#প্রণয়_প্রত্যাবর্তন🖤 [পর্ব-১৩]
~আফিয়া আফরিন
বাইরে থেকে সেই গম্ভীর এবং হিমশীতল কণ্ঠস্বর আবার ধ্বনিত হলো যেন অন্ধকার নিজেই কথা বলছে, “থাম তাওহীদ! পাপের ঘড়া পূর্ণ হতে আর এক কদম বাকি। ওই মেয়েটাকে ছোঁয়ার আগে নিজের পরিণতির কথা একবার ভাব।”
তাওহীদ ভয়ে আর্তনাদ করে উঠল, “কে? সামনে আয়! সাহস থাকলে সামনে এসে কথা বল!”
অন্ধকার থেকে ক্রুর হাসি ভেসে এল। সেই কণ্ঠস্বর আবার বলল, “আজ আমি আসব না। আজ শুধু তোর ভয়টা দেখতে আসছি। তুই যারে মাটি চাপা দিয়া ভাবছিলি সব শেষ, সে আজ তোর চারপাশটা ঘিরে ধরছে। খুব শীঘ্রই তোর জন্য একটা বিশেষ উপহারের ব্যবস্থা করা হইছে। ততক্ষণ এই পাপের বোঝা বয়ে বেড়া।”
কথাটা শেষ হতেই বাইরের ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে কারো দ্রুত চলে যাওয়ার শব্দ পাওয়া গেল। তাওহীদ কাঁপা হাতে টর্চ জ্বেলে দরজার দিকে দৌড়ে গেল, কিন্তু সেখানে কেউ নেই। শুধু গেটের পাশে পড়ে আছে তার আরেকটা লোকের নিথর দেহ। তাওহীদের বুকের ভেতরটা তখন ধড়ফড় করছে। সে বুঝতে পারল, অদৃশ্য আততায়ী তাকে এখনই মারবে না; সে তাকে তিলে তিলে যন্ত্রণায় দগ্ধ করে মারতে চায়। মৃন্ময়ী মেঝেতে পড়ে হাঁপাচ্ছে, আর শিশির অস্ফুট স্বরে সৃষ্টিকর্তাকে ডাকছে। তাওহীদ ফিরে এসে আবার মৃন্ময়ীর দিকে হাত বাড়াতে গেল, কিন্তু তার হাত কাঁপছে। ওই কণ্ঠস্বরের ভয় হাড়ের ভেতর পর্যন্ত ঢুকে গেছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে তার বেঁচে থাকা লোকজনকে চিৎকার করে বলল, “সবগুলারে পাহারা দে! আমি একটু আসতাছি। কেউ যেন নড়াচড়া না করে!”
তাওহীদ ঘর থেকে বেরিয়ে টলতে টলতে বাইরের খোলা বাতাসে এল। তার মাথায় ঘুরছে সেই চিরকুট আর অরুনিমার স্মৃতি।
অনিন্দিতা রায় চেয়ারম্যান বাড়ি এসে পৌঁছালেন। তখন প্রায় ভোর। উঠোনে পা দিতেই দেখলেন চেয়ারম্যান আর তার স্ত্রী বিধ্বস্ত অবস্থায় বারান্দায় বসে আছেন। বর্তমান পরিস্থিতির চাপ তাদের ভেতরটা খোকলা করে দিয়েছে। অনিন্দিতা সরাসরি তাদের সামনে এসে দাড়াল। কোনো ভূমিকা না করেই তীক্ষ্ণ স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, “চেয়ারম্যান সাহেব, আপনার মেয়ে অরুনিমার ব্যাপারে আমার কিছু জরুরি তথ্য লাগবে। কেন সে নদীতে গিয়ে আত্মহত্যা করেছিল? পুলিশ ফাইলে অনেক কিছুই অস্পষ্ট।”
চেয়ারম্যান মুখ তুলে তাকালেন। তার চোখ দুটো রক্তবর্ণ হয়ে গেল। তিনি অস্ফুট স্বরে বললেন, “ম্যাডাম, ওই অভিশপ্ত দিনের কথা আর মনে করাবেন না। আমাগো আদরের মাইয়াটা কেন এমন করল, তা আমরা শত চেষ্টা করেও জানতে পারিনি।”
অনিন্দিতা সোজা চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, “অরুনিমার সাথে জমিদার বাড়ির তাওহীদের কোনো সম্পর্ক ছিল? আপনারা কি জানতেন যে অরুনিমা তাওহীদকে ভালোবাসত?”
এই প্রশ্নটা শুনতেই অরুনিমার মা ডুকরে কেঁদে উঠলেন। তিনি আঁচলে মুখ ঢেকে কাঁদতে কাঁদতে অস্পষ্ট স্বরে বললেন, “না ম্যাডাম, আমরা কিছুই জানি না। অরুনিমা কাউরে কিছু বলে নাই। আমাগো সামনে কোনোদিন কোনো ছেলের কথা মুখে আনেনি। কিন্তু ওই ঘটনার কিছুদিন আগে থাইকা ও একদম মনমরা হইয়া থাকতো। কারো সাথেই কথাবার্তা বলত না। সারাদিন ঘরের কোণায় বইসা কী যেন ভাবত।”
অনিন্দিতা নিজের নোটবুকে টুকে নিল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “ও কি ওই সময় কোনো চিঠি লিখে গেছিল? বা কোনো চিরকুট?”
চেয়ারম্যান সাহেব মাথা নাড়লেন, “না। আমরা ঘরবাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজছি, কিচ্ছু পাই নাই। শুধু দেখতাম ও মাঝে মাঝে কাঁদত। আমরা জিজ্ঞেস করলে বলত মাথাব্যথা করতেছে। আমরা ভাবছিলাম হয়তো পড়ার চাপ-টাপ। জানলে কি আর মাইয়াডারে চোখের আড়াল করি?”
অনিন্দিতা লক্ষ্য করল, চেয়ারম্যান তাওহীদের নাম শুনেই অস্বস্তিতে পড়ছেন। তিনি চাপ দিয়ে বললেন, “তাওহীদ কি আপনাদের বাড়িতে আসত? বা অরুনিমার সাথে বাইরে দেখা করত?”
চেয়ারম্যানের স্ত্রী এবার ডুকরে উঠলেন, “তাওহীদ তো জমিদার বাড়ির পোলা, গ্রামের সবার লগে ওর খাতির। কিন্তু অরুনিমার লগে ওর কোনো কথা হইছে বইলা আমাদের মনে পড়ে না। তবে অরুনিমা মরার দিন সকালে ওকে খুব অস্থির দেখছিলাম। আমাগো বাড়িতে বারবার আসছিল।”
অনিন্দিতা রায় বুঝতে অসুবিধা হলো না, অরুনিমা বড় কোনো গোপন সত্য নিয়ে মারা গেছে বা গায়েব হয়েছে। সে চেয়ারম্যানকে উদ্দেশ্য করে বলল, “আপনার মেয়েকে আপনারা যতটা সহজ ভাবছেন, ঘটনা হয়তো তারচেয়েও অনেক বেশি জটিল। আমি অরুনিমার ঘরটা একবার তল্লাশি করতে চাই। আপনাদের লুকানো কোনো তথ্য যদি পরে আমার হাতে আসে, তবে সেটা ভালো হবে না।”
অনিন্দিতা রায় সময় নষ্ট করল না। চেয়ারম্যানের স্ত্রীর দেখানো পথ ধরে তিনি অরুনিমার ঘরে ঢুকলেন। ঘরটা ধুলোর আস্তরণে ঢাকা থাকলেও আসবাবপত্রগুলো এখনো আগের মতোই সাজানো। তিনি ঘরের প্রতিটি কোণা, পুরনো বইয়ের তাক আর আলমারি খুঁটিয়ে দেখলেন। কিন্তু প্রকাশ্যে তেমন কিছু নজরে এল না। তবে তার তীক্ষ্ণ নজর এড়াল না জানালার পাশে পড়ে থাকা একটা ছোট্ট কাঠের বাক্স। সেটা সংগ্রহ করে তিনি চেয়ারম্যান দম্পতিকে বিদায় জানিয়ে থানার দিকে রওনা দিলেন। তার মনে হচ্ছে, অরুনিমার মনমরা থাকা আর তাওহীদের বারবার চেয়ারম্যান বাড়িতে আসার পেছনে কোন না কোন যোগসূত্র রয়েছে।
এদিকে ইটভাটায় চরম অস্থিরতা। তাওহীদ বাইরে থেকে কিছুক্ষণ পায়চারি করে নিজের ভয়টা কাটানোর চেষ্টা করল। নিজেকে বারবার বোঝাচ্ছে, নিশ্চয়ই কেউ তাকে ভয় দেখানোর জন্য নাটক করছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে আবার সেই অন্ধকার ঘরটার দিকে পা বাড়াল যেখানে তার শিকারগুলো রয়েছে। তাওহীদ ঘরে ঢুকেই কর্কশ গলায় চিৎকার করে উঠল, “ওই! তোরা এখনো মুখ খুলবি না?”
কিন্তু ঘরের ভেতর পা দিতেই তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। টর্চের আলো ফেলতেই সে দেখল শিশির রক্তাক্ত অবস্থায় এক কোণায় পড়ে আছে কিন্তু তাহমিদ যে খুঁটির সাথে বাধা ছিল, সেই খুঁটিটা খালি! বাঁধন ছেঁড়া দড়িগুলো মেঝেতে পড়ে আছে। তাওহীদ পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল, “ভাই কই? এই! আমার ভাই গেল কোথায়?”
তাওহীদ উন্মত্তের মতো ঘরটা তন্নতন্ন করে খুঁজল। ইট স্তূপের আড়ালে, অন্ধকার কোণায় কোথাও তাহমিদের চিহ্ন নেই। হঠাৎ তাওহীদের মাথায় বজ্রপাতের মতো একটা চিন্তা খেলে গেল। একটু আগে একটা কণ্ঠস্বর তাকে শাসিয়ে গেল, পাথরটা ওপর থেকে পড়ল আর এখন তাহমিদের উধাও হয়ে যাওয়া! তাওহীদের দুচোখ বিস্ময় আর রাগে বড় বড় হয়ে গেল। সে নিজের কপালে হাত দিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “তাহমিদ! তারমানে একটু আগে ওই কণ্ঠস্বর আমার আপন ভাইজানের ছিল? ওই আমারে ভয় দেখাইয়া গেল? এই গুটিবাজি তাহমিদ করতেছে?”
তাহমিদ কোনোভাবে নিজের বাঁধন খুলে ফেলেছে এবং অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে তাকে মানসিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা করছে। অথবা, তাহমিদই সেই ‘অদৃশ্য আততায়ী’ সেজে তাকে ঘোল খাওয়াচ্ছে। নিজের আপন ভাইয়ের এই বিশ্বাসঘাতকতা তাওহীদকে আরও হিংস্র করে তুলল। সে পৈশাচিক চিৎকার করে বলল, “তাহমিদ! তুই আমার ভাই হইয়া আমার পিঠে ছুরি মারলি? বের হ! সাহস থাকলে সামনে আয়। তোরে আমি জ্যান্ত মাটির নিচে পুইড়া দিমু!”
মৃন্ময়ী আর শিশির অবাক হয়ে লক্ষ্য করল, তাওহীদ নিজের সাথেই লড়ছে। ভয়ের চেয়েও প্রতিহিংসা তাওহীদকে অন্ধ করে দিচ্ছে। আচমকা সে ঘরের ভেতর উন্মাদের মতো হাসতে লাগল। ধীর পায়ে আবার মৃন্ময়ীর দিকে এগিয়ে গেল। মৃন্ময়ী ভয়ে দেয়ালের সাথে সেঁটে যাওয়ার চেষ্টা করছিল, কিন্তু তাওহীদ ওর চুলের মুঠি ধরে হ্যাঁচকা টানে মাঝখানে নিয়ে এল। তাওহীদ মৃন্ময়ীর মুখের ওপর নিশ্বাস ফেলে বিকৃত স্বরে বলল, “তাহলে গুজবটা মিছা না? আমার বড় ভাইজান তাহমিদ যে তোরে মনে মনে ভালোবাসত, সেইটা তো আজ হাতেনাতে প্রমাণ হইয়া গেল! শয়তানটা নিজের ভাইরে ধোঁকা দিয়া তোরে বাঁচাইতে আসছিল?”
মৃন্ময়ী ব্যথায় কুকড়ে গিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল, “ওনারে এই জঘন্য কাজের মধ্যে টানিস না। সে তো মানুষের মতো মানুষ, তোর মতো জানোয়ার না।”
তাওহীদ পৈশাচিক হাসল। মৃন্ময়ীর চিবুকটা জোরে চেপে ধরে বলল, “ঠিক আছে চল! ভাই যখন তোরে এতই ভালোবাসে, তখন তোরে তো হাতছাড়া করা যায় না। তোরে নিজের বউ বানায়া ঘরে তুলুম। তারপর সারাজীবন তাহমিদ আর মাস্টার দেখুক যে মৃন্ময়ী কার চরণে পইড়া থাকে। এরচেয়ে বড় প্রতিশোধ আর কী হইতে পারে?”
শিশির রক্তমাখা মুখে চিৎকার করে উঠল, “তাওহীদ!”
তাওহীদ এক লাথিতে শিশিরকে সরিয়ে দিয়ে বলল, “চুপ কর মাস্টার! আজ রাতেই কাজটা শেষ করুম। কাজী ডাকার দরকার নাই, আমি নিজেই কাজী।”
মৃন্ময়ী আর্তনাদ করে বলল, “আমি মইরা যাব, তাও তোর মতো জানোয়ারকে বিয়া করব না।”
তাওহীদ ভ্রুক্ষেপ করল না। এক হাতে মৃন্ময়ীর হাত ধরে রেখে তার লোকদের দিকে তাকিয়ে কর্কশ গলায় চিৎকার করে উঠল, “আশপাশে দেখ, কোনো লাল কাপড় পাওয়া যায় কিনা। ছিঁড়া হোক বা যেমনেই হোক একটা লাল কাপড় জোগাড় কর।”
লোকটা ভয়ে ভয়ে দৌড়ে গেল এবং পাশের পরিত্যক্ত ঘর থেকে এক টুকরো রক্তবর্ণের পুরনো চাদর ছিঁড়ে নিয়ে এল। কাপড়টা ধুলোবালি মাখা। তাওহীদ সেটা মৃন্ময়ীর সামনে দোলাতে দোলাতে বলল, “জমিদার বংশের পোলা যখন কিছু চায়, তখন তা ছিনায়া নিতে জানে।”
তাওহীদ যখন দাঁতে দাঁত চেপে মৃন্ময়ীর মাথায় সেই ধুলোবালি মাখা লাল কাপড়টা জোর করে জড়িয়ে দিচ্ছিল, ঠিক তখনই তার পকেটে থাকা ফোনটা কর্কশ শব্দে বেজে উঠল। এই চরম মুহূর্তে বাঁধা পেয়ে তাওহীদ বিকট একটা গালি দিয়ে ফোনটা বের করল। স্ক্রিনে আব্বা লেখা দেখে তার বিরক্তি চরমে পৌঁছাল। ফোনটা কানে নিতেই ওপাশ থেকে জমিদার মকবুল রহমানের আতঙ্কিত ও উত্তেজিত গলা শোনা গেল, “তাওহীদ! তুই এই মুহূর্তে যেখানেই থাকোস, জলদি বাড়িতে আয়।”
তাওহীদ চেঁচিয়ে উঠল, “আব্বা! আমি একটা জরুরি কাজে আছি। এই সময় ডাইকেন না তো!”
মকবুল রহমান গর্জিয়ে উঠলেন, “তোর জরুরি কাজ চুলোয় যাক!”
ফোনটা কেটে গেল। তাওহীদ রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে হাতের ফোনটা ইটের দেয়ালে আছড়ে মারল। ফোনটা চুরমার হয়ে গেল। সে মৃন্ময়ীর দিকে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে গজগজ করতে করতে বলল, “তোর কপাল ভালো মৃন্ময়ী। যমদূতের হাত থিকা আজ বেঁচে গেলি। কিন্তু মনে রাখিস তাওহীদ যা ধরে, তা ছাড়ে না।”
সে তার সাঙ্গোপাঙ্গদের দিকে ফিরে কর্কশ গলায় নির্দেশ দিল, “এই দুইটারে আবার শক্ত কইরা বাঁধ। আর শুন, খবরদার! এই ঘর থিকা যেন একটা আওয়াজও বাইরে না যায়। আমি বাড়ি থিকা ঘুরে আসি, তারপর হিসাব শেষ করুম। আর ওই তাহমিদরে যদি দেখস, তবে ওরেও বান্ধবি। ওরে আমি নিজের হাতে শিক্ষা দিমু।”
তাওহীদ বেরিয়ে যাওয়ার সময় মৃন্ময়ীকে একটা হিংস্র ধাক্কা দিল। মৃন্ময়ী দেয়ালে আঘাত পেয়ে আর্তনাদ করে উঠল। ওরা বেরোতেই ইটভাটার প্রকোষ্ঠে মরণপণ নিস্তব্ধতা নেমে এল। কেবল দূরে তাওহীদের জিপ স্টার্ট দেওয়ার শব্দটুকু মিলিয়ে গেল। মৃন্ময়ী মেঝের ওপর পড়ে হাঁপাচ্ছিল। ও উঠে বসার চেষ্টা করল। পুরো শরীর ব্যথায় অবশ হয়ে আসছে, কিন্তু চোখের সামনে শিশিরের রক্তাক্ত দেহটা দেখে নিজের যন্ত্রণা ভুলে গেল। শিশির দেয়াল ঘেঁষে আধশোয়া হয়ে পড়ে আছে। তার সাদা পাঞ্জাবিটা রক্তের নকশায় চেনা যাচ্ছে না। চোখ দুটো আধবোজা, মুখ দিয়ে অনবরত নোনা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। মৃন্ময়ী শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে ঘষটে ঘষটে শিশিরের একদম কাছে এগিয়ে এল। নিজের হাত দুটো পেছনে শক্ত করে বাঁধা, কিন্তু তাতে কী? ও শিশিরের কষ্ট সহ্য করতে পারছে না। অস্ফুট স্বরে ডাকল, “শোনেন, আমার দিকে তাকান।”
শিশির চোখ মেলল। মৃন্ময়ীর চোখের জল আর ডুকরে ওঠা কান্না দেখে ঠোঁটের কোণে একচিলতে করুণ হাসি ফুটে উঠল। তিনি ভাঙা গলায় বললেন, “মৃন্ময়ী তুমি ঠিক আছ?”
মৃন্ময়ী ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। নিজের বাঁধন খোলার সাধ্য নেই, তাই নিজের শরীরটা একটু বাঁকিয়ে শিশিরের মুখের কাছে নিয়ে এল। হাত পেছনে থাকায় ও নিজের কনুই দিয়ে অত্যন্ত সন্তর্পণে শিশিরের গাল আর ঠোঁট বেয়ে পড়া গাঢ় রক্তটুকু মোছানোর চেষ্টা করতে লাগল। পরনের কাপড় আর কনুইয়ের ঘষায় শিশিরের ক্ষততে লাগছে, তবুও মৃন্ময়ীর এই আকুতি দেখে শিশির স্থির হয়ে রইল। মৃন্ময়ী ধরা গলায় বলল, “আমার জন্য আপনার আজ এই দশা। আপনি কেন আসলেন ওই শয়তানটার সামনে? ও একটা জানোয়ার।”
শিশির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অস্পষ্ট স্বরে বললেন, “মরতে তো একদিন হবেই মৃন্ময়ী। কিন্তু তোমার সম্মানের ওপর আঁচড় লাগতে দিব না।”
মৃন্ময়ী বিড়বিড় করে বলতে লাগল, “তাহমিদ ভাই কোথায় গেল? সে কি সত্যিই এসব করছে?” শিশির কিছু বলতে চাইল, কিন্তু যন্ত্রণায় কপাল কুঁচকে এল। এই অন্ধকার ঘরে, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও মৃন্ময়ীর এই সামান্য হাতের স্পর্শ আর মমতা শিশিরের কাছে তখন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ওষুধ বলে মনে হচ্ছিল। মৃন্ময়ী ধরা গলায় পুনরায় বলল, “আমরা কি কোনোদিন এই নরক থিকা বের হইতে পারব না? এখানকার আওয়াজও কারো কানে যাইব না। আমাদের কি কেউ বাঁচাইতে আইব না? আমার ভয় লাগতাছে। ওরা আবার আইলে আমরা আর বাঁচতে পারমু না।”
শিশির যন্ত্রণায় চোখ বুজে ছিল। তাওহীদের রডের আঘাতে সারা শরীর ফেটে রক্ত বেরোচ্ছে, বিশেষ করে হাত দুটো রক্তাক্ত হয়ে একদম অবশ হয়ে আছে। রক্তাক্ত হাত তাই ওরা বাঁধার প্রয়োজনবোধ করেনি।
মৃন্ময়ীর কান্নার শব্দে শিশির কাঁপতে থাকা ডান হাতটা তুলল। হাত বাড়িয়ে মৃন্ময়ীকে আলতো করে নিজের কাছে টেনে নিল। অস্ফুট স্বরে বললেন, “সাহস হারাইয়ো না। যে অন্ধকার ঘনায়, সে আবার চলেও যায়। আল্লাহ সহায় থাকলে কেউ আমাদের কিচ্ছু করতে পারবে না।”
বলতে বলতেই শিশির তাঁর অবশ হয়ে আসা আঙুলগুলো দিয়ে মৃন্ময়ীর পেছনে থাকা হাতের বাঁধনটা অনুভব করার চেষ্টা করল। বাঁধনটা খুব শক্ত ছিল। তার হাতের কাটা ক্ষতগুলো থেকে আবার রক্ত চুইয়ে পড়তে তবুও দাঁতে দাঁত চেপে সে সেই দড়ির প্যাঁচগুলো খুলে দিল। মৃন্ময়ী বিদ্যুৎবেগে হাত সামনে নিয়ে এসে শিশিরের রক্তাক্ত হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিল। ডুকরে উঠে বলল, “আপনার হাত ফেটে রক্ত বের হইতেছে! আপনি আমার লাইগা এত কষ্ট কেন করতেছেন?”
শিশির ম্লান হাসল। ঘামে ভেজা কপালে চুলের কয়েকটা গোছা লেপ্টে আছে। খুব নিচু স্বরে বলল, “নিজের কষ্টের চেয়ে তোমার মুক্তিটা বেশি দরকার ছিল।” মৃন্ময়ীর চোখজোড়া অশ্রুতে টইটুম্বর হয়ে গেল।
.
জমিদার বাড়িতে থমথমে পরিবেশ। মকবুল রহমান অস্থিরভাবে পায়চারি করছেষ। তাওহীদ ঘরে ঢোকা মাত্রই তিনি মেসেজটা দেখালেন। স্ক্রিনে একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে আসা খুদেবার্তা জ্বলজ্বল করছে, “তাওহীদকে আমি কিছুই করব না, কিন্তু একটা শর্ত আছে। শর্তটা স্বয়ং জমিদার মশাইকে পালন করতে হবে। একজনকে খুন করতে হবে, আগামীকাল। কখন, কোথায় সেটা আমি সময়মতো জানিয়ে দেব।”
তাওহীদ মেসেজটা পড়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। উদ্ধত গলায় বলল, “আব্বা, এইসব ফালতু মেসেজে আপনি ডরান? কে এই পাগল যে জমিদারে হুকুম দিতাছে? আমি এসবরে ডরাই না। ওই শয়তানরে সামনে পাইলে আমি নিজেই শেষ করুম।”
মকবুল রহমান দাঁতে দাঁত চেপে তর্জনী উঁচিয়ে বললেন, “তুই চুপ কর! পরিস্থিতি তুই বুঝতাছোস না। পুলিশ কমিশনার ফোন দিছে, অনিন্দিতা রায় আমাগো ফাইল খুইলা বসছে। এই খুনি যা করতেছে তাতে আমরা মরুম। আমি প্রস্তাবে রাজি। যারে মারতে কয় কাল তারেই মারুম, কিন্তু পুলিশের এই গেরো আর লাশের মিছিল থেকে মুক্তি চাই। তাড়াতাড়ি এই আপদ নিরসন করা লাগব।”
তাওহীদ মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ চুপ থাকল। তারপর আমতা আমতা করে নিচু স্বরে বলল, “আব্বা, একটা কথা কই। আমি ঠিক করছি মৃন্ময়ীরে আমি বিয়া করমু।”
ছেলের কথা শুনে মকবুল রহমান থমকে দাঁড়ালেন। তাওহীদ এবার সাহস সঞ্চয় করে তাহমিদের ঘটনাও বলতে শুরু করল। কথাটা শেষ করার সাথে সাথে ঘরের নিস্তব্ধতা চিরে একটা প্রচণ্ড শব্দের প্রতিধ্বনি হলো। মকবুল রহমান সজোরে তাওহীদের গালে এক চটকানা বসিয়ে দিলেন। থাপ্পড়ের চোটে তাওহীদ টাল সামলাতে না পেরে সোফার ওপর গিয়ে পড়ল। তিনি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, “হারামজাদা! বাড়িতে আগুন লাগছে আর তুই আসছোস বিয়া করতে? একদিকে পুলিশ ফাঁস বুনতাছে, আরেকদিকে আমার ব্যবসা ডুবছে। সব তোর এই বদমায়েশির লাইগা! জমিদার বংশ কি শেষমেশ ওই জহির মোল্লার মাইয়ার আঁচলে মুখ লুকাইবো? ছিঃ! ওরা দুইটা তোর কাছে না? যা গিয়া আগুন লাগায়ে দে। মাইরালা দুইটারে, ব্যস কিচ্ছা খতম। না থাকল মাথা, আর না থাকল মাথাব্যাথা।
.
.
.
চলবে….
#প্রণয়_প্রত্যাবর্তন🖤 [পর্ব-১৪]
~আফিয়া আফরিন
যখন ভোরের আলো সবে ফুটতে শুরু করেছে তখন ফের অনিন্দিতা রায় জমিদার বাড়ির সদর দরজায় এসে দাঁড়ালেন। তাওহীদ বাবার সাথে তর্কের পর রাগে গজগজ করতে করতে বাড়ি থেকে বের হতে চেয়েছিল, কিন্তু অনিন্দিতাকে দেখে পথ আটকে গেল। পেছনে মকবুল রহমান সাহেবও ফ্যাকাশে মুখে দাঁড়িয়ে রইলেন। অনিন্দিতা সোজা তাওহীদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “অরুনিমার সাথে আপনার ঠিক কী ধরনের সম্পর্ক ছিল তাওহীদ? আপনি নাকি প্রায়ই চেয়ারম্যান বাড়ি যেতেন?”
তাওহীদ সামলে নিয়ে অবজ্ঞার সুরে বলল, “আমরা কলেজে একসাথে পড়তাম, সেই সূত্রে সামান্য জানাশোনা ছিল। একই গ্রামের মেয়ে, বিপদে-আপদে খোঁজখবর নিতাম এর বাইরে কিছু না।”
অনিন্দিতা পকেট থেকে স্বচ্ছ প্লাস্টিকের প্যাকেটে থাকা একটা সোনার আংটি বের করে তাওহীদের সামনে ধরলেন। শীতল গলায় বললেন, “এই আংটিটা অরুনিমার ঘরের একটা গোপন বাক্স থেকে পাওয়া গেছে। এটা কি আপনি চেনেন?”
তাওহীদ মুহূর্তের জন্য চমকে উঠলেও নিজেকে সামলে নিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। বলল, “এইসব সস্তা আংটি বাজারে হাজারটা পাওয়া যায়। অরুনিমার মতো মেয়ের ঘরে কার আংটি থাকবে না থাকবে, তা আমি কেমনে জানব? ওই মেয়ের চরিত্র ভালো ছিল না। কার সাথে কখন কোথায় ঘুরত তার কোনো ঠিক ছিল না। মরার আগে হয়তো কোনো প্রেমিকের স্মৃতি রাইখা গেছে।”
এমন কুরুচিপূর্ণ কথায় অনিন্দিতার চোয়াল শক্ত হয়ে এল, “মৃত মানুষকে নিয়ে এসব বলতে আপনার বাঁধে না? যাইহোক, এবার আসল কথায় আসি। নিখোঁজ শিশির আর মৃন্ময়ী কোথায়? আপনি কি জানেন তারা গত সন্ধ্যা থেকে গায়েব?”
তাওহীদ একটা নাটকীয় কাশি দিয়ে সোফার ওপর বসে পড়ল। সে কপালে হাত দিয়ে দুর্বল গলায় বলল, “ম্যাডাম, কাল রাত থিকা আমার ১০৪ ডিগ্রি জ্বর। আমি শরীর নিয়া বিছানা থিকা উঠতে পারতাছি না, আর আপনি আসছেন জহির মোল্লার মাইয়ার কথা জিজ্ঞেস করতে? আমি কি এলাকায় পাহারাদারি করি নাকি যে কে কোথায় গেল তার হিসাব রাখুম?”
মকবুল রহমান পাশ থেকে সায় দিয়ে বললেন, “জি ম্যাডাম, ছেলেটা আমার সারা রাত জ্বরে পুড়তাছে। ও এসবের কিছুই জানে না।”
অনিন্দিতার মনে হলো, তাওহীদ ডাহা মিথ্যে বলছে। চোখেমুখে মোটেও জ্বরের ঘোর নেই। তবুও তিনি মুচকি হেসে বললেন, “জ্বর যখন উঠেছে, তখন সাবধানে থাকবেন তাওহীদ সাহেব। কারণ জ্বর বাড়লে মানুষ অনেক সময় প্রলাপ বকে সত্য কথা বলে দেয়। আমি আজই আবার আসছি।”
.
গ্রামের সেই বীভৎসতা থেকে অনেক দূরে, অন্য গ্রামের আরেক প্রান্তের ছোট ঘর। জানালার ফাঁক দিয়ে ভোরের ধূসর আলো সবে ঘরের মেঝেতে এসে পড়েছে। গত তিনটে দিন প্রণয় আর অরুনিমার ওপর দিয়ে ঝড় গেছে। শান্ত গত তিন দিন ধরে তীব্র জ্বরে পুড়ছে। গ্রামে যাওয়ার সব পরিকল্পনা বাতিল করে দিয়ে দুজনেই ছেলের শিয়রে বসে বিনিদ্র রাত কাটিয়েছে। আজ শেষ রাতে শান্তর শরীরের তাপমাত্রা কিছুটা কমেছে, জ্বরটা একটু ইস্তফা দিয়েছে। টানা জাগরণে অরুনিমা এতটাই ক্লান্ত ছিল যে, শান্তর পাশে মাথা রেখেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে। শান্তও ঘুমোচ্ছে, তবে জ্বরের ঘোরে থেকে থেকে ডুকরে কেঁদে উঠছে। প্রণয় তাই ঘুমানোর সাহস পায়নি; সে একদৃষ্টিতে ছেলের নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। ঠিক এমন সময় নিস্তব্ধতা ভেঙে দরজায় মৃদু কিন্তু দৃঢ় আওয়াজ হলো, “ঠক, ঠক, ঠক।”
প্রণয় চমকে উঠল। এই সাতসকালে কে আসতে পারে? সে অত্যন্ত সন্তর্পণে শান্তর পাশ থেকে উঠে গিয়ে দরজা খুলল। দরজার ওপাশে একজন দাঁড়িয়েছিল, যার সাথে কয়েক মুহূর্ত খুব নিচু স্বরে কথা হলো।
প্রণয় ঘরে ফিরে এল। অরুনিমার কাঁধে হাত দিয়ে আলতো করে ডেকে তুলল। অরুনিমা ধড়ফড় করে উঠে বসেই আগে শান্তর কপালে হাত দিল। তারপর প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল, “জ্বর কি আবার বাড়ছে?”
প্রণয় বলল, “না, জ্বর আগের চেয়ে কম। শোনো অরু, আমার একটা বিশেষ কাজ আছে। আমি একটু আসছি। তুমি শান্তর কাছে থাকো। ও উঠলে যেন ভয় না পায়। আর শোনো একদম রাগারাগী করবে না।”
অরুনিমা অবাক হয়ে প্রণয়ের হাত ধরল, চোখেমুখে দুশ্চিন্তা। ও ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে? এই ভোরে কই যাচ্ছ? কে এসেছে দরজায়?”
প্রণয় জ্যাকেটটা গায়ে চাপাতে চাপাতে শুধু বলল, “এসে সব বলছি। তুমি শুধু ছেলেটাকে সামলাও।” অরুনিমা কিছু বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই প্রণয় দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
তাওহীদ যখন ইটভাটায় ফিরে এল, তখন তার দুচোখে খুনের নেশা আর অপমানের জ্বালা। বাপের হাতের ওই চড়টা ভেতরের শেষ মনুষ্যত্বটুকুও পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে। সে চেয়েছিল মৃন্ময়ীকে জ্যান্ত কবরে রেখে সারাজীবন নিজের পায়ের তলায় দাসী বানিয়ে রাখবে, ওর তেজ ভাঙবে। কিন্তু এখন আর সেই সময় নেই। পুলিশ কমিশনার আর অনিন্দিতা রায় যেভাবে পেছনে লেগেছে, তাতে এই দুজনকে বাঁচিয়ে রাখা মানে নিজের ফাঁসির দড়ি নিজে বোনা। সে হনহন করে সেই অন্ধকার ঘরটার দিকে এগিয়ে গেল। ভেতরে ঢুকে দেখল শিশির আর মৃন্ময়ী দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে নিথর হয়ে পড়ে আছে। দীর্ঘ ধকল আর রক্তক্ষরণে তারা তখন প্রায় বেহুঁশ। তাওহীদ তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্ত থমকাল। মনে একটা আফসোস খচখচ করে উঠল। বিড়বিড় করে বলল, “শখ ছিল তোরে খুবলানোর। তোরে এইভাবে ছাই বানায়া দিমু ভাবি নাই। আমার বাপে আমার গায়ে হাত তুলছে তোর লাইগা। তোরা থাকলে আমার বিপদ।”
সে আর এক সেকেন্ড দেরি করল না। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকদের ইশারা করতেই তারা কেরোসিনের ড্রাম নিয়ে হাজির হলো। তাওহীদ নিজে হাতে কেরোসিন ঢালতে শুরু করল। শিশির আর মৃন্ময়ীর অবশ শরীরের ওপর, দড়ির ওপর। তেলের উগ্র গন্ধে পুরো ঘরটা ভারী হয়ে উঠল তবুও ওদের জ্ঞান ফিরল না। তাওহীদ পকেট থেকে দিয়াশলাই বের করল। একটা কাঠি জ্বালিয়ে সেটার শিখার দিকে তাকিয়ে পৈশাচিক হাসল। ভাবল, “মৃন্ময়ীর মতো অনেক মেয়ে আসবে। কিন্তু তাওহীদের সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখা আগে দরকার।”
জ্বলন্ত কাঠিটা সে তেলের স্রোতের ওপর ছুড়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে “হুঁ হুঁ” করে আগুন জ্বলে উঠল। শুকনো কাঠ আর কেরোসিনের ছোঁয়ায় আগুনের লেলিহান শিখা ঘরের ছাদে গিয়ে ঠেকল। ধোঁয়ায় চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসছে। তাওহীদ তৃপ্তির চোখে সেই অগ্নিকুণ্ডের দিকে তাকিয়ে উল্টো ঘুরে হাঁটা দিল। পেছন থেকে শিশিরের অস্ফুট গোঙানি ভেসে আসলেও তাওহীদ ফিরে তাকাল না। সে দ্রুত পায়ে জিপে গিয়ে বসল। জিপে উঠে আয়েশ করে সিগারেট ধরাল। আয়নায় নিজের লাল হয়ে থাকা গালটা একবার দেখে নিয়ে সে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। মৃন্ময়ীর জন্য তার মনে যে সামান্য খচখচানি ছিল, সেটা মুহূর্তেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে ধোঁয়া ছেড়ে বললল, “আরে, ভাত ছিটালে যেমন কাকের অভাব হয় না, টাকা ছিটালে সেরকম নারীর অভাব হয় না। এই অজপাড়াগাঁয়ের একটা মাইয়া মরলে দুনিয়া কি থেমে যাবে নাকি? শহরে গেলেই তো আশেপাশে কত্ত! কত মৃন্ময়ী লাইনে দাঁড়াবে।”
তাওহীদের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সে তো আর আজকের খেলোয়াড় নয়। নারী বশীকরণে সে বরাবরই ওস্তাদ। কত মেয়ে যে তার মিষ্টি কথার জালে আর ক্ষমতার দাপটে ধরা দিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। হঠাৎ মনে পড়ে গেল অরুনিমার কথা। বিড়বিড় করে বলল, “অরুনিমা, ওহ অরুনিমা। মাই লাভ, মাই সুইটহার্ট! বশীকরণে তাওহীদরে হারায় কার সাধ্য! ওই তেজস্বিনী অরুনিমাকেও তো একবার কব্জা কইরা বিয়া করছিলাম। তবে তার কপাল খারাপ ছিল বইলা সে নাই।” নিজের সাফল্যের কথা ভেবে তাওহীদ বেশ চনমনে বোধ করল। তার কাছে ক্ষমতা আর টাকাই হলো আসল কথা। টাকা থাকলে আইন পকেটে থাকে, আর নারী থাকে পায়ের নিচে।
জিপের জানালার বাইরে দিয়ে দ্রুতবেগে চলে যাওয়া গাছপালার দিকে তাকিয়ে তাওহীদ পেছনে ফেলে আসা দিনগুলোর কথা ভাবতে লাগল। অরুনিমার কথা মনে পড়তেই মেজাজটা আবার একটু খিঁচড়ে গেল। মেয়েটা দেখতে মন্দ ছিল না, বেশ মায়াবী ছিল। কিন্তু সমস্যাটা শুরু হলো তখন, যখন মাঝখান থেকে অরুনিমা পেট বাঁধিয়ে হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দিল। তাওহীদ নিজেকে একটা বিশ্রী গালি দিল, “আরে বাপু, আমার কি তখন সময় বাচ্চার দায়িত্ব নেওয়ার? আমি কি সংসার করার লাইগা বিয়া করছি নাকি? ভাবছিলাম দু’দিন মজা করুম, তারপর ব্যস! তা না, মেয়ে তো একেবারে ঘরনী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করল।”
অরুনিমা যখন জেদ ধরল সে এই বাচ্চা নষ্ট করবে না, তখন তাওহীদ বাধ্য হয়েই কঠিন ভাষায় বলেছিল, “এইসব ঝামেলা পালার সময় আমার নাই। সোজা যাও, এবোরশন করো।”
কিন্তু অরুনিমা তো নাছোড়বান্দা। দিনরাত শুধু কান্নাকাটি আর অনুনয়-বিনয়। বিরক্ত হয়ে সেদিন তাওহীদ সোজাসুজি জানিয়ে দিয়েছিল, “শোনো, তোমারে আমি বউ হিসেবে কিছুতেই সমাজে স্বীকৃতি দিতে পারুম না। তারচেয়ে একটা বুদ্ধি দেই চলো তোমারে দূরে কোথাও বিক্রি কইরা দিয়া আসি। ওতে আমারও কিছু লাভ হইব, আর তোমারও একটা ব্যবস্থা হইব।”
কথাটা শুনে অরুনিমা ঘৃণায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। মুখ দিয়ে শুধু একটা শব্দই উচ্চারণ করতে পেরেছিল, “ছিঃ!”
তাওহীদ হেসে বলেছিল, “এতই যদি সতী-সাবিত্রী হও, তবে যাও গিয়া পেছনের নদীতে ঝাঁপ দিয়া মরো। আপদ বিদায় করো!” অরুনিমা সত্যি সত্যিই কালিন্দী নদীতে ডুবে মরে ঝামেলা চুকিয়েছিল। এইমুহূর্তে তাওহীদ তৃপ্তির ঢেকুর তুলল।
.
বদ্ধ কুঠুরিতে বাতাসের অক্সিজেন দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল। আগুনের প্রচণ্ড উত্তাপ আর কেরোসিনের ঝাজালো গন্ধে মৃন্ময়ী আর শিশিরের অচেতনপ্রায় মস্তিস্কে চাবুক পড়ল। প্রথমে চোখ মেলল শিশির। চারদিকে আগুনের লেলিহান শিখা দেখে রক্ত হিম হয়ে গেল। তাওহীদ নিশ্চয়ই তাদের জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার চূড়ান্ত ব্যবস্থা করে গেছে। আগুনের তাপে মৃন্ময়ীও ছটফট করে আর্তনাদ করে উঠল। আগুনের দেওয়াল তাদের চারপাশ থেকে ঘিরে ধরছে। দরজার সামনে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে, ওদিক দিয়ে বের হওয়ার কোনো পথ নেই। একমাত্র ভরসা ওপরের দিকে থাকা ছোট একটা ভাঙা জানালা, যা মাটি থেকে বেশ উঁচুতে। শিশির নিজের রক্তাক্ত, কাটাছেঁড়া হাতের যন্ত্রণাকে তুচ্ছ করে মৃন্ময়ীর হাত ধরে টেনে তুলল। তার আঙুলগুলো থেকে তখনো রক্ত চুইয়ে পড়ছে, আগুনের তাপে সেই ক্ষতগুলোও জ্বলেপুড়ে যাচ্ছে। উন্মাদের মতো চিৎকার করে বলল, “মৃন্ময়ী! ওঠো! আমাদের বের হতে হবে। তুমি আমার কাঁধে পা দাও!”
মৃন্ময়ী ধোঁয়ায় কাশতে কাশতে বলল, “আপনের হাত দিয়া রক্ত পড়তাছে! আপনি পারবেন না। আপনি আগে যান!”
“তর্ক করার সময় নাই মৃন্ময়ী! আমি যা বলছি সেটা শোনো।” শিশির তার রক্তাক্ত দুই হাত এক করে জানালার নিচে শক্ত করে ধরল। যন্ত্রণায় মুখ বিকৃত হয়ে যাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল হাড়গুলোও যেন চামড়া ফুঁড়ে বেরিয়ে আসবে। মৃন্ময়ী অশ্রুভেজা চোখে শিশিরের রক্তাক্ত হাতের ওপর ভর দিয়ে আর কাঁধে পা দিয়ে জানালার কাছে পৌঁছানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল। শিশিরের পিঠ আর কাঁধের ক্ষতগুলোয় যখন মৃন্ময়ীর পায়ের চাপ পড়ছিল তখন ব্যথায় শিশিরের চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসছিল, কিন্তু হাত নড়ল না। সে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে মৃন্ময়ীকে ওপরে ঠেলে দিল। মৃন্ময়ী জানালার কার্নিশটা ধরতে পারল। শিশির মরণপণ শক্তিতে তাকে ধাক্কা দিয়ে বলল, “বাইরের দিকে লাফ দাও! জলদি!”
মৃন্ময়ী কোনোমতে জানালার সরু গলে বাইরে গড়িয়ে পড়ল। বাইরে পড়েই ভেতরের দিকে হাত বাড়িয়ে চিৎকার করে উঠল, “আপনের হাত দেন, আমার হাত ধরেন।” কিন্তু ভেতরে আগুনের তান্ডব তখন বহুগুণ বেড়ে গেছে। ছাদের পুরনো কাঠ মড়মড় করে ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। আগুনের সেই নরককুণ্ডের মাঝখানে দাঁড়িয়ে শিশির ম্লান হাসল, তার হাত দুটো থরথর করে কাঁপছে। তার রক্তাক্ত আঙুলগুলো জানালার কার্নিশ ছোঁয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে ওপর থেকে এক বিকট শব্দ হলো। ইটভাটার পুরনো ছাদের বিশাল একটা কাঠের বিম আর জ্বলন্ত ইটের স্তূপ প্রচণ্ড শব্দে ভেঙে পড়ল জানালার সামনে।
ধুলো আর আগুনের ফুলকিতে চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেল। মৃন্ময়ী আতঙ্কে পিছিয়ে গেল। আগুনের সেই দেওয়াল আর ভেঙে পড়া ধ্বংসস্তূপের কারণে শিশিরের জানালার কাছে আসার শেষ পথটুকুও চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল। মৃন্ময়ী জানালার ওপাশে হাত বাড়িয়ে পাথর সরাতে চাইল, কিন্তু আগুনের তাপে কাছে ঘেঁষতে পারল না। ভেতরের সেই দাউদাউ আগুনের লাল আভার মাঝখানে শিশিরের অবয়বটা অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। দেওয়াল ধরে কোনোমতে দাঁড়িয়ে কেবল শান্ত গলায় বলল, “মৃন্ময়ী তুমি পালাও। অনেক দূর চইলা যাও। আমার সময় শেষ।”
মৃন্ময়ী আর্তনাদ করে উঠল কিন্তু ভেতর থেকে আর কোনো উত্তর এল না। শুধু ছাদ ভেঙে পড়ার আরও কয়েকটা শব্দ আর আগুনের পৈশাচিক গর্জন শোনা গেল। শিশিরের সেই রক্তাক্ত অবয়বটা ধীরে ধীরে আগুনের লেলিহান শিখার আড়ালে হারিয়ে গেল। যে মানুষটা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজের শরীরের রক্ত দিয়ে মৃন্ময়ীকে আগলে রেখেছিল, সে নিজেই সেই আগুনের যজ্ঞে উৎসর্গ হয়ে গেল।
মৃন্ময়ী পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে দেখল, চিরচেনা সেই মানুষটাকে…
ইয়াসিফ থানার যাবতীয় ফর্মালিটিজ শেষ করে ফিরছিল। হঠাৎ ডানদিকের নির্জন দিগন্তে আকাশের বুক চিরে আগুনের লেলিহান শিখা দেখে সে থমকে দাঁড়াল। ওই তো ইটভাটা! কিছু একটা ঘটেছে বুঝতে পেরে সে আর দেরি করল না, উন্মাদের মতো দৌড় দিল আগুনের উৎসের দিকে। কাছে পৌঁছাতেই বীভৎস দৃশ্য তার চোখে পড়ল। জ্বলন্ত ঘরটার সামনে একজন মেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আর্তনাদ করছে। চারপাশে আর কেউ নেই, কেবল আগুনের গগনবিদারী গর্জন। ইয়াসিফ দ্রুত কাছে গিয়ে দেখল মেয়েটি আর কেউ নয়, মৃন্ময়ী। সারা শরীর ধুলো আর রক্তে মাখা, চোখ দুটো অপার্থিব যন্ত্রণায় ঝাপসা হয়ে আসছে। ইয়াসিফ ওকে আগলে ধরে চিৎকার করে ডাকল, “মৃন্ময়ী! মৃন্ময়ী!”
মৃন্ময়ী তখন জ্ঞান হারাচ্ছে। কাঁপা কাঁপা হাত তুলে জ্বলন্ত ধ্বংসস্তূপের দিকে ইঙ্গিত করে অস্ফুট স্বরে কেবল একটাই কথা বলতে পারল, “শিশির আগুনের ভেতরে…” কথাটা শেষ হতেই মৃন্ময়ীর মাথাটা ইয়াসিফের কাঁধে নুয়ে পড়ল। ঠিক সেই মুহূর্তে অন্ধকারের দুই প্রান্ত থেকে আরও দুটি ছায়া সেখানে এসে হাজির হলো। সামনে তাকিয়ে দেখল, সব শেষ। ইটভাটার ছাদটা পুরোপুরি ধসে পড়েছে, আগুনের শিখা সবকিছু গ্রাস করে নিয়েছে। কোনো মানুষের পক্ষেই এখন ওই নরককুণ্ডে ঢোকা সম্ভব নয়। অথচ ওরা বাঁচাতেই এসেছে। তাহমিদ আর প্রণয় পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। হারের নিঃশব্দ হাহাকার নিয়ে তারা একে অপরের দিকে তাকাল। কোনো কথা হলো না, কেবল পরাজিত সৈনিকের মতো মাথা নিচু করে তাদের সেখান থেকে ফিরে যেতে হলো।
.
ইটভাটার ভয়াবহ আগুন যখন নিভে এল, তখন সেখানে পড়ে আছে পোড়া ইটের স্তূপ আর ছাই। দমকল বাহিনী আর গ্রামের মানুষ ধ্বংসস্তূপ সরাল। আগুনের লেলিহান শিখা যা পুড়িয়ে শেষ করতে পারেনি, তা হলো শিশিরের হাতে থাকা ঘড়ি আর গলার চেইন। সনাক্তকরণের জন্য এইটুকু আর মৃন্ময়ীর শেষের কথাটুকু যথেষ্ট ছিল।
ওদিকে মৃন্ময়ীর অবস্থা সংকটাপন্ন। ইয়াসিফ ওকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলেও জ্ঞান ফেরার কোনো লক্ষণ নেই। ও একেবারে নিথর, পাথরের মতো স্তব্ধ। রওশন আরা হাসপাতালের বারান্দায় আছাড় খেয়ে বিলাপ করছেন। তার গগনবিদারী চিৎকার হাসপাতালের দেওয়াল চিরে দিচ্ছিল।
শিশিরের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ল। যে মানুষটা বিনা পয়সায় বাচ্চাদের পড়াতো, যে হেসেই মানুষের দুঃখ ভুলিয়ে দিত, সে আজ নেই। বাতাসের প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসে শিশিরের নাম প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
শিশিরের মৃত্যুর খবরটা শোনার পর থেকে অরুনিমা আর স্বাভাবিক মানুষের মধ্যে নেই। প্রণয় ওকে সামলানোর চেষ্টা করতেই অরুনিমা এক ঝটকায় তাকে সরিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। চোখের করুণ চাহনি মুহূর্তেই এক ভয়ঙ্কর জিঘাংসায় রূপ নিল। উন্মাদের মতো বলল, “তাওহীদ ভাবছে ও জিতে গেছে? না, এইবার লুকায়া থাকার দিন শেষ। ওই জানোয়ারটা আমার পেটের সন্তানরে অস্বীকার করছে, আমার ইজ্জত নিছে খেলছে, আমি তাও সইছিলাম। কিন্তু আজ ও আমার কলিজার টুকরা ভাইটারে জ্যান্ত পুড়াইয়া মারছে!”
অরুনিমা ঘরের এককোণ থেকে একটা ধারালো দা হাতে তুলে নিতে চাইল, প্রণয় এসে ওকে থামাল। স্থির করতে চাইল। কিন্তু ওর দুচোখে আগুনের শিখা বেরোচ্ছে। হিসহিস করে বলল, “পুলিশ-আদালত দিয়া ওর বিচার হবে না, ওর বিচার আমি করব।”
শান্ত ভয়ে গুটিসুটি মেরে বসে আছে। অরুনিমাকে শান্ত করা যাচ্ছিল না। প্রতিশোধের নেশায় ও তখন সাক্ষাৎ রণচণ্ডী। এতদিন যে ছাই চাপা আগুন অরুনিমার ভেতরে ধিকধিক করে জ্বলছিল, শিশিরের মৃত্যু তাকে এক ধ্বংসাত্মক দাবানলে পরিণত করেছে।
.
চারদিক থমথমে নিস্তব্ধতা, ঠিক ঝড়ের আগের পূর্বাভাস। এমন সময় জমিদার বাড়ির অন্দরমহলে মকবুল রহমানের ফোনের স্ক্রিনটা আবার জ্বলে উঠল। সেই রহস্যময় অপরিচিত নাম্বার থেকে কাঙ্ক্ষিত মেসেজটা এসেছে। হাড়হিম করা নির্দেশ: “বাড়ি থেকে বের হন। আমি যা যা বলব, এখন থেকে ঠিক তা-ই করবেন। একটুও এদিক-ওদিক হবে না। একা একা গ্রামের পূর্ব দিকে যেখানে শ্মশানঘাট, সেই রাস্তার দিকে আসতে থাকেন।”
মকবুল রহমানের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমল। তিনি বুঝতে পারলেন, এই খুনি বা নির্দেশক তার প্রতিটি পদক্ষেপ নজর রাখবে। তিনি নিজের শয়নকক্ষে ঢুকলেন। বহুদিনের পুরনো কাঠের ড্রয়ারটার দিকে হাত বাড়ালেন। একা যখন যেতেই হচ্ছে, তখন নিজের লাইসেন্স করা পিস্তলটা সাথে রাখা জরুরি। পরিস্থিতি বেগতিক দেখলে অন্তত আত্মরক্ষা করা যাবে। ড্রয়ারটা খুললেন। কিন্তু ভেতরটা ওলটপালট। সব আছে, কালো রঙের ভারী পিস্তলটা নেই। মকবুল রহমান পাগলের মতো ড্রয়ারের ভেতর হাতড়ালেন। বিড়বিড় করে বললেন, “পিস্তলটা গেল কই? ওইখানেই তো ছিল!”
অতঃপর তাকে পিস্তল ছাড়াই রাতের অন্ধকারে বের হতে হলো।
.
.
.
চলবে….
