Saturday, June 6, 2026







মরিচীকা পর্ব-০৪

#মরিচীকা
#পর্ব ৪
#মাকামে_মারিয়া

পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য কাউকে হাসতে দেখা। খুব কুৎসিত মানুষটাকেও হাসলে অপূর্ব সুন্দর লাগে। নাজেরা দুষ্টমির ছলে আঙুলের ডগায় কিছুটা আলতা নিয়ে তাযিনের ফর্সা গালে লাগিয়ে দিয়ে হাসতে লাগলো। তাযিন চমকে উঠে বললো, কি করছিস নাজরু! গালে কেন দিচ্ছিস তা-ও এসব মেয়েলী জিনিসপত্র!!

নাজেরা টেনে টেনে বললো, ওহ আচ্ছা তাই না! ভুলে গিয়েছিস তোকেও ছোট বেলায় পাড়ার কাকিমা থেকে শুরু করে স্কুলের সবাই মেয়ে ভাবতো।

তাযনি ব্রু কুঁচকে বলে, হয়েছে! থাম, সেসব ছোট কালের কাহিনি। আমাকে বোকা বানিয়েছিস তোরা সবাই। আর কতবার যে শুনাবি এসব।

নাজেরা নাক টেনে বললো, তুই বুঝি ছোট বেলার কাহিনি আমাকে বার বার হাজার বার মনে করিয়ে দিস না? তাহলে আমি দিবো না কেন শুনি??

তাযিন হার মেনে বললো, আচ্ছা আচ্ছা আরও কি আছে মনে করা দেখি।

নাজেরা একটু ভেবে বললো, আর কি! তোকে দেখতে পুতুলের মতো লাগতো। গুলুমুলু গাল, গোলাপি ঠোঁট। একদম মেয়েদের মতো দেখতে। আন্টি তোকে আর আমাকে একই রঙের জামা পড়াতো। আমার থেকেও বেশি মেয়ে আর পুতুলের মতো সুন্দর লাগতো তোকে। মানুষ তো জানতোও না তুই ছেলে।

তাযিন লাজুক ছেলে, নাজেরার থেকে এসব শুনলে বেশ লজ্জা পায়। তাকে মানুষ মেয়ে ভাবতো এটা তার জন্য বেশ লজ্জারই বটে। কিন্তু নাজেরা যখন হাসোজ্জ্বল চেহারা নিয়ে ওসব কাহিনি আবার পুনরাবৃত্তি করে তখন মনের কোথাও যেনো শান্তি অনুভব হয়।

কিরে জিলাপি! কি এতো ভাবছিস।

তাযিন নাক ফুলিয়ে বললো, নাজেরা! খবরদার আমাকে জিলাপি ডাকবি না।

তুই হচ্ছিস পৃথিবীর সবচেয়ে বোকা প্রাণী, যাকে শুধুমাত্র একটা নাম বলেই ক্ষেপিয়ে দেওয়া যায়।

তাযিন আবারও মনে মনে শপথ করে নাজেরা যতই এই নাম বলে ক্ষেপানোর চেষ্টা করে সে ক্ষেপে যাবেনা। নাজেরাকে হারিয়ে দিবে। কিন্তু পারে না। এই নামটা সে একেবারেই মেনে নিতে পারে না। না পারার কারণ হলো, সে-ই ছোট বেলায় স্যার তাকে মেয়ে ভেবেই জিলাপি নাম দিয়েছিলো। এখন জিলাপি ডাকা মানে তো তার জেন্ডারে আঘাত লাগে। এগুলো ভাবলেই তাযিনের মেজাজ বিগড়ে যায়।

দুটো মানবের কথোপকথনের সাক্ষী হয়ে যাচ্ছে নিহাল। যদিও আড়ি পাতা উচিৎ না কিন্তু নিহাল কোনো এক অদ্ভুত কারনে এই দৃশ্য এড়িয়ে যেতে পারলো না। মনে হচ্ছে আকাশ থেকে দুটো পাখি জমিনে এসে কিচিরমিচির করছে। কি সুন্দর! কি সুন্দর!

নিহাল ভাইয়া!! কি করছো তুমি এখানে?

সুন্দর দৃশ্য দেখার মাঝে ব্যঘাত ঘটালো জাহেরা। নিহাল জাহেরার মুখের উপর আঙুল তুলে বললো, চুপপপ! শব্দ করিস না।

জাহেরা অবাক হয়, ফিসফিস করে বলে, কি হয়েছে বলো তো? তোমাকে খোঁজতেছে সবাই। খাবে চলো।

কথাগুলো বলতে বলতেই জাহেরা রুমের ভেতর উঁকি দিলো। তাযিন তখনও ফ্লোরে বসে আছে। নাজেরা আলতা রাঙা পা দুটো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে আর হাসছে।

কিছু বুঝে উঠার আগেই জাহেরা রুমে ঢুকে গেলো। নাজেরা আর তাযিন প্রথমে একটু ভয় পেলেও জাহেরাকে দেখতে পেয়ে বুকে হাত দিয়ে সমস্বরে বলে উঠলো, জাহু!! ভয় পাইয়ে দিয়েছো তো।

কি এমন চলছে এখানে যে ভয় পেয়ে গেলে তোমরা! জাহেরার কন্ঠে সন্দেহ সাথে কিছুটা কটাক্ষও বটে৷ তাতে অবশ্য নাজেরা বা তাযিন কারো কিছু যায় আসেনা। তারা এতে অভ্যস্ত। জাহেরাকে আগে থেকেই জানে কিনা!

তাযিন আর নাজেরা কুশলাদি করলো জাহেরার সাথে। চাঁপা কুঞ্জতে জাহেরার আসা যাওয়া হয় ছোট বেলা থেকেই। বোনের শশুর বাড়ি হওয়ার আগে ফুফুরও বাড়ি কিনা! আর তা-ই তাযিন নাজেরা সহ বাকি কাজিনদের সঙ্গে মুটামুটি আলাপ আছে। যদিও কাজিন মহলের সবচেয়ে উগ্র আর অহংকার হওয়ায় অন্যরা তেমন একটা পছন্দ করেনা জাহেরা নামক সুন্দরী রমনীকে। মনে মনে দেখতে না পারলেও সামনাসামনি উপেক্ষা করার উপায় নেই। জোর খাটিয়ে হলেও সে সবার মধ্যিখানে থাকতে চায়।

জাহেরা ঘুরে ঘুরে আয়নায় নিজেকে আবারও দেখতে লাগলো। চেনাজানা সবাই ধরেই নিয়েছে এই মেয়ের আয়না দেখার রোগ আছে। কোথাও আয়না দেখলেই সে থেমে যায় অতঃপর নিজেকে দেখতে ব্যস্ত হয়।
তাযিনের দিকে তাকিয়ে বললো, আচ্ছা তাযিন ভাইয়া দেখো তো আমায় সুন্দর লাগছে না?

তাযিন কপালের চুল গুলো ঝাকিয়ে বললো, হ্যাঁ তুমি তো পীর! সুন্দর লাগছে কিনা এই প্রশ্ন আসেই না।

জাহেরার চোখে মুখে অহংকার ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লো। তাযিনের করা প্রশংসা তার মন ভরেনি বোধহয় তাই তো আবারও জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছা নাজেরা আপুর থেকেও আমি বেশি সুন্দর তাই না?

তাযিনের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো। ফ্লোর থেকে উঠতে নাজেরার দিকে হাত বারিয়ে দিলো। নাজেরা তাযিনের হাত ধরে টেনে উঠাতে সাহায্য করলো। জাহেরা তখনও উত্তরের আশায়। তাযিন দিগুণ অহংকার কন্ঠে এনে বললো, আমার চোখ দিয়ে বিচার করতে চাইলে জমিনের সবচেয়ে সুন্দর আর স্নিগ্ধ নারী আমাদের নাজেরা। তুমি তো কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্যে মুখরিত। উপরটাই চকচকা।

জাহেরার সুন্দর মুখটা চুপসে আসলো। তাযিনকে জিজ্ঞেস করা উচিৎ হয়নি বুঝতে বাকি রইলো না। এই ছেলে যে সব সময়েই একরোখা সেটা জাহেরা জানতো।
দরজার ওপাশ থেকে নিহাল সমস্ত কিছুর সাক্ষী হয়ে রইলো। জাহেরা কি করবে বুঝতে না পেরে নিহালকে জোরে ডাকতে লাগলো

নিহাল ভাইয়া! এদিকে আসো।

যেহেতু নিহালকে ডাকা হয়েছে, আর সবাই তাকে দেখে ফেলছে তাই নিহাল জাহেরার ডাক উপেক্ষা করতে পারলো না। ভদ্র ও শান্ত ভাবে রুমে প্রবেশ করলো।

ড্রেসিং টেবিলে থাকা আলতার কৌটাটা নিহালের হাতে দিয়ে জাহেরা বললো, আমাকে একটু আলতা লাগিয়ে দেও তো নিহাল ভাইয়া।

নিহাল ব্রু কুঁচকে তাকালো জাহেরা দিকে। একটু আগেই আলতা লাগিয়ে দেওয়ার দৃশ্য সে উপভোগ করেছে কিন্তু এখন জাহেরার প্রস্তাবে মাথা ঝিমাচ্ছে। জাহেরা ঠিক কোন অধিকারে এমন প্রস্তাব করেছে নিহালের বুঝে আসছে না। তবে এতোটুকু ঠিকই বুঝতে পারছে যে, জাহেরা নিজেকে জাহির করার জন্য, বড় করে দেখানোর জন্য এবং নাজেরার সমপরিমাণ হতে পাল্লা দিচ্ছে। কিন্তু নিহালের অশান্ত মন খুব করে বলছিলো সে নাজেরার হাসি মুখ দেখতে চায় পৃথিবীর যেকোনো কিছুর মূল্যে। কেনো চায় জানে না। এই অদ্ভুত চাওয়া আগে কখনো মনে উদয়ন হয়নি তো। তবে আজ কেনো হলো!

নিহাল ভাইয়া! কিছু বলছি তোমাকে।

নিহাল জাহেরার হাত থেকে কৌটাটা নিয়ে আগের জায়গায় রেখে দিলো। হালকা হেঁসে বললো, খিদে পেয়েছে। খাবো চল।

জাহেরার হাত ধরে টেনে নিয়ে বের হয়ে গেলো। যাওয়ার আগে নাজেরার থমথমে মুখশ্রীর দিকে দৃষ্টি দিতে ভুললো না। যদিও ওমন থমথমে মুখশ্রী দেখে হৃদয়ের একটা কোণে কেমন চিনচিন করছে যেনো।

বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা হয়েছে। নিহাল হাসফাস করছে। সে-ই তখন থেকে সবাই মিলে জোর করছে আজকের রাতটা থেকে যেতে। কিন্তু নিহাল নারাজ। তার মনে হয়, এতো বড় যুবক ছেলে দূরসম্পর্কের আত্নীয়দের বাড়িতে রাত কাটানো উচিত না। কিন্তু জাহেরা আজকে কোনো ভাবেই যাবে না। সে দুই একদিন থেকে তবেই যাবে। এতে অবশ্য নিহালের আপত্তি নেই। সে সম্মতি দিয়ে বলেছে, জাহেরা থাকুক আমি বরং চলে যাই।

ওমনি জাহেরা ন্যাকা কান্না শুরু হয়েছে। আর নূরজাহান নাকের ঢগা ফুলিয়ে বলছে, আমার ছোট বোনটা একটু শখ করেছে নিহাল। থেকে গেলে কি এমন হবে। জাহু পরে একা যাবে কি ভাবে!

নিহালের অসহ্য লাগে এসব। কিন্তু কিছু করার নেই সহ্য করতে হবে দুই বোনকে। শুধু সহ্যই না হাসি মুখে সহ্য করতে হবে।

ছাঁদে শীতকালীন আড্ডা জমেছে। পাশেই ধোঁয়া উঠা আগুন জ্বালানো হয়েছে। নাসির উদ্দীন আর তার বড় মেয়ে আগুনে হাত দিয়ে তাপ নিচ্ছে। চোখে মুখে উপচে পড়া আনন্দ। তাযিন হাজেরার ছোট বাচ্চা নিহারার সাথে দুষ্টমি করছে। নাজেরা নিচে এসেছে চা বানিয়ে নিবে বিধায়।

জামেনা খাতুন বসে বসে ঝিমাচ্ছে আর তসবিহ জপছে। নাজেরা কিচেনে টুকটাক শব্দ করতেই জামেনার ঝিমানোতে ব্যঘাত ঘটলো। জামেনা গলা ঝেড়ে ডাকলেন—

নাজেরা! তোমার বাবা কোথায়?

চায়ের পাতিলে পানি টগবগ করে ফুটছে। কিচেনের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে পাশের বাড়ির ছাঁদের রেলিং এ দুটো পাখি কিচিরমিচির করছে। ঝগড়া অভিমান কিংবা অভিযোগ চলছে তাদের মধ্যে। নাজেরা বোধহয় কিছু ভাবছে কিন্তু কি ভাবছে বা কোন জগতে আছে সেই খেয়াল মস্তিষ্ক ধারন করতে পারেনি।

জামিনা খাতুন মানিককে ডেকে বললো, মানিক! ও মানিক! সবাই কি একসাথে মরলো নাকি!

মানিক বাজারে গিয়েছে মাত্রই কিছুক্ষন আগে। পাঠিয়েছে জামিনা নিজেই। ভেবেছিলো মেহমানরা চলে যাবে কিন্তু যায়নি তারউপর বড় মেয়ে আর তার বাবাও এখন বাড়িতে। কিছু প্রয়োজনীয় বাজার-সদাই লাগবে।

নাজেরা চুলা থেকে চা নামিয়ে ড্রয়িং রুমে এসে জিজ্ঞেস করলো, কিছু লাগবে আম্মু?

মেহমানদের নাস্তার ব্যবস্থা করতে বলো মালেকাকে ডেকে।

নাজেরা নিচুস্বরে বললো, মালেকা খালা তো বাড়ি চলে গিয়েছে আম্মু। আমি নাস্তার ব্যবস্থা করবো?

জামিনার মুখশ্রীতে বিরক্তি ফুটে উঠলো। নাজেরার হাসি পেলো এটা ভেবে যে, আজকে কাজ করার জন্য অনুমতি নিতে হচ্ছে। অথচ অন্য সময় কাজ থেকে ছাড়া পেতে মনটা ছটফট করতে থাকে। কিন্তু ছাড়া পায় না।

জামিনা বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। উঁকিঝুকি মেরে জিজ্ঞেস করলো, তুমি কি করছিলে কিচেনে??

নাজেরা একটু তাড়া দিয়ে বললো, ওহ হ্যাঁ! চা নিয়ে ছাঁদে যেতে হবে আম্মু। চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। আমি বরং যা-ই।

জামিনা কিছু বলার আগেই নাজেরা কেটে পড়লো। জামিনা খুবই বিরক্ত হলো। জানা কথাই নাসির উদ্দীন বাড়িতে আসলে মেয়েটা সাপের পাঁচ পা দেখে। সারাক্ষণ উড়তে থাকে। জামিনা তো ঠিক এ জন্যই চায় নাসির চট্টগ্রামই থাকুক বাড়িতে থাকার দরকার নেই।

ছাঁদের দরজাতে পা রাখতেই বেশ ধোঁয়ার গন্ধ নাকে বাজলো। নাজেরা ভয় পেয়ে এগুতেই দেখলো আগুন নিবে প্রচন্ড কালো ধোঁয়া উড়ছে। কাছে এসে চায়ের কাপগুলো রেখে বললো, কি করছো টা কি তোমরা? আগুন নিবিয়ে এমন ধোঁয়া করছো। পাশের বাসার মানুষদের অসুবিধা হতে পারে।

তাযিন নাজেরাকে বাঁধা দিয়ে বললো, আহা! তুই দূরে সর। আমি দেখছি।

নাজেরা তাযিনকে সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করে বললো, হয়েছে জিলাপি! তুই যে কত অর্কমা আমার জানা আছে।

হাজেরা, তার মেয়ে, নাসির উদ্দীন সবাই কিছুটা দূরে সরে আসলো। নাজেরা খুব চেষ্টা করে দ্রুতই আগুন ফিরিয়ে আনলো। ধোঁয়ায় চোখ মুখে অন্ধকার দেখছিলো। নাক মুখ আর চোখ লাল হয়ে গিয়েছে মেয়েটার।

নাসির উদ্দীনের কাছে এসে বললো, বাবা দ্রুত চায়ে চুমুক দেন। ঠান্ডা হয়ে গেলো তো। পাঁচ কাপ চা এনেছিলো। তাযিন, নাজেরা হাজেরা আর নাসির উদ্দীন মিলে চারজন। আরও এককাপ বেশি এনেছে যদি নিহারা চেয়ে বসে বাচ্চা মানুষ বলে কথা।

কিন্তু বিপত্তি বাঁধলো যখন দেখলো নিহাল আর জাহেরাও ছাঁদে উপস্থিত। ট্রে তে নিহারা আর নাজেরার চায়ের কাপ অবিশিষ্ট। নাজেরা তাযিনের কানে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো — এরা আসছে কখন?

চায়ের চুমুক দিয়ে তাযিন চোখ বন্ধ করে বললো, আহা! তোর হাতের চা মানেই অমৃত।

নাজেরা বিরক্ত হয়ে বললো, পরের বার বিষ মিশিয়ে দিবো। জিজ্ঞেস করি কি! আর সে উত্তর দেয় কি! জিলাপি কোথাকার!

তাযিন নাক ফুলিয়ে বললো, আরে তুই যাওয়ার পরেই এসেছে। ধোঁয়ার জন্য দূরে গিয়ে বসেছে আর তুইও বোধহয় ধোঁয়ার জন্য খেয়াল করিস নাই।

তাযিন আর নাজেরার কথার মাঝেই জাহেরা কাছে চলে আসলো। নাজেরা দ্রুত একটা চায়ের কাপ জাহেরার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো, এটা তোমার জন্য জাহু!

জাহেরা স্মিত হেঁসে চায়ের কাপ হাতে নিলো, ফ্লোরে বিছিয়ে রাখা পাটিতে তাযিনের সাথে বসলো। নাজেরা আড়চোখে একটু দূরের মানুষটাকে দেখলো। জাহেরার চোখে পড়ে গেলো সেই দৃশ্য। জাহেরা অবিশিষ্ট থাকা চায়ের কাপের দিকে তাকালো, এরপর নাজেরার দিকে তাকিয়ে বললো, নাজরু আপু! বসে আছো যে? চা তো শরবত হয়ে গেলো। যা-ও নিহাল ভাইয়াকে দিয়ে আসো।

নাজেরা কিছু না ভেবে নিজের কাপের চা নিহালের জন্য নিয়ে যেতে পা বাড়ালো। কেমন অস্বস্তি লাগছে যেনো। চা টাও কিছুটা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। এটা দেওয়া উচিৎ হবে??

এসব ভাবতে ভাবতেই নিহালের সামনে এসে দাঁড়ালো। কারো উপস্থিতি টের পেয়ে নিহাল বামে তাকাতেই দেখলো, সেলোয়ার-কামিজ পড়া ছিমছাম গঠনের একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাথায় ঘোমটা, কপালে কানের কাছে অবাধ্য চুলগুলো শীতের ঠান্ডা বাতাসে উড়ছে। গায়ে গরম কাপড় নেই, মৃদু কাঁপছে বোধহয়। চোখ নাক লাল টুকটুকে হয়ে আছে। অন্য সময় হলে নিহাল হয়তো ভাবতো মেয়েটা বোধহয় কেঁদেছে। কিন্তু এখন এমনটা ভাবছে না কারণ বেশ খানিকক্ষণ আগে থেকেই সে নাজেরার কার্যক্রমের সাক্ষী হচ্ছিল।

নাজেরা চায়ের কাপটা এগিয়ে দিয়ে কন্ঠে অপরাধবোধ এনে বললো, ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে বোধহয়। কিছু মনে করবেন না।

নিহাল চায়ের কাপ হাতে নিলো। মেয়েটাকে প্রতিত্তোরে কিছু বলা দরকার। বলা দরকার সে কিছু মনে করেনি৷ বরং খুশী হয়েছে। কিন্তু নিহাল কিছু বলতে পারছে না। নাজেরা মিনমিনে স্বরে বললো, আপনার অসুবিধা হলে গরম করে নিয়ে আসবো?

নিহালের বুকে সাহস আসলো, গম্ভীর আর মোটা স্বরে বললো, জ্বি না! ধন্যবাদ।

নাজেরা একপা পিছিয়ে আসলো। ইচ্ছে করছে এই লোকের সামনে থেকে দৌড়ে পালায়। কিন্তু পারছে না। আর পালাতেই বা চাইবে কেন সেটাও বুঝতে পারছে না। রাতের আলো আধারে লোকটার চেহারাও তো ওতো বুঝা যাচ্ছে না। কিন্তু মনে হচ্ছে মুখশ্রী একটু ভারী, গালে চাপদাড়ি। আচ্ছা হাসলে কি উনাকে অনেক সুন্দর লাগবে?? এসব কি ভাবছে সেটা ভেবেই নাজেরা আরও একবার নিজেকে বকে দিলো।

নিহাল পিছু ডাকলো, শুনুন।

নাজেরা থামলো,জায়গা থেকে নড়লো না,তবে কানে পেতে রইলো।

নিহাল বললো, চা খুব মজা হয়েছে।

নাজেরা এবার একটু ঘুরে দাঁড়িয়ে কিছুটা অবাক স্বরে বললো, খাওয়া শেষ?

নিহাল চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বললো, জ্বি শেষ। ঠান্ডা তো তাই জিহ্বা পুড়ে যাওয়ার ভয় ছিল না। দ্রুত গিলে ফেলছি।

না চাইতেও নাজেরা হুট করে হেঁসে দিলো। মুক্ত দানার মতো হাসি। আর ঠান্ডা চায়ের কথা ভেবে একটু লজ্জাও লাগলো। নাজেরা আবারও অপরাধ বোধ নিয়ে বললো, আসলে ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। খুবই লজ্জা লাগছে মেহমানকে ঠান্ডা চা খাইয়ে দিলাম। কিছু মনে রাখবেন না প্লিজ।

নিহাল অদ্ভুত কন্ঠে শুধালো, কিছুই মনে রাখবো না?

নাজেরা অস্থির হয়ে বললো, তার মানে মনে রাখবেন?

নিহাল শান্ত কন্ঠে বললো, মনে রাখতে হবে না। থেকে যাবে।

নাজেরা একটু অধিকার খাটিয়ে বললো, আচ্ছা আমি আবারও ভালো আর গরম গরম চা খাওয়াবো আপনাকে। এতে হবে? শোধবোধ করে নিবেন তো?

নিহাল বসা থেকে উঠলো। একটু এগিয়ে এসে বললো, শোধবোধ চাচ্ছি না।

তাহলে কি চাচ্ছেন?

কিছু চাইতেই হবে??

নাজেরা একটু নড়েচড়ে উঠে বললো, না মানে! ওই চায়ের,

নিহাল থামিয়ে দিয়ে বললো, আচ্ছা! চাচ্ছি তবে!

নাজেরা হালকা হেঁসে বললো, জ্বি বলুন?

নিহাল কিছুটা দূরে সরে গেলো। ছাঁদের রেলিং এ হাত রেখে দাঁড়ালো। কিছুক্ষণ পর নাজেরা দিকে তাকিয়ে বললো, আরও একবার আপনার মুখের ওই হাসি দেখতে চাই। দেখাবেন??

চলেব…….

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ