#প্রণয়_প্রত্যাবর্তন🖤 [পর্ব-০৩]
~আফিয়া আফরিন
ডাক্তার সেদিনই বলেছিল, রিপোর্ট পেতে কমপক্ষে এক সপ্তাহ লাগবে। এক সপ্তাহ পর…
অফিসার পোস্টমর্টেম রিপোর্ট হাতে নিয়ে নির্লিপ্ত গলায় বললেন, “রিপোর্টে কোনো অস্বাভাবিকতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মৃত্যুর কারণ, আত্মহত্যা। মামলা ক্লোজ করা হচ্ছে।” কথাগুলো বলেই সে ফাইলটা বন্ধ করল। এটুকুতেই সব শেষ। কিছুক্ষণ থেমে থেকে আবার বলল, “লাশটা হস্তান্তর করা হবে। আপনারা চাইলে আজই নিয়ে যেতে পারেন।”
থানায় ইয়াসিফ আর জহির মোল্লা এসেছিল। জহির মোল্লা তখন পুলিশের সাথে কথা বলায় ব্যস্ত। আর এদিকে ইয়াসিফের মাথায় অনেকগুলো অংক তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠছে। হস্তান্তর! কী সহজ শব্দ। যেন কোনো জিনিস ফেরত দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।
লাশ ঘরের অভ্যন্তরে হিমশীতল পরিবেশ। সাদা কাপড়ে ঢাকা শরীরটার পাশে এসে ইয়াসিফ দাঁড়াল। কেউ নেই। দরজাটা মৃদু শব্দে বন্ধ হয়ে গেল। সে ধীরে পায়ে এগিয়ে এসে মুখের কাপড়ের এক কোণ সরাল। ময়ূরীর মুখটা দেখা গেল। নিশ্চল, স্থির, নিস্পন্দ, অচল কিন্তু আশ্চর্যজনক নিশ্চল। একেবারেই অবিচলিত। কম্পিত করপল্লবে সে পরম মমতায় ওর হস্ত ধারণ করল। হাতটা বরফের মতো ঠান্ডা। চমকে উঠল সে। অনড় অবস্থানে থেকে বলল, “এই হাতটা… এই হাতটা দিয়েই তো আমাকে ধরে কাঁদছিলে সেদিন।”
ইয়াসিফ নিজের মনেই কথা বলছে, থামছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, “তুমি বলেছিলে, সবকিছুতে পাশে থাকবে। ঠিক হয়ে যাবে, বলেছিলে না? এমনটাই তো কথা ছিল।” সে ফিসফিসালো, “তুমি মিথ্যে বলেছিলে, ময়ূরী?”
ইয়াসিফ বুড়ো আঙুলটা আলতো করে ময়ূরীর হাতের পিঠে বুলিয়ে দিল। আপনজনের উদাসীনতা, হৃদয়হীন সান্নিধ্য, নিস্পৃহতা, দূরত আবেগে জমে গেল। গলাটাও ভেঙে এলো, “যদি তোমার এত কষ্ট ছিল, তবে আমাকে বললে না কেন? আমাকে কি আর চিনতে পারা যাচ্ছিল না? আমার অস্তিত্ব কি এতটাই বিস্মৃত ছিল? আমি কি আমূল বদলে গিয়েছিলাম?” তার কণ্ঠে অনুযোগের সুর শোনা গেল, “আমি সব ভেবে রেখেছিলাম। কোথায় থাকব, কীভাবে থাকব… কিন্তু তুমি আমাকে সব দিক থেকে একা করে দিলে। আমার হৃদয় অবাধ্য। আমার মন মানে না, কোনভাবেই মানে না।” সে মাথা নিচু করল। কপালটা ময়ূরীর হাতের সাথে ঠেকিয়ে রাখল দীর্ঘক্ষণ। তার মনে হচ্ছিল; যদি এভাবে কিছুক্ষণ থাকে, যদি এই ঠান্ডা স্পর্শটা নিজের ভেতরে টেনে নিতে পারে, তাহলে হয়তো ময়ূরীর সব না-বলা দুঃখ,
সব চাপা আর্তনাদ, একটু একটু করে নিজের শরীরে চলে আসবে। সে চাইছিল, এই ব্যথাটা ভাগ হয়ে যাক। ময়ূরীরটা কমুক, তারটা বাড়ুক। কিন্তু প্রাণহীন দেহটা নিশ্চুপ রইল। শুধু মৌনতা আর শীতলতার অবিনশ্বরতায় জানান দিল, চির বিদায়ের পর আর কোন দাহ, কোন কষ্ট, যাতনা, অনুশোচনা প্রত্যাবর্তনের পথ খুঁজে পায় না।
লাশ বাড়িতে পৌঁছাতেই বাড়িটা শোকের ঘরে রূপ নিল। দাফনের প্রস্তুতি শুরু হলো। কিন্তু মৃন্ময়ীর কাছে কিছুই বাস্তব মনে হচ্ছে না, সবকিছুই অলীক আর মায়ার খেলা। সাদা কাফনের ভেতরে শুয়ে থাকা শরীরটার দিকে তাকিয়ে ওর মাথার ভেতরে বারবার একটা কথাই ঘুরছে, “না। ও এটা করতে পারে না।”
লাশ দাফনের কার্যক্রম শেষে মৃন্ময়ী দাওয়ার এক কোণে তাকাল। ইয়াসিফ বসে আছে সেখানে। মাটির দিকে তাকিয়ে। দৃষ্টি শূণ্য সে। শারীরিকভাবে কেউ উপস্থিত কিন্তু মানসিকভাবে অনুপস্থিত। মৃন্ময়ী এগিয়ে এলো। পায়ের গতি অসাঢ়। ইয়াসিফেল সামনে এসে দাঁড়িয়ে খুব নিচু গলায় বলল, “আপনি বিশ্বাস করেন, ইয়াসিফ ভাই?”
ইয়াসিফ কোনো উত্তর দিল না। মৃন্ময়ী আবার বলল, “আপনি কি সত্যিই বিশ্বাস করেন, ময়ূরী এমন কিছু করতে পারে?”
ইয়াসিফ দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব ধীরে মাথা তুলল। চোখ দুটো লাল নয়, ক্লান্ত। বিপন্ন দশা, চরম সংকটকাল চলছে তার। ভারী গলায় বলল, “বিশ্বাস? আমি তো আর নিজেকেই বিশ্বাস করতে পারছি না।” ইয়াসিফ এবার চোখ তুলে তাকাল ওর দিকে, “ময়ূরী ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু ভাঙা আর আত্মহত্যা করা মানুষ এক জিনিস না। ওর চোখে আমি ভয় দেখেছি, হতাশা না।”
মৃন্ময়ীর বুকটা ধক করে উঠল। ও এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল, “আমারও তাই মনে হয়, ইয়াসিফ ভাই। আরেকটা কথা, আব্বাকে খুব অদ্ভুত লাগছে।”
ইয়াসিফ চুপচাপ শুনছে। মৃন্ময়ী বলেই যাচ্ছে, “সবকিছুতে কেমন তাড়াহুড়ো করছে। লাশ আনতে, দাফন করতে, কথাবার্তা থামাতে… যেন যত তাড়াতাড়ি সব শেষ হয়, ততই ভালো। আব্বা কখনো এমন করে না। মা ভেঙে পড়ছে, আর উনি শুধু বলছেন, ‘এত কাইন্দা কি হইব? সব আল্লাহর হুকুম। মাইয়ার মরার কথা আছিল তাই মরছে।’ আপনিই বলেন, আব্বা এমন? আপনি চেনেন না তারে?”
ইয়াসিফের দৃষ্টি সরু হয়ে এলো। সে তৎক্ষণাৎ কিছু বলল না। কিন্তু আগের ঘটনাগুলো মিলিয়ে দেখল, আসলেই তো। মৃন্ময়ী ভুল কিছু বলে নাই। অতিরিক্ত চিন্তায় তার মাথায় সামান্য বিষয়গুলো ধরা দিয়েও ফসকে গেছে। মৃন্ময়ী ফের বলল, “আমি জানি না কেন কিন্তু মনে হচ্ছে, আব্বা কিছু লুকাচ্ছে। আব্বা এমন কিছু জানে যেটা আমরা কেউ জানিনা।”
ইয়াসিফ মাথা নাড়ল। বলল, “আমারও ঠিক এই অনুভূতিটাই হচ্ছে।” সে উঠে দাঁড়াল। এখন আর আবেগ দিয়ে কাজ হবে না। দুঃখ প্রকাশ করে লাভ হবে না। ময়ূরীর সাথে সাথে নিশ্চয়ই কোনো বড় সত্যকেও চাপা দেওয়ার হয়েছে। যেকোনো মূল্যে তা জানতে হবে, হবেই। ঠিক তখনই কানে এলো জহির মোল্লার হাহাকার করা কণ্ঠ। লোকটার কণ্ঠে অসহায়ত্ব, ক্ষোভ আর ভয় একসাথে মিশে আছে, “এই গ্রাম আর আমার নাই। এই গ্রামে মানুষ নাই। মুখ আছে, জিভ আছে, ক্ষমতা আছে, জোর আছে কিন্তু মানুষ নাই। আমার মাইয়াডারে খাইছে এই গ্রাম। এখন আর থাকুম কেমনে? খুব তাড়াতাড়ি চলে যেতে হবে। সব সম্পর্ক শেষ। এই মাটিতে আর আমার কিচ্ছু নাই, কেউ নাই।” তার হাপিত্যেশ করা কথায় অনেকেই সান্তনা দিচ্ছেন। কোনোকিছুই গায়ে লাগছে না। কারণ একটা সত্য সে নিজেই ময়ূরীর সঙ্গে মাটিচাপা দিয়েছে। সেদিন সকালে যখন ময়ূরীর খোঁজে পুরো গ্রাম ছুটে বেড়াচ্ছে, তখনই জমিদার হাজী মকবুল নিজে এসে দাঁড়িয়েছিল জহির মোল্লার দোকানে। সবসময়কার মত দাড়ি-টুপি-পাঞ্জাবি, হাতে তসবিহ। মুখে কৃত্রিম দরদ। এসেই জিজ্ঞেস করেছিল, “কি খবর মোল্লা?”
জহির মোল্লা কোনো জবাব দেয়নি। এই লোকটার লেবাসধারী ভণ্ডামি সে ভালো করেই জানে। শুধু তাই না, এই দোকানের সামান্য জায়গাটুকু নিয়ে বহুদিন ধরেই তাদের মন-কষাকষি চলছে। জায়গাটা জহির মোল্লার চৌদ্দ পুরুষের ভিটে। তার বাঁচার একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু জমিদারের কাছে এসবের কোনো মূল্য নেই। যেকোনো মূল্যে তার জায়গাটা চাই-ই চাই। উনাকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে কটাক্ষ মিশিয়ে জমিদার ফের বলেছিলেন, “কেন যে তোমরা আমার কথা শোনো না ভাই? কেন যে অবাধ্য হও? মাইয়াটারে খুঁইজা পাইতেছ না তো, পাইবা কেমনে?”
জহির মোল্লা মাথা তুলে তাকিয়েছিল। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনে জানেন, আমার ময়ূরী কই?”
জমিদার তখন মুচকি হেসেছিল, দম্ভের হাসি। চেয়ারের ওপর আরাম করে বসে, তসবিহ ঘোরাতে ঘোরাতে রসিয়ে রসিয়ে কথা বলতে শুরু করেছিল তার কনিষ্ঠ পুত্রের কুকর্ম। তার কথায় জহির মোল্লার বুকের ভেতরটা একটু একটু করে ছিঁড়ে টুকরো হয়ে যাচ্ছিল। সেখানেই ছিল তার আনন্দ। বলেছিল, “মেয়েমানুষ তো, মোল্লা। এগুলা নিয়তি। সব মাইয়ার কপালে সব সুখ থাকে না।”
জহির মোল্লার কানে তালা লেগে গেল। ভারসাম্য হারানোর অনুভূতি হচ্ছে। মাথা চক্কর দিচ্ছে। মেয়ের অস্তিত্ব হরণের কথা, একজন বাবা হয়ে শুনতে হচ্ছিল তাকে। বুকের ভেতরটায় এমন চাপ পড়ল, যেন পৃথিবীর সব ওজন একসাথে এসে পড়েছে। সে চেয়ারটা শক্ত করে ধরল। টেনে তুলল, জমিদারের দিকে যেই না ছুঁড়ে মারবে তৎক্ষণাৎ তিনি বাঁধা দিলেন। হেসে বললেন, “খাড়াও, খাড়াও। এত অস্থির হইলে চলে?”
জহির মোল্লা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। কম্পমান দেহে সামনে এগিয়ে এসে হুংকার দিল, “আমি মামলা দিমু, আপনের নামে মামলা দিমু!”
জমিদার চুপ করে তাকিয়ে রইল। মমতাহীন, বিদ্বেষপূর্ণ ভঙ্গিতে হাসছেন। ওদিকে জহির মোল্লার কণ্ঠে আগুন জ্বলছে, “চৌদ্দ শিকের ভাত খাওয়ামু আপনারে, কোমড়ে দড়ি পড়ামু। এই মাইয়ার রক্তের দাবি আমি এমনি এমনি ছাড়ুম না!”
জমিদার সাহেব তসবিহের দানাগুলো আরও জোরে ঘোরাতে ঘোরাতে বলল, “মামলা? কোমড়ে দড়ি? হাসালে ভাই।” তারপরেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন। উপহাসের দৃষ্টিতে তাকালেন। ওই দৃষ্টি বড্ড শ্লেষপূর্ণ চাহনি, কুটিল হেয় প্রতিপন্নকারী দৃষ্টি। তিনি ব্যঙ্গাত্মক ভাবে বললেন, “মোল্লা… এইসব কথা কইলে নিজের ক্ষতি করবা। তোমার তো আরেকটা মাইয়া আছে, ভুলে গেছ?” শেষের কথাটা তিনি এমন ফিসফিস স্বরে বললেন যেন হুমকিটা শুধু জহির মোল্লার কানে ঢোকে। এই একটা বাক্যেই জহির মোল্লার সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেল। চোখের চোখের ভেতর দাউ দাউ করে জ্বলা আগুন নিভে গেল। মুঠো শক্ত হয়ে আবার ঢিলে হয়ে গেল। সেসময় থেকেই চুপ করে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। পিত্র হৃদয়ের এই চরম অপারগতার ভার সে বইতে পারছিল না। বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে ছিঁড়ে যাচ্ছিল।
একজন বাবা হয়ে নিজের মেয়ের সম্মান রক্ষা করতে না পারার লজ্জা,
ভয় অসহায়ত্ব একে একেবারে ভেঙ্গে দিয়েছে। ময়ূরীর কবরের কাছে বসে আপন মনে ক্ষমা চেয়েছিল, “মাফ করিস মা, তোর বাপ দুর্বল। তোরে বাঁচাইতে পারলাম না। আমি ভয় পাইছি। তোর বোনডারে আগলাইতে গিয়া, তোরে ছাড়তে হইছে মা। আল্লাহ যদি আবার সুযোগ দিত, আমি বুক পেতে দিতাম। কিন্তু এখন…”
সে জানে, এই দীর্ঘ আর্তনাদে এই ক্ষমা চাওয়ায় কিছুই বদলাবে না। ময়ূরী আর ফিরবে না। এই অপরাধবোধ নিয়েই তাকে বাকি জীবনটা কাটাতে হবে।
.
ইয়াসিফ শহরে ফিরে এসেছিল। গ্রামের পরিবেশটা তার জন্য আর সহনীয় নয়। প্রতিটা ক্ষণ ময়ূরীর অনুপস্থিতিকে আরও প্রকট করে তুলছিল। শহরে এসে সে সরাসরি দেখা করল এক পরিচিত বন্ধুর সঙ্গে। পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, ইন্সপেক্টর অনিন্দিতা রায়। ইয়াসিক ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবকিছু খুলে বলল। ময়ূরীর ভয় পাওয়া, অস্পষ্ট কথা, হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়া আর শেষে ঝুলন্ত লাশ। অনিন্দিতা দীর্ঘক্ষণ চুপ করে শুনল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “তুমি নিশ্চিত, ময়ূরী আত্মহত্যা করার মতো মেয়ে ছিল না?”
ইয়াসিফ মাথা নাড়ল, “একদম ১০০%।”
অনিন্দিতা ফাইলের মতো করে মাথার ভেতর তথ্যগুলো সাজিয়ে নিল। তারপর সরাসরি প্রশ্ন করল, “পোস্টমর্টেম রিপোর্ট তুমি দেখেছ?”
“দেখেছি। সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। এইটাই তো সবচেয়ে অস্বাভাবিক। এখানে কিছুতেই সবকিছু স্বাভাবিক থাকার কথা নয়।”
অনিন্দিতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “দাফনের পর আবার পোস্টমর্টেম করা যায় কিন্তু সেটা সহজ না।”
ইয়াসিফ সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল, “কী লাগবে?”
অনিন্দিতা চোখ তুলে তাকালেন, “শক্ত কারণ। নতুন প্রমাণ অথবা প্রমাণের যৌক্তিক সম্ভাবনা।” তারপর তিনি যোগ করলেন, “আর সবচেয়ে বড় কথা, পরিবারের সম্মতি বা আদালতের আদেশ।”
ইয়াসিফের মুখ শক্ত হয়ে গেল, “ওর বাবা রাজি হবে না।”
“তুমি যদি নিশ্চিত হও তবে আমি সব ব্যবস্থা করতে পারি।” ইয়াসিফ মাথা নাড়ল। সেকেন্ডবার পোস্টমর্টেমের অনুমতি সহজ ছিল না। কিন্তু অসম্ভবও না। অনিন্দিতা রায় নিজের জায়গা থেকে যা করার, সবটাই করলেন। নিজের আত্নীয় বলেই জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছ থেকে এক চুটকিতে অনুমতি নিয়ে ফেলল। ইয়াসিফের বয়ানও লিখিত আকারে নিলেন। সবকিছু সংযুক্ত করে একটি শক্ত আবেদন তৈরি করলেন। কাগজে-কলমে কারণ দেখানো হলো, “সন্দেহজনক মৃত্যু এবং প্রাথমিক তদন্তে সম্ভাব্য তথ্য গোপনের আশঙ্কা।”
দু’দিন পর অনুমতি এলো। অনিন্দিতা তখনই সিদ্ধান্ত নিল, এই কাজটা পুলিশ পরিচয়ে করলে অপরাধী আগেই সতর্ক হয়ে যাবে। ওরা সতর্ক হলে সমস্ত প্রমাণ উধাও। তাই গুপ্ত কৌশল অবলম্বন করল। ইয়াসিফ আগেই গ্রামে ফিরে গেল। এরপর এক সন্ধ্যায় অনিন্দিতা রায় গ্রামে এলেন। তার সাথে দু’জন সাব-ইন্সপেক্টর। কেউ নিজেদের পরিচয় দেয়নি। তারা এসেছে এনজিও কর্মী হিসেবে। অনিন্দিতা জহির মোল্লার দোকান থেকেও ঘুরে গেল। লোকটা কেমন অন্যমনস্ক, বুড়িয়ে গেছে। কিছুর ভয় তাকে ভিতর থেকে ভেঙে দিয়েছে। সে কিছু জানে কিন্তু বলতে পারছে না। তাই সিদ্ধান্ত হল, রাতের অন্ধকারে কাজটা সম্পন্ন করতে হবে। ইয়াসিফ মৃন্ময়ীকে সমস্তটা বলেছে। অনিন্দিতাও কথা বলেছ ওর সাথে। মৃন্ময়ী বলেছে, “আমার বোনের সত্যটা করতে আমি সব করব।”
“গুড, ব্রেভ গার্ল!”
রাতটা অসম্ভব রকমের নিস্তব্ধ। মাঝেমাঝে কুকুরের ডাক এবং ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছে। চাঁদটা মেঘের আড়ালে লুকিয়ে। অন্ধকার ঠিক যতটা দরকার, ততটাই রয়েছে। ইয়াসিফ আগে থেকেই কবরস্থানের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। কিছুক্ষণ পর ছায়ার মতো করে এসে দাঁড়াল অনিন্দিতা। তার সাথে দুইজন সাব-ইন্সপেক্টর। সবাই প্রস্তুত। তারপর এল মৃন্ময়ী। কালো শাড়ি, মাথায় আঁচল টানা। মুখটা পাথরের মতো শক্ত, কিন্তু চোখে জমে থাকা জল চাঁদের আলোয় চিকচিক করছে। কবরের মাটি এখনও তাজা। একজন সাব-ইন্সপেক্টর ধীরে কোদাল চালাতে শুরু করল। প্রতিটা কোপ ইয়াসিফের বুকের ভেতর পড়ছে। মাটি সরে যাচ্ছে আর ভয়ঙ্কর অতীত উঠে আসছে। মৃন্ময়ী মুখ ফিরিয়ে নিল, ও দেখতে পারছে না। ইয়াসিফ চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল। শেষমেষ কাফনের সাদা কাপড় উঁকি দিল। অনিন্দিতা নিচু স্বরে বলল, “হয়ে গেছে।”
মৃন্ময়ীর গলা ফেটে বেরিয়ে এলো চাপা কান্না। ও ছুটে এসে কাফনের সাদা কাপড়ে হাত রাখল, “আপা…”
ইয়াসিফও আর নিজেকে সামলাতে পারল না, হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। অনিন্দিতা বলল, কেউ যেন ভুলেও লাশের হাত না দেয়। কবরটা এক সপ্তাহের পুরোনো হলেও তীব্র গন্ধ ছড়ায়নি। কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি, ভেজা এঁটেল মাটি আর কবরের গভীরতা পচনটাকে ধীর করে রেখেছিল। অনিন্দিতার নির্দেশে লাশ সাবধানে তোলা হলো। কালো কাপড়ে ঢেকে চুপচাপ নেওয়া হলো গাড়ির দিকে। তারপর আর এক মুহূর্ত দেরি নয়। ওরা রওনা হয়ে গেল। আর পেছনে দু’জন মানুষ বিধ্বস্তভাবে অপেক্ষার প্রহর গুনতে লাগল।
সাতদিন পর… এই সাতটা দিন সাতটা যুগের মতো কেটেছে। অবশেষে আজ দুপুরে অনিন্দিতা রায়ের ফোন এলো। তার কণ্ঠ শান্ত শীতল, “রিপোর্ট এসেছে।”
ইয়াসিফ কথা বলতে পারল না। শুধু ফোনটা কানে চেপে ধরল। অনিন্দিতা পড়তে শুরু করল, “মৃত্যুর কারণ, শ্বাসরোধজনিত মৃত্যু। যা কোনোভাবেই আত্মহত্যার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দেহে একাধিক ব্যক্তির দ্বারা সংঘটিত জোরপূর্বক যৌন নির্যাতনের সুস্পষ্ট আলামত পাওয়া গেছে।”
এক আঘাতেই ইয়াসিফের সবকিছু ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে স্তব্ধ। চারিপাশ দুলে উঠল। অনিন্দিতা আরও বললেন, “মৃত্যুর সময়কাল ও আঘাতের ধরন অনুযায়ী এটা পূর্বপরিকল্পিত অপরাধের ইঙ্গিত দেয়। এটি একটি গ্যাং রেপ ও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। রিপোর্টে এটাই পেয়েছি। ইয়াসিফ, আর ইউ ওকে? বুঝতে পারছ তোমার ময়ূরী আত্মহত্যা করেনি, ওকে খুন করা হয়েছে।”
ফোনটা নামিয়ে রাখল ইয়াসিফ। চোখ বন্ধ করল। এটা সে ভাবেনি। সত্যটা যে এতটা নিষ্ঠুর, এতটা নির্দয় হতে পারে তার জন্য সে প্রস্তুত ছিল না। মাথার ভেতর সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল। ময়ূরীর কান্নাভেজা মুখ, অসম্পূর্ণ কথাগুলো ঘুরপাক খেতে লাগল। দম আটকে আসার অনুভূতি হলো। এই উল্টোপাল্টা চিন্তার ভিড়েই একটা নাম সাপের ফণার মত ঠান্ডা আর বিষাক্ততার সহিত হিসহিস করে উঠল, “তাওহীদ…”
.
.
.
চলবে….
#প্রণয়_প্রত্যাবর্তন🖤 [পর্ব-০৪]
~আফিয়া আফরিন
তাওহীদ বর্তমানে অস্বাভাবিক রকম খোশ মেজাজে আছে। যেন কিছুই ঘটেনি। যেন কোনো রাত, কোনো আর্তচিৎকার তার জীবনের পাতায় একটুও দাগ কাটেনি। এত জঘন্য কাজের পরেও বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই। থাকবেই বা কেন? মাথার উপর যখন বাবার ক্ষমতাধর ছায়া আছে তখন ভয় নামের জিনিসটা তার অভিধানেই নেই। বাবা বলেছিল শহরে ফিরে যেতে। তাওহীদ শোনেনি, শোনার প্রয়োজনও বোধ করেনি। উল্টো শার্টের উপরের দু’টা বোতাম খুলে, চওড়া বুকে হাওয়া লাগিয়ে, চোখে কালো সানগ্লাস চেপে দেদারসে ঘুরে বেড়াচ্ছে গ্রামজুড়ে। চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে হাসছে বন্ধুদের সাথে, আড্ডা দিচ্ছে। গ্রামের মানুষ জানে, জমিদারের ছোট পুত্র বখাটে। তাই তারা সহজে ঘাঁটায় না, খুব একটা কথাবার্তা ও বলে না লোকজন। তাওহীদও গ্রামের সাধারণ মানুষের সাথে আগ বাড়িয়ে কথা বলতে যায় না। ওদের সে মানুষই মনে করে না। তার নিজের একটা দল আছে। ছোট কিন্তু বেশ শক্ত সামর্থ্য। এই ছেলেগুলো তাওহীদের গোপন বিজয়ের অংশীদার, সবগুলো বখাটে। এই ছেলেগুলো পুরো গ্রামটাকে ওদের ব্যক্তিগত খেলার মাঠ মনে করে।
ওদের আড্ডার জায়গাটা গ্রাম থেকে একটু দূরে, পুরোনো ইটভাটার পেছনে একটা পরিত্যক্ত কুঁড়েঘর। সাধারণত গ্রামের মানুষ কেউ ওখানে যায় না। জায়গাটা ঝোপঝাড়ে ঘেরা, এক পাশে শুকনো খাল, দিনের বেলাতেও অস্বস্তিকর লাগে। সন্ধ্যা নামলেই তাওহীদের দলটা সেখানে জড়ো হয়। এখানেই ওরা নিজেদের কুকীর্তির গল্প বলে। কে কাকে কখন কীভাবে ফাঁদে ফেলেছিল, কে কতটা ভয় পেয়েছিল, কখন কার চোখে অশ্রুধারা নেমে এসেছিল… সবকিছুই ওদের কাছে রসালো গল্প। আজও সেই আলাপ হচ্ছিল। তাওহীদ চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে একটা পা আরেকটার উপর তুলে হাসতে হাসতে বলে, “মুখটা মনে আছে? ওই সময়ের!”
বাকিরা সঙ্গে সঙ্গে হো হো করে হেসে ওঠে। সে হাসিগুলো ভারী, কর্কশ, শীতল, নিষ্ঠুর, নির্দয়। যেন কোনো মানুষের হাসি নয়, শিকারের উপর দাঁড়িয়ে থাকা শিকারির হাসি। মোহন নামের একজন নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, “ভাই ময়ূরীর সবকিছু মিটমাট হয়ে গেছে তাই না?”
তাওহীদ সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ল। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি খেলল, “অল ক্লিয়ার।” সে বলল, “আব্বা আছে না!”
রাজীব বলল, “ভাগ্যিস আছে।”
মোহন জবাবে বলল, “নাহলে তো ঝামেলা হইয়া যাইত ভাই।”
তাওহীদ মাথা নাড়ল। সানগ্লাসটা ঠিক করে নিয়ে বলল, “ঝামেলার চিন্তা তোরা করিস না। যা মন চায় দেদারসে সেটাই কর। সব আব্বা দেখবেনি। মনে আছে, অরুনিমার কথা? সে বেচারি তো নদীতে ডুবে নিজেকে জলাঞ্জলি দিয়েছে। হো হো হো…”
হাসিটা দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এলো। সেই মুহূর্তে দরজার বাইরে পায়ের শব্দ। কাঠের দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল তাহমিদ। তাওহীদের বড় ভাই। ঔরসজাত ভাই হলেও তাওহীদ আর তাহমিদ এক নয়। তাহমিদ বেশ সাদামাটা ধরনের ছেলে। চোখে মুখে সেই ঔদ্ধত্য ভাবটা নেই। তাহমিদ এই কুঁড়েঘরে খুব একটা আসে না। ভেতরে ঢুকেই সে থমকে দাঁড়াল। হাসির শব্দ থেমে গেল। সবাই চুপ। তাহমিদের দৃষ্টি ঘুরে ঘুরে সবার মুখে পড়ল, বিশেষ করে তাওহীদের দিকে। সে কিছুই বলল না। জানে, ছোট ভাইটা বেপরোয়া। জানে, বাবার ক্ষমতার আড়ালে কত কিছু চাপা পড়ে যায়। জানে, এসব একদিন খুব খারাপ জায়গায় গিয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু সে কী করবে? বাপের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস নেই। ছোট ভাইকে থামানোর ক্ষমতাও নেই। তাওহীদ উঠে দাঁড়িয়ে চেয়ার ছেড়ে দিয়ে বলল, “ভাইজান তুমি এইখানে?”
তাহমিদ বলল, “আব্বা তোকে খুঁজতেছে।”
তাওহীদ বাকি ছেলেদের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোরা থাক তাহলে এখন। দেখি আব্বাজান কি হুকুম করে। আসছি।” তারপর ভাইয়ের সাথে হাঁটা দিল নিজেদের বাড়ির উদ্দেশ্যে। আব্বা আবার শহরে ফিরে যাওয়ার কথা বলে কিনা কে জানে? সে ভ্রু কুঁচকে হাঁটে। এই পালিয়ে যাওয়ার কথাটা শুনতে তার ভালো লাগে না।
.
শিশির এই এলাকার চেয়ারম্যানের একমাত্র ছেলে। গত কয়েকদিন এলাকায় ছিল না, পরিবার সমেত এক আত্মীয়ের বিয়েতে বাইরে গিয়েছিল। গ্রামের খবর থেকে ওরা তখন অনেক দূরে। আজ বিকেলে ফিরেই গ্রামের বাতাসটা অস্বাভাবিক ঠেকল। চেয়ারম্যান নজির আহমেদ সব শুনে দুঃখ প্রকাশ করলেন। সকালে জহির মোল্লার সাথে দেখা করবেন বলেও ঠিক করলেন।
ময়ূরী আর মৃন্ময়ী, ওরা দু’বোন শিশিরের ছাত্রী। কথাটা শুনে সে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছিল না। বাড়ি ফিরে কোনোরকমে জামা কাপড় পাল্টাল। মাথার ভেতরে শুধু একটা কথাই ঘুরছিল, এটা কীভাবে হলো? বেরোনোর সময় মাকে শুধু বলল, “একটু বের হচ্ছি।” তারপর পা আপনাতেই ময়ূরীদের বাড়ির দিকেই এগিয়ে গেল। ওদের বাড়ি গিয়ে দরজায় কড়া নাড়ল। কিছুক্ষণ পর দরজাটা খুলল মৃন্ময়ী। চোখ দুটো লাল, মুখটা ফ্যাকাশে, কিন্তু মেরুদণ্ডটা স্থির রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। শিশিরকে দেখেই ও একটু চমকে উঠে বলল, “আপনে?”
শিশির গলা খাঁকারি দিয়ে খুকখুক করে কাশল, “ভালো আছো?” কথাটা জিজ্ঞেস করেই সে বুঝল, এরকম পরিস্থিতিতে এই প্রশ্নটা কতটা বেমানান!
মৃন্ময়ী কিছু বলল না। দরজা থেকে সরে দাঁড়াল, “আসুন।”
শিশির ভেতরে ঢুকল। বাড়ি জুড়ে শোকের ছায়া, নীরব ক্রন্দন। বাতাসও শোকাচ্ছাস বয়ে বেড়াচ্ছে। সে একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল, “চাচা আছে?”
মৃন্ময়ী মাথা নাড়ল, “আছে।” মৃন্ময়ী শিশিরকে উঠোনের মোড়ায় বসতে ইশারা করে নিজে ভেতরের ঘরে গেল বাবাকে ডাকতে। কিছুক্ষণ পর জহির মোল্লা বেরিয়ে এলেন। লোকটাকে দেখে শিশিরের কেমন যেন লাগল। এই মানুষটাকে আগে যেমন দেখেছে, এখন আর তেমন নেই। চোখ দুটো বসে গেছে, সেই চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। মুখে মোচ দাড়ি অগোছালো। একজন ভাঙা মানুষ যে ভেতরে ভেতরে চূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। রওশান আরা তখনও শয্যাশায়ী। ঘরের ভেতর নিঃশব্দে পড়ে আছেন। চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। মৃন্ময়ী উঠোনের এক কোণে খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে রইল। পা দুটো অবশ লাগছে। জহির মোল্লা একবার তাকালেন মেয়ের দিকে। তারপর গম্ভীর গলায় বললেন, “যা, ভেতরে যা। এদিকে কাজ কি?”
বাবার আদেশে মৃন্ময়ী চুপচাপ ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল। আসলে জহির মোল্লার বলা কথাটা ছিল ভয় থেকে বলা। এই গ্রামের বাতাস, ছায়া মেয়ের গায়ে লাগুক তিনি চান না। ভেতরে ঢুকতেই রওশান আরার ক্ষীণ কণ্ঠ শোনা গেল, “কে আইছে?”
মৃন্ময়ী শাড়ির আঁচলটা মুঠোবন্দী করছিল। ও কী বলবে? স্যার? অসম্ভব। ভাই? অসম্ভবেরও ওপরে কিছু হলে সেটা। তাই চুপ করে রইল। রওশান আরা আবার জিজ্ঞেস করলেন, “কইলি না যে?”
মৃন্ময়ী নিচু গলায় বলল, “পড়াইতে আসে যে, সে আইছে।”
“শিশির?”
“হুম।”
“ওরা আইলো কবে?”
মৃন্ময়ী চোখ নামিয়ে বলল, “জানিনা। আব্বার সাথে কথা কইতেছে।” ও এগিয়ে গিয়ে দরজায় কান পাতল। দরজার ফাঁক গলে শিশিরের দিকে চোখ পড়ল। নিভৃত সুখের আবেশে মনটা পুলকিত হলো। শিশিরের প্রতি ওর একটু ভালোলাগা আছে। তবে যতটা না মৃন্ময়ীর আছে তারচেয়েও বেশি শিশিরের আছে, তা ও জানে। চোখ বন্ধ করে মনে মনে স্বীকারও করে। মৃন্ময়ী ওদের কথায় মনোযোগ দিল। জহির মোল্লা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলছেন, “এই গ্রাম ছাড়ব। যেটুকু জমি আছে, সব বিক্রি করে দিব। আমি তোমার আব্বার জন্য অপেক্ষা করছি। তার সঙ্গে কথা বলে সব ঠিকঠাক করে নেব।”
শিশির কিছুটা চমকালো বোধহয়, “এটা কেনো করবেন চাচা? কেনো এমন কথাবার্তা বলছেন?”
জহির মোল্লা গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেললেন। ধীরে বললেন, “তুমি বুঝবা না বাবা। মাইয়ার বাপের অনেক সমস্যা থাকে। একটা তো গেছেই…” কথাটা বলেই তিনি থেমে গেলেন। গলাটা ধরে এলো, “আরেকটার জীবনটা তো নষ্ট করতে পারি না।”
শিশির অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। চাচার কথা তার বোধগম্য হচ্ছে না, “কিন্তু মৃন্ময়ীর জীবন নষ্ট হবে কেন? কি হয়েছে?”
জহির মোল্লা উত্তর দিলেন না। তিনি শূন্য দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে রইলেন; যেন এই ঘর, এই উঠোন, এই মানুষগুলো কেউ নেই।
ওই শূন্যতার ভেতরেই আবছাভাবে ভেসে উঠল ময়ূরীর মুখটা। মেয়ের আর্দ্র আঁখি, কম্পিত ওষ্ঠ্য, হৃদয়ের হাহাকার, গোপন বেদনা। মনে হলো, ময়ূরী ঠিক তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। চুপচাপ শুধুমাত্র কিছু জানার আগ্রহে নিথর হয়ে তাকিয়ে আছে। তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। চোখের কোণ ভিজে গেল কিন্তু তিনি তাকিয়েই রইলেন…
ঠিক সেই সময়েই উঠোন পেরিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকে এলো ইয়াসিফ, “চাচা! চাচা…” তার কণ্ঠস্বর হাঁপাচ্ছে, নিঃশ্বাস পড়ছে এলোমেলোভাবে, অস্থির ভঙ্গিতে।
জহির মোল্লা চমকে উঠে পাশ থেকে বললেন, “বাবা, আমি এখানে। কি হইছে?” বলতে বলতেই তিনি উঠে দাঁড়ালেন। শিশিরও তৎক্ষণাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল।
ইয়াসিফ কোনো ভূমিকা না টেনে চোখে চোখ রেখে কঠিন স্বরে প্রশ্ন ছুড়ে দিল, “আপনি জানেন, ময়ূরীর সাথে আসলে কি হয়েছিল?”
প্রশ্নটা জহির মোল্লার মাথায় বজ্রপাতের মত হয়ে আঘাত করল। তিনি কেমন থমকে গেলেন। শিশির হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল ইয়াসিফের দিকে। ইয়াসিফের গলা এবার আরও চড়ে উঠল, “চাচা আপনি জানেন কি না, বলুন!”
চিৎকার চেঁচামেচিতে মৃন্ময়ী আতঙ্কিত হয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “কি হইছে?”
ইয়াসিফ আর নিজেকে সামলাতে পারল না। জোরালো গলায় বলল, “চাচা, আপনি বলুন।”
জহির মোল্লা চোখ নামিয়ে বললেন, “কিছু হয় নাই তো বাবা। যা হইছে, তা তো দেখলাই।”
ইয়াসিফ সঙ্গে সঙ্গে কথাটা কেটে দিল, “যা দেখেছি, সেটুকু শুধু দেখানো হয়েছে। আমি যা দেখিনি, সেটাই জানতে চাই।”
জহির মোল্লার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। বুঝে গেলেন, ইয়াসিফ অযথাই আন্দাজ করছে না। নিশ্চিত কিছু জেনেই এসেছে। তার কণ্ঠ হঠাৎ রুক্ষ হয়ে উঠল, “আমি চাই না তুমি আমার মাইয়ার বিষয়ে কথা কও। তোমাদের তো বিয়া হয় নাই। বিয়া হইলে সব দায়িত্ব তোমার উপর ন্যস্ত করতাম কিন্তু বিয়া তো শেষ পর্যন্ত হইল না, বাবা।”
ইয়াসিফের দৃষ্টিতে আগুনের ঝলক। এক পা এগিয়ে এসে বলল, “আপনি বিষয়টা চাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন, চাচা। ময়ূরীকে যে খুন করা হয়েছে, তা আপনি জানেন না? অস্বীকার করতে পারবেন?”
মৃন্ময়ী বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। খুন? মানে হত্যা? শিশির নিঃশ্বাস পর্যন্ত ফেলতে ভুলে গেছে। এগিয়ে এসে অবিশ্বাসী কণ্ঠে বলল, “কি হয়েছে ভাই? খুন মানে কি? পোস্টমর্টেম রিপোর্টে তো এসব কিছুই ছিল না!”
ইয়াসিফ শিশিরের দিকে তাকাল। চোখে লালচে ক্লান্তি, কণ্ঠে জমাটবাঁধা ক্রোধ। ধারালো গলায় বলল, “ওটাই তো সমস্যা। রিপোর্টটা ছিল সাজানো।”
মৃন্ময়ীর বুকের ভেতরটা ধপ করে উঠল, “সাজানো?”
ইয়াসিফ আবার বলল, “দ্বিতীয় পোস্টমর্টেমের রিপোর্ট পেয়েছি। ময়ূরী আত্মহত্যা করেনি। ওকে খুন করা হয়েছে। এর আগে ওর উপর পাশবিক নির্যাতন হয়েছে। গ্যাং রেপ।”
মৃন্ময়ীর মাথার ভেতরটা ঘুরে উঠল। দম নিতে কষ্ট হচ্ছিল। হাত দিয়ে খুঁটি আঁকড়ে ধরে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করল। ইয়াসিফ জহির মোল্লার দিকে তাকাল, “এই কারণেই ও চুপ ছিল। কেউ চেয়েছিল এটাকে পুঁজি করে সবকিছু আত্মহত্যা বানিয়ে শেষ করে দিতে। চাচা আপনি ভয়ে চুপ ছিলেন, আমি বুঝতে পারছি। এখন জানতে চাই, অপরাধী কে? যদিও আমি জানি, কিন্তু আপনার মুখ থেকে শুনে নিশ্চিত হতে চাই।”
জহির মোল্লা হঠাৎ এগিয়ে এসে মৃন্ময়ীর হাতটা শক্ত করে ধরে ফেললেন। গলাটা কেঁপে উঠল তাড়াহুড়োয়, “আমি কিচ্ছু জানি না।” চোখ সরিয়ে নিয়ে বললেন, “কে বলছে তোমাকে এসব? কিসের তদন্ত করছ আবার? ময়ূরীকে তো দাফন করা হয়েছে।” তারপর মৃন্ময়ীর দিকে ফিরে বললেন, “তুই ঘরে আয়। এরা যা ইচ্ছে হয় করুক। যা মন চায় বলুক।”
ইয়াসিফ পেছন থেকে গলা তুলে বলল, “এটা তাওহীদের কাজ, তাই না? আমি ওকে দেখে নিচ্ছি।”
কথাটায় জহির মোল্লার বুকের ভেতরটা চিরে দিল। তিনি হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ালেন। চোখেমুখে অসহায়তা। একজন ভেঙে পড়া বাবার আকুতি, “না বাবা, না। তুমি কিছু করো না।” এক হাত দিয়ে বুক চেপে ধরে বললেন, “আমার এক মেয়ে গেছে। আরেক মেয়েকে হারাতে পারব না আমি।”
“কি বলছেন এসব আপনি? আরেক মেয়েকে হারানোর কথা উঠছে কীভাবে?”
তিনি মৃন্ময়ীর দিকে তাকালেন। ওই তাকানোর ভেতর ভয় ছিল, অনুনয় ছিল, ছিল সেই কালো স্মৃতিগুলো; যা তাকে প্রতিদিন দমবন্ধ করে রাখে। ভাঙ্গা গলায় বললেন, “ওরা বড় মানুষ, বাবা। ক্ষমতাওয়ালা। একটা কথা বললে আরেকটা লাশ পড়তে সময় লাগে না। আমি ময়ূরীকে বাঁচাতে পারলাম না। মৃন্ময়ীটাকে অন্তত বাঁচতে দাও।”
ইয়াসিফ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। সবকিছু মিলিয়ে তার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল, কেন একজন বাবা সত্যের বিপক্ষে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছে? এটা অবশ্যই তার দুর্বলতা না। এটা ভয়, এই ভয়টা জন্মেছে সন্তানের জন্য। সে ধীরগতিতে নিঃশ্বাস নিল। গলাটা শান্ত কিন্তু ইস্পাতের মতো শক্ত রেখে বলল, “চাচা, আপনি চিন্তা করবেন না। দায়িত্ব আমি নিচ্ছি, সবকিছু আমার উপর ছেড়ে দিন। মৃন্ময়ীও বাঁচবে আর ময়ূরীও ন্যায় পাবে।”
.
.
.
চলবে….
