#মরিচীকা
#পর্ব ০৭
#মাকামে_মারিয়া
তাযিন চিরকুট আর টিকলি টা নাজেরার হাতে দিলো। যেহেতু সে আগেই পার্সেল খুলে ফেলছে তাই আর আর প্যাকেজিং খুলার ঝামেলা ছিল না। নাজেরা ছোট বাচ্চাদের মতো খুশী হলো এতো সুন্দর একটা জিনিস পেয়ে। এতোটাই খুশী হয়েছে যে এটা কে পাঠিয়েছে সে দিকে তার কোনো খেয়ালই নেই। তাযিনের কান্না পাচ্ছে। মন খারাপের স্বরে মিনমিনে স্বরে বললো, আমিও তো তোকে কত কিছু গিফট করি। কই তখন এতো খুশী হোস না তো?
টিকলিটা নাড়াচাড়া করতে করতেই নাজেরা সহজ স্বাভাবিক কন্ঠে বললো, এটা তো সারপ্রাইজ গিফট। সারপ্রাইজ গিফট পেলে সবারই আনন্দ হয়। তোর হয় না?
জানি না আমাকে তো তুই কখনো কোনো সারপ্রাইজ গিফট দেসনি।
ওমা সে কি? তোর বন্ধুরা তো কত্ত গিফট দেয় তোকে। সারপ্রাইজ গিফটও দেয়। আন্টি আঙ্কেলও তো তোকে তোর বার্থডে তে সারপ্রাইজ গিফট দেয়। ওগুলো কিছু না?
নাহ! ওসব এক্সপেকটেশনের মধ্যেই না। আমার এক্সপেকটেশন তো তুই। শেষের কথাটা যথাসম্ভব নিচু স্বরেই বললো। নাজেরা ঠিকঠাক শুনতে না পেয়ে জিজ্ঞেস করলো, কি বললি?
তাযিন বললো, কিছু না বাদ দে তো। ভালো লাগছে না চল বাসায় যাবি না?
নাজেরা হাতে থাকা টিকলিটা তাযিনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে মাথাটা একটু এগিয়ে দিয়ে বললো একটু পড়িয়ে দে তো দেখি কেমন লাগে!তাযিনের হৃদস্পন্দন বেড়ে গেলো। তাই বলে অন্য কারো ভালোবাসায় ভাগ বসাবে ছেলেটা? যে পাঠিয়েছে সে যে খুব যত্ন নিয়ে আর ভালোবেসে পাঠিয়েছে সেটার প্রমান তো সাথে থাকা চিরকুট। যেটার একেকটা শব্দ নাজেরার জন্য ভালোবাসার হলেও তাযিনের জন্য ছিল বিষাক্ত আঘাত।
তাযিন বাঁধা দিয়ে বললো, তোরটা তুই পড়ে নে।
নাজেরা নাছোড়বান্দা। তাযিনকেই বললো, পড়িয়ে দে না দোস্ত। তুই না আমার প্যায়ারি দোস্ত।
দুজনের বন্ধুত্ব এতোই গভীর যে তাযিন মেয়েটাকে কোনো ভাবেই প্রত্যাখান করতে পারে না। কিন্তু ভালোবাসা? ছেলেটার হৃদয়ে যে ভালোবাসা জন্ম নিয়েছে সেটার কি হবে? এটা এমন এক ভালোবাসা যেটা কিনা প্রকাশ করাও সম্ভব নয়৷ বন্ধুত্বে ভালোবাসা নির্মম হয়। প্রকাশ করা যায় না, করলেও বন্ধুত্ব আর টিকে থাকে না। তখন বন্ধুত্ব আর ভালোবাসা দুটোই জীবন থেকে চিরতরে হারিয়ে যায়। শুধু হারায় না একবুক বিষাদ উপহার রেখে যায়। ভালোবাসা ছাড়া বাঁচা যায় কিনা তাযিন জানে না, কিন্তু বন্ধুত্ব ছাড়া সে বাঁচতে পারবে না বলেই টের পায়। আর বন্ধুত্ব মানেই তো আস্ত এক নাজেরা। যাকে ভালোবাসার কথা প্রকাশ করে হারাতে চায় না।
একটা পিন দিয়ে নাজেরার চুলে টিকলিটা আঁটকে দিলো। মিষ্টি হাসি, কপালে রেড স্টোনটা চিকচিক করছে। কি ভীষণ মুগ্ধতা এই মেয়ের চোখে মুখে। সেটা যদি নাজেরা বুঝতো! তাযিনের বড্ড আফসোস হয়। নাজেরা ভুল করেও কখনো তাযিনকে বন্ধু, ভাই থেকে অন্য কিছু ভাবেনি অথচ তাযিন? সে কিনা একটা জীবন কাটিয়ে দেওয়ার দিবাস্বপ্ন বুনছে!
তাযিনের হাতে চিরকুট টা ছিল। দুজন বাড়ির দিকে রওনা হলো। তাযিন মনে মনে খুব করে দোয়া করছে নাজেরা যেনো চিরকুটের কথা ভুলে যায়। সে চায় না নাজেরা এই চিরকুট পড়ুক, জানুক যে তাকে কেউ প্রেম নিবেদন করছে। তাযিনের আগেই কেউ তার জারুলতাকে প্রেম নিবেদন করবে আর সে সেটা খুব কাছ থেকে দেখবে, সহ্য করবে আদোও সেটা হতে দেওয়া যায়?
কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। নাজেরা বেশ উৎসাহের সঙ্গেই বললো, কই দেখি চিরকুটে কি লিখছে?
তাযিন মুঠো করে রাখা হাতটা সরিয়ে নিয়ে বললো, না দেখলে হয় না?
নাজেরা আশ্চর্য হয়ে বললো, ওমা! বোকা ছেলে বলে কি! দেখবো না কেন? দেখতে মানা?
আমার মন চাচ্ছে না তুই এটা দেখ।
নাজেরা হেঁসে কুটিকুটি হয়ে বললো, কিন্তু আমার খুব মন চাচ্ছে দেখতে। দে তো দেখি আমি।
তাযিন মুখটা গোমড়া করে রেখেই নাজেরার হাতে চিরকুট টা দিয়ে দ্রুত হাঁটা শুরু করে দিলো।নাজেরা চিরকুটটা চোখের সামনে মেলে ধরলো। হাসি হাসি মুখে ঠোঁট জোড়া নাড়িয়ে বিরবির করে চিরকুট টা পড়তে আরম্ভ করলো। পড়তে পড়তে চোখ স্থীর হয়ে আসলো, চোখের পাতা নড়ছে না। ঠোঁটের নাড়াচাড়া কিছুটা কমে আসলো, হাঁটার গতি যথাসম্ভব কমে গেলো বলা চলে। তাযিন অনিচ্ছা সত্ত্বেও পিছন ফিরে তাকিয়ে বললো, চিরকুট পড়ে ফিদা হয়ে গেলি? বাসায় যাবি নাকি আমি চলে যাবো?
তাযিনের কথায় নাজেরা যেনো সম্মতি ফিরে পেলো। চিরকুট থেকে মাথা তুলে চিরকুটটা হাতের মুঠোতে গুঁজে নিয়ে বললো, এই তো আসছি।
সারাটা পথ দুজনের কেউ আর একটা কথাও বললো না। তাযিন কথা বললো না অভিমানে। কিন্তু নাজেরা? সে কেন কথা বললো না? তার তো চিরকুট পড়ে খুশী হওয়ার কথা কিন্তু এমন চুপসে গেলো কেনো? তার মানে কি খুশী হয়নি? একবার জিজ্ঞেস করে দেখবো কিছু? এতো কিছু ভাবতে ভাবতে পথের সমাপ্তি টানলেও শেষ পর্যন্ত তাযিন আর কিছু বললো না। শুধু বাড়ির সামনে এসে একটু থেমে বললো, টা টা।
নাজেরা তাযিনের মুখের দিকে তাকিয়ে কেবল হাত নেড়ে বিদায় জানালো তাও মুখে কিছুই বললো না। মেয়েটার উপর যতই অভিমান হোক না কেনো! এমন চুপসে গেলে তাযিনের খুব অশান্তি লাগে। কিন্তু কি করার? ওর স্বভাব টাই যে এমন। খুব কষ্ট পেলে বা খুব খুশী হলে এমন সাইলেন্ট হয়ে যায়। তার মানে কি সে খুব খুশী হয়েছে?
__________
নিহাল কারখানা থেকে বাসায় আসলো। ঢাকা চট্টগ্রাম শহরে দুটো শো-রুম আছে ওদের। আর বাড়িতে সদরেই একটা বড় গোডাউন আছে কাপড়ের। চট্টগ্রাম ঢাকা এবং বাড়িতে সবখানেই মূলত তাকে খেয়াল রাখতে হয়। সে হচ্ছে ম্যানেজার, কাকার আন্ডারে কাজ করে।
বাসায় এসেই দেখলো জাহেরা নাক ঢেকে ঘুমাচ্ছে তার বিছানায়। নিহালের সবচেয়ে অপছন্দের কাজ এটা।আর জাহেরাও কেন যেনো বেছে বেছে ছেলেটার পছন্দের কাজ গুলো করে আর ক্যাচাল বাঁধিয়ে সম্পর্ক খারাপ করে। না হয় কাজিনদের সম্পর্ক কেনো এমন সাপেনেউলে হবে? নিহাল খুব কম রাগে কিন্তু যখনই রাগে হুট করে রেগে বো*ম হয়ে যায়।
জাহেরাকে একপ্রকার ধমকে বললো, জাহেরা! আমার বিছানায় কেনো ঘুমাচ্ছো?? হুয়াই?
মেয়েটা গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। এই ছেলের ডাক নাকে গেলে তো? কিন্তু নিহালও হয়েছে বেশ আত্মসম্মান ওয়ালা পুরুষ। সে জাহেরাকে চাইলেই গায়ে হাত দিয়ে ধাক্কা দিতে পারতো। কিন্তু সে তো এটা করবে না। তাহলে এই মেয়েকে কি ভাবে ডাকা যায়?
জগে পানি পেলো, গ্লাস তুলে নিয়ে এক গ্লাস পানি নিলো একটু পানি খেয়ে গলা ভিজিয়ে নিলো বাদবাকি সবটা পানি জাহেরার ঘুমন্ত মুখে ছুঁড়ে মারলো। হঠাৎ এমন আক্রমণে চিৎকার করে ঘুম থেকে উঠে গেলো জাহেরা। প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বললো, এটা তুমি কি করলে নিহাল ভাইয়া?
আমার বেডে ঘুমাচ্ছো কেনো? এগুলো কেমন ধরনের অভদ্রতা?
জাহেরা যথেষ্ট আশ্চর্য হয়ে বললো, এসব কি বলছো তুমি? ঘুম পেয়েছে তাই ঘুমাচ্ছি। এখানে অভদ্রতার কিছু হয়েছে আদোও?
বের হও! প্লিজ লিভ মি অ্যালং।
জাহেরা বিরক্ত হয়ে কম্বল ছুঁড়ে ফেললো। আজ এটা একটা বিহিত করেই ছাড়বে এই ছেলে পেয়েছে কি? যখন মুখে যা আসবে সেটা বলেই অপমান করবে?
জাহেরা দরজার কাছে চলে যেতেই নিহাল পিছু ডেকে বললো, শুনো কাকুর আদরের দুলালি। তুমি তোমার বাপ মায়ের আদরের হতে পারো কিন্তু নিহালের নয়৷ সো ন্যাকামো আমার সাথে করতে আসবে না। এন্ড কান খুলে শুনে রাখো আমার সাথে একদম অসভ্যতামি নয়।
চোখ মুখ লাল করে কাঁদতে কাঁদতে জাহেরা বের হয়ে গেলো। তাতে নিহালের কিছু যায় আসে না। সে জানে এটার পরিণতি কি হবে। জাহেরা তার বাবাকে গিয়ে বিচার দিবে এরপর নিহালের কাকা তাকে ডেকে বুঝাবে, লাগলে দুই একটা ধমকও দিবে। এসব এখন আর নিহাল পরোয়া করে না। আগে অবশ্য কাকা হিসেবে ফয়জুল হাকিমকে যথেষ্ট সম্মান এবং ভয় করতো আপাতত আর করে না। সেটারও যথেষ্ট কারন রয়েছে।
জাহেরার মা রুকাইয়া এসে নিহালের দরজায় করাঘাত করলো। নিহাল নিহাল বলে ডাকতেই নিহাল অনিচ্ছা সত্ত্বেও সাড়া দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কি হয়েছে ছোট মা?
খাবে চলো। না খেয়ে শুয়ে পড়লে যে?
আমার খিদে নেই ছোট মা। আপনারা খেয়ে নেন।
রুকইয়া একটু থেমে বললো, তোমার কি আজকে বেশি মন খারাপ নিহাল?
নিহাল একটু নিশ্বাস নিলো। ছেলেটা এতিম। কিন্তু এই যে ছোট মা বলে ডাকে নারীটাকে। পৃথিবীতে একমাত্র এই একজনই আছে যে নিহালকে বুঝে। নিহালও ঠিক মায়ের মতোই ভালোবাসে নারীটাকে। নিহাল কন্ঠ স্বাভাবিক রেখে বললো, না ছোট মা। আমি হাবিজাবি খেয়েছিলাম। খিদে নেই তেমন।
রুকইয়া শাসনের স্বরে বললো, আবার বলাও হচ্ছে? কতবার বলেছি বাহিরে হাবিজাবি খেয়ো না।
আচ্ছা আর খাবো না। আপনি শুয়ে পড়ুন।
রুকইয়া চলে গেলো। নিহালের চোখে ঘুম নেই সে এপাশ ওপাশ করছে। ঘুম আসছে না। কেনো ঘুম আসছে না? মন কি সত্যি খারাপ? নিহাল টের পেলো হ্যাঁ সত্যি তার মন খারাপ। মন খারাপের কারণ খোঁজতে গিয়ে মনে পড়লো তার পাঠানো পার্সেলটা কোনো এক ছেলে রিসিভ করেছে আর এতেই নিহালের চিন্তা বেড়েছে সাথে মন খারাপও হয়েছে। সে ভেবেই নিয়েছে পার্সেল রিসিভ করা ছেলেটা নাজেরার বড় ভাই তাহির। তাছাড়া আর ছেলেই বা আসবে কোথা থেকে? বাড়িতে তো আর ছেলে নেই। তাযিনের কথা বেমালুম ভুলে বসে আছে এ যুবক।
চলবে………
#মরিচীকা
#পর্ব ০৮
#মাকামে_মারিয়া
শ্যামলি! প্রথম দেখায় ভালোবাসা হয়?
আমি ভালোবাসা বুঝিনা। তবে তোমার হাসির প্রেমে পড়েছি। শুনো শ্যামলি! যেনো তেনো প্রেম নয়! মনে হচ্ছে পৃথিবীর সমস্ত সুখ বিক্রি করে হলেও তোমার হাসি দেখতে চাই। তোমার দরজায় কড়া নাড়ছি, সাড়া দিবে না?
ইতি
শ্যামলির হাসিতে মাতোয়ারা সে।
নীল নয়, সাদা কাগজের এই চিরকুটটি নাজেরা একাধিক বার পড়ে ফেলছে। ঘরের কাজ করছে আর মিটিমিটি হাসছে। একটা কাজ শেষ করে আবার দৌড়ে গিয়ে বইয়ের ভাজ থেকে চিরকুটটা হাতে নিয়ে আবার পড়ছে। এক অদ্ভুত অনুভূতি।
নুরজাহান বিকেলে চা চাইলো নাজেরাকে ডেকে। নাজেরা তখন আরও একবার চিরকুট পড়ছিল। নুরজাহানের ডাক সে শুনেনি। নুরজাহান কিছুটা রেগেই ডাকলো, নাজেরা!! ডাকছি তোমায়!
ভাবির কর্কশ গলার আওয়াজ শুনেই নাজেরার বুকের ভেতর কাঁপন সৃষ্টি হলো, হাত মৃদু কাঁপছে ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে। দ্রুত চিরকুট টা লুকিয়ে রেখে কিচেনে দৌড় দিলো। চুলায় পাতিল বসিয়ে পানি দিলো, সামান্য লবণ আর চিনি দিলো। পানি নাড়তে গিয়ে টের পেলো হাত এখনো মৃদু কাঁপছে। বুঝতে পারছে ভয়টা একটু বেশিই পেয়েছে। চিরকুট টা হাতে থাকায় এতোটা ভয় পেলো সে।
নুরজাহানকে চা দিতেই সে জিজ্ঞেস করলো, সারাক্ষণ রুমে থাকো। কি ব্যাপার? রুমে এতো কি?
নাজেরা মনে মনে বিরক্ত হলো, রুমে থাকলেও কিনা দোষ? কাজকাম রেখে তো আর রুমে বসে থাকে না!
কিছু না ভাবি এমনি। কিছু করা লাগবে?
নাহ। ছাঁদ থেকে কাপড় গুলো নিয়ে আসো। সব বলেকয়ে করাতে হবে কেনো!
নাজেরা জবাব দিলো না কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। জামিনা তো নাসির উদ্দীনের সাথে চট্টগ্রাম গিয়েছে। বাড়িতে নাজেরা আর নুরজাহানই আছে। তাহির অফিসে। সে ফিরবে সন্ধ্যায়।
সূর্য ডুবে গিয়েছে। কিন্তু সন্ধ্যা নামতে এখনো কিছু সময় বাকি। শীত কাল বিধায় সূর্য বেশি সময় স্থায়ী হয়নি। নাজেরা ছাঁদে এসে প্রথমেই তাকালো পাশের বাসার ছাঁদটায়। যার জন্য তাকালো তাকে দেখতে পেয়ে ঠোঁটে হাসি ফুটলো।
নাজেরা এগিয়ে এসে ডাকলো, জিলাপি!
তাযিন ঘাড় ঘুরিয়ে নাজেরার দিকে তাকালো। স্মিত হেঁসে বললো, শুনছি বল।
তোর মন ভালো?
কেনো তোর মন খারাপ? তাযিন জিজ্ঞেস করলো।
নাজেরার চোখে মুখে দুষ্টমির আভাস। বললো, আমার কি সব সময় মন খারাপ থাকে নাকি হুহ্? মাঝে মাঝে মন ভালো থাকে। আজকেও মন ভালো। আজকে কেউ বকা দিলেও মন খারাপ হবে না। তুই কিছু বকা দে তো। জমিয়ে রাখা বকা গুলো দিয়ে দে।
তাযিন হয়তো বুঝতে পারলো এই মেয়ের মন ভালো হওয়ার কারণ। সে বললো, তোকে দেওয়ার মতো জমানো বকা নেই। তোর মন এতো ভালো হওয়ার কারণ কি সেটা কি আমি জানতে পারি? নাকি সেটাও সিক্রেট? তাযিন কারন জানে তা-ও বেহায়া মন নাজেরার মুখ থেকে কিছুটা শুনতে চায়।
নাজেরা ব্রু কুঁচকে বললো, সে কি কথা তাযিন! এ ভাবে বলছিস কেন! আমার সব কিছুই তোর জানা। তোর কাছে আমার আবার সিক্রেট কি হুম? এ ভাবে বলতে পারলি?
হ্যাঁ পারলাম তো। তাযিন স্থীর।
তাযিনের এড়িয়ে যাওয়া টের পেয়ে নাজেরা অভিমানের স্বরে বললো, তুই আমাকে একটুও ভালোবাসিস না তাই না?
উঁহু একটুও ভালোবাসি না। তোকে ভালোবাসার কত মানুষ আছে।
নাজেরার প্রচন্ড মন খারাপ হলো। তাযিন কেমন এড়িয়ে যাচ্ছে যেনো। অথচ মেয়েটা এসেছিলো সুখ ভাগ করতে। যে মানুষটার সাথে সব মন খারাপ ভাগ করা হয় তার সাথে সুখটা ভাগ করে নিবে না? এতোটাও পর তো তাযিনকে ভাবে না সে! অথচ তাযিন কিনা এড়িয়ে যাচ্ছে তাকে?
নাজেরা অভিমান নিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলো। চলে যেতে নিবে ওমনি তাযিনের মনে হলো মেয়েটা কষ্ট পাচ্ছে। হয়তো সে সত্যি খুশী হয়েছে কারো প্রেম নিবেদন পেয়ে। যদি সে খুশী হয় তাহলে তাযিনের মেনে নিতে সমস্যা কোথায়? তাযিন তো এটাই চায় যে যেকোনো কিছুর বিনিময়ে জারুলতা খুশী থাকুক।
তাযিন পিছু ডেকে বললো, এই মেয়ে!
নাজেরা পিছন ফিরে দাঁড়ালো ঠিক তবে কিছু বললো না। তাযিন হাহাহা করে হেঁসে উঠলো। হাসতে হাসতে ভেঙে পড়ছে যেনো। ছেলেটা একটু বেশি সুন্দর। নাজেরার মন চায় নজর টিকা লাগিয়ে দিতে যেনো তার এই দুষ্ট বন্ধুর দিকে কারো নজর না লাগে। নাজেরার ছোট কালের ইচ্ছে সে নিজে দেখেশুনে তাকে বিয়ে করাবে। এই ইচ্ছের কথা অবশ্য তাযিনকে অনেক বার বলেছে প্রতিবার তাযিন নাজেরার চুল টেনে দিয়ে বলেছে, তোকে এতো পাকনামি করতে বলি নাই। আমি বিয়েই করবো না। হয়তো মনে মনে আরও বলেছে যে তোকে ছাড়া কাউকে বিয়ে করবো না। মনের কথা কি আর নাজেরা জানে? সে তো মন পড়তে পারে না।
প্রেম নিবেদন পেয়ে আমাকে ইগনোর করছিস। কত্ত সাহস রে তোর! তাযিন হাসি থামিয়ে বললো।
নাজেরা নাক ফুলিয়ে বললো, হাসবি না একদম। এতোক্ষণ ফাজলামো করতেছিলি তাই না?
হ্যাঁ তাছাড়া কি? কাঁধ ঝাকিয়ে বললো তাযিন।
বেয়াদব ছেলে একটা।
আর তুই বেয়াদবের একমাত্র বন্ধু। তার মানে তুইও বেয়াদব।
মোটেও না৷ আমি তোর মতো রামছাগল না।
হোয়াট রাবিশ নাজেরা! আমি রামছাগল হতে যাবো কোন দুঃখে?
নাজেরা একদম রেলিং ঘেঁষে দাঁড়ালো। তাযিনের চুলের দিকে আঙুল তাক করে বললো, এই যে ছাগলের মতো লম্বা লম্বা চুল।
তাযিন চোখের উপর থেকে চুল গুলো সরিয়ে বললো, তুই বুঝবি না। ইট’স মাই হেয়ার স্টাইল।
তারপর দু’জনে মিলে হাহা হিহি করে কিছুক্ষন হেসে কুটিকুটি হলো। এদের কেমিস্ট্রি টাই এরকম। মান অভিমান আর দুষ্টমি, সাথে হাসি তামাশা তো আছেই।
কিছুক্ষন চুপ করে থেকে নাজেরা আনমনে শুধালো, আচ্ছা তাযিন তোর কাছে ভালোবাসা মানে কি?
তাযিন শান্ত গলায় বললো, ভালোবাসার কোনো সংজ্ঞা আমার জানা নেই। মিনমিনে স্বরে আরও বললো, ভালোবাসা বলতে আমি তোকেই বুঝি। কিন্তু তোর কাছে আমার সংজ্ঞা কেবলই বন্ধুত্ব।
জানিস আমায় একজন প্রেম নিবেদন করছে।
তাযিনের বুকের ভেতর তোলপাড় ঝড় উঠলো কিন্তু বুকের ভেতরের ঝড় কি কেউ টের পায়? নাজেরাকে অসন্তুষ্ট দেখতে চায় না সে। তাই খোঁচা মেরে বললো, পটে গিয়েছিস মনে হচ্ছে? আমার অনুমতি নিয়েছিস হুম? আমি না তোর ওয়ান এন্ড ওনলি বেস্ট ফ্রেন্ড। আমার একটা অধিকার আছে না!
নাজেরা হাসলো। বললো, আচ্ছা বল তাহলে তুই অনুমতি দিচ্ছিস কিনা?
তাযিন অবাক হওয়ার ভান করে বললো, সিরিয়াসলি অনুমতি নিচ্ছিস?
হ্যাঁ সিরিয়াসই তো। বল তো আমার কি করা উচিৎ?
তাযিন মেঘালয় আকাশের দিকে তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো, তোর মন কি বলছে নাজেরা? মনকে জিজ্ঞেস কর।
আমার মন খুব করে সায় দিচ্ছে। ভালোবাসা কে না চায় বল? আমারও তো ইচ্ছে করে কেউ আমায় খুব ভালোবাসবে।
তাযিনের চোখের কোণ ভিজে আসলো। খুব কষ্ট করে চোখের পানি আটকে বললো, হ্যাঁ সেটাই তো৷ সবাই-ই তো ভালোবাসা চায়। তুইও চাইবি এটাই স্বাভাবিক।
নাজেরা সুখী সুখী মনোভাব নিয়ে বললো, আমি এমন একজন চাইতাম যে আমার হাসি দেখার জন্য পৃথিবীর সব সুখ ত্যাগ করে দিবে। জানিস সে-ও এটাই লিখছে। সে আমার হাসির প্রেমে পড়েছে। নাজেরার চোখে মুখে গভীর আনন্দ উপলব্ধি করতে পারলো তাযিন। অথচ ছেলেটার বুক ফেটে কান্না আসছে। নিয়তি তাহলে এটাকেই বলে? একজনের আনন্দ অন্যজনের বিষাদ!
তাযিন বুঝলো নাজেরা এতেই আনন্দিত। অতএব মেয়েটাকে এখানেই সুখী হতে দেওয়া উচিৎ। ছোট বেলা থেকে মেয়েটাকে দেখে আসছে। কম কষ্ট পায়নি সে। তাযিন আগে থেকেই জানতো নাজেরা এতিম,জামিনা তার সৎ মা। কিন্তু তাযিনের আম্মু নিষেধ করেছিলো বলে সেটা কখনো নাজেরাকে বলেনি সে। মেয়েটাকে দিনের পর দিন কষ্ট পেতে দেখে তাযিন নিজের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিল যেকোনো কিছুর বিনিময়ে নাজেরাকে সুখী দেখতে চায়, অথচ কে জানতো অন্য কারোর সঙ্গে মেয়েটাকে মিলিয়ে দিয়ে সুখী করতে হবে!
তাযিন আমাকে কিন্তু তোর হেল্প করতে হবে। জানিসই তো ভাইয়া ভাবি আর আম্মু জানতে পারলে আমাকে মেরেই ফেলবে।
তাযিন লম্বা নিশ্বাস নিয়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললো, আমি থাকতে তোকে কে মেরে ফেলবে দেখবো না আমি!
নাজেরা বাহবা দিয়ে বললো, এই না হলে আমার বন্ধু জিলাপি!
তাযিন চাপা হাসলো। বল কি হেল্প করতে হবে?
মাগরিবের আজান পড়ে গেলো। নাজেরা ভড়কে গিয়ে বললো, ইয়া আল্লাহ আজান দিয়ে দিলো। আমি কাপড় গুলো নিয়ে যাচ্ছি আপাতত। তোকে রাতে সবাই শুয়ে পড়লে তারপর কল দিবো বুঝলি? অপেক্ষা করিস ঘুমিয়ে যাসনে বন্ধু আমার।
তাযিন ঘাড় কাত করে সায় দিলো। নাজেরা কাপড়চোপড় গুটিয়ে নিয়ে দৌড়ে নিচে নেমে গেলো। তাযিন তখনও মেয়েটার যাওয়ার পানে তাকিয়ে আছে। ভীষণ আফসোস হচ্ছে, কিসের আফসোস ঠিক বুঝতে পারছে না কিন্তু হচ্ছে। এই মূহুর্তে এসে ছেলেটার মনে হচ্ছে ভালোবেসে না পাওয়ার থেকেও বেশি যন্ত্রণার ভালোবাসার মানুষটার কাছে ভালোবাসা প্রকাশ করতে না পারা। সে জানলো না আমি শুধু ভালোই বেসে গেলাম! কি ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক!
________
নিহাল সকালে বের হয় সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে। বাসায় ফিরে আধাঘন্টা পরিবার বলতে যারা আছে ছোট মা, কাকা, জাহেরা এদের সাথে কাটায়। ড্রয়িং এ বসে এরপর রাতের খাবার শেষ করেই নিজের রুমে চলে যায়।
কিন্তু আজকে খাওয়া দাওয়া করার পরেও একটু বেশি সময়ই ড্রয়িং রুমে বসে রইলো। জাহেরা এসেছিলো তাকে পড়ার বাহানা দেখিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছে। এবার পাশে বসে আছে ছোট মা রুকাইয়া। মহিলা ভেবেছে হয়তো ছেলেটা একা একা বসে আছে তাই সঙ্গ দিচ্ছে। কিন্তু নিহাল খুব করে চাচ্ছে উনিও চলে যাক।
ছোট মা বসে আছেন কেনো? আপনি শুয়ে পড়ুন।
তুমি ঘুমাবে না নিহাল?
হ্যাঁ এই তো একটু কাজ করেই চলে যাচ্ছি। ফোনে কাজের খুব একটা চাপ এমন ভান করলো।
একটু কথাবার্তা বলেই রুকাইয়া উঠে চলে গেলো। নিহাল বড় করে নিশ্বাস নিলো। সেই বাসায় আসার পর থেকেই একা হতে চাচ্ছিলো কারণ ল্যান্ডলাইন থেকে নুরজাহানের শশুর বাড়িতে একটা কল করবে মূলত নাজেরাকে পাওয়ার জন্য করবে। ধরা পড়ে গেলেও বুঝানো যাবে যে হয়তো বাসা থেকেই কেউ কলটা করেছে। আর নিহাল ভেবেই নিয়েছে কলটা নাজেরাই রিসিভ করবে কারণ সচারাচর ল্যান্ডলাইনে তেমন ফোনকল আসেনা এটা শুধু দারোয়ান, আর অফিস কলের জন্য রাখা হয়েছে। তাছাড়া যার যার পার্সোনাল ফোন আছেই।
নিহাল কল করলো, তবে কিছুটা নার্ভাস লাগছে। প্রথম বারেই কলই রিসিভ হলো। ওপাশ থেকে হ্যালো শব্দটা ভেসে আসতেই নিহাল একদম জমে গেলো। এটা নাজেরা কন্ঠস্বর সেটা বুঝতে সময় লাগেনি।
নাজেরা হ্যালো হ্যালো করে সাড়া না পেয়ে রেখে দিলো কারণ এই মেয়েরও তাড়া আছে। সে যে আরেকজনকে অপেক্ষায় রেখে আসছে। নাজেরা এদিকটার কাজকাম সব শেষ করে রুমের দিকে যাবে ওমনি আবার কল আসলো। কিছুটা বিরক্ত হলো এবার। কলটা রিসিভ করেই হালকা ধমকের স্বরে বললো, কথা বলছেন না কেনো হ্যালো? কথা বলুন?
এ ভাবে ধমক দিলে ভয় পেয়ে যাচ্ছি তো শ্যামলি!
নাজেরা অবাক হয়ে গেলো! সে-ই লোকটা না? দ্রুত চারপাশে তাকালো ওকে কেউ দেখছে না তো? বাসায় অবশ্য কেউ নেই, ভাই ভাবি সেই তখনই রুমে ঢুকে গিয়েছে।
নাজেরা নিচু স্বরে বললো, আপনি?
চিনতে পেরেছেন তাহলে?
জ্বি চিনতে পেরেছি। কিন্তু কি বলবেন দ্রুত বলেন এখানে কথা বলা নিরাপদ না।
নিহাল জানে নিরাপদ না তাই দ্রুত বললো, আচ্ছা ঠিক আছে আপনার ফোন নাম্বারটা লাগবে এটার জন্যই কল করেছি।
নাজেরা নিজের ফোন নাম্বার দিয়ে দিলো মূহুর্তেই। কলটা কেটে দিয়ে ল্যান্ডলাইনের পাশেই কিছুটা সময় দাঁড়িয়ে রইলো। শরীরের মধ্যে কেমন যেনো কাঁপা কাঁপা একটা অনুভূতি হচ্ছে, শরীর কাঁপছে, শীতও লাগছে আবার হাসিও পাচ্ছে। এটাকে পাঁচমিশালী আনন্দ বলে নাকি?
দ্রুত রুমে চলে আসলো। রুমে এসেই ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো অচেনা নাম্বার থেকে কল আসছে। নাম্বারটা অচেনা হলেও কার নাম্বার সেটা বুঝতে অসুবিধা হলো না। কল রিসিভ করলো, ওপাশে নিহাল অপেক্ষায় ছিল। দু’জন প্রথম বারের মতো প্রেমে মজেছে।
তাযিন বিরক্ত হচ্ছে। প্রায় দুই ঘন্টা যাবৎ অপেক্ষা করছে। রাত দশটা থেকে শুরু করেছে এখন বারোটা বাজতে চললো অথচ নাজেরার এখনো আসার খবর নেই। প্রথমে কল রিং হলে এখন ব্যস্ত দেখাচ্ছে। সে তো ব্যস্ত থাকার কথা নয়। বলেছিলো অপেক্ষা করতে কিন্তু এখনো কি বাসার কাজ শেষ হয়নি। তাযিনের চোখে ঘুম চলে আসলো, ওয়াশরুম থেকে চোখে মুখে পানি দিয়ে আসলো, ঘুমিয়ে গেলে চলবে না যদি নাজেরা এসে না পায়? রাগ করবে নিশ্চয়ই। অপেক্ষা করতে বলেছিলো মানে সে আসবে এতোটুকু বিশ্বাস তাযিন তার না হওয়া ভালোবাসার মানুষের প্রতি রাখে।
চলবে……..
