#_প্রণয়িনী_
#_শেষ_পর্বে__
#_কলমে_নাহিদ_রহমান_
হসপিটালের করিডর জুড়ে লোক সমাগমে পা ফেলার আর জায়গা নেই। প্রণয়ের গোটা পরিবার জাহানারা, মোস্তফা, লিপি, মাহিমা, পাভেল, পরাণ, পূর্ণা এসেছে। সবাই ছোট্ট বাবুকে নিয়ে ব্যস্ত। নাম ঠিক করা নিয়ে বেশ তর্ক জুড়েছে ভাই-বোন’রা। ভালো-মন্দ শুনে বয়সী’রা অভিমত রাখছে।
মোস্তফা চৌধুরী মকবুল সাহেবের সাথে কথা বলছেন। তিনি এটা-সেটা বলে নিজের সন্তানের প্রশংসায় পঞ্চমুখ! মকবুল শুনছেন। প্রথমে ইতস্তত ছিলেন যে ধনী গরিবের ভেদাভেদ করবেন কিন্ত না তিনি ভুল প্রমাণিত হলেন। মোস্তফার বড়ই অমায়িক ব্যবহার। মকবুলও কম না। প্রাণের গুণ গাইছেন।
প্রণয় কাজির সাথে আলাপে রত। কাগজপত্র তৈরি সহ নিজ সম্পত্তির বন্টননামা বানিয়ে নিচ্ছে। উকিল রয়েছে ওর সাথে। এদের কাজে কর্তৃপক্ষ সহ সাধারণ খুবই বিরক্ত। করিডরটা জ্যাম করে রেখেছে তার উপর কথার শব্দ দূষণ তো রয়েছে।
–”স্যার, প্লিজ বি কাইন্ড! শোরগোল কম করুন।
নার্স প্রণয়ের সামনে দাঁড়িয়ে অনুরোধ করল। প্রণয় কথা থামিয়ে চাইলো ভদ্রমহিলার পানে। তবে আমলে নিল না। নার্স হতাশ হয়ে ফিরে গেলেন। পরাণ এগিয়ে এসে বলল,
–”ভাইয়া, ওয়ালেট দাও।
প্রণয় এক বাক্যেই দিয়ে দিল। পরাণ হাতে নিতে নিতে বলল,
–”ভাবিমণির ডেলিভারি টাইমে যে নার্স ছিল উনার খোঁজ বের করো। আমি ততক্ষণে মিষ্টি নিয়ে আসি। তুমি ও না। সম্মানি পর্যন্ত দাওনি তাকে।
প্রণয় মনে মনে আফসোস করল। তখনই কানে এলো,
–”বাইরে এতো আওয়াজ কিসের?
প্রাণের ঘুম ভাঙ্গল। সেই জিজ্ঞেস করল দায়িত্ব রত নার্সকে। ওর শরীর খুব দূর্বল। প্রচুর র’ক্তপাত হয়েছে। এখন শরীরে বাড়তি ব্লাড পুশ করা হচ্ছে। প্রাণ কোমড়ের নিম্নাংশ অনুভব করতে পারছে না। চোখের দৃষ্টি ঘোলা। তার যখন পুরোপুরি ঘুম ঘোর কাটল তখন এক প্রকার চিল্লিয়ে উঠল,
–”আমার বাচ্চা! আমার সন্তান কই?
নার্স জবাব দিবে ঠিক সেসময় প্রণয় কেবিনে ঢুকল। কোলে তার আদুরে বেবি। প্রাণ আপ্লূত চোখে হাত বাড়িয়ে ধরল। প্রণয় আলতো করে যার নাড়ী ছেড়া ধন তাকে দিয়ে দিল। প্রাণের হাত কাঁপছে। সে সম্পূর্ণ আয়ত্বে বাচ্চাটাকে পেয়ে নিজ অংশের মুখ দেখে অঝোরে কেঁদে দিল। ঝুম বর্ষণ শুরু হলো চোখ জোড়ায়।
প্রণয় প্রাণের পাশে বসল। এক হাতে জড়িয়ে নিল রমণিকে। মায়ের কান্না দেখে বাচ্চাও কেঁদে দিয়েছে। প্রাণ উতলা হলো। ছেলের সারা মুখে চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিল। তবে কি মা, ছেলের কারোর কান্না থামল না। এতে প্রণয়ের বুক ভার হলো। নার্স বললেন এবার,
–”ম্যাম, বাবুকে ফিডিং করান।
প্রণয় নড়লো না। বরং নার্স যদি তাকে বাইরে যেতে বলে তাই আগে-ভাগে নিজেই বলে উঠল,
–”প্লিজ, এক্সকিউজ আস!
শালিক’দের একলা ছেড়ে দিল নার্স। প্রাণ অপ্রতিভ ভাবে ওড়না দিয়ে ভালো করে জড়িয়ে নিল নিজেকে সহ পুত্রকে। প্রণয় মুখ ফিরিয়ে রেখেছিল এবার তাকাল প্রাণের মুখে। চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল,
–”ছেলের নাম রেখেছি।
প্রাণ চুপ। প্রণয় কপাল জড়িয়ে ফের আওড়াল,
–”জানতে চাইবে না?
–”হুম।
ছোট্ট উত্তরে ঠোঁট প্রসারিত হলো প্রণয়ের। বলল সেই স্বরে,
–”প্রাণয় মাহমুদ চৌধুরী। আপনার প্রা, আমার ণয়। সুন্দর না?
–”অনেক।
প্রণয়ের হাসি বিস্তর বাড়লো। প্রাণকে নিজের দিকে আরও টেনে নিয়ে ওর কানের কাছে লঘু স্বরে বলল,
–”একটু পর আমাদের বিয়ে।
প্রাণ চমকে ঘাড় বাঁকিয়ে চাইলো। প্রণয় স্বল্প হেসে প্রাণের কপালে চুমু এঁকে দিল। ভালোবাসা ময় আশ্বস্ত পরশ ছিল তাতে। প্রাণ শিহরণে মূর্ছা গেল। বুকে দুরুদুরু মাদল বাজছে। প্রণয় পকেট হতে পেপার খানা বের করে প্রাণের সামনে ধরল। প্রাণ প্রশ্ন সূচক ব্যপ্তিতে এক হাতে নিয়ে সম্পূর্ণ পড়ল। সম্পত্তির হুইল করা এতে। প্রণয়ের ভাগের সবকিছু প্রাণয় সহ তার ভাই-বোন সমান ভাগে পাবে। সূদুর প্রসারি চিন্তা। বেহায়া উপাধি দিল প্রাণ। তন্মধ্যে প্রণয় বলে বসল,
–”আপনার ভাষায় মানুষ স্বার্থপর, লোভী। তাই বুড়ো বয়সে ছেলে যেন আমাদের দেখা-শোনা করে সেই লোভে এই কাজ করলাম।
প্রাণ ভাগ্যকে দেখবে সে আর কত ভাঙ্গবে তাকে। তাই বিলম্ব হলো না কাগজটা টুকরো টুকরো করে ছিড়তে। প্রণয় হা বোনে গেল। প্রাণ জনাবের তাজ্জব হওয়া মুখের দিকে চেয়ে বলল,
–”প্রত্যেক রুহ স্বয়ী রিজিক নিয়ে আসে নিজের সাথে।
প্রণয় আর কথা বাড়াল না। প্রাণয় ঘুমিয়ে গেছে। প্রণয় ছেলেকে কোলে নিয়ে দোলনায় শুইয়ে দিল। লিপি বাহির হতে অনুমতি চাইলেন,
–”আব্বা, ভেতরে আসি?
–”আসো আম্মু।
লিপি ত্রস্ত পায়ে ভেতরে এসে প্রণয়ের জায়গায় বসলেন। প্রাণ মাথা নামিয়ে রেখেছে। সালাম জানালো সেভাবেই। ওর লজ্জা নাকি অনুতাপ হচ্ছিল। সেদিন বড় মুখ করে কি সব বলে এসেছে। লিপি তর্জনি আঙ্গুল প্রাণের থুতনিতে ঠেকিয়ে ওর মুখ তুললেন। মৃদু হেসে বললেন,
–”ঘরে তুলছি। আমার মর্যাদা কিসে তা দেখিয়ে না দিয়ে মা’কে আপন করে নিও। চৌধুরী পরিবারের সম্মান তুমি।
প্রাণের মুখ লুকানোর জায়গা রইল না। নিভু নিভু পলক ঝাপটানি বেড়ে গেছে। লিপি হাসলেন। পার্স ব্যাগ হতে বক্স বের করলেন। খানদানি কাকন জোড়া পড়িয়ে দিলেন প্রাণের হাতে। বেশ মানিয়েছে। প্রাণ আড়ে আড়ে দেখছে স্বর্ণ চুড়ি গুলো। সুখানুভব ব্যক্ত করতে অপারগ রইল সে। চিকচিক করতে দেখা গেল চোখের কোল।
„বিয়ে পড়ানোর কার্যক্রম চলছে। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে সকলে। ফাসুর-ফুসুর করছে অপরের সঙ্গে। কেবিনে কাজির গলা উচ্চ রবে ভাসছে। উনার দুই পাশে দুই বেয়াই, মোস্তফা, মকবুল। তারা প্রতিত্তোরে সব কিছু বুঝিয়ে দিচ্ছেন।
রোগীর বেডে প্রাণের দু’দিকে জাহানারা আর প্রণয় বসেছে। প্রাণয় বাবার কোলে থেকে পিটপিট করে চেয়ে বুঝতে চেষ্টা করছে যে এসব কি হচ্ছে? মায়ের বিয়ে খাচ্ছে অথচ পিচ্চিকে কেউ জানালো না। না ইনসাফি এটা! তার পূর্ণ হক রয়েছে।
–”মা, বলেন আলহামদুলিল্লাহ কবুল।
কাজির কথার পিঠে প্রাণ বুক ভরে শ্বাস টানল। প্রণয়ের নিশ্বাস আটকে রয়েছে। দরুদ পাঠ করছে সে। প্রাণ নত মস্তকে স্পষ্ট ভাষায় পর পর তিন বার উচ্চারণ করল,
–”আলহামদুলিল্লাহ কবুল।
প্রণয়ের বুক জমিনে যেন উল্লাসি আনন্দ নৃত্য রত। ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয় তা। কি যে সুখ বিরাজ করছে মন অলিন্দে। ঝড়ে ঝড়ে পরছে হাসি। অবশেষে কাজির নির্দেশে প্রণয়ের কণ্ঠে ধ্বনিত হলো তিন কবুল। কাজি সাহেব রেজিষ্ট্রি পেপারে বর-বধূর স্বাক্ষর নিয়ে মোনাজাত ধরলেন। সকলে হাত তুললেন রবের দরবারে। অক্ষুণ্ণ থাকে যেন শালিক জুটি!
„খোশ-মেজাজিপনা প্রত্যেকের মধ্যে। কাজি চলে যেতেই সবাই ব্যস্ত হলো নববধূকে গিফট দিতে। এবেলায় এক দফা সেরে রাখবে। জাহানারা শুভ কাজ শুরু করলেন। নাক ফুল পরিয়ে দিলেন নাতি বউয়ের নাকে। প্রাণের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। প্রাণ গাইগুই করবে প্রণয় হাত চেপে ধরল ওর। বোঝাল চুপ থাকতে। প্রাণ আর পাল্টা জোর খাটাল না।
পূর্ণা নিজ গলার চেইন খুলে গলিয়ে দিল ভাবির গলায়। মাহিমা এগিয়ে এসে হীরের আংটি আঙ্গুলে পরাল। হুকুমের ন্যায় তামিল করল,
–”কখনো খুলবে না। আমার উনি নিজে পছন্দ করে দিয়েছে শ্যালক পত্নীর জন্য।
প্রাণ মিষ্টি লাজ হাসল। পরাণ লেডিস্ ওয়াচ গিফট করল। মোস্তফা, পাভেলও বাদ রইল না। বেচারি প্রাণ হাপিয়ে গেছে। অতঃপর, দম্পত্তির ফুরসত মিললো। সবাই ঘরে ফিরবেন। মকবুল স্ত্রী, ছেলেকে বাড়ি আনবেন তাই মেয়ের থেকে বিদায় নিলেন। প্রাণ আবার কেঁদে ভাসাল। রোজ আসতে বলল দেখা করতে। মকবুল মেয়ের চুলে চুমু খেয়ে সায় দিলেন।
কেবিন রুম গুমোট! প্রাণ নাক টানছে। মুখশ্রী বিষাদে ছেঁয়ে। প্রণয় ছেলেকে বউয়ের কোলে দিল। আরও গা ঘেঁষে বসল। প্রাণের মন অন্য দিকে ঘোরাতে দুষ্টু কণ্ঠে বলল,
–”সবার উপহার নিলেন এবার আমার পাওনা উপহার শোধ করে বাধিত করুন।
প্রাণ ভীষণ লজ্জা পেল। গাল দু’টো হায়ায় রাঙ্গা হলো। নয়নে উদয় হলো লুকোচুরি ভাব। চিত্তে নামলো বিবশতা। প্রণয় খুব বেহায়া হলো আজ। নিজেকে জাহির করল বড্ড অধৈর্যহীন।
.
যেতে যেতে পেরিয়ে গেল চার দিন। বিবাহ পরবর্তী সময়টা হসপিটালেই কাটলো প্রাণের। এখন সে পুরোপুরি সুস্থ। তবে ডক্টর চেকআপের উপর রাখতে বলেছেন। প্রণয়ের যত্ন, ভালোবাসায় জড়তা কাটছে। মনের দোটানা ভাব, চিন্তা দূর হচ্ছে। তাড়াহুড়ো নেই। প্রাণ মনস্থির হেতু নিজেও এখন গুরুত্ব দিবে এই সম্পর্ক’কে। একটু লোভী হয়েছে ওর দিল।
প্রাণ প্রণয়ের পাজা কোলে। তারা দাঁড়িয়ে আছে চৌধুরী নিবাসের চৌকাঠে। বধূবরণ চলছে। স্বপরিবার উপস্থিত এখানে। লিপি ছেলে, পুত্রবউকে মিষ্টি, পানীয় খাইয়ে দিয়ে বললেন,
–”ফ্রেশ হয়ে নিচে এসো। লাঞ্চ করব একসাথে।
ভঙ্গ হলো জটলা। প্রণয় বউকে বাহুডোরে নিয়েই রুমে গেল। পিছে ছিল পূর্ণা কোলে নিয়ে প্রাণয়কে। ভাতিজা তার বড়ই মিশুক। সবার কোলে উঠতে কোন নারাজি নেই জনাবের।
„পূর্ণা পিচ্চিকে বিছানায় শুইয়ে দিল। দরজা লাগিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেল। প্রণয় প্রাণকে নামাল। প্রাণ দেখল আজ কক্ষ ভীষণ গোছালো, পরিপাটি। বিস্মিত হলো খানিক। প্রণয় ছেলের শিয়রে বসে বলল,
–”নিন, রুমের সমস্ত কিছু মুখস্থ করে ফেলুন। জানেন তো আমি কেমন?
প্রাণ ফোস করে নিশ্বাস ফেলে কাবার্ড খুলে প্রয়োজনীয় পোশাক নিয়ে গোসল দিতে ঢুকল ওয়াশরুমে। শরীর ম্যাজ ম্যাজ করছে। হসপিটাল সরকারি বা প্রাইভেট হোক যায় আসে না, তাদের গন্ধ এক রকম।
প্রণয় ছেলের সাথে গল্পে মজেছে। প্রাণয় খুব চঞ্চল। আধা ঘণ্টা লাগিয়ে প্রাণ গোসল সারল। পরণে চকোলেট কালার সালোয়ার কামিজ। আজ আর ওড়না নেই গলায়। চুলে তোয়ালে পেচানো। স্নিগ্ধ লাগছে তাকে। প্রণয় কথা বলাই ভুলে গেল। মুগ্ধ চাহনিতে চেয়ে রইল। প্রাণয় ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে বাবার মুখে। এই ব্যাডা খেলছে না কেন?
প্রাণের চোখ কপালে উঠল। সাহসাই ধেয়ে উঠল ক্রোধ। রুমের এ অবস্থা কেন? যেন ঘূর্ণিঝড় বয়ে গেছে। বেডের পাশে রাখা ডাস্টবিন গলিয়ে ডায়পারের অর্ধেক বাহিরে ঝুলে আছে। গন্ধ ছাড়ছে তাতে। সোফার উপর নোংরা শার্ট, প্যান্ট। টি-টেবিলে মোজা, আন্ডার। কাবার্ডের পাল্লা খোলা। ভেতরের কাপড় লন্ড-ভন্ড। প্রাণের বিহ্বল গলা উঁচু শোনাল,
–”হায় আল্লাহ! এসব কি?
প্রণয় ধ্যান ফিরে পেল। ছেলের কপালে চুমু খেয়ে দাঁড়িয়ে গেল। সে তোয়ালে পড়ে আছে। বিছানা থেকে অপর তোয়ালে নিয়ে বলল,
–”আপনার গুণধর পটি করেছিল। আমি চেঞ্জ করে দিয়েছি ডায়পার।
মহৎ কাজ করেছে। প্রাণ নির্বাক। প্রণয় হেলতে দুলতে গেল ওয়াশরুমে। দরজা লাগানোর শব্দে প্রাণ সেপানে তাকিয়ে নাক শিকোয় তুলল। রোজ কি এসব সহ্য করতে হবে? ভেবেই অসুস্থ বোধ করছে সে। কান্না পাচ্ছে। অগত্যা প্রাণ রুমের দশা ঠিক করতে লাগল।
„প্রণয় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল সেট করছে। সীসায় প্রাণের দিকে চেয়ে বলল,
–”ঘুম আসছে না?
–”না,
প্রাণ ফিডিং করাচ্ছে কিন্তু ঘুম নেই পিচ্চির চোখে। খিদেও পেয়েছে ওর। প্রণয় পুনশ্চ বলল,
–”নিয়ে চলুন।
দুই শালিক প্রাণয়কে সাথে করে খেতে নামল। প্রাণকে সাদরে গ্রহণ করেছে সবাই। ডাইনিং জমজমাট। খাওয়ার ক্ষণটুকু উপভোগ্য! সকলের চপলতা, উল্লাসে মনোরম কাটল দুপুর।
.
„সপ্তাহ বাদ দিনটা শুক্রবার। সন্ধে সন্ধে লগ্ন। প্রাণ বায়না ধরল ফুচকা খাবে। প্রণয় কানেই তুলল না। সে জারি রাখল টাইপিং। আজ অফিস নেই জন্য বাড়িতেই রয়েছে সে। প্রাণ ছো মেরে নিয়ে নিল কোলে থাকা ল্যাপটপ। প্রণয় সরু নেত্র ফেলল বউয়ের উপর। শুধাল,
–”মাথার তার ছিড়েছে?
প্রাণ রাগে ল্যাপটপ বিছানায় ছুড়ে দিল। মুখ বাঁকা করে কক্ষ ত্যাগ করল। প্রণয় আশ্চর্য! এ মেয়েটা দিন দিন পাজি হচ্ছে। ফোন বের করল সে। আগে কথা শুনলে বাসায় বানাতে বলা যেত। এখন বাইরের ছাড়া খাবেও না প্রাণ। তার যেতে ইচ্ছে করল না। পরাণকে ফোন করে দশ মিনিটেই দিয়ে যেতে বলল ফুচকা। প্রণয় সোফা ছেড়ে বিছানায় বসে ডুব দিল ল্যাপটপে।
প্রাণ লিভিং রুমে এসে কাউচে বসল। আবেগী হয়েছে সে। অল্পতেই মুখ ভার করে। আসলে পরিস্থিতি মানুষকে পরিবর্তন করায়। তাদের সম্পর্ক মজবুত হয়েছে। এখন সবাই সবার কাজে মশগুল। একলা প্রাণ বিরক্তি নিয়ে গেল কিচেনে। লিপি নাস্তা বানাচ্ছেন।
প্রাণয় পূর্ণার কাছে জাহানারার রুমে। মাহিমা বোধহয় কলে স্বামীর সাথে প্রেম করছে। আর কে কই জানে না প্রাণ। ঠিক তখনই পরাণ ডাক পারল,
–”ভাবিমণি,
প্রাণ দৌঁড়ে গেল। দেবরের হাতে প্যাকেট দেখে খুশি হলো। রাগ পরল নিমিষেই। প্যাকেট নিজ হাতে নিয়ে বলল,
–”সবাইকে ডেকে আনুন।
–”ওকে.
পরাণ উত্তর দিতেই প্রাণ গলা উঁচালো,
–”মা, বাটি, প্লেট নিয়ে আসো।
হুকুম করছে দেখো! এভাবেই রাজ রাণীর হালে দিন কাটছে প্রাণের। লিপি বাসন নিয়ে এলেন। প্রাণ বেড়ে নিল ফুচকা। পরাণ বোনদের ডেকে আনলো। পূর্ণা প্রাণয়কে বাপের কাছে দিয়ে এসেছে। সন্ধ্যার নাস্তায় জমপেশ খানাপিনা হলো।
প্রাণ ঢেকুর তুলতেই গা গুলিয়ে উঠল ওর। হজম করতে পারল কই? মিনিট পেরুতেই দৌঁড় লাগাল। ডাইনিং বেসিন ভাসিয়ে দিল বমি করে। লিপি এসে ধরলেন ওকে।
খবর পৌছে গেল প্রণয়ের কানে। ছুটে এলো নিচে। ছেলেকে মাহিমার কাছে দিয়ে প্রাণকে কোলে তুলে নিল। রিস্ক নিবে না। ডক্টরের কাছে চলল। গোষ্ঠী সমেত সঙ্গ ধরল ওর। জাহানারা, পূর্ণা রয়ে গেলেন শুধু। বৃদ্ধা আবার এক কাঠি উপরে। ফোন করে বাকিদের জানালেন সংবাদখানা।
„সকলে চিন্তিত। করছে প্রতিক্ষা। মকবুল সাহেব উপস্থিত হলেন সস্ত্রীক। মনিরা স্বামীর ছায়া হয়ে রইলেন। অবশ্য কেউ উনাকে দেখেও দেখছে না। মোস্তফা হিম্মত দিলেন বেয়াইকে। চেম্বারে লিপি রয়েছেন প্রাণের সাথে। কাউকে আর অ্যালাউ করেনি। প্রণয় নিজে যায়নি। সে এসব নিতে পারে না। বেচারা কাঁদছেও। পাভেল সাত্বনা দিচ্ছে তাও যেই কি সেই।
সকলে মুমূর্ষু। এমন কান্না আরও ভয় ধরাচ্ছে। অবশেষে রুক্ষ স্বরে মকবুল ত্যক্ততা প্রকাশ করলেন,
–”এটা ছেলে না মেয়ে রে? দেখো, কেমন ফ্যাচ ফ্যাচ করে কাঁদছে! দয়া করে একে কেউ থামাও।
শশুরের কথায় রাগ উঠল প্রণয়ের। এখন বউয়ের জন্য একটু দুঃখবিলাশ পর্যন্ত করতে পারবে না? মুখ যথাশয় গম্ভীর করে মকবুলের সামনে দাঁড় হলো সে। আঙ্গুল তুলে গমগমে গলায় আওড়াল,
–”আমি পুরুষ না মহিলা আপনার মেয়ে ভালো জানে। রোজ রাতে কান্না করে দুধের ছেলেটাকেও জানিয়ে দেয় বাপের কুকীর্তি।
মকবুল আহাম্মক! হতবুদ্ধি ভদ্রলোক। বাড়ির মানুষ গুলোর কান দিয়ে ধোঁয়া ছুটছে। তারা এ কোন ঠোঁটকাটা ছেলেকে দেখছেন? পাভেল এগিয়ে এসে মামার কাঁধ চাপড়ে বাহবা দিল। গর্বে তার বুক ফুলে উঠছে। বাকি মাহিমা, পরাণ ঠোঁট টিপে হাসছে। ভাগ্নের দোয়ায় তাদের ভাই পেঁকে যাচ্ছে।
প্রাণের তেমন কিছুই হয়নি। সামান্য গ্যাস সমস্যা। ডক্টরের কাছে না এলেও হতো। ডক্টরের মুখে এ’কথা শুনে সকলে গাড়িতে গিয়ে বসল। চলেও গেলেন কেননা প্রাণের যেতে দেরি হবে।
মকবুল মেয়ের সাথে কথা বললেন। মনিরা কথা বলার জন্য সুযোগ খুঁজলেন কিন্তু প্রাণ তাকাল না অবধি। অবজ্ঞা করে গেল একেবারে। তার চেয়ে বেশি দাওয়াত করল মকবুলকে একা। মনিরা স্বাভাবিক রইলেন। পেটের মেয়ে নয়, যা কিছু করেছেন প্রাণ ক্ষমা করেছে এটাই শুকরিয়া।
প্রণয় জলদি বাড়ি ফিরল। প্রাণ ঘুমিয়ে পরেছে। গাড়ি থেকে কোলে নিয়ে সোজা রুমে গেল। কক্ষে পূর্ণা প্রাণয়কে ঘুম পাড়াতে পায়চারি করছে। বহুক্ষণ মাকে না পেয়ে পিচ্চি কাঁদছে খুব। প্রণয় বউকে শুইয়ে দিল। ছেলেকে কোলে নিয়ে বোন বেরিয়ে যেতেই লক করল ডোর।
প্রণয় ঘুম না ভাঙ্গিয়ে প্রাণকে এক হাতের সাহায্যে কাত করিয়ে ছেলেকে শুইয়ে দিয়ে সাহায্য করল ফিডিং করাতে। প্রাণয় বাবার দিকে চেয়ে খাওয়াতে মন দিয়েছে। প্রণয় হেসে উঠে প্রাণকে পেছন হতে জড়িয়ে ধরল। মাথা এগিয়ে ছেলের গালে চুমু খেল। বউয়ের কানের পিছে গভীর চুম্বন করে আওড়াল,
–”ভালোবাসি প্রাণ প্রণয়িনী!
(প্রাণ এবং তার ঘটনাবলিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। গল্পে ব্যবহৃত সংলাপ, উক্তি, মন্তব্য কাউকে ছোট বা নিচু করে দেখানো উদ্দেশ্য নহে। হ্যাপি রিডিং…..)
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
….._–সমাপ্ত–_…..
