Saturday, June 6, 2026







বাড়ি"ধারাবাহিক গল্প"প্রণয় প্রত্যাবর্তনপ্রণয় প্রত্যাবর্তন পর্ব-৫+৬

প্রণয় প্রত্যাবর্তন পর্ব-৫+৬

#প্রণয়_প্রত্যাবর্তন🖤 [পর্ব-০৫]
~আফিয়া আফরিন

শাঁখারিয়া গ্রাম পেরিয়ে আরও দুটো গ্রাম গেলেই পড়ে মিঠাই পুকুর।
এই গ্রামটা ছিমছাম, শান্তশিষ্ট। কোন ঝুট ঝামেলার বালাই নেই বললেই চলে। গ্রামের একেবারে কোণের দিকে ছোট্ট একটা বাড়ি। বাড়ির কার্নিশে একজোড়া শালিকের বাসা। দু’টো পাখি ডাল বদল করছে, মাঝে মাঝে ডানা ঝাপটে নিজেদের মতো করে সময় কাটাচ্ছে।
দুপুরের রোদটা চড়া, উঠোনটা একেবারে শুকনো, মাটির ফাটলে ফাটলে ধুলো জমে আছে। হাওয়া নেই বললেই চলে, সবকিছু থমকে আছে রোদের তাপে। বাড়ির সামনে বাঁশের দড়িতে কয়েকটা কাপড় ঝুলছে। একটা বেগুনি রঙের শাড়ি, একটা শার্ট আর ছোট বাচ্চার কয়েকটা কাপড়। পুবের পুকুরের দিক থেকে কাদার গন্ধ ভেসে আসছে। অরুনিমা বারান্দায় চাটাই পেতে বসে আছে। ওর ছয় বছরের ছেলে শান্ত পাশেই গুটি আর কাঠি নিয়ে খেলছে, “মা এইটা দেখো।” শান্ত গুটি সাজাতে সাজাতে বলছে, “এইটা আমার বাড়ি, এইটা দোকান।”

অরুনিমা হেসে উঠল, “বেশ! তোমার বাড়িতে কে কে থাকবে বাবা?”

শান্ত গুটি সাজানো থামিয়ে মাথা তুলে তাকাল, “তুমি আর বাবা।” বেশ গম্ভীর গলায় বলল ও। অরুনিমা ছেলেটাকে কাছে টেনে নিল। ছেলেটার চুলে হাত বুলিয়ে দিল। আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে এলোমেলো চুলে আদর জমে রইল। মা-ছেলের এই খুনসুটির মাঝেই হঠাৎ উঠোনে প্রায় ঝড়ের গতিতে দৌড়ে ঢুকল প্রণয়। প্যানিক আক্রান্তের মত দেখাচ্ছে তাকে। অরুনিমা উঠে দাঁড়াল। প্রণয় নিজেকে সামলে বলল, “শান্ত, আব্বু তুমি বাইরে খেলো। আম্মুর সাথে কথা আছে।”

শান্ত কিছু না বুঝেই উঠোনে চলে গেল। প্রণয় অরুনিমার হাত ধরে ঘরের ভেতর টেনে নিল। উন্মত্তের মতো বলল, “সর্বনাশ হয়ে গেছে।”

অরুনিমা আঁতকে উঠল। এতক্ষন শুধুমাত্র প্রণয়কে দেখছিল। চাপা কন্ঠে প্রশ্ন করল, “কি সর্বনাশ? কি হয়েছে? এইভাবে হন্তদন্ত হয়ে কোথা থেকে এলে?”

প্রণয় একবার দরজার দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল, “ময়ূরী খুন হয়েছে।”

“কীহহহহ?” অরুনিমার মুখ থেকে শব্দটা বেরিয়ে এলো প্রায় আর্তচিৎকার হয়ে। অরুনিমার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রণয় এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। কোথা থেকে শুরু করবে, সেটা ঠিক করতে পারছে না। গলাটা শুকিয়ে আসছিল। শুকনো ঢোক গিলেই বলল, “ও আত্মহত্যা করে নাই অরু, ওকে খুন করা হইছে।”

অরুনিমার চোখ দুটো পাথরের মতো স্থির হয়ে গেল, “কি বলছ তুমি?”

এরপর প্রণয় নিঃশ্বাস ছেড়ে দ্রুত সমস্ত ঘটনা, যা সে শুনে এসেছে নিজের চোখে দেখেছে, সব বলতে লাগল। অরুনিমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল, “সবাই তো বলছিল…”

“সব মিথ্যা।” প্রণয় জোর দিল, “ইয়াসিফের সন্দেহ হয়। সে শহরে গিয়ে বড় অফিসারের সাথে কথা বলে। আবার পোস্টমর্টেম করায় গোপনে। ওইখানেই উঠে আসে আসল সত্য।”

অরুনিমা দেয়ালে ভর দিয়ে দাঁড়াল, “এখন ওখানকার কি অবস্থা? আমি কি একবারও যেতে পারবো না? বলো, প্রণয় কে করেছে এই কাজ? আগে বলো, এত ঘটনা জানলে কি করে যেহেতু আত্মহত্যা বলেই ঘটনাকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ”

প্রণয়ের কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো, “লাশ আবার তোলা হয়েছে। ইয়াসিফ আর মৃন্ময়ীর সাহায্য করেছে। ওরা এই বিষয়টা সম্পূর্ণ গোপনে করেছে। তদন্ত শেষে আবার দাফন করার জন্য গ্রামে ফিরছে। এখন আর ঘটনা গোপন নাই। সব জানাজানি হয়ে গেছে।”

অরুনিমার চোখের সামনে ভেসে উঠল ময়ূরীর মুখ। ওর প্রাণবন্ত হাসিটা, চোখের ভাষা। অরুনিমা ছলছল চোখে প্রণয়ের দিকে তাকাল। চোখের কোণে জল জমে আছে, কিন্তু পড়ছে না। অভিমান আর রাগে আটকে আছে। গলা ধরে এসেছে তবুও তীক্ষ্ণ কন্ঠে প্রশ্নটা করল, “কে করেছে এই কাজ?”

প্রণয় চুপ করে রইল। নামটা উচ্চারণ করলেই বাতাস বিষিয়ে উঠবে সাথে অরুনিমাও। তারপর মৃদুস্বরে বলল, “আমি যেটুকু শুনেছি, জমিদারের ছেলে ছাড়া আর কারও নাম মাথায় আসে না।”

অরুনিমার শরীরটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল। চোখের পানি আর আটকে রাখতে পারল না। আক্রোশে গলা কেঁপে উঠল, “তাওহীদ?” নামটা উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে মুখটা লাল হয়ে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে ধরল ও। এতদিনের চেপে রাখা ক্ষোভ এক লহমায় ফেটে বেরোতে চাইছে। প্রণয় নীরবে মাথা নাড়ল, “হুম।” তারপর এক পা এগিয়ে এসে অরুনিমার কাঁধে হাত রাখল। সামান্য অভয়দানের চেষ্টা করল। নিচু গলায় বলল, “একা না, আরো অনেকেই আছে।”

অরুনিমা প্রণয়ের হাতটা চেপে ধরল। ভেজা চোখে তাকিয়ে বলল, “ওরা কি ওদের পাপের শাস্তি কোনোদিনও পাবে না প্রণয়? বলো, এইসব মানুষ কি এভাবেই পার পেয়ে যায়?” গলদেশ ভেঙে গেল শেষ কথাটায়। এতদিন চুপ করে থাকায়, মাথা নিচু করে বেঁচে থাকায় বুকের ভেতর জমে থাকা বিষ আজ উপচে পড়ছে। একটু দম নিয়ে স্পষ্ট কণ্ঠে বলল, “আমাকে একবার নিয়ে যাবে প্লিজ! আমি একটু যেতে চাই, আমি নিজে দেখতে চাই। কতদিন যাইনা বলতো?”

প্রণয় অরুনিমার মুখের দিকে তাকাল। তারপর ওর হাতটা ছাড়িয়ে নিল। চোখে চোখ রাখল না। জানালার বাইরে তাকিয়ে খুব শান্ত জমাট বাঁধা গলায় বলল, “একটা কথা বুঝতে হবে তোমাকে… যে মানুষটা সারা দুনিয়ার কাছে মৃত, সে হুট করে আবার জীবিত হয়ে উঠতে পারে না।”

অরুনিমা থমকে গেল। প্রণয় এবার ওর দিকে ফিরে তাকাল, “ওই গ্রামে তুমি মৃত, অরুনিমা। সবার কাছে নদীতে ডুবে যাওয়া একটা গল্প, একটা অতীত! বুঝেছ?” প্রণয় কথাগুলো এতটাই জোর দিয়ে বলল যে তা নিজের গায়েও বিঁধছে, “হঠাৎ যদি তুমি সেখানে গিয়ে দাঁড়াও, তাহলে শুধু তোমার জীবন না, যারা সত্যটা জানতে চাইছে, উদঘাটন করতে চাইছে তাদের সবার গলায় ছুরি ঠেকবে।”

অরুনিমা শূণ্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। গাল বেয়ে অঝোর ধারায় টুপটাপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। প্রণয় স্থির কণ্ঠে শেষ কথাটা বলল, “তোমাকে থাকতে হবে দূরে। জীবিত থেকেও মৃত হয়ে। এটাই এখন তোমার সবচেয়ে বড় পরিচয়।”

শেষ কথাটুকু শোনা মাত্র অরুনিমার ধৈর্য্যর বাঁধ ভাঙল। কতদিন হয়ে গেল! ছয়টা বছর! কম সময়? সারাজীবন কি এইভাবেই বেঁচে থাকতে হবে ওকে? এতক্ষণ যেটুকু শক্তি দিয়ে নিজেকে শক্ত করে ধরে রেখেছিল, মুহূর্তেই তা চুরমার হয়ে গেল। ও দুহাতে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠল। সে কান্না নিঃশব্দ নয়, বুক ফেটে বেরোনো কান্না। তখনই উঠোন থেকে দৌড়ে এলো শান্ত। দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়েই বলল, “মা, মা তুমি কান্না করো কেন? কান্না তো পঁচা মেয়েরা করে!”

ও ছোট ছোট পা ফেলে এগিয়ে এসে মায়ের চোখের পানি মুছিয়ে দিতে হাত বাড়াল। কিন্তু অরুনিমা তখন নিজের ভেতরের ঝড় সামলাতে পারল না। একরাশ তাচ্ছিল্য আর অজানা রাগে ও শান্তকে ঠেলে সরিয়ে দিল, “যা এখান থেকে।”

শান্ত হোঁচট খেয়ে থমকে দাঁড়াল। বড় বড় চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। কিছু বলল না। কিছু বোঝারও ক্ষমতা নেই ওর। শুধু অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। এই মা তো একটু আগেও হাসছিল! প্রণয় এগিয়ে এসে শান্তকে কোলে তুলে নিল। বুকের সাথে চেপে ধরে চুলে চুলে হাত বুলিয়ে দিল, “তুমি আমার কাছে আসো বাবা। মায়ের মনটা একটু খারাপ। মন ভালো হলে তারপর আবার মা আদর করবে।”

শান্ত বাবার কাঁধে মুখ গুঁজে দিল। এখানেই সব নিরাপত্তা। বাবা সবসময় এমনই। বাবার বুকে মাথা রাখলে পৃথিবীটা আবার ঠিক হয়ে যায়। শান্তর ছোট্ট মাথার ভেতরে শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খায়, মা’টা যে মাঝে মাঝে এমন হয়ে যায় কেন? এই ভালো, এই খারাপ…
মা’কে বুঝতেই পারে না শান্ত।
.
জমিদার হাজী মকবুল ঘরের মধ্যে অস্থিরভাবে হাঁটতে লাগলেন। প্রতি পা ফেলতেই মেঝে কম্পিত হচ্ছে। দাগিয়ে রাখা দাড়িও রাগে কাঁপছিল, চোখে জ্বলছিল ক্রোধের আগুন। সবকিছুই আজ তার নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে।
“কী! কীভাবে সব বের হয়ে যাচ্ছে? মোল্লার এত বড় সাহস আমার বিরুদ্ধে যায়? সবকটাকে দেখে নিব, সবকটাকে শেষ করে ফেলব।” তিনি নিজের সঙ্গে কল্পনাত্মক কথা বললেন। জহির মোল্লাকে যে হুমকি ছুড়েছিলেন তা কাজে দেয়নি। চোখ বুজলেই মনে হচ্ছে, আর এক মিনিট সময় পেরোলেই গ্রামের মানুষদের সামনে নিজেই ধুঁকে পড়বেন। এতদিনের খ্যাতি, সম্মান, প্রতিপত্তি এক নিমিষে ধুলোয় মিশে যাবে। দম বন্ধ করা অস্থিরতা, ক্রোধ আর আতঙ্ক একত্র হয়ে জমিদারের বুকের ভেতর একটি অগ্নিকুণ্ড তৈরি করছে। তিনি হঠাৎ থেমে দাঁড়ালেন। চাপা স্বরে আগুন কণ্ঠে চিৎকার দিয়ে ডাকলেন, “তাহমিদ!”

ডাক শুনেই তাহমিদ ঘরে ঢুকল। কিছু বলতে যাবে তার আগেই বাবা বলল, “এইবার তুই নিজ দায়িত্বে তাওহীদকে ঢাকা পৌঁছে দিয়ে আসবি,” জমিদার দাঁত চাপলেন, “আর এক মুহূর্ত দেরি চাই না আমি। হারামজাদাকে আমি আরও সপ্তাহখানেক আগেই শহরে চলে যেতে বলছি। কানে নিচ্ছে না।”

তাহমিদ থমকে গেল। তবে যা শুনছে তা সত্যি? অথচ সে এসবের কিছুই জানেনা। বাবা কি তবে ইন্ধন দাতা? বুকের ভেতর জমে থাকা প্রশ্নটা আর চেপে রাখতে পারল না, “আব্বা বাইরে কিছু কথা শোনা যাচ্ছে। সেসব কি সত্যি?”

তার নিষ্করুণ মুখ। কণ্ঠে বরফের মতো শীতলতা, “সত্য-মিথ্যার বিচার আমি করব। কোনটা সত্য, কোনটা মিথ্যা, সেটা জানার দায়িত্ব আমি কাউকে দেইনি। তোকেও কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নই।”

“কিন্তু আপনাকে নিয়ে…”

“সেসব আমি দেখে নিচ্ছি।” তসবির দানা টানতে টানতে কথাটা কেটে দিলেন তিনি। তাহমিদ আর কিছু বলল না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। ঠিক তখনই দরজার পাশ থেকে তাওহীদ এগিয়ে এলো। তাকে দেখে জমিদার বড় ছেলেকে নির্দেশ করলেন, “দ্রুত যাওয়ার সমস্ত ব্যবস্থা কর।”

তাহমিদ চলে যেতেই তাওহীদ ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “আব্বা, আপনি আমাদের গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে বলছেন? এদের ভয়ে লেজ গুটিয়ে পালানোর মতো প্রাণী অন্তত আমি নই। আপনি শুধু অনুমতি দিন, জহির মোল্লার খেল আমি এখনই খতম করছি।”

“শুধু মোল্লা একা নয়। ইয়াসিন আকন্দের ছেলেটাও আছে। একবার বলুন, দুনিয়ার বুক থেকে নামটাই নিঃশেষ করে দিই।”

জমিদার চোখ মেলে চাইলেন। হঠাৎ বজ্রনির্ঘোষের মতো হুংকার ছাড়লেন, “তাওহীদ! মাথা গরম করিস না। তুই এক্ষুনি গ্রাম ছাড়বি। পুলিশ এসেছে। যা করার আমি করব। যা, এই মুহূর্তে!”
বাবার সেই হুংকারের সামনে তাওহীদের সমস্ত দম্ভ মুহূর্তে চুপসে গেল। আর কোনো কথা বেরোল না মুখ থেকে। রশিদের সহায়তায় দুই ভাই উল্টোপথে দ্রুত পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। ওরা বের হওয়ার দশ মিনিটও হয়নি। বাইরে থেকে হঠাৎ অনেক মানুষের হট্টগোলের শব্দ ভেসে এল। তৎক্ষণাৎ ভেতর থেকে তার স্ত্রী সালেহা দৌড়ে এলেন, “দেখেন! বাহিরে কতডি মানুষ জড়ো অয়েছে! অয়েছেটা কি কিছুই বুঝতে পারতেছি না। আপনে একটু বাইরায় যাইয়া দেখেন।”

জমিদার স্তব্ধ হলেন। চোখে ক্রোধ আর আতঙ্ক মিশ্রিত ভঙ্গিতে দৌড়ে দরজা দিয়ে বাইরে বের হয়ে গেলেন। বাইরে পা রাখতেই থমকে গেলেন তিনি। উঠোন, রাস্তা যেদিকে চোখ যায়, মানুষ আর মানুষ। গ্রামের সব মানুষ যেন একত্রিত হয়েছে। কথার উপর কথা, হইচইয়ে বাতাস ভারী। কেউ চেঁচাচ্ছে, কেউ গালিগালাজ করছে, কেউ আবার শুধু দাঁতে দাঁত চেপে তাকিয়ে আছে। কোনো কথাই স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে না। জমিদার দুই হাত তুলে গলা চড়িয়ে বললেন, “চুপ করেন! এক এক কইরা কথা বলেন!”

কে শোনে কার কথা! ভিড় আরও গর্জে উঠল। সেই হট্টগোল ঠেলে এক মধ্যবয়সী লোক সামনে এগিয়ে এলো। তার কণ্ঠে জমাট ক্ষোভ, “আমরা আপনাকে সম্মান করি ঠিকই। তাই বইলা কি আপনার অবিচার মেনে নেব? এই গ্রাম কি আপনার বাপ-দাদার খাস সম্পত্তি নাকি?”

চারদিক থেকে সায় তুঙ্গে উঠল, “হ ঠিক!”

“ঠিক কইছে!”

লোকটা আবার বলল, “আপনার ছোট ছেলেটাকে ডাকেন। তাওহীদ কই? ওরে সামনে আনেন।”

জমিদারের মুখ শক্ত হয়ে গেল। কিছু বলার আগেই ভিড়ের ভেতর থেকে আরেকজন চেঁচিয়ে উঠল, “মাইয়াডারে মাইরা ফেলাইয়া হুমকি ধামকি দেওয়া হচ্ছে? আমরা গ্রামের মানুষ কি সব মইরা গেছি?”

আরেকজন তীক্ষ্ণকন্ঠে বলল, “এইখানকার পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বানানো! টাকা দিয়া সব চাপা দেওয়া হইছে। এইসব আমরা জাইনা গেছি।”

ভিড় ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠল, “আমরা বিচার চাই!”

“খুনি ছাড় পাবে না!”

“ক্ষমতার জোরে সব ঢাইকা রাখা যাবে না!”

জমিদার আবার গলা তুললেন, “এইসব মিথ্যা কথা! প্রমাণ আছে?”

সঙ্গে সঙ্গে জবাব এলো, “প্রমাণ আছে! ইয়াসিফ বাবার কাছে দ্বিতীয় রিপোর্ট আছে। মাইয়াডারে খুন করছে, ওরে নষ্ট করছে।”

এই কথায় ভিড় একেবারে ফেটে পড়ল। কেউ বলল, “এ গ্রামে আর আপনাদের রাজ চলবো না!”

চারপাশ থেকে একসাথে গর্জন উঠল, “ডাকেন তাওহীদকে!”

“ডাকেন!”

“ডাকেন!”

“আমরা শুধু অপরাধীর বিচার চাই। আপনার ছেলে যদি নির্দোষ হয়, সামনে আনেন। আর দোষী হলে, তাকে বাঁচানোর চেষ্টা কইরেন না।”

জমিদার দুই হাত তুললেন। গলার স্বর নামালেন, যেন ভিড়ের উত্তাপ ঠান্ডা করা যায়। চোখে মুখে সেই চেনা ধর্মভীরু ভাব আনলেন। ভারী কন্ঠে বললেন, “শুনেন… শুনেন আপনারা, এইভাবে চেঁচাইলে কোনো সত্য বের হইবো না।”

ভিড়ের আওয়াজ একটু কমল। জমিদার সেই সুযোগটাই কাজে লাগালেন। তিনি বললেন, “প্রথম কথা, আমার ছেলে এখন এইখানে নাই। সে ঢাকা শহরে গেছে। নতুন চাকরি পাইছে আপনাদের দোয়ায়।” একটু থেমে চারপাশে তাকালেন। গলায় ধর্মের আস্তরণ, “আপনারা তো জানেন, আমি হাজী মানুষ। নামাজ-কালাম করি। আল্লাহর ভয়ে চলি। আমি কি আমার ছেলেদের এই শিক্ষা দিছি? এমন নোংরা কাজ?”

কেউ কিছু বলার আগেই তিনি এগিয়ে গেলেন, “তাওহীদের মাথা একটু গরম, এইটা ঠিক। কিন্তু তাই বলে খুন? ধর্ষণ?” ভিড়ের মধ্যে ফিসফিস শুরু হলো। জমিদার সুযোগ বুঝে আরও নিচু স্বরে বললেন, “সত্যি কইতে কি, মাইয়ার চরিত্র আগে থেকেই ভালো ছিল না। চরিত্র ভালো থাকলে মাইয়া পেরেম করে? দেখেন গিয়া, আকন্দের পোলার লগে কিছু হয়েছিল তাই আত্মহত্যা করছে। আগের পোস্টমর্টেমে সব পরিষ্কার।”

তিনি তসবির দানা থামিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, “এই যে পরে যে রিপোর্ট বের হইছে, এইটা বানানো। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কিছু লোক চায় গ্রামে আগুন লাগাইতে, আমার সম্মান নষ্ট করতে।” ভিড়ের দিকে আঙুল তুলে বললেন, “আপনারা বুদ্ধিমান মানুষ। গুজবে কান দিলে চলবে? প্রমাণ ছাড়া একজন হাজী মানুষ আর তার পরিবারকে এভাবে অপদস্থ করা কি ঠিক?”

লোকদের মধ্যে ফিসফিসানি শুরু হয়ে গেছে। তারা তো শুধুমাত্র জহির মোল্লার থেকে ঘটনার বিস্তারিত শুনেই দৌড়ে এসেছে। এখন কেউ কেউ পিছিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে জমিদারের কথাই ঠিক। তিনি ধর্মপ্রাণ মানুষ, তার পরিবার এত খারাপ হবে? কখনোই না। হাজী মকবুল শেষে প্রায় মিনতির সুরে যোগ করলেন, “আমি আপনাদেরই লোক। এই গ্রামই আমার সব। আপনারা যদি চান, আমি নিজে তদন্তে সহযোগিতা করবো। কিন্তু এইভাবে বিচার করলে সত্য মরে যাবে।”

জমিদারের কথায় অনেকের মুখে দ্বিধা নেমে এলো। সন্দেহ আর ক্ষোভ, দুটোই রইল। কেউ কেউ ক্ষমা চেয়ে বিদায় নিল। জমিদার কুটিল হাসলেন। তাকে পাকড়াও করা এত সহজ? ইয়াসিফ শাহরিয়ার! জহির মোল্লা! হাঁটুর বয়সী এই মানুষগুলো তাকে টপকাবে? অসম্ভব।
.
ময়ূরীর দাফনটা আবার হলো। কিন্তু শোকটা আর আগের মতো ছিল না। যেটা একবার মিইয়ে গিয়েছিল, সেটা এবার নতুন করে মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। আগুনে ঘি ঢালার মতো। কান্না ছিল কিন্তু তারচেয়েও বেশি ছিল চাপা ক্ষোভ, দাঁতে দাঁত চেপে রাখা রাগ। ইয়াসিফ তখনো পুলিশের নজরদারির ভেতর। জিজ্ঞাসাবাদ, কাগজপত্র পেরিয়ে বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। দাফনেও থাকতে পারল না। ভেতরে ভেতরে রক্ত গরম হয়ে উঠছিল তার। মনে হচ্ছিল, এসব ঝামেলা যদি না থাকতো তবে এতক্ষণে তাওহীদের লাশ রাস্তায় পড়ে থাকত এবং কুকুর শিয়ালে কুঁড়ে কুঁড়ে খেত। কিন্তু এখন আবেগ দিয়ে কিছু করার সুযোগ নেই, সেটা সে নিজেও জানে। পুলিশ নতুন করে কেস ফাইল করেছে। সবকিছু একদম শুরু থেকে। সব নোট করতে করতেই সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। অফিসার সিদ্ধান্ত নিল, কাল সকালে জমিদার সাহেবের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা হবে। এই ফাঁকে ইয়াসিফ গ্রামের মানুষদের থেকে খবর পেল, তাওহীদ নাকি গ্রামে নেই। শহরে চলে গেছে। ইয়াসিফ দাঁতে দাঁত চেপে ছুরির মতো ধারালো কণ্ঠে বলল, “গ্রামে নেই তো কী হয়েছে? সাত সমুদ্র তেরো নদী পাড়ি দিলেও, জানোয়ারটা আমার হাতের বাইরে যাবে না। যেখানে লুকাক, যেভাবেই লুকাক… ময়ূরীর রক্তের হিসাব ওকে দিতেই হবে।”

রাতটা অস্বাভাবিক রকমের নিস্তব্ধ। দিনভর কান্না, হাহাকারে এই বাড়ির মানুষগুলো ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। মনের সাথে শরীরটাও ভেঙে গেছে। রওশান আরা নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছে। মৃন্ময়ী চোখ মেলে তাকিয়ে আছে অন্ধকারে। কেউ কথা বলার শক্তি পাচ্ছে না। ঠিক তখনই, বাড়ির সামনের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। ঠক। ঠক। জহির মোল্লা আঁতকে উঠলেন। চোখের কোণ মুছতে মুছতে উঠে দাঁড়ালেন। এত রাতে কে এসেছে? গ্রামের কেউ? তিনি দরজার কাছে গিয়ে কাঠের খিলটা সরালেন। দরজা খুলতেই কিছু বুঝে ওঠার আগেই শরীরটা ঝাঁকুনি খেল। ঠান্ডা কিছু একটা বুকের ভেতর ঢুকে গেল।
একটা না, পরপর কয়েকবার ছু’রির আঘাত। জহির মোল্লার চোখ বড় হয়ে গেল। মুখ খুলে চিৎকার করতে চাইলেও গলা থেকে কোনো শব্দ বেরোল না। বাতাস আটকে গেল ফুসফুসে। পা দুটো আর শরীরের ভার নিতে পারল না। তিনি মাটিতে ঢলে পড়লেন। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছায়াগুলো এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। ঠিক যেভাবে এসেছিল, নিঃশব্দে সেভাবেই অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
.
.
.
চলবে….

#প্রণয়_প্রত্যাবর্তন🖤 [পর্ব-০৬]
~আফিয়া আফরিন

রশিদ একবার পেছনে তাকাল। কাজ শেষ, নিশ্চিত। নিঃশব্দে হাত ইশারায় দলবলকে কাছে ডাকল। কেউ কথা বলল না। ওরা রওনা হলো। গন্তব্য, আকন্দ বাড়ি। গ্রামের সরু মাটির পথ ধরে ছায়ার মতো এগোতে লাগল কয়েকটা অবয়ব। পায়ের শব্দ ঢেকে দিচ্ছে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, দূরে কোথাও কুকুরের ক্ষীণ চিৎকার। রাতটা যেন সব দেখে ফেলেও কিছু না দেখার ভান করছে। সবার সামনে একজন। তার হাতে ছু-রিটা। রক্তে ভেজা ছু-রির ধারটা চাঁদের আলোতে মৃদু ঝিলিক দিচ্ছে। যেন আলো ছুঁতে চায়, আবার লুকোতেও চায়। ছুরির রক্ত তাজা, এখনো শুকায়নি। ছু-রির গা বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা করে মাটিতে পড়ছে আবার পেছনের জনের পায়ের চাপায় মিলিয়ে যাচ্ছে।
রাত প্রায় দু’টো। আকন্দ বাড়ির চারপাশে অন্ধকার এমনভাবে চেপে বসেছে, যেন আলো বলে কিছু যে আছে তাই সকলে ভুলে গেছে। দূরের হ্যারিকেনগুলোর ক্ষীণ আলো এখানে পৌঁছায় না। নিস্তব্ধতা এত ঘন যে নিজের নিঃশ্বাসের শব্দও কানে লাগে। রশিদ আর তার দল থেমে গেল বাড়িটার সামনে। তাহের আকন্দকে বিকেলেই দেখা গেছে পূর্বপাড়ায় ভাইয়ের বাড়ির দিকে যেতে। সে আজ আর ফিরবে না বাড়িটা আজ ফাঁকা। যদিও আকন্দ সাহেবের স্ত্রী রয়েছে তবুও ছেলেমানুষ ইয়াসিফ একলাই। রশিদের ঠোঁটের কোণে নিষ্ঠুর নিষিদ্ধ একটা হাসি খেলল। আজ রাতের শিকার সে-ই। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একজন হাত তুলল। ঠক। ঠক। কড়া নাড়ার শব্দটা রাতের বুক চিরে ভেতরে ঢুকে গেল।
অনেকক্ষণ পর ভেতর থেকে একটা চাপা আওয়াজ ভেসে এলো, “কে?”

ইয়াসিফের গলা। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলো নিঃশ্বাস চেপে ধরল। কেউ কোনো শব্দ করল না। ভেতরের পায়ের শব্দ ক্রমশ এগিয়ে আসছে। কাঠের দরজায় কান পেতে ইয়াসিফ আবার সেই প্রশ্ন করল, “কে?”

রশিদ গলা খাঁকারি দিল। কণ্ঠটাকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল, “ভাই… আমি।”

ভেতর থেকে সঙ্গে সঙ্গে জবাব এল, “আমি কে? এই রাতের বেলা কি দরকার?”

রশিদ একটু থামল। তারপর বলল, “ভাই, আমি পাশের গ্রামের সাইফ। আপনার আব্বা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ছে। খুব খারাপ অবস্থা। একটু আসলে ভালো হয়।”

ইয়াসিফের ভুরু কুঁচকে গেল। একটু সন্দেহ হলেও পাত্তা দিল না। দরজার খিলটা খুলতেই কাঠের পাত দু’খানা সরে গেল। সে ঠিক বুঝে ওঠার আগেই, অন্ধকারের ভেতর থেকে একটা ছুরির ফলা ঝাঁপিয়ে পড়ল। ঝকঝকে একটা ঝিলিক। ইয়াসিফ প্রতিক্ষণে পিছিয়ে গেল। ছুরিটা শূন্যে কোপ মারল। সামান্য এক ইঞ্চির জন্য বেঁচে গেল সে। হাতের টর্চলাইটটা পড়ে যায়নি, শক্ত করে ধরা ছিল। তৎক্ষণাৎ আলোটা সামনে ফেলল। সাদা আলোয় মুহূর্তেই মুখটা স্পষ্ট হয়ে উঠল।
রশিদ! জমিদারের খাস লোক। ইয়াসিফ দাঁত চেপে বলল, “রশিদ? তুই?”

রশিদ ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে উঠল। পেছন থেকে আরেকজন এগিয়ে এলো। চেহারায় বিষ মাখানো হাসি। রশিদ তার দিকে তাকিয়ে বলল, “টার্গেট মিস করছ ক্যা? দে চাকু মাইরা সানডে-মানডে ক্লোজ কইরা দে।”

ইয়াসিফ এক ঝটকায় নিজেকে সামলে নিল। পা দুটো শক্ত করে মাটিতে গেঁথে দাঁড়াল। টর্চের আলোটা সোজা লোকটার চোখে মারল। মুহূর্তের জন্য লোকটা চোখ কুঁচকে ফেলল। সেই ফাঁকে ইয়াসিফ পাশে রাখা কাঠের চেয়ারটা টেনে নিয়ে ঢাল বানাল। ছুরির কোপ পড়ল চেয়ারের গায়ে। কাঠ ফেটে গেল। সে পিছিয়ে গেল না বরং চেয়ারটা ঘুরিয়ে সামনে থাকা একজনের পায়ে সজোরে ঠেলে দিল। লোকটা ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গেল।
আরেকজন পেছন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইতেই ইয়াসিফ দরজার পাল্লা ঠেলে বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু ওরা সংখ্যায় বেশি। চারদিক থেকে ধস্তাধস্তি, ধাক্কা আর অনবরত গালিগালাজ চলছে। কয়েক মুহূর্তের প্রতিরক্ষা সম্ভব হলো মাত্র। তারপরই শক্তি ফুরোতে লাগল। এতগুলো অস্ত্রধারী মানুষের সাথে একা অস্ত্রহীন হয়ে লড়াই করা সম্ভব হচ্ছে না, কপাল বেয়ে ঘাম নামছে। ঠিক তখনই, বাড়ির ভেতরে একের পর এক বাতি জ্বলে উঠল। মায়ের কণ্ঠ ফেটে বেরিয়ে এলো, “ইয়াসিফ বাবা কই তুই? কি হচ্ছে? বাইরে এত চেঁচামেচি কেন? কারা এলো?”

মায়ের কণ্ঠটা কানে পৌঁছাতেই ইয়াসিফের মনোযোগটা নড়েচড়ে গেল।
এক মুহূর্তের জন্য দৃষ্টি সরে গেল ওদের দিকে থেকে।
“মা…” বলার আগেই ঝলসে উঠল ছুরির ফলার আলো। প্রথম কোপটা এসে লাগল ডান কাঁধের নিচে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দ্বিতীয় কোপটা পড়ল পিঠের উপর দিকে। রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল। ইয়াসিফ হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। দাঁত চেপে আর্তনাদটা গিলে ফেলতে চাইল, কিন্তু পারল না। চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসছে। ঠিক সেই সময় ভেতর থেকে দরজা খুলে যাওয়ার শব্দ। মায়ের আতঙ্কিত চিৎকার, “ইয়াসিফ, বাবা…”

এই চিৎকারটা ওদের জন্য সংকেত ছিল। রশিদ দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলল, “চল। দ্রুত চল, মানুষজন আইয়া পড়লে সব্বনাশ হয়ে যাইব।”
আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ছায়ার মতো সবাই মিলিয়ে গেল। রাতের আঁধারে মিলিয়ে যেতে সমস্যা হলো না। ইয়াসিফ মাটিতে পড়ে রইল। রক্তে ভিজে গেছে কাপড়। কান ঝাঁঝরা করা মায়ের কান্না আর ডাকের ভেতরেই সে অজ্ঞান হয়ে গেল।
চিৎকার আর হইচই শুনে আশপাশের ঘরগুলোও জেগে উঠল। কে কোথা থেকে বেরিয়ে এলো কেউ বুঝে ওঠার আগেই উঠোন ভরে গেল মানুষে। কেই হারিকেন হাতে, কেই টর্চ হাতে আবার আলো-আঁধারির ভেতরেই কারো কারো চোখে পড়ল উঠোনে রক্তে ভেসে থাকা ইয়াসিফকে। একজন দৌড়ে এসে আহাজারি শুরু করল, “আল্লাহ আল্লাহ! এইডা কী হইল? ইয়াসিফরে কে মারল রে?”

উদ্বেগ আর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল মুহূর্তেই। একজন তার মাকে সামলাতে গেল কিন্তু তিনি অনবরত ইয়াসিফের অচেতন দেহ ঝাঁকিয়ে ডাকছে, “ইয়াসিফ, চোখ খোল বাবা… কথা ক!”

রক্ত বন্ধ করার জন্য একজন গামছা চেপে ধরল, আরেকজন দৌড়ে গিয়ে ভ্যান আনল। আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। সবাই মিলে সাবধানে তাকে তুলে নিল। হারিকেনের আলো দুলতে দুলতে সামনে চলল, পেছনে ছুটল মানুষ। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে একটাই কথা ভেসে বেড়াচ্ছে, “হাসপাতালে নিতে হবে, তাড়াতাড়ি। রক্ত বন্ধ করা যাইতেছে না কোনোভাবেই। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে।”

মানুষ বুঝতে পারল না, কী হচ্ছে হঠাৎ? তাদের শান্তশিষ্ট গ্রামীণ জীবনে কার নজর লাগল? তবে শাঁখারিয়া গ্রামের অন্ধকার রাস্তা সাক্ষী হয়ে রইল আরেকটা রক্তাক্ত সত্যের, আরেকটা রক্তাক্ত দেহের।
.
মৃন্ময়ী স্থির হয়ে বাবার লাশের পাশে বসে আছে। নিঝুম রাত। গভীর নৈঃশব্দ্যে আচ্ছন্ন চারিধার। কেউই এখন পর্যন্ত কিছু জানে না। ও বাইরে এসেছিল শুধু বাবাকে ডাকতে, “আব্বা…”

ডাকটা ওইভাবেই গলার ভেতরে আটকে গিয়েছিল। উঠোনের মাটিতে পড়ে থাকা রক্তাক্ত শরীরটা দেখেই ওর পা দু’টো অবশ হয়ে গিয়েছিল। আর এক পা এগোনোর শক্তিও পায়নি। ধপ করে বসে পড়েছিল মাটিতে। তারপর সেই যে বসেছে, আর ওঠেনি। বলা ভালো, উঠার শক্তি পায়নি। একটু কান্নাও করেনি ও, চিৎকার না, হাহাকারও না। চোখ দু’টো শূণ্য দৃষ্টিতে বাবার মুখটার দিকে তাকিয়ে ছিল শুধু। এতদিন যে মুখটার দিকে তাকিয়ে সাহস ও অনুপ্রেরণা পেত, তা আজ চিরতরে নিভে গেছে। সাহসের আঁধার আজ নিশ্চল, নিস্তব্ধ। দুঃখের সবটুকু জল ফুরিয়ে গেছে, এখন শুধুই শূন্যতা। কান্নার সময় পেরিয়ে গেছে, নতুন করে আর ভেজার কিছুই অবশিষ্ট নেই। হৃদয় শুকিয়ে কাঠ, পাথর হয়ে বসে আছে মৃন্ময়ী। রাতটা আরও গাঢ় হলো। মৃন্ময়ী একই ভঙ্গিতে বসে রইল। নিভৃতে বাবা হারিয়ে যাওয়ার যন্ত্রণায় মেয়েটি এক রাতে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বড় হয়ে গেল। বিসর্জন দিতে হলো ওর জীবনের সকল শিশুসুলভ সরলতা!

সকাল সকাল জহির মোল্লার লাশ দাফন করা হলো। দাফনের আগেই পুলিশ এসেছিল। কয়েকজন অফিসার উঠোনে দাঁড়িয়ে চারপাশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। জিজ্ঞেস করল কীভাবে কি হয়েছিল? কখন হয়েছিল? সবশেষে বলল, “আমরা তদন্ত করব। অপরাধীদের ছাড় দেওয়া হবে না।”

কথাগুলো অরণ্যে রোদন হয়ে রইল। পুলিশের এই নিস্ফল আবেদনে কেউ কান দিল না। মানুষ জানে, পুলিশের দৌড় কতদূর? কার সাথে কথা বলবে পুলিশ? কে উত্তর দেবে? মৃন্ময়ী ঘরের দুয়ারে খিল এঁটেছে। ভেতর থেকে কোনো শব্দ নেই। দরজার ওপাশে সে আছে কি না, সেটুকুও নিশ্চিত না। নিজেকেও পৃথিবী থেকে বহুদূরে রেখেছে। রওশন আরা শয্যায় অজ্ঞান। মুখটা ফ্যাকাসে, নিঃশ্বাসটুকু শুধু আছে বলেই মানুষজন বুঝছে তিনি বেঁচে আছেন। তার চারপাশে গ্রামের কয়েকজন মহিলা বসে আছে। তারা মাথায় পানি ঢালছে, কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। ফিসফিস করে দোয়া পড়ছে, আবার চোখ মুছছে আঁচলে। পরিবারটার জন্য কষ্ট হচ্ছে। মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে পরিবারের দুটো সদস্য কতল হলো। আর কি আছে ওদের জীবনে?
চেয়ারম্যান সাহেব এলেন, জমিদার এলেন সান্তনা দিতে। তারা উঠোনে দাঁড়িয়ে একটুক্ষণ ইতস্তত করলেন। সবাই এসে দাঁড়িয়ে রইল। কথা বলার মানুষ নেই। শোকটাই সকল প্রশ্নের উত্তর হয়ে দাঁড়িয়েছে!

দু’দিন পর ইয়াসিফের জ্ঞান ফিরল। এই দু’টা দিন সময় থমকে দাঁড়িয়ে ছিল। ডাক্তাররা আগেই বলে দিয়েছিলেন, অবস্থা আশঙ্কাজনক। শরীর থেকে অনেক রক্ত ঝরেছে। ছুরির কোপ এমন জায়গায় লেগেছিল যে, একটু এদিক-ওদিক হলেই সব শেষ হয়ে যেত। ভাগ্য আর জেদের মাঝখানে ঝুলে ছিল ইয়াসিফের প্রাণ। সেদিন রাতেই খবর পাঠানো হয়েছিল তাহের আকন্দকে। খবর পেয়ে তিনি আর দেরি করেননি। হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছিলেন হাসপাতালে। ছেলেকে অচেতন অবস্থায় দেখে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠেছিল তার। কিন্তু অশ্রুতে বুক ভাসাননি। এই সময় কাদা তার জন্য বিলাসিতা। জহির মোল্লা খুন হওয়ার খবর পাওয়ার পর আর কিছু বুঝতে বাকি রইল না। এটা কাকতালীয় ঘটনা হতে পারেনা। সবকিছুর সুতো গিয়ে এক জায়গাতেই বাঁধা। তাহের আকন্দ সব বুঝেও চুপ করে রইলেন। প্রকাশ্যে কিছু বললেন না। এখন কথা বললে বিপদ আরও বাড়বে। ইয়াসিফের জ্ঞান ফেরার পর প্রথম কাজটাই করলেন তিনি। ছেলের কানে কানে বললেন, “একদম চুপচাপ থাকবি। বাপ আমার, আমাদের কথা একবার ভাব। তোর ভাগ্য সাথে ছিল বলে আজ বেঁচে গেছিস বাবা। ওরা এত সহজে ছাড়বে না আমাদের।”

ইয়াসিফ কিছুই বলল না। চোখ দু’টো শুধু ছাদের দিকে স্থির হয়ে ছিল। ব্যথায় কুঁকড়ে উঠছিল শরীর, কিন্তু তার চেয়েও বেশি জ্বালাচ্ছিল ভেতরের আগুন। এই দু’দিনে তাহের আকন্দ কোনোরকমে পুলিশকে বুঝিয়ে বিদায় করেছেন। আজ আর এড়ানো গেল না। পুলিশ এসেছে, ইয়াসিফের বয়ান নিতে। আশ্চর্যের বিষয়, ইয়াসিফ পুলিশকে সত্যটা বললে না। শুধু বলল, “আমি কাউকে দেখার সুযোগ পাইনি।”

তবে সে উপরে চুপ থাকলেও ভেতরে ভেতরে আগুন জ্বলছিল। সব জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছিল ক্রোধে। আজ যদি সে সব বলে দিত, পুলিশ কী করবে? পুলিশ মামলা করবে। চার্জশিট দেবে। কোর্টে মামলা চলবে। কয়েক বছর ধরে তারিখের পর তারিখ পড়বে। সাক্ষী, প্রমাণ হারাবে। শেষমেশ কী হবে? বেশি হলে তাওহীদ আর তার সঙ্গীরা “অপরাধী” প্রমাণিত হবে। হয়তো গ্যাং রেপের জন্য আজীবন কারাদণ্ড। খুনের জন্য ফাঁসি বা ফাঁসির বদলে যাবজ্জীবন। আর জমিদার? সে প্রভাবশালী ব্যক্তি। আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যাবে। সর্বোচ্চ যা হবে, কিছুদিন হাজত তারপর জামিন। সম্মান একটু আঁচড় খাবে, এই যা। এসবে ইয়াসিফের পোষাবে না। ময়ূরীর যন্ত্রণা ওদের চার্জশিটে ধরা পড়বে না। জহির মোল্লার নিথর দেহ ওদের রায়ে বেঁচে উঠবে না। কিছু অপরাধের শাস্তি আদালত দিতে পারে না। সেগুলোর বিচার অন্য জায়গায় হয়, অন্যভাবে হয়। এই অন্যায়ের বিচার হবে, স্বহস্তে ব্যক্তিগতভাবে।
.
বিকালের মৃদুমন্দ্র রোদে মৃন্ময়ী উঠোনে ঝাড়ু দিতে ব্যস্ত ছিল। ও এত মনোযোগ দিয়ে ঝাড়ু দিচ্ছিল যে, আশেপাশের শব্দ কানে পৌঁছাচ্ছে না। সেসময় শিশির এসে দাঁড়াল উঠোনের দ্বারে। মৃন্ময়ী লক্ষ্য করল না। সেই ঝাড়ুর শলার আগা তার পা মাড়িয়ে গেল। অদ্ভুতভাবেই ও চমকে উঠল। শিশির বুঝতে পারল, মৃন্ময়ী ব্যস্ত আর তার উপস্থিতি অবচেতনভাবে ওকে ধাক্কা দিয়েছে। মৃন্ময়ী ঝাড়ু থামিয়ে মাথা তুলে তাকাল, “আপনি এখানে?”

শিশির এগিয়ে এসে বলল, “চাচী বাড়িতে আছে?”

“আছে।” মৃন্ময়ীর উত্তর সংক্ষিপ্ত। তারপর একটুখানি থেমে বলল, “কিন্তু কথা বলবে না। যা বলার আমাকে বলুন।”

“আচ্ছা।” বলেই সে চুপ করে রইল। এক ধরনের অস্বস্তিকর নীরবতা তাকে আচ্ছন্ন করে রাখল। মৃন্ময়ী ঝাড়ুটা একপাশে ঠেলে অন্য কাজে হাত দিল। ইচ্ছে করেই বসে কথা বলার অবকাশ দিল না। কাজের ফাঁকেই শিশিরের দিকে তাকিয়ে বলল, “বলুন, শুনছি। বসে কথা বলার সময় নেই।”

শিশির ইতস্তত করল। তারপর নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, “চাচার দোকানপাটের কী হবে?”

মৃন্ময়ী থেমে গেল। চোখ দুটো সরাসরি শিশিরের দিকে তুলে তাকাল। কণ্ঠে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ, “কেন? আমিও কি মরে গেছি?”

শিশির হতভম্ব হয়ে গেল, “তুমি দেখবে?”

“দেখব। আমাকে কি অবলা নারী ভেবেছেন? আমি আমার বাপ-বোনের মতো ভীতু নই।”
শিশির কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখল মৃন্ময়ী ঝাড়ু দিচ্ছে, বাড়ির অন্যান্য কাজ করছে। কিন্তু সেই তাড়াহুড়োর মধ্যে অদৃশ্য লক্ষ্য লুকানো। প্রতিটি কাজই এত তৎপর, এত দ্রুত, যেন দেখানোর জন্য। শিশিরের বুঝতে অসুবিধা হলো না। ও সব আড়াল করে নিজের সমস্ত আবেগ, সমস্ত শোক এবং সমস্ত ক্ষত থেকে লুকানোর চেষ্টা করছে। শিশির এগিয়ে এসে মৃন্ময়ীর হাত ধরল। মৃন্ময়ী চোখ তুলে তাকাতেই সে বলল, “কষ্ট পেলে কাঁদো। সবকিছু নিজের মধ্যে চাপিয়ে রাখছো কেন? তোমার ভেতরের যন্ত্রণা বাইরে বেরোতে দাও।”

“কষ্ট পাব কেনো?”

“কষ্ট পাওয়ার জন্য কারণ লাগে না মৃন্ময়ী। কখনো কখনো মানুষ শক্ত থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তুমি একা সব সামলাতে চাইছো। কিন্তু তুমি পাথর না। ভাঙলে ভাঙো, কাঁদলে কাঁদো তাতে তুমি ছোট হবে না।”

“আমি কাঁদব না।” শীতল গলায় বলল ও।

“আমার সামনে অন্তত মুখোশ পরতে হবে না। আমি দেখেছি তোমাকে শক্ত হতে, এবার একটু দুর্বল হলেও ক্ষতি নেই।”

মৃন্ময়ীর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আমি ওদেরকে শেষ করে ফেলব।” দীর্ঘদিন চেপে রাখা ক্ষোভ, অপমান আর অসহায়তা একসাথে জ্বলে উঠল। চোখ দুটো শুকনো, অথচ তার ভেতরে দাবানল দাউদাউ করছে। প্রতিশোধের সেই আগুন লুকোনোর কোনো চেষ্টাই করল ও। শিশির স্পষ্ট দেখতে পেল। এই মৃন্ময়ীকে সে আগে দেখেনি। সে কিছু বলল না। কোনো উপদেশ দিল না। মৃন্ময়ীর কাঁধে হাত রাখল, ভরসার হাত।

এরপর মাত্র দু’দিন গেল। এই দু’দিনের ব্যবধানে একজন মানুষকে কেন্দ্র করে পাঁচ দিক থেকে পাঁচটি অস্ত্র তুলল পাঁচজন ভুক্তভোগী। পিস্তল, ছুরি, কোদাল, দা, রশি; পাঁচটা অস্ত্র, পাঁচটা হাত তবে তাদের প্রত্যেকের লক্ষ্য একটাই। একজন মানুষ! সে হচ্ছে তাওহীদ!
.
.
.
চলবে….

গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ