#মরিচীকা
#পর্ব ০৫
#মাকামে_মারিয়া
আমি আমার মায়ের সৎ মেয়ে তাই না খালা?
মালেকা কাজ করছিলো,নাজেরার কথায় মুখ তুলে তাকালো। কিছু বললো না।
কিছু বলছো না যে খালা?
মালেকা অনিচ্ছা সত্ত্বেও বললো, এগুলা কওয়ার অনুমতি নাই আম্মা।
আমি জানি খালা। সবই জানি। আমি আর ছোট নেই। আমি যদি আমার মায়ের আপন মেয়ে হতাম তাহলে আমার সাথে এমন আচরণ করতে পারতো না। তাই না বলো?
মালেকা চুপ করে রইলো। সে এ বাড়িতে কাজ করে পঁচিশ বছর হতে চললো। এ বাড়ির সবই তার জানা। নাজেরাকে কখনো মুখ ফুটে বলার সাহস হয়নি মেয়েটা জামিনার আপন মেয়ে না। কিন্তু জামিনার আচরণে কারো সন্দেহের অবকাশ থাকে না।
নাজেরা বললো, আচ্ছা আমার নিজের আম্মু কোথায়? আমি এখানে আসলাম কি ভাবে? আমার মা বেঁচে আছে তো খালা?
মালেকা এক মূহুর্তও রান্নাঘরে দাঁড়ালো না। এখানে থাকলেই মেয়েটা হরেকরকমের প্রশ্ন করবে। এসব প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়াও বিপদের। উত্তর দিলে আজই এ বাড়িতে শেষ দিন হতে পারে।
মালেকা হনহনিয়ে চলে গেলো। নাজেরার চোখ টলমল করে উঠলো। বুকের ভেতর চিনচিনে ব্যথা অনুভব করছে মেয়েটার। চোখের সামনে সব ঘোলাটে হয়ে আসছে। কিচেনের কাজকর্ম রেখে দৌড়ে ছাঁদে চলে আসলো। অদ্ভুত এক কারনে মন খারাপের সময় ছাঁদে যেনো আসতেই হয়।
আজকে সূর্য মামার দেখা পাওয়া যায়নি। ছাঁদে মৃদু ঠান্ডা বাতাস, চারদিকে কুয়াশা মুড়ানো দৃশ্য। নাজেরা শীতে কাঁপছে। কিছুটা মন খারাপও বটে।
নাজেরা! আবার মন খারাপ কেনো?পাশের বাসার ছাঁদ থেকে তাযিন জিজ্ঞেস করলো।
নাজেরা হাসার চেষ্টা করে বললো, উঁহু মন খারাপ না। খুব ঠান্ডা তাই কাঁপছি।
ঠান্ডা তো ছাঁদে এসেছি কেনো? রুমে বসে থাক।
ছাঁদে দেওয়া কাপড়চোপড় গুলো উল্টেপাল্টে দিতে দিতে নাজেরা বললো, কাজেই এসেছি। তোর মতো অকর্মণ তো নই।
হ্যাঁ খুব কাজের তুই। রোদ নেই অথচ কাপড়চোপড় মেলে দিয়ে রেখেছিস।
নাজেরা কড়া চোখে তাযিনের দিকে তাকিয়ে বললো, তুই বুঝিস আদোও কিছু? রোদ নেই তো কি হয়েছে? বাতাসেও কাপড় শুকায়।
তাযিন শব্দ করে হাসতে লাগলো। নাজেরা এগিয়ে আসলো রেলিং এর পাশে। দুটো বিল্ডিং একদম কাছাকাছি হওয়াই ছাঁদ থেকে দারুণ আড্ডা দেওয়া যায়।
নাজেরা কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো, আমি তো ছাঁদে এসেছি কাজে। তুই কেন এই ঠান্ডার মধ্যে ছাঁদে এসে বসে আছিস হুম? মতলব কি বল তো?
তাযিন মুচকি হাসলো কিছুটা লজ্জাও পেলো। ওই যে বললাম লজ্জা পেলে ছেলেটার মুখ লালচে হয়ে যায়। মাথা চুলকিয়ে তাযিন বললো, মতলব একটা আছে। কিন্তু তোকে বলা যাবে না।
নাজেরা ব্রু কুঁচকে বললো, তাই না? আমাকে বলা যায় না এমন কিছুও তোর থাকে? তোর আগাগোড়া সব আমার জানা ভুলে যাসনে জিলাপি।
তাযিন গম্ভীর হয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে রইলো। আজ আর জিলাপি বলাতে রাগ করলো না। অবশ্য সিরিয়াস রাগ কখনোই আসেনি, মিছেমিছি রাগ করতে ভালো লাগে মেয়েটার সঙ্গে। তাই তো জিলাপি বলে ডাকলেই বিরাট রাগ দেখানোর ভান করে সে।
প্রসঙ্গ পাল্টে তাযিন জিজ্ঞেস করলো, তোদের মেহমান চলে গিয়েছে?
হ্যাঁ। আজকে সকালেই তো চলে গেলো।
থাকার কথা ছিল না কয়েকদিন??
ছিল! শুধু জাহেরা থাকতে চেয়েছিলো সাথে আসলো যে ওর চাচাতো ভাই। উনি বোধহয় থাকতে চায়নি তাই চলে গেলো।
তাযিন ভাবুক দৃষ্টিতে শূন্যে তাকিয়ে মিনমিনে স্বরে বললো, ওহ আচ্ছা।
নাজেরা বললো, কি হলো? তুইও মন খারাপের রোগে আক্রান্ত হলি নাকি?
এই রোগ সবার রক্তে মিশে আছে নাজেরা। এই রোগ ছাড়া মানুষ আছে? নাকি তোর মনে হয় মন খারাপ শুধু তোর একার আমাদের নেই!
নাজেরা চুপ করে গেলো। সে জানে জমিনের সবারই মন খারাপ হয়, একেক জনের মন খারাপের একেক রকমের কারন আর একেক রকমের ব্যাখা থাকে। কারোটা জগন্য কারোটা বা অল্পস্বল্প কষ্টই। নাজেরার মনে হয় তার কারনটা জগন্য। এই যে মেয়েটার মা সারাক্ষণ বকাঝকা করতেই থাকে এটা জগন্য নয় কি?
__________
জাহেরার বেজায় মন খারাপ। নুরজাহানের শশুর বাড়িতে গিয়েছিলো কয়েকটা দিন থাকবে ভেবে কিন্তু নাহিল একেবারেই নারাজ থাকতে। বাড়িতে এসেও মুখ ফুলিয়ে রাখলো। ফয়জুল হাকিম নাহিলকে ডেকে পাঠালো।
আসসালামু আলাইকুম কাকা৷ ডেকেছেন?
ফয়জুল গম্ভীর কণ্ঠে সালামের জবাব দিয়ে বললো, কি ব্যাপার নিহাল? চলে আসলে যে? ভালো লাগেনি নুরজাহানের শশুর বাড়ি?
নিহাল হাসার চেষ্টা করে বললো, জ্বি না কাকা। তেমন কিছু নয়। আমার জরুরি কাজ পরে গিয়েছে তাই চলে আসতে হলো। জাহেরাকে তো বললাম থেকে যেতে।
ভেতরের রুম থেকে জাহেরা নাক টেনে বললো, একা কেনো থাকবো? তুমিও আমার সাথে থাকতে নিহাল ভাইয়া।
নিহাল কিছুটা বিরক্তর স্বরে বললো, আশ্চর্য জাহেরা। তুমি একাই থাকতে পারতে তো। আমি না হয় নিয়ে আসতাম পরে। এটা নিয়ে এতো রাগ করার কি আছে!
জাহেরা আরও কিছু বলার আগেই ফয়জুল হাকিম মৃদু ধমকের স্বরে বললো, নিহাল!! বাচ্চা মেয়েটার সাথে এ ভাবে কথা বলতে হয় না। তুমি দেখো না আমরা আমার মেয়ের সঙ্গে কেমন আচরণ করি। তোমারও স্নেহ করা উচিৎ।
নিহাল কিছুটা অপমানিতবোধ করলো। দাঁতে দাঁত চেপে বললো,জ্বি কাকা। আমি আসি তাহলে।
হ্যাঁ যা-ও। কাজের আপডেট দিও।
নিহাল চলে আসলো। মনটা বিষিয়ে গেলো। জাহেরা মেয়েটা অতিরিক্ত ন্যাকা। এ জন্য সুন্দরী মেয়েদের নিহাল সহ্য করতে পারে না। এরা অতিরিক্ত ন্যাকা হয়। আচ্ছা সব সুন্দরীরাই কি ন্যাকা হয়? নাজেরার মতো শ্যাম কালো মেয়েরা কি হয়? মায়াবতী?
নিজ মনে ভাবতে ভাবতেই নিহালের ঠোঁট জোড়া প্রসস্থ হয়ে হাসি ফুটলো। আসার সময় নাজেরাকে দূর থেকে দেখেছে সে। মেয়েটাকে সারাক্ষণ কাজের উপর রাখে নুরজাহান। এই তো যখন নিহালরা বিদায় নিচ্ছিলো নাজেরা হাতের কব্জিতে ওড়না প্যাচিয়ে কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
জাহেরা তখন বোনকে জড়িয়ে ধরে আহাজারি করছিলো। নাজেরাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই নুরজাহনা ধমকের স্বরে বললো, কিরে? দাঁড়িয়ে আছিস যে? রোদ উঠেছে ছাঁদে কাপড় গুলো মেলে দিয়ে আয়।
নাজেরা মুচকি হাসার চেষ্টা করে সিঁড়ি ঘরে গিয়ে আরেকবার পিছন ফিরে তাকালো। নিহাল মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ছিল টের পেতেই নাজেরা যেনো আরও বেশি লজ্জা পেলো। মেহমান গুলোর সামনে ভাবির এ ভাবে ধমক না দিলে হতো না? ভেবেই নাজেরার চোখের কোণে অবাধ্য পানি চিকচিক করছিলো।
নিহালের বুকের ভেতর অজানা ঢেউের তোলপাড় চলছে। গেইট টপকে চাঁপা কুঞ্জের বাহিরে এসে দাঁড়ালো সবাই। জামিনা আর নুরজাহান জাহেরাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। নিহালের মনটা খারাপ, কি যেনো একটা হয়েছে কে জানে! মনের ভেতর অদ্ভুত রকমের অশান্তি হচ্ছে। গাড়িতে বসে পড়লো সে।
নাজেরা ছাঁদের রেলিং এর পাশে এসে দাঁড়ালো। তার ঠিক সামনে নিচেই নিহাল বসে আছে গাড়িতে, লোকটার কাকের বাসার মতো মাথাটা আর একটা হাত দেখা যাচ্ছে। নাজেরা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। কানে তখনও বাজছে নিহালের করা সেই আবদার ” আরও একবার আপনার হাসি দেখতে চাই। দেখাবেন?”
নাজেরার বড় বড় সুখ সুখ লাগছে এমন আবদারে। আজ অব্দি কখনো কেউ এতো সুন্দর আবদার করেছিলো বলে মেয়েটার মনে পড়ে না। নিহাল এদিক সেদিক করতে করতে হঠাৎ কি মনে করে উপরে তাকালো, দুজন চোখাচোখি হতে সময় লাগলো না। নাজেরার বুকে একটা ধাক্কার মতো লাগলো। খুব চেষ্টা করেও সে চোখ ফিরিয়ে নিতে পারছে না। মনে হচ্ছে অদৃশ্য কিছু একটা আটকে রেখেছে।
নাজেরার মিষ্টি করে হাসলো। চোখের ইশারায় বিদায় জানালো। চোখের ভাষায় ঠোঁটের হাসিতে বুঝিয়ে দিলো সে নিহালের আবদার রেখেছে। আরও একবার মিষ্টি করে হেঁসে দিয়েছে। নিহাল শুধু তাকিয়ে থাকতেই পেরেছে কিছুই বলতে পারেনি। হয়তো বলতে চেয়েছিলো, এতো মিষ্টি করে হেঁসো না শ্যামলী। মেয়েদের এতো সুন্দর করে হাসতে মানা।
চলবে…….
#মরিচীকা
#পর্ব ০৬
#মাকামে_মারিয়া
তাহির ডেকে পাঠালো নাজেরাকে। নাজেরা রেডি হচ্ছিল ভার্সিটি যাবে। অর্নাস ফাস্ট ইয়ারে সে। ইয়ার চেঞ্জ এক্সামের বেশি দিন নেই। কিন্তু পড়াশোনা তেমন একটা হয়নি। অবশ্য মেয়েটাও তেমন ভালো স্টুডেন্ট নয়। তাযিন অনেকটা হেল্প করে তাকে। তাযিন ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট।
নাজেরা রেডি হয়ে ভাইয়ের রুমের সামনে দাঁড়িয়ে অনুমতি চাওয়ার উদ্দেশ্যে সালাম দিয়ে বললো, ভাইয়া আসবো?
তাহির নিজেও অফিসে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছিল। টাই বাঁধতে বাঁধতে বললো, এসো নাজেরা।
নাজেরা রুমে ঢুকলো। বরাবরে মতোই ভাইয়া ও ভাবির এই রুমটা নাজেরার ভীষণ পছন্দের। পছন্দ হবেই না কেনো? একে তো এতো সুন্দর আর গুছানো একটা রুম, তারউপর চাইলেও এই রুমটাকে দেখতে পায় না সে। চাইলেই হুট করে রুমে ঢুকে যাওয়ার অনুমতি নেই। নুরজাহান নিষেধ করে দিয়েছে। শুধু ডাক পড়লেই আসতে পারে সে। আর তাই তো যখনই আসে তখনই মন ভরে রুমের আনাচকানাচে ভালো করে চোখ বুলিয়ে নেয়। কিছু জিনিস চোখে দেখায় শান্তি মিলে।
তাহির জিজ্ঞেস করলো,কলেজ যাচ্ছো?
নাজেরা বললো, জ্বি ভাইয়া।
কেমন চলছে পড়াশোনা?
জ্বি ভালো।
তোমাকে ইদানীং দেখা যাচ্ছে না ব্যাপার কি? কোনো কিছু লাগে না? ভাইয়াকে বলো না যে?
নাজেরা চুপ করে রইলো। তাহির তার একমাত্র বড় ভাই। ভাই হিসেবে সে পারফেক্ট। নাজেরাকে খুব ভালোবাসে। যখন যা লাগবে সবই এনে দেয়। কিন্তু বিপত্তি সৃষ্টি করলো নুরজাহান। নাজেরার একমাত্র ভাইয়ার বউ ভাবি। যে কিনা নাজেরাকে একদম পছন্দ করে না। সে চুপিসারে নাজেরাকে বারণ করে দিয়েছে নাজেরা যেনো তার হাসবেন্ডের কাছে কোনো কিছু না চায়। তার হাসবেন্ড নাজেরার পিছনে টাকা খরচ করবে এটা নুরজাহান একেবারেই সহ্য করবে না। এরপর থেকে নাজেরা তাহিরের কাছে আর তেমন কিছুই চায় না। আগে পড়াশোনার খরচের ব্যাপারটা তাহির দেখতো।
তাহির ফের জিজ্ঞেস করলো, কি হলো? কিছু বলছো না যে?
নাজেরা হাসার চেষ্টা করে বললো, জ্বি ভাইয়া আব্বু টাকা দিয়েছে। তাই আর আপনার কাছে চাওয়া হয়নি। লাগলে চাইবো।
তাহির বিশ্বাস করে নিলো। সে একই সাথে বোন, মা এবং বউয়ের প্রতি লয়াল। তাই নাজেরা চাইলেও নুরজাহানকে নিয়ে কিছু বলতে পারে না। বললে পরে দেখা যাবে তাহির নাজেরার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে গেলো।
তাযিন ভার্সিটি ক্যাম্পাসে বসে অপেক্ষা করছে। একটু পর পর গেইটের দিকে তাকাচ্ছে। নাজেরার জন্য অপেক্ষা করছে সে। মেয়েটা এখনো আসছে না।
ভার্সিটিতে তাযিন ফ্যামাস বয়। ছেলে মেয়ে উভয় তাযিনের সান্নিধ্য পেতে মরিয়া। জেনিফা এসে তাযিনের পাশ ঘেঁষে বসলো। মেয়েটা নজরকাড়া সুন্দরী, মেয়েরা যেমন তাযিনের সান্নিধ্য লাভের আশায় থাকে ছেলেরা তেমনি জেনিফার সান্নিধ্য পেতে চায়৷ কিন্তু তাযিন?সে কি আদোও পাত্তা দেয় কোনো মেয়েকে? হোক সে বিশ্ব সুন্দরী।
জেনিফা বললো, কারো জন্য অপেক্ষা করছো তাযিন?
তাযিন মাথা ঝাঁকিয়ে বললো, হ্যাঁ।
জেনিফা আগ্রহ নিয়ে বললো, কার জন্য জানতে পারি?
তাযিন সরাসরি বলে দিলো, নাহ সিক্রেট।
জেনিফা অপমানিত হলো। অবশ্য তাতে মেয়েটি অভ্যস্ত। প্রায় সময়ই তাযিন তাকে এ ভাবে উপেক্ষা করে।
জেনিফা এখনো পাশে বসে আছে। তাযিনের অস্বস্তি হচ্ছে। নাজেরা এসে দেখে মাইন্ড করবে না তো? যদিও নাজেরা এসবে একেবারেই নজর দিবে না কিন্তু তাযিনের মন অন্য কিছু আশা করে, তার অশান্ত মন আগ বাড়িয়ে ভেবে নেয় নাজেরা কষ্ট পাবে, মন খারাপ হবে। কিন্তু আদোও নাজেরার এসব কিছু হয়?
তাযিন ক্লাসে চলে আসলো। নয়টা বেজে চল্লিশ। পয়তাল্লিশ থেকে ক্লাস শুরু। মেয়েটা এখনো আসেনি। এই মেয়ের জন্য তাযিন সবার শেষে ক্লাস রুমে ঢুকে। আগে ঢুকে সিটে বসলে পাশের সিট ফাঁকা থাকে না। কেউ না কেউ এসে বসেই পড়ে। সব সময় তো আর উঠিয়ে দিতে পারে না। তাই ছেলেটা সবার শেষে ক্লাস রুমে ঢুকে, প্রায় সবার আসা হয়ে গেলে একেবারে পিছনের সিটে গিয়ে বসে। তার ঠিক পাশেই মেয়েদের সিটে যেনো নাজেরা বসতে পারে।
একবার নাজেরা ক্লাসে আসলো না। তাযিন ক্লাস রুমে আসলো। ক্লাস টাইম শুরু হয়ে গেলো। মেয়েদের সিটে তাযিনের পাশের সিটাতে নাফিসা এসে বসে পড়লো। সে অবশ্য তাযিনের পাশের সিটে বসতে পেরে খুশী হয়েছিল কিন্তু তাযিন সে-ই খুশী বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে দিলো না। নাফিসার ব্যাগটা পিছনের সিটে সরিয়ে রেখে বললো, এই সিটে আমার বউ বসবে। পিছনে গিয়ে বসো নাফিসা।
ক্লাসের যেকজন একথা শুনলো সবাই তাযিনের দিকে তাকিয়ে রইলো। কেউ কেউ আবার আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো, তোর বউ বসবে মানে? কে তোর বউ? তার মানে আমাদের ক্লাসেরই কেউ তোর বউ? তোর ক্রাশ?
কথাটা জিজ্ঞেস করেছিলো মুন্না। তাযিন ধমক দিয়ে বললো, ক্রাশ আবার কি? বউ বল বউ। ক্রাশ ট্রাশ কিছু না ডিরেক্ট বউ।
ক্লাসের সবার ভিষন জানার ইচ্ছে ছিল তাযিন কাকে পছন্দ করে। নাজেরাকে কয়েকজন সন্দেহ করলেও নাজেরার দিক থেকে একেবারে সচ্ছ থাকায় সন্দেহটা একটু ঢিলে হয়েছিল। কিন্তু কারো কারো সন্দেহ থেকেই গিয়েছিল। কোনো কোনো মেয়ে তো আবার নিজেকে তার প্রেমিকা ভেবে নিতো এ জন্য তাযিন কোনো মেয়ের সাথে কথা বলতো না। কথা বললেই যদি নিজেকে প্রেমিকা দাবী করে তাহলে কথা বলার কি দরকার? সেদিন নাফিসা সিট ছেড়ে দিয়েছিলো ঠিক কিন্তু সিটটা ফাঁকাই ছিল। কারণ তাযিনের বউ আসেনি। অর্থাৎ নাজেরা সেদিন ক্লাসে যায়নি। এরপর সন্দেহটা আরও গভীর হলো ছেলেমেয়েদের। ক্লাস শেষে তুন্না তো বলেই ফেললো, তাযিন নাজেরা তো আজ আসলো না। তার মানে কি আমরা ধরে নিবো নাজেরাই তোমার বউ?
তাযিন তেমন একটা পাত্তা না দিয়ে ক্লাস থেকে বের হতে হতে বললো, তোমরা ধরলেও সে আমার বউ, না ধরলেও বউ। তোমরা ধরলে নাকি ছাড়লে ডোন্ট কেয়ার।
তাযিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ঠিক ক্লাস শুরু হওয়ার পাঁচ মিনিট পর নাজেরা কিছুটা হাঁপাতে হাঁপাতে ক্লাস রুমের দরজায় এসে দাঁড়ালো। ফুঁপানোর স্বরে বললো, স্যার আসবো?
ক্লাসের সবার দৃষ্টি তখন নাজেরার দিকে। নাজেরার দৃষ্টি স্যারের দিকে। তাযিনের দৃষ্টি তো সেই তখন থেকেই নাজেরার আসার পথে।
মেয়েটা রুমে ঢুকেই পিছনে চলে গেলো। তাযিন চোখের ইশারায় পাশের সিটটা দেখালেও নাজেরা তাকালো না সেদিকে। সে অন্য একটা সিটে বসে পড়লো। তাযিনের ফর্সা মুখটা লাল টকটকে হয়ে গেলো। নাজেরা তাকে ইগনোর করছে? এটা মেনে নেওয়া সম্ভব? তাযিনের বুকের ভেতরটা পুড়ছে । সে জানে মেয়েটা খুব বেশি হার্ড না হলে তাকে ইগনোর করে না। তার মানে তাযিন কি কোনো ভুল করে বসলো? ছেলেটার কান্না পাচ্ছে। যেনো বাচ্চা ছেলের মতো এক্ষুনি কান্না করে দিবে।
বহু কষ্টে ক্লাস শেষ করলো। নাজেরা বের হয়ে আসলো। তাযিন আগে থেকেই বাহিরে অপেক্ষা করছিলো। সে আসতেই তাযিন কিছুটা বেপরোয়া গতিতে সামনে এসে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো —
কি ভুল করেছি বল?
নাজেরা ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে টের পেলো চোখ মুখ লাল। জিজ্ঞেস করলো, তুই কান্না করেছিস?
তাযিন হাতের তালুতে মুখটা মুছে বললো, আমি কি ভুল করেছি সেটা বল প্লিজ।
নাজেরা হাসার চেষ্টা করে বললো, তোর কেনো মনে হচ্ছে তুই ভুল করেছিস? মানে ভুল কি তুই-ই করবি এমন কোনো লিখিত চুক্তি হয়ে গিয়েছে? অপর পক্ষের ভুল হতে পারে না?
নাহ। তোর ভুল হতে পারে না। নিশ্চয়ই আমার কোনো ভুল হয়েছে। তা না হলে নাজেরা আমাকে কখনো ইগনোর করে না এটা আমি জানি।
নাজেরা এবার একটু মজা পেলো। আরেকটু মজা নেওয়ার জন্য জিজ্ঞেস করলো, আর কিছু জানিস নাকি বল শুনি?
তাযিনের কন্ঠ কাঁপা। সে কিছুটা দ্রুতই কথা বলছে। আরেকটু দ্রুততার সাথে বললো, আমি অনেক কিছু জানি নাজেরা। আমি জানি যে আমিই তোর একমাত্র কাছের বন্ধু। ছোট বেলা থেকে এখন পর্যন্ত তুই অকারণে আমার সাথে কখনো রাগ করিস নাই। তুই আমার সাথে মোট সতেরো বার রাগ করেছিস, ইগনোর করেছিস। এই সব কিছু আমার মুখস্থ করা। আর প্রতিবার রাগের একটা কারণ ছিল। তাই তোর রাগ করা মানেই আমার ভুল হয়েছে।
নাজেরা বরাবরের মতোই সন্তুষ্ট হলো। সতেরো বার রাগ করলেও করতে পারে যেহেতু নাজেরার ওসব মনে নেই। কিন্তু তাযিন যখন বলেছে তার মানে সত্যি। তবে এই ছেলের অনুগত টের পায় সে। কোনো বারই চার পাঁচ ঘন্টার বেশি রাগ করে থাকতে পারেনি। শুধু একবার প্রায় তেইশ ঘন্টা অর্থাৎ তাযিনের ভাষায় পুরো একটা দিন রাগ করে ছিল। তা-ও সে বার নাজেরা রাগ করে চট্টগ্রাম চলে এসেছিলো বাবার সাথে বেড়াতে। বেড়াতে আসার ঠিক কিছুক্ষন আগেই ওদের ঝগড়াটা হয়। নাজেরা চলে আসে তাযিন ওদের বাড়ি এসে দেখলো মেয়েটা নেই। নিজ বাড়িতে গিয়ে সে কি কান্না। আমাকে নাজেরার কাছে নিয়ে যা-ও আব্বু।
দানিশ ছেলের কান্না থামতে না পেরে তখনই রওনা দেয় চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে। যেহেতু নাজেরার আব্বু এবং তাযিনের আব্বু বন্ধু ছিল তাই অন্য কোনো সমস্যা হলো না। দানিশ জানালো তার ছেলেও নাজেরার সঙ্গে বেড়াতে চায়। তখন দুটোর বয়স ছিল আট বছর।
তাযিন তাড়া দিয়ে বললো, বল না এবার? রাগ করেছিস কেনো?
নাজেরা দুইহাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ঘাড় নাড়িয়ে এদিক সেদিক তাকিয়ে বললো, চল বাসায় যাই।
তাযিন বাচ্চাদের মতো পা নাচিয়ে বললো, না প্লিজ। রিজন জানতে চেয়েছি তো আমি। প্লিজ টেল মি।
বাড়ি যাবি কিনা সেটা বল?
না যাবো না। তুই আগে বলবি।
নাজেরা বিরক্তিকর স্বরে বললো, তুই ওমন বাচ্চাদের মতো করিস কেন তাযিন?
কারন আমি বাচ্চা। আম্মু বলে আমি এখনো বাচ্চা।
তোর আম্মুর কাছে তুই বাচ্চা সো আম্মুর কাছে বাচ্চামো করবি আমার সাথে না।
তাযিন একটু রুক্ষতার সঙ্গে বললো, টু বি সিরিয়াস নাজেরা। আমি কিছু জিজ্ঞেস করছি।
নাজেরা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললো, ওকে ফাইন। সকাল থেকে তোর সাথে আমার কি কি কথা হয়েছে মনে কর।
তাযিন যেনো বহুবছর ধরে খোঁজতে থাকা পথের সন্ধান পেলো। ব্রেনে চাপ দিয়ে সকাল থেকে হওয়া সব কিছু মনে করার চেষ্টা করলো।
নাজেরা বললো, কি হলো? মনে পড়ছে কিছু?
অনেক কিছু একসাথে মনে পড়তেছে। কোনটাকে কারণ হিসেবে ধরবো বল তো?
নাজেরা দাঁত কিড়মিড় করে বললো, ওকে বল আমাকে আজকে কলেজে নিয়ে না আসার কারণ কি ছিল?
কারণ তুই আমাকে আগেই বের হতে বলেছিলি। তোর একটা পার্সেল.. এতোটুকু বলেই তাযিন থেমে গেলো।
নাজেরা বললো, হ্যাঁ তারপর? কি হলো বল? থেমে গেলি কেন? আমার পার্সেল কোথায়?
তাযিন চুপসে গেলো। সে পার্সেল রিসিভ করেছে। কিন্তু সেটার আপডেট নাজেরাকে দেয়নি কারণ পার্সেলে যেটা ছিল সেটা পেয়ে তাযিনের খুব মন খারাপ হয়েছে।
নাজেরা বললো, কি হলো বল?
তাযিন মন মরা হয়ে বললো, রিসিভ করেছি তো।
হ্যাঁ তারপর? কই সেটা?
তুই একারণে রাগ করেছিস? একটা পার্সেলের জন্য রাগ করতে পারলি আমার সাথে?
নাজেরা তাযিনের থেকে কিছুটা খাটো তাই ছেলেটার মাথা নাগাল পায় না। বললো, একটু নিচু হও তো জিলাপি।
তাযিন নিচু হলো, নাজেরা তাযিনের মাথায় একটা থাপ্পড় লাগিয়ে দিয়ে বললো, মোটেও রাগ করিনি রে গাধা। আজকে ক্লাসে রজব স্যার ছিল। জানিস না স্যার কত রাগী। উনিশ-বিশ হলেই ক্লাসের সবার সামনে অপমান করে।
তাযিনের মনে পড়লো সত্যিই তো রজব স্যার ছিল। বেচারা নাজেরার চিন্তায় ওসব কিছু ভুলেই গিয়েছিল।
তাযিন মাথা চুলকাচ্ছে। নাজেরা বললো, পার্সেল দে?
তাযিন অভিমানের স্বরে বললো, না নিলে হয়?
আশ্চর্য! তুই তো অনেক বার আমার পার্সেল রিসিভ করেছিস। এবং শর্ত অনুযায়ী প্রতিবারই আমার আগে তুই পার্সেল খুলেছিস। তাহলে আজকে কি এমন হলো?
অনেক কিছু হয়েছে। তাযিনের মুখে রাজ্যের বিষন্নতা।
নাজেরা উতলা হয়ে জিজ্ঞেস করলো, কি হয়েছে বলবি তো?
পার্সেল কে পাঠিয়েছে জানিস?
নাজেরা বললো, না জানি না তো। তোর জানার কথা যেহেতু তুই রিসিভ করেছিস।
অজানা কেউ পাঠিয়েছে নাজেরা।
নাজেরা কিছুটা অবাক হয়ে বললো, ওকে বুঝলাম কিন্তু তুই ওতো মন খারাপ করছিস কেনো? কি ছিল পার্সেলে?
একটা রেড স্টোনের হেড ড্রপ। সাথে একটা চিরকুট।
হেড ড্রপ? মানে সিঁথিতে পড়ার টিকলি? এই ইউনিক জুয়েলারি কে পাঠালো? আবার চিরকুটও? নাজেরা বেশ আশ্চর্য হলো কিন্তু তাযিনের ভীষণ মন খারাপ, ইচ্ছে করছে চিরকুটটা ছিঁড়ে কুটিকুটি করে ফেলে।
চলবে…….
