#_প্রণয়িনী_
#_১৫_তম_পর্বে__
প্রণয় বড়ই ব্যথিত হলো। রব প্রণয়ের কোন কালের পাপের ফল এখন ভোগ করাচ্ছেন একমাত্র তিনিই জানেন। ওর রুদ্ধ জবানে কোন শব্দগুচ্ছ এলো না প্রকাশ করার মতো। চেয়েই রইল প্রাণ প্রণয়িনীর আদলে। সে মেয়ের খাওয়া ছাড়া ধ্যান-জ্ঞান নেই অন্য কিছুতে।
প্রাণ পুরো মিষ্টি টোস্ট এর প্যাকেট শেষ করল। প্রণয় গ্লাসে পানি ঢেলে বাড়িয়ে ধরল। প্রাণ পানি পান শেষ করতেই প্রণয় গামছা এগিয়ে দিল। প্রাণ তা নিয়ে মুখ, হাত মুছল। প্রণয় কাষ্ঠ হেসে ফোরণ কাটল,
–”সবসময় দূর-ছাই করেন আবার দেখ-ভাল করার বেলায় ঠিকই রোগী বোনে যান।
–”দেখাতে স্বেচ্ছায় করছেন, ইগনোর করি কিভাবে?
এতক্ষণে মুখ খুলল প্রাণ। কিন্ত কথাটা তীরের মতো গিয়ে বিঁধল প্রণয়ের বুকে। জর্জরিত হলো তার মন কুঠির। সেকি দেখানোর জন্য এসব করছে? মন থেকে ভালোবেসে করছে। প্রণয় হৃদয়ে চিনচিনে ব্যথা অনুভব করল। কর্কশ কণ্ঠে বলল,
–”আমার অনুভূতিকে আপনার সম্মান করা উচিত।
প্রাণ চিৎ হয়ে শুয়ে পরল। কানেই তুলল না। প্রণয় কষ্টায়িত মন নিয়ে নিজের বালিশ তুলে প্রাণের পায়ের নিচে দিল। প্রাণ চোখ খুলল, যখন প্রণয় পায়ের কাছে বসল ওর তড়িৎ প্রশ্ন,
–”কি করছেন কি?
প্রণয় এবার সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করল প্রাণকে। সে সুধীর হস্তে প্রাণের পা টিপে দিতে শুরু করল। প্রাণ পা সরিয়ে নিবে প্রণয় সাহসাই গর্জে উঠল,
–”বাড়াবাড়ি করলে আমিই আপনার ক্ষতি করব।
ভ্যাবাচেকা খেল প্রাণ। শান্ত ছেলের হঠাৎই বিপরীত রুপে হওয়ারই কথা। তার কথা তাকেই ফিরিয়ে দিল। সে অপ্রতিভ হলো। নির্নিমেষ চোখে চেয়ে রইল প্রণয়ের দুঃখগ্রস্থ বদনে।
প্রণয় নিজ কাজ করে যাচ্ছে। তাকাচ্ছে না অবধি প্রাণের দিকে। সে সারাদিন পাগলের ন্যায় ছুটে বেড়ালো, ছলচাতুরী করে প্রাণকে কাজে নিয়োগ দিয়েছে, হাত জখম করেছে, নিবিড়কে রাস্তা হতে সরিয়েছে, প্রাণ তার কোন জিনিস নেয় না সেজন্য মকবুল সাহেবকে খোঁজ করে উনাকে মেয়ের দুর্দশা জানিয়েছে। ভদ্রলোক এখন মেয়ের দায়িত্ব নিয়েছেন। এর পেছনে তো কলকাঠি নেড়েছে প্রণয়। অবশ্য কিছু প্রাণের অজানা তাই বলে সে এগুলো লোক দেখাতে করেছে? ভাবতেই প্রণয়ের মুখ শক্ত হয়ে আসছে। নাকে তপ্ত বায়ুর আসা যাওয়া বাড়ছে।
পরম আবেশে প্রাণের চোখ আপনাই বুজে গিয়েছিল এখন নিশ্বাস ঘন হয়েছে ওর। নিশ্চিন্তে পাড়ি জমিয়েছে ঘুমের দেশে। প্রণয় হাতের কাজ থামাল না। শুধু তাকাল মনরমণির পানে। কি নিষ্পাপ সুশ্রী! এখন শান্ত নহর যেন! কত না মায়ামোহ লেপ্টে রয়েছে সেথায়। প্রণয়ের চাহনিতে মুগ্ধতা ছেঁয়ে গেল। সে পুরুষ কিভাবে এই পুতুল’কে কষ্ট দিতে পারল? সে আদেও পুরুষ ছিল? প্রণয় ক্ষোভে ফেটে পরল।
„আযানের ধ্বনিতে মুখর হলো চারিপাশ। রাতের আঁধার কেটে দিগন্ত জুড়ে সূর্য উকি দিচ্ছে। এদিকে দেখায় ভাটা পরল প্রণয়ের। হাতের কাজ থামিয়ে দিল সে। তাকে যেতে হবে এখন। প্রণয় দাঁড়িয়ে গিয়ে টেবিলে রাখা ফোন তুলে কল লাগাল পরাণকে। রিসিভ হলে জানাল তাকে নিতে আসে যেন।
প্রণয় শিয়রে দাঁড়িয়ে প্রাণের কপালে প্রগাঢ় চুম্বন বসাল। গভীর থেকে গভীর আদর মাখিয়ে দীর্ঘ করল পরশটুকু। কি শীতলতা নামলো বুকে। প্রণয় মুখ দু’ ইঞ্চি উপরে উঠিয়ে চোখ স্থির করল প্রাণের আননে। বাম হাত তুলে ওর মসৃণ গালে বৃদ্ধাঙ্গুল দ্বারা আলতো করে বুলিয়ে দিতে দিতে আওড়াল,
–”নিজেকে আবডালে রাখছি কিন্তু আপনাকে মনের আড়াল করছি না। আমার আপনি’টার খেয়াল রাখবেন।
নিদারুণ পুড়ছে মন অলিন্দ। হাহাকার উঠেছে সেখানে। প্রণয়ের আবার সব এলো-মেলো লাগছে। প্রাণের সান্নিধ্যে কথার আঘাত পেয়েও এত তুমুল মর্মপীড়া বোধ হয়নি। প্রণয় আর থাকল না। দরজা টাইট করে ভিড়িয়ে দিয়ে প্রস্থান নিল।
„প্রণয় অপেক্ষায় রত। রাস্তায় দাঁড়িয়ে স্মোক করছে। এই বেলায় শেষ খাওয়া। আবার আগের অভ্যাসে ফিরতে হবে ওকে নচেৎ প্রাণ তাকে বখাটে ভাবা থামাবে না। সে অহরহ বিড়ি টানে না। দিনে দুই, একটা। কোন দিন ব্যস্ততার চাপে খাওয়া হয়ে উঠে না। প্রাণকে মনে ধরার পর খুব মানষিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে ও, তাই স্মোক করা বেড়েছে।
পরাণ এলো যথা সময়ে। গাড়ি থেকে নেমে গিয়ে দাঁড়াল বড় ভাইয়ের পাশে। তার মলিন শ্রী খানা দেখে আর ঠাট্টা করার সাহস পেল না। রয়ে-সয়ে জিজ্ঞেস করল,
–”ভাইয়া, তুমি ড্রাইভ করবে?
–”আসতে দেরি হলো কেন? গরুর গাড়িতে আসলি বুঝি!
প্রণয় ছোট ভাইয়ের উপস্থিতি টের পায়নি। নিজ ধ্যান বিভোর ছিল। সে প্রশ্ন শুনে তাকিয়ে পাল্টা রোষ পূর্ণ গলায় বিক্ষেপ ঝাড়ল। পরাণ বড় ভাইয়ের কাঁধ ধরে তাকে গাড়ির ফ্রন্ট সিটে উঠাল। বুঝল কিছুই ঠিক হয়নি, তাই প্রণয়ের এই কড়া মেজাজ। এমতাবস্থায় ওকে ড্রাইভ করতে দেওয়া বোকামি।
প্রণয় মাথার চুল খামচে ধরল। মানস্পটে ভেসে উঠছে প্রাণের শূণ্য দৃষ্টির ভাষা। ব্যথিত গলায় বলে উঠল,
–”প্রাণ আমাকে একটুও চায় না। আমাকে তার পদতলে রাখতেও নারাজ। আমি আর কি করে তাকে পাব, ভাই? উনাকে ছাড়া আমার যে গতি নেই।
পরাণ ড্রাইভিং এর ফাঁকে বিয়োগান্তক দৃষ্টিতে একপল তাকাল প্রণয়ের পানে। ওর হৃদয় ভেঙ্গে এলো ভাইয়ের মুষড়ে পড়া দেখে। সে কি বলে সাত্বনা দিবে ভেবে পেল না। জোর- জবরদস্তি করে তো আর কারো মনের মানুষ হওয়া যায় না।
সকাল বেলা। জগিং করা লোক ব্যপক। কিছু চায়ের দোকান এখন রমরমা। নিউজ পেপার বিলিকারীর হাক-ডাকে ব্যস্ততা দেখা যাচ্ছে। পরাণ রাস্তার পাশে টি-ষ্টোল এর সামনে গাড়ি দাঁড় করাল। নেমে গিয়ে ভাইয়ের পাশের দরজা খুলে প্রণয়ের বাহু ধরতেই প্রণয় লাল চোখে চাইলো। সেথায় প্রশ্ন লেপ্টে।
পরাণের হাতে টি-শার্ট। বড় ভাইয়ের দশা দেখে তারও খারাপ লাগছে। সে প্রণয়কে দ্রুত টি-শার্ট পড়িয়ে দিতে দিতে বলল,
–”চলো, চা খাই। রিফ্রেশ হবে তুমি। নিরাশ হয়ো না। জানোই তো– আল্লাহ তায়ালা কারো মেহনত বিফলে যেতে দেয় না। যেখানে তোমার চাওয়া পবিত্র, ধৈর্য ধরো সুখ তোমার হবেই।
প্রণয় এক রবের মহিমায় সর্বদাই বিশ্বাস রাখে। ওই যে ভয়! মানুষের মন তো, ভয় থাকবেই। সে স্মিত হাসি হেসে পরাণকে হাগ করল। পরাণ স্নেহ ভরে ভাইয়ের পিঠ বুলিয়ে দিল। অতঃপর, দুই ভাই এগোল সামনের দোকানে। কিন্তু পা জোড়া থামাতে হলো ওদের। প্রণয় রাগান্বিত চোখে চাইলো পরাণের মুখে। তার বিষন্ন মুড আরও খারাপ হলো। পরাণ সামনেই তাকিয়ে আছে। সাহসাই প্রশ্ন ছুড়ল,
–”এরা এখানে কি করছে?
দোকানের সামনে মনিরা বেঞ্চে বসে আছেন। মোহন পায়চারি করছে সঙ্গে ফোনে কাকে যেন ট্রাই করছে। পরাণ ফের বলে উঠল,
–”আপদ গুলো কি সারারাত রাস্তাতেই ছিল? এই মা-ছেলে আবার কোন ঘোট পাকাচ্ছে না তো?
–”যা, ওদের থেকে শুনে আয়। বাল, তোর মাইন্ড ফ্রেশ করার চক্করে আমার মগজ আরও তেতে গেল।
প্রণয়ের শক্ত কথার জবাব শেষ হতেই চৌধুরী সহদর’রা একে অপরের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে মোহনের দিকে নিক্ষেপ করল। অচিরেই তাদের ব্রহ্মতালুতে ধেয়ে উঠল উষ্ণ র’ক্ত। মোহনের ছিল ক্ষ্যাপাটে বাক্যবাণ,
–”আমি ওই মা’গীরে মেরে ওর’ই র’ক্তে গোসল দিব। কুত্তিটা ভোলাভালা সেজে আমাদের পথের ফকির বানিয়ে ছাড়ল।
–”আহ, মানুষ জনের কানে যাবে।
মনিরা ছেলেকে টোকতেই মোহনের গালে দর ঘুষি পরল। রাতে মার খেয়ে গাল ফুলে উঠেছিল। পুনরায় একই স্থানে প্রণয়ের প্রহারে দাঁত র’ক্তে রঙিন হলো। মোহন কাত হয়ে মাটিতে আছাড় খেল। চোখে সব ধোঁয়া ধোঁয়া দেখছে।
মনিরা ভরকে গেছিলেন, যখন প্রণয়কে দেখল নিজেকে আর শান্ত রাখতে পারলেন না। তিনি গরম করে দিলেন প্রণয়ের কান। ভদ্রমহিলার থাপ্পড় খেয়ে দুই ভাই কিংকর্তব্যবিমূঢ়! তাদের মূর্ত ভাব কাটল মনিরার ধারাল কণ্ঠে,
–”রাত ভর নোংরামি করিস আর দিনের বেলা হম্বিতম্বি। তোকে তো আজ আমিই দেখে নিব।
প্রণয় চোয়াল পিষে মনিরার চড় মারতে উদ্যতি হাত আটকে নিল। এই ফকিন্নি তাকে থাপ্পড় মারল? আশে-পাশের সবাই হা হয়ে তামাশা দেখছে। প্রণয় হিসহিসিয়ে বলল,
–”তোর সব ইঙ্গিত ওই দিকে যায় কেন? নষ্টা মহিলা।
প্রণয় আজ স্বভাবে সংযম, ভদ্রতা, নম্রতা ভুলে গেছে। মানুষ আসলে বিক্ষিপ্ত মেজাজে থাকলে বিক্ষুব্ধ আচরণ করে। তার বহিঃপ্রকাশ প্রণয়ের এই হিংস্রতা। উনাকে আরও ঝাড়বে মোহন উঠে এসে প্রণয়ের কলার ধরল। প্রণয় মনিরাকে ছেড়ে দিয়ে উল্টো ঘুরে ধাক্কা দিল মোহনকে। হুকুমের ন্যায় তাগাদা দিল,
–”ভাই, পুলিশ কমিশনার সাহেবকে ফোন কর। এই জানোয়ারের নামে মা’র্ডার কেস, রে’প কেস, সম্পত্তি আত্মসাৎ, ড্রা’গ সাপ্লায়ার, মানহানীর মামলা কর।
পরাণ তাই করল। ভাইয়ের আদেশ স্বীরধার্য। মনিরার মাথায় মুহুর্তেই আকাশ ভেঙে পরল। হায়, হায় করে উঠলেন তিনি। সাপের লেজে পা দিয়েছে ছোবল তো খেতেই হবে। মনিরা প্রণয়ের কাছে হাত জোড় করে মিনতি করবেন প্রণয় চিবিয়ে উঠল,
–”দূরে সর, দূরে সর। একদম কাছে আসবি না।
প্রণয় মোহনের উপর চড়াও হলো। এলোমেলো লাথি, গুড়ি, ঘুষি মেরে মেরে মনের ঝাঝ মেটাতে তৎপর হলো। তাকে দেখে বোঝা যাচ্ছে অন্যের রাগ মোহনের উপর ঝাড়ছে। হবে বোধহয় প্রাণের অবজ্ঞা। প্রণয়ের গলায় সুতীব্র ক্রোধ,
–”তোদের বলি নাই প্রাণের কোন ক্ষতি করবি না। তাকে তার মতো থাকতে দিবি। বলিনি– আমি প্রাণকে বিয়ে করলে বাড়ি তোদের নামে করে দিব। রাতে তাও কেন উনাকে কষ্ট দিতে গিয়েছিলি। বল কুত্তা, বল।
–”ভুল হয়ে গেছে, ভাই। মাফ করে দিন।
মোহন প্রাণ বাঁচানোর ভয়ে আকুতি জানালো। ছেলের পিঠে মনিরাও অনুনয়-বিনয় করে গেলেন,
–”হ্যাঁ, হ্যাঁ বাবা। আমাদের ভুল হয়ে গেছে। আসলে রাগের বশে মাথা ঠিক ছিল না তখন। আমরা এমন স্পর্ধা কখনো করব না। আমি তোমার মায়ের মতো। অন্তত মায়ের এ’টুকু অনুরোধ রাখো। আমি তোমার পায়েও পরছি।
–”মায়ের মতো? মা নামের কলঙ্ক আপনি।
প্রণয় মার থামিয়ে তাচ্ছিল্য ভরে উপহাস করল। মনিরা পরাভৃতের ন্যায় মাথা নুইয়ে ফেললেন। মিছে ভাবপ্রবণ দেখিয়েও কার্য সিদ্ধি হলো না। প্রণয় সরে দাঁড়াল। গা ঝাড়া দিয়ে পুনশ্চ আওড়াল,
–”প্রাণ তো আপনারই মেয়ে। আপনার স্বামীর অংশ। গর্ভে ধরলেই শুধু মা হওয়া যায় না। অবশ্য আপনার গর্ভ নিজ দোষে কলুষিত করছেন। মা হয়ে সন্তানকে মানুষ করতে পারেননি।
মনিরা নির্বাক হলেন। ইনচার্জ ইসহাক ফোর্স সমেত হাজির। প্রণয় উনার সাথে করমর্দন সারলো। সবিস্তরে সব জানাতেই ইসহাক বললেন,
–”স্যার, থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ করতে হবে।
–”ওকে. আমি আমার উকিল পাঠিয়ে দিচ্ছি। তিনি সমস্ত ফর্মালিটিস দেখে নিবেন। কো-অপোরেট করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
ইসহাক সামান্য হাসলেন। ফিরতি কথাও পেশ করলেন। প্রণয় হ্যান্ডশেক করল। মোহন, মনিরাকে গাড়িতে তোলা হচ্ছে। প্রণয় তাদের পাশে গিয়ে বলল,
–”এবার যদি আপনাদের সুবুদ্ধির উদয় হয়। তবে আমি ছাড়ছি না আপনাদের। এক থাপ্পড়ের পরিণাম জীবন ভর ভোগ করাব। ভদ্র ব্যবহার আপনাদের ধাতে নেই। ছোটলোক কিনা! শুকনো কথাকে ভেবেছেন মিথ্যে বুঝ দেওয়া। ভালো থাকবেন।
মনিরা, মোহন এখনো আহাজারি করে যাচ্ছে। তাদের আর বুঝতে বাকি নেই কি দুর্দশা হতে চলেছে তাদের সাথে। লোভী হয়ে ভুলেই বসেছিল ক্ষমতাধর’দের পিছনে লাগতে নেই।
পরাণ নিরব দর্শক। যাক অবশেষে তার ভাইয়া ক্ষমতার অপব্যবহার দেখাল। আগে তো বিনীত ভাবে মনিরাকে বুঝিয়েছে যেন নিজেদের যা আছে তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে। এই জন্য মাহিমা আপু রাগ করেছিল কেন তাদের ছেড়ে দিল। শাস্তি হওয়া দরকার। আসলেই অত্যাচারীকে ছাড় দিতে নেই।
প্রণয় আবার তা চায়নি। অনেক যুক্তি দেখিয়ে বড় বোনকে বুঝিয়েছিল প্রাণ নাকি কষ্ট পাবে। সেই তো গিরগিটি আপন রঙ পাল্টে ফেলল। কুত্তার লেজ কি সোজা হয়? এসব মনে চেপে উদ্বেগ নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
–”প্রাণ আপুকে জানাবে? তিনি তো কিছুতেই মানবেন না।
প্রণয় ভ্রু জোড় করে ভাইয়ের আননে তাকাল। তার স্বরে বলল,
–”আপু কি? ভাবিমণি ডাকবে।
পরাণ ঘাড় দোলালো। বোঝাল আর ভুল হবে না। প্রণয় ফের চাইলো সামনে। বলল,
–”প্রাণের চারপাশের কাটা সাফ। এখন শুধু ফুলকে আমার বুক জমিনে আজীবনের তরে রোপন করা বাকি।
বেশি, বেশি রেসপন্স করবেন। হ্যাপি রিডিং…..
#কলমে_নাহিদ_রহমান_
#চলবে_________________________________________
#_প্রণয়িনী_
#_১৬_তম_পর্বে__
প্রাণের ঘুম ভাঙ্গল। ঢাকা শহরের সকাল সেই একঘেয়ে। চারিদিকে শব্দ দূষণ, তীব্র কোলাহল আর শহুরে গন্ধ যুক্ত বাতাসে নাভিশ্বাস! প্রাণ বিছানা হতে নেমে দরজা বন্ধ, রুম ফাঁকা দেখে সস্থির শ্বাস ফেলল। যাক প্রণয় তাহলে চলে গেছে! সে রুম সাফ-সাফাই করতে ধরল। কাজের মাঝে বকা-ঝকা কম করল না। প্রণয় এক রাতেই কক্ষ ভাগাড় বানিয়ে ফেলেছে। বড্ড অপরিচ্ছন্ন লোকটা! প্রাণের গলা দিয়ে অতিশয় মন্দ ভাব প্রকাশ পেল,
–”গ্যাদর!
প্রাণ হাফ ছাড়ল এতক্ষণে। পুরো কামড়া ঝকঝকে পরিষ্কার। আধা ঘন্টার পরিশ্রমে এখন বসবাস উপযোগী লাগছে। প্রাণ প্রতিজ্ঞা করল প্রণয় তার বাড়ি এলে রুমেই ঢুকতে দিবে না। ওর মনে পরল প্রণয় তাকে আর বিরক্ত করতে আসবে না।
প্রাণ গামছা কাঁধে চাপিয়ে ব্রাশে পেস্ট লাগিয়ে নিল। পোশাক এবং বালতি নিয়ে দরজা খুলতেই মুখের রঙ আঁধার হলো। রাগান্বিত কণ্ঠে ঠেলে বেরিয়ে এলো,
–”আপনি?
প্রণয় হাসি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে। স্বাভাবিক তার চিত্ত গড়ন। কালো রঙের ফর্মাল সাজ। স্যুট-ব্যুট পড়ে যেন অফিসে এসেছে। আদলে সজীবতা! প্রফুল্লতা লেপ্টে চোখ জোড়ায়। চুলের পানি এখনো শুকায়নি। বোঝা যাচ্ছে তাড়াহুড়ো করে এসেছে। প্রণয় জবাবে বলল,
–”জি, আমি। সরুন দেখি।
–”না। আপনার কি গন্ডারের চামড়া? রাতে যে বললাম আমাকে বিরক্ত করবেন না। তাও চলে এসেছেন?
প্রাণের কাঠিন্য হেতু প্রণয় আকাশ থেকে পরল এমন ভাণ ধরল। তেমনই স্বর,
–”আমি কোথায় বিরক্ত করতে এলাম? আপনার যত্ন করছি। এই যে খাবার নিয়ে এসেছি।
প্রণয় প্যাকেট গুলো প্রাণের মুখের উপর ধরল। ফের বলল,
–”আমি অশিক্ষিত নই। আপনি বলেছেন বিরক্ত না করতে, কিন্তু যত্ন করতে তো মানা করেননি। খাবার খেয়ে আপনাকে অফিসে পৌছে দিব, আবার অফিস থেকে বাসায় ড্রপ করে দিব। এগুলোকে কি বিরক্ত করা বলে?
প্রাণের আক্কেল গুড়ুম! ব্যাক্কল বোনে গেছে সে। কি যুক্তি পেশ করল ওর শর্তের উপর। প্রণয় বাঁকা হাসল। বেশ জব্দ করতে পেরেছে। সে প্রাণের পেলব বাহু ধরে দরজা হতে সরিয়ে দিয়ে টুপ করে রুমে ঢুকে পরল। প্রাণ থতমত দশা সামলে খেকিয়ে উঠল,
–”আপনি কথার বরখেলাপ করছেন!
–”বাহ রে! সে হিসেবে তো আপনিও মিথ্যুক হচ্ছেন।
প্রণয় খাবারের প্যাকেট পড়ার টেবিলের উপরে রাখল। তখনই নজরে পরল নিউজপেপার খানায়। হেড লাইনে বড় বড় করে চাকরির বিজ্ঞপ্তি ছাপা। প্রণয় তা হাতে তুলে নিয়ে প্রাণের দিকে ফিরল। প্রাণের আনন চাপা রাগে রাগান্বিত। শ্রী ঈষৎ রাঙ্গা! ওর গলবিল অবধি বিষ তেঁতো ঠেকছে। প্রণয় ভ্রু নাচিয়ে শুধাল,
–”চাকরি খুঁজছেন? তা ভালো, মনে একটু ভয় থাকা উচিত।
‘নাদান মেয়ে! ভেবেছে থাপ্পড়ের জন্য তাকে বরখাস্ত করা হবে। আমি তাকে হৃদয়ের দখল দিতে চাই, আর উনি সামান্য চাকরির ভয় পাচ্ছেন। ইন শাহ আল্লাহ, একদিন সিইওর চেয়ারে আসীন হবেন আপনি।
প্রণয় ভাবনা নিমিত্তে উথিত দীর্ঘশ্বাস বুকে দমিয়ে নিয়ে ঠোঁটে গা জ্বালানি হাসি টেনে তাড়া লাগাল,
–”কি হলো? জলদি গোসল সেরে আসুন। অফিস যেতে দেরি হচ্ছে তো। আমি আপনার স্যালারি কাট করে নিব কিন্তু।
প্রাণ ধরাম করে দরজা লাগিয়ে দিল। কি’বা বলার আছে আর। অপমান, অপদস্ত, হেয় কোন কিছুর কমতি রাখেনি করতে। থাপ্পড় পর্যন্ত দিয়েছে শুধু লাথি উষ্ঠা’টাই যা বাকি। পাথেয় জীবনে সংগ্রামী হোক, কঠোর মনের হোক যে পুরুষ একবার পেছনে লেগেছে তাকে আটকানোর সাধ্যি নেই মেয়েদের। প্রথমে বাস্তবতার দোহাই পিঠে মনকে হয়তো বুঝ দিবে কিন্তু একসময় ঠিকই মন নরম হয়। মেয়েদের কোমল রুপেই সৃষ্টি করা হয়েছে। এর মাঝে কেউ পুরুষকে ব্যবহার করে, কেউ অসীম ভালোবেসে ফেলে। তদ্রূপ পুরুষও!
প্রণয় পেপার জানালা দিয়ে বাইরে ফেলল। মহৎ কাজ করে সিংগেল বেডে গা এলিয়ে দিল। গোসল দিয়েও শরীর ম্যাজ- ম্যাজ করছে। ঘুম পাচ্ছে তার। না, ধ্যান ঘোরাতে প্রণয় ফোন বের করল। পায়ের উপর পা তুলে রত হলো ফোনে। কয়েক মিনিট পেরুতেও আরাম বোধ পেল না। মাথার নিচে ভেজা লাগছে। ব্লেজার’টাকে বস্তা মনে হচ্ছে ওর নিকট।
প্রণয় উঠে বসল। পেছনে তাকাল। এই রে বালিশ ভিজে গেছে তার চুলের পানিতে। পরোয়া নেই। সে দাঁড়িয়ে গিয়ে গায়ের কোট খুলে বিছানার কোণায় রাখল। পায়ের মোজা খুলে মেঝেতে ফেলল। এগিয়ে গিয়ে কাপড় রাখার র্যাক হাতড়ে প্রাণের ওড়না বের করল। গোছানো তাক এলোমেলো হলো এতে। সেটা দিয়ে ভালো করে মাথা মুছে নিল। গামছা তো প্রাণ নিয়ে গেছে। প্রণয় এবার সন্তুষ্ট মনে ফের শুয়ে পরে মনোনিবেশ করল ফোনের গেইমে।
„যথারীতি প্রাণ লম্বা সময় নিয়ে গোসল দিয়ে ফিরল। কিন্তু রুমে ঢুকে হতভম্ব হলো ও। এটা কক্ষ না আস্তাবল? প্রাণের অতিষ্ঠ গলা,
–”প্রণয়,
–”হুমম,
লম্বা টান। প্রণয় উল্টো ত্যক্ত গেইমের মাঝে বিরক্ত করায়। প্রাণ সবেগে এসে ফোন কেড়ে নিল। প্রণয় কুচকে যাওয়া আননে চাইলো মনরমণির পানে। প্রাণ হাত দিয়ে তার ভেজা ওড়না, শকস, ব্লেজার, কাপড়ের র্যাক সব দেখিয়ে দিয়ে বলল,
–”এসব কি?
প্রণয় সবটা দেখেও নির্বিকার। পাল্টা বলে,
–”নিন, নিন। খাবার বেড়ে দিন। আমি আপনার সঙ্গে খাবো জন্য বাসায় খাইনি।
–”সব জিনিস জায়গা মতন রেখে দিন।
–”আপনি আমাকে দিয়ে কাজ করাবেন?
প্রণয়ের অতি আশ্চর্য কণ্ঠ। প্রাণ কি ব্যপ্তি জানাবে ভেবে পেল না। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে খাবার বাড়তে লাগল। এদিকে প্রণয়ের আফসোস পূর্ণ কথা,
–”আমাকে লেভেলটা ফুলফিল করতে দিলেন না।
–”ছুতো পেয়ে গেলেন তো?
–”ইউ আর সো ইন্টেলিজেন্ট!
প্রাণ আদল ততোধিক জড়িয়ে নিল। তার তো ইচ্ছে করছে তরকারির ডিব্বাটা বদমাশটার মাথায় ঢেলে দিতে। কানা- ঘুষো শুরু হয়ে গেছে তাকে নিয়ে। সে গোসলে ঢুকে বাইরে অনেকের গলা শুনতে পেয়েছে। এই ভয়টাই পাচ্ছিল প্রাণ।
প্রণয় বাবু হয়ে বসে রয়েছে। ফোনে গেম খেলতে মগ্ন। প্রাণ গিয়ে জনাবের পাশে বসল। ইতস্ত বিক্ষিপ্ত মনে চুপচাপ খাইয়ে দিতে লাগল প্রণয়কে। মধুর দৃশ্য! এক কাঙ্গাল প্রেমিক সর্ব আমলে নিযুক্ত ঠকে যাওয়া নারীর মন জয় করতে।
„প্রাণ দরজায় তালা লাগিয়ে ঘুরল। প্রণয় হাতের ব্লেজার ওর দিকে বাড়িয়ে ধরে বলল,
–”পড়িয়ে দিন।
–”হাতেই রাখুন। সেই তো গাড়িতে গিয়েই উঠবেন।
–”কাজ আছে।
অগত্যা প্রাণ পরিয়ে দিতে লাগল। অনেকেই তাদের ডোর লক করার ফাঁকে আড়ে আড়ে শালিক’দের দেখছে। তারাও কাজে বের হচ্ছে। প্রণয়ের পরিধান শেষ হতেই সে চট করে প্রাণকে পাজা কোলে তুলে নিল। প্রাণের রুহ ছলকে উঠেছে। নিজেকে সামলে নিতে এক হাতে প্রণয়ের গলা জড়িয়ে ধরল। লম্বা শ্বাস ছাড়তেই প্রণয় আওড়াল,
–”ভালোবাসি।
প্রাণের চোখ জোড়া বড় বড় হলো। শিউরে উঠল সর্বাঙ্গ। যতবার প্রণয়ের মুখে এই প্রেমময় চার শব্দ শোনে ততবারই এরুপ বেচাইন নামে ওর মনকুঠিরে। প্রণয় গলা উঁচালো,
–”বউ হয় আমার। ঝগড়া হয়েছে আমাদের। প্রাণের মা নেই, বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেছে জন্য বাপের বাড়ি না গিয়ে এখানে এসে উঠেছে। আমি বারে বারে বউয়ের রাগ ভাঙ্গাতে আসছি।
আর বলার প্রয়োজন নেই। পড়শী’রা এতেই তিলকে তাল বানিয়ে দিবেন। প্রাণ বিস্মিত! হা হয়েছে ওর পীবর ঠোঁট দ্বয়। প্রণয় পা চালিয়ে প্রাণের উদ্দেশ্যে নিচু কণ্ঠে বলল,
–”আমাদের নিয়ে রটনা রটাচ্ছে। প্রাণ চলুন না বিয়ে করে ফেলি। সামনেই একটা কাজি অফিস রয়েছে।
প্রাণ নিস্তব্ধের ন্যায় পড়ে রইল। প্রণয় নিরাশ হলো। গাড়িতে ড্রাইভার রয়েছিল বসকে আসতে দেখে নেমে গেলেন তিনি। ফ্রন্ট সিটের দরজা খুলে দিলেন। প্রণয় প্রাণকে বসিয়ে দিয়ে লক করে দিল ডোর। ওয়ালেট বের করে পাঁচশত টাকা ড্রাইভারকে দিল। বলল,
–”ক্যাবে করে চলে আসুন।
প্রণয় ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি টান দিল সোজা অফিসের উদ্দেশ্যে। সারা রাস্তা মুখে কুলুপ এঁটে বসে ছিল প্রাণ।
„প্রাণ রিসেশনে কর্মরত। প্রণয় পকেটে হাত গুজে উপস্থিত হলো সেথায়। প্রাণ দাঁড়িয়ে গিয়ে সম্মান দেখাল। প্রণয়ের বিবর গুরুগম্ভীর। বসের পেছন হতে বসির এগিয়ে এসে ট্রে রাখল ডেস্কের উপর। প্রাণ তপ্ত বায়ু ত্যাগ করল। প্রণয় রাশভারি গলায় বলল,
–”খেয়ে নিন।
প্রাণ দেখতে থাকল বোলটা। তাতে ভর্তি নানা ধরনের কাটা ফ্রুটস। সে ফের তাকাল প্রণয়ের সিরিয়াস আদলে। এই লোক কি শুরু করেছে? অফিসে এসব করার মানে কি? প্রাণের চিত্তে জড়তা নামলো। প্রণয় সেটা আন্দাজ করে মুখ খুলবে ওর পিএ রুবা এসে ভয়ে ভয়ে বলল,
–”স্যার, আউটডোর মিটিং’এ যেতে হবে।
প্রণয় অর্ধেক ঘুরে রুবার পানে চেয়ে প্রতিত্তোর করল,
–”আই নো. প্রাণের খাওয়া সম্পূর্ণ হলেই চলে যাব। আপনি নিজের কাজ দেখুন।
রুবা বসিরকে আর প্রাণকে দেখে হন্তদন্ত পায়ে প্রস্থান নিল। প্রাণের সরু চাহনি। প্রণয় এবার ধ্যান দিল প্রাণের উপর। শক্ত শোনাল ওর গলা,
–”এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার মানে হয় না।
প্রাণ বসল ফটাফট। প্রণয় গাম্ভীর্যতা কমিয়ে আনলো। ডেস্কে কনুই ঠেকিয়ে ঝুকে গেল। প্রাণ মাথা নামিয়ে নিল। প্রণয়ের শীতল স্বর,
–”আপনার লেইম চিন্তা-ভাবনা বাদ দিয়ে খেয়ে নিন। অফিসের সবাই জানে আপনি আমার উডবি। সকলে এটাও মানে আপনাকে নিয়ে কটুক্তি করা, তার ক্যারিয়ার শেষ।
প্রাণ তড়াক করে চোখ তুলল। সে অতি থেকে অতিতর আশ্চর্য না হয়ে পারল না। তবে এত অবাক হওয়া বৃথা। এটা তো হওয়ারই কথা। প্রণয় ট্রে হতে বোল তুলে প্রাণের সম্মুখে রাখল। ভ্রু দুলিয়ে জানাল,
–”নিন শুরু করুন। আ’ম গেটিং লেইট.
প্রাণ শংকিত মনে কাটা চামুচ তুলে খাওয়া শুরু করল। প্রণয় নির্নিমেষ চোখে শুধু তাকিয়ে রইল। মুগ্ধ সে। জনাব প্রতি পদে পদে অনুভব করে,
‘একজন পুরুষ এক নারীতেই পরিপূর্ণ হয়। ব্যক্তিত্বের সুপুরুষ নিজ অভিমানিনীর পরতে পরতে ভালোবাসা লুটায় তবুও কিঞ্চিৎ কার্পণ্য করে না। তারা জানে শ্রেয়সী’রা ভালোবাসার আদুরে ভিক্ষারিণী।
–”একাই খাচ্ছেন? আমাকে সাধলেন না?
প্রণয় হঠাৎ বলে বসল। প্রাণ খাওয়া থামিয়ে ভ্রু গুটিয়ে চাইলো। সে আড়ষ্ট! একভাবে তাকে কেউ দেখছে আর সে স্বাভাবিক থাকবে তা কি সম্ভব? অন্যথায় প্রাণ কিঞ্চিৎ বিরক্তও বটে! ভীষণ ব্যস্ততা ভুলে তাকে দেখারই বা কি আছে?
প্রণয় মৃদু হাসল। এতেই প্রাণ হাস-ফাস করে উঠল। এটা ধূর্ততার ইঙ্গিত। নিশ্চয় কোন বেহায়া কাজ করতে যাচ্ছে। প্রাণ জিভ দ্বারা পিবর ঠোঁট ভিজিয়ে নিল। জবান ছোটাবে প্রণয় প্রাণের হাত ধরল। চোখ টিপ দিয়ে সেই হাতে ধরা স্পুনে আধা খাওয়া ফলের টুকরো খানা মুখে পুরে নিল।
প্রাণ বিহ্বল তথাপি লজ্জিত! তার এঁটো খেল? গাল দু’টোতে বসন্তের বাহার নেমেছে। প্রণয়ের আপাতত কাজ শেষ। বোলে দুই’একটা টুকরো রয়েছে শুধু। সে সটান হলো। পকেটে হাত গুজে আওড়াল,
–”এগুলো কিন্তু মোটেও বিরক্ত করা নয়।
প্রাণ সেই যে চোখ বুজে মাথা নমিত করল লাঞ্চ ব্রেক অবধি একচুল পরিমাণ নড়লো না।
„দুপুরের খাবার সময় চলছে। প্রাণ অলস বসে আছে। প্রণয় বিরিয়ানি পাঠিয়েছে সেটা দু’এক লোকমা খেয়ে হেলায় ফেলে রেখেছে। খেতে ইচ্ছে করছে না ওর। তাকে এখানে কোন কাজ করতে দেওয়া হয় না। সকাল থেকে ব্যাচ দুইটা পার্সেল রিসিভ করেছে সে। এই নিয়ে প্রণয়ের সঙ্গে কথা বলে দেখবে? ভাবার মাঝেই মেসেজ টোন বাজল।
প্রাণ ফোন হাতে নিতেই বসিরের আগমন ঘটল। বিরিয়ানি যেমন রেখে গিয়েছিল তেমন দেখে তিনি বললেন,
–”ম্যাম, খাননি কেন?
–”পেট ভরা।
প্রাণের সরল গলা। বসির ফোনে কল লাগাল। সাথে সাথেই রিসিভ হলো। ভদ্রলোক জানালেন,
–”স্যার, খায়নি।
প্রাণ মিছে হেসে খেতে আরম্ভ করল। ওপাশের ব্যক্তি প্রণয় ছাড়া কেউ না। বসির পুনরায় বললেন,
–”জি, স্যার ম্যাম খাচ্ছেন। আমি এখানেই দাঁড়িয়ে আছি।
ভয়ের তো কিছু নেই। প্রাণ ভয় কেন পেল? নিজেই নিজেকে বকা দিয়ে খাওয়াতে মন দিল। শেষ লোকমা পর্যন্ত রয়ে গেলেন বসির।
„প্রাণ অফিসে বেকার বসে না থেকে বাইরে গেল। মকবুল সাহেব টাকা পাঠিয়েছেন তারই মেসেজ এসেছিল তখন। প্রাণ রিকশা নিয়ে ব্যাংকে গেল। প্রথমে টাকা উইথড্র করে হেঁটেই বাজারে চলল। আজ সে সংসারের নতুন জিনিস কিনবে একটা।
চোখ গেল ফুটপাতের ভ্যানে। ফল-ফলান্তি বিক্রি হচ্ছে। প্রাণ রাস্তা পার হয়ে সেখানে গেল। কয়েকজন এটা সেটা কিনছেন, দর, দাম করছেন। প্রাণ আমলকি হাতে তুলে পরোখ করে দেখছে। নাকের কাছে নিয়ে ঘ্রাণ অনুভব করছে তখনই পাশ হতে কেউ বলে উঠল,
–”প্রেগ্ন্যাসি আর এই গরমে আমলকির আচারের জুড়ি মেলা ভাড়!
প্রাণ মিষ্টি হাসি উপহার দিল। অপরিচিতা মেয়ে। বয়স হবে সাইত্রিশ কিংবা আটত্রিশ এর কাছাকাছি। খুবই লাস্যময়ী। আদলটা যেন কার মতো! টুকটাক কথা চলছে তাদের।
–”আরে মিস. হিজাবি।
পুরুষালি গলায় প্রাণ, মেয়েটি পিছু ঘুরল। প্রাণ বিস্ময় সমেত বলল,
–”পাভেল তুমি?
–”জি, আম্মুকে গার্ড দিচ্ছি।
পাভেল সানগ্লাস খুলে ভাব নিয়ে বলল। প্রাণ মৃদু হাসল। মাহিমা ছেলের বাহুতে আলতো চাপড় বসিয়ে শুধাল,
–”তুমি চেনো উনাকে?
–”আম্মু, তোমার ছেলের না হওয়া বউ।
মাহিমা পুত্রের রসিক জবাব শোনার দশায় নেই। কণ্ঠনালী দ্বারা বেরিয়ে এলো,
–”ইনিই প্রাণ?
একেই বলে অদৃষ্টের পরিহাস! প্রাণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
বেশি, বেশি রেসপন্স করবেন। হ্যাপি রিডিং…..
#কলমে_নাহিদ_রহমান_
#চলবে_________________________________________
