর হাতটা সে গাড়ি থেকে নামা অব্ধি একবারও ছাড়েনি নিজের মুঠো থেকে। এতো সাবধানতার পরও গল্প দু-তিনবার হুঁচোট খেলেও বটে। যদিও শুভ্র তাকে আগলে নিয়েছে প্রতিবার। চতুর্থ বারের সময় যখন শাড়ির কুঁচিতে বেজে আবারও হুঁচোট খেলো শুভ্র তখন বিরক্ত হয়ে বলল,
‘তাহিয়াত তোমাকে ঘুরতে আসার সময় শাড়ি পড়ার বুদ্ধি টা কে দিয়েছিল? ট্র্যকিং এ তুমি এমনেতেই অভ্যস্ত না তারউপর শাড়ি কেনো পড়তে গেলে?’
গল্প চুপচাপ থাকে কোনো উত্তর দিলো না। শাড়িটা সে আজ শখের বসে পড়েই ঘুরতে এসেছে। তাছাড়া শাড়ি পড়ে চা বাগানে ছবি তুলা তার কতদিনের স্বপ্ন! তাই আজ আসার সময় শাড়ি পড়ে আসলো। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে শাড়ি পড়ে না আসলেই বোধহয় ভালো করতো; এটা সামলাতে সামলাতেই তার জান আয়-ঢায় করছে। এরমধ্যেই কেয়া এসে খপাৎ করে শুভ্রর থেকে গল্পর হাতটা নিয়ে বলল,
‘কি সারাক্ষণ বউয়ের হাত ধরে রাখিস ভাই? তর বউ কি ছোট বাচ্চা যে ছেড়ে দিলে হারিয়ে যাবে!’
শুভ্র চোখ ছোট ছোট করে বলল,
‘কোনো অংশে কমও না। জিজ্ঞেস কর এই নিয়ে কতোবার হুঁচোট খেয়েছে।’
কেয়া ওসব পাত্তা দিলো না। বলল,
‘সে যাইহোক এখন ছাড়। আর গল্প তুমি আমার সাথে আসো ওদিকটায় যাই, অনেক সুন্দর ভিউ।’
কথাটা বলেই কেয়া গল্পকে সঙ্গে করে হাত ধরে নিয়ে গেলো। পিছন থেকে শুভ্রর গলার আওয়াজ এলো,
‘বি কেয়ারফুল তাহিয়াত, আবারও হুঁচোট খেয়ো না।’
গল্প আর কেয়া দুজনের কেউই ওসব শুনেও না শুনার ভান করে চলে যায়।
কেয়া গল্পর অনেকগুলো ছবি তুলে দেয়। গল্প এখানে এসে মুক্ত পাখির মতো উড়ছে। শুভ্র আবার ওকে চোখে চোখেই রাখছে; কখন না আবারও হুঁচোট খেয়ে ফেলে এই ভয়ে। শুভ্রর হুট করেই একটা ফোন আসে ও রিসিভ করে একটু দু-কদম সামনে গেলো। গল্প টিলার কিনারায় একটা বড়ো গাছের কাছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কেয়া আর আরাফের কাপল পিক এর পোজ দেখছে। কেয়া রাগী রাগী মুখ করে একটু পরপরই আরাফের দিকে তাকিয়ে বলছে –ঠিক হয়ে দাঁড়িয়ে পোজ দিতে। কিন্তু আরাফ বেচারা প্রতিবারই ভুল করছে আর কেয়া রাগে গজগজ করছে। আরাফ তখন আবারও কেয়ার কথামতো পোজ দেওয়ার ট্রাই করছে। আর ওদের ছবি ক্লিক করতে করতে ফাহিম বেচারা হয়রান –একটা ছবি তুলতে এতো ঢঙ করে কেনো পোজ দিতে হবে? সবকটা পাগল! গল্প দূর থেকে তা দেখে হেসে কুটিকুটি হচ্ছে।
গল্প এবার সামনে পা বাড়াতে চাইলে বেখেয়ালিতে নিচে গড়িয়ে পড়া শাড়ির আঁচলে পা বেজে হুমড়ি খেয়ে পড়লো। পড়লো তো পড়লো তাও আবার নিচের ঢালু জায়গাটাতে যদিও সে গাছের শিকড় টা শক্ত করে ধরে রেখেছে তাতেও মনে হচ্ছে নিজেকে সামলানো যাচ্ছে না। ওদিকে শুভ্র গল্পর মৃদু চিৎকার শুনে তড়িৎ পিছনে তাকাতেই দেখে গল্পর বেহাল অবস্থা। শুভ্রর রুহ কেঁপে উঠলো। ফোন ফেলে দৌড়ে আসে গল্পর কাছে।
গল্পর চিৎকার শুনে কেয়ারাও দৌড়ে আসে। শুভ্র ততক্ষণে গল্পকে তুলতে সক্ষম। গল্প একদিকে ভয়ে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভয়টা হচ্ছে মূলত শুভ্রকে। তার চিন্তা ভাবনার মধ্যেই কানে বাজলো শুভ্রর গমগমে আওয়াজ,
‘ইউ আর জাস্ট আনবিলিভ্যাল তাহিয়াত। মানুষ এতোটা কেয়ারলেস কিকরে হতে পারে? আমি শুধু দু’মিনিটের জন্য চোখ সরালাম আর তুমি দু সেকেন্ডই এদিকে অঘটন ঘটালে! নাউ অ্যাই আন্ডারস্ট্যান্ড –আঙ্কেল আন্টি কেনো তোমাকে ট্যুরের জন্য এ্যলাও করতো না।’
গল্প একপ্রকার সিটিয়ে রইলো। কেয়া শুভ্রকে থামাতে বলল,
‘হয়েছে হয়েছে এবার থাম শুভ্র। মেয়ে টা এমনেতেই ভয় পেয়েছে। ওটা তো একটা এক্সিডেন্ট ছিলো।’
শুভ্র থামলো না। বলল,
‘তুই আমাকে থামতে বলছিস! ওকে আমি বারবার সাবধান করেছি তারপরও এতোটা কেয়ারলেস! এখনই কি হতে পারতো ভাবতে পারছিস?’
শুভ্র আরও কিছু বলত কিন্তু গল্পর ওমন ভিতু ভিতু মুখ দেখে কিছু বলতেও পারলো না। তবে তার হাতটা শক্ত করে নিজের মুঠোয় নিয়ে বললো,
‘এখান থেকে রিসোর্টে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ভুলেও হাত ছাড়ানোর ট্রাই করলে –সোজা ঢাকা ব্যাক করবো।’
গল্প চুপ করে থাকলো। আজ সে আসলেই একটু বেশি খামখেয়ালি পনা করেছে। শুভ্র তখনই রিসোর্টে যেতে চাইলে বাকিরা সবাই বাঁধ সাজে। কারন তারা এখন ভানু রোডে সেভেন লেয়ারের চা টেস্ট করতে যাবে। শ্রীমঙ্গল আসবে অথচ এই চা টেস্ট করবে না, এমনটা হয় নাকি? গল্পও শুভ্রর দিকে অনুনয় চোখে চাইলো। শুভ্র ওতেই গলল।
ভানু রোডে সবাই সেভেন লেয়ারের চা খেয়ে গাড়িতে উঠলো। সবাই এক কাপ করে খেলেও গল্প তার ডাবল খেয়েছে। তার ভাষ্যমতে এতো টেস্টি চা ও এটা সারাদিন খেলেও বিরক্ত হবে না। আরও কিছু জায়গায় ঘুরাঘুরি করে সন্ধ্যা সন্ধ্যায় সবাই রিসোর্টের পথে রওনা দিলো। শুভ্র তার কথা রেখেছে একবারের জন্যও গল্পর হাতটা তখন থেকে ছাড়েনি। গল্প এটা নিয়ে বিরক্ত হলেও ভয়ে কিছু বলতে পারেনি, কেননা দোষ টা তার-ই ছিলো।
______________________________
আজ সারাদিন ঘুরাঘুরির পর আরাফ রা ঠিক করেছে রাতে তারা রিসোর্টের লেকের পাশে বসে বারবিকিউ পার্টি করবে। ঘোষণা অনুযায়ী তাই হলো। আরাফ আবার রান্না-বান্নায় খুব পারদর্শী। বলতে গেলে রান্না টা তার ভীষণ শখের একটা বিষয়। তাই পার্টির মূল শেফ সে-ই হলো। কেয়া আর গল্পকে কিছুই করতে হয়নি কারন সমস্ত কাজ ছেলেরাই করেছে।
খাওয়া-দাওয়ার পার্ট শেষ হবার পর ফাহিম গান ধরলো। তার গানের গলা আবার মারাত্মক সুন্দর। গল্প খুব এনজয় করছে সবকিছু। কিন্তু সারাদিনের ক্লান্তি তখন তাকে ঝেকে ধরেছিল। শুভ্র খেয়াল করে বলল,
‘বেশি টায়ার্ড লাগছে? রুমে যাবে?’
গল্পর টায়ার্ড লাগলেও এই মুহূর্তে সে এই মজার আড্ডার আসর ছেড়ে কোথাও যেতে চাচ্ছে না। মাথা নাড়িয়ে না বুঝালো। শুভ্র বুঝল– বলল,
‘তুমি চাইলে আমার কাঁধে মাথা হেলিয়ে শুনতে পারো!’
গল্পর কি হলো কে জানে! শুভ্র বলতেই সমস্ত সংকোচতা দূরে টেলে নিজের মাথাটা শুভ্রর কাঁধে হেলিয়ে দিল। শুভ্রর ঠোঁটের কোনে হাসিটা আপনা-আপনি এসে গেলো। আড্ডা চলতে লাগলো সেই পুরনো রেশ ধরেই।
ঘন্টাখানেক পর আড্ডার আসর তখন শেষ। গল্প আড্ডায় মশগুল হতে হতে কখন যে ঘুমে তলিয়ে গেল বুঝা গেলো না। আরাফ আর কেয়াও রুমে চলে গেছে। ফাহিম যাওয়ার আগে টিপ্পনী কেটে বলল,
‘ভাই, বউয়ের সাথে কি এখানেই ঘুমানোর প্ল্যান? প্রচুর মশা কিন্তু এখানে, তরা থাকতে চাইলে ওরা তাদের খাতিরে যত্নের কোনো খামতি রাখবে না? তবে রোমান্সে একটু-আধটু ডিস্টার্ব করবে আরকি!’
শুভ্র চোখ গরম করে চাইল ফাহিমের দিকে; কিন্তু কিছু বলার আগেই ফাহিম এখান থেকে পগারপার। তবে যাওয়ার আগে থাম্বস আপ দেখিয়ে বলল –অল দ্যা বেস্ট। ফাহিম যেতেই শুভ্র চাইল গল্পর ঘুমন্ত মুখের দিকে। ইশশ এই গুলোমুলো মুখটার দিকে যখনই সে থাকায় তার হার্ট ম্যাল্ট হয়ে যায় তখন। শুভ্রর মোটেই ইচ্ছে হলো না ডাক দিয়ে গল্পর ওমন আদুরে ঘুম ভাঙাতে। তাই খুব সন্তপর্ণে গল্পকে পাঁজা কোলে তুলে নিলো। এই প্রথম গল্পর এতো কাছাকাছি আসায় অদ্ভুত ভাবে তার হার্ট বিট মারাত্মক ফাস্ট হচ্ছে। হার্টের এমন ধুপধাপ আওয়াজে মনে হচ্ছে এই বুঝি গল্পর ঘুম ভেঙে গেলো!
রুমে এসে গল্পকে আস্তে করে বেডে শুইয়ে দিলো। পরপরই করে ফেললো এক মারাত্মক কাজ –ঘুমন্ত গল্পর কপালে এবং দু’গালে ভীষণ আশ্লেষে ঠোঁটে চুমু আঁকে। তারপর আস্তে করে শরীরে কমফোর্টারটা টেনে দিয়ে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ালো।
শুভ্র চলে গেছে বুঝতে পেরেই গল্প চট করে চোখ মেললো। আজ সে একটু ছলাকলা করলো বৈকি। বাগানে গল্পর চোখটা লেগে আসলেও সে তখন পুরোপুরি ঘুমায় নি। শুভ্রর কাছাকাছি থাকার জন্য ঘুমের টালবাহানা সাজাল। কিন্তু…কিন্তু শুভ্র যে ওকে এতোটা কাছ থেকে ছুঁয়ে দিবে সেটা তো ও ভাবতেই পারেনি। কমফোর্টারটা টেনে মুখ ডেকে নিলো –মন বলছে গাল গুলো আবারও হয়তো লাল হয়ে গেছে হাতের উল্টো পিট দিয়ে গালে হাত রাখতেই টের পেলো তা অলরেডি উত্তপ্ত। এখন যদি শুভ্র এসে আবারও তার গালে চুমু খেতে চায় তখনতো ও বুঝে যাবে গল্প ঘুমায়নি –এতোক্ষন ঘুমের ভান করছিলো। কি মুশকিল! শুভ্র ছুঁয়ে দিতেই গাল গুলো ওমন লাল হয়ে উত্তপ্ত কেনো হয়? সে কমফোর্টার থেকে মুখ বের করে উঁকি দিয়ে দেখলো শুভ্র আসছে কি-না। এর মধ্যেই ওয়াশরুমের দরজা খুলার আওয়াজ আসতেই সে আবারও হুড়মুড়িয়ে কমফোর্টার দিয়ে গা-মাথা জড়িয়ে নিলো।
____________
পরদিন সকাল বেলা গল্পর ঘুম ভাঙতেই দেখতে পায় শুভ্র লাগেজ গুছাচ্ছে। শুভ্রকে সকাল সকাল লাগেজ গুছাতে দেখে সে কপাল কুঁচকে ফেলে। শুভ্র লাগেজ কেনো গুছচ্ছে? তারা কি আজ চলে যাবে নাকি? কথাগুলো মনে আসতেই সে শুভ্রকে ডাকল,
‘শুভ্র, আপনি লাগেজ কেনো গুছাচ্ছেন? আমরা কি আজ চলে যাচ্ছি?’
শুভ্র লাগজে তার শেষ শার্ট টা ভরতে ভরতে জবাব দিলো,
‘হ্য, আজ আমরা বেরোবো। তুমি একটু দ্রুত ফ্রেশ হয়ে নাউ আমি তোমার লাগেজেও অলরেডি প্যাক করে দিয়েছি। একটু চেক করে নাউ কিছু থেকে গেলো কিনা! আমাদের আর দু’ঘন্টা পর ট্রেন।’
গল্প বিস্ময়ে কিংকত্যর্ববিমূর হয়ে গেলো। তারা আজই চলে যাবে মানে টা কি? শ্রীমঙ্গলে তাদের আরও দু’দিন থাকার কথা ছিলো তবে! চলে যাবার কথা শুনে গল্পর মনটাই খারাপ হয়ে গেলো। শ্রীমঙ্গলের এই নৈসর্গিক সৌন্দর্য তাঁকে দারুণ আকৃষ্ট করেছে। এখান থেকে এতো দ্রুত ঢাকার ওই যান্ত্রিক কাটখোট্টা এলাকায় যেতে তার মন একদমই সায় দিচ্ছে না। তাছাড়া আরও একটা রিজন আছে তার এখানে থাকতে চাওয়ার আর তা হলো শুভ্র। হ্য, শ্রীমঙ্গলের সৌন্দর্য যেমন সে উপভোগ করেছে ঠিক তেমনি সে উপভোগ করেছে শুভ্র নামক চমৎকার পুরুষটির সঙ্গও। এখান থেকে চলে যাওয়া মানে সেই আবার কালেভদ্রে একবার আধবার তাদের দেখা হবে। কথাটা ভাবতেই গল্পর মন খারাপের পারদ দ্বিগুণ হলো। বিষন্ন মুখে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ালো।
গল্প ওয়াশরুমে ডুকতেই শুভ্র ঠোঁট কামড়ে হাসলো। কন্ঠে রহস্য নিয়ে বলল…গেট রেডি ফর অ্যানাদার নিউ সারপ্রাইজ –সুইট ওয়াইফি।
#চলবে
#লাভ_আফটার_ম্যারেজ
#আনাহিতা_তুলি
#পর্ব_১৬
কয়েকঘন্টার ব্যবধানে শুভ্রদের গাড়িটা এসে থেমেছে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। গাড়ি থেকে নেমেই গল্প কিছু টা অবাক হয়ে শুভ্র কে জিজ্ঞেস করলো,
‘আমরা কি প্ল্যানে করে যাচ্ছি, শুভ্র?’
শুভ্র গাড়ির পিছন থেকে লাগেজ বের করতে করতে জবাব দিলো,
‘হ্যাঁ। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ফ্লাইট।’
শুভ্রর কথা শুনে গল্পর মন খারাপ টা যেনো হু হু করে ভেরে গেলো। ও ভেবেছিলো তারা ট্রেনে করে যাবে তাতে সময়টাও অনেক বেশি কাটানো যাবে। গল্প বুঝতে পারছে না শুভ্রর ফিরে যাওয়ার এতো কেনো তাড়া! কই গল্পর তো কোনো তাড়া নেই; তার তো আরও বেশ কিছু দিন শুভ্রর সঙ্গে থাকতে মন চাচ্ছে। গল্প তো এখনই ফিরতে চাইছে না তবে শুভ্র কেনো চাচ্ছে! শুভ্রর কি গল্পর সঙ্গ ভালো লাগছে না? কথাগুলো ভাবতেই তার মন ভার হয়ে এলো। তার এসব আজগুবি চিন্তার মধ্যেই কেয়ার গলা ভেসে আসলো,
‘এ্যাই গল্প চলো তাড়াতাড়ি। চেকিং করতেও টাইম লাগবে, চলো চলো।’
গল্প মাথা নাড়িয়ে সায় জানায়। কেয়ার সাথে ভিতরে চলে। কেয়া গল্পর এমন বেজার মুখ দেখে ভ্রু কুচকে বললো,
‘গল্প, সুইটি কি হয়েছে? মন খারাপ কেনো?’
গল্প একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
‘আজ তো ফিরে যাচ্ছি, তোমাদের অনেক মিস করব। ফিরে গেলে তো আর রেগুলার দেখা হবে না ভাবতেই মন খারাপ হচ্ছে।’
কেয়া বিস্তর হেসে বললো,
‘ওহো, এটার জন্য আবার মন খারাপ করতে হয়! তুমি চাইলেই সবার সাথে আবারও দেখা করতে পারবে। আমরা আমরাই তো।’
গল্প কেয়ার কথায় হাসল অল্প। কেয়ার এবার একটু টিপ্পনী কেটে বলল,
‘আচ্ছা গল্প, আমাদের সাথে দেখা হবে না বলে মন খারাপ নাকি শুভ্রর থেকে আবারও দূরে থাকতে হবে বলে মন খারাপ –কোনটা? হু হু।’
গল্প মেকি রাগ দেখিয়ে বলল,
‘এমন কিছুই না আপু। তুমি অযথাই ভাবছো আমার তোমাদের সবার জন্যই মন খারাপ লাগছে।’
কেয়া হাসতে হাসতে বলল,
‘বলে ফেলো আমরা আমরাই তো লজ্জা পেতে হবে না সোনা।’
‘ধুরর… তোমরা না…..!’
কিছু বলতে চেয়েও গল্প বলতে পারল না। তাড়াহুড়ো করে সামনে এগিয়ে গেলো। পিছন থেকে কেয়ার হাসির আওয়াজ স্পষ্টই শুনতে পেলো।
__________________________________
গল্প প্ল্যান থেকে নেমে চারপাশ বুলিয়ে শুভ্র কে দ্বিধান্বিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
‘শুভ্র এটা তো ঢাকা এয়ারপোর্টে না। কক্সবাজার; আমরা কক্সবাজার এয়ারপোর্টে কি করছি?’
শুভ্র উত্তর দিলো না বলল,
‘তাই নাকি এটা ঢাকা না? ওহো, বিমান কি ভুল টার্নিং নিয়েছিলো নাকি?’
শুভ্রর কথার রেশ বুঝে গল্প চোখ ছোট ছোট করে চাইলো। বলল,
‘আপনি কি মজা করছেন শুভ্র! আমরা এখানে কেনো?’
শুভ্র কিছু না বলে গল্পর হাতটা তার মুঠোয় নিয়ে যেতে যেতে বলল,
‘যেহেতু কক্সবাজার এসেছি তবে চলুন সমুদ্রের সঙ্গে দেখা টা করেই যাই। নয়তো আফসোস হবে না –কক্সবাজার এসেও সাগরের কুল ঘেঁষে হাটতে পারলাম না! ইশশ…!’
গল্প সরু চোখে শুভ্রর ভাব-গতিক দেখলো। কক্সবাজার আসাটা যে তার পরিকল্পনা ছিল এটা বুঝতে তার সময় লাগলো না বেশি। কিন্তু হুট করে এখানে কেনো আসতে গেলো তা গল্পর বুঝে আসলো না। আর কেয়া আপুটাও তো তখন কিছু বলল না।
শুভ্ররা দুপুরের খাবার খেলো কক্সবাজারের দামি একটা রেস্টুরেন্টে। খাওয়া দাওয়ার পর সবাই রেস্টুরেন্ট থেকে বের হলো। তাদের সবার মধ্যেই একটা তাড়াহুড়ো ভাব গল্প লক্ষ্য করছে। কিন্তু সবার এতো তাড়াহুড়ো কেনো তা বুঝে আসলো না গল্পর।
গাড়িতে উঠে এবার সে কেয়াকে বলল,
‘এখন রিসোর্টে গিয়ে আমি একটা লম্বা ঘুম দিব আপু। ভীষণ টায়ার্ড লাগছে।’
কেয়া হেসে বললো,
‘ওসব চিন্তা বাদ দাও ডিয়ার। আরও কয়েক ঘন্টার জার্নির জন্য প্রস্তুত হও –আমাদের এখন শিপে উঠতে হবে।’
গল্প যারপরনাই অবাক হলো কেয়ার কথায়। বলল,
‘শিপে? শিপে কেনো আপু, কোথায় যাচ্ছি এবার?’
কেয়া ফিসফিসিয়ে বলল,
‘যদিও সিক্রেট তবু বলছি –উই আর গোশিং টু প্রবাল দ্বীপ।’
গল্প বেখেয়ালে মথা নাড়িয়ে পরপর কথাটা বুঝে আসতেই একপ্রকার মৃদু চিৎকার করে বলল,
‘প্রবাল দ্বীপ! ইউ মিনস দ্বারুচিনি দ্বীপ?’
কেয়া গল্পর কথা বুঝতে না পেরে ভ্রু কুচকে বললো,
‘দ্বারুচিনি দ্বীপ! মানে?’
গল্প তাড়াহুড়ো করে বলল,
‘ওহো! দ্বারুচিনি দ্বীপ অ্যাই মিন সেন্ট মার্টিন।’
কেয়া উপরনিচ মাথা দুলাল। গল্প খুশিতে বাক-বাকুম করে উঠে কেয়াকে ঝাপটে ধরলো। বলল,
‘আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না আপু আমরা সেন্ট মার্টিন যাচ্ছি!’
কেয়া হেসে বললো,
‘তাহলে একেবারে সেন্ট মার্টিন পৌঁছেই বিশ্বাস করো কেমন!’
____________________
শুভ্ররা শিপে করে দ্বীপে এসে পৌঁছেছে এক-দেড় ঘন্টার হবে হয়তো। আগে থেকেই কটেজ বুক করা ছিলো বিদায় –কোনো ঝামেলা বিহীন সেখানে উঠে যেতে পারে। গল্প কটেজের বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই তার দৃষ্টি স্থির হয়ে এলো। বারান্দা থেকে দূরের ওই নীল সমুদ্র দৃশ্যমান। সমুদ্রের ওই স্নিগ্ধ বাতাসে মন ফুরফুরে হয়ে এলো। কিছুক্ষন বাদেই সূর্যাস্ত হবে মাথায় আসতেই চপল পায়ে ঘরে ডুকল। শুভ্রকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বলল –শুভ্র দ্রুত আসুন তো। আমি সূর্যাস্ত দেখব। জলদি চলুন।
শুভ্র কিছু বলার সুযোগই পেলো না। শুধু তার সামনে থাকা চঞ্চলা রমণীটির দিকে অপলক তাকিয়ে থেকে সামনে এগুতে লাগলো।
গল্প যেনো বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে তার স্বপ্নের দ্বারুচিনি দ্বীপে এসে। সারাদিনের জার্নি ক্লেশ –গল্প নিমিষেই ভুলে গেলো সমুদ্রের নীল শীতল পানিতে পা দিতেই। সে পাখির মতো ছুটছে। শুভ্র একটু দূরেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ চোখে গল্পর চঞ্চলতা দেখছিল। বিয়ের প্রথমদিন যখন শুনেছিল সে এই সেন্ট মার্টিন দ্বীপে আসতে না পারার দারুণ আফসোস। তখনই মনে মনে ঠিক করে ফেলেছিল গল্পকে সে তার আফসোস নিয়ে বেশিদিন থাকতে দিবে না। খুব দ্রুতই সেন্ট মার্টিন তথাকথিত গল্পর দ্বারুচিনি দ্বীপ ভ্রমণে নিয়ে আসবে। শুভ্র নিজের কথা রেখেছে; গল্পকে নিয়ে এসেছে তার দ্বারুচিনি দ্বীপে যেখানে সে এখন মুক্ত পাখির মতো উড়ে বেড়াচ্ছে।
গল্প শুভ্রকে দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দৌড়ে এসে তার হাতটা ধরে বলল –আপনি এখানে একা একা কেনো ওদিকটায় চলুন আমার সাথে সানসেট দেখবেন।
বলেই শুভ্রর হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো। দ্বীপের কিছুটা সামনে এসে দাঁড়ালো; পায়ের গোড়ালি অব্ধি ডুবানো। তারউপর ছোট বড়ো ঢেউ হেলেদুলে আরও একটু ভিজিয়ে দিচ্ছে। গল্প দু’হাত প্রসারিত করে চোখ বন্ধ করে রেখেছে বাতাসে তার খোলা চুলগুলো শুভ্রর মুখের উপর আছড়ে পড়ছে। শুভ্র গল্পর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হুট করেই গল্পর গলার সাইডে ঠোঁট মুখ ডুবালো। আকস্মিক এই কান্ডে গল্প স্তব্ধ হয়ে গেলো। শুভ্র ওভাবে মুখ দাবিয়েই নাক টেনে বলল,
‘ইটস স্মেলস টু গুড তাহিয়াত। তুমি কি কোনো পারফিউম ইউজ করেছো? যদি করে থাকো –তো খবরদার আর কখনো করো না এক্সেপ্ট আমার কাছে আসা ছাড়া। আমি চাইনা অন্য কেউ এই স্মেল পাক!’
শুভ্রর ওসব কথা গল্প শুনলো ঠিকই কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারলো না। কেননা কথা বলার সময় শুভ্রর গরম নিশ্বাস যখন তার গলায় পড়ছিল তখন সে শিউরে শিউরে উঠছিল। শুভ্রর তো সেসব বেখবর। গল্পকে এমন চুপ থাকতে দেখে শুভ্র মাথা তুললো। বলল,
‘কি ব্যাপার তাহিয়াত আপনি এমন কাঠের মতো দাঁড়িয়ে আছেন কেনো?’
এই লোক হুটহাট এমন আপনি আজ্ঞে করে কেনো গল্পর সেটা কিছুতেই বুঝে আসে না! গল্প কিছু বলল না কেমন জানি হাসফাস করে উঠলো। শুভ্র ঠোঁট কামড়ে কিছু একটা ভেবে দুষ্ট হেসে বললো,
‘আপনার কি ব্রিদিং প্রবলেম হচ্ছে? দেখি দেখি এদিকে আসুন তো!’
শুভ্রর কথায় গল্প যেনো আহাম্মক বনে গেলো। তার কেনো হুট করে ব্রিদিং প্রবলেম হবে? তবে তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই শুভ্র তাকে ভীষণ কাছে টেনে নিয়ে আসলো। গল্প কিছু বুঝে উঠার আগেই শুভ্রর ঠোঁট এসে তার ঠোঁটে ছুলো ভীষণ আশ্লেষে। গল্পর চোখ বড়ো বড়ো হয়ে এলো শুভ্রর এমন কান্ডে। শুভ্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানেই তাকে ছেড়ে দিলো। মুখটা খুব ইনোসেন্ট করে জিজ্ঞেস করলো,
‘অ্যাই হোপ এখন ঠিক আছেন। জানেন তো, ব্রিদিং প্রবলেম হলে এটা খুব কাজে দেয়। অ্যাম অ্যাই রাইট তাহিয়াত?’
শুভ্র তখনো মিটিমিটি ঠোঁট কামড়ে হাসছে। গল্প তাজ্জব বনে চেয়ে রইলো। বলতে ইচ্ছে হলো –শুনন ধুরন্ধর পুরুষ, সমুদ্রের পারের এই স্নিগ্ধ বাতাসে কারও ব্রিদিং প্রবলেম হয় না। বরং আপনি যা করলেন তাতে শ্বাসরুদ্ধ হওয়ার চান্স নাইনটি নাইন পয়েন্ট ফাইভ পার্সেন্ট।
গল্পর ভাবনার মধ্যেই শুভ্র ওর ধরে উল্টো দিকে ঘুরতে ঘুরতে বলল,
‘এখন কটেজে চলো। আজ সারাদিন এতো জার্নি করে তুমি টায়ার্ড হওনি নাকি? আমি তো টায়ার্ড। চলো চলো… ফ্রেশ হতে হবে আবার ক্ষুধাও পেয়েছে।’
গল্প শুভ্র সঙ্গে তালে তাল মিলিয়ে চলতে লাগলো। তার দৃষ্টি শুভ্রর মুঠোয় তার হাতের দিকে। আশপাশটা একটু দেখেও নিলো কেউ ছিলো কিনা! না… কেউ নেই এইদিকে। ভেবেই গল্প স্বস্তির শ্বাস ফেললো। এই প্রথম শুভ্রর এমন গভীর স্পর্শে তার পুরো শরীর মন যেনো আন্দোলিত হয়ে উঠেছে। শরীরের শিরায় শিরায় যেনো শুভ্রর স্পর্শের শিহরণ বয়ে চলছে। গল্প তার একটা হাত বুকের বা পাশে রেখেই অনুভব করলো তার হৃদযন্ত্র টা অসম্ভব লাফালাফি করছে। গল্প হৃদযন্ত্রকে শাসিয়ে বলল– কি আশ্চর্য এভাবে লাফালাফি করার কি আছে? কেউ ছুঁয়ে দিলেই এভাবে লাফালাফি করতে হয় না মাই ডিয়ার হার্ট! তবে তার এই শাসানো টা খুব একটা কাজে আসলো না –হৃদযন্ত্র টা তার আপন গতিতেই ধুকপুক ধুকপুক করেই যাচ্ছে। বিষয়টি গল্পর কাছে ভারী অসহ্যকর টেকলো। মনে মনে কিছু গালিও ছুড়লো ওমন লাগামহীন হার্টের উদ্দেশ্য।
#চলবে
