#মরিচীকা
#পর্ব ১৫
#মাকামে_মারিয়া
নিয়তি কাকে কখন কি ভাবে ঠকিয়ে দেয় সেটা কেউ আগে থেকে আন্দাজ করতে পারে না। গতরাত ভোরে জাহেরা পালিয়ে গিয়েছিল কামরান হায়দারের সঙ্গে। আজ সন্ধ্যা রাতে বিয়ে হয়ে গেলো নিহালের সাথে। জাহেরার বিবেক বুদ্ধি কমই বলা চলে, বয়সও তো অল্প। বাবা মায়ের মতে মেয়ে এখনো মেট্রিক পাশ করেনি। তার আর কি বুদ্ধি হবে?
ক্লাস সেভেন থেকেই পাড়ার ছেলেদের দ্বারা খুব ডিস্টার্বড হতো জাহেরা। ছোট থেকে সুন্দরী হওয়ায় কারো চোখ এড়াতে পারেনি। নিজেও খুব চঞ্চল স্বভাবের হওয়াতে সবাই বেশ সুযোগ পেয়ে যেতো ডিস্টার্ব করার। ফয়জুল হাকিম বড্ড চিন্তায় ছিলেন এই মেয়েকে নিয়ে। একে তো দিনকাল ভালো না তারউপর মেয়েটাও হয়েছে উড়নচণ্ডী। ভেবেছিল মেট্রিক পরিক্ষা দিতে পারলেই নিহালের সাথে বিয়ে করিয়ে দিবে। নিহাল বিয়ের পর পড়াশোনা করালে সেটা তার খুশী তখন নিশ্চয়ই আর মেয়েকে নিয়ে উনার এতো চিন্তা করতে হবে না। যার বউ সে চিন্তা করবে। কিন্তু তার ভাবনায় জল ঢেলে দিয়ে মেয়ে যে আগেই কোনো ছেলের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পালিয়ে যাবে সেটা কে জানতো? তাও কামরান হায়দারের মতো একটা বখাটে ছেলের সঙ্গে?
নুরজাহান বোনকে খুব আদর করে। জাহেরার পাশে বসে জিজ্ঞেস করলো, কামরান হায়দারকে তোর পছন্দ হলো কি ভাবে শুনি? তুই ওর সাথে কি ভাবে পালিয়ে যাস? আশ্চর্য লাগছে।
জাহেরা চোখ রাঙিয়ে বোনকে জবাব দেয়, বাজে কথা বলবে না আপু। হায়দার খুব স্মার্ট ছেলে।
নুরজাহান হেঁসে ফেলে, সুন্দরীদের চয়েস খারাপ শুনেছিলাম। তোকে দেখে সেটার প্রমাণ পেয়ে গেলাম। তোর তো রুচিই খারাপ।
জাহেরা কিছুটা উত্তেজিত স্বরে বললো, হ্যাঁ তোমাদের চয়েস তো খুব ভালো তাই তো ওই জানোয়ারটার সঙ্গে আমাকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিলে। আমি থাকবো না ওর সাথে দেখো। আমি আবার পালিয়ে যাবো হায়দারের সঙ্গে।
নুরজাহান বোনকে কখনো ধমক দেয়নি। বেশ আদরের কিনা। কিন্তু এবার মৃদু ধমকে উঠে বললো, সেটআপ জাহেরা। কই হায়দার আর কই নিহাল। আসমান জমিন পার্থক্য। কাকে কার সাথে মিলাচ্ছিস? তুই এখনো ছোট ম্যাচিউরিটি আসলে বুঝতে পারবি হিরে পেয়েছিস।
তোমাদের হিরে তোমরা রেখে দিচ্ছো না কেনো আপু? আমার ঘাড়ে তুলে দিলে কেনো?
ঠিক সেই মূহুর্তে নিহাল রুমে প্রবেশ করে গর্জে উঠে বললো, আমাকে তোর ঘাড়ে তুলে দেয়নি, তোর মতো একটা নর্দমাকে আমার ঘাড়ে তুলে দিয়েছে। নুরজাহানের দিকে তাকিয়ে বললো, তোমার বোন যেনো আমাকে চোখ রাঙিয়ে কথা না বলে সর্তক করে দাও। না হয় আমি ওর চোখ তুলে ফেলবো।
নুরজাহান আশ্চর্য হয়ে গেলো। দুটোর সম্পর্ক যে এতো খারাপ সেটা তো আগে খেয়াল করেনি। এদের ভবিষ্যৎ আসলে কি? নুরজাহান বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালো। নিহালের কাছে এসে দাঁড়িয়ে জাহেরাকে শুনতে না দিয়ে ফিসফিস করে বললো, সাবধান নিহাল! আমার বোনের যেনো কিছু না হয়।তাকে বকাঝকা করবা না। বোনটা কিন্তু আমার,এই নুরজাহান হাকিমের। ভালো খারাপ যাই হোক তুমি কিন্তু তাকে কবুল করেছো সাথে তার সমস্ত কিছুকেও। অতএব হজম করতে হবে।
নুরজাহান চলে গেলো, নিহাল দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছে। চোখ দুটো থেকে আগুন ছিটকে পড়ছে । নিয়ম অনুযায়ী আজ তাদের বাসর রাত। এখন রাত দশটা চুয়াল্লিশ বাজে। নিহালের গায়ে একটা ঘামে ভেজা সাদা শার্ট, তাকে দেখে নতুন বর লাগছেই না। তবে জাহেরাকে বউ লাগছে। তার সাজসজ্জা বউয়ের মতোই। হবে নাই বা কেনো? সে বউ সেজেই কাজি অফিসে গিয়েছিল কামরান হায়দারকে বিয়ে করতে। সেখান থেকে তুলে এনেই তো নিহালের সাথে বিয়ে দেওয়া হয়েছে।
দেখো কেমন নির্লজ্জের মতো বউ সেজে বসে আছে।
খাটে বসে থাকা জাহেরার দিকে তাকিয়ে বিরবির করতে করতে নিহাল একটু এগিয়ে আসলো। জাহেরা এমন আগুন চেহারা দেখে ভয় পাচ্ছে মনে মনে।
নিহাল এগিয়ে এসে জাহেরার মাথা থেকে ঘোমটা দেওয়া ওড়নাটা একটানে খুলে ফেললো। রুমের ফ্যান চালিয়ে দিলো ফুল স্পিডে যেনো রুমের শব্দ বাহিরে না পৌঁছায়। বসে থাকা জাহেরাকে বিছানা থেকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে ঠাস করে দুই গালে দুটো থাপ্পড় লাগিয়ে দিলো। থাপ্পড় দুটো এতোটাই জোরসে দিয়েছে যে বেচারি জাহেরা ফ্লোরে লুটিয়ে পড়ছে।
লুটিয়ে পড়ে থাকা জাহেরার চুলের মুঠিতে ধরে নিহাল বজ্র কন্ঠে বললো, তোর খুব শখ না বিয়ে করার? তোর ভাতারের সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিস বিয়ে করতে। তোর মতো একটা বেয়াদব মেয়েকে আমার গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছে তোর বাপ আবার তোর মুখে বড় বড় কথা আসে কি ভাবে? তোর তো লজ্জায় মুখের সাউন্ড অফ হয়ে যাওয়ার কথা।
জাহেরা কিছু বলতে নিবে ওমনি নিহাল মেয়েটার মুখ চেপে ধরে বললো, একদম চুপ! কোনো সাউন্ড করবি না। তোর নিঃশ্বাসের শব্দ টুকুও আমি শুনতে চাই না। আমি ঘৃণা করি তোকে, তোর সমস্ত কিছু’কে। থুথু ফেলি তোর ছায়া’কেও।
জাহেরা অস্পষ্ট স্বরে বলে উঠলো, নিহাল ভাই!
নিহাল হাঁপাতে হাঁপাতে ফ্লোরে বসে পড়লো। দুজনেই হাঁপাচ্ছে। জাহেরার চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। গালে এতো জোরে চেপে ধরেছে, আর এতো শক্তি দিয়ে থাপ্পড় মেরেছে যে ঠোঁট ফেটে রক্ত পড়ছে। নিহাল হাঁপাতে লাগলো, চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। রুমে শুধু ফ্যানের শব্দ হচ্ছে, দুটো মানুষের নিশ্বাসের শব্দও শুনা যাচ্ছে না। নিহাল ফুপিয়ে উঠলো, কান্নাভেজা কন্ঠে আফসোসের স্বরো শুধালো, কেনো করলি জাহেরা? কেনো? কেনো এমন বোকামি করলি? তোর বোকামির জন্য আমার জীবনটা নরক হয়ে গেলো। আমার স্বপ্ন, আমার আশা, আমার ভালোবাসা সব শেষ। তুই আমাকে ধ্বংস করে দিলি মেয়ে।
জাহেরা নিজের কান্না থামিয়ে নিহালের দিকে তাকিয়ে রইলো। এই ছেলেকে কখনো কান্না করতে দেখেনি। আজ কিনা সে কান্না করছে? বাচ্চাদের মতো ফুপিয়ে কাঁদছে লোকটা। জাহেরার মনের ভেতর বিরাট এক পরিবর্তন চলে আসলো। এই বয়সের মেয়েদের মন আষাঢ় মাসের আকাশের মতো হুটহাট পরিবর্তন হয়।
নিহালের মতো একজন ম্যাচিউর পুরুষ মানুষ এ ভাবে কান্না করছে। ব্যাপারটা খুব সহজে নেওয়া গেলো না। জাহেরা কি করবে বুঝতে পারলো না। নিহালকে শান্তনা দেওয়া দরকার? কিন্তু কি ভাবে শান্তনা দিবে? এদিকে নিজেকেও শান্তনা দিতে হতো কিন্তু নিহালের কষ্টের কাছে নিজের কষ্টটা ঠুনকো লাগছে।
নিহাল চলে গেলো বারান্দায়। সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ছে গ্রিলের ফাঁকে। বাবা মা কে হারানোর পর যে ব্যথা পেয়েছিল আজ আরও একজনকে হারিয়ে ঠিক সেই ব্যথা অনুভব করছে। মনে হচ্ছে পুরনো ক্ষত নতুন করে জাগ্রত হয়েছে। পকেট থেকে ফোনটা বের করে সাইড বাটনে চাপতেই মিষ্টি মুখের হাসিটা ফুটে উঠলো। কি ভীষণ মিষ্টি করে হাসতো মেয়েটা। নিহাল সেই হাসি কেড়ে নিলো। নিজেকে খুনি মনে হচ্ছে। নাজেরা অনেক গুলো কল দিয়েছে। কিন্তু কোনো টেক্সট করেনি হয়তো মুখ থেকে শুনতে চায় সবটা। কিন্তু নিহাল কি ভাবে বলবে সে অন্য কাউকে বিয়ে করে ফেলছে?
নাজেরা বিছায় কাঁথা গায়ে দিয়ে শুয়ে কাঁপছে। শরীর কেঁপে জ্বর এসেছে মেয়েটার। মালেকা পাশে বসে আছে। নাজেরা অস্পষ্ট স্বরে কিছু বলছে সেটাই শুনার চেষ্টা করে যাচ্ছে। খুব সম্ভবত নিহালের নাম জপে। নাজেরার ফোনটা বেজে উঠলো। মালেকা তড়িঘড়ি করে রিসিভ করলো,কানে দিয়ে জিজ্ঞেস করতে লাগলো, হ্যালো কে? কে আপনে?
মালেকা ফোনকলের অপেক্ষায় ছিল। সে ফোনের সিস্টেম বুঝেনা, বুঝলে কাউকে কল করে মেয়েটার শরীর খারাপের কথা জানাতো। কল পেয়ে ভাবলো অন্তত একজনকে জানাতে পারলেই তো হবে। তাই বার বার উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করতে লাগলো, কে? কে আপনে?
নিহাল বুঝতে পারলো না এটা কার কন্ঠস্বর। মালেকার সম্পর্কে সে অবগত না। জিজ্ঞেস করলো, নাজেরা? নাজেরা নেই?
মালেকা যেনো মরুভূমিতে পানির সন্ধান পেলো। হাঁপিয়ে উঠে বললো, হা হা আছে তো। নাজেরা আম্মার শরীল অনেক খারাপ। আপনি কি কাউরে খবর দিতে পারবেন? আপনেরে তো চিনলাম না, যাইহোক বন্ধু টন্ধু হইবেন হয়তো।
নিহাল আঁতকে উঠল, কি হয়েছে? নাজেরা ঠিক আছে তো?
ঠিক নাই। হঠাৎ কি হইলো খাঁড়াই ছিল, নিচে পইড়া গেছে। পানি দিয়া হুঁশ ফিরাইলাম। এখন তো শরীর কাইপা জ্বর আইছে। বাড়িত কেহ নাই আমার কেমুন জানি ডর লাগতাছে সাহেব।
নিহাল ফোনটা কানে রেখেই বারান্দা থেকে বের হয়ে রুমে আসলো। জাহেরা ফ্লোরে নাকি বিছানায় সেদিকে তাকিয়েও দেখলো না। দ্রুত বাসা থেকে বের হয়ে গাড়ি নিয়ে রওনা দিলো নুরজাহানের শশুর বাড়ি অর্থাৎ নাজেরাদের বাড়িতে।
রাত বারোটা নাগাদ ঔষধপত্র নিয়ে হাজির হলো,মুখে মাক্স,মাথায় কালো ক্যাপ মালেকা দেখলে চিনে যেতে পারে সে জন্য এমন ভাবে এসেছে। ভুল করেও নিহাল আসতে পারে সেটা সন্দেহ করবে না কারণ উনি জানে বেচারার আজকে বিয়ে। বাসর রাত ফেলে এখানে আসবে কোন দুঃখে!
মালেকা দরজা খুলে দিলো, ফোনেই লোকটা বলেছিল সে আসতেছে তার বাসা কাছেই, সে নাজেরার কলেজের বন্ধু হয়।
নিহাল দোতলার ঘরে চলে আসলো,মালেকা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। ছেলেটা এমন ভাবে দৌড়ে যাচ্ছে মনে হচ্ছে কতদিনের চেনা এই ঘরদোর। জ্বরের তাপে নাজেরা শ্যামকালো চেহারাটা লালচে হয়ে গেলো। তিতকুটে লাগছে যেনো। মেয়েটা কাঁপছে। নিহাল পাশে বসলো নাজেরার মাথায় হাত বুলাতে গিয়ে আঁতকে উঠল। মনে হচ্ছে আগুনে হাত রেখেছে, জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে সে। নাজেরার মনে হলো বহু পরিচিত কারো স্পর্শ পেয়েছে। যে পুরুষের প্রথম স্পর্শে কেঁপে উঠেছিল সেই পুরুষের স্পর্শে দ্বিতীয় বারের মতো কাঁপুনি থেমে গেলো। নাজেরা চোখ খুলার চেষ্টা করে বিরবির করে আওড়ালো, নিহাল? আপনি এসেছেন?
নিহালের চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। এতোটা অসহায় ভাবে দেখতে হলো মেয়েটাকে! এই ছিল তবে নিয়তিতে? মালেকা রুমে চলে আসলো। নিহাল বাহান দিয়ে মহিলাকে দূরে রাখতে বললো, আপনি গরম পানি করে নিয়ে আসুন আমি ঔষধ খাইয়ে দিচ্ছি।
মালেকা চলে গেলো। নাজেরার মাথাটা নিজের কোলে রেখে হাতটা দিয়ে সারাটা মুখ মুছে দিলো। মালেকাকে জিজ্ঞেস করা হয়নি রাতে কিছু খেয়েছে কিনা। নিজের সাথে আনা কেক থেকে একটু খাইয়ে দিলো জোর করেই। এরপর ঔষধ খাওয়াতে গেলে নাজেরা খেতে চাইলো না। নিহাল বললো, ঔষধ না খেলে আমাকে দেখবে কি ভাবে? চোখ খুলতে তো পারছো না। ঔষধটা খেয়ে নেও। নাজেরা ঔষধ খেয়ে নিলো। কিছু মানুষের সঙ্গ পেলে রোগ সেরে উঠে। নাজেরা চোখ খুলে নিহালের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ছেড়ে দিলো। ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করলো, সত্যি বিয়ে করেছেন?
নিহাল কিছু বলতে পারলো না। চুপ করে তাকিয়ে আছে। নাজেরা ফের জিজ্ঞেস করলো, আমাকে বিয়ে করবেন বলেছিলেন না নিহাল? মিথ্যা বলেছিলেন?
নিহাল কি বলবে বুঝতে পারছে না। নাজেরার মাথাটা ধরে রাখা হাতটা কাঁপছে। নাজেরা আবারও বললো, তিনমাস তেইশ দিনের প্রেম আমাদের। ব্যস এতোটুকুই ছিল আমাদের পথচলা? এতো স্বল্প? আরেকটু দীর্ঘ হলে কি এমন ক্ষতি হতো?
তুমি আমার নসিবে নেই শ্যামলি! তোমাকে নিজের করবো কি ভাবে বলো?
নাজেরা আরও কিছু বলতে চেয়েও বললো না। অনেকটা সময় চোখ বন্ধ করে চুপ করে রইলো। এর মধ্যে মালেকা আসলো, গেলো, আবার কোনো কিছুর বাহানা দিয়ে কিচেনে পাঠালো। নাজেরা মনে করার চেষ্টা করলো সেদিনের কথা। যেদিন প্রথমবারের মতো নিহাল তাকে স্পর্শ করেছিল, হাতে হাত রেখে।
নরম স্বরে জিজ্ঞেস করেছিল, শ্যামলি একটা অন্যায় আবদার করবো যদি তুমি রাগ না করো।
ওরা তখন রেস্টুরেন্টের কোণার সিটে বসে কফি খাচ্ছে। নাজেরা শুনেছে প্রেম ভালোবাসার সম্পর্কের ক্ষেত্রে ছেলেমেয়েদের নিষিদ্ধ চাহিদা থাকে। এগুলো সে খুব ভয় পায়, এড়িয়ে চলতে চায়। এতোদিন প্রেম না করার এটাও একটা কারন। নাজেরা ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, কি আবদার?
নিহাল মাথা চুলকিয়ে বলেছিল, তোমার হাতটা একটু ধরবো?
নাজেরা ফিক করে হেঁসে দিয়ে মূহুর্তের মধ্যেই হাতটা এগিয়ে দিলো নিহালের সামনে। নিহাল হাতটা সযত্নে ধরে বুকের বা পাশটাতে চেপে ধরে বলেছিল, তুমি আমার এখানে থাকো শ্যামলি। এখানটার মালিকানা একমাত্র শ্যামলির।
নাজেরা ভাবনা থেকে বের হলো, নিহালকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে, নিহাল আপনার বুকের বা পাশটার মালিকানা কি অন্য কেউ পেয়ে গেলো?
মুখ ফুটে কথা বলতে পারেনি ঠিক কিন্তু ওর চাহনিতে বোধহয় নিহাল কিছুটা বুঝে গেলো। নাজেরার হাতটা দ্বিতীয় বারের মতো টেনে নিয়ে বুকের বা পাশে চেপে ধরে বললো, তুমি আমার নসিবে ছিলে না, কিন্তু এখানে আজীবন থাকবে। আমি তোমাকে এখানে কবর দিলাম।
নাজেরা কাঁদছে। নিহালের ফুপানোর শব্দ শুনা যাচ্ছে। ধরে রাখা হাতটা টেনে এনে মুখ ফিরিয়ে নিলো নাজেরা। শেষ বারের মতো অভিমানী কন্ঠে বললো, আপনার বউ অপেক্ষা করছে নিহাল। আপনি চলে যান। বউয়ের সাথে অন্যায় করবেন না কখনো না। এটা আমার অনুরোধ।
নিহাল উঠে দাঁড়ালো। নাজেরাকে শেষ বারের মতো দেখতে দেখতে দরজার কাছে এসে থামলো। মালেকাকে ডেকে বললো, খালা নাজেরাকে দেখে রাখবেন।
মালেকা হাসি দিলো ঘাড় কাত করে বললো, হ দেখমু। আপনেরে ধইন্যবাত সাহেব। বড় উপকার করলেন। বাড়িত তো কেহ নাই। সবাই বিয়া খাইতে গেছে। মাইয়াডারে একা ফালাই গেছে। এডা কুনু কাম হইলো কন তো!
নাজেরা নাক কুঁচকে নিলো। মালেকাদের মতো মহিলাদের একটা অভ্যাস হলো যাকে পায় তার কাছেই গসিপ করতে থাকে। এগুলো নিহালকে বলে কি হবে! দুঃখের অভিযোগ করতে হয় আপন লোকদের কাছে। নিহাল তো আপন না, সে দূরের মানুষ। খুব দূরের।
চলবে……..
#মরিচীকা
#পর্ব ১৬
#মাকামে_মারিয়া
তিনদিন পর হোম ডেলিভারিতে একটা পার্সেল আসলো। নাজেরার জ্বর কমেনি। নুরজাহান বাপের বাড়ি থেকে ফিরেনি। জামিনা ছাঁদে ছিল। নাজেরার হয়ে আজকে কাজগুলো কিছু করে দিচ্ছে। কি জানি কেন হঠাৎ মায়া হলো। মেয়েটা দিনভর শুয়ে আছে কিন্তু বকা দিচ্ছে না। মালেকার ধারণা নাসির উদ্দীন কড়া স্বরে স্ত্রীকে শাসিয়েছে। একে তো মেয়েটাকে ছাড়া ভাইয়ের মেয়ের বিয়ে খেতে চলে গিয়েছে, তারউপর মেয়েটা অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। আপন মা হলে পারতো এসব?
তাহির বাসায় ছিল। আজকে দুপুর পর্যন্ত অফিস করে বাসায় চলে আসছে। সন্ধ্যার দিকে শশুর বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা দিবে। নুরজাহান বলেছে তাকে গিয়ে আনতে হবে। না হয় আসবে না। তাহির ভেবে পায় না এটা বিবাহিত মেয়েদের কেমন ধরনের রোগ। যাওয়ার সময় তো নেচে নেচে চলে যায়, স্বামী পারমিশন দিলো কিনা দেখার দরকার নেই। কিন্তু যখনই শশুর বাড়িতে ফেরার সময় হয় তখনই শর্ত জুড়ে দেয়। তোমাকে এসে নিতে হবে, না হয় আমি যাবো না।
পার্সেল রিসিভ করে দেখলো নাজেরার নামে, এসেছে বরিশাল থেকে। পাঠিয়েছে সোফিয়া আন্টি। তাহিরের জানার ইচ্ছে জাগলো না ভেতরে কি আছে। সে সোজা দোতলার ঘরে চলে গেলো। নাজেরা বসে আছে আনমনা হয়ে, দৃষ্টি তাযিনের ফাঁকা বারান্দাটার দিকে। কিছু ভাবছে না, ভাবনায় কিছু আসছেও না। টানা দুইদিন এতো বেশি ভেবে ফেলেছে ভাগ্যটাকে নিয়ে এখন ভাবনারা ফুরিয়ে গিয়েছে। আর কিছু কল্পনা করতে পারছে না। শুধুমাত্র তাকিয়ে থাকার জন্যই তাকিয়ে আছে। বড্ড নিষ্প্রাণ লাগছে তাকে।
তাহির রুমে এসে ডেকে বললো, নাজেরা। জ্বর কেমন এখন? কথাটা বলতে বলতে কপালে এসে হাত দিয়ে জ্বর অনুমান করার চেষ্টা করলো। নাজেরাকে আর মুখ ফুটে বলতে হলো না জ্বর কেমন। শুধু মৃদু হাসার চেষ্টা করলো ভাইকে দেখে।
তাহির পার্সেলটা এগিয়ে দিয়ে বললো, বরিশাল থেকে এসেছে। সোফিয়া আন্টি পাঠিয়েছে মনে হচ্ছে।
ভাইয়ের হাতের পার্সেলটার দিকে চোখ দিলো। মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। মনের মধ্যে কোনো অনুভূতিরা জেগে নেই। মনে হচ্ছে সব অনুভূতি মৃত। ভালো খারাপ, মিষ্টি তেঁতো কোনো রকম লাগছে না। হাতটা বাড়িয়ে পার্সেলটা নিবে যে সেটাও ইচ্ছে করছে না। কেন ইচ্ছে করছে না সেটাও জানে না।
তাহির বুঝলো বোনের শরীর দূর্বল। সে চোখের ইশারায় বুঝালো বিছানায় রেখে যেতে। পার্সেলটা রেখে তাহির চলে গেলো। দরজা অব্দি গিয়ে আবার ফিরে এসে বললো, তোমার ভাবিকে আনতে যাচ্ছি। যাবে আমার সাথে? তুমি তো অসুস্থ তাই জোরও করতে পারছি না।
নাজেরার কি বলা উচিৎ বুঝতে পারছে না। ভাবিকে আনতে যাওয়া মানে তো নিহালের মুখোমুখি। এ জীবনে আর কোনো দিন নিহালের মুখোমুখি হতে চায় না সে।
আমি যাবো না ভাইয়া।
তাহির আমতাআমতা করে বললো, বিয়েটা হুট করেই হয়েছে বুঝছো। আমিও তো খবর পেয়ে অফিস থেকে চলে গিয়েছি। আম্মুও দ্রুতই গেলো। বাড়ি ফাঁকা তাই তোমাকে রেখে গিয়েছে। আব্বু শুনে আম্মুকে খুব বকেছে। তুমি কিছু মনে করোনি তো?
নাজেরা হাসার চেষ্টা করে বললো, আমি কি মনে করবো ভাইয়া? আমার কি মনে করা উচিৎ?
তুমি চাইলে এখন আমার সাথে আসতে পারো। নতুন বউ জামাইকেও দেখে আসলে। তাহির কিছুটা বিনয়ের সঙ্গেই বললো।
নাজেরা দু’দিকে ঘাড় নাড়িয়ে বললো, আমার শরীর চলছে না। আমি কোথাও যেতে পারবো না ভাইয়া। আপনি চলে যান।
তাহির জানতো নাজেরা অসুস্থ শরীর নিয়ে যাবে না। বেচারি ভালোই অসুস্থ হয়ে পড়েছে হঠাৎ করে। চোখ মুখ শুকিয়ে গিয়েছে। দেখলে মনে হবে খুব কাছের কেউ মারা গিয়েছে। মৃত্যুর শোকে মানুষ এমন কায়া হয়ে যায়।
নাজেরার ঠোঁটে কেমন যেনো তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠলো। মনে মনে ভাবছে ভাগ্যিস অসুস্থ ছিলাম। না হয় তো নতুন বউ জামাইকে দেখে মন পুড়তে হতো। নুরজাহান নিশ্চয়ই বোন আর বোন জামাইকে দাওয়া করে আনবে এখানে। নাজেরা মনে মনে ভেবে রেখেছে সেদিন বাড়িতে থাকবে না। কোথাও চলে যাবে। কিন্তু কোথায় যাবে! তাযিনটা থাকলে ভালো হতো একটা বুদ্ধি দিতো। হঠাৎ মনে পড়লো তাযিন তো একদম নিরুদ্দেশ। তার খোঁজ খবর একেবারে নেই। সে-ও কি আমায় ভুলে গেলো? নাকি আমিই তাকে ভুলে গেলাম। অবশ্য ছেলেটাকে কয়েকটা দিন বড্ড অবহেলা করা হয়ে গিয়েছে। অবহেলায় লোহাতেও মরিচীকা ধরে, আর সে তো মানুষ। অতএব আমার অভিমান করা সাজে না। অভিমান তো করবে সে। প্রেমের জলে বন্ধুত্ব নিসর্জন দিয়েছি। কে জানে হয়তো অভিমান করেই দূরত্ব বাড়িয়েছে।
তাযিনের হদিশ পাওয়ার আশায় পার্সেল খুললো আনমনে। খুলে বাসার চাবি পেলো সাথে একটা মসৃন কাপড়ে লাল টকটকে ওড়না। কাপড়টা একেবারে পাতলা, কেমন চিকচিকও করছে। সাথে কোনো চিরকুট নেই। নাজেরা কিছু বুঝতে পারলো না। ওড়নাটা কিসের জন্য!
প্রায় তিনদিন পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ওড়নাটা মাথায় ধরলো। খুব বিশ্রী লাগছে। একটুও মানাচ্ছে না। চোখ মুখের অবস্থা ভূতের মতো হয়ে আছে। নাজেরা বিরক্ত হয়ে ওড়নাটা ছুঁড়ে ফেলে দিলো। নিজের এমন বাজে অবস্থা দেখে চিৎকার করে কান্না করতে ইচ্ছে করছে।
সন্ধ্যার দিকে জামিনাকে বলে একটু বের হলো। যদিও জামিনা প্রশ্ন করতে ভুলেনি। কোথায় যাচ্ছো?
নাজেরা মিথ্যা কথা বলতে পারে না। গুলিয়ে ফেলে, তাই সত্য কথা বলাটাকেই নিরাপদ মনে করে। বললো, তাযিনদের বাসায় যাচ্ছি আম্মু।
জামিনা বললো, ওরা তো বরিশালে বেড়াতে গিয়েছে। চলে এসেছে নাকি?
নাহ। আসেনি, বাসার চাবি পাঠিয়েছে। তাযিনের টিয়াকে নিয়ে যায়নি। খাবার পানিও নেই। মনে হচ্ছে টিয়া অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে আমি গিয়ে এটাকে নিয়েই চলে আসবো।
জামিনা অনুমতি দিলো। নাজেরা গায়ে মোটা শাল জড়িয়ে চাঁপা কুঞ্জ থেকে বেরিয়ে ছায়ানীড়ে ঢুকলো। বাসায় ঢুকে সোজা তাযিনের রুমে চলে আসলো। বড্ড অগোছালো রুম, বেড়াতে যাওয়ার আগে সব কাপড়চোপড় নামিয়ে এলোমেলো করে রেখে গিয়েছে। পানি এনে একটু পানি টিয়াকে দিলো, ওমনি টিয়া ডানা নাড়িয়ে, ধন্যবাদ জারুলতা, ধন্যবাদ জারুলতা করছে। নাজেরা না চাইতেও হেঁসে দিলো। কি মিষ্টি করে ডাকে টিয়া।
রুমে কাপড়চোপড় গুছাতে গিয়ে খেয়াল করলো আলমারি লক করে যায়নি। খুলে রাখা,এই ছেলে বড্ড বেখেয়ালি। সোফিয়া আন্টি জানলে হয়তো খুব বকা দিতো। কিন্তু তাতে তার কিছু যায় আসতো না। সে যুক্তি দাঁড় করাতো, রুমটা তো আমারই। এখানে তো আর কেউ আসছে না সো গুছানো নাকি অগোছালো সে-সব দেখার কি দরকার।
এসব ভাবতে ভাবতেই নাজেরা কাপড়চোপড় আলমারিতে গুছিয়ে রাখলো হঠাৎ একটা এলবাম চোখে পড়লো। অন্যের জিনিসে হাত রাখা অনুচিত কিন্তু নাজেরা রাখলো কারন এলবামের কভার পেইজে নাজেরা আর তাযিনের ছোট কালের একটা ফটো কেটে কস্টেপ দিয়ে আটকে রাখা। নাজেরা তাযিনের চুলে ধরে রেখেছে এমন একটা দুষ্ট ছবি। ছবিটা চিনতে অসুবিধা হলো না। সে’বার সোফিয়া আন্টি তাযিন ও নাজেরাকে হাতে বানানো দুটো ফ্রক জামা পড়িয়ে দিলো। ঠোঁটে লিপস্টিক, কপালে টিপ, কাঁধ সমান চুলগুলো ঝুঁটি করে দিলো।
সোফিয়ার মেয়ে বাবু নেই, বড্ড শখ করে না হওয়া মেয়ের জন্য একজোড়া ছোট্ট সাইজের স্বর্ণের চুড়ি বানিয়ে রেখেছিল। একটা তাযিনের হাতে আরেকটা নাজেরার হাতে দিয়ে দিলো। সে খেয়াল করে দেখলো নাজেরাকে খুব মিষ্টি লাগছে কিন্তু তারচেও বেশি মিষ্টি দেখতে লাগছে তার ছেলে তাযিনকে। মনে হচ্ছে তাযিন ছেলে নয়, একটা ফুটফুটে পুতুলের মতো মেয়ে বাচ্চা। দুটোকে পুতুলের মতো সাজিয়ে ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলছিল, হঠাৎ নাজেরা তাযিনের চুল খামচে ধরলো এটাই সেই ছবি,হালকা ঘোলাটে হয়ে গিয়েছে।
নাজেরা ইদানীং কিছুতেই মন দিতে পারছে না
মন ভালো করতে এটার খুব প্রয়োজন ভেবেই এলবামটা সাথে নেওয়ার জন্য নামিয়ে রাখলো। ছোট কালের সুখী দৃশ্য গুলো মনে করলেও মন ভালো হয়ে যায়।
টিয়াপাখিটাকে খাঁচা সহ নিয়ে বাসায় চলে আসলো। নিজ বারান্দায় রেখে ভাবলো আজ একটু টিয়ার সাথে কথা বলবে। তাযিন সেদিন কথা বলতে দেয়নি। তাযিনের বারান্দার দিকে আঙুল তাক করে দেখিয়ে বললো, টিয়া দেখো ওই যে তুমি ওখানে ছিলে। তোমার মালিকের ঘরে।
টিয়া ডানা ঝাপটিয়ে বলতে লাগলো, মালিক, মালিক।
নাজেরার বড্ড হাসি পেলো, চিৎকার করে হাসতে ইচ্ছে করছে। হাসতে হাসতেই বললো, হ্যাঁ মালিক। তাযিন তোমার মালিক তাই না?
তাযিন,তাযিন” আবারও বলতে শুরু করলো টিয়া।
নাজেরা ভীষণ এনজয় করছে। আহাল্দ করে জিজ্ঞেস করলো, তোমাকে তাযিন আর কি পঁচা কথা শিখিয়ে বলতো?
পঁচা কথা, পঁচা কথা” বলেই লাফিয়ে উঠলো।
নাজেরা কপাল চাপড়ে হাসছে। তোমাকে আর কিছু শিখিয়ে দেয় নাই? জারুলতা শিখিয়েছে?
জারুলতা জারুলতা, বলে ফের লাফাচ্ছে।
নাজেরা বিরক্ত হয়ে বললো, ওহ! বাবা! আর কি শিখিয়েছে। জারুলতা কি? জারুলতা কে জানো?
ভালোবাসি ভালোবাসি” টিয়া ডানা ঝাপটিয়ে বললো।
নাজেরা সরু চোখে তাকিয়ে রইলো। তাযিন এটা শিখিয়েছে? ভালোবাসি? আনমনে জিজ্ঞেস করলো, কাকে ভালোবাসো?
জারুলতা জারুলতা।
নাজেরা উপুড় হয়ে বসে ছিল। এবার ফ্লোরে লেপ্টে বসে পড়লো। একগালে হাত নিয়ে টিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। টিয়া এপাশ ওপাশ নেচে বেড়াচ্ছে। কিছুক্ষন নাচানাচি করে এসে নাজেরার মুখোমুখি হয়ে স্থীর হলো। নাজেরা বললো টিয়া আবার বলো ভালোবাসি।
টিয়া নেচে উঠে বললো, ভালোবাসি ভালোবাসি।
চলবে……..
