#প্রণয়_প্রত্যাবর্তন🖤 [পর্ব-১৭]
~আফিয়া আফরিন
অন্ধকার আমবাগানের জরাজীর্ণ মন্দির প্রাঙ্গণ এখন বিভীষিকাময় নাট্যমঞ্চ। একদিকে মরণকামড় খাওয়া আহত বাঘের মতো তাওহীদ মাটিতে লুটিয়ে আছে, একহাত গুলিতে এফোঁড়-ওফোঁড়। তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে অরুনিমা, মৃন্ময়ী আর পিস্তল হাতে তাহমিদ। তখনই ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে বের হয়ে এলেন প্রণয় আর তার কবজায় থাকা বিধ্বস্ত মকবুল রহমান। তিনি তাওহীদকে ওই অবস্থায় দেখে চিৎকার করে উঠলেন, “তাওহীদ! আমার বাজান!”
প্রণয় মকবুল রহমানকে একটা ধাক্কা দিয়ে সামনে ফেলে দিল। অরুনিমা আর মৃন্ময়ী অবাক হয়ে দেখল, মকবুল রহমানের ঘাতক হিসেবে খোদ প্রণয়কে। অরুনিমা অস্ফুট স্বরে বলল, “তুমি এইখানে?”
প্রণয় অরুনিমার দিকে তাকিয়ে বিষণ্ণ হাসল, “তোমারে একলা এই পাপের ভার নিতে দিতাম না অরুনিমা। এই জমিদার বংশের শিকড় উপড়ে ফেলার পরিকল্পনা তো আমি অনেক আগেই শুরু করছিলাম।”
মৃন্ময়ী কুড়ালটা শক্ত করে ধরে বলল, “তারমানে আপনিই তাহমিদ ভাইরে এইখানে পাঠাইছেন?”
প্রণয় মাথা নাড়ল। সে নিষ্ঠুর বিচারকের মতো সবার মাঝখানে দাঁড়াল। তাহমিদের দিকে তাকাল, “তাহমিদ ভাই, বাপ-ভাইকে এই অবস্থায় দেখে তোমার আফসোস হচ্ছে?”
তাহমিদ পিস্তলটা নামিয়ে একরাশ ঘৃণা নিয়ে বাবার দিকে তাকাল, “না ভাই। আমি চাই এই লোকটা নিজের চোখে দেখুক সে কী কী হারাইছে। উনি বাবা হওয়ার যোগ্য না।”
সেই মুহূর্তে বনের সরু পথ দিয়ে ঢুকল ইয়াসিফ। আলগোছে অন্ধকারে পথ হাতড়াতে হাতড়াতে অবশেষে তাহমিদের একটা ম্যাসেজ পেয়ে এখান পর্যন্ত আসতে সক্ষম হয়েছে। বুনো লতাপাতা হাত দিয়ে সরিয়ে যখন সামনে তাকাল, রক্ত হিম হয়ে গেল। রক্তের নেশা এত প্রগাঢ় হতে পারে? বুঝতে অসুবিধা হলো না, এটা জ্যান্ত ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে প্রস্তুত করল চরম সত্যের মুখোমুখি হতে। চিৎকার করে উঠল, “প্রণয়! আমি জানি তুমি কেন এই জায়গাটা বেছে নিয়েছ! এইবার আর আইন নিজের হাতে নিও না।”
প্রণয় ইয়াসিফের দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল, “আইন তো জমিদারদের পকেট থেকে বের করছি। অরুনিমা যখন নদীতে ঝাঁপ দিল, আইন কোথায় ছিল? শিশিররে যখন পুড়াইয়া মারা হইলো, আইন কই ছিল? মৃন্ময়ীরে মাইরা আত্মহত্যার নাটক সাজানো হলো, তখন আইন কই ছিল? আইন নাই। আমার পুরো পরিবার যখন ধ্বংস করেছে তখন তোমাদের সুশীল আইন কোথায় ছিল? আজ প্রকৃতি নিজেই আইন-আদালত সাজাইছে।”
প্রণয়ের মুখ থেকে বের হওয়া কথাগুলো এক একটা বোমার মতো ফাটছিল নির্জন মন্দির প্রাঙ্গণে। অরুনিমা স্তব্ধ হয়ে গেল। হাতের ধারালো দা-টা ঘাসের ওপর পড়ে গেল ভোঁতা শব্দে। টলতে টলতে প্রণয়ের সামনে এসে দাঁড়াল। চোখেমুখে এখন তাওহীদের প্রতি ঘৃণার চেয়েও বড় বিস্ময় আর আতঙ্ক। ও হাপিত্যেশ করে প্রণয়ের শার্টের কলার চেপে ধরল। কাঁপাকাঁপা গলায় আর্তনাদ করে উঠল, “প্রণয়! তুমি এসব কী বলতেছ? পলাশ তালুকদার তোমার বাবা? তুমি তো কোনোদিন বলো নাই! তুমি তো কপালপুরের মাস্টার হিসেবে এই গ্রামে আসছিলা। তুমি এই আবোল-তাবোল কথা কেন বলতেছ? তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেল?”
প্রণয় অরুনিমার অস্থির হাতজোড়া নিজের হাতের মুঠোয় নিল। স্পর্শ অস্বাভাবিক শীতল। খুব শান্ত আর ভারী গলায় বলল, “শান্ত হও অরু। অনেক কাহিনী আছে যা তুমি জানো না। এই যে মকবুল রহমান জমিদার সেজে বসে আছে, উনি আসলে একজন স্বনামধন্য খুনি। আজ থেকে চব্বিশ বছর আগে এই মন্দিরের পেছনেই ছিল আমাদের তালুকদার বাড়ি। এই লোকটা ক্ষমতার লোভে আমাদের সাজানো বাড়িটায় আগুন লাগাইয়া দিছিল। আমার মা-বাবা, আমার ছোট্ট বোনটা… সবাই ওই আগুনে কয়লা হইয়া গেছিল। আমাকে আর আমার ভাইকে নিয়ে চাচা কোনোমতে জান নিয়া পালাইছিল। আমি এসব জানতাম না। বছর দশেক আগে চাচা মারা যাওয়ার সময় বলে গিয়েছিল। আমার বয়স তখন দুই আর আমার ভাইয়ের পাঁচ। মাত্র, চিন্তা করতে পারো?”
ওরা পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে শুনছিল। প্রণয় মকবুল রহমানের দিকে একবার ঘৃণার চোখে তাকিয়ে আবার অরুনিমার দিকে ফিরল, “এরা শুধু তোমার জীবনটাই নষ্ট করে নাই, এরা আমার অস্তিত্বই মিটায়া দিছিল। আমি এই গ্রামে মাস্টার হইয়া আসছিলাম এদের শিকড় কাটতে। তুমি তো তাওহীদের কাছে বলি হইছিলা, কিন্তু আমি তিলে তিলে চব্বিশ বছর ধইরা পুড়ছি। তাও সবকিছু ক্ষমা করে তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে নতুন করে বাঁচতে চেয়েছিলাম। দেখো বাঁচতে শিখেও গিয়েছিলাম। তুমি, শান্ত… এইতো আমি! এইতো আমার জীবন! ভেবেছিলাম এদের পাপাচারে আর দৃষ্টি রাখব না। কিন্তু পারলাম না। ওরা একেরপর এক, কতকগুলো মানুষকে শেষ করল দেখেছ? শেষমেষ আমি বুঝলাম, এদের জ্যান্ত কবর না দিলে আমার মা-বাবার আত্মা শান্তি পাবে না।”
অরুনিমা অঝোরে কাঁদতে শুরু করল। যাকে উদ্ধারকর্তা ভেবেছিল, সে আসলে নিজেও এক বিশাল অগ্নিকুণ্ডের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল এতদিন! মকবুল রহমান তখনো মাটির ওপর হামাগুড়ি দিচ্ছেন। বিড়বিড় করে বলছেন, “তোমার বড় ভাই? তুমি চিনো ওরে?”
প্রণয় ক্রুর হেসে তাহমিদের দিকে ইশারা করল, “আমার ভাই তো আপনার কোলেই বড় হইছে চাচা। সে আপনার নামমাত্র বড় ছেলে তাহমিদ। আপনার স্ত্রীর সন্তান হচ্ছিল না বলে আমার ভাইরে চুরি করে নিয়া আসছিলেন নিজের বংশের বাতি জ্বালাইতে। ভাবছিলেন প্রতীক বড় হইয়া আপনার পাপের রাজত্ব সামলাইব? কিন্তু দেখছেন তো, রক্ত ঠিকই রক্তের টান চিন্না নিছে। চাচা? আমি ঠিক বলছি? ভুল হলে শুধরে দিয়েন। চাচার মুখে শোনা কাহিনী তো!”
তাহমিদের হাতের পিস্তলটা থরথর করে কাঁপতে লাগল। সে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে মকবুল রহমানের দিকে তাকাল। তারমানে, যার জন্য সে আজীবন অপরাধবোধে ভুগেছে, সেই লোকটাই তার পরিবারের ঘাতক? পুরো আমবাগানটা মৃতপুরীর মতো নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তাহমিদ অস্ফুট স্বরে বলল, “না এটা হইতে পারে না! এত বড় বিশ্বাসঘাতকতা আমার সাথে? এটা কি সত্যি? কে বলবে আমারে?”
প্রণয় ম্লান হেসে বলল, “রক্তের টান লুকানো যায় না ভাই। তাই তো আজ তুমি নিজের অজান্তেই আমার সাথে হাত মিলাইছো। এই জানোয়ারটা কেবল আমাকে এতিম করে নাই, সে তোমারে দিয়া নিজের পরিবারের খুনিরে আব্বা ডাকাইছে।”
মকবুল রহমান পাগলের মতো চিৎকার করে উঠলেন, “মিছা কথা! সব মিছা কথা!”
“চুপ। নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য আপনে সব করেছেন। তাওহীদ তো একটা বিকৃত জানোয়ার, আর আপনে তারচেয়েও বড় শয়তান। আজ চব্বিশ বছর পর আমি আমার ভাইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, আর আপনি আপনার নিজের তৈরি করা নরকে।”
তাহমিদ ওরফে প্রতীক শরীরের ভার ছেড়ে দিয়ে হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়ল। দুচোখ বেয়ে নোনতা জল গড়িয়ে পড়ছে। চেনা পৃথিবীটা এক নিমিষেই কাঁচের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। প্রণয় এগিয়ে গিয়ে ভাইয়ের কাঁধে হাত রাখল। ভাইয়ের ভেঙে পড়া রূপ দেখে প্রণয়ের পাথুরে চোখেও আজ জল। নিচু স্বরে বলল, “জানি, সত্যটা মেনে নেওয়া কঠিন। মকবুল রহমান কেবল খুনি নন, উনি চতুর জাদুকর। কিন্তু তোমার মা তোমারে খুব মায়া করত। আর সেই মায়ার কাছেই আমি বারবার হেরে গেছি।”
প্রতীক ঝাপসা চোখে প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “আগে বলো নাই কেন ভাই? কেন এত বছর আমারে এই নরকে ফেলে রাখলা?”
প্রণয় ম্লান হেসে আকাশের দিকে তাকাল, যেখানে রাতের কালো ফিকে হতে শুরু করেছে। বলল, “কেমনে বলতাম রে? যারে তুমি মা ডাকো, উনার জন্য তো কোনোদিন প্রতিশোধের নেশায় উন্মত্ত হতে পারিনি। উনি জমিদার গিন্নি হতে পারেন, কিন্তু একজন পবিত্র হৃদয়ের মানুষ। সে তোমারে নিজের পেটের ছেলের চেয়েও বেশি আগলে রাখছেন। আমি বারবার তোমারে নিতে আসছি কিন্তু যখন দেখছি তুমি নিশ্চিন্তে মায়ের আঁচলের তলায় তখন আমি ফিরে গেছি। একজন মমতাময়ী মায়ের কোল থেকে কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা আমার ছিল না।” প্রণয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরও বলল, “দশ বছর আগে যখন চাচা সব বলে গেলেন, আমি এই গ্রামে মাস্টার হয়ে এলাম। অনেকবার চেয়েছিলাম এদের সব জ্বালিয়ে দিতে, কিন্তু যখন দেখতাম তুমি তোমার মায়ের জন্য পাগল, তখন আমি থমকে যেতাম। মায়ের চোখের পানির কথা ভেবেই আমি এদের পাপ মুখ বুজে সহ্য করেছি। ভেবেছিলাম, হয়তো একদিন তোমারে সত্যিটা বলবো আর তোমারে এই অন্ধকার থেকে বের করে নিয়ে যাব। কিন্তু তাওহীদ পশুত্বের সব সীমা পার করে দিল!”
মকবুল রহমান মাটিতে পড়ে থেকে হাহাকার করে বলার চেষ্টা করছেন, “তাহমিদ বিশ্বাস কর বাবা, আমি তোরে ভালোবাসছি! আমি তোরে আমার রাজপুত্র বানাইছি!”
সে ঘৃণাভরে মুখ ফিরিয়ে নিল, “যে রাজপুত্র তার মা-বাবার লাশের ওপর সিংহাসন গড়ে, সেই রাজত্বে আমি থুতু দেই।”
প্রণয় আর প্রতীক দুই ভাই আজ চব্বিশ বছরের ব্যবধানে পৈশাচিক প্রতিহিংসার মঞ্চে এক হয়েছে। দুজনেই তাওহীদের দিকে এগিয়ে গেল। তাওহীদ যন্ত্রণায় মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছিল। প্রতীক তার বুট জুতোটা তাওহীদের আহত হাতের ওপর থেকে সরিয়ে সজোরে ওর গলার ওপর চেপে ধরল। তাওহীদ খাবি খেতে শুরু করল, চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। প্রণয় ঠান্ডা গলায় বলল, “বল তাওহীদ, এখন তোর সাথে কী করা উচিত? যে জীবন তুই ধ্বংস করছিস, তার কি কোনো মাফ আছে? চব্বিশ বছর আগে আমাদের পরিবারটা যেমন তোদের পায়ের তলায় পিষ্ট হইছিল, আজ দেখ তোদের অহংকার কেমনে ধুলোয় মিশতেছে।”
ঠিক তখনই কুড়ালটা ঘাসের ওপর ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বাঘিনীর মতো সামনে এগিয়ে এল মৃন্ময়ী। চোখমুখ রাগে লাল হয়ে গেছে, শরীর কাঁপছে। ও প্রতীক আর প্রণয়কে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। ওরা কিছুটা অবাক হয়ে সরে দাঁড়াল। মৃন্ময়ী তাওহীদের শার্টের কলার ধরে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে টেনে হিঁচড়ে দাঁড় করাল। তাওহীদ টলছিল, কিন্তু মৃন্ময়ী ছাড়ল না। ও প্রথম থাপ্পড়টা কষাল তাওহীদের বাম গালে, “এটা জমিদারের ছেলে হওয়ার অহংকারের জন্য, যে ক্ষমতার দাপটে তুই মানুষরে কুত্তা ভাবতি!” তাওহীদ সামলে ওঠার আগেই মৃন্ময়ী দ্বিতীয় থাপ্পড়টা দিল, “এইটা অরুনিমা আপার জন্য! যারে তুই ভালোবাসার নাটক কইরা বিক্রি করতে চাইছিলি, যারে তুই মরতে বাধ্য করছিলি!”
তৃতীয় থাপ্পড়টা আরও জোরালো। মৃন্ময়ীর হাত লাল হয়ে গেছে ব্যথায়, কিন্তু ও থামল না। উন্মাদের মত বলল, “এইটা তার জন্য যে মানুষটা তোর পাপের প্রতিবাদ করছিল বইলা তুই তারে জ্যান্ত পুড়াইয়া মারলি! তোরে কি বাঘে মারবে জানোয়ার? তোরে তো পিপঁড়ায় খাবে!” মৃন্ময়ী তাওহীদের দুই গালে এলোপাতাড়ি চড় মারতে শুরু করল আর পাগলের মতো চিৎকার করতে লাগল, “এইটা শিশিরের শেষ নিঃশ্বাসের জন্য! এইটা আমার বোনের খুনি হওয়ার জন্য! এইটা গ্রামের প্রতিটা মানুষের ভয়ের জন্য!”
তাওহীদ মৃন্ময়ীর পায়ের কাছে আছড়ে পড়ল। মৃন্ময়ী হাপাতে হাপাতে তাওহীদের মুখের ওপর থুতু ছিটিয়ে দিয়ে বলল, “তোর মরণ হলে তো মাটিও তোরে জায়গা দিবে না রে পিশাচ।”
মকবুল রহমান নিজের চোখের সামনে নিজের ছেলের এই বেইজ্জতি আর পতন দেখে চিৎকার করে উঠলেন। প্রণয় তার বুকে লাথি মেরে ফেলে দিল।
মৃন্ময়ীর হাতের চড় থাপ্পড় খেয়ে তাওহীদ যখন প্রায় অর্ধমৃত অবস্থায় মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে, তখন অরুনিমা এগিয়ে এল। ওর চলাফেরায় কেবল নিরেট পাথুরে শীতলতা। মৃন্ময়ী সরে দাঁড়াল, জায়গা করে দিল অরুনিমাকে; যার জীবনের প্রতিটা বাঁকে তাওহীদ বিষ ঢেলে দিয়েছিল। অরুনিমা তাওহীদের সামনে স্থির হয়ে দাঁড়াল। তারপর পরম মমতায় ওর আলুলায়িত চুলগুলো হাত দিয়ে একপাশে সরিয়ে দিয়ে তাওহীদের সেই ঘৃণ্য কপালে নিজের হাতের ধারালো দা-টা স্পর্শ করাল। দা-এর ঠান্ডা লোহার ছোঁয়া লাগতেই তাওহীদ যন্ত্রণার মাঝেও একবার শিউরে উঠল। অরুনিমা কোনো কথা বলল না, একে একে তাওহীদের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় গভীর ক্ষত তৈরি করতে লাগল। না, প্রাণ কেড়ে নেওয়ার জন্য নয় বরং তিলে তিলে যন্ত্রণার স্বাদ বোঝানোর জন্য। অরুনিমার মাথায় তখন ঘুরছিল সেই রাতের কথা, যখন নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে তাওহীদ সমাজ আর কলঙ্কের ভয় দেখিয়ে ওকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল। মনে পড়ছিল কোলের নিষ্পাপ শিশুর কথা, যাকে জন্ম দিয়েও লোকচক্ষুর অন্তরালে বন্দি জীবন কাটাচ্ছিল। অরুনিমা তাওহীদের চুলের মুঠি ধরে মুখটা মাটির সাথে ঘষতে শুরু করল। ঠিক সেইভাবে যেভাবে তাওহীদ একদিন ওর সম্মান ধুলোয় মিশিয়েছিল। একপর্যায়ে তাওহীদকে টেনে তুলে ভাঙা মন্দিরের পিলারের সাথে হেলান দিয়ে বসাল। তাওহীদ যখন যন্ত্রণায় আর্তনাদ করার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছে, অরুনিমা তখন তার বুকের বাম পাশে দা-এর অগ্রভাগটা চেপে ধরল। মনে করিয়ে দিতে চাইল, একটা মানুষের হৃদয় ভাঙলে কেমন লাগে। অরুনিমার নীরব রুদ্রমূর্তি দেখে সেখানে উপস্থিত প্রণয়, প্রতীক কিংবা ইয়াসিফ; কারো সাহস হলো না তাকে থামানোর। একজন নারীর মাতৃত্ব আর সতীত্বের অবমাননার বিচার আজ কোনো আদালত নয়, আজ প্রকৃতির বিচারে অরুনিমা নিজেই করছে।
ইয়াসিফ এতক্ষন দাঁড়িয়ে বীভৎস বিচারের সাক্ষী হচ্ছিল। এবার এগিয়ে এল। তার চোখেমুখে ক্রোধ নেই। সে তাওহীদের ঝাপসা হয়ে আসা চোখের সামনে ঝুঁকে বসল। বলতে শুরু করল, কীভাবে তাওহীদকে খুনের জাল বুনেছিল। ময়ূরীর হত্যা, জহির মোল্লার খুন, তাকে আঘাত; সবকিছুর প্রতিশোধ নিতে ইয়াসিফও কোপ মারার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু তার দুর্ভাগ্য, এই শয়তান গুলোকে নিজে শাস্তি দিতে পারল না।
সব শুনে প্রণয় এগিয়ে এল। তার হাতে ধরা ছিল একটা প্রাচীন ধারালো অস্ত্র। মকবুল রহমান ভয়ে চিৎকার করে উঠলেন। প্রণয় তার সামনে দাঁড়িয়ে পৈশাচিক হাসি হাসল। অস্ত্রটা উঁচিয়ে বলল, “না, আপনাকে আমি মারব না। মরলে তো আপনি মুক্তি পেয়ে যাবেন। আমি চাই আপনি বেঁচে থাকুন, কিন্তু সেই বেঁচে থাকা হবে মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর। আপনি সারাজীবন পঙ্গু হয়ে ওই ভিটার দিকে তাকিয়ে কাঁদবেন যেখান থেকে আপনি তালুকদার বংশকে উচ্ছেদ করেছিলেন।”
প্রণয় চরম নিষ্ঠুরতায় মকবুল রহমানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। পঙ্গুত্ব নিশ্চিত করার জন্য সে তার শরীরের স্নায়ু আর হাড়ের ওপর নিপুণভাবে আঘাত করল। আমবাগান চিরে মকবুল রহমানের হৃদয়বিদারক আর্তনাদ আকাশে ছড়িয়ে পড়ল। উপস্থিত সবাই দাঁতে দাঁত চেপে বীভৎসতা দেখল। কেউ এক পা এগিয়ে এল না তাকে বাঁচাতে। তাদের মনে তখন চব্বিশ বছর আগে পুড়ে মরা সেই পরিবার, ময়ূরী, জহির মোল্লা আর শিশিরের আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে ভোরের প্রথম আলো ফুটতে শুরু করেছে। অন্ধকারের পর্দা সরে গিয়ে পুব আকাশে লালাভ আভা দেখা দিচ্ছে। আর সেই নির্জনতা চিরে বহু দূর থেকে ভেসে এল পুলিশের সাইরেনের শব্দ। অনিন্দিতা রায় ফোর্স নিয়ে দ্রুত এগিয়ে আসছেন।
.
.
.
চলবে….
#প্রণয়_প্রত্যাবর্তন🖤 [পর্ব-১৮]
~আফিয়া আফরিন
অনিন্দিতা রায়ের নির্দেশে কনস্টেবলেরা মকবুল রহমান আর তাওহীদকে স্ট্রেচারে তুলল। দুজনের অবস্থাই আশঙ্কাজনক; মকবুল রহমানের জ্ঞান নেই বললেই চলে আর তাওহীদ যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছে। তাদের দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হলো। জমিদার বাড়ির প্রতাপ আজ আক্ষরিক অর্থেই ধুলোয় মিশে বিদায় নিল।
প্রণয় ধীরপায়ে অনিন্দিতা রায়ের সামনে এসে নিজের হাত দুটো বাড়িয়ে দিল। তার চোখেমুখে প্রশান্তি খেলছে, যেন চব্বিশ বছরের দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর যাত্রার অবসান ঘটেছে। অনিন্দিতা রায় হ্যান্ডকাফটা পরানোর আগে কিছুক্ষণ প্রণয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার দৃষ্টিতে কঠোরতা থাকলেও কোথাও যেন বিষণ্ণতাও মিশে ছিল। নিচু স্বরে বললেন, “এতদূর কেন গেলেন? আইনকে তো একটা সুযোগ দিতে পারতেন।”
প্রণয় ম্লান হাসল, “আইন তো অন্ধ ছিল ম্যাডাম। যে আগুনে আমার শৈশব পুড়ছে, সেই আগুনের তাপ আপনার আইন কোনোদিন সহ্য করতে পারত না।”
অনিন্দিতা রায় দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “একবারও কি স্ত্রী আর অবুঝ সন্তানের কথা ভাবলেন না? ওদের ভবিষ্যৎ আপনি অন্ধকার করে দিলেন।”
অরুনিমা পাশে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছিল। প্রণয় উত্তর দেওয়ার আগেই হঠাৎ বাগানের সরু পথ দিয়ে একজন লোক ছোট একটা শিশুকে কোলে নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ঢুকে পড়ল। লোকটা ওদের পরিচিত, তাদের কাছেই শান্তকে রেখে এসেছিল। কোল থেকে নামিয়ে দিতেই শান্ত ছোট ছোট পা ফেলে দৌড়ে এল। চারপাশের পুলিশ, রক্ত আর বিশৃঙ্খলা বোঝার মতো বয়স ওর হয়নি। ও শুধু চেনে ওর বাবাকে।
“বাবা! ও বাবা!” বলে এক দৌড়ে প্রণয়কে জড়িয়ে ধরল। প্রণয় হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়ল। দুহাতে তখন হ্যান্ডকাফ পরানো হয়ে গেছে। লোহার শেকলের শব্দ ছাপিয়ে শান্তর খিলখিল হাসি আর বাবার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ার দৃশ্যটা উপস্থিত প্রতিটা মানুষের বুকে তীরের মতো বিঁধল। প্রণয় হ্যান্ডকাফ পরা হাত দুটো দিয়েই শান্তকে বুকের মাঝে জাপটে ধরল। লোহার শেকলের ঝনঝনানি শব্দটা শান্তর কানে পৌঁছাল না, ও কেবল বাবার চেনা ঘ্রাণটুকু শুষে নিতে চাইল বড় বড় চোখ করে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “বাবা, তুমি কাল কেন আসোনি? তুমি এখন কোথায় যাও বাবা?”
প্রণয়ের গলাটা ধরে এল। সে শান্তর কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বলল, “বাবা অনেক দূরে একটা কাজে যাচ্ছি সোনা। যদি আমি আর কখনো ফিরে না আসি, তবে মায়ের কাছে একদম লক্ষ্মী ছেলের মতো থেকো। মাকে কখনো একা রেখো না।”
“কেন আসবে না? আমি একা থাকব কেন? মা তো অনেক বকে, তুমি না থাকলে মা আমাকে মারবে!”
প্রণয় হেসে অরুনিমার দিকে তাকাল। তারপর শান্তকে বলল, “আমি মাকে বলে দিচ্ছি, মা আর কোনোদিন তোমায় বকবে না। বড় হয়ে যখন দুনিয়া দেখতে শিখবে, তখন বুঝবে তোমার বাবা কেন হারিয়ে গিয়েছিল। মানুষের মরণ হলেও কাজ বেঁচে থাকে বাবা। তুমি বড় হয়ে মানুষের মত মানুষ হইয়ো, কারও উপর অন্যায় হতে দিও না।”
শান্ত কথাগুলোর গূঢ় অর্থ বুঝল না, শুধু বাবার চোখের পানি মুছে দিয়ে আবার বুকে মুখ লুকাল। প্রণয় অরুনিমার দিকে মুখ তুলে তাকাল। অরুনিমা যন্ত্রণায় ভেঙে পড়েছে। ও কাঁদতে কাঁদতে পাশে বসে বলল, “আমার কী হবে? আমাকে কে দেখবে? তুমি ছাড়া এই দুনিয়ায় আমার আর কে আছে? তুমি চইলা গেলে আমি তো এইবার সত্যি ভেসে যাব।”
প্রণয় মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করল তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে দৃঢ় গলায় বলল, “না অরু, ভেসে যাওয়া এত সহজ নয়। তোমার জন্য তোমার বাবা আছেন। ফিরে যাও বাবার কাছে। শান্তকে নিয়ে ওই বাড়িতেই থাকো, ওইটাই এখন তোমাদের নিরাপদ আশ্রয়।”
অরুনিমা চিৎকার করে উঠল, “আমি এই অভিশপ্ত গ্রামে থাকব না। তুমি ছাড়া আমার কেউ নাই, কোনো ঘর নাই!”
প্রণয় শান্ত গলায় বলল, “ঘর মানুষে না, মনে থাকে। আজ থেকে তোমার বাবার বাড়িই তোমার ঘর। শান্তর ভবিষ্যতের কথা ভাবো। আমার জন্য অপেক্ষা কোরো না, আমার জীবনটা অনেক আগেই এই বনের অন্ধকারে হারায়া গেছে। তুমি শুধু শান্তরে একটা সুন্দর সকাল দিও।”
অনিন্দিতা রায় আর সময় দিলেন না। ঘড়ির কাঁটা আর আইনের বাধ্যবাধকতা কোনো আবেগকেই চেনে না। তিনি গম্ভীর কণ্ঠে কনস্টেবলদের ইশারা করলেন, “নিয়ে যাও।”
একটা নির্দেশে পৃথিবীটা দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেল। প্রণয়কে উঠে দাঁড়াতে হলো। কিন্তু শান্ত? ও তো অবুঝ। ছোট ছোট আঙুল দিয়ে বাবার শার্টের খুঁটটা এমনভাবে আঁকড়ে ধরে রেখেছে, যেন ওটাই জীবনের শেষ অবলম্বন। প্রণয় যতবার পা বাড়াতে যায়, শান্তর ছোট্ট হাতের টান তাকে স্থবির করে দেয়। লোহার হ্যান্ডকাফটা শান্তর হাতে ঘষা খাচ্ছে, কিন্তু সেদিকে ওর খেয়াল নেই।
প্রণয় নিচু হয়ে শান্তর হাত দুটো নিজের হাত থেকে আলাদা করতে চাইল। কিন্তু এই বাঁধন ছাড়া কি এত সহজ? ওর শিশুমন নেতিবাচক কিছু বুঝে গেছে। কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল, “না, বাবা তুমি যাবে না। তুমি গেলেই মা কাঁদবে, তুমি চলো আমাদের সাথে।”
প্রণয় দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে সামলালো। এই বাঁধন ছিঁড়তে না পারলে সে কোনোদিন ন্যায়ের পথে নিজের সাজা গ্রহণ করতে পারবে না। অরুনিমার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকাল। অরুনিমা টলতে টলতে এগিয়ে এল। জোর করে শান্তকে টেনে নিল। শান্ত চিৎকার করে হাত-পা ছুড়তে লাগল। নখ দিয়ে প্রণয়ের শার্টে আঁচড় কাটল। প্রণয় যখন পুলিশের গাড়ির পা-দানিতে পা রাখল, শেষবারের মতো পেছন ফিরে তাকাল। দেখল, শান্তর মুঠোয় রয়ে গেছে তার শার্টের ছিঁড়ে যাওয়া ছোট্ট অংশ। হয়ত ওই অংশটুকুই এখন ওদের সম্পর্কের শেষ যোগসূত্র!
গাড়ির দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা অরুনিমার বুকে এসে বিঁধল। জিপটা যখন ধুলো উড়িয়ে চলতে শুরু করল, শান্ত তখনো অরুনিমার কোল থেকে ছিটকে বেরিয়ে ধুলোমাখা রাস্তার ওপর দৌড়াতে লাগল, “বাবা, ও বাবা, যেও না!”
অনিন্দিতা রায় আয়নায় সেই দৃশ্য দেখেও মুখ ঘুরিয়ে নিল। এই অন্ধকার রাতের পর যে সকাল এল, তা আলোর চেয়েও বেশি রক্ত আর অশ্রু দিয়ে ভেজা।
.
ভোরের আলো যত পরিষ্কার হচ্ছে, গত রাতের বীভৎস সত্যগুলো গ্রামের মানুষের মুখে মুখে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। মকবুল রহমান আর তাওহীদের পৈশাচিক রূপ কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। এইবার তাদের মনে ভয়ের বদলে ঘৃণা আর ক্ষোভের জোয়ার উপচে পড়ল। সবাই বিচার চাচ্ছিল, “এই জানোয়ারগুলার মরণ হইলেই গ্রাম পবিত্র হইব! জ্যান্ত পুড়াইয়া মারছিল মাস্টারেরে, এখন নিজেরা তিল তিল কইরা নরক ভোগ করুক।”
সাধারণ যে গ্রামবাসী গতকাল পর্যন্ত জমিদারের সামনে ভয়ে তটস্থ থাকত, আজ তারাই তাদের থুতু ছিটিয়ে ঘৃণা প্রকাশ করল।
অরুনিমা যখন শান্তর হাত ধরে চেয়ারম্যানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল, তখন চেয়ারম্যান এক নিমেষেই দশ বছর বুড়িয়ে গেলেন। নিজের আদরের মেয়েকে মৃত জেনে এতদিন তিনি যে শোক বয়ে বেড়িয়েছেন, আজ তাকে জ্যান্ত সামনে দেখে কথা বলার শক্তিও হারিয়ে ফেললেন। কিন্তু মেয়ের চোখের পাথুরে চাহনি আর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট শান্তকে দেখে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। অরুনিমা শুধু বলল, “বাবা, আমি ফিরে আসছি। কিন্তু আমার ঘর নেই, প্রণয় নেই, কেউ নেই।”
চেয়ারম্যান এগিয়ে গেলেন। কাঁপাকাঁপা হাতে শান্তকে জড়িয়ে ধরলেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “মা রে, প্রণয়রে আমি আবার ফিরাই আনব। তোরে কথা দিতেছি। তুই আর আমাগোরে ছাইড়া যাইস না মা। আয়, ঘরে আয়।” অরুনিমা কি করবে? শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। নদীর হাড়হিম করা স্রোত আর মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে আসার মুহূর্তটা গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। সেদিন রাতে তাওহীদের অপমানে আর কলঙ্কের বোঝা সইতে না পেরে ও যখন নদীর উত্তাল ঢেউয়ে ঝাঁপ দিয়েছিল, তখন কেবল মনে হয়েছিল সব যন্ত্রণার অবসান হতে যাচ্ছে। পানির অতল গহ্বর ওকে টেনে নিচ্ছিল, ফুসফুস ফেটে যাচ্ছিল বাতাসের অভাবে। চেতনার শেষ বিন্দুতে ও শুধু দেখেছিল অন্ধকারের মাঝেও কিছু একটা তার দিকে ধেয়ে আসছে। অরুনিমা নদীর মাঝস্রোতে তলিয়ে যাচ্ছিল, প্রণয় নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মরণফাঁদে। আবছা মনে পড়ে, একজোড়া শক্ত হাত তাকে টেনে ধরল। যখন দেহটা নিস্তেজ হয়ে আসছিল, তখন কেউ একজন ওকে তীরের ঘাসে শুইয়ে দিয়ে পেটে চাপ দিচ্ছিল। জ্ঞান ফেরার পর দেখেছিল ভিজে সপসপে প্রণয়কে। অতঃপর প্রণয় ওকে সুস্থ করে তুলেছিল, অনাগত সন্তানের দায়িত্ব নিয়েছিল। সেদিন নদী অরুনিমাকে কেড়ে নিতে চেয়েছিল, কিন্তু প্রণয় ওকে ফিরিয়ে দিয়েছিল নতুন সত্তা হিসেবে। এখন কোথায় সেই প্রণয়? অরুনিমা বিড়বিড় করে বলল, “তুমি সেদিন কেন বাঁচাইছিলা? একা থাকার যন্ত্রণার চেয়ে তো ওই নদীই ভালো ছিল।”
বিচার হয়েছে ঠিকই তবে মৃন্ময়ী আর ইয়াসিফ আজ বড় বেশি রিক্ত। সত্য জয়ী হয়েছে, কিন্তু এই সত্যের দাম দিতে গিয়ে ওরা হারিয়েছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষগুলোকে। মৃন্ময়ী টলতে টলতে কবরস্থানের দিকে এগিয়ে যায়। পাশাপাশি দুটো করব; একটা বাবার, অন্যটা আদরের বোনের। ঘাসগুলো শিশিরে ভেজা। মৃন্ময়ী কবরের পাশে বসে মাটির ওপর হাত রাখল। ফিসফিস করে বলল, “আব্বা, বুনু… তোমরা কি দেখতে পারতেছ? আজ ওই জানোয়ারদের বিচার হইছে। কিন্তু এই বিচার দিয়া আমি কী করুম? এই বাড়ি, এই জগত আমার কাছে এখন শ্মশান। তোমরা আমারে আর মারে একলা রাইখা গেলা ক্যান?”
মৃন্ময়ী শিশিরের কবরের দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতে চায়, কিন্তু পারল না। বুক ফেটে আসে কান্নায়। শিশিরের দগ্ধ দেহের স্মৃতি তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল। মনে মনে বলল, “আপনি আমারে বাঁচাইয়া দিয়া গেছেন ঠিকই, কিন্তু আমার জীবন তো আপনার সাথেই ওই আগুনে পুড়ে ছাই হইয়া গেছে। মানুষের আত্মা সাথে না থাকলে সেই বাইচ্চা থাকায় কি লাভ?”
রওশান আরা মৃন্ময়ীকে আগলে রাখেন। তিনি কাঁদেন না। কাঁদলে এই মেয়েটা যে একেবারেই ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে।
সবাই যখন কিছু না কিছু পেল কিংবা হারাল, তাহমিদ ওরফে প্রতীক তখন দাঁড়িয়ে রইল অথৈ সাগরের মোহনায়। তার প্রাপ্তি আর হারানোর হিসেবটা বড্ড গোলমেলে। সে ফিরে পেয়েছে তার প্রকৃত পরিচয়, পেয়েছে ভাইকে; কিন্তু বিনিময়ে হারিয়েছে অস্তিত্বের কতকগুলো বছর। তদন্ত আর আইনি প্রক্রিয়ার মাঝে তাহমিদকে এখন অভিশপ্ত জমিদার বাড়িতেই থাকতে হচ্ছে।
সালেহা বেগম সবটা শুনে আর্তনাদ করে উঠেছিলেন। ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে জ্ঞান হারান। সেই থেকে তার অবস্থা শোচনীয়। জ্ঞান ফিরছে আর ‘তাহমিদ’ বলে ডুকরে উঠছেন। ওই নারীর মাতৃত্বের কাছে প্রতীক পরাজিত। ঘৃণা থাকলেও সে মমতাময়ী মাকে ফেলে যেতে পারছে না।
তাহমিদ বারান্দার খুঁটি ধরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে প্রশ্ন জাগে, সে কি আসলেই নির্দোষ? পাপীর ছায়ায় থেকে সে কি অজান্তেই পাপের ভাগীদার হয়নি? তাওহীদের অনেক অন্যায় জেনেও আড়াল করেছে, জমিদারের ক্ষমতার দাপট ভোগ করেছে। আজ আইনি খাতায় সে হয়তো রাজসাক্ষী, কিন্তু নিজের বিবেকের আদালতে সেও তো অপরাধী। তার উল্লাস নেই, বিজয় নেই। সে কেবল জীবন্ত ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা পাহারাদার, যে নিজের ঘর খুঁজতে গিয়ে এক বিশাল শ্মশানের হদিস পেয়েছে।
.
অনিন্দিতা রায়ের বিশেষ অনুমতিতে মকবুল রহমানকে গ্রেফতারের আগে সালেহা বেগম দেখা করার সুযোগ পেলেন। দীর্ঘ অনেকগুলো বছরের দাম্পত্য, আভিজাত্য আর মিথ্যে মোহের বিষাদময় সমাপ্তি দেখতে তিনি আজ এখানে। লোকটা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে আছে, কিন্তু সালেহার চোখে কোনো পানি নেই, নেই কোনো মায়া। তিনি স্থির দৃষ্টিতে স্বামীর পানে চেয়ে রইলেন, এই চাউনিতে সব ঘৃণা আর জমাটবদ্ধ অপমান উগরে দিচ্ছেন। মকবুল রহমান অস্ফুট স্বরে কিছু বলতে চাইলেন, কিন্তু সালেহা সেই সুযোগ দিল না। তিনি আঁচলের তলা থেকে বের করে আনলেন হারানো পিস্তলটি যেটা তাহমিদ নয়, খোদ সালেহা বেগমই নিজের কাছে লুকিয়ে রেখেছিলেন। এই আগ্নেয়াস্ত্রই হবে এই অভিশপ্ত বংশের শেষ বিচারের হাতিয়ার। কাঁপা কাঁপা হাতে ট্রিগার চাপলেন। ঠাস! একটামাত্র গুলিতে ত্রিশ বছরের ঘাতক, এক মিথ্যাবাদী আর লোভী পিশাচের ইহলীলার অবসান ঘটল। মকবুল রহমানের নিথর দেহটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। গুলির শব্দে পুলিশ ছুটে এল। অনিন্দিতা রায় স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন এই শান্ত রণচণ্ডী নারীর দিকে। সালেহা বেগম পিস্তলটা ফেলে দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার চোখেমুখে পরম তৃপ্তির আভা খেলছে।
তাকেও গ্রেফতার করা হলো। তাহমিদ চাইল এই খুনের দায় নিতে, মায়ের ঋণ শোধ করতে। সালেহা বেগম ম্লান হেসে তাহমিদের মাথায় হাত রেখে ধীর গলায় বললেন, “আমারে ক্ষমা কর বাবা। আমি তোমার লাইগা এতদিন কিছু করতে পারিনি। তোমার শৈশব চুরি হইছে আমার চোখের সামনে, অথচ আমি অন্ধ সাজছিলাম। আজ এই পিশাচটারে শেষ কইরা আমি নিজের কলঙ্ক মুছলাম। তুমি খুশি হইছো তো বাবা? আমারে মাফ কইরা দিও। তোর এই মা তোরে নিজের পেটের ছেলের চেয়েও বেশি ভালোবাসছে।”
তাহমিদ অশ্রুসজল চোখে চেয়ে রইল মহীয়সী নারীর দিকে, যে নিজের হাতে সব ধ্বংস করে তাকে কলঙ্কমুক্ত পৃথিবী উপহার দিয়ে গেলেন। আইনের চোখে এটা অপরাধ, কিন্তু নৈতিকতার বিচারে এক জননীর প্রায়শ্চিত্ত।
.
অবশেষে বিচারের দিন এলো। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছে দুই মেরুর দুই মানুষ। একদিকে বিধ্বস্ত তাওহীদ রহমান; অন্যদিকে শান্ত, অবিচল মুখে দাঁড়িয়ে আছে প্রণয় এহসান। বিজ্ঞ বিচারক তার চশমাটা ঠিক করে মামলার চূড়ান্ত রায় পড়া শুরু করলেন,
“এই মামলার নথিপত্র এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করে আদালত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, আসামী তাওহীদ রহমান ক্ষমতার দম্ভে একেরপর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। সে কেবল শিশির আহমেদকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারেনি, বরং ক্ষমতার অপব্যবহার করে নারীদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছে এবং একটি গোটা জনপদকে ভয়ে তটস্থ রেখেছে। তার কৃতকর্ম সভ্য সমাজের জন্য ভয়াবহ এবং কলঙ্কিত দৃষ্টান্ত। আসামী তাওহীদ রহমান: ময়ূরীকে ধর্ষন এবং খুন, শিশির আহমেদের হত্যাকাণ্ড এবং অরুনিমার ওপর চালানো পাশবিক নির্যাতনের দায়ে বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩০২ এবং ৩৭৬ ধারা মোতাবেক আসামীকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হলো। আগামী কার্যদিবসে আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করার আদেশ দেওয়া হলো।
অন্যদিকে, আসামী প্রণয় এহসান ন্যায়বিচার না পেয়ে প্রতিহিংসার পথে হেঁটেছেন। চব্বিশ বছর আগে তার পরিবারের ওপর হওয়া অন্যায়টি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক এবং অমানবিক। কিন্তু আইন কাউকে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য নিজের হাতে বিচার তুলে নেওয়ার অনুমতি দেয় না। আসামী প্রণয় অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় খুনের ষড়যন্ত্র সাজিয়েছেন এবং একাধিক খুনের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত থেকেছেন। যদিও তার প্রেক্ষাপট ভিন্ন, কিন্তু একাধিক খুনের ষড়যন্ত্রের মাস্টারমাইন্ড হওয়া এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অপরাধে তাকেও ছাড় দেওয়ার অবকাশ নেই। দণ্ডবিধির ৩০২ এবং ১২০-বি ধারা মোতাবেক আসামী প্রণয় এহসানকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হলো।” রায় ঘোষণা শেষে বিচারক তার কলমের নিব ভেঙে ফেললেন।
রায়ের শব্দটা আদালত কক্ষে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। অরুনিমা পেছনের বেঞ্চে বসে শান্তকে জাপটে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। প্রণয় ঘাড় ঘুরিয়ে অরুনিমার দিকে তাকাল। তার শূন্য দৃষ্টি অরুনিমার কানে কানে শুধু একটা কথা বলে গেল, “শান্তকে আকাশ দেখতে শিখিও অরু, মাটির দিকে তাকিয়ে যেন ও কোনোদিন রক্ত না দেখে।”
.
.
.
চলবে….
