#প্রণয়_প্রত্যাবর্তন🖤 [পর্ব-০৭]
~আফিয়া আফরিন
ইয়াসিফ বাড়ি ফিরে এসেছে। ভাবছে কোথা থেকে কি শুরু করবে! আগে তাওহীদকে খুঁজে বের করতে হবে। এত বড় শহরে কোথায় গা ঢাকা দিয়েছে কে জানে? তবে খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন না। দু’দিন জমিদারকে অগোচরে অনুসরণ করলেই সম্ভব। তার আগে রশিদের একটা হেস্তনেস্ত করা দরকার। বারান্দায় বসে পরিকল্পনা সাজাতেই ইন্সপেক্টর অনিন্দিতা রায় এসে হাজির হলেন। ইয়াসিফের সাথে গত দু’দিন ধরে তার কথা হচ্ছে, যা বুঝেছে তাতে সে নারাজ। কেন এরকম অবুঝের মত কাজ করছে তা তিনি বুঝতে পারছেন না। আজও তাকে বোঝাতেই এসেছে। এগিয়ে এসে তিনি সরাসরি ইয়াসিফের দিকে তাকালেন। উঠোনের হলুদ আলোয় তাকে খুব নিস্তেজ দেখাচ্ছে। শরীর জুড়ে ব্যান্ডেজ, চোখের নিচে গভীর কালো ছায়া। অনিন্দিতা শক্ত গলায় বলল, “তুমি সব জেনেও মিথ্যা বলছো কেন, ইয়াসিফ? কেন কিছু স্বীকার করতে চাও না? এইভাবে থেমে গেলে অপরাধীরা পার পেয়ে যাবে। তুমি কি চাও না ময়ূরীর অপরাধীরা শাস্তি পাক?”
ইয়াসিফ চোখ নামিয়ে নিল। ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে ধরল। অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর সেই একটাই উত্তর, “আমি কিছু জানি না।”
অনিন্দিতা ওর মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। এই ‘আমি কিছু জানি না’-র আড়ালে যে কতটা আগুন দাউদাউ করছে, সেটা বুঝতে পারছেন না। তবে এইটুকু বুঝতে পারছেন ইয়াসিফ ইচ্ছে করে কিছু চেপে যাচ্ছে। কিন্তু তার বোঝা আর শক্তপোক্ত প্রমাণ হাতে পাওয়া এক জিনিস নয়। তিনি আর চাপ দিলেন না। ভালো করেই বুঝে গেছেন, ইয়াসিফ কিছুই বলবে না। নোটবুকে কয়েকটা কথা লিখে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, “ঠিক আছে। তুমি না জানলেও কেস থেমে থাকবে না। আমরা নিজেদের মতো করে তদন্ত করব।”
কেস ইতোমধ্যেই ফাইল করা হয়েছে। একদিকে জহির মোল্লার নির্মম খু’ন, অন্যদিকে ইয়াসিফকে হ’ত্যার স্পষ্ট চেষ্টা। দু’টোই আলাদা আলাদা ঘটনা, কিন্তু সুতো কোথাও গিয়ে এক হয়ে যাচ্ছে। অনিন্দিতা রায় বুঝে গেছেন, এই মামলা শুধু নথির ভেতর রেখে সমাধান করা যাবে না। আইনের পাশাপাশি নিজের বুদ্ধি, নিজের চোখ-কান সবকিছু ব্যবহার করেই এগোতে হবে। তিনি নিজের মতো করেই কেসটা সামলানোর সিদ্ধান্ত নিলেন।
এদিকে ইয়াসিফ বেঁচে যাওয়াটাই রশিদের জন্য সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেদিন রাতের প্রতিটা মুহূর্ত চোখের সামনে ভাসছে। ইয়াসিফ শুধু তাদের দেখেইনি, কথাও বলেছে। তবুও সে স্বীকার করল না কেন? প্রশ্নটা রশিদের বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে আছে। রহস্যটা যত বাড়ছে, ভয়টাও তত গভীর হচ্ছে। জমিদার সাহেব তাই ঝুঁকি নিলেন না। রশিদকে স্পষ্ট নির্দেশ দিলেন, কিছুদিনের জন্য গা ঢাকা দিতে। চোখের আড়ালে থাকাই এখন সবচেয়ে নিরাপদ। কিন্তু সত্যের একটা স্বভাব আছে! অন্যায়কারীরা যত চাপা দিতে চায়, ততই সে ফাঁক খুঁজে বেরোয়। আর সেই ফাঁক ধরার জন্য ইন্সপেক্টর অনিন্দিতা রায় ইতোমধ্যেই নড়ে বসেছেন।
.
জহির মোল্লা চলে যাওয়ার পর মৃন্ময়ীদের সংসারটা সংকীর্ণ হয়ে এসেছে। এখন এই সংসারের কর্তী-নেত্রী সবই ও। রওশন আরার এসব দিকে হেলদোল নেই, তিনিও মনে মনে মৃত্যুর অপেক্ষা করছেন। শুধুমাত্র চিন্তা হয় ছোটো মেয়েটাকে নিয়ে। কেমন এক পলকে মেয়েটা বড় হয়ে গেল। নিজেই সংসার সামলাচ্ছে, বাড়িঘর দেখভাল করছে। তার ভয় হয় মাঝেমাঝে, বিশেষ করে রাতের বেলা! সামান্য শব্দেই তিনি চমকে উঠেন। এই বুঝি ফের হানাদার বাহিনী আক্রমণ করে। এই বাড়িতে এখন হাহাকার করা শূন্যতা, সেই শূন্যতা ভরাট করার মতো কিছুই নেই। জহির মোল্লার দোকানটা চেয়ারম্যান সাহেব নিজ দায়িত্বে একজনের হাতে বুঝিয়ে দিয়েছেন। এটা সাহায্য না নিয়ন্ত্রণ, কে জানে? মৃন্ময়ী জানতে চায়নি। জগত সংসারের মায়া উঠে গেছে। কিছুই আর ভালো লাগেনা।
হঠাৎ করে জীবনটা এরকম বদলে গেল। বদল চেয়েছিল, কিন্তু তাই বলে এত কঠিন? এত নিষ্ঠুর? মা একেবারেই কথা বলে না। কখনো চুপচাপ দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বসে থাকেন, কখনো হঠাৎ হঠাৎ কেঁদে ওঠেন। মৃন্ময়ীর দিন কাটে মা’কে সামলাতে সামলাতেই। খাবার খাওয়ানো, ওষুধ খাওয়ানো, কাজে কর্মে সাহায্য; একই বৃত্তে ঘুরছে জীবন। নিজের শোকটাকে কোথাও রাখতে পারে না। মায়ের ভাঙনের ভেতর নিজের ভেঙে পড়ার সুযোগ নেই। মাঝেমাঝে শিশির আসে। বারান্দার একপাশে বসে থাকে। কখনো দু’কথা জিজ্ঞেস করে, কখনো কিছু না বলেই বসে থাকে অনেকক্ষণ। মৃন্ময়ী কথা বলতে চায়। কিন্তু কী বলবে তা ভেবে পায়না। এইভাবে চুপচাপ বসে থাকার কোনো মানে হয়না, তবুও শিশির থাকে। হয়তো একটু ভরসা যোগানোর জন্যই! আজ শিশির আসেনি। বিকেলের দিকটায় মৃন্ময়ী অজান্তেই অপেক্ষা করছিল। সে এলে ভালো লাগে। অন্তত একটা মানুষের মুখ তো দেখা যায়! নইলে চারপাশটা কেমন চোরাবালির মরুভূমির মতো নীরব, শুকনো, বুকের ভেতর হাহাকার তুলে দেয়। মৃন্ময়ী অনেকক্ষণ দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। উঠোন পানে তাকিয়েছে, পথের দিকে তাকিয়েছে আবার চোখ নামিয়ে নিয়েছে। সময় গড়িয়েছে, দিনের আলো ক্ষীণ হতে শুরু করেছে। কিন্তু পরিচিত সে জন আজ আর আসেনি। সন্ধ্যার আঁধার নামতেই ও ভেতরে ঢুকল। দরজার পাল্লা ঠেসে বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এক অসহ্য দীর্ঘশ্বাস, যাতে অবসাদ আর রিক্ততা মিশে আছে আর মুখ বুজে বয়ে বেড়ানো প্রতীক্ষার যাতনা পুঞ্জীভূত হয়ে আছে।
.
জমিদার বাড়ির ভেতরটা আজকাল চাপা উত্তেজনায় ঠাসা থাকে। বাইরে যতই শক্ত মুখোশ থাকুক, ঘরের চার দেয়ালের ভেতর সেই মুখোশ বারবার ফেটে পড়ছে। জমিদারের স্ত্রী সালেহা বেগম সব জানেন। একেবারে শুরু থেকে না হলেও, যতটুকু জানার দরকার তারচেয়েও বেশি। তিনি একাধিকবার স্বামীর সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদের স্বর তুলেছেন। স্পষ্ট করে বলেছেন, “এইসব থামান। অনেক হইছে। আর পারতেছি না আমি। মানুষের চোখে চোখ রেখে চলা দায় হইয়া যাইতেছে।”
জমিদার প্রথমে পাত্তা দেননি। পরে বিরক্ত হয়ে উঠেছেন। শেষমেশ গলা চড়িয়ে বলেছেন, “তুমি এসবের মধ্যে নাক গলাবে না। ঘরের বাইরে যাওয়া কমাও।”
“মানুষ আপনারে নিয়া নানান কথা কয়।”
জমিদার আরও জোরে হুঙ্কার দিয়ে উঠেন। স্ত্রীর দিকে না তাকিয়েই বললেন, “তুমি মহিলা মানুষ। ঘরে থাকাই তোমার কাজ। এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নাই। বেশি বাড়াবাড়ি করলে ঘরের বাইরে যাওয়ার সুযোগটাও আর পাইবা না। মনে রাইখো এখন যা করতাছি, সব পরিবারের ভালোর লাইগ্গা।”
কাঁপা কাঁপা গলায় তিনি বললেন, “খুনাখুনি কইরা আপনে কার ভালো চান?”
মকবুল রহমান সামনে এসে দাঁড়ালেন। আচমকা তার শক্ত হাত দুটো স্ত্রীর গলায় চেপে বসল। শ্বাস আটকে এলো তার। চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে গেল ভয়ে। তিনি মুখটা একদম কাছে এনে হিসহিস করে বললেন, “চুপ! একদম চুপ।” আঙুলের চাপ আরও শক্ত হলো, “আমি যা করছি, তার হিসাব কাউরে দেই না। তোরেও দিব না।”
স্ত্রী ছটফট করতে লাগলেন। মকবুল রহমান তো ছাড়লেন-ই না উল্টো অন্যহাতে চুলের মুঠি শক্ত ধরে বললেন, “তোর কি মা**? তোরে খাওয়াইতেছি, পড়াইতেছি, মাথার ওপর ছাদ দিছি, এইগুলা কি কম হইছে?”
সালেহা বেগম কাঁপতে কাঁপতে দেয়ালের দিকে সরে গেলেন। কথাগুলো চাবুকের মতো বুকের মধ্যিখানে এসে আঘাত করল। জমিদার থামলেন না। তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন, “এই বাড়িতে থাকবি, আমার দয়ায় থাকবি আর আমারই কাজে নাক গলাবি? এত কথা বলা লাগে কেন, হ্যাঁ? মহিলা মানুষ হইয়া বেশি বুদ্ধি ফলাইতে গেছোস?” তিনি আঙুল তুলে হুমকি দিলেন, “মনে রাখবি, এই তল্লাটে আমার চোখে চোখ রাইখা কথা কওনের সাহস কেউ পায় না। আর তুই তো কিছুই না। আমি চাইলে তোর খাওয়া, চলাফেরা, এমনকি শ্বাস নেওয়াও বন্ধ কইরা দিতে পারি।”
সালেহা নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলতে লাগলেন। শব্দ করার সাহসটুকুও আর রইল না। মকবুল রহমান গলা থেকে হাত সরিয়ে ধাক্কা দিয়ে বলে, “চুপচাপ থাকবি। নাইলে তোর জন্য কবর খুঁড়তে আমার একমিনিটও লাগবে না।” তিনি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতেই সালেহা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। ছোটো ছেলে আর বাপ মিলে যে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করেছে, তার শেষ কোথায়? শেষটা মনে হলে তার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠে। কি করবেন তিনি? এই গ্রামের সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষগুলোকে বাঁচাতে বাপ-ছেলেকে বিষ খাইয়ে নিজেও বিষ খেয়ে নিবেন?
বাপের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তাহমিদও অবগত। কিন্তু চুপ করে থাকা ছাড়া তার আর কোনো উপায় নেই। মন মানে না। সে চায়, অন্তত যতটুকু পারে মৃন্ময়ীর পাশে দাঁড়াতে। নিঃশব্দে হলেও, ঢাকঢোল পেটানোর ইচ্ছে তার নেই। তাহমিদ নিজেও জানে না, ঠিক কবে থেকে মৃন্ময়ী তার চোখে আলাদা হয়ে উঠেছে। ছোটবেলা থেকেই মেয়েটা চঞ্চল ছিল। কারও তোয়াক্কা করত না, নিজের মতো চলত। অস্থির প্রকৃতির, যেন কোথাও থিতু হতে চায় না। কখনো আলাদা করে নজরে আসেনি। কিন্তু বছর দু’য়েক আগে হঠাৎ করেই যেন চোখে পড়ে গেল। তারপর ভালো লাগা শুরু হলো। আর সেই ভালো লাগাটাই যে কখন নিঃশব্দে ভালোবাসায় রূপ নিয়েছে, তাহমিদ নিজেও টের পায়নি। মৃন্ময়ীর শ্যামলা মায়া-মাখা মুখখানি তার চোখে ভাসে বারবার। কাজলরাঙ্গা অভিমানী চোখের কোণে জমে থাকে অব্যক্ত বেদনা ও জেদের প্রতিচ্ছবি। ঠোঁটে ভিড় জমায় না বলা কথারা। মেয়েটার পরিবারের সঙ্গে যা করা হয়েছে, তাহমিদ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না। রক্তের সম্পর্ক তাকে নীরব থাকতে বাধ্য করেছে ঠিকই, কিন্তু মনটা ক্রমেই বিদ্রোহী হয়ে উঠছে। সে জানে, একদিন না একদিন তাকে নিজের অবস্থান নিতেই হবে।
.
আজও অরুনিমার ধৈর্য ভেঙে গিয়েছিল। ছোট্ট শান্ত কিছু বুঝে ওঠার আগেই মায়ের কাছে ধাক্কা খেতে হয়েছে। অরুনিমা ধমক দিয়ে বলল, “কয়বার বলেছি, ওই জিনিসে হাত দিস না! কথা কানে যায় না তোর?”
শান্ত থমকে গেল। বিস্মিত চোখ দুটো মায়ের মুখের দিকে তুলে তাকাল। আসলে অরুনিমা নিজেও জানে, রাগটা শান্তর ওপর নয়। ওটা অতীতের ওপর। একটা বিষাক্ত স্মৃতি, যেটা মাটিচাপা দিয়ে রাখতে চায়। কবর দেওয়া একটা অধ্যায়, যার নাম মনে করতেও ভয় পায়। ভুলতে চেয়েছিল, ভুলে থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু শান্ত… এই বাচ্চাটা না জেনে, না বুঝে সেই সবকিছুর নাটের গুরু হয়ে যায়। অরুনিমা দাঁতে দাঁত চেপে চোখ সরিয়ে নিল। মনে করতে চায় না, কিছুতেই না। প্রণয় সামনে এসে দাঁড়াল। শান্তকে আলতো করে কোলে নি, “আয় বাবা। মা একটু ক্লান্ত।”
তারপর শান্তকে নিয়ে পাশের ঘরে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর প্রণয় ফিরে এলো। অরুনিমার পাশে বসে কিছু বলল না। শুধু চুপচাপ বসে থাকল। অরুনিমা মুখ ঘুরিয়ে রাখল। চোখ ভিজে উঠেছিল, কিন্তু কাঁদেনি। একসময় প্রণয় সরাসরি জিজ্ঞেস করল, “কি হচ্ছে অরু? ও তো ছোটো বাচ্চা।”
অরুনিমা ঝট করে মুখ ফিরিয়ে নিল। ধারালো কণ্ঠে বলল, “তো? আমি কি করব? সারাজীবন এই বোঝা বয়ে নিয়ে বেড়াব? ও একটা কলঙ্ক। বুঝছো? আমার জীবনের সবকিছু ছারখার করে দিয়েছে।” ওর গলার স্বর ক্রমেই বিষাক্ত হয়ে উঠল, “ও আসার পর থেকে আমার কিছুই আর আমার থাকেনি। শ্বাস নিলেই মনে হয় অভিশাপটা বুকের ভেতর নড়ে ওঠে।”
প্রণয় চুপ করে তাকিয়ে রইল। অরুনিমা বলতেই থাকল, “ও মোটেও বাচ্চা না। ও আমার শাস্তি। আমার দাগ। আমার জীবিত জীবনের কবর। ও জন্মেছে আমাকে শেষ করতে। আমি চেষ্টা করি না মনে করতে। সত্যি চেষ্টা করি। কিন্তু ওর মুখটা দেখলেই, সব মনে পড়ে যায়। সব…” অরুনিমা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। তারপর উন্মাদের মত ছুটে এলো প্রণয়ের কাছে, “ওকে তো আমি মেরে ফেলতে চেয়েছিলাম। তখন তুমি কেন বাঁচিয়েছিলে বলো? আমি মরে গেলেও তো সমস্যা ছিল না। বলো, কেন আমাদের বাঁচিয়েছ?” কণ্ঠটা হঠাৎ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল ওর, “তুমিও কি আমাকে শাস্তি দিতে চাও? সারাজীবন এই বোঝা বয়ে নিয়ে?”
প্রণয় একটা কথাও না বলে সামনে এগিয়ে গেল। অরুনিমার মাথাটা দু’হাতে টেনে নিজের বুকে চেপে ধরল। শক্ত করে। খুব নিচু গলায় বলল, “শান্ত হও। আমি তোমাকে বাঁচিয়েছি নিজের কারণে, নিজের ভালোবাসা রক্ষা করতে, ভালোবাসার দায়িত্ব থেকে। তুমি তো দোষী ছিলে না অরু। তুমি দুর্বল ছিলে, ভেঙে পড়েছিলে।”
অরুনিমা কিছু বলতে গিয়েও পারল না। প্রণয় বলল, “ভাবছো তো শান্ত তোমার অভিশাপ? উঁহু, তুমি নিজের অতীতের কাছেই বন্দী। ও তোমাকে ধ্বংস করেনি, অরু। তোমাকে ধ্বংস করেছে, তোমার সঙ্গে ঘটে যাওয়া অধ্যায়গুলো। তোমাকে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল অন্ধকারে। সেই অন্ধকারে আশার আলো হয়ে এসেছে শান্ত, আমাদের শান্ত।”
অরুনিমার চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। নিজেও প্রণয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। প্রণয় মাথায় হাত বুলিয়ে দিল, “কাঁদতে চাইলে কাঁদো। রাগ করতে চাইলে করো। কিন্তু শান্তর সাথে এমন করো না। একটু কাছে ডাকো। ও তোমাকে ‘মা’ বলার সাহস খুঁজে বেড়াচ্ছে।”
অরুনিমার বুকের ভেতরে একেকটা পাহাড় ভেঙে ভেঙে পড়ে যাচ্ছে। বছরের পর বছর যে কষ্ট চেপে রেখেছে, আজ সেগুলো নিঃশব্দে একটার পর একটা মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। ও কতকিছু সহ্য করেছে। কত অপমান, ঘৃণা, নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করার যন্ত্রণা। প্রতিটা সকাল শুরু হয়েছে অপরাধবোধে, প্রতিটা রাত শেষ হয়েছে নিজেকে দোষ দিয়ে। আয়নায় তাকালেই মনে হয়েছে, এই মুখটা চেনে না; এই জীবনটা ওর নয়। শান্তর দিকে তাকালেই বুকের গভীরে জমে থাকা বিষাক্ত স্মৃতিগুলো জেগে উঠেছে। ওকে আবার সেই অন্ধকারে টেনে নিয়েছে, যেখানে ও অসহায় ছিল। আজ প্রণয়ের বুকে মাথা রেখে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে অরুনিমা বুঝতে পারছে কষ্ট শুধু ওকে ভাঙেইনি, অবশও করে দিয়েছে। সেই অবশতার নিচে কোথাও একটা ক্ষীণ স্পন্দন আছে, যার ফলে এখনও নিঃশ্বাস নিতে পারছে। হয়তো সেই স্পন্দনের নাম শান্ত!
.
এই গ্রামে যারা জমিদারের খাস লোক, তারা তাওহীদের বন্ধুও বটে। তাওহীদের সকল অপকর্মের সাক্ষী। রাজিবও তেমনি একজন। তাওহীদের অনুপস্থিতিতে জমিদারের চোরাকারবারী বর্তমানে ওরাই সামলাচ্ছে। আজ রাতে রাজীব নগদ ৫০ হাজার টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরছিল। এই টাকাটা তাকে গচ্ছিত রাখতে দেওয়া হয়েছে।
রাত তখন একটা বেজে পেরিয়েছে। শুনশান রাস্তায় রাজিব একাই হাঁটছিল। হঠাৎ কোথা থেকে যেন একটা শব্দ ভেসে এল, ডুকঁড়ে ডুকঁড়ে কান্না। ঠিক মানুষের শিশুর মতো, অথচ মানুষের না। শকুনের কান্না। শব্দটা বাতাস চিরে তার কানে ঢুকতেই রাজিবের বুকের ভেতর কেমন করে উঠল। পা দুটো আপনাতেই ধীর হয়ে গেল। সে বারবার পেছনে ফিরে তাকাতে লাগল। টের পেল, কেউ তাকে অনুসরণ করছে। পরক্ষণেই অন্ধকারের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটা কালো ছায়া। মাথা থেকে পা পর্যন্ত কালো পোশাকে ঢাকা। মুখটাও দেখা যাচ্ছে না। হাতের ধারাল ছু’রিটা চাঁদের আলোয় ঝিলমিল করছে। রাজিবের বুকের ভেতর ধক করে উঠল। ঠান্ডা বাতাস বইছে, অথচ তার কপাল বেয়ে ঘাম নামছে। চারপাশে খসখস শব্দ হচ্ছে। তাকিয়ে দেখল, কুকুর। একটা নয়, অনেকগুলো। জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে অন্ধকারের আড়াল থেকে তাকিয়ে আছে। রাজিব আর সামনে পা বাড়াতে পারল না। কালো ছায়াটা এগিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে হাত তুলল, ছু’রির ফ’লাটা বাতাস কেটে উঠল। রাজিবের গলা কাঁপছিল, “কে আপনি? আমার সাথে এমন করছেন কেন? আমার অপরাধ কী?”
অন্ধকারের ভেতর থেকে নির্মম কন্ঠে ভেসে এলো, “তুই ধ’র্ষক। মিথ্যাবাদী। খু’নির ইন্ধনদাতা। এর চেয়ে বড় অপরাধ আর কী চাস?”
রাজিব নিজেকে সামলাতে পারল না। হুড়মুড় করে লোকটার পায়ে পড়ে গেল। কাঁদতে কাঁদতে বলল, “ক্ষমা করে দেন ভাই। আর জীবনে এসব পাপ কাজের ধারে কাছেও যাব না। দয়া করে আমার জীবন ভিক্ষা দেন।”
“তোকে মাফ করে দিলে কি ময়ূরী ফিরে আসবে? তোদের মতো নরপশুকে মাফ করা যায় না। তোরা শোধরাবি না, কোনোদিন না।”
আগুন্তক রাজিবের সামনে বসে পড়ল। মুখ থেকে কালো মুখোশটা সরাল। রাজিব তাকিয়ে দেখল। দেখেই তার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল। যেন ভূত দেখেছে। মুখ দিয়ে শব্দ বেরোবার আগেই, ছু’রির কো’প পড়ল গলায়। র’ক্ত ছিটকালো। কাতরাতে কাতরাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল রাজিব। কয়েকটা শ্বাস নিতে পারল, তারপর সব শেষ। আগন্তুক রাজিবের নি’থর দে’হটা টেনে নিয়ে গেল জমিদার বাড়ির পেছনে। সেই জায়গায়, যেখানে ময়ূরীর লা’শ পড়েছিল। সেখানেই লা’শটা ফেলে দিয়ে একটা হিসেব চুকিয়ে দিল। তারপর সে নেমে গেল পাশের নদীতে। ঠান্ডা পানিতে শরীর ধুয়ে নিল বারবার। র’ক্ত লেগেছিল যে! সে হাঁটতে শুরু করল, নিজের গন্তব্যের দিকে। অন্ধকারের ভেতর মিলিয়ে যেতে যেতে বলল, “প্রতিশোধ শুরু হয়ে গেছে।”
.
.
.
চলবে….
#মহাকাব্যের_চন্দ্রবিন্দু❤️ [পর্ব-০৪]
~আফিয়া আফরিন
উর্মি রেগেমেগে ফোন কেটে দিয়েছিল। আকাশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসেছিল। মাথার ভেতর একসাথে অনেককিছুই ঘুরপাক খাচ্ছে অথচ কোনোটাই ঠিকমতো ধরা দিচ্ছে না। শেষমেশ নিজেই কল ব্যাক করল।
রিং যেতে না যেতেই কল রিসিভ হলো। উর্মি কিছু বলল না, চুপ করে রইল। আকাশ গলা পরিষ্কার করে বলল, “এই আমার বিয়েশাদী সম্পর্কে তুই এত ডিটেইলস কীভাবে জানিস?”
উর্মি প্রথমে মুখ বাঁকিয়ে চুপ করে রইল। তারপর চাপা গলায় বলল, “আমি জানব না?”
“কীভাবে জানবি?” আকাশের গলায় খানিকটা বিরক্তি। এত রাখঢাক সহ্য হচ্ছে না আর।
“তোর বিয়ে কার কথা ঠিক হয়েছে, এইটা শুনেছিস?”
“শুনিনি বলেই তো জিজ্ঞেস করছি।”
“আমার সাথে।”
কথাটা উর্মির বলতে দেরি হলো কিন্তু আকাশের শুকনো মাটিতে আছাড় খেতে মুহূর্তও দেরি হলো না। কথাটা বোধগম্য হতেই আকাশের ভেতরটা কেমন দপ করে উঠল। হেঁচকিও উঠে গেল, “ক… কী?” গলার স্বরটা কেমন অচেনা শোনাল নিজের কাছেই, “কি বলছিস তুই?”
উর্মি জবাব দিল না। আকাশ নিজেই বুঝতে পারছে না এখনও। মাথার ভেতর ঝাঁ ঝাঁ শুরু হয়ে গেল। উর্মি? ওর সাথে বিয়ে? কোনোদিন, কোনো এক অদ্ভুত স্বপ্নেও কি সে এমন কথা কল্পনা করেছিল? ছোটো বেলার বন্ধু, হ্যাঁ। ঝগড়ার সঙ্গী, হ্যাঁ। অভ্যাস, নিশ্চিতভাবেই। কিন্তু বিয়ে? আকাশ চুপ করে গেল। শুধু বুকের বাঁ পাশে সেই চেনা ধুকধুকানিটা হঠাৎ খুব জোরে আওয়াজ করতে লাগল। এই ধুকধুকানি কি বিস্ময়ের? নাকি এমন কোনো সত্যের, যার নাম সে এতদিন উচ্চারণই করেনি? যা সে বহুকাল জেনেও চুপচাপ নিজের মধ্যে চাপিয়ে রেখেছিল। আকাশ বলল,
“মশকরা হচ্ছে?”
ওপাশ থেকে উর্মির শান্ত, নিরেট গলা, “না দোস্ত। সত্যি। বাবা বলল।”
“সিওর তুই?”
“হুম। রাখছি।” এরপর আর কিছু না বলেই উর্মি ফোন কেটে দিল। ফোনটা কানে ধরে রেখেই আকাশ স্থির হয়ে বসে রইল। ঘোরের ভেতর ঢুকে গেল। এইমাত্র ভেবে রেখেছিল, বাবা বাড়ি এলে বিয়েশাদীর প্রসঙ্গ উঠলেই সোজাসুজি নাকোচ করে দেবে। পড়াশোনা শেষ হয়নি, ভবিষ্যৎয়ের বালাই নেই এখন কি বিয়ে করবে? কিন্তু এখন? না আছে বলার শক্তি আছে, না আছে বলার ইচ্ছে! রাতের দিকে শফিউল আলম বাড়ি ফিরলেন। ড্রয়িংরুমে বসতেই কথার ফাঁকে উর্মির নামটা প্রথমবারের মত কানে এলো। শফিউল আলম গম্ভীর গলায় বললেন, “আমি আনোয়ার ভাইকে কথা দিয়ে এসেছি। কথার হেরফের হবে না। আর আকাশও আমার সিদ্ধান্তের বাইরে যাবে না। আশা করি, তোমরাও অমত করবা না। আমি কথাবার্তা বলে দিন-তারিখ ঠিক করছি খুব শীঘ্রই।”
ঘরে উপস্থিত মানুষগুলোকে গুমোট নিস্তব্ধতা গ্রাস করে নিল। আকাশও নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে কিছু বলল না। প্রস্তাবটা তার কাছে অগ্রহণযোগ্য ছিল না। সত্যি বলতে কী, এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যাওয়ার মতো জোর এই মুহূর্তে তার অবশিষ্ট নেই। সে কিছুতেই পারবে না। আকাশ কাউকে কোনোদিন বলেনি হয়তো নিজেকেও ঠিক করে বলেনি কিন্তু উর্মিকে সে ভালোবাসে, এটা তার সুদীর্ঘকালের অমোঘ সত্য। তার সত্তায় মিশে থাকা বহুকালের সত্য। এই প্রেম কখনো মুখে বলা হয়নি। এই প্রেমে কোনো প্রস্তাব বা প্রতিজ্ঞার প্রয়োজন ছিল না, ওটা ছিল একান্তই অভ্যাসের অংশ। ভালোবাসাটা যখন অনাড়ম্বর অভ্যাসে পরিণত হয় এখন সেখানে কোন শব্দের বা ব্যাখার প্রয়োজন পড়ে না। উর্মিকে ভেবেই আকাশের শুরু, ওকে ভেবেই শেষ; ওর সবটুকুতেই তার অধিকার বা অপরাধবোধ, এটাই আকাশের প্রেম। ওর ভালো-খারাপ সবকিছুকেই নিজের বলে নেয়, নিজের করে নেয় অকারণেই। এটা একপাক্ষিক বন্ধুত্বের নাম দিয়ে ঢেকে রাখা দুর্বলতা হতে পারে? তাই কখনো সাহস করেনি মুখ ফুটে বলতে পারেনি, যদি বন্ধুদের সম্পর্কটাই নষ্ট হয়ে যায়? তবে কারো সাথে ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে গেলেই উর্মির মুখটা চোখের সামনে ভাসতো। যতবার ভুল করে অন্য কারো নাম মাথায় এনেছে, মনের ভেতর কোথাও একটা বাঁধা পড়ে যেত।
কল্পনায় থাকা মানুষটা হঠাৎ করেই বাস্তবে রূপ নিয়েছে। বন্ধুত্বের গণ্ডি থেকে বাইরে আসতে চাচ্ছে। স্বপ্নের মতো লাগছে! ঠিক স্বপ্নও না, আবার জাগরণও না। আকাশ নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না, সে খুশি নাকি ভয় পাচ্ছে।
এর মধ্যেই শফিউল আলম আর দেরি করলেন না। তিনি দিন-তারিখ ঠিক করে ফেললেন। উর্মিকে সামনে রেখে আনোয়ার হোসেনকে কথা দিলেন, “ভাই, ছেলেমেয়ে এখনও স্টুডেন্ট এটাতো অস্বীকার করার কিছু নেই। কিন্তু যতদিন আকাশ নিজের পায়ে দাঁড়াতে না পারছে, ততদিন পর্যন্ত উর্মি আমার দায়িত্ব। আমি বাবা হয়ে এই দায়িত্ব পালনে একচুলও পিছপা হব না। ওদের পড়াশোনায় যেন কোনো বাঁধা না আসে, সেটা আমি দেখব। উর্মির পড়ালেখা আগের মতোই চলবে। সংসারের কঠিন দায়িত্ব এখনই ওদের মাথায় চাপবেনা। আমার ঘরে এসে উর্মি কোনোদিন নিজেকে বোঝা মনে করবে না, এই নিশ্চয়তা আমি দিচ্ছি। বিয়ের পর ওরা হুট করে বড় হয়ে যাক তা আমরা কেউ চাই না। ওরা যেমন ছিল, তেমনই থাকবে।”
এরপর উর্মির পরিবার থেকেও আপত্তি করার কোনো কারণ ছিল না। হাসিখুশি ভাবে সবাই রাজি হয়ে গেল। আকাশ আর উর্মির বাবারা যেহেতু দু’জনই সমাজে পরিচিত মুখ, সম্মানজনক অবস্থানে থাকা মানুষ তাই এই খবরটা চাপা থাকল না একমুহূর্তও। খবর পাঠাতে যতটুকু সময় লাগে, তার অর্ধেক সময়ও লাগল না এখানে। খবরের সঙ্গে সঙ্গে গল্পও জুড়ে গেল নিজের নিজের মতো করে। তারপর শুরু হলো একটার পর একটা ফোন। বন্ধু-বান্ধবী, পরিচিত ভাই-ব্রাদার। দু’জনের অবস্থাই একই রকম। হেসে উড়িয়ে দেওয়ার মতো ব্যাপার না,
আবার সত্যিটা পরিষ্কার করে বলার ভাষাও খুঁজে পাচ্ছে না। আসলে ওরা নিজেরাই বুঝতে পারছিল না কী হচ্ছে, অন্যদের কী বলবে?
এই ঘটনার পর আকাশ আর উর্মির মধ্যে আগের মতো যোগাযোগ রইল না। একই জায়গায় থাকে বলে পুরোপুরি এড়িয়েও যাওয়া সম্ভব ছিল না। দু’জন দু’জনকে দেখত ঠিকই। কখনো বিকেলের দিকে ছাদে দাঁড়িয়ে থাকলে উর্মি নিচে তাকিয়ে দেখত, আকাশ বাড়ির সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। আকাশও ওই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ করে কখনো কখনো মাথা তুলে তাকাত। দেখবে কিনা জানেনা। দেখলেও কিছু হবে না। ব্যাস, এইটুকুই।
.
পরদিন সকালটা উর্মির শুরুই হলো নাঈমের ফোনে। ওর ফোনেই আন্দাজ করে ফেলেছে, ঘটনা নিশ্চয়ই ওরাও শুনেছে। নাঈম অবাক হয়ে বলে উঠল, “কিরে, যা হুনলাম হগ্গল হাচ্চা নি?”
উর্মি চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল, “কী শুনছিস?”
“তোঁয়ারা নাকি প্রেম হরিরে ধরা খাইছ? অহন ঘর থাকি ঘাড়ে ধরি বিয়া গরাইত দে!”
উর্মি হেসেই কুল পেল না, “তোকে কে বলল এসব?”
নাঈম ফোঁস করে উঠল, “কেউ গইছে। তুই চাইলেই কি কুথা ফাস ন অই থাকবো?”
“আরেএএএ…”
উর্মি কিছু বলার আগেই নাঈম ধমক দিল, “আকাশরে ফুন দিছি, পাইন ন। হডে হেই শালা?”
“আমি কি জানি? তুই আগে নিজের ভাষা ঠিক কর ভাই। অর্ধেক বুঝি তো অর্ধেক মাথার উপ্রে দিয়া যায়।” উর্মির নির্লিপ্ত জবাব।
“এহন আঁর লগে কতা ন কইবার লাই বাহানা?”
“ধুর! ফালতু বকিস না। ফোন রাখ।”
নাঈম গম্ভীর সুরে বলল, “আগে ক, তুই বিয়া গরিলেল্লা অ্যার গিয়্যা হইব?”
উর্মি ভুরু কুঁচকে বলল, “কেন? তোর সাথে কি আমি প্রেম করছি?”
“আঁই হবিষ্যৎ ইবা গইজ্জাম তো!” (ভবিষ্যতে করতাম তো)
“তোর জন্য ডাক্তারনি আছে।”
নাঈম খোশমেজাজে বলল, “হায়, ইতা কি গইও? আঁত্তুন শরম লাগে।” উর্মি মুচকি হাসল। নাঈমটা এরকমই, একটু পাগলাটে ধাঁচের। নোয়াখালীর ছেলে, একইসাথে পড়াশোনা করে। নাঈমের সাথেও উর্মির পরিচয় আকাশের হাত ধরেই। ওদের বন্ধুমহলে তেমন বিশেষ কেউ নেই। আকাশের যাদের সাথে পরিচয়, উর্মিও ওদেরকেই চেনে। এদের মধ্যে ইশতিয়াক এবং নাঈম অন্যতম। ইশতিয়াক চট্টগ্রামের, প্রথম প্রথম ওদের ভাষা বুঝতে জান-প্রাণ এক হয়ে যেত। এখন আর বিশেষ সমস্যা হয় না।
বিয়েটা তাড়াতাড়িই ঠিক হয়ে গেল। বন্ধুদের দাওয়াত দেওয়ার পুরো কাজটাই আকাশকে হাতে নিতে হয়েছে। সেই কাজ করতে গিয়ে যে পরিমাণ ক্যালানি খেয়েছে, বলার মত নয়। মেসেঞ্জার গ্রুপে সারাক্ষণ এসব চলতেই আছে, “দেখ, শেষ পর্যন্ত দুই বরিশাইল্লা বিয়া করতাছে। একেকজন জীবন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ভাজা ভাজা করে খাবে।” বলতে বলতে পিঠ চাপড় মারে একে অপরকে। আকাশ তৎক্ষণাৎ উর্মিকেও গ্রুপে এড করে। পঁচানি, সে একলা খাবে কেন? উর্মি ওসব পাত্তা না দিয়ে গ্রুপে লিখল, “তোরা আয় আগে। তারপর যত খুশি গবেষণা করিস।”
সঙ্গে সঙ্গে নাঈম রিপ্লাই দিল, “আইয়ুম। আঁরা ন আইলে তঁইগুর বিয়া অইবনি?”
ইশতিয়াক আরেক কাঠি বাড়িয়ে দিল, “উয়াঁরে ছাড়া বিয়া অইলে, হে বিয়া মানি নিতাম না।”
এরপর আর কথা নয়। হঠাৎ করেই দুই বান্দর গান শুরু করে দিল, “বরিশালের লঞ্চে উইঠা লইবো কেবিন রুম, বন্ধুরে মোর বুকে লইয়া দিবো একটা ঘুম, ঠাইসা দিবো একটা ঘুম!” হাসি মজায় সেই সময়টা তো বেশ কেটে গেল। কিন্তু যে দু’জনকে ঘিরে এত কাহিনী, ওরাই নিজেদের নিয়ে নিশ্চুপ। তাই দু’জনের ঐকান্তিক ইচ্ছেয় সেদিন রাতে ওদের চূড়ান্ত করা হলো। উর্মির ভাষ্যমতে, ওর মা-বাবা যে সিদ্ধান্ত নিবে সেটাই ও মেনে চলবে। নিজের যেহেতু পছন্দ নেই তাই পরিবারের নির্দেশই শেষ কথা। উর্মি যা যা বলল, আকাশও ঠিক সেই কথাগুলোই রিপিট করল। ফোন রেখে দু’জনই অদ্ভুতভাবে ভাবতে বসল, ভাগ্যিস আমাদের পরিবার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভাগ্যিস! নয়তো হয়ত নিজেদের পছন্দের মানুষটাকে হারাতেই হত, পরিবারের কথা মেনে চলতে গিয়ে। আল্লাহ’ই সব ব্যবস্থা করেছেন। যেন দু’জনার এই পথ এক হয়ে একই বাঁধনে বাঁধা পড়ে!
পরের মঙ্গলবারের মধ্যে ঢাকা আর রাজশাহী থেকে যাদের আসার কথা, সবাই ঠিক সময় মতো পৌঁছে গেল। উর্মি আকাশকে বলেছিল, “আমার বাড়িতে নাঈমদের থাকতে দিতে পারছি না। মানে, ছেলেমানুষ… বুঝতেই তো পারছিস। বাবা খারাপ মনে করতে পারে। তুই একটু দেখ।”
আকাশ বলল, “এটা নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। আমি ওদের এখানে আসার কথাই বলে রেখেছি।”
উর্মি নিশ্চিন্ত হলো। বাবা বা ভাইয়া হয়ত ওর মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলত না, কিন্তু উর্মির খারাপ লাগত। আকাশ সেটা বুঝল। ঠিক এই কারণে উর্মি আকাশের উপর এত বেশি ভরসা করে। অদ্ভুত এক ছেলে, কীভাবে যেন না বলা কথাও বুঝে যায়।
.
ইশতিয়াক একটু রক টাইপের ছেলে। সবসময় আড্ডা, নাচানাচি আর পাটাতনে এই ছেলেটা একদম মাস্টার! মেয়ে পটানোতে পিএইচডি করেছে, নিশ্চিত। কিন্তু বরিশালে এসে দেখে, বরিশালের মেয়েরা একেবারেই আলাদা! ফ্লার্ট করার ছেলেটার চেষ্টায় এখানে তেমন কোনো কীর্তি হলো না উল্টো তারাই ইশতিয়াককে নাকানি-চোবানি খাইয়ে দিল, যেন চট্টগ্রামের পাটাতন রকস্টার বরিশালের মেয়েদের হাতের খেলনা হয়ে গেছে! এই যে একটু আগে মেয়েরা তাকে ঘিরে ধরল, “তুমি কি নাচবে আমাদের সাথে?”
ইশতিয়াক বুক ফুলিয়ে এগিয়ে গেল। সে তো ডান্স চ্যাম্পিয়ন। নাচতে পারব না মানে কি? ওই চুনোপুটি মেয়েগুলো তার সঙ্গে নাচতে পারবে কিনা, সেটাই আসল চ্যালেঞ্জ। কিন্তু প্রথম তিন স্টেপেই, হায়রে! মেয়েরা ইশতিয়াককে পায়ের তলায় ঘোরাতে লাগল। ডান্স ফ্লোরে ইশতিয়াক একেবারে পাগলাটে হাওয়ার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। চ্যাম্পিয়নের আত্মবিশ্বাস তৎক্ষণাৎ ফুড়ুৎ! আছাড় খেতে খেতে কোন রকম বেঁচে পালালো। বুকে হাত রেখে একটু থেমে বলল, “বরিশাইল্লাগুলা ডেঞ্জারাস! মানুষ এমনি এমনি আর বলে না। চেহারাখানাই খালি চকচক্কা না, গটে বুদ্ধিও আছে। কোনোটা যে কখন চোখে চোখ রেখে ফাঁদে ফেলে বোঝাই যায় না। ডেঞ্জারাস, ডেঞ্জারাস, সত্যি বলছি ভাই!”
ইশতিয়াক আকাশকে সাবধান করে বলল, “দোস্ত, বরিশাইল্লা মাইয়া। বিয়া করতাছোস, সাবধানে থাকিস। তোর জন্য আমার চিন্তা হচ্ছে।”
আকাশ কিছু না বলে কেবল হাসল। এরপর থেকে শুক্রবার পর্যন্ত ইশতিয়াক নিজেকে চিরকুমার দাবি করে মেয়েদের থেকে দশ হাত দূরে দূরে থাকল। দরকার হলে এরপর পাল্লা দিয়ে গরুর সাথে ঘাস খাবে তাও মেয়েদের পাল্লায় পড়বে না। জন্মের শিক্ষা হয়ে গেছে। এরপর পরই শুক্রবার বেলা বারোটা নাগাদ আকাশ-উর্মির বিয়ে সম্পন্ন হয়ে গেল।
.
.
.
চলবে…
