#প্রণয়_প্রত্যাবর্তন🖤 [সূচনা পর্ব]
~আফিয়া আফরিন
বিয়ের দিন বউ পালিয়ে গেছে! এই কথাটা গ্রামজুড়ে ছড়াতে সময় লাগল না। কেউ বলল, বাপ-মা জোর করে বিয়ে দিচ্ছে বলে পালিয়েছে। কেউ বলল, অন্যকারো সাথে পালিয়েছে। কেউ আবার ফিসফিস করে ভয়ানক অনেক কথাই বলল। কিন্তু ইয়াসিফ বিশ্বাস করতে পারছিল না। ময়ূরীর তো পালানোর কথা ছিল না। এই বিয়েটা ওদের দু’জনেরই স্বপ্ন ছিল। বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা একটা সম্পর্ক! শত বাঁধা পেরিয়েও একসাথে থাকার প্রতিশ্রুতি। অতঃপর আজ সেই প্রতিশ্রুতির চূড়ান্ত সন্ধ্যা। ময়ূরীর তো কনের সাজে ঘরের ভেতর বসে অপেক্ষা করার কথা ছিল। তবে? ওই ঘরটা ফাঁকা। শাড়ি, গয়না, ময়ূরী; কেউ নেই, কিচ্ছু নেই। ইতোমধ্যে কনের খোঁজে বেরিয়ে পড়েছে সবাই। পুকুরপাড়, বাঁশঝাড়, গ্রামের শেষ রাস্তা কোনো খানে বাদ নেই। নাম ধরে ধরে ডাকাডাকি হচ্ছে, “ময়ূরীইইই!”
কিন্তু কোথাও কোনো সাড়া নেই। ইয়াসিফ আর অপেক্ষা করল না। তার অস্বস্তিটা সন্দেহে রূপ নিয়েছে। এই গ্রামে যত অঘটন ঘটেছে, সব কিছুর শিকড় এক জায়গাতেই গিয়ে ঠেকে। জমিদার বাড়ি! সে সোজা সেদিকেই হাঁটা ধরল। ইয়াসিফ ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “তাওহীদ!” একটু থেমে চেঁচালো, “তাওহীদ! বাহিরে আয়।”
কোনো সাড়া নেই। আরও জোরে চেঁচাল, “তাওহীদ! আমি জানি তুই ভিতরেই আছিস।” কিছুক্ষণ পর ভেতর থেকে পায়ের শব্দ শোনা গেল। বেরিয়ে এলো জমিদার হাজী মকবুল রহমান। ইয়াসিফকে একবার উপর থেকে নিচ পর্যন্ত দেখে নিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, “এভাবে চেঁচামেচি করছ কেন? এটা কোনো বাজার না। ভদ্রলোকের বাড়ি।”
ইয়াসিফের কণ্ঠ ক্রোধে রুদ্ধ হয়ে আসছিল, “ময়ূরী কোথায়?”
জমিদার সাহেব ভ্রু কুঁচকে বললেন, “ময়ূর? সেডা কেডা? আমার এখানে কোনো ময়ূর বা উটপাখি আসে নাই। যাও গা বাবা।”
ইয়াসিফ এক পা এগিয়ে এসে বলল, “ডোন্ট ট্রাই টু বি ওভারে স্মার্ট। দুই দিন আগেও এই বাড়ির পেছনে যা হয়েছে…” আজ সকালে ময়ূরীর বলা কথায় সে আন্দাজে ঢিল ছুঁড়ল।
“চুপ!” জমিদার সাহেবের গলা চড়ল। চক্ষু যুগল হিম হয়ে এলো, “এই বাড়ির নাম নেওয়ার আগে মুখ সামলে কথা বলবা। প্রমাণ আছে? না থাকলে এক পাও সামনে বাড়াইও না।”
ইয়াসিফ এখনও রোষে কাঁপছিল, “আগে ময়ূরীকে পেয়ে নিই।” সে বলল “তারপর আপনার আর আপনার ছেলের ব্যবস্থা করব।” জমিদার সাহেব কিছু বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু ইয়াসিফ থামিয়ে দিল, “ভেবেছিলাম বিয়েটা শেষ হোক, তারপর হিসাব চুকাবো। কিন্তু না, আমি এর শেষ দেখে ছাড়বো।”
জমিদার সাহেব ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বললেন, “প্রমাণ আছে?”
“নেই। কিন্তু বের করব। একটা না, অনেকগুলো। যেদিন প্রমাণ পাব, সেদিন লুকানোর জন্য আকাশ–পাতাল কোনো কিছুতেই ঠাঁই পাবেন না।”
জমিদার কিছুই বললেন না। ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। ইয়াসিফ ফটকের দিকে এগিয়ে আরেকবার চোখ তুলে তাকিয়ে বলল, “ওয়েট অ্যান্ড সি।”
ইয়াসিফ পুরোপুরি চলে যাওয়ার পর জমিদার সাহেব কিছুক্ষণ ফটকের দিকেই তাকিয়ে রইলেন। চোখেমুখের কঠিন ভাবটা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে গেল। দৃষ্টিতে চাপা উদ্বেগ। তিনি ভেতরের দিকে ঘুরে গলা চড়ালেন, “রশিদ!”
এক মুহূর্তের মধ্যে একজন মাঝবয়সী লোক দৌড়ে এলো, “জি, সাহেব।”
জমিদার গলা নিচু করে বললেন, “তাওহীদ হারামজাদাকে এখনই খবর দে। আজকেই যেন শহরে চলে যায়।”
“এখনই?”
“হ্যাঁ।” জমিদার দাঁত চেপে বললেন, “দু’দিন সবকিছু চুপচাপ ছিল। এখন আর থাকবে না। মানুষ ক্ষেপেছে, পুলিশ আসবে গ্রামে। যাহ, তার আগেই ওরে বল চলে যাইতে। এক মুহূর্তও দেরি করা চলবে না।”
রশিদ মাথা নুইয়ে বলল, “আজ্ঞে সাহেব।”
.
ময়ূরীর বাড়িতে তখন কান্নার রোল পড়ে গেছে। উঠোনে, ঘরে, বারান্দায় সবখানে কান্নার শব্দ। মৃন্ময়ী ফোঁপাচ্ছে, বাবা নিঃশব্দে চোখ মুছছে, কেউ কেউ আবার মাটিতে বসে মাথায় হাত দিয়ে শূন্যের দিকে তাকিয়ে আছে। ময়ূরীর মা রওশন আরা বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। হঠাৎ বুক চাপড়ে কাঁদছেন আবার হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলছেন, “আমার মাইয়াডা কই? আমার মাইয়াডারে খুঁজে দাও আল্লাহ!”
মৃন্ময়ী মাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। নিজেরও চোখ শুকিয়ে গেছে। এ কোন বিপদ নেমে এলো? রাত নেমে এসেছে। এখনও ময়ূরীর একটা খবর পাওয়া যায়নি। জহির মোল্লা বিকেলের দিকে থানায় গিয়েছিলেন। ঘণ্টাখানেক পরে ধ্বংসাত্মক অবস্থায় বাড়ি ফিরলেন। দৃষ্টিতে ক্লান্তি, অবয়বে শ্রান্তির আভা। রওশন আরা ছুটে এসে জিজ্ঞেস করলেন, “কি বলল পুলিশ? কিছু করবে তো?”
জহির মোল্লা নিচু গলায় বললেন, “কিছুই না।” কষ্টটা চেপে রেখে বললেন, “ওর বলল, ২৪ ঘণ্টা না পেরোলে নাকি কিছু করা যায় না। আর যেহেতু বিয়ের আসর থেকে মেয়ে গায়েব… ওরা একদম সিওর, মেয়ে পালাইছে।”
রওশন আরা চিৎকার করে উঠলেন, “আমার মাইয়া পালাইবো কেন? কার লগে পালাইবো?”
জহির মোল্লার গলা ভারী হয়ে এলো, “আরও বলল, এখন কেস-ফেস করে লাভ নাই। সময় নষ্ট। যাও, যাও।” তিনি চুপ করে গেলেন। ঘরের ভেতর আবার কান্নার শব্দ বেড়ে উঠল। মৃন্ময়ী এগিয়ে এলো। বাবার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “আব্বা, তোমরা কি পুরা গ্রামটা দেখছো?”
জহির মোল্লা তাকিয়ে বললেন, “দেখছি তো মা। মানুষজন সবদিকেই গেছে।”
“ইয়াসিফ ভাই কই এখন?” ইয়াসিফের খবর তিনি জানেন না। তাই চুপ করে রইলেন। রওশন আরাও তাকিয়ে রইলেন মেয়ের দিকে। মৃন্ময়ী নিচু গলায় বলল, “ইয়াসিফ ভাই আপাকে ছাড়া এমনে বসে থাকার মানুষ না। উনি নিশ্চয়ই খুঁজছেন। উনি যদি কিছু জানেন…”
ওর কথা পুরোপুরি শেষ হলো না। বাইরের অন্ধকার আরও ঘন হয়ে এলো। আর সেই অন্ধকারের ভেতরেই হয়তো লুকিয়ে আছে ভয়ংকর সত্য।
ঘটনাটা শুরু হয়েছিল ঠিক দু’দিন আগে। ইয়াসিফ শাহরিয়ার, আকন্দ বাড়ির একমাত্র ছেলে। গ্রামের সীমানা পেরিয়ে অনেকদিন আগেই শহরে চলে গেছে। পড়াশোনা শেষ করে সেখানেই চাকরি-বাকরি করছে। ছুটিতে আসা–যাওয়ায় গ্রামের সাথে তার সম্পর্কটা কখনোই ছিঁড়ে যায়নি। ময়ূরীর সাথে ইয়াসিফের সম্পর্কটা নতুন না। ছোটবেলার চেনাজানা, তারপর ধীরে ধীরে ভালো লাগা আর একসময় তার গভীরতা। বছরের পর বছর ধরে ওরা একে অপরকে নিঃশব্দে ধরে রেখেছে। চাকরি পাওয়ার পর ইয়াসিফ প্রথম যেটা করেছিল, সেটা হলো বাড়িতে সব কথা খুলে বলা। মা–বাবা আপত্তি করেননি। ময়ূরীকে তারা ছোটবেলা থেকেই চেনেন। গ্রামের অন্য দশটা মেয়ের মতো ও না। ভীষণ শান্তশিষ্ট, ভদ্র, নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকা। কারো সাথে উচ্চস্বরে কথা বলা তো দূরের কথা, চোখ তুলে তাকাতেও সংকোচ বোধ করত।
বিয়ের প্রস্তাবের পর সবকিছু ভীষণ দ্রুত এগিয়ে গেল। দুই পরিবারেই রাজি। তারিখ ঠিক হলো, প্রস্তুতি শুরু হলো। সবকিছু এতটাই স্বাভাবিক ছিল যে, কেউ কল্পনাও করেনি এই স্বাভাবিকতার আড়ালেই উতলে উঠছে এক ভয়ংকর ঝড়। সেই ঝড় আসতে সময় নিয়েছিল মাত্র দু’ঘন্টা।
ইয়াসিফ বিয়ের ঠিক এক সপ্তাহ আগেই গ্রামে ফিরেছিল। কিন্তু দু’দিন আগে হঠাৎ করেই শহরে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে। কাজের একটা জরুরি ঝামেলা, না গেলে চলছিল না। তাই কোনো উপায় না পেয়ে শহরে ফিরে যেতে হয় তাকে। এই ঘটনাটা ময়ূরীর জানা ছিল না। ইয়াসিফ ভেবেছিল, ফিরে এসে বলবে। সেদিন সন্ধ্যার পর ময়ূরী ঘরেই ছিল। হঠাৎ পেছনের জানালায় মৃদু শব্দ। ময়ূরী জানালার কাছে গিয়ে দেখল, পাশের বাড়ির কাজের মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ও নিচু গলায় বলল, “আপা, ইয়াসিফ ভাই তোমাকে বাড়ির পেছনের দিকে ডাকছে।”
ময়ূরী একটু অবাক হলো, “এখন?”
মেয়েটা মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ। একটু আগেই আসছে। তাড়াতাড়ি যেতে বলছে।”
ময়ূরীর মনে সন্দেহ জাগেনি। কারণ বিগত কয়েকবার ইয়াসিফ ঠিক এইভাবেই, লোকচক্ষুর বাইরে বাড়ির পেছনে দেখা করেছে। এক মুহূর্ত দেরি না করে ময়ূরী আঁচলটা ঠিক করে বেরিয়ে পড়ল। ও পেছনের দিকের সরু পথটায় কাউকে দেখতে পেল না। আরেকটু এগিয়ে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তেই সবকিছু ঘটে গেল। পেছন দিক থেকে কেউ বা কারা যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল। একটা শক্ত হাত মুখ চেপে ধরল। চিৎকারটা গলার ভেতরেই আটকে গেল। আরেকজন পেছন থেকে দুই হাত জড়িয়ে ধরল, শরীরটা হাওয়ার মতো করে তুলে নিল। ময়ূরী ছটফট করতে লাগল। পা মাটিতে পড়ছে না, শ্বাস নিতে পারছে না। একজন ধমক দিল, “আওয়াজ করবি না।”
তারপর পাঁজাকোলা করে তুলে নেওয়া হলো ওকে। ঝোপঝাড়, কাদা, ভাঙা ইট পেরিয়ে দ্রুত এগোতে লাগল তারা। কয়েক মুহূর্ত পরেই একটা জীর্ণ কুটিরের সামনে এসে থামল সবাই। দরজাটা ঠাস করে বন্ধ হয়ে গেল। ময়ূরী হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। উঠে দাঁড়াতে চাইল, ঠিক তখনই তাওহীদ সামনে এসে দাঁড়াল। মুখে সেই ভয়ংকর হাসি, “কই যাস?”
ময়ূরী কাঁপতে কাঁপতে পিছিয়ে গেল। দেয়ালে পিঠ ঠেকল। চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল ভয়ে, “তাওহীদ ভাই, আমি কিছু করি নাই। আমাকে ছেড়ে দেন…”
তাওহীদ হেসে উঠল। হাসিটা হিংস্র, তাচ্ছিল্যের। সে চারপাশে তাকিয়ে অন্যদের দিকে ইশারা করল, “ভাই? শুনছিস সবাই? এখন আমি ভাই!”
বাকি কয়েকজন হাসল। কেউ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, কেউ জানালার ধারে। কারো চোখে কৌতূহল, কারো চোখে লালসা। ময়ূরী মাথা নাড়ল, “আমি বাড়ি যাব। কেউ জানে না আমি এখানে এসেছি, ইয়াসিফ জানলে…”
নামটা শুনেই তাওহীদের চোখে আগুন জ্বলে উঠল, “ইয়াসিফ? ওরে বিয়ে করবি বলে এত দেমাক?”
ময়ূরী আরও পিছোতে চাইল। কিন্তু আর জায়গা নেই। তাওহীদ হঠাৎ করে জোরে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে চারপাশের সবাইকে দেখিয়ে বলল, “দেখছিস? পাখি পালাতে চাইছে।”
চারদিক থেকে চাপা আওয়াজ উঠল, “শোধ নেন ভাই। আজই সময়, আপনের আব্বা কইয়া দিছে।”
তাওহীদ এক পা এগিয়ে এলো। ময়ূরীর শাড়ির আঁচলটা টেনে ধরল। ও কেঁপে উঠল। দু’হাত দিয়ে নিজেকে আগলাতে চেষ্টা করল, পিছিয়ে যেতে চাইল কিন্তু পারল না। তাওহীদ ঠোঁটের কোণে ঠান্ডা হাসি খেলিয়ে বলল, “কিছু মানুষ আছে যারা ভাবে, সবকিছু ওদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। তোকে আমি বিয়ে করতে চেয়েছিলাম না? যাহ এখন আমি তোকে বলছি, আর দরকার নাই। বিয়ে ছাড়াই অনেক কিছু করা যায়। আজ আমি একলা করব না, সবাই মিলে।” তাওহীদের কণ্ঠে তাচ্ছিল্য। ময়ূরীর চোখে আতঙ্ক। কুটিরের বাতিটা কেঁপে উঠল। সেই কাঁপুনির ভেতরেই হারিয়ে গেল ময়ূরীর শেষ আশাটুকু। তাওহীদ আর তার সঙ্গীদের হিংস্র হাসি, মদের গন্ধ, দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রহরীর মতো নীরবতা ময়ূরীর জীবনটাকে থেঁতলে দিয়েছিল। সেদিনই ময়ূরীর ভেতরটা মরে গিয়েছিল, শুধু শরীরটা বেঁচে ছিল।
এরপর যা ঘটেছিল, সেটা আর বলার মতো ছিল না। বাইরের পৃথিবী তখনও স্বাভাবিক। কেউ জানত না, ওই চার দেয়ালের ভেতরে কীভাবে একটা জীবন ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। অনেক পরে, যখন দরজাটা আবার খুলল ময়ূরী তখন মাটিতে বসে ছিল। শাড়ির আঁচল এলোমেলো, চোখ দুটো শূন্য। কাঁদার শক্তিটুকুও শেষ হয়ে গেছে। তাওহীদ সামনে এসে দাঁড়াল, “আজ যা হইছে, একটা শব্দও যদি বাইরে যায়…” সে বাকিটা শেষ করল না। প্রয়োজনও ছিল না। পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরাল। আগুনের আলোয় তার চোখ দুটো জ্বলে উঠল। একটা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে কুটিল হাসি হেসে বলল, “তোর বোনটা তো বাড়িতেই আছে তাই না?”
ময়ূরীর বুকটা কেঁপে উঠল। ওরা হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেল। কুটিরের ভেতর শুধু ধোঁয়ার গন্ধ আর ভুক্তভোগী না, বন্দী ময়ূরীর নিঃশ্বাসের শব্দ রয়ে গেল।
ময়ূরী এই সব কথা কাউকে বলেনি। কেউ জানলো না, কেউ কিছু বুঝল না। পরদিনই ইয়াসিফ এসেছিল। ময়ূরী মুখ খুলল না। চুপচাপ, নিঃশব্দে বসে থাকল। ওর চোখে ভেঙ্গে যাওয়া স্বপ্ন আর ভয়, দু’টোই ঝলমল করছিল। সবাই ওর মন খারাপের কারণ হিসেবে ভেবে নিয়েছে, বিয়ে হয়ে যাবে তাই মেয়ের মন খারাপ।
সেই চুপচাপ ময়ূরী বিয়ের দিন অর্থাৎ আজ সকালবেলা আকুল হয়ে কেঁদেছে। ইয়াসিফ দেখা করতে এসেছিল। ময়ূরী ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত কষ্ট, সমস্ত ভয় বেরিয়ে এলো। চোখ দিয়ে পানি ঝরছে, আর ঠোঁট কম্পমান। ইয়াসিফ চুপচাপ ওর মাথায় হাত রাখল। কিছু বলল না। ময়ূরী অস্পষ্টভাবে কিছু বলল। তাওহীদ সম্পর্কে একটুখানি ইঙ্গিত দিল, কিন্তু পুরোটা বলল না। শুধু এতটুকুই, যাতে ইয়াসিফ কিছুটা বুঝতে পারে। ময়ূরী বলল, “ওরা আমাকে জমিদার বাড়ির পেছনে ধরে নিয়ে গেছিল।ওই বাড়ির পেছনের একটা কুটির আছে না! সেখানে কি হয়েছিল জানো? ওরা ওরা, জমিদার সাহেবও সব জানে…” ব্যস এইটুকুই। ময়ূরী বাকি কথাটা শেষ করতে পারেনি। বিয়েবাড়ির হৈ হট্টগোলে আর কিছু বলার সুযোগ পায়নি। যেহেতু ইয়াসিফের সাথে তাওহীদের আগে থেকেই একটা ঝামেলা আছে তাই ময়ূরীকে তুলে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টা ইয়াসিফ মনে রাখল। ভাবল, “যা করার বিয়েটা হয়ে গেলে করব।” কিন্তু ওই মুহূর্তে সে ঘুনাক্ষরেও ভাবতে পারেনি ঠিক কী হয়েছিল তার প্রাণপ্রিয় ময়ূরীর সাথে!
যে বিয়ের পর ব্যবস্থা নিবে, সেই বিয়েটাই তো হলো না। চোখে খুঁজে ফিরছে ময়ূরীকে, কোথায় গেল ও? কেন এমন আচরণ করল? সকালবেলা কেঁদে কেঁদে এসে জড়িয়ে ধরল, আর এখন কোথায় হারিয়ে গেল?
.
সকাল হয়ে এলো। সূর্যের আলো গ্রামের ঘর-বাড়ির ওপর পড়তে শুরু করেছে। রাতের নিঃশব্দ, নির্ঘুম মুহূর্তগুলো চোখের পলকে সবাইকে ক্লান্ত করে রেখেছে। খোঁজ এখনও চলছে অবিরত। হঠাৎ দমকা হাওয়ার মতো খবর এলো, “ময়ূরীকে পাওয়া গেছে।”
বাড়ির সবাই চুপ হয়ে গেল। কেউ বিশ্বাস করতে পারছিল না। এরপর খবরের ভয়ংকর সত্য সামনে এলো, “ময়ূরীর লাশটা জমিদার বাড়ির পেছনে, আমগাছের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে।”
.
.
.
চলবে….
#প্রণয়_প্রত্যাবর্তন🖤 [পর্ব-০২]
~আফিয়া আফরিন
রওশান আরা নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। তিনি প্রথমে বুঝতেই পারেননি। ত্রস্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, “কই পাওয়া গেছে?”
যে খবর নিয়ে এসেছিল তিনি বলল, “জমিদার বাড়ির পেছনে, আমগাছের সাথে…”
আর কিছু বলা লাগল না। তীব্র মানসিক আঘাতে বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে গেল। মর্মভেদী যন্ত্রণায় দুই হাতে বুক চেপে ধরে চিৎকার করে উঠল, “আল্লাহ! আমার ময়ূরী, আমার মাইয়াডা।”
সে আওয়াজ অশ্রুঝরা রোদন নয়, মাতৃবক্ষ ছিন্ন করে আসা তীব্র আর্তনাদ। তার শরীর ঢলে পড়ল। মৃন্ময়ী দৌড়ে এসে মাকে ধরে ফেলল। কোনোরকম বলল, “মা মা, এমন কইরো না।” বলতে গিয়েই ওর নিজের গলাও ভেঙে গেল। মাকে আগলে ধরতে চাইছে, কিন্তু নিজের শরীরটাই কাঁপছে অনবরত। আচ্ছন্ন দৃষ্টিতে সবকিছু অস্পষ্ট লাগছে। প্রতীয়মান হচ্ছে, সমগ্র অস্তিত্ব যেন যুগপৎ ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে। রওশান আরা তখনও বারবার একটাই কথা বলছিলেন, “আমার মাইয়াডা কী দোষ করছিল আল্লাহ…” মৃন্ময়ী মাকে শক্ত করে ধরে রাখল। ঝাপসা দৃষ্টিতে আশেপাশে তাকিয়ে বাবাকে খোঁজার চেষ্টা করল। বাবা কোথায়? সে কি শুনেছে? তার আদরের মেয়েটা…
জহির মোল্লার এক হাতে দোকানের খাতা আরেকটা হাত মাথায় ঠেকিয়ে বসেছিল। খবরটা যখন কানে এলো তখন হতদ্যোম হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কোন ময়ূরী?”
যখন পুরো কথাটা বলল লোকটা, জহির মোল্লা ক্ষণমাত্রও কালক্ষেপণ করলেন না। খাতাটা হাত থেকে পড়ে গেল। বাকহীনভাবে সে দ্রুতগতিতে ছুটে চলল। না, দৌড় না। নিজের শরীরটাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে অপরিজ্ঞাত শঙ্কার অভিমুখে। চেনা রাস্তা, চেনা বাঁক কিন্তু আজ সবকিছু অচেনা লাগছে। পা দুটো মাটিতে ঠিকমতো পড়ছে না। মাথার ভেতর একটাই শব্দ ঘুরছে, “হইতে পারে না। হইতে পারে না।”
জমিদার বাড়ির পেছনের দিকটা চোখে পড়তেই জহির মোল্লার পায়ের গতি কমে গেল। দূর থেকেই লোকজনের ভিড় দেখা যাচ্ছে। আমগাছটা চোখে পড়ল। তার বুকের ভেতর বাতাস আটকে গেল। সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। হাঁটু ভেঙে মাটিতে বসে পড়ল। লাল হয়ে যাওয়া চোখে তাকিয়ে রইল গাছটার দিকে, ঝুলে থাকা নিথর দেহটার দিকে। জীর্ণ কণ্ঠ থেকে ভাঙা আওয়াজ বেরিয়ে এলো, “ময়ূরী, মা আমার মা…” লোকজন ভিড়ে ঠেলে এগিয়ে এসে তাকে দাঁড় করাল।
ইয়াসিফ কিছুই বলছিল না, বলতে পারছিল না। ময়ূরীর ঝুলন্ত দেহটা চোখের সামনে ভাসছিল বারবার। যেন কেউ জোর করে তার চোখের ভেতর সেই দৃশ্যটা গেঁথে দিয়েছে। একটা মানুষ, যার আজ নতুন জীবনে পা রাখার কথা ছিল সে কীভাবে এই অবস্থায় পৌঁছাল? মাথার ভেতর একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল, ময়ূরী আত্মহত্যা করবে কেন? অসম্ভব। ময়ূরী এমন না। চূর্ণ-বিচূর্ণ হলেও অন্তরাত্মায় অবিচল থাকার তেজ ওর ছিল। ভয় পেত, কিন্তু হার মানত না। আজ সকালেই তো কেঁদেছিল তার বুকে মুখ লুকিয়ে। সেই রোদনে অন্তিম পরিণতির সংকল্প ছিল না। ছিল কেবল শঙ্কা, দ্বিধা আর অনুতাপের ভার। তাহলে কী হলো? কী এমন বোঝা ও একা বয়ে বেড়াচ্ছিল? ইয়াসিফের বুক ধুকপুক করে উঠল। মনে পড়ল; ময়ূরীর এড়িয়ে যাওয়া দৃষ্টি, অল্প কথায় থেমে যাওয়া, অকারণ ভয় পেয়ে চমকে ওঠা।
তাওহীদ! নামটা চিত্তে প্রবেশ করতেই দাবানল সৃষ্টি করল। ইয়াসিফ কিছুতেই দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাতে পারছিল না কারণ সে ঘটনার একাংশও পুরোপুরি জানেনা। তবে এইটুকু বুঝতে পারল, জমিদার বাড়ির পেছনে লাশটা কাকতালীয় হতে পারে না। তার শোক রূপ নিচ্ছিল প্রশ্নে আর প্রশ্নগুলো জমে জমে ঘৃণায় পরিণত হচ্ছিল। নিজেকে ভীষণ ভঙ্গুর মনে হচ্ছিল। এতদিনের ভালোবাসা, স্বপ্ন, প্রতিজ্ঞা একটা দমকা হাওয়া এসে সব উড়িয়ে নিয়ে গেছে। আজ ওদের একসাথে থাকার কথা ছিল। আজ সে তার স্ত্রীকে বাড়ি তুলত। অথচ এখন? নিয়তি যেন নিষ্ঠুর হাসি হেসে বলছে, “তুমি দেরি করে ফেলেছ।” ইয়াসিফ চোখ বন্ধ করল। বুকের ভেতরটা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। সত্যিটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। সব দুঃস্বপ্নের মত আঘাত হানছে।
.
পুলিশ আসতে বেশি দেরি হলো না। সাইরেনের শব্দটা গ্রামের নিস্তব্ধতাকে চিরে গেল। কয়েকজন কনস্টেবল ভিড় ঠেলে সামনে এলো। আমগাছটার নিচে শাড়ির আঁচলে আবৃত নিথর দেহটা এখনও ঝুলে আছে। একজন পুলিশ অফিসার গম্ভীর গলায় নির্দেশ দিল, “লাশ নামাতে হবে। পোস্টমর্টেমের জন্য নিতে হবে।”
দু’জন কনস্টেবল এগিয়ে গিয়ে সাবধানে দড়ির গিঁট খুলল। ময়ূরীর দেহটা মাটিতে নামানো হলো। জহির মোল্লা সামনে এসে দাঁড়াল। পুলিশ বলল, “আমরা লাস্টে নিয়ে যাব।”
“কোথায় নিয়ে যাবেন?”
অফিসার উত্তর দিল, “থানায়। পোস্টমর্টেম করতে হবে।”
এই কথাটা শোনামাত্র জহির মোল্লার মুখের রক্ত শুকিয়ে পাংশুবর্ণ হয়ে গেল। তিনি কিছুতেই মেয়েটাকে কাটাছেঁড়া করতে দিবেন না। এক কথায় বলল, “না,”
অফিসার ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “ঝামেলা করবেন না প্লিজ। এটা আইনগত প্রক্রিয়া।”
জহির মোল্লা এবার একটু সামনে এগিয়ে এল, “মাইয়াডারে আমি আর কাটতে দিমু না। কত কষ্ট পাইয়া মরছে দেখছেন না? জীবনে যা পাইছে, তা গেছে। মরার পরও শরীর কাইট্যা দেখব এইটা আমি মানি না।”
চারপাশে আবার ফিসফিস শুরু হলো। রওশান আরা দূর থেকে কাঁদছিল। মৃন্ময়ী বাবার হাত আঁকড়ে ধরল। অফিসার কিছুটা কঠোর হয়ে বলল, “আপনার মেয়ের মৃত্যুটা স্বাভাবিক না-ও হতে পারে। পোস্টমর্টেম না করলে সত্য বের হবে কীভাবে?”
জহির মোল্লা হঠাৎ গর্জে উঠল, “সত্য? আমার মাইয়া বাইচ্চা থাকতে আপনারা কোন সত্য উদঘাটন করছেন? তখন সত্য কই আছিল? মাইয়া মরার পরেই সত্য লাগে?”
অফিসার ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন। তার কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারছেন না। তৎকালে তার কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল ক্ষোভ, অসহায়ত্ব ও অভিমানের নিবিড় সংমিশ্রণ। ফের বললেন, “আমি বাবা…” তিনি কথাটা বলেই থেমে গেলেন এক মুহূর্তের জন্য তার চোখের সামনে ভেসে উঠল আরেকটা মুখ, ছোট মেয়েটার। ভয়ে চোখগুলো বড় বড় হয়ে গেছে। তারপর ভেসে উঠল জমিদার সাহেবের ভয়ঙ্কর কণ্ঠ, “মুখ খুইলো না জহির। এক মাইয়া তো গেলই। আরেকটা আছে, না?”
তার গলা শুকিয়ে এলো। গর্জনটা আর ধরে রাখতে পারল না সে। ভীষণ ক্লান্ত স্বরে বলল, “আমার মাইয়াডা অনেক কষ্ট পাইছে। মরার পর অন্তত শান্তিতে থাকুক।” মৃন্ময়ী বাবার হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরল। ও কিছু বুঝতে পারছিল না, কিন্তু বাবার হাত স্পর্শ করে ভাঙনটা ঠিকই বুঝে যাচ্ছিল।
পুলিশ অফিসার চুপ করে রইলেন। তার দৃষ্টি সন্দিগ্ধ। সহকারীকে পাশে ডেকে নিচু স্বরে কিছু বলল। শেষমেশ তিনি বললেন, “ঠিক আছে। আপনি লিখিতভাবে জানাবেন যে পোস্টমর্টেমে আপত্তি আছে।”
জহির মোল্লা মাথা নাড়ল। কি আর করতেন তিনি? তার এত ক্ষমতা নেই। সে তো বাবা… এক সত্তার অধিকার হরণ করে আরেক সত্তার আয়ু টিকিয়ে রাখছেন। তাকে যে এক অবলার যন্ত্রণার ওপর ভিত্তি করে অন্য প্রাণের অস্তিত্ব রক্ষা করতে হবে!
এতক্ষণে ভিড় ঠেলে ইয়াসিফ সামনে এগিয়ে এলো। এতক্ষণ সে চুপ করে ছিল। চুপচাপ সব দেখছিল। ভেতরে জমে থাকা শোক আর সন্দেহ মিলেমিশে অসম্ভব দৃঢ়তা তৈরি করেছে। ইয়াসিফ বলল, “না, পোস্টমর্টেম হবে।”
হঠাৎ সবাই তার দিকে তাকাল। জহির মোল্লা বিস্মিত হলো, “তুমি কী কও বাবা?”
ইয়াসিফ এক পা সামনে এগিয়ে এল। গলায় যন্ত্রণা চাপা দিয়ে বলল, “আমি জানি, এই জিনিসটা আমাদের জন্য মেনে নেওয়া অনেক কঠিন। আপনাদের কাছে আরো বেশি কঠিন। কিন্তু আপনি তো আপনার মেয়েকে চেনেন তাই না? আমিও ময়ূরীকে চিনি। সে এমন মেয়ে না যে হঠাৎ করে সব ছেড়ে চলে যাবে।”
সে থামল। শ্বাস নিল গভীরভাবে, “গতকাল ওর কথাবার্তা, আচরণ সন্দেহজনক ছিল। ভয় পেয়েছিল কোনো কারণে। আমার চোখের দিকে তাকাতে পারত না। স্যার, আমি জানতে চাই এটা আত্মহত্যা নাকি অন্যকিছু? অথবা এমন কি কোনো কারণ যাতে ওকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করা হয়েছে?”
এই কথাটুকু বলেই ইয়াসিফ জহির মোল্লার দিকে ঘুরল। নিজেকে সামলে বলল, “চাচা, আপনি বাবা। আমি আপনার কষ্ট বুঝতে না পারলেও খানিকটা অনুমান করতে পারছি। কিন্তু যদি আজ সত্যটা চাপা পড়ে যায়? তাহলে ময়ূরীর সাথে সাথে সত্যটাও নিঃশেষ হয়ে যাবে। আপনি কি তা চান? ন্যায় চান না?”
জহির মোল্লার চোখে জল টলমল করল। সে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু মুখ দিয়ে শব্দ বের হলো না। ইয়াসিফ শেষ কথাটা বলল, “ময়ূরীর চলে যাওয়ার কথা ছিল না। আমরা ওকে বাঁচাতে পারিনি। কিন্তু এখন অন্তত জানতে চাই, কেন ও আত্মহত্যা করল।”
ইয়াসিফের কথায় জহির মোল্লার চোখে আগুন জ্বলে উঠল। বেদনার শিখা নয়, এ যে আতঙ্কের দহন। তিনি শক্ত গলায় বললেন, “না।” উনার সাথে ইয়াসিফের ছোটখাটো একটা দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে গেল। শেষমেষ পুলিশ অফিসারের সিদ্ধান্তের কাছে তিনি অটল থাকতে পারলেন না। এটা যেহেতু আত্মহত্যা, আইন অনুযায়ী সন্দেহজনক মৃত্যু; তাই তদন্ত হবেই। লাশ নিয়ে যাওয়া হলো। স্ট্রেচারে যখন ময়ূরীকে তোলা হচ্ছিল, রওশান আরা চিৎকার করে উঠলেন। মৃন্ময়ী মাকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়েছিল। ওর চোখেও আগুন দাউ দাউ করছে। রক্তবর্ণ চোখ নিয়ে ও আশেপাশে তাকাল। এতক্ষণে ভিড় কমেনি উল্টো আরো বেড়েছে। মানুষজন ফিসফাস করছে। চারিপাশে রহস্যের গন্ধ ছড়িয়ে গেছে।
মৃন্ময়ী আর ময়ূরী, দুজনেই জমজ। চেহারায় একেবারে এক। একই চোখ, একই নাক, একই মুখের গড়ন। সহজে ওদের আলাদা করা যেত না। কিন্তু স্বভাব? আকাশ-পাতাল পার্থক্য। ময়ূরী ছিল চুপচাপ। সব সহ্য করত, মানিয়ে নিত। কথাবার্তা কম বলত। আর মৃন্ময়ী? ও সর্বদা আগুনের স্ফুলিঙ্গ। একটুতেই শিখা ফোঁস করে জ্বলে ওঠে। ও চুপ থাকতে পারে না, অন্যায় দেখলে মুখ খোলে। আজ বাবার কথাগুলো ঠিকঠাক মনে হলো না। নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছে। কিন্তু কি সেটা?
.
জমিদার হাজী মকবুল রহমান দেখা করে গেছেন। সান্ত্বনা বাক্য আওড়েছেন। গ্রামে সবাই তাকে “হাজী সাহেব” বলেই চেনে। দীর্ঘ দাড়ি, সাদা টুপি, ইস্ত্রি করা পাঞ্জাবি হাতে সবসময় কাঠের তসবি দ্বারা একেকটা দানা ঘোরান। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, লোকটা খুব ধর্মপরায়ণ। নামাজ পড়েন, দান-খয়রাত করেন, মসজিদের কাজে অংশগ্রহণ থাকেন। কিন্তু এই সাজটা তার ঢাল, পাপ ঢাকার ঢাল। আজ গ্রামে পুলিশ এসেছে। হাজী মকবুল রহমান দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখলেন। মুখে বেদনার প্রলেপ, চোখে অনুশোচনার আভাস। তসবি ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন, “আল্লাহ যা করে ভালোর জন্যই করে…”
তবে অন্দরমহলে ভিন্ন ফন্দি-ফিকির চলছিল। কে কী দেখেছে, কে কী শুনেছে, আর সবচেয়ে বড় কথা; পুলিশকে তদন্তের জন্য উসকে ইয়াসিফ শাহরিয়ার কতদূর যেতে পারে, তা তিনি দেখে নিবেন।
হাজী মকবুল রহমান বাড়ি ফিরে এলেন। বারান্দায় এসে থামলেন। চারপাশ একবার চোখ বুলিয়ে দেখলেন। তারপর গলা নামিয়ে বললেন, “রশিদ।”
ছায়ার মতো একজন লোক এগিয়ে এলো। নিম্ন পানে দৃষ্টি স্থির রেখে বলল, “জ্বি, হাজী সাহেব।”
তিনি তসবি ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন, “তাওহীদ কই?”
রশিদের কণ্ঠ একটু থরথর করল, “ছোট সাহেব ঘরের ভেতর। খুব অস্থির দেখতেছি। তারে কালকে যাইতে কইছিলাম, কিন্তু গেল না।”
হাজী সাহেব ঠোঁটের কোণে হালকা একটা হাসি খেলালেন, “অস্থির হইলে চলে না। ওরে শহরে পাঠাও, আজই। দু’দিন গ্রাম চুপচাপ থাকুক।”
রশিদ মাথা নাড়ল। “জ্বি।”
“আর পুলিশ?”
“থানার ওসি সাহেবের সাথে কথা হইছে। আপনার নাম শুনেই নরম হইয়া গেছে।”
হাজী মকবুল রহমান তসবি থামালেন। তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন, “খেয়াল রাখবা। হাদিয়াটা যেন সম্মানের হয়। এই কেস যেন এখানেই থামে।”
রশিদ সাহস করে জিজ্ঞেস করল, “আর ময়নাতদন্ত?”
“কাগজে যা লেখা লাগে, তাই লেখা হইব।”
রশিদের গলা শুকিয়ে গেল, “জ্বি, হাজী সাহেব।”
হাজী মকবুল রহমান আবার তসবি ঘোরাতে শুরু করলেন, “আল্লাহ সব দেখেন। কিন্তু এই গ্রামের মানুষ যা দেখবে, তা আমি ঠিক করব।”
রশিদ সরে গেল। হাজী মকবুল রহমান দাঁড়িয়ে রইলেন বারান্দায়। দূরে গ্রাম, দূরে আলো-আঁধারি। ঠিক তখনই পাশ থেকে আরেকটা ছায়া খুব সাবধানে নিঃশ্বাস চেপে সরে গেল। সে কিছু শোনেনি স্পষ্টভাবে। কথাগুলো ভাঙা ভাঙা কানে এসেছে। কিন্তু ওতটুকুই যথেষ্ট ছিল। ছায়াটা বুঝে গেল, অন্তরালে কোনো কালজয়ী রচনা গোপনে আকার নিচ্ছে। নিছক কোনো নির্দোষ ঘটনা নয়, এটা এক বড়সড় জঘন্য কারসাজি। কিন্তু কার বিরুদ্ধে?
.
.
.
চলবে….
