#_প্রণয়িনী_
#_সূচনা_পর্বে_
#_লেখনীতে_নাহিদ_রহমান_
–”অবশেষে পেটের জারজ বাচ্চা’টা এবোরেশন করাতে রাজি হলে! এখন আর আমারও তোমাকে বিয়ে করতে সমস্যা নেই।
‘প্রাণ নিজ ছোট্ট কক্ষের জালানা দিয়ে উদাস চোখে আকাশ দেখছিল। দুপুরের আলো ওর ক্লান্ত মুখে পড়ে নিরব কান্নার ছাপ ফেলেছে। হটাৎ’ই পেছন হতে ভেসে আসা কথায় প্রাণ হকচকিয়ে উঠে তড়াক করে উল্টো ঘুরে দৃষ্টি ফেলল আগুন্তকের পানে। ওর বেখেয়ালি ভাব কেটে গেল। স্বয়ী ধ্যানে মগ্ন ছিল সে ওতটা বোঝেনি কি বলেছে। আবছা কানে এসেছে শব্দগুচ্ছ। কিন্তু এই মানুষকে নিজের কক্ষে দেখে থতমত খেয়ে শুধাল,
–”আপনি?
–”জি, আমি। মনে আছে দেখি।
জবাব হেতু এগিয়ে এলো ‘নিবিড়। প্রাণ কণ্ঠ কর্কশ করল,
–”একটু আগে কি বললেন আপনি? বিয়ে করতে সমস্যা নেই মানে?
–”আমাকে তোমার মা ডেকেছে তোমার সাথে বিয়ে নিয়ে একান্তে আলাপ সারার জন্য।
নিবিড় পেচানো জবাব দিয়ে এক ধ্যানে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে লাগল রমনির ভড়কে যাওয়া আনন। অতীব সুন্দরীর কাতারেই পরবে প্রাণ। ফর্সা তার গায়ের বরন, ডাগর ডাগর আঁখি, গোলগাল মুখশ্রীর সাথে মানানসই নাকটা, হালকা গোলাপি রঙ্গা অধর জোড়া। লম্বাও ঠিকঠাক। যখন প্রথম দেখা তখন পর্দায় ছিল প্রাণ।
নিজের উপর ঘোর লাগা নজর বুঝে আড়ষ্টতা ঘিরে ফেলল প্রাণকে। অনুমতি না নিয়ে রুমে প্রবেশ করেছে তার জন্য ঝাড়ি দিবে নাকি এমন কু প্রস্তাবে কেমন অনুভূতি প্রকাশ করবে বুঝতে পারার আগেই ফের কথা পারল নিবিড়,
–”লোক মুখে যা শুনেছি, তেমনই লাস্যময়ী তুমি। কিন্তু অসম্পূর্ণা! ব্যাপার না বিয়ের পর আমরা মানিয়ে নিব। হবো অপরের পরিপূরক।
‘প্রাণ বাকহারা! হতবিহ্বল হয়ে মুখে কোন কথা আসছে না। তাকে কি ঘর বয়ে এসে অপমান করল? বিয়ে? একে কে বিয়ে করবে? বিস্মিত আর রাগের মিশ্রিত অবস্থা চোখে মুখে ছড়িয়ে পরল ওর। স্বল্প পরিচিত মানুষের কাছ থেকে হুট করে অযাচিত কথায় শরীর গুটিয়ে নিল সে। রুক্ষ স্বরে বলল,
–”আপনার মাথা ঠিক আছে? এমন অসভ্যতামি করার মানে কি?
–”তোমার মা’ই তো আমায় রিকুয়েষ্ট করে ডাকল। তুমি নাকি রাজি আমাকে বিয়ে করতে আর আমার দেওয়া শর্ত মানতে।
„‘প্রাণের চিত্ত জুড়ে রাগের আভাস প্রকট হলো। সাহসাই হাত চলে গেল সামান্য উঁচু হওয়া উদরে। যেখানে তার একটা অংশ বেড়ে উঠছে। তবে প্রাণ স্বভাব সুলভ শান্ত রাখল নিজেকে। শানিত নজরে দেখে নিল দন্ডায়মান পুরুষটাকে। উনি সাবলীল ভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। কোনো ধরণের লজ্জা বা দ্বিধা নেই ওই চোখ দু’টিতে। ভাব এমন যেন এটা গুরুতর কিছু নয় বরং এটা উনার অধিকার। ‘প্রাণ ভুল শুনেছে ভেবে শক্ত গলায় পুনরায় জানতে চাইলো,
–”মানে? আমি তো এসবের কিছু জানি না? আপনার সাহস হলো কি করে এবোরেশন শব্দটা আমার সামনে বলার! অন্তত আপনার থেকে এটা আশা করিনি আমি!
প্রাণের মায়ের উপর খানিক ক্ষোভ জন্মাল নিবিড়ের। তবে প্রাণের রুপ দেখে গলে গেল তা। নিবিড় নিজেদের দূরত্বটুকু কমিয়ে নিয়ে মাথা ঝুকিয়ে নরম গলায় বলতে লাগল,
–”বিয়ে করতে চাই তোমাকে। তোমার মায়ের কথা বাদ। নিজেই প্রস্তাব রাখছি। যেহেতু দু’জনের নতুন করে পথ চলা শুরু তাই আমি চাইছিনা তুমি অন্যের অংশ নিজের শরীরে বয়ে বেড়াও। আমার চাওয়া কি অন্যায়?
শির শির করে ঠান্ডা শিহরণ বয়ে গেল প্রাণের পিঠের দ্বার বেয়ে। ওড়নার প্রান্ত খাঁমচে ধরল নিজের রাগ দমন করতে। এবার বুঝতে পারল সে সবটা। নিশ্চয় মা এই কাজ করেছে। উনি পাঠিয়েছেন এই লোককে। যে কিনা খুনি হতে বলছে!
জঘন্য কাজের কথা ভাবতেই তির তির করে ক্রোধের মাত্রা বাড়ছে প্রাণের। মুখশ্রী লালিমা বর্ণ ধারণ করেছে ওর। অথচ কণ্ঠ যেন রোধ হয়ে এসেছে প্রাণের। কড়া কথা বের হচ্ছে না গলবিল দিয়ে। বেশি রাগান্বিত হলে এই এক সমস্যা! তবুও প্রবল গড়িমা নিয়ে আর অনাগত সন্তানের অপমানে, প্রাণ নাশের কথায় সপাটে থাপ্পড় বসিয়ে দিল নিবিড়ের পুরুষালি নিরেট গালে। ক্ষিপ্ত কণ্ঠে আওড়াল,
–”আপনি ভাবলেন কি করে? ইতর কোথাকার!
নিবিড় চড় খেয়েও ভাবলেশহীন। বরং বেহায়া হেসে হাত উঁচিয়ে তর্জনি আঙ্গুল দিয়ে প্রাণের ফর্সা মেদুর গাল ছুঁয়ে দিল। ভ্যাবাচেকা খেল প্রাণ। পিছিয়ে যেতে নিবে কিন্তু নিবিড় সাহসা ওর কোমড় চেপে ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল মেয়েলি দেহখানি। প্রাণকে আরও বিস্মিত করতে নিজের চরিত্র প্রকাশ করল সে। নিজেকে দমিয়ে রাখা বড় দায় হলো ওর। সামনে এমন আগুন সুন্দরী আর মেরুদণ্ডহীন ব্যবহৃত নারী থাকলে কোন পুরুষ নিজের লালসা দমিয়ে রাখতে পারে?
প্রাণের মোচড়া মুচড়ি জারি রয়েছে। নিবিড় পর পর প্রাণের চোয়াল আলতো চেপে ধরে ঠোঁট দাবিয়ে চুমু এঁকে দিল মেয়েলি মসৃণ গালে। মন্ত্র মুগ্ধের ন্যায় স্ব প্রশংসিত কণ্ঠ ওর,
–”নারীর সামান্য ঝাঁঝ বেসাতি উত্তপ্ততা ছড়ায় পুরুষের মনে। আই লাইক ইট, বেব।
প্রাণ কিংকর্তব্যবিমুড়! দম আটকে আসছে যেন ওর। গায়ে নেমেছে কম্পন। নিবিড়কে ধাক্কা দিয়ে ছুটে গেল ওয়াশরুমে। মুহুর্তেই বেসিন ভাসিয়ে গল গল করে বমি করে ভাসিয়ে দিল। হাপড়ের ন্যায় শ্বাস চলছে প্রাণের।
নিবিড় খানিক চিন্তিত হলো। সেও হেল্প করার জন্য ওয়াশরুমে ঢুকতে নিলে প্রাণ সেভাবেই চিল্লিয়ে উঠল। উষ্মায় শরীর কাঁপছে ওর অথচ প্রচন্ড ঘৃণায় চোখে নোনা পানি পূর্ণ। আঙ্গুল তুলে ক্ষিপ্ত গলায় থেমে থেমে উচ্চারণ করল সে,
–”এক্ষুণি বেড়িয়ে যান বাসা থেকে। আমার অংশ আমি নাড়ি ছেড়া করব না, কখনোই না। আর আপনাকে বিয়ে করা তো দূর আমার চোখের সামনে থেকে দূর হয়ে যান। অসভ্য পুরুষ!
নিবিড়ের কপালে চার খানা রেখা ভেসে উঠল এবার। এই প্রাণ দেখছি অন্য সব মেয়ের মতো নয়। তার মতো পয়সা ওয়ালাকে দূর ছাই করছে? অপমানিত বোধ করল সে। এভাবে আহ্লাদ করে ডেকে এনে কথা শুনতে চাইবে কোন পুরুষ?
প্রাণের শেষের কথা চড়া শোনাল। যা লিভিং রুম পর্যন্ত পৌছে গেল। তা শুনে মুহুর্তেই মেয়ের ঘরে ছুটে এলেন চল্লিশোর্ধ ‘মনিরা বেগম। এক পল নিবিড়ের ক্রোধিত মুখ পরোখ করে প্রাণের বাহু চেপে ধরেলেন স্বজোরে। ঝাড়ি দিতে মুখ খুলবে কিন্তু উনাকে থামাল নিবিড়। রূঢ় চাপা গলায় বলল,
–”এই তেজ আমিই আমার মাঝে বিলীন করব।
বুকের বেদনা প্রগাঢ় হলো প্রাণের। শরীরটা কোন নর্দমার কীট লাগছে! অসাড়তা নেমেছে মাংসল দেহে। কপোল ভিজিয়ে অশ্রুর ছন্দ পতন বইতে লাগল। সে আবার খুব শক্ত মনের রমণি নয়। কিন্তু প্রবল আত্মমর্যাদা সম্পন্ন নারী।
নিবিড় হনহনিয়ে প্রস্থান নিল। মনিরা অস্থির হলেন। স্বেচ্ছায় পাওয়া সুযোগ হাত ছাড়া কে করে? কত কষ্ট করে নিবিড়কে ভুলিয়ে ভালিয়ে রাজি করালেন তা জলে যেতে দিবেন না।
–”তোকে পরে দেখে নিচ্ছে।
প্রাণের হাত ঝটকা মেরে ছেড়ে দিয়ে শাসালেন ওকে মনিরা। পর পর পিছু নিলেন নিবিড়ের। বোঝানোর চেষ্টা জারি রাখলেন সেই সঙ্গে,
–”বাবা, তুমি শান্ত হও। আমি মানিয়ে নিব ওকে। তুমি যা চাইবে তাই হবে। একটু ভরসা রাখো আমার উপর।
নিবিড় থামল। আসলে সে নারীবাজ। কিন্তু এলিট সোসাইটিতে বউ নামক পারমানেন্ট একজন রাখতে হয়। জাস্ট শো অফ। নাহলে কলিগ’রা হাসাহাসি করে। গোপনে যাই করো, বউ থাকা চাই। এদিকে সুন্দরী, ভোলাভালা মেয়ে পাওয়া চাঁদ হাতে পাওয়ার সমান হয়ে গেছে। সে হিসেবে প্রাণ ঠিকঠাক কিন্তু স্বভাবে তার মনের মতো না। আবার অন্যের বাচ্চা পেটে রেখেছে। সে চাপা স্বরে মনিরার উদ্দেশ্যে বলল,
–”আপনার তাহলে উচিত ছিল প্রাণকে রাজি করিয়ে আমাকে ডাকা। শুধু শুধু সময় নষ্ট করলাম। রেডিকিউলাস!
এহেন ভারি গলায় মনিরা এবার অপরাধীর মত মুখ করলেন। তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টায় আছেন যাতে প্রাণ জীবনের ভয়ে কারো গলায় ঝুলে পরতে চায়। শেষে ওই বাচ্চাটার জন্য দাবা পাল্টে যায় উনার। কে জারজের ঘানি টানতে চাইবে আজীবন?
প্রাণ গুটি গুটি পায়ে উপস্থিত হলো সেথায়। ভেবেছিল ইতরটা চলে গেছে কিন্তু না মনিরার সাথে পরামর্শ চলছে এখনো। নিবিড় মনিরাকে উপেক্ষা করে ঘাড় মুড়িয়ে প্রাণকে আর একবার দেখে চোখ টিপে দিল। চড় খেয়ে জেদ উঠে গেছে মাথায়। বলল,
–”হানি, গেট রেডি টু বি মাইন।
মনিরা ক্রুর হাসলেন। যাক সুযোগ এখনো রয়েছে তবে। নিবিড় প্রস্তান নিল স্ব দর্পে। প্রাণ সহ্য করে নিল সবকিছু। তাছাড়া উপায়ও নেই। বাসা খালি হতেই মায়ের মুখে চেয়ে সোজা বলল,
–”আমাকে না জানিয়ে আপনি এটা ঠিক করেননি,
শেষ করতে পারল না তার আগেই মনিরা এগিয়ে এসে সপাটে চড় বসিয়ে দিলেন প্রাণের গালে। প্রাণ নত মস্তকে ব্যথাতুর হাসল। পরিহাসের হাসি! চড়াল গলা মনিরার,
–”মুখপুরি, কত হেপা সামলিয়ে এই বার সম্বন্ধ পেলাম তাও ভেস্তে দিচ্ছিলি। আর কত কাল আমাদের ভোগাবি তুই? তোর জন্য সমাজে মুখ দেখতে পারি না আমরা। সবাই থু থু ছোড়ে।
প্রতিত্তোরে কোন ভাষা খুঁজে পেল না প্রাণ। প্রতি বারের ন্যায় এবারও হাজার চাপা কথা বুকে গোপন রাখল সে। মনিরা ফের হাঁকিয়ে উঠলেন,
–”তুই আজই যাবি এবোরেশন করাতে নাহলে আর এবাড়িতে তোর ঠাঁই হবে না। কার না কার জারজ সন্তান গর্ভে ধরেছিস।
–”মা,
ভেজা নেত্র তুলে নিগূঢ় কণ্ঠে ডাকটা উচ্চারণ করল প্রাণ। বোবা আর্তনাদ যেন ঠিকরে বের হলো বুকের গহীন হতে। মনিরা ফের অপর গালেও ঠাটিয়ে চড় বসিয়ে দিলেন। পর পর প্রাণের কবরি বদ্ধ কেশ পেঁচিয়ে নিলেন হাতের মুঠিতে।
প্রাণ কুকরে গেল বিষ ব্যথায়। ক্লেশে গোঙ্গানি ধ্বনি বের হলো শ্বাসতন্ত্র দ্বারা। মনিরা মুখে ছোটাল কড়া বাক্য,
–”মা ডাকবি না এই নোংরা মুখে। তোর হায় লাগলে না জানি আমার হায়াত ফুরায়! আপয়া, জন্ম নিতেই তো পেটে ধরা মাকে হজমের দুয়ারে পাঠালি। আবার স্বামীকেও,
–”দোহাই লাগে ওমন কথা মুখেও নিও না।
হু হু করে কেঁদে দিল প্রাণ। মুষড়ে পরছে সে শারীরিক ধকলে। মনিরা শমিত হলেন এ’দফা। প্রাণকে ঘাড় ধাক্কা দিলেন এক প্রকার। নিজেরো মাথায় খু’ন চেপেছিল উনার। শুধু পারছেন না একটা লাথি দিয়ে পেটের বাচ্চাটা নষ্ট করতে। তবে এতে নিজের ভীত নড়ে যাবে ভেবে শান্ত রয়েছেন। কপালে স্বামী জুটেছে একটা মেয়ে যা বলবে তাই নিয়ে নাচবে।
প্রাণ সোফায় উপুড় হয়ে পরল। মুখ খিঁচে নিল ব্যথায়। ওর হাপড়ের ন্যায় শ্বাস। মনিরা মুখ বাঁকিয়ে চলে গেলেন কিচেনে।
.
„‘মধ্যবিত্তের মাঝারি ফ্ল্যাটখানা এখন পিনপিনে নিরব। গুমোর ধরে আছে বসত। তবে প্রাণ সোফার হাতলে কপাল ঠেকিয়ে নিজের ব্যথা সয়ে নিচ্ছে। বেশি একটা লাগেনি ওর। মনের যতনাই বেশি। তবে ক্লান্ত সে।
মনিরা চা বানিয়ে লিভিং রুমে এসে প্রাণকে এখনো ক্রন্দনরত অবস্থায় দেখে বেজায় রুষ্ঠ হলেন। গুণ গুণ বোজা কান্নার আওয়াজ উনার কানে বাজছে। মুখ কুঁচকে নিয়ে উষ্মায় গিজ গিজ করতে লাগলেন তিনি। সোফার পাশে এসে দাঁড়িয়ে গিয়ে এক হেচকা টানে প্রাণকে বসা হতে দাঁড় করিয়ে বাজ খাই গলায় চেঁচালেন,
–”মরা কান্না থামা রে, মুখপুরি। তোর বাপ এখনো জীবিত।
প্রাণ নিথর দেহের ন্যায় শুধু দাঁড়িয়ে রইল। পায়ের আওয়াজ কানে যেতেই ওর কান্না থেমেছিল। উত্তর দেওয়া বৃথা! বরং চুপ থাকলেই কটূ কথা গুলো হজম করতে হবে না বেশি। মনিরা সোফায় আয়েশ করে বসলেন। তীর্যক চোখে চাইলেন প্রাণের মুখে। বললেন তার স্বরে,
–”আমার মুখ দেখে পেট ভরাবি নাকি? ভাত গিলতে হলে যা দুপুরের এঁটো থালা বাসন গুলো ধুয়ে দে। আমি একটু ঘুমাব।
প্রাণ নিজের ভঙ্গুর, অসুস্থ শরীরটা কোন রকমে টেনে নিয়ে চলল রান্নাঘরের দিকে। যাওয়ার মাঝে পায়ের গতি কমিয়ে পিছে মুড়ে উল্টো জানতে চাইল,
–”রান্নাও করতে হবে?
–”তোর আশায় বসে ছিলাম না।
চায়ের কাপে চুমুক বসিয়ে মুখ ঝামটা মারা উত্তর করলেন মনিরা। প্রাণ রন্ধনশালায় এসে মনের ভেতর চাপা কষ্ট উগলে দিল দীর্ঘ শ্বাসে। তাকে তাড়াতেই প্রত্যহ এত আয়োজন।
চোখ গেল কিচেন সিঙ্কে। যেখানে অপরিষ্কার থালা-বাসন ভর্তি হয়ে আছে। ভঙ্গুর প্রাণ শুরু করল তা ধুতে। অনেক ক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে পা ধরে গেছে ওর। ঝিমঝিম করছে। ফাঁকি দিলে খাবার পাবে না। অথচ এখনো অর্ধেক বাসন ধোয়া বাকি। খিদের জন্য পেটে খামচে ধরেছে। চোখের কর্ণিশে জমা অশ্রু হাতের উল্টো পিঠে গড়িয়ে পরার আগেই মুছে নিল প্রাণ। গাল দু’টোতে দাগ বসে গিয়েছে চোখের জল গড়ায়। রোজ রোজ এমন হচ্ছে অথচ বেহায়া চোখ হতে এমনি পানি ঝরবে।
#চলবে_______________________________________?
#_প্রণয়িনী_
#_২য়_পর্বে_
প্রাণ চোখ মুছে ফোন হাতে তুলে নিল। একমাত্র সখীর নাম দেখে শত বিষাদের মাঝেই ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটল ওর। ঝটফট তা রিসিভ করে সালাম জানাল। পর পর নিজেই জানতে চাইলো সরাসরি,
–”এখন ফোন দিলি যে?
ফোনের অপর পাশের ‘অদ্বিতা জানে প্রাণের বাড়ির পরিস্থিতি। তাই তড়িৎ জবাবে বলল,
–”মেসেজ দিলাম রিপ্লাই করলি না তাই কল দিলাম। একটা চাকরির খোঁজ পেয়েছি, তোর বায়োডাটা পাঠিয়ে ছিলাম তাতে তুই সিলেক্ট হয়েছিস।
–”আলহামদুলিল্লাহ।
চাপা উত্তেজিত গলা প্রাণের। এতটুকু প্রাপ্তিতে পুনরায় চোখের কোণ ভিজে আসছে। মুখ বিবরে উজ্জ্বল ভাব! গলা কাঁপছে ওর। তবু নিজেকে শান্ত রেখে পিছে মুড়ে দেখে নিল আশপাশ। সস্থির শ্বাস ফেলে পুনশ্চ শুধাল, –”কিসের কাজ?
–”অফিসের রিসেপশনিস্ট কিন্তু একটা সমস্যা আছে।
–”কি?
কপালে কতেক ভাজ এলো প্রাণের। ক্ষীন আশার আলো টুকু বুঝি কপালে নেই। ভাবনা মাঝেই উত্তর আসলো অদ্বিতার,
–”পদটা অস্থায়ী।
–”ওহ! ব্যাপার না রে যতদিন করা যায় করবো আমি।
অদ্বিতার কথা শেষে প্রাণের বিরস গলা। আবার কিছু সময়ের নীরবতা নামল। অদ্বিতা কণ্ঠে রস বোধ ঢালল। সাত্বনা দিয়ে বলল,
–”চিন্তা করিস না, প্রাণ। তুই কাজের পারফরম্যান্স ভালো করলে কর্মীদের রেফারেন্স পেলে স্থায়ী হবে কাজটা। তুই আজকেই একবার গিয়ে দেখা কর। আমি মেসেজে সমস্ত ডিটেইলস তথ্য দিয়েছি।
–”ওকে। অনেক ধন্যবাদ, বোন।
প্রাণ নিচু গলায় সম্মতি জানাল। অভিবাদন জানিয়ে কল কাটল সে। কাজ ফেলে রেখেই রুমে ফিরে রেডি হয়ে নিল প্রাণ। বিছানার তোশকের নিচে খুঁজে খুঁজে একশত ত্রিশ টাকা পেল মাত্র। ভাবল রিকশা করে যাবে তবে এবার হেঁটেই যেতে হবে ওকে। দীর্ঘ শ্বাসটা বেরিয়ে গেল বুকের গহীন হতে। তাও মুখে এক টুকরো হাসি রইল। প্রাণ চুপি চুপি লুকিয়ে বাড়ি থেকে বের হলো। মনিরা ঘুমিয়ে গিয়েছেন জন্য কোন হেপা পোহাতে হলো না ওকে তেমন।
.
„‘অফিসের ঠিকানায় এসে দাঁড়াল প্রাণ। চোখ তুলে দেখে নিল বিশাল অট্টালিকা খানা। সামনে বসার জন্য নান্দনিক বেঞ্চ পাতা রয়েছে তাতে বসে পড়ল ক্লান্ত দেহ জিরিয়ে নিতে। কড়া রোদ মাথায় নিয়ে পুরো রাস্তা হেঁটে এসেছে, তার উপর কাঠ ফাটা গরমে ত্বক জ্বলছে। গলা শুকিয়ে এসেছে ওর। মাথাটা কেমন যেন ধরেছে! ফাইলটা পাশে রেখে দু’হাতে মুখের ঘাম মুছে নিল প্রাণ। গলা ভেজালে ভালো লাগত ঠিক তখনই রাস্তার ধারে প্রাণের নাক বরাবর একটা কালো গাড়ি এসে থামল সাহসাই। প্রাণের চোখ গেল সেদিকে। দৃষ্টি হলো সন্দিহান।
ধীরে ধীরে জালানা নামল গাড়ির। প্রাণ দেখল ড্রাইভিং সিটে বসা মানুষটা পুরুষ। ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। তবে মুখ দেখার উপায় নেই। মাস্ক পরা, চোখে গ্লাস আটা। মনে মনে একটু হাসলো প্রাণ। কেউ গাড়িতে এভাবে সং সেজে থাকে বুঝি? অপরিচিতের নজর নিজের উপর তাক দেখে একটু জড়ো-সড়ো হলো সে। এভাবে তাকে দেখার কি আছে? আর গাড়িই বা দাঁড় করাল কেন? প্রাণের মনে উদিত প্রশ্নের ইতি টানতে লোকটা ভেতর থেকে পানির বোতল ছুড়ে দিল জানালা গলিয়ে। সেটা সোজা গিয়ে পড়ল প্রাণের পায়ের কাছে। মুহুর্তেই প্রাণের আননে একরাশ অবাক রেশ ছড়িয়ে পরল। দ্রুত বোতলটা হাতে তুলে নিয়ে চোখ তুলে নজরে নজর সন্ধির করল। তখনই শোনা গেল গমগমে গম্ভীর পুরুষালি গলা,
–”আপনার প্রয়োজন এটা।
আর কথা নেই। নাতো ব্যক্তিটির কিছু শোনার ইচ্ছে। গাড়ির কাঁচ আবার উঠল। গতি বাড়িয়ে চলে গেল গাড়িটা। প্রাণ এখনো ঘোরে রয়েছে যেন! গলার আওয়াজও কোন দিন শুনেছে বলে মনে পরছে না। বোতলটা একবার দেখে ফের চলে যাওয়া গাড়িটা দেখতে লাগল সে। মনে খুত খুতে প্রশ্ন ভিড়ল,
–”হুট করে এভাবে কে উপকার করে তাও অজানা কাউকে?
প্রাণ উত্তর পেল না কোন। ইনটেক বোতল দেখে সন্দেহ হলো না আর। বরং তৃষ্ণা মিটিয়ে পানি পান করল সব প্রশ্ন মন থেকে ঝেড়ে ফেলে। যেই হোক উপকার করল জন্য দোয়া করে দিল প্রাণ। খানিক বিশ্রাম নিয়ে ঢুকে গেল অফিসে। কত বিশাল এড়িয়া! চারিদিক ঘুরে দেখে নিজেকে সামলে নিল সে। অচেনা জায়গা তাই রিসেপশনে গেল,
–”শুনবেন একটু।
–”জি,
রিসেপশনিস্ট ‘রিতা ফোন রেখে জবাব দিলেন। জানাল প্রাণ,
–”আমি জবের জন্য এসেছি। কোথায় বা কার সাথে যোগাযোগ করবো?
–”কোন সেক্টর।
–”রিসেপশনিস্ট।
–”পেপার এনেছেন?
প্রাণ দ্রুত নিজের বায়োডাটার ফাইল এগিয়ে দিল। রিতা সব কিছু চেক করে একটা পেপার বাড়িয়ে ধরে বললেন,
–”মিস. প্রাণ, অভিনন্দন আপনাকে। এপয়েন্টমেন্ট পেপারটায় বসের সাইন নিয়ে আমার কাছে আসুন। আমি কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছি।
–”ওকে।
কৃতজ্ঞ হাসলো প্রাণ। রিতা গলা উঁচালেন,
–”বসির,
এক ডাকেই মধ্যবয়সী বসির উপস্থিত হলেন ডেস্ক এড়িয়ায়। রিতা প্রাণকে দেখিয়ে বসিরকে বললেন, –”উনাকে বসের কেবিনে নিয়ে যান।
–”আসুন মিস।
প্রাণ পিছু পিছু চললো। নির্দিষ্ট ফ্লোরে এসে বসির কেবিন দেখিয়ে দিল। প্রাণ উনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে নক করল দরজায়।
–”কামিং.
কণ্ঠ চিনতে ভুল হলো না প্রাণের। কপালে ভিড়ল কয়েক দীর্ঘ ভাজ। উপকারীকে ভোলা যায় নাকি? তার মানে এত বড় অফিসের বস তখন যেচে উপকার করেছিলেন। ভাবতেই বুঝল লোকটা অহংকারী হবে না হয়তো! নম্র কদমে ভেতরে প্রবেশ করল সে। স্ব বিনয়ে সালাম জানাতে অপর পাশ হতে পাল্টা প্রশ্ন এলো, –”বসের নাম জেনে নিয়েছেন?
দাঁতে জিভ কাটলো প্রাণ। কতটা আহাম্মক সে! ইশশ, চোরের মতো মুখ বানাল নিমিষেই। এই গাধামির জন্য চাকরিটা না যায় ওর। ইতস্তত গলায় সাফাই গাওয়া জবাব,
–”আসলে,
–”প্রণয় মেহমিদ চৌধুরী।
ঠান্ডা গলায় বলল বস রুপি প্রণয়। লজ্জিত দৃষ্টি প্রাণের। দেখল তথাকথিত সুদর্শন বটে! লম্বা গড়ন, ফর্সা বরণ। সিল্কি চুলের নিচে স্বল্প চওড়া কপাল, খাড়া নাক, চাপ দাড়ি রেখেছেন। ছোট চোখের ক্ষুরধার চাহনি। প্রাণ একটু হ্যাবলা হাসার চেষ্টায়,
–”জি, স্যার।
প্রণয় আড়ষ্ট হওয়া ছোট্ট মুখটায় চেয়ে থেকেই হাত বাড়ল শুধু। প্রাণ বুঝল। দ্রুত পেপার এগিয়ে দিল বসের দিকে। তা নিতে নিতে প্রণয় আওড়াল,
–”স্মার্ট মুভ উন্নতি করতে হবে। জবান যেন স্পষ্ট হয়।
প্রাণ মাথা নিচু করল। ঘাড় নাড়িয়ে সায় দিল,
–”আই ইউল ট্রাই মাই বেষ্ট, স্যার.
„’অবশেষে চাকরিটা হলো প্রাণের। পায়ের নিচের ভীতটা যেন শক্ত মনে হচ্ছে এখন। বুকের ভার অবস্থা নেমে দুশ্চিন্তা মুক্ত লাগছে ওকে। খুব করে শোকর আদায় করল রবের নিকট। প্রফুল্ল চিত্তে আবার ডেস্কে ফিরে রিতাকে জানাল সব।
রিতা কাজ বুঝিয়ে দিলেন,
–”কাজটা সিম্পল। জাস্ট ফ্রন্ট ডেস্কে বসবে, কল ধরবে, টুকটাক অফিসের খোঁজ খবর কেউ জানতে চাইলে উত্তর করবে। পারবে?
প্রাণ অনুভুতির জালে ডুবে মাথা নাড়ল। সুস্থির শ্বাস নিয়ে বলল,
–”অবশ্যই পারব।
.
„‘বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেল। অর্ধেক বেলা রিতার সাথে সাথে থেকে দেখে নিল কেমন করে কাজ করতে হবে। কাজের দরুন বাড়ির কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিল প্রাণ। কিন্তু এখন সদর দরজার সামনে এসে ভয় জমল বুকে। মনে পরল রাতের রান্না করতে বলেছিল মা। দুরুদুরু বুকে দরজার নব ঘোরাল সে। দরজা খোলার শব্দে মনিরা চাইলেন সে পানে। ওত পেতে ছিলেন তিনি। প্রাণের ক্লান্তি ভাব টলাতে পারল না উনার রাগ। মেজাজি কড়া স্বরে ছোটালেন বাক্য বাণ,
–”নবাব বেডির আসার সময় হলো তবে! কোন নাগরের সাথে ছিলি এত রাত অবধি?
প্রাণ নজরান্দাজ করল তিক্ত কথাগুলো। তেমনই সংশয় পূর্ণ বুকে এসে দাঁড়াল মায়ের সামনে। বলতে ধরল,
–”আমি এক্ষুণি রান্না বসাচ্ছি।
প্রাণ উল্টো পা বাড়াবে ওর হাতে থাকা কাগজখানা চোখে পরল মনিরার। নিশ্চয় কোন কাজ পেয়েছে। গলা শক্ত হলো উনার,
–”আজ কাল দেখি তোর বড্ড সাহস বেড়েছে। কথা লুকাচ্ছিস আমার থেকে?
–”তা নয়..
–”তাহলে? তা আজ কত কাস্টমার পেলি? কাগজটায় লিস্ট রয়েছে বুঝি তার?
–”আম্মা, জবান সংযত করুন।
মনিরা ফট করে হাতে থাকা গরম চায়ের কাপটার সব চা ছুড়ে দিলেন প্রাণের দিকে। চায়ের তীব্র উত্তাপে মুখের একপাশ, গলা, ঘাড় পুড়ল ওর। মাথাটা যেন ঘুরে উঠল প্রাণের। পোড়া জায়গা টনটন করল জ্বলুনির ব্যথায়। আত্মচিৎকারে জানান দিল কতখানি কষ্ট! পাষাণ মনিরা আমলেই নিলেন না তা। বসা হতে উঠে দাঁড়িয়ে প্রাণের জ্বলতে থাকা গাল চেপে ধরলেন। গর্জন তুললেন কথায়,
–”রাত বিরেতে দেহ বেচে বেড়াস তা বললে আমার সাথে উঁচু গলায় কথা বলিস। ভালোই অধঃপতন হয়েছে দেখি। তোর রঙ্গলীলা তোর বাপকেও জানাতে হয়।
গাল চেপে ধরায় প্রাণের চিৎকার কমলো কিন্তু পোড়ার ক্ষত জ্বালা করায় গলা কাটা মুরগির ন্যায় ছটফট করে গেল সে। মিনতি করে গেল ছেড়ে দেওয়ার জন্য। অবাধ্য নোনাপানির ঢেউ নামল চোখ বেয়ে। মনিরা ওকে টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে ছোট্ট ঘুপরিতে ছুড়ে ফেললেন। দরজা লাগিয়ে দিয়ে বললেন,
–”আজ তোর রাতের খাওয়া বন্ধ।
মনিরা পৈশাচিক আনন্দ পেলেন প্রাণের আকুতি দেখে। দরজায় কান পেতে শুনতে পেলেন তীব্র ক্রোন্দন সুর, ব্যথাতুর গোঙ্গানি। তেমনই কণ্ঠে বললেন,
–”তড়পে তড়পে ম’র!
#লেখনীতে_নাহিদ_রহমান_
#চলমান________________________________________
