#মরিচীকা
#পর্ব ১৭
#মাকামে_মারিয়া
বাসে পাশাপাশি সিটে বসে আছে তাযিন এবং সোফিয়া। তাযিন ভীষণ এক্সাইটেড, সে বাসায় ফিরছে। কতদিন পর নাজেরাকে দেখতে পাবে। যদিও বেশ রাগ অভিমান করেই দুরত্ব টেনেছিল কিন্তু হুট করে মন কেমন করছে তাই তো অতি দ্রুতই মায়ের আঁচল টেনে বাচ্চা ছেলের মতো মিনতি করলো সে বাসায় ফিরতে চায়, বেড়াতে আর ভালো লাগছে না। সোফিয়া কিছুটা বিরক্ত হয়েই বলেছিল, কি যে করিস! মন চাইল আসলি আবার চলে যেতে লাফাচ্ছিস! আমারও একটা সুযোগ সুবিধা লাগে তো। তোর নানু বলেছে আমাকে পুরনো বাড়িতে নিয়ে যাবে, কতদিন পর ছোট কালের বান্ধবীদের দেখবো ভেবেছিলাম।
তাযিন নাক টেনে বললো, আমিও আমার ছোট কালের বান্ধবীকেই দেখার জন্য ছুটছি।
তুই বরং তোর বান্ধবীকে দেখতে যা,আমি থাকলাম আমার বান্ধবীদের সাথে দেখা করার জন্য।
তাযিন নাছোড়বান্দা, মা’কে সাথে করে আসছে তাকে সাথে করেই ফিরবে। সকাল এগারোটা বাজে তখন, সূর্যের প্রখর তাপ। সোফিয়া ঘুমাচ্ছে সিটে হেলান দিয়ে। তাযিনের ঘুম আসছে না। ভেতরটা কেমন অস্থীর। একবার মনে পড়লো নাজেরা পার্সেল পেয়েছিল, ওড়নাটা মাথায় দিয়েছে? নিশ্চয়ই খুব সুন্দর লেগেছে। মসলিন কাপড়ের ওড়না, রুহি বায়না ধরেছিল মেলায় যাবে। সন্ধ্যায় মেলায় নিয়ে গেলো। সমস্ত মেলা ঘুরে ঘুরে রুহির পছন্দমতো সব কিছু কিনলো, ঝালমুড়ি খেলো রুহি, তাযিন পাশে দাঁড়িয়ে। বললো, তাযিন ভাই আপনিও খাবেন না?
জ্বি না রুহি! তুমি খাও।
রুহি খেতে লাগলো, একটু পর আইসক্রিম খেলো। ফুচকা আর হালিমও খেলো। বাড়ির জন্য প্যাকেট করে অনেক খাবারদাবার কিনেও নিলো। তাযিন ব্রু কুঁচকে ভাবছে, এই মেয়ে এতো খেতে পারে? চেহারা দেখে তো মনে হয় না খেতে পারে যে!
রুহি বললো, আমার শেষ। চলেন বাড়ি যাই।
তাযিন দেখলো দু’হাতে জায়গা হচ্ছে না মেয়েটার এতো কিছু নিয়েছে। অবশ্য সব টাকা তাযিন দেয়নি, সে নিজেই বড় ভাই, দাদি,ফুফু সবার কাছে গিয়ে গিয়ে বলেছে মেলায় যাবো বকশিস দাও। ফেরার পথে সেই লাল টকটকে ওড়নাটা নজরে আসলো তাযিনের। এতোক্ষণ যাবৎ চুড়ি কানের দুল সহ নানান কিছু চোখে পড়ছে কিন্তু চোখ আঁটকে যায়নি, মনে হয়নি কারো জন্য নিতে হবে। কিন্তু ওড়নাটা দেখেই পা থেমে গেলো মন ডেকে বলছে জারুলতাকে দারুণ মানাবে।
রুহি বললো, তাযিন ভাই এটা কার জন্য? খুব সুন্দর।
নজর দিও না রুহি।
দিলাম না। কিন্তু কার জন্য নিচ্ছেন?
কার জন্য নিচ্ছি বলে তোমার ধারণা?
অবশ্যই গার্লফ্রেন্ড এর জন্য!
এমন ধারণা হওয়ার কি কারণ?
আপনি তো অবিবাহিত, তাই নিলে গার্লফ্রেন্ড এর জন্যই নিবেন।
বান্ধবীর জন্য নেওয়া যায় না? সব কেনো গার্লফ্রেন্ড বা স্ত্রীকে ঘিরে হতে হবে?তাযিন রুহির সম্মুখে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা করলো।
রুহি শরীর দুলিয়ে হেঁসে উঠলো, ছেলেদের বান্ধবী থাকাটা বেমানান তাযিন ভাই।
তাযিন বিরক্ত হয়ে বললো, কেনো? ছেলে বলে বান্ধবী থাকা যাবে না?
না না থাকা যাবে না কে বললো? থাকা যাবে, আমাদের ক্লাসে সাবিহা আর নাজিম খুব ভালো বন্ধু। কিন্তু আমার ভালো লাগে না এই যা।
ওহ তোমার ভালো লাগে না সেটা বলো, আমি তো ভয় পেয়ে গেছিলাম।
কেনো ভয় পেয়েছিলেন?
ছেলেদের বান্ধবী বেমানান বললে যে তাই।
রুহি নিঃশব্দে হেঁসে বললো, তার মানে বান্ধবীর জন্য নিচ্ছেন এটা?
হয়তো। বাদ দাও ওতো জেনে কাজ নেই। বউ বান্ধবী গার্লফ্রেন্ড প্রেয়সী প্রেমিকা, আমার কাছে ওই সব কিছুর সংজ্ঞা এক সুতায় বাঁধা।
সোফিয়া এখনো ঘুমাচ্ছে, তাযিন চেষ্টা করেও ঘুমাতে পারছে না। সে ঘুমাতে পারছে না অথচ তার মা ঘুমাবে এটা হতে দেওয়া যাচ্ছে না।
তাযিন সোফিয়াকে ডাকলো, আম্মু শুনছো?
ভীষণ হালকা ঘুম, ছেলের ডাকে ভেঙে গেলো। শুনছি বল?
আমি বোরিং হচ্ছি একা একা, তুমি ঘুমাচ্ছো!
সোফিয়া বিরক্ত হলো, এতো বড় একটা ছেলে এখনো ছোট বাচ্চাদের মতো জ্বালাতেই থাকে। অনেক গুলো সন্তানের জ্বালানো একটা সন্তান পুষিয়ে দিচ্ছে বলেই সোফিয়ার ধারণা। বোতল থেকে ঢকঢক করে পানি খেয়ে বললো, আর কতক্ষণ লাগবে রে?
আর বেশিক্ষণ না,চলে এসেছি। আচ্ছা আম্মু তুমি কি তোমার বান্ধবীদের সাথে দেখা করতে না পেরে মন খারাপ করেছো?
একটু করেছি।
মিস করছো তাদের?
দেখা হলে, ছেড়ে আসতে হতো তখন বেশি মিস করতাম।এখন ওতোটাও মিস করছি না।
তাযিন বললো, কিন্তু আমি আমার বান্ধবীকে মিস করছি।
সোফিয়া নাক ফুলিয়ে তাকায় ছেলের দিকে, ছেলে মুচকি হাসে। সোফিয়া টের পেয়েছে সব কিছুই। কিন্তু ছেলে মুখ ফুটে সবটা বলে না,আর মা-ও বুঝতে দেয়না সে যে সব বুঝে ফেলছে। ছোট বেলা থেকে পাগলামি দেখে আসছে, না বুঝে উপায় আছে?
তাযিন মায়ের কাঁধে মাথা রাখলো, নরম স্বরে জানতে চাইলো, আচ্ছা আম্মু, নাজেরার আম্মু নেই কেনো?
নেই কে বললো? আছে তো।
সেটা তো ওর নিজের আম্মু না।
মা কি আবার নিজের, পরের হয় বাবা?
হয় তো, এই যে তুমি আমার নিজের আম্মু। বলেই মা’কে আরেকটু জড়িয়ে ধরতে চাইলো তাযিন।
সোফিয়া মৃদু ধমকে উঠে বললো, বাসে বসে আছি বাপ! তুই সব সময় এমন বাচ্চামো করিস কি ভাবে! বেড়াতে গিয়েও শান্তি পাইনি সবাই বলাবলি করছিল সোফিয়া তোর ছেলেটা এখনো বাচ্চাই রয়ে গেলো।।সারাক্ষণ মায়ের আঁচল ধরে থাকে।
আচ্ছা শুনো,নাজেরার আপন মা কোথায়?
মারা গেছে। সোফিয়া কন্ঠ নিচু করে বললো।
কি ভাবে মারা গেলো?
নাজেরার বাবা ছিল তোর আব্বু আর নাসির ভাইয়ের বন্ধু। কিন্তু বন্ধুদের মাঝে থাকে না একজন বখাটে, খারাপ, নেশাখোর। সেটা ছিল নাজেরা বাবা জহির। দেখতে ছিল নায়কদের মতো, খুব সুন্দর। নাজেরার আম্মু রুমা, মায়াবতী মেয়ে। জহির আর রুমা প্রেম করে পালিয়ে বিয়ে করে। বিয়েটা আমাদের বাসায় হয়েছিল। তখন আমাদের একটা মাত্র রুমের বাসায়, আমি আর রুমা খাটে বিছানা করে শুইতাম। তোর আব্বু আর জহিরকে নিচে বিছানা করে দিতাম। দুজনের বড্ড প্রেম ছিল, জহির আদর করে রুমু বলে ডাকতো। হঠাৎ একদিন ভরদুপুরে বাহির থেকে এসে রুমাকে বললো, রুমু কি আছে গোছগাছ করে নেও। রুমা তখন ভাত খাচ্ছিল। জহির ছিল একরোখা স্বভাবের। এখুনি বের হতে বলেছে মানে এখুনি বের হতে হবে। মুখ ফুটে জিজ্ঞেসও করা যাবে না আমরা কোথায় যাচ্ছি? ভাতের প্লেট ফেলে রেখে রুমা বের হয়ে গেলো জহিরের সাথে।
সোফিয়া থামতেই, তাযিন জিজ্ঞেস করলো, কোথায় গিয়েছিল তারা?
তোর আব্বু রাতে এসে দেখলো ওরা চলে গিয়েছে। আমায় জিজ্ঞেস করায় আমি বললাম, জানি না কোথায় গিয়েছে। কিছু তো বলে যায়নি। সে রাতে তোর আব্বুও আমার সাথে রাগ দেখিয়েছে,আমি কেন জানি না তারা কোথায় গিয়েছে সেজন্য। আমি কি করে জানবো বল? আমায় তো বলে যায়নি।
তুমি জানতে চাওনি?
জহিরকে আমার একটু ভয় ভয় লাগতো। নেশা পানি খেতো। চোখ মুখ কেমন লাল হয়ে থাকতো। আমার তখন নতুন নতুন বিয়ে হয়েছে, বরিশাল থেকে তোর আব্বু সাথে করে ঢাকায় নিয়ে এসেছে। হৃদয়ে আনন্দরা পাখা মেলে উড়ছিল নতুন সংসার সাজাবো বলে। এর মধ্যেই তারা এসে বিপত্তি বাঁধালো, সে নিয়ে আমার মনে একটু রাগ ছিল। তাই জহিরের সাথে আমার কথাবার্তা তেমন হতো না। কিন্তু রুমার সাথে কেমন করে যেনো মিলেমিশে গেলাম। রুমা যাওয়ার আগে বুদ্ধি করে আমাদের বাসার টেলিফোন নাম্বারটা লিখে নিয়ে গেলো। পড়াশোনা জানা মেয়ে বুদ্ধি ছিল মাথায়। জহির যখন বাসায় থাকতো না তখন আমাকে ফোন দিতো। প্রথম যেদিন ফোন দিয়েছিল আমি চিনতে পারিনি। বড্ড মধুর স্বরে বলেছিল, আপা আমি। আমি রুমা চিনতে পেরেছেন?
রুমা সেদিন জানিয়েছিল তোর আব্বুর সাথে ওদের নাকি ঝামেলা হয়েছে, তাই আমাদের বাসা ছেড়ে চলে গিয়েছে। নাসির ভাইয়ার সাথে জহিরের সম্পর্ক আরও বেশি ভালো ছিল। রাগটা তোর আব্বুর সাথেই হয়েছিল।
তাযিন অবাক হয়ে মায়ের মুখে সেই গল্পটা শুনছে। এখন তারা একটা পার্কে বসে আছে। পঁচিশ মিনিটের মতো হবে বাস থেকে নেমে গিয়েছে। পার্কটা ভীষণ সুন্দর, কাপলদের তেমন ছড়াছড়ি নেই। মৃদু বাতাস, শরীর ও মন ফুরফুরে করে তুলছে। তাযিন দোকান থেকে কিছু খাবার নিয়ে আসলো।
সোফিয়া আনমনে বলতে লাগলো, আমার বাচ্চার খুব শখ ছিল। বিয়ের অনেক দিন হয়ে যাওয়ার পরেও বাচ্চা হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখতে পেলাম না। এই নিয়ে মন খারাপ চলতো সংসারে। হঠাৎ একদিন রুমা ফোন করে জানালো সে মা হতে যাচ্ছে। খুশীর খবর হলেও আমি তেমন একটা খুশী হতে পারলাম না। মেয়ে মানুষ তো হিংসা চলে আসলো মনে। বিয়ের তিনমাসও হয়নি তাদের অথচ বাচ্চার খবর চলে আসলো অথচ আমাদের বিয়ের তখন সাত মাস চলছে। এরপর আমি আর কখনো রুমাকে ইচ্ছে করে ফোন দেইনি।
দেড়মাস পর টের পাই আমিও প্রেগন্যান্ট। কিন্তু বাচ্চাটা টিকেনি। তোর আব্বু এর আগে কখনো বাচ্চা নিয়ে কিছু বলেনি, কথা শোনায়নি। আমি নিজেই মন খারাপ করতাম কিন্তু সেদিন বাচ্চাটা নষ্ট হয়ে গিয়েছে শুনে আমাকে বলেছিল, সোফিয়া হিংসা করা ভালো কাজ নয়। আমি তোমার চোখে জহিরের স্ত্রীকে নিয়ে হিংসা দেখেছি। এগুলো মন থেকে মুছে ফেলো দেখবে ভালো কিছু হবে।
আমার ভীষণ মন খারাপ হলো, রুমাকে কল দিয়ে ভালো মন্দ খবর নিলাম। কিন্তু তার খবর ভালো আসলো না। ইদানীং জহির গায়ে হাত তুলছে। ঘরে খাবার মতো কিছু থাকে না। কাজকাম কিছু করে না। পানি খেয়ে কাটায়। রুমা অনুরোধ করে বললো, আপা আমার বাচ্চাটাকে তো বাচাতে হবে। আমার একটা চাকরির ব্যবস্থা করা যায় কোনো ভাবে?
রুমা তখন ছয় মাসের প্রেগন্যান্ট। আমি দ্বিতীয় বারের মতো টের পেলাম আমিও প্রেগন্যান্ট, তুই আমার পেটে তখন দুইমাসের। রুমার প্রতি আমার তখন আর কোনো হিংসা নেই। তোর আব্বু আমার অনেক যত্ন-আত্তি করতো। রুমারা তখন মালিবাগ বস্তিতে থাকতো। আমাদের বাসার কাজের খালাও সেখানে থাকতো। খালাকে দিয়ে খাবার-দাবার পাঠাতাম। সে কোনো দিন রুমাকে দিতো, কোনো দিন নিজেই রেখে দিতো।
একদিন খুশীর খবর আসলো রুমা মা হয়েছে। একটা ফুটফুটে মেয়ে বাবু হয়েছে তার। আমার ভীষণ ইচ্ছে হলো আমি বাবুটাকে দেখতে চাই। আমাকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হলো। কেবিন ফাঁকা, রুমা নেই। বাবুটা নাসির ভাইয়ের কোলে চিৎকার করছে। আমি কাছে গিয়ে কোলে তুলতে চাইলাম। তোর আব্বু কোলে নিতে দিলো না। বললো আমি নাকি পারবো না নিতে, অসুবিধা হবে। আমি রুমাকে খোঁজলাম, পেলাম না। জহিরকে খোঁজলাম পেলাম না। তোর আব্বুকে বার বার জিজ্ঞেস করলাম বাবুটার বাবা মা কোথায়? সে কিছু বলে না। চোখের পানি লুকানোর চেষ্টা করে শুধু। আমি বুঝতে পারলাম খবর ভালো না। আমাকে শুনায় না আমি ভয় পাবো তাই। তোর আব্বু আমার হাতটা শক্ত করে ধরে রাখলো যেনো ছেড়ে দিলেই আমিও এমন একটা ফুটফুটে বাবু জন্ম দিয়েই তাকে ছেড়ে চলে যাবো চিরদিনের জন্য।
চারদিকে দুপুরের নিস্তব্ধতা। সোফিয়ার চোখ ভিজে উঠলো। পুরনো দিনের কথা মনে করলে, ক্ষতগুলো নতুন করে জেগে উঠে। তাযিন নির্বিকার। কি বলবে বুঝতে পারছে না।
নাজেরার আম্মু সেদিন মারা গিয়েছিল?
সোফিয়া বললো, হ্যাঁ নার্স জানিয়েছে বাচ্চার মায়ের অতিরিক্ত রক্তশূন্যতা ছিল। জহির যখন শুনলো তার ভালোবাসার রুমা নেই। একটা বাচ্চা রেখে সে না ফেরার দেশে চলে গিয়েছে। সে পাগলের মতো হয়ে গেলো। যতই যাইহোক বড্ড ভালোবাসতো রুমাকে। কিন্তু নিজের খারাপ স্বভাবও ছাড়তে পারতো না। মেয়েকে ছুঁয়েও দেখলো না। নাসিরকে বলে গেলো, এই মেয়েকে নিয়ে আমি বাঁচতে পারবো না নাসির। রুমার কাছে চলে গেলাম আমি। তুই মেয়েটাকে দেখে রাখিস।
জহির রেললাইনে ঝাপ দিয়ে সুইসাইড করলো। নাসির উদ্দীন নাজেরাকে ঘরে নিয়ে গেলো। জামিনা মেনে নিতে নারাজ। তাহির তখন বুঝদার ছেলে, বাবুটাকে কোলে নিয়ে বললো, এটা আমার বোন আম্মু। রেখে দেন ওরে। জামিনা রাখতে রাজি না। হাজেরাকে টেনে এনে বললো, এই যে তোমার বোন আছে। আর বোনের দরকার নেই।
আমি তো প্রেগন্যান্ট চাইলেও এই দুধের বাচ্চাটাকে লালন-পালন করতে পারতাম না৷ তোর আব্বু আমাকে নিয়ে খুব ভয়ে থাকতো। রেস্টে রাখতো। অনেক বুঝিয়ে জামিনা ভাবির কাছে নাজেরাকে রাখা হলো। তাছাড়া জহির শেষ বারের মতো নাসিরকে এই মেয়ের দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিল। নাজেরা চারমাস পঁচিশ দিনের দিনে তুই জন্ম নিলি। তারপর,,, তারপর কিছু দিন একটু বড় হওয়ার পর তোদের দুটোকে আমিই পেলেপুষে বড় করলাম। জামিনা ভাবি তো কেবল মায়ের পার্ট নিয়েছে। তাও ওতোটুকু করেছে যে আলহামদুলিল্লাহ।
তাযিন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো, তার মানে নাসির আঙ্কেলও নিজের বাবা না!?
না, কিন্তু নিজের মেয়ের চেয়েও বেশি আদর করে রাখেন।
তাযিনের খুব কান্না পাচ্ছে, মেয়েটা এতোটা একা এই পৃথিবীতে। তার আপন বলতে কেউ নেই, কেউ না।
চলবে………
#মরিচীকা
#পর্ব ১৮
#মাকামে_মারিয়া
সুন্দরী মেয়েদের মাথায় যে গোবর থাকে সেটা এই কয়দিনে নিহাল টের পেয়েছে। তার তো মনে হয় সুন্দরী মেয়েদের বাবা মা ভাই বোন আত্নীয়স্বজনদের মাথায়ও গোবর থাকে। অবশ্য সে নিজেও এই সুন্দরীর আত্মীয় কিন্তু সেটা মানতে ইচ্ছে করে না। আবার এখন তো শুধু আত্মীয়-ই নয় সে তার স্ত্রী, স্ত্রী জাহেরা। যে কিনা বাসর রাতে আবেগে ভেসে কান্নাকাটি করে সকাল এগারোটায় ঘুম থেকে উঠেছিল। বাসার লোকজন তো মহাখুশি, এতো কিছু হয়ে যাওয়ার পরে যদি গোয়ালের পাগলা গরুটা শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকে এতে তো খুশী হওয়ারই কথা,পরিবেশ শান্তশিষ্টও থাকে।
নিহাল পালিয়ে যেতে চেয়েছিল। চেয়েছিল কোথাও চলে যাবে, এমন কোথাও যেখানে চেনাজানা কেউ থাকবে না। দূরের কোনো দেশে। কিন্তু সে পারলো না। ফয়জুল হাকিমের চোখ ফাঁকি দেওয়া কোনো ভাবেই সম্ভব না। মৃত্যু ছাড়া তার হাত থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না। এখন তো এতো কঠোর ভাবে চোখে চোখে রাখছে যেনো সে পালিয়ে যাবে তো দূর থাক, চাইলেও নিজেই নিজেকে মেরে ফেলতে পারবে না। মেয়ের বাবার এতো তদারকি অথচ মেয়ের কোনো হেলদোল নেই। সে তার ঘুম আর স্কিন কেয়ার নিয়ে আছে। তাতে অবশ্য নিহালের কোনো যায় আসে না। কোনো সুন্দরীকে এ ভাবে প্রত্যাখান করা যায় সেটা জাহেরাকে বিয়ে না করলে বুঝতে পারতো না। মেয়েটার প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ আসে না। দেখলেই পায়ের রক্ত মাথায় এসে টগবগ করতে থাকে।
জাহেরা গুনগুন করে গান গাচ্ছে আর রেডি হচ্ছে। নুরজাহান একপ্রকার জোর করেই আজকে তাদের বাড়িতে দাওয়াত দিয়ে গিয়েছে। নিহাল যাবে না বলেও কোনো লাভ হলো না। যেতে তাকে হবেই। নতুন বিয়ে করলে বউ নিয়ে আত্নীয়দের বাসায় বেড়াতে যেতে হয়। এই নিয়মের বাহিরে চাইলেও নিহাল যেতে পারলো না। আজকে তাদেরকে যেতে হবে চাঁপা কুঞ্জে। সাথে ফয়জুল হাকিম, রোকাইয়া বেগম, আর দু’জন কাছের কর্মচারীও যাবে। নিহাল বসে আছে বারান্দায়, সকাল বারোটা বাজে। সবাই মুটামুটি রেডি হয়ে গিয়েছে। শুধু জাহেরার সাজসজ্জা এখনো বাকি। নিহাল বসে বসে পা নাচাচ্ছে। ইচ্ছে করছে ড্রেসিং টেবিলের সামনে রংঢং করা মেয়েটার গালে থাপ্পড় লাগিয়ে দিতে। জাহেরাকে থাপ্পড় মারা প্রিয় কাজ হয়ে গিয়েছে। নিয়ম করে দুটো তিনটে থাপ্পড় দিতে না পারলে শান্তি লাগে না। মেয়েটাও হয়েছে বেহায়া আর নির্লজ্জ তার কাছে থাপ্পড় যেনো পান্তা-ইলিশ। থাপ্পড় খেতে খেতে এতোটাই বেহায়া হয়ে গিয়েছে যে এখন আর কান্না করে না। থাপ্পড় খেয়ে হিহি করে হাসে। নিহালের মেজাজ তখন আরও খারাপ হয়ে যায়।
সেদিন রাতে জাহেরা এসে ডাকলো, নিহাল ভাই চলো আম্মু খেতে ডাকছে।
নিহালের কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না। নাজেরাকে ইদানীং বড্ড মনে পড়ে। মেয়েটা সব রকম যোগাযোগের রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে। খুব করে ইচ্ছে করছে কেমন আছে জানতে! মনে অভিমানও জমেছে, অভিমানী মন বার বার আওড়াচ্ছে, শ্যামলি! তুমি কেমন আছো সেটা তো জানতে দিলে না। অন্তত আমি কেমন আছি সেটাও কি তোমার জানতে ইচ্ছে করে না? ভুলে গেলে তবে আমাকে?
জাহেরা নিহালের চুল টেনে বললো, আরেহ আসো না আম্মু ডাকছে।
নিহাল বসা থেকে তড়িৎ গতিতে উঠে গিয়ে জাহেরা গালে দিলো একটা থাপ্পড়।
জাহেরা গালে হাত রেখে ঠোঁট উল্টে বললো, একটা থাপ্পড়ে পেট ভরছে না নিহাল ভাই। আমার অনেক খিদে পেয়েছে। চলো খাবে। আম্মু বলছে স্বামীকে ছাড়া যেনো না খেয়ে নেই। কি মুশকিল বলো তো!
নিহালের ইচ্ছে করলো চিৎকার করতে। এ কেমন মেয়ে ভাই! কি পরিমাণে নির্লজ্জ!
তারপর দিন নিহাল কাজের বাহানায় সারাদিন বাহিরে রইলো। বাসায় আসতে ইচ্ছে করে না। বাসায় থাকলেই মেয়ের বাবা মা সমানে জামাই আদর করতে থাকে। তার এসন হজম হয়না। আর এদিকে মাথা খাওয়ার জন্য তাদের পাগলা মেয়ে তো আছেই। তাই কাজের বাহানা দিয়ে বাহিরেই সন্ধ্যা হয়ে গেলো। পাশের গলির ছোট চিপাগলিতে জিম মেরে বসে রইলো। ল্যাম্পপোস্টের আলো চোখে লাগছে। চোখ জ্বালা করছে, মনও কেমন জ্বলছে যেনো। বিষন্ন লাগছিল। ফোনটা বের করলো, নাজেরার একটা হাসিমুখের ফটো ফোন স্ক্রীনে ভেসে আছে নিহাল অনেকটা সময় ধরে ফটোটার দিকে তাকিয়ে রইলো। এই ফটোটা সেন্ট করা নিয়ে কত কাহিনি হলো। নিহাল আবদার করে বলেছিল, একটা ফটো দিবে?
নাজেরা বলেছিল, ফটো কেনো?
দেখবো তোমায়।
আমি তো কাছাকাছিই বাস করি নিহাল সাহেব! প্রতিদিন দেখা হয় আমাদের।
নিহাল বললো, হুটহাট যখন দেখতে মন চায় তখন কোথায় পাবো তোমায়? এই যেমন গভীর রাতে দেখতে মন চাইলে? চলে যাবো তোমার রুমের বারান্দায়? গিয়ে টুকা দিয়ে বলবো কি? শ্যামিলি একটু এদিকে আসো তো চট করে তোমাকে দেখেই চলে যাবো। আসবে তখন?
নাজেরা হাসতে হাসতে বলেছিল, এই না না! একদমই এসব করবেন না। আমি এখুনি দিচ্ছি ফটো।
নিহালের চোখ জ্বলছে। কে জানতো এই মেয়েটাকে হারিয়ে ফেলবে সে! মনে হচ্ছে এখুনি কান্না করে দিবে। ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠল। নাজেরার ফটো ঢেকে গিয়ে জাহেরার ফটো ভেসে উঠল। সাথে সেভ করে রাখা সেই নাম, জিরাফ! বিয়ের আগে জিরাফ ডাকলে বেশ ক্ষেপতো সে। নামটা তো এখনো চেঞ্জ করা হয়নি। ইচ্ছে করছে এখুনি চেঞ্জ করে দিতে। চেঞ্জ করে কি দিলে উচিত হবে সেটা বুঝতে পারলো না। কল রিসিভ করে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে জাহেরা বলেছিল, নিহাল ভাই! আছেন? নিহাল ভাই?
নিহাল একটা ধমক দিয়ে বললো, প্রতি নিঃশ্বাসে ভাই ডাকতে কে বলছে তোকে!
জাহেরা দুষ্ট স্বরে বললো, ভাই ডাকবো না তাহলে? স্বামী ডাকবো? নাকি শুধু নিহাল ডাকবো?
বাজে না বকে কেনো কল করেছিস সেটা বল?
সারাদিন তুমি বাসায় ছিলে না। দ্রুত বাসায় আসো।
নিহালের কথা বাড়াতে ইচ্ছে করলো না তাই কিছু না বলেই কলটা কেটে দিতে নিবে ওমনি জাহেরা আবার বললো, শুনো না, দ্রুত আসো। তোমার হাতের থাপ্পড় খাইনি আজকে। আমার কেমন জানি হাসফাস লাগছে। মনে হচ্ছে কিছু একটা অনিয়ম হয়ে গিয়েছে। আমার খাবার হজম হচ্ছে না। তোমার হাতের থাপ্পড় খেলে আমার স্কিন টোন ব্রাইট হয়। তোমার হাতে যাদু আছে বুঝলে!
নিহালের মনে হলো এই মেয়েটাকে সামনে পেলে এখুনি ধরে বেঁধে পাগলাগারদে রেখে আসতো। জ্বালিয়ে মারছে একপ্রকার।
তাযিন বাসায় ফিরেছে একদিন হয়ে গেলো। কিন্তু নাজেরার দেখা পেলো না। ওদের বাসায় একবার গিয়েছে ভীষণ আগ্রহ নিয়ে। ভেবেছে গিয়েই একটা সারপ্রাইজ দিবে। কিন্তু সে নিজেই সারপ্রাইজ হয়ে গিয়েছে। টিয়া আর নাজেরা দুটোই বাসায় নেই। নাজেরা টিয়াকে সাথে নিয়ে বের হয়েছে কিন্তু কোথায় গিয়েছে সেটা বাসার কেউ জানে না৷ জামিনাও আজকাল তেমন একটা আগ্রহ দেখাচ্ছে না মেয়েটার প্রতি। ভাবছে যেথায় খুশী যাক!
নাজেরা বসে আছে বড় বটগাছ তলায়। এলাকার ঠিক পূর্ব পাশেই বটগাছটা নদীর ধারে। তীব্র বাতাস এখানে। বাতাস যেনো নিজেকেই উড়িয়ে নিয়ে যাবে ওরকম অবস্থা হয়ে যায়। ইদানীং বার বার এখানে আসা হচ্ছে, খুব ছোট বেলা তাযিনের সাথে একবার মাত্র এখানে এসেছিল সে। তখন ওরা ক্লাস সেভেনের স্টুডেন্ট। স্কুল ফাঁকি দিয়ে বটগাছ তলায় এসে বসে রইলো। সোফিয়া ছেলেকে খোঁজতে খোঁজতে হয়রান। পরে জানতে পারলো এখানে এসে বসে আছে। এখানে এসে বসে থাকার কারন উদ্ধার করলো। রাজিব স্যারের পড়া শিখেনি, স্যার খুব মারে। সোফিয়া বললো, আমি তো তোমাকে সন্ধ্যায় পড়া শিখিয়ে দিয়েছিলাম।
চটপটে তাযিন এক সেকেন্ডও না ভেবে বলেছিল, নাজেরা তো পড়া শিখেনি। ওর শরীর ভালো না দেখো গায়ে কত্ত জ্বর।
সোফিয়া কিছুটা বিরক্তই হয়েছিল। এই মেয়ের জন্য নিশ্চয়ই ছেলের পড়াশোনার ঘাটতি মেনে নিবেন না।
চারপাশে মানুষের আনাগোনা। বিভিন্ন ধরনের, বিভিন্ন পেশার মানুষজনের যাতায়াতের পথ। নাজেরা আনমনে বসে আছে। টিয়াপাখির খাঁচাটা পাশেই রাখা। টিয়ার দিকে তাকিয়ে নাজেরা স্মিত হেসে বললো, টিয়া তোর মন ভালো?
টিয়া নেচে-কুঁদে বললো, মন ভালো, মন ভালো।
নাজেরার বড্ড হাসি পায় টিয়ার কন্ঠস্বর শুনলে। কি সুন্দর নেচে নেচে আনন্দে ভেঙে ভেঙে কথা বলে। নাজেরা হেঁসে বললো, আমারও মন ভালো। জানিস সত্যি মন ভালো। একটুও মন খারাপ লাগছে না।
টিয়া আবার নেচে উঠে বললো, মন খারাপ, মন খারাপ।
নাজেরা দুইদিকে মাথা নেড়ে বললো, না না! মন ভালো আমার। তোর মালিক এসেছে জানিস?
টিয়া নিজ থেকে তেমন কিছু বলতে পারে না। তার সাথে যেটা বলা হয় সে সেটাকেই রিপিট করে। তাই তো আবার রিপিট করলো, মালিক মালিক!
নাজেরা বললো, তোর দুষ্ট মালিক! তাযিন সারওয়ার! একদিন হয়ে গেলো বাসায় আসছে। আমি লুকিয়ে ছিলাম। এই যে এখানে লুকিয়ে আছি। তুই কি ভাবছিস বাড়িতে মেহমান আসবে। নিহাল আর তার বিয়ে করা বউ আসবে তাই এখানে এসে লুকিয়ে বসে আছি? মোটেও না বুঝলি! তোর মালিকের থেকে লুকিয়ে বসে আছি। আমি চাই তোর মালিক আমায় খোঁজে বের করুক। খুব করে চাই।
টিয়া বললো, খোঁজে বের করবে, খোঁজে বের করবে।
চলবে…..!
