#প্রণয়_প্রত্যাবর্তন🖤 [পর্ব-১১]
~আফিয়া আফরিন
রাত ক্রমে ঘন হয়ে আসছে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর দূর থেকে ভেসে আসা শেয়ালের হুক্কাহুয়া ছাড়া পুরো গ্রাম নিথর স্তব্ধতায় ডুবে আছে। মৃন্ময়ী এখনো বাড়ি ফেরেনি। শোয়া থেকে উঠে বসার মতো শারীরিক শক্তি রওশন আরার ছিল না, কিন্ত আশঙ্কায় তিনি অনেক কষ্টে দেয়াল ধরে ধরে উঠে বসলেন। বুকের ভেতরটা কু ডাকছে। তিনি ক্ষীণ স্বরে ডাকলেন, “মৃন্ময়ী? ও মৃন্ময়ী… কই গেলি মা?”
কোথাও কোনো সাড়াশব্দ নেই। শেয়ালের একটানা ডাক আর অন্ধকার উঠোনটা যেন তাকে ভেঙচি কাটছে। রওশন আরা টলমলে পায়ে উঠে উঠোনের আলোটা জ্বালালেন। চারিদিকের অন্ধকার কাটলেও মনের অন্ধকার কাটল না। বাড়ির আশেপাশে, রান্নাঘরে, এমনকি ঝোপঝাড়ের ধারেও মেয়েটাকে খুঁজলেন। মৃন্ময়ী তো বলে গেল শিশিরের সাথে যাচ্ছে, একটু পরই ফিরে আসবে। তবে এত দেরি হচ্ছে কেন? গ্রামে তো এখন যমদূত ঘুরে বেড়াচ্ছে। নিজের ভয়কে জয় করে তিনি পাড়ার রহিমন বিবির ঘরের দরজায় গিয়ে কড়া নাড়লেন। রওশন আরার উষ্কখুষ্ক চুল আর আতঙ্কিত মুখ দেখে রহিমন বিবি অবাক হয়ে বললেন, “কি হইছে ও মিনুয়ের মা? এই রাইতে আইলা যে?”
রওশন আরা হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, “আমার মৃন্ময়ীরে দেখছেন? শিশিরের লগে বাইর হইছিল সন্ধ্যার আগে। অহনও ফিরে নাই।”
রহিমন বিবি কপালে হাত দিয়ে আঁতকে উঠলেন, “সর্বনাশ! তুমি জানো না গ্রামে কী চলতাছে? ১৪৪ ধারা জারি হইছে। পুলিশ ছাড়া রাস্তায় কেউ নাই। মানুষজন ওত পাইতা আছে। এই অবস্থায় মাইয়াডারে বাইরে পাঠাইলা কেন?”
রওশন আরার মাথাটা ঘুরে উঠল। তিনি পাশের একটি খুঁটি ধরে নিজেকে সামলালেন। পাড়ার আরও দু-এক বাড়িতে খোঁজ নিলেন, কেউ কোনো সুসংবাদ দিতে পারল না। বরং সবার চোখেমুখে এক বিষণ্ণ ভয়। কেউ মুখ ফুটে কিছু বলছে না। তিনি বুকভরা হাহাকার নিয়ে তিনি অন্ধকারের মধ্যেই চেয়ারম্যান বাড়ির দিকে ছুটলেন। চেয়ারম্যান বাড়ির সদর দরজায় গিয়ে রওশন আরা পাগলের মতো করাঘাত করতে লাগলেন। পাহারাদার দরজা খুলতেই তিনি ভেতরে ঢুকে পড়লেন। হট্টগোল শুনে চেয়ারম্যান সাহেব লুঙ্গি ঠিক করতে করতে বৈঠকখানায় বেরিয়ে এলেন। রওশন আরা আর্তনাদ করে উঠলেন, “চেয়ারম্যান সাহেব! মৃন্ময়ী আর আপনের শিশির বাজান কই? ওরা তো এখনো ফিরে নাই। সন্ধ্যার আগে দুইজনে একলগে বাইর হইছিল, অহনও তাগো কোনো হদিস নাই!”
চেয়ারম্যান আকাশ থেকে পড়লেন। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল, কিন্তু পরক্ষণেই সেটা প্রচণ্ড রাগে রূপান্তরিত হলো। তিনি গর্জিয়ে উঠলেন, “কী বললা তুমি? শিশির তোমার মাইয়ার সাথে বের হইছে? আর এখনো ফিরে নাই? এই রাইত-বিরাইতে এইগুলা কী অলুক্ষণে কথা শোনাইতেছ!”
শিশির যে ঘরে নেই, এই খবরই তিনি জানতেন না। তড়িঘড়ি করে শিশিরের ঘরে গিয়ে দেখলেন বিছানা শূন্য। মুহূর্তের মধ্যে চেয়ারম্যান বাড়ির পরিবেশ বদলে গেল। মোস্তাক আহমেদ চিল চিৎকার শুরু করলেন, “ওরে কে কোথায় আছিস? জলদি আয়! আমার পোলা কই গেল? গ্রামে এত পুলিশ, এত পাহারা তার মধ্যে আমার পোলা নিখোঁজ হয় কেমনে?’ তিনি বাড়ির চাকরবাকর আর অনুসারীদের ওপর চড়াও হলে, “সবগুলান অকর্মণ্য! আমার পোলার যদি কিছু হয়, তবে তোদের জ্যান্ত পুইড়া মারুম। খবর দে থানায়!”
সবাই চুপচাপ মাথা নিচু করে রইল। কয়েকজন মশাল জ্বালিয়ে ওদের খুঁজতে বের হলো। শিশিরকে ফোন করা হলো কয়েকবার, কিন্তু ফোন অফ। বারবার কেটে যাচ্ছে। চেয়ারম্যানের হৈ-হুল্লোড়ে পুরো এলাকা জেগে উঠল। তিনি রওশন আরার দিকে তাকিয়ে আরও কঠোর গলায় বললেন, “তোমার ওই আপদ মাইয়াটার লগে আমার পোলার কী কাম ছিল? কেন ওরে নিয়া বের হইছে? যদি আমার শিশিরের একটা আঁচড় লাগে, তবে তোমার নিস্তার নাই।” রওশন আরা কোনো উত্তর দিতে পারলেন না, শুধু ডুকরে কেঁদে উঠলেন। অসুস্থ শরীর নিয়ে এই দুশ্চিন্তা নিতে পারছেন না।
চেয়ারম্যান দেরি করলেন না। সরাসরি থানায় ফোন করলেন। খবরটা আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল। গ্রামের প্রভাবশালী মহলে কানাকানি শুরু হতেই তা জমিদার মকবুল রহমানের কানে পৌঁছাতেও বেশি সময় লাগল না। খবরটা শুনেই তার বুকটা ধক করে উঠল। তিনি খুব ভালো করেই জানেন তার ছেলে তাওহীদ কতটা বেপরোয়া হতে পারে।। মকবুল রহমান তৎক্ষণাৎ তাওহীদকে ডেকে পাঠালেন। তাওহীদ ঘরে ছিল না, কিছুক্ষণ পর সে ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়াল। মকবুল রহমান ছেলেকে দেখেই গর্জে উঠলেন, “তাওহীদ! চেয়ারম্যানের পোলা আর জহির মোল্লার মাইয়া নিয়া গ্রামে হুলস্থুল শুরু হইছে। তুই কি এর মধ্যে আছোস?”
তাওহীদ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সোফায় বসল। পকেট থেকে লাইটার বের করে আগুন জ্বালিয়ে নির্বিকার গলায় বলল, “আব্বা, আপনে এসবের মধ্যে না গেলেই ভালো হয়।”
মকবুল রহমান টেবিলের ওপর সজোরে থাপ্পড় মেরে বললেন, “ফাজলামি করোস? জহির মোল্লার মাইয়ারে ধরে আনছোস কেন? তুই জানোস না চেয়ারম্যানের পোলা ওর লগে ছিল? একসাথে দুইটারে গায়েব কইরা দিলে পুলিশ এবার ছাড়ব না। অনিন্দিতা রায় এমনিতেই আমাগো ওপর ক্ষেইপা আছে!”
তাওহীদ সোজা হয়ে বসল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আব্বা, মৃন্ময়ীর সাথে আমার পুরনো হিসাব আছে। ও আমারে অপমান করছে, আমার ইগোতে লাগছে। আর ওই শিশির? মাঝখান দিয়া পণ্ডিতি করতে আইছিল। তাই দুইটারে একলগে সাইজ করার সুযোগ ছাড়ি নাই।”
মকবুল রহমান আতঙ্কিত গলায় বললেন, “কী করছোস ওদের?”
তাওহীদ নিষ্ঠুর হাসল, “এখনো তো কিছুই করি নাই আব্বা। কেবল তো খেলা শুরু। ইটভাটায় আটকায়া রাখছি। মাইয়ার ওই তেজ আর অহংকার আমি মাটির সাথে মিশায়া দিমু। আর শুনেন আব্বা, যদি চেয়ারম্যান বা পুলিশ আপনেরে কিছু জিগাইতে আসে, তবে সোজা এক কথা বইলা দিবেন। বইবেন যে ওরা নিশ্চয়ই প্রেম-পিরিতি করতেছে, এইজন্যই এলাকা ছাইড়া পালাইছে। জহির মোল্লার মাইয়া তো এমনিতেই ড্যামকেয়ার, আর চেয়ারম্যানের পোলা হইলো সহজ-সরল মানুষ। সুযোগ পাইয়া ভাগাইয়া নিয়া গেছে। এইসব কথা একবার রটাইয়া দিতে পারলে পুলিশও আর আমাগো পিছে ঘুইরা লাভ পাইব না।”
মকবুল রহমান ছেলের চতুরতা দেখে একটু আশ্বস্ত হলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর মনের ভেতর অজানা এক আতঙ্ক দলা পাকিয়ে রইল। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, “কিন্তু অনিন্দিতা রায়রে চিনোস না তুই। সে সহজে এইসব কথা বিশ্বাস করার লোক না।”
তাওহীদ দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভেঙে পৈশাচিক হাসল, “বিশ্বাস করানোর দায়িত্ব আমার।” বলেই তাওহীদ আবার অন্ধকারের দিকে পা বাড়াল। তার গন্তব্য এখন সেই পরিত্যক্ত ইটভাটা, যেখানে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে দুটো নিষ্পাপ প্রাণ।
তাহমিদ দরজার ওপাশে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল। তাওহীদের প্রতিটি কথা তার কানে বিষের মতো বিঁধছিল। নিজের ভাইয়ের এমন পৈশাচিক রূপ দেখে শরীর রি রি করে উঠল। সে আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। পা টিপে টিপে বাবার শয়নকক্ষে ঢুকল। মকবুল রহমানের ড্রয়ারে সবসময় একটা লোডেড রিভলভার থাকে। কাঁপা হাতে ড্রয়ার খুলে অস্ত্রটা তুলে নিল সে। কোমরের পেছনে লুকিয়ে রেখে দ্রুত পায়ে বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল।
রাস্তার অন্ধকার আর পাহারাদারদের চোখ এড়িয়ে তাহমিদ মেঠো পথ ধরে ছুটতে শুরু করল। যদি আজ ভাইয়ের রক্ত ভাইরে নিতে হয়, তাও সে আপত্তি করবে না।
.
জমিদার মকবুল রহমান ঘর থেকে বের হলেন। তিনি শোকাতুর পিতা আর হিতৈষী প্রতিবেশীর ভেক ধরলেন। সরাসরি চেয়ারম্যান বাড়ির দিকে রওনা হলেন। সেখানে পৌঁছাতেই দেখলেন চেয়ারম্যান রাগে-দুঃখে অস্থির হয়ে উঠোনে পায়চারি করছেন। মকবুল রহমান দ্রুত গিয়ে চেয়ারম্যানের সাথে আলোচ্য ঘটনা নিয়ে আলাপ করলেন। জানতে চাইলেন, কিভাবে কি হলো? তার গলায় ঝরঝর করে ঝরছে মেকি মায়া। ভেজা গলায় বললেন, “শান্ত হন। খবরটা শুইনা আমার কলিজাটা ধক কইরা উঠছে। শিশির তো আমার নিজের পোলার মতো। কিন্তু ভাই, একটা কথা না কইয়া পারতাছি না। এই বিপদের দিনে কথাগুলা তিতা লাগব, তাও শুনেন।”
চেয়ারম্যান কপাল কুঁচকে তাকালেন, “কী কইতে চান?”
মকবুল রহমান গলার স্বর আরও নিচু করলেন, “আমি অনেকদিন ধইরা শুনতেছি, ওই জহির মোল্লার মাইয়া মৃন্ময়ী আপনার শিশিররে নানাভাবে ফুঁসলাইতেছিল। আসলে মাস্টার মানুষ তো, দুনিয়াদারি বুঝে না। ওই মাইয়া তারে প্রেমের জালে আটকাইছে। আমার তো মনে হয় ভাই, এইটা কোনো নিখোঁজ না। মাইয়া আপনার পোলারে ফুসলাইয়া এলাকা থিকা ভাগাইছে। না হইলে দুইজনে একলগে গায়েব হয় কেমনে?”
চেয়ারম্যানের চোখের মণি স্থির হয়ে গেল। মকবুল রহমান আগুনের ওপর ঘি ঢেলে দিলেন, “মাইয়ার স্বভাব-চরিত্র তো আগে থাইকাই সুবিধাজনক না। ওই মাইয়ার জন্যই আপনার পোলার সম্মান ধুলায় মিশতাছে ভাই!”
চেয়ারম্যানের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। তিনি দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, “ওই মাইয়া যদি আমার পোলারে বিপথে নিয়া থাকে, তবে আমি ওরে আস্ত রাখুম না! আমার পোলার মান-সম্মান নিয়া খেলা?” মকবুল রহমান মনে মনে হাসলেন। তার কাজ হয়ে গেছে। এখন চেয়ারম্যান পুলিশের ওপর চাপ দেওয়ার বদলে মৃন্ময়ী আর ওর পরিবারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।
.
তাহমিদ বুকভরা সাহস নিয়ে এগোতে চেয়েছিল, কিন্তু অনভিজ্ঞ হাত আর পৈশাচিক শক্তির সামনে সে বড় অসহায়। ইটভাটার পোড়া ইটের স্তূপ আর ভাঙা দেওয়ালের আড়াল নিয়ে সে যখন তাওহীদের একদম কাছাকাছি পৌঁছাল, তখন একটা শুকনো ডাল তার পায়ের নিচে পড়ে মড়মড় করে ভেঙে গেল। সেই সামান্য শব্দটাই কাল হয়ে দাঁড়াল।
তাহমিদ রিভলভার উঁচিয়ে ধরার আগেই পেছন থেকে তাওহীদের এক লোক বাঘের মতো তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তাহমিদের হাতের অস্ত্রটা ছিটকে দূরে গিয়ে পড়ল। ধস্তাধস্তির আওয়াজে তাওহীদ এগিয়ে এল। তাওহীদ তাহমিদের কলার ধরে হ্যাঁচকা টানে তাকে আলোর নিচে নিয়ে এল। সে অবাক হওয়ার ভান করে বলল, “আরে! এ তো দেখি আমার বড় ভাইজান। তা হাতে খেলনা নিয়ে এখানে কী মনে করে? তুমিও কি এই কালনাগিনী মৃন্ময়ীর রূপের মায়ায় পড়ছো নাকি?”
তাহমিদ রক্তচক্ষু নিয়ে চিৎকার করে উঠল, “মৃন্ময়ীরে ছাইড়া দে তাওহীদ! তুই যা করতেছস তার ফল ভালো হইব না।”
“তোরা সব বোকা আর মূর্খ। এই বাঁধ বাঁধ, এইটারেও বাঁধ।”
তাহমিদকে ধাক্কা দিয়ে শিশিরের পাশে ফেলে দেওয়া হলো। তাহমিদ দেখল শিশির রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে আর মৃন্ময়ী এখনো অচেতন। নিজের অসহায়ত্বে তাহমিদের চোখ ফেটে জল এল। বেঁধে রাখা অবস্থাতেই তাওহীদ ইশারা করল তার লোকজনকে। দুজন শক্তপোক্ত লোক অচেতন মৃন্ময়ীকে তুলে নিয়ে পাশের একটি অন্ধকার প্রকোষ্ঠের দিকে রওনা হলো। মৃন্ময়ীর পা দুটো মাটির ওপর দিয়ে ঘষটে যাচ্ছিল। তাহমিদ পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল, “কুলাঙ্গার! মৃন্ময়ীরে ছাইড়া দে! অরে ছোঁয়ার সাহস করিস না। আমি তোরে খুন করব, আমি তোরে ছাইড়া দিমু না!”
সেই মুহূর্তে শিশিরেরও জ্ঞান ফিরল। মাথার পেছনে প্রচণ্ড যন্ত্রণা আর ঝাপসা দৃষ্টি নিয়ে সে তাকিয়ে দেখল, মৃন্ময়ীকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি বুঝতে সমস্যা হলো না। সে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠেও সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠল, “তাওহীদ, খবরদার! তুই বাঁচতে পারবি না তাওহীদ।”
তাওহীদ বিরক্ত হয়ে কপালে ভাঁজ ফেলল। সে শিশির আর তাহমিদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। চোখে জিঘাংসার আগুন। রাগত স্বরে তার লোকদের বলল, “এই দুইটার চিল্লাইনিতে আমার কান ঝালাপালা হইয়া যাইতেছে। মুখ বন্ধ কর এদের!”
মুহূর্তের মধ্যে লোকগুলো নোংরা কাপড়ের টুকরো দিয়ে শিশির আর তাহমিদের মুখ শক্ত করে বেঁধে ফেলল। তাওহীদ পৈশাচিক তৃপ্তিতে বলল, “চেঁচায়া লাভ নাই। এই ইটভাটায় তোদের চিৎকার শোনার মতো কেউ নাই। শিশির সাহেব, আপনে শিক্ষিত মানুষ। বইয়ে তো অনেক বীরত্বের গল্প পড়ছেন, আজ স্বচক্ষে পরাজয়টা দ্যাখেন।”
শিশির শিকল ছেঁড়ার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল, কিন্তু লোহার বাঁধন তার রক্তক্ষরণ বাড়িয়ে দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করতে পারল না।
তাওহীদ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তার সাঙ্গোপাঙ্গদের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে কর্কশ গলায় নির্দেশ দিল, “তোরা মাইয়ার চোখে-মুখে পানির ঝাপটা দে। যেভাবেই হোক ওর জ্ঞান ফেরানোর ব্যবস্থা কর। আমি একটু পর আসতেছি।”
কথাটা বলেই তাওহীদ একটা কুৎসিত হাসি দিয়ে পকেট থেকে সিগারেট বের করল।
এই নৃশংসতার মধ্যেও ঘটে গেল আরেকটি ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী ঘটনা। আরেকটা খুন হলো। এই ছেলেটার নাম শফিক। সে তাওহীদের ফোন পেয়ে এইদিকেই আসছিল। পথিমধ্যে আক্রমণ করা হয়। আততায়ী তার লাশের পাশেও একটা চিরকুট রেখে গেল-
“হারাধনের একটি ছেলে
কাঁদে ভেউ ভেউ,
মনের দুঃখে চলে গেল
রইল না আর কেউ।”
.
.
.
চলবে….
#প্রণয়_প্রত্যাবর্তন🖤 [পর্ব-১২]
~আফিয়া আফরিন
থানার ভেতর অনিন্দিতা রায় অস্থিরভাবে পায়চারি করছিলেন। কোনোকিছুর সমাধান তো হচ্ছেই না, উল্টো সব ভজগট পাকিয়ে যাচ্ছে। একের পর এক খু’ন, চিরকুট রহস্য আর এখন চেয়ারম্যানের ছেলের নিখোঁজ হওয়া, পরিস্থিতি একেবারেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তারমধ্যে উপরমহলের চাপ তো রয়েছেই। এমন সময় ইয়াসিফের উকিল জামিনের কাগজ নিয়ে হাজির হলেন। এখানকার অফিসার ফাইলটা দেখে গম্ভীর গলায় বললেন, “সবই তো বুঝলাম। কিন্তু ইয়াসিফের বিরুদ্ধে এখনও ইনভেস্টিগেশন শেষ হয়নি। এই মুহূর্তে ওকে ছাড়া কি ঠিক হবে?”
উকিল সাহেব বিনয়ের সহিত বললেন, “স্যার ইয়াসিফের বিরুদ্ধে আপনারা কোনো শক্ত প্রমাণ দিতে পারেননি। কোর্ট সবদিক বিবেচনা করেই জামিন মঞ্জুর করেছে। আজ যেহেতু সরকারি দপ্তরের অনেক কাজ বাকি, তাই সব ফর্মালিটি শেষ করে সে আজ আর বের হতে পারবে না; কাল নাগাদ সে থানা থেকে বের হবে।”
অনিন্দিতাও তার মেলালেন। তাছাড়া ইয়াসিফকে তারও দরকার, কিছু কথাবার্তা বলতে হবে। সময় সুযোগ কিছুই হচ্ছে না। অফিসার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “ঠিক আছে। কাল পর্যন্ত ও আমাদের হেফাজতেই থাকছে। কিন্তু একটা কথা মনে রাখবেন, ও বের হওয়ার পর যেন গ্রাম ছেড়ে পালানোর চেষ্টা না করে। ওর ওপর কড়া নজরদারি থাকবে।” উকিল চলে যাওয়ার পর অনিন্দিতা লকআপের দিকে তাকালেন। ইয়াসিফ লোহার শিকের ওপাশে শান্ত হয়ে চুপচাপ বসে আছে। তার চেহারায় মোটেও কোনো উদ্বেগ নেই বরং গভীর রহস্য খেলা করছে। সে জানে, বাইরে এখন পৈশাচিক খেলা চলছে। তাওহীদ তার সীমা লঙ্ঘন করেছে। অফিসার সবদিক পর্যবেক্ষণ করে লকআপের সামনে গিয়ে দাঁড়াল, “কাল দুপুরে আপনি মুক্ত হচ্ছেন ইয়াসিফ সাহেব। কিন্তু মনে রাখবেন, জেলের বাইরে পা রাখলেই আপনার আসল পরীক্ষা শুরু। আমি জানি আপনি অনেক কিছু লুকিয়ে যাচ্ছেন।”
ইয়াসিফ মুখ তুলে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি। সে শুধু অস্ফুট স্বরে বলল, “স্যার কাল দুপুর পর্যন্ত অনেক সময়। এই সময়ের মধ্যে গ্রামের মানচিত্র হয়তো অনেকখানি বদলে যাবে। আপনি বরং আপনার ইনভেস্টিগেশনে নজর দিন।”
অনিন্দিতা চমকে তাকাল। ইয়াসিফ কি তবে সব জানে? গ্রামের মানচিত্র বদলে যাবে মানে কি বোঝাল?
অনিন্দিতা রায় লকআপের শিকের ওপর হাত রাখল। তার চোখ দুটো ইয়াসিফের মনের গভীরতা মাপার চেষ্টা করছে। তিনি গলাটা একটু নামিয়ে বললেন, “শোনো ইয়াসিফ সাহেব, কাল তুমি ছাড়া পেয়ে যাচ্ছো, কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর আমাকে দাও যা আমি আজজও মেলাতে পারছি না। এই যে একে একে খুনগুলো হচ্ছে রাজিব, রশিদ, মোহন, পারভেজ আর সবশেষ শফিক এদের প্রত্যেকের খুনের একটা যোগসূত্র আছে। তুমি কি সত্যিই কিছু জানেন না? নাকি সব জেনেও এই রক্তবন্যা উপভোগ করছ?”
ইয়াসিফ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীর পায়ে শিকের একদম কাছে এগিয়ে এল। তার চোখের মণি দুটো স্থির। সে নিচু স্বরে বলল, “প্রতিশোধ তো সবাই নিতে চায়। কিন্তু এই যে খুনি যে কায়দায় খেলছে, সেটা প্রতিশোধের চেয়েও বেশি কিছু। এটা একটা বিচারের মত লাগছে। ময়ূরীর খুনের বিচার আইন করতে পারবে না। পারলেও তা আমাদের কারোরই মনপূত হবে না। কেউ একজন আছে, যে নিজ হাতে সেই দায়িত্ব তুলে নিয়েছে।”
অনিন্দিতা ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “তুমি কি সন্দেহ করছেন কেউ এই কাজটা তোমার হয়ে করে দিচ্ছে?”
ইয়াসিফ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে নিজেও ভেতরে ভেতরে ভীষণ চিন্তিত। ভেতরে এখন তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ঝড় চলছে। মনে মনে ভাবছে, “কে এই ব্যক্তি? আমি জেলে বসে যখন ময়ূরীর অপমানের শোধ নেওয়ার জন্য ছটফট করছি, তখন বাইরে অন্য কেউ আমার কাজটা করে দিচ্ছে কেন? আমার তো কাউকে দেওয়ার মতো এত টাকা নেই, আর এমন বিশ্বস্ত লোকও তো নেই যে জান বাজি রেখে জমিদার বংশের সাথে পাল্লা দেবে। তবে কি শিশির? না, সে কেনো করবে? এত সাহস আছে? আমি তো চেয়েছিলাম নিজের হাতে ওদের শেষ করতে, কিন্তু এই খুনি তো আমাকে সেই সুযোগটাই দিচ্ছে না। সে কি তবে আমার চেয়েও বেশি কিছু হারিয়েছে?”
এতটা মরিয়া হয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার ঠ্যাকা কার পড়েছে? কে সে যে ছায়ার মতো লেগে আছে তাওহীদের পেছনে? সে অনিন্দিতার দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্ত গলায় বলল, “আমি শুধু এইটুকু জানি খুনি যেই হোক না কেন, সে খুব পেশাদার। সে খুনের পর চিরকুট রেখে যাচ্ছে, চিহ্ন রেখে যাচ্ছে। সে আসলে ভয় দেখাচ্ছে না, সে জমিদার বাড়ির দম্ভটাকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। আপনি যদি সত্যিই ওকে ধরতে চান, তবে তাওহীদের পিছে নজর রাখুন। খুনি ওর কাছে পৌঁছাতে বেশি দেরি করবে না।”
অনিন্দিতা রায়ের খটকা আরও বাড়ল। ইয়াসিফের গলার স্বরে ভয়ের চেয়ে বেশি বিস্ময় কাজ করছে। তিনি বুঝতে পারলেন, ইয়াসিফ নিজেও জানে না এই তৃতীয় পক্ষটা কে। অনিন্দিতা কনস্টেবলকে ইশারা করে বললেন, “ঠিক আছে, ইয়াসিফ। কাল পর্যন্ত এখানে থাকো। তবে মনে রাখবে, কাল বের হওয়ার পর যদি কোনো অঘটন ঘটে, তবে প্রশাসন সবার আগে তোমাকেই ধরবে।”
অনিন্দিতা চলে যাওয়ার পর ইয়াসিফ অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “কে তুমি? আমার হয়ে কাজটা কেন সহজ করে দিচ্ছ? নাকি তুমিও আমার মতোই কোনো এক ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসা এক নামহীন আর্তনাদ?”
ইন্সপেক্টর অনিন্দিতা রায় সার্কেল এসপি (অতিরিক্ত পুলিশ সুপার) শাকিল আহমেদ, অত্যন্ত ঝানু অফিসার তার সাথে গোপন আলোচনায় বসলেন। শাকিল আহমেদ চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে একটা ফাইল দেখছিলেন। অনিন্দিতা সামনে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, “স্যার, পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। জহির মোল্লার মেয়ে আর চেয়ারম্যানের ছেলে নিখোঁজ। ওদিকে তাওহীদের বন্ধু শফিকের লাশ পাওয়া গেছে।”
শাকিল আহমেদ চশমাটা টেবিলের ওপর রাখলেন। তীক্ষ্ণ চোখে অনিন্দিতার দিকে তাকিয়ে বললেন, “মিস অনিন্দিতা আমরা কি কোনো ভুল করছি? খুনি যেভাবে একে একে জমিদার বাড়ির ঘনিষ্ঠদের শেষ করছে, তাতে পরিষ্কার যে সে কোনো একটা সিরিয়াল মেইনটেইন করছে। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে ইয়াসিফ এই খুনি নয়। খুনি অন্য কেউ, যে পুলিশকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য ইয়াসিফকে ব্যবহার করছে অথবা ইয়াসিফের আড়ালে নিজেকে লুকাচ্ছে।”
অনিন্দিতা নিচু স্বরে বললেন, “আমারও তাই মনে হয় স্যার। ইয়াসিফ নিজেও আজ আমাকে জিজ্ঞেস করছিল এই খুনিটা কে হতে পারে। তার চোখেমুখে আমি বিভ্রান্তি দেখেছি।”
শাকিল আহমেদ টেবিলের ওপর ম্যাপটা বিছিয়ে দিলেন। তারপর আঙুল দিয়ে একটা বিশেষ জায়গায় টোকা দিয়ে বললেন, “শোনো অনিন্দিতা, আমরা একটা গোপন পরিকল্পনা করব।” বলেই তিনি রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসলেন। অতঃপর তারা যা পরিকল্পনা করল তার মূলভাব হচ্ছে, জমিদার আর তার লোকেরা যেন কোনোভাবেই টের না পায় যে পুলিশ মুভ করছে। তারা জানবে, পুলিশ তদন্তে স্থবির হয়ে আছে কিন্তু ভেতরে ভেতরে জাল বিছানো হবে। সকালের আগে আমি ওই রহস্যময় খুনি আর অপহৃত মৃন্ময়ীদের হদিস চায় তারা। অনিন্দিতা স্যালুট দিয়ে বললেন, “ইয়েস স্যার। পরিকল্পনা একদম নিখুঁত। আমি এখনই তৈরি হচ্ছি।”
শাকিল আহমেদ জানালার বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললেন, “হারাধনের ছেলেরা একে একে কমছে, দেখা যাক শেষ ছেলেটা কে হয়!”
.
ইটভাটার গুমোট পরিবেশে এখন আতঙ্কের রাজত্ব। শফিকের খুনের খবরটা যখন তাওহীদের কানে পৌঁছাল, মুহূর্তে তার ভেতরের জানোয়ারটা শিকল ছিঁড়ে বেরিয়ে এল। চোখমুখ লাল হয়ে উঠেছে, কপালে রাগের রগগুলো ফুলে ফেঁপে নীল হয়ে আছে। মৃন্ময়ীর জ্ঞান ফেরানোর নির্দেশ দিয়ে সে পাশের রুমে গিয়েছিল, কিন্তু শফিকের খবর পেয়ে সে আবার উন্মত্তের মতো ফিরে এল যেখানে শিশির আর তাহমিদ মুখ বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে। তাওহীদ এখন আর মানুষ নেই, পাগলা কুত্তার মতো আচরণ করছে। সে শিশিরের দিকে এগিয়ে গেল। তার হাতে একটা লোহার রড, যা সে মাটির ওপর দিয়ে টেনে আনছে। ঘর্ষণের কর্কশ শব্দে শিশিরের হাড় হিম হয়ে এল। তাওহীদ হঠাৎ নিচু হয়ে শিশিরের মুখ থেকে কাপড়টা হ্যাঁচকা টানে খুলে ফেলল। হিসহিসিয়ে গর্জে উঠল, “এই মাস্টার! আমার বন্ধুগুলা একে একে খুন হইতেছে আর তুই এখানে বইসা তামাশা দেখতাছস? রাজিব, রশিদ, মোহন, অহন শফিকরেও যমদূত মাইরা রাইখা গেছে। তুই জানোস ওইটা কে? বল কুত্তা, কে খুন করতেছে আমার লোকজনরে?”
শিশির যন্ত্রণায় গোঙাতে গোঙাতে বলল, “আমি… আমি জানি না। আমি তো এখানেই…”
তাওহীদ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে লোহার রড দিয়ে সজোরে শিশিরের পায়ে একটা বাড়ি মারল। হাড় ভাঙার মড়মড় শব্দ আর শিশিরের গগণবিদারী চিৎকার ইটভাটার দেয়ালগুলোতে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল। তাহমিদ পাশে বসে ছটফট করছে, কিন্তু তার মুখ বাঁধা থাকায় সে শুধু গোঙাতে পারছে। তাওহীদ শিশিরের চুল মুঠি করে ধরে তার মুখটা নিজের মুখের কাছে নিয়ে এল। তার গরম নিঃশ্বাস শিশিরের নাকে লাগছে। সে চেঁচিয়ে বলল, “মিছা কথা কবি না! জহির মোল্লার মাইয়া কি তরে কিছু কইছে? ওরে কি কেউ পাহারা দিতাছে? এইটা কি ইয়াসিফের কাম? নাকি তুই নিজে কোনো চাল চালছস? বল! নইলে আজ তোরে আমি জ্যান্ত এই ইটের চুলায় পুইড়া মারুম!”
শিশির ব্যথায় নীল হয়ে কাঁপছে। সে অস্পষ্ট স্বরে বলল, “আমি সত্যিই জানি না তাওহীদ। কিন্তু পাপ কখনো চাপা থাকে না, তোর পাপের সাজা শুরু হইছে…”
“পাপের সাজা? আমারে তুই নীতিবাক্য শুনাস!” বলেই তাওহীদ আবার চড়াও হলো শিশিরের ওপর। একের পর এক কিল-ঘুষি আর লাথি। শিশিরের সাদা পাঞ্জাবি জবজবে লাল। তাওহীদ যেন আজ খুন না করে থামবে না। সে পকেট থেকে ছুরিটা বের করে শিশিরের গলার কাছে ধরল, “শেষবার জিগাইতাছি, ওই খুনিটা কে? যে চিরকুট রাইখা যাইতেছে সে কার লোক? বল, নইলে তোর এই আলগা বীরত্ব আজ এইখানেই শেষ কইরা দিমু!”
পাশের রুম থেকে তখন মৃন্ময়ীর গোঙানি শোনা যাচ্ছে। ওর জ্ঞান ফিরতে শুরু করেছে। তাওহীদ দাঁতে দাঁত চেপে পাশের রুমের দিকে ইশারা করল। তার চোখে খুনের নেশা। সে গর্জে উঠে তার সাথের একটা লোককে বলল, “যা! ওই মাইয়ার জ্ঞান ফিরছে। ওরে টানতে টানতে এইখানে নিয়া আয়। ও দেখুক ওর মাস্টার সাহেবের কি হাল করতেছি!”
লোকটি দ্রুত গিয়ে মৃন্ময়ীকে নিয়ে এল। মৃন্ময়ীর মাথা ঝিমঝিম করছে, রক্ত আর চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে। ও যখন ঝাপসা চোখে সামনে তাকাল, কলিজাটা শুকিয়ে গেল। ওর পরম শ্রদ্ধার মানুষ, সহজ-সরল সেই মানুষটা রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছেন। তাওহীদ মৃন্ময়ীর চুল মুঠো করে ধরল। তাকে বাধ্য করল শিশিরের ক্ষতবিক্ষত শরীরের দিকে তাকাতে। তাওহীদ পৈশাচিক হেসে বলল, “কী রে? খুব তো তেজ দেখাইতি। দেখ, তোর মাস্টারের কী দশা করছি! অহন তুই ওরে বল, ও যেন মুখ খোলে। কে আমার লোকগুলারে মারতাছে? এইটা কি তোর কোনো চাল? বল!”
মৃন্ময়ী কান্নায় ভেঙে পড়ে বলল, “ওনারে ছাইড়া দেন ! ওনি কিচ্ছু জানেন না। ওনার গায়ে আর হাত তুইলেন না, দোহাই লাগে!”
তাওহীদ একটা জ্বলন্ত সিগারেট শিশিরের কাঁধের ক্ষতে চেপে ধরল। শিশির যন্ত্রণায় ধনুকের মতো বেঁকে উঠল, কিন্তু ফের মুখ বাঁধা থাকায় সেই চিৎকারটা কেবল ভুতুড়ে গোঙানি হয়ে রয়ে গেল। তাওহীদ মৃন্ময়ীর মুখের কাছে মুখ নিয়ে এল, “অরে বলতে বল! না হয় আজ তোর চোখের সামনেই ওর জান কোরবান কইরা দিমু। মাস্টাররে বাঁচাইতে চাইলে সত্যিটা বল। ওই খুনিটা কে? ইয়াসিফের লোক? নাকি জহির মোল্লা মরার আগে কোনো গুন্ডা পালছিল তোর লাইগা?”
মৃন্ময়ী আর্তনাদ করে উঠল, “আমি জানি না! খোদার কসম, আমি কিচ্ছু জানি না! আমরা কেমনে জানমু বাইরে কী হইতেছে?”
তাওহীদ আরও হিংস্র হয়ে উঠল। সে শিশিরের ওপর আবার রড দিয়ে আঘাত করতে করতে বলল, “জানস না? আচ্ছা, তাইলে দেখ কেমনে তোর মাস্টারের হাড়গুলা একটা একটা কইরা ভাঙি। তুই যত দেরি করবি, এই হারামি তত বেশি কষ্ট পাইব!”
তাহমিদ পাশের খুঁটির সাথে বাঁধা অবস্থায় পাগলের মতো মাথা কুটছে। সে বলতে চাইছে সেই রিভলভার নিয়ে এসেছিল, কিন্তু তাকে তো এককোণে ফেলে রেখেছে। মৃন্ময়ী চিৎকার করে বলল, “ওনারে মাইরেন না! আপনি যা চান আমি তাই করুম, তাও ওনারে আর মাইরেন না!”
তাওহীদ থামল না। সে আজ পৈশাচিক উল্লাসে মেতেছে। সে মৃন্ময়ীকে ধাক্কা দিয়ে শিশিরের গায়ের ওপর ফেলে দিল। তারপর তার লোকদের দিকে তাকিয়ে বলল, “তৈরি হ। যদি এর মধ্যে কেউ মুখ না খোলে, তবে আজ এই ইটভাটা হবে এদের কবরস্থান। মাস্টার মুখ খুলব না, আর তুইও তেজ দেখাইতেছস? আচ্ছা, তাইলে তেজটা একটু ভাইঙা দেখি।”
বলেই তাওহীদ মৃন্ময়ীর চুলের মুঠি শক্ত করে ধরল। মৃন্ময়ী কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে সজোরে টান দিয়ে নিজের দিকে নিয়ে এল। মৃন্ময়ী ব্যথায় চিৎকার করে উঠল, “ছাড়! আমার গায়ে হাত দিবি না! খোদার গজব পড়ব তোর ওপর!”
তাওহীদ পৈশাচিক হাসল। সে মৃন্ময়ীর থুতনিটা কামড়ে ধরার মতো করে চেপে ধরল, “খোদার গজব? গজব তো আইজ তোর ওপর নামব। অনেক শখ ছিল না এই মাস্টারের লগে ঘোরার? অহন দেখ, তোর এই মাস্টার কেমনে চেয়ে চেয়ে দেখে আমি তোর সাথে কী করি।”
তাওহীদ হিংস্রভাবে মৃন্ময়ীর শাড়ির আঁচল টেনে ধরল। মৃন্ময়ী দুই হাত দিয়ে নিজেকে আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল, কিন্তু তাওহীদের পৈশাচিক শক্তির সামনে ও খড়কুটোর মতো অসহায়। তাওহীদ ওকে ধাক্কা দিয়ে দেয়ালে চেপে ধরল এবং তার গলার কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে হিশহিশিয়ে বলল, “আইজ কেউ তোরে বাঁচাইতে আইব না। আইজ শুধু তুই আর আমি।”
শিশির এই দৃশ্য দেখে উন্মাদ হয়ে উঠল। সে শিকল ছেঁড়ার জন্য এমনভাবে হেঁচকা টান দিল যে তার কবজির চামড়া ছিঁড়ে রক্ত ছুটতে শুরু করল। সে মুখ বাঁধা অবস্থায় গোঙাতে গোঙাতে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু তার আর্তনাদ কেবল ঘরের গুমোট বাতাসে প্রতিধ্বনিত হলো। তাহমিদ ছটফট করছিল, নিজের আপন ভাইয়ের এই বীভৎস রূপ সে সহ্য করতে পারছে না। এদিকে তাওহীদ মৃন্ময়ীর মুখটা এক হাত দিয়ে চেপে ধরে তার ওপর আরও চড়াও হওয়ার চেষ্টা করল। মৃন্ময়ী সর্বশক্তি দিয়ে তাওহীদের হাতে কামড় বসিয়ে দিল। তাওহীদ ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে চেঁচিয়ে উঠল, “হারামজাদি! এত বড় সাহস তোর?”
সে মেজাজ হারিয়ে মৃন্ময়ীকে একটা সজোরে থাপ্পড় মারল। মৃন্ময়ী মেঝেতে আছড়ে পড়ল। তাওহীদ এবার তার গায়ের চাদরটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে মৃন্ময়ীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইল। ঠিক সেই মুহূর্তে ইটভাটার ছাদের ওপর থেকে একটা ভারী পাথর নিচে এসে পড়ল। পুরো ঘরটা কেঁপে উঠল। তাওহীদ থমকে দাঁড়াল। বাইরে থেকে গম্ভীর অতিপ্রাকৃত কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “হারাধনের একটি ছেলে, সময় ফুরালো তার। পাপের পাল্লা ভারী হলো, সাজা পাবে এবার!”
তাওহীদ চমকে উঠে দরজার দিকে তাকাল।
.
থানায় বসে অনিন্দিতা রায় পুরনো ধুলোবালি মাখা ফাইলগুলো একের পর এক উল্টে যাচ্ছিলেন। তাঁর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে, বর্তমানের এই খুনের মিছিলের সূত্রপাত অনেক আগে হয়েছে। হঠাৎ একটা ফাইলে তার চোখ আটকে গেল, অরুনিমা নিখোঁজ ও মৃত্যু সংক্রান্ত তদন্ত রিপোর্ট।
ফাইলের ভেতরে থাকা সাক্ষ্যপ্রমাণের পাতাগুলো উল্টাতে উল্টাতে অনিন্দিতা থমকাল। সেখানে গ্রামের এক সাধারণ মানুষের জবানবন্দি লেখা আছে। তাতে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, “অরুনিমার সাথে জমিদার বাড়ির ছোট ছেলে তাওহীদের দীর্ঘদিনের একটা সম্পর্ক ছিল বলে ধারণা করা হয়।” শুধু তাই নয়, অরুনিমার মৃত্যুর পর লাশ শনাক্তকরণ নিয়েও এক ধরণের অস্পষ্টতা ছিল রিপোর্টে। তড়িঘড়ি করে মামলাটি ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল। অনিন্দিতার কপালে ভাঁজ পড়ল। তিনি আর দেরি করলেন না। নিজের রিভলভারটা চেক করে কোমরে গুঁজলেন। কনস্টেবলকে চিৎকার করে ডাকলেন, “গাড়ি বের করো! এখনই আমাদের অরুনিমাদের বাড়িতে যেতে হবে। আর শোনো, ওই গ্রামের ডাক্তারকে খবর দাও যিনি অরুনিমার ডেথ সার্টিফিকেট লিখেছিলেন। আমার মনে হচ্ছে অরুনিমা মারা যায়নি।”
অনিন্দিতার জিপ ঝড়ের গতিতে গ্রামের মেঠো পথ চিরে ছুটে চলছে। অরুনিমা যদি বেঁচে থাকে, তবে এই খুনের হোতা কে?
.
.
চলবে….
