#_প্রণয়িনী_
#_৩য়_পর্বে__
রজনী গভীর নিগূঢ়তায় তলিয়ে। ঘুপচি ঘরটা অন্ধকারে মোড়া। প্রাণের শরীর কাঁপিয়ে জ্বর নামলো এ’ক্ষণে। পোড়া গাল, গলা, আর ঘাড়ের অসহ্য ব্যথার সঙ্গে লড়ার শক্তিটুকুও আর নেই ওর। নিথর হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে। হয়তো জ্ঞান নেই। ছটফটানি ক্ষয়ে নিরব হয়েছে।
জমপেশ ঢেকুর তুলে রাতের আহার সারলেন মনিরা। হেলে দুলে ডাইনিং থেকে নিজের রুমে গিয়ে দাঁত ব্রাশ করলেন। অলস শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দিতেই মনে পরল প্রাণের কথা। খেয়াল করবে না, করবে না করেও কি যেন মনে করে উঠে পরলেন শোয়া হতে। ত্রস্ত চলে গেলেন ঘুপরি ঘরটার দিকে। বাহির হতে কোন সাড়া শব্দ পেলেন না প্রাণের। মনে মনে ভাবলেন,
–”মরে গেছে নাকি?
ধক করে উঠল মনিরার বুক। তড়িঘড়ি রুমে প্রবেশ করে দেখলেন প্রাণ মেঝেতে পড়ে রয়েছে। নাকের কাছে আঙ্গুল নিয়ে পরোখ করলেন নিভু নিভু শ্বাস চলছে প্রাণের। জ্বর বোধহয় তার চূড়ান্ত রুপে আছে। দেহ হতে কেমন ধোঁয়া উড়ছে। ওর শরীর ছুঁয়ে দিতেই উত্তাপ টের পেলেন মনিরা। মন নরম হলো একটু। সেই সকাল এগারোটা থেকে না খাওয়া, তার উপর পাঁচ মাসের প্রেগন্যান্ট, খিচুনি না উঠে যায়!
মনিরা গামছা ভিজিয়ে এনে পোড়া ক্ষতগুলো মুছে দিলেন। কোন রকমে টেনে হিচড়ে প্রাণকে মেঝে থেকে চৌকিতে উঠিয়ে পাতলা, ময়লা যুক্ত কম্বলটা গায়ে চাপিয়ে দিলেন। মুখে চোখে পানির ছিটা দিতেই হুশ ফিরল প্রাণের। জ্বরের তোপে একটু পানি চাইলো সে। এতেই মুখ কুঁচকে নিলেন মনিরা। বিরবিরালেন,
–”একেই বলে কপাল!
মনিরা মনের বিরুদ্ধে গিয়ে একটু পানি পান করিয়ে, নাপা ট্যাবলেট খাওয়ায় দিয়ে প্রস্থান করলেন কক্ষ। নেহাতই তিনি চা ঢেলেছেন গায়ে তাই করলেন। নাহলে মরে পরে থাকলেও চোখ তুলে তাকাতেন না তিনি।
•
„’ভোরের আলো ফুটতেই প্রাণের ঘুম ভাঙ্গল। দূর্বল শরীরে কোন মতে উঠে বসল সে। পেটে খিদের চোটে ব্যথা শুরু হয়েছে। খিচে ধরছে একপাশ। হাতে পায়ে বল পাচ্ছে না একফোঁটা। মাথার ভেতরে ভোতা যন্ত্রণা। দৃষ্টি ঘোলাটে! তাও জোরালো মনোবলে প্রাণ সামলে নিল নিজেকে। আস্তে ধীরে ফ্রেশ হতে চলল।
ওয়াশরুমের সিসায় নিজের ফোলা, পাংশুটে মুখ দেখতেই চোখ নামিয়ে নিল প্রাণ। বিশ্রী লাগছে দেখতে! গালের নিচে দু’ইঞ্চি মতো বড় ফোস্কা পরেছে। গলায়ও হয়েছে একটা বিষ ফোস্কা। হাত মুখ ধুয়ে ওড়না দিয়ে হিজাব বেঁধে নিল যাতে কেউ বুঝতে না পারে। জখমে ঘষা লেগে মুখ দিয়ে বের হলো ব্যথাতুর ধ্বনি, “আহ! কিন্তু প্রাণ দাঁতে দাঁত চেপে সয়ে গেল যন্ত্রণাটুকু। অফিসেও যেতে হবে। শরীর খারাপের দোহাই দিলে পেট তো চলবে না।
‚মনিরা চুপচাপ থালা-বাসন গুছাচ্ছেন। বাহারি পদের খাবারে ভরিয়ে ফেলেছেন টেবিল। কেননা ছেলে-বউ ট্যুর শেষে বাড়ি ফিরেছে। সেথায় প্রাণের উপস্থিতি বুঝে একপল চাইলেন ওর মুখে। প্রাণ রয়েছে নত মস্তকে। একটু ভয়ে। সকালের রান্না করে দিতে পারেনি বলে এখনো ওকে না খাইয়ে রাখে নাকি!
মনিরা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে হাতের কাজ জারি রেখে বললেন তীক্ষ্ণ কণ্ঠে,
–”কেবিনেটের উপর খাবার রাখা আছে খেয়ে বিদেয় হ। মোহন বাড়িতে আছে।
প্রাণ চুপচাপ কিচেনে গেল। দু’টো শুকনো রুটি আর এক বাটি ডাল। এতটুকু খাবার দেখেই মুখের আদল চকচকে হলো ওর। প্রসন্ন হেসে ঝাঁপিয়ে পরল খাবারে। খিদে পেটে খাবার পরায় যা পেল তাই তৃপ্তি করে খেল প্রাণ। মনিরাও সেসময় আসলেন সেখানে। প্রাণ গ্লাসের পানিটুকু শেষ করে ভয়ে ভয়ে নরম গলায় বলল,
–”আম্মা, দুপুরে অফিসে খাবো, হাতে টাকা নেই যদি কিছু খাবার দিতেন।
মনিরার আদল শক্ত হলো। তেমনই রূঢ় কণ্ঠ,
–”রাতে হাত পুড়ে রান্না করেছি, নষ্ট তো করা যায় না। হাড়িতে পড়ে আছে তাই নিয়ে যা।
যাক আজ দুপুরে অন্তত না খেয়ে থাকতে হবে না। এতেই প্রাণের স্বস্তি। চট জলদি বক্সে পান্তা ভরে নিল সে। মনিরা দেখার আগেই লুকিয়ে দু’টো মরিচ, পেয়াজ আর সরিষার তেলও নিল খানিক।
প্রাণ কর্মের তাগিদে মোহনের নজরে পরার আগেই বেরিয়ে গেল বাড়ি হতে। অবশ্য সে ছেলে ঘুমাবে দুপুর অবধি। বাড়ি থেকে বেশ কিছু দূর গিয়ে প্রাণ ফোন লাগাল কাউকে। রিসিভ হতেই আবেগী হলো। ধেয়ে আসা কান্না গিলে বলল,
–”আব্বু,
অপর পাশের পঞ্চাশোর্ধ মকবুল সাহেব চিন্তিত হলেন। মেয়ে তো কখনো নিজে থেকে ফোন করে না। এত বছর পর হঠাৎ কল করল কেন? খুশিও হলেন তিনি। স্নেহময় গলায় বললেন,
–”কেমন আছিস, মা?
–”ভালো আছি।
মকবুলের পিতৃমন হু হু করে উঠল মেয়ের বিরস কণ্ঠ শুনে। কিছু জিজ্ঞেস করবেন প্রাণ কথা বাড়াল না। সোজা বলল,
–”আমার কিছু টাকা লাগবে।
এত নিরুপায় না হলে প্রাণ কখনোই ফোন দিত না বাবাকে। বুকে যে নিদারুণ অভিমান জমা হয়েছে। চিন্তাগ্রস্ত কণ্ঠ মকবুলের,
–”আমি না টাকা পাঠিয়ে দিয়েছি তোর মায়ের একাউন্টে।
–”উনি বললেন টাকা খরচ হয়ে গেছে, তোমাকে ফোন দিয়ে টাকা চাইতে।
কথা কাটিয়ে দ্রুত বলল প্রাণ। মকবুল সাহেব ভেতরে ভেতরে অস্থির হলেন। বুঝলেন মেয়ে তার ভালো নেই। বুকে পাথর চেপে উত্তর পারলেন,
–”আচ্ছা।
–”এক হাজার টাকা হলেই হবে। বেশি দিও না।
মকবুল অপারগতার দীর্ঘ শ্বাস ফেললেন। মনটা তৃষ্ণার্ত হলো উনার। উতলা হলেন মেয়ের সঙ্গে দু’ চারটে কথা বলতে,
–”মা’রে,
অপর পাশের সুদূর প্রবাসী মকবুলের হয়তো বুক ভার হলো। প্রাণ উনাকে নিরাশ করে ফোন কাটল নিমেষেই। মুখ তার রয়েছে সবেকার মতই নির্বিকার!
.
প্রণয় তিন রাস্তার মোড়ে ফুটপাতের ধারে গাড়ি থামিয়ে সিগারেট ফুঁকছে। এখান থেকে তার অফিস দশ মিনিটের রাস্তা। এখনো প্রচুর সময় রয়েছে। ওর বাসায় ভরা সদস্য জন্য এভাবে আড়ালে-আবডালে স্মোক করতে হয় ওকে।
প্রণয় পরিবারের কাছে বেজায় ভদ্র ছেলে। সিগারে টান দেওয়ার মাঝে ওর বেখেয়ালিতে দৃষ্টির প্রকাশ্যে এলো প্রাণ। তবে মেয়েটিকে দূর হতে দেখেই বেশ অসুস্থ মনে হচ্ছে আবার অফিসের রাস্তা ছেড়ে অন্য রাস্তায় যেতে দেখে কিছুটা কৌতূহল জন্মাল প্রণয়ের মনে। সে সিগারেটের শলাকা পায়ে পিষে গাড়িতে উঠে পরল। পিছু নিল প্রাণের।
„‘অবশেষে প্রাণ পৌঁছল সরকারি হসপিটালে। সকাল বেলা বেশি ভীড় নেই তবে দশ বারো জন লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। তিন টাকা দিয়ে টিকিট কাটবে নিমিত্তে প্রাণও লাইনে দাঁড়াল।
দীর্ঘ পথ হেঁটে আসা, অসুস্থ শরীরে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে প্রাণের পা টন টন করছে। মাথার উপরে রবির তেজস্বী রোদ নিয়ে প্রাণের পালা এলো এবার। সাড়া হলো টিকিট কাটা।
গাড়ির কাঁচ উপেক্ষায় প্রণয় এক দৃষ্টে দেখে গেল রমণিকে। নানান প্রশ্ন উদয় হলো ওর মস্তকে। তবে তার চেয়ে অধিক ইচ্ছে জাগল প্রাণকে সাহায্য করার। তাই দেরি না করে গাড়ি থেকে নেমে পরল সে। পা বাড়াবে মাথায় এলো এভাবে হুট করে সামনে গিয়ে কি বলবে? সে কেন এসময় হসপিটালে? এমন নানান প্রশ্নে জর্জরিত হতে হবে তাকে। আননে বেজার ভাব ভিড়ল প্রণয়ের।
ক্ষণপরে একলাই বাঁকা হেসে মুহুর্তেই পাশে থাকা অন্য গাড়ির জালানার কাঁচে ডান কনুই দিয়ে স্বজোরে আঘাত করল। কাঁচ ভেঙে কিছু টুকরো বিঁধল বলিষ্ঠ হাতের মাংসল অঙ্গে। বেদনার রেশে প্রণয়ের আনন হলো নীলচে। প্রণয় মুখ খিঁচে সব ব্যথা উপেক্ষা করে নিজেকেই বাহবা দিল। মানুষ তো গর্ধভ বলবে ওকে!
‚বার্ন ইউনিটের কেবিনে প্রাণের পোড়া স্থান ড্রেসিং চলছে। গালের ফোস্কাটা ফেটে গেছে তখন হিজাব বাঁধার ফলে। নরম চামড়া চাপ সহ্য করতে পারেনি। প্রণয়ও নিজের চিকিৎসা শেষে খুঁজতে খুঁজতে সেখানে এলো। করিডরে দাঁড়িয়ে থাই গ্লাস ভেদে চোখে পরল প্রাণের গালের দগদগে ঘা খানা। আঁতকে উঠল সে। অনুভব করল তার বুক যেন মুষড়ে পরেছে! না আর দেখার শক্তি নেই ওর। প্রণয় সাহসাই মাথা ঘুরিয়ে নিল।
তবে ফের চাইলো ওদিকে। প্রাণ হেলদোলহীন! উফ তাক করছে না। কাঠ হয়ে রয়েছে চোখ বুজে। প্রণয় ওকে এমন নিষ্প্রাণের ন্যায় দেখে বলল,
–”এই মেয়ে কি জড় পদার্থ?
নার্স কাজ শেষ করে যা যা করতে হবে সব নির্দেশনা দিলেন। বার বার এও বললেন,
–”সম্পূর্ণ ভাবে বিশ্রাম নিতে হবে।
কিন্তু রেস্ট নেওয়ার মতো বিলাসিতা কি প্রাণের আছে? তখনই প্রাণের চোখ গেল জালানা গলিয়ে বাইরে। চোখা- চোখি হলো প্রণয়ের সাথে। প্রণয় আলতো হেসে বিনা অনুমতিতে ঢুকে গেল কেবিনে। সোজা নার্সকে শুধাল,
–”ট্রিটমেন্ট শেষ উনার?
–”জি।
নার্স অপ্রস্তুত হলো কিছুটা প্রণয়ের হুট করে আগমনে। তাও জবাব হেতু প্রেসক্রিপশন বাড়িয়ে ধরলে প্রণয় ফট করে সেটা নিল কেড়ে নেওয়ার মতন। জিজ্ঞেস করল,
–”বিল কোথায় দিতে হবে?
নার্স তাজ্জব বোনে গেছে! এ পাগল বলে কি? জবাব আসে প্রাণ হতে,
–”এটা সরকারি হসপিটাল।
–”ওহ।
প্রণয় প্রাণের সন্দেহী নজরকে পাত্তা দিল না। যা ভেবেছিল সেটাই হলো এখন। প্রাণ লোকটিকে এখানে দেখে বিস্মিত হয়েছিল। সেভাবেই বলল,
–”আপনি অফিসের কাজ ফেলে এখানে কি করেন?
উত্তর তো তৈরি প্রণয়ের। সূক্ষ্ম হেসে ঝুলানো হাত বাড়িয়ে ধরে বলল,
–”বোকামির চিকিৎসা করাতে আসা।
প্রাণ কথা বলল না আর। সে নিজের জ্বালায় বাঁচে না সেখানে অন্যের ব্যাপারে উদাসীন তো হবেই! প্রণয় চুপচাপ প্রাণের পিছু পিছু হাঁটা লাগাল। জানতে চাইল,
–”আপনার মুখে কী হয়েছে, মিস. প্রাণ?
–”এত আগ্রহ ভালো নয়, স্যার। নিজের কাজে যান।
বলে হাত পাতলো প্রাণ। প্রণয়ের প্রশ্ন সূচক আবরু দেখে নিজেই বলল ফের,
–”প্রেসক্রিপশনটা দিন।
–”চলুন আমি ওষুধ নিয়ে দিচ্ছি।
–”হসপিটাল ফার্মেসীতে এগুলো বিনামূল্যে পাওয়া যায়। ধন্যবাদ আপনাকে।
প্রণয় বিনা বাক্যে দিয়ে দিল তা। সে বুঝল এই রমণির প্রয়োজন নেই তার। সে নিছকই একজন বস। কথা বাড়ালে এই নারীর চক্ষুশূল হতে সময় লাগবে না। তাও কিসের আশায় যেন রয়ে গেল সে প্রাণের সঙ্গী হয়ে। প্রাণ ওষুধ নিয়ে বিল্ডিংয়ের বাইরে আসতেই প্রণয় কথা পাড়ল,
–”কিছু না মনে করলে আমি আপনাকে লিফট দিতে পারি।
–”প্রয়োজন নেই।
–”আপনার বস হিসেবে এটুকু সাহায্য নিতেই পারেন। তাছাড়া আপনি অসুস্থ। আমার ভালো লাগবে আপনাকে সহায়তা করতে পারলে।
প্রণয় হাল ছাড়ল না। প্রাণ আড়ালে ফোস করে শ্বাস ফেলল। এই লোকের অভিব্যক্তি, চোখের ভাষা বুঝতে হিমসিম খাচ্ছে ও। ভঙ্গুর হাত দেখে তো মনে হচ্ছে সত্য কথাই বলেছে। প্রাণ ভদ্র সুলভ হেসে শীতল স্বরে বলল,
–”কেউ স্বেচ্ছায় না বললে আপনার উচিত পাল্টা ঔদ্ধত্য দেখানো। এছাড়া দামি জিনিসে মাছির স্থান দূষণীয়!
প্রণয় হতবাক হয়ে গেল। প্রাণ ওকে ফেলেই হেঁটে চলল অফিসের উদ্দেশ্যে। বেশি দূরে নয় তো। হসপিটাল থেকে পাঁচ মিনিটের পথে তিন রাস্তার মোড়। তারপর কয়েক মিনিটে অফিস।
#লেখনীতে_নাহিদ_রহমান_
#চলমান________________________________________
#_প্রণয়িনী_
#_৪র্থ_পর্বে__
প্রণয়ের চোখে-মুখে ধৈর্যহীনতার প্রলেপ লেপ্টে। সে কাজ ফেলে রেখে গ্রাউন্ড ফ্লোরে অপেক্ষারত। এতটুকু সময়ে ওর চোখ দু’টি বোধহয় তাড়াস গিয়েছে প্রাণকে দেখার জন্য। কি এক অবস্থা? প্রচুর বেহায়া হচ্ছে সে!
প্রণয় নিজের এমন কাজে নিজের উপরই বিরক্ত। কোথাকার কোন মেয়ের জন্য সে এভাবে তার মূল্যবান সময় নষ্ট করছে। তার উপর হাতে আঘাত করল সামান্য দুটো কথা বলার জন্য। অথচ সে মেয়ে মনে হয় তাকে বেগানা পুরুষ ভাবছে। এবেলা সবই বেকার মনে হলো ওর কাছে।
প্রণয় ওয়েটিং এড়িয়া লাগোয়া ডেস্কটপ এর সামনে পায়চারি করছে। আসা-যাওয়া সবাই দেখছে ওর উদ্বিগ্নতা। প্রণয়ের ছটফটে মন শান্ত হলো যখন প্রাণের অফিস দোরগোড়ায় আগমন ঘটল। মনে মনে ঠিক করে রেখেছিল টাইম মতো না আসতে পারলে বকুনি দিবে তা আর হলো কই? প্রণয় দ্রুত ওর সামনে গিয়ে অধৈর্য গলায় বলল,
–”আপনি ঠিক আছেন? আসতে অসুবিধা হয়নি তো? পানি খাবেন?
–”এই কেউ এক গ্লাস পানি দিয়ে যাও।
প্রণয় গলা উঁচিয়ে যখন প্রাণের মুখে চাইলো তখন রমণির চিত্ত জড়িয়ে গেছে। স্থবির হয়েছে প্রাণ। বুঝতে পারছে অনেকের ক্ষুরধার দৃষ্টি তার উপর নিবদ্ধ। নম্রতা বজায় রেখে চাপা গলায় হিসহিসিয়ে উঠল সে,
–”কি করছেন কি আপনি এসব?
–”আপনার দেখ-ভাল।
প্রণয়ের আনন বোকাসোকা। এমন বেঁফাস উত্তরে নিজেও খানিক অপ্রস্তুত হলো ও। প্রাণ থতমত খেল। সকাল থেকে তার সাথে এসব কি হচ্ছে ভেবেই আরও বেশি অসুস্থ বোধ করল। ততক্ষণে বসির পানি নিয়ে এসেছে। প্রণয় তা হাতে তুলে সম্মুখ পানে ধরতেই প্রাণ নাকোচ করে দিল এক বাক্যে,
–”প্রয়োজন নেই।
হতাশ হলো প্রণয়। ইচ্ছে তো করছে কষে একটা রাম ধমক দিতে। কিন্তু অযাচিত অধিকার বোধ নিয়ে সংশয়ী সে। সঙ্গে নিজের মনোভাব বুঝতে অক্ষম! উপায়ন্তর রাগের বর্শবর্তী হয়ে বেশ শব্দ করেই গ্লাসটা ডেস্কে রাখল।
প্রাণ যেন একদিনেই হাপিয়ে উঠেছে! নিজের আসনে গিয়ে বসল সে। প্রণয় প্রত্যাখ্যান পেয়ে সেভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। ওর পাশে বসির বসের আদেশের উন্মুখ হয়ে আছে। প্রাণ এক মনে নিজের কাজ করছে।
„কেটে গেল কিছু প্রহর। না! এভাবে এই মেয়েকে বশে আনা যাবে না। প্রণয় পানির গ্লাসটা দেখে ফের ক্রুর হাসল। মাথা ঝুকিয়ে বসিরের কানে কানে কিছু বলে দিল। বসের হুকুম তামিলে তাই করল বসির।
বসির পানির গ্লাস তুলে নিতে জেনে শুনেই ডেস্কে এনভেলাপ করা ফাইলের উপর ফেলে দিল। ভিজে গেল পার্সেল আসা গুরুত্বপূর্ণ ফাইলটা। প্রাণ আর্তনাদ করে উঠল,
–”এ কি করলেন, ভাই?
প্রণয় বিজয়ী হেসে এগিয়ে গেল সেথায়। এবার বাগে পেয়েছে। সে সজ্জন, নিষ্পাপ মন নিয়ে সহায়তা করতে চাইছে আর তাকেই কিনা অগ্রাহ্য করা হচ্ছে। প্রণয় মুখের আদল গম্ভীর করল। গলার স্বর ভারি করে মিছে ধমকে সুর তুলল কণ্ঠে,
–“আপনার এই মনোযোগহীনতা মাফ করার মতো না, মিস প্রাণ! কত জরুরি কাজের ফাইল ছিল জানেন আপনি? নাকি আধা দিনেই কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন? এভাবে তো কাজ করতে পারবেন না আমার অফিসে।
প্রাণ ভয়ে নিমজ্জিত বুক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল মাথা নিচু করে। গলা কাঁপছে ওর,
–”দুঃখিত! আমার উচিত ছিল তখনই ফাইলটা আপনার কেবিনে পাঠিয়ে দেওয়া।
–”আপনার ছোট্ট সরিতে কি আমার ক্ষতি পূরণ হবে?
প্রণয়ের কথায় কিছুটা রাগের আভাস। প্রাণের কাঁদো কাঁদো মুখ দেখে আর ঘাটাল না ওকে। বলে শমিত স্বরে,
–“বুঝলাম আপনি ক্লান্ত কিন্তু কাজ তো করতেই হবে। আমার কেবিনে আসুন।
কেবিনে? সে সামান্য একটা রিসেপশনিস্ট তার কি কাজ থাকতে পারে কেবিনে? প্রাণ কিছু বলতে নিবে তার আগেই প্রণয় স্পষ্ট ভাবে বিরোধ করল,
–”কোন এক্সকিউজ নয়, মিস. প্রাণ।
•
„‘কেবিনে এসি চলছে। পিনপিনে নিরবতার মাঝে শুধু কিবোর্ড চালনার শব্দ। প্রাণ মগ্ন নিজ কর্মে। মানছে সে পড়া-শোনায় ভালো তবে সে তো রিসেপশনিস্ট। কিন্তু এখন প্রাণ কম্পিউটারে ফাইল টাইপিং করে সেভ করে রাখছে। যা তার কাজ নয়। কিছু বলতেও পারছে না যদি বস মনঃক্ষুন্ন হয়। তবে অস্বস্তি হচ্ছে ওর কেননা প্রণয়ের দৃষ্টি আটকে রয়েছে ওর মুখবিবরে। না পেরে প্রাণ চোখ তুলল। তাতে প্রণয় টান টান হয়ে নড়েচড়ে উঠল। নজর হলো তীক্ষ্ণ। প্রাণের মুখ-মন্ডল ফ্যাকাশে হয়েছে। চোখ লাল। হঠাৎ যেন প্রণয়ের কণ্ঠ ভেঙ্গে এলো,
–“আর ইউ ওকে, প্রাণ?
–“হ্যাঁ, স্যার।
মিথ্যে বলল প্রাণ। তার যে এসির বাতাসে এলার্জি। কিন্তু সামান্য কর্মচারী হয়ে বসকে সাধবে যে এসিটা অফ করুন। মন টানল না। বরঞ্চ সয়ে নেওয়াই উচিত মনে করল।
–“ঠিক আছে, মিস. প্রাণ। আপনি এবার আসতে পারেন।
চতুর প্রণয় জানে কিছু সমস্যা আছে। তবে এই মহিলার তো মুখে কুলুপ আটা বলবে না কিছুই। প্রাণের মুখ বিবর্ণ হয়েছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তবুও তিনি কর্তব্যপরায়ণ থাকবেন। অস্ফুটে আওড়াল প্রণয়,
–”আমায় গাঁধা পেয়েছে!
প্রাণ মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেল। প্রণয় এবার টের পেল হাতের ব্যথা। গলায় ঝুলানো হাতের দিকে চেয়ে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলল।
•
আযান পরল একটু আগে। ঘড়ির কাটায় এখন দেড়টা। অফিসে লাঞ্চ ব্রেক টাইম চলছে। প্রাণের হাঁটতে ইচ্ছে হলো না নাতো ক্যান্টিনে যাওয়ার কোন ইচ্ছে আছে। তাই স্বয়ী আসনেই মেঝেতে বাবু হয়ে বসে দুপুরের ভোজন করতে লাগল। কাল রাতের পান্তা, এই দুপুর অবধি থেকে তাতে টক উঠেছে। তাও খেতে থাকল প্রাণ।
ডেস্কে কারো উপস্থিতিতে খাওয়া থামিয়ে মাথা উঁচু করল প্রাণ। অতি বয়স্ক আর অল্প বয়সী তরুণ দু’জন ওকেই দেখছে। গলার খাবারটুকু গিলে জিজ্ঞেস করল,
–”জি, কিছু বলবেন?
তন্মধ্যে যুবকটি বৃদ্ধার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
–”ও বমা, এই যুগেও দেখি গরিব রয়েছে।
–”আহ! ভাইয়া, মেয়েটা শুনতে পেলে কষ্ট পাবে।
বৃদ্ধা সামান্য হাসার চেষ্টা করল প্রাণের আড়ষ্ট মুখ দেখে। বললেন,
–”দুঃখিত বোন, খাওয়ার সময় তোমাকে বিরক্ত করলাম। তুমি মনে হয় নতুন, তাই কি?
–”জি। আজই জয়েন করেছি।
–”আমি হলাম তোমার বস প্রণয়ের দাদি ‘জাহানারা। আর….
–”আর আমি এই ইয়াং লেডির নাতনির ছেলে পুতি ‘পাভেল শিকদার।
কথা টেনে পাশ থেকে নিজের পরিচয় দিল পাভেল। অতঃপর পুনশ্চ তারিফ করল,
–”কর্পোরেট অফিসে আজকাল হিজাব ব্যবহার দেখায় যায় না। বিশ্বাস করো, হিজাবে তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে। হাতের নাগালে থাকলে গাল টেনে দিতাম। উফস, তুমি করে বললাম।
–”ইট’স ওকে.
প্রাণ বোধহয় লজ্জা পেল। ব্লাস করছে ওর গাল দু’টো। ঠোঁটে ফুটল লাজুক হাসি। তা দেখে পাভেল ঠোঁট টিপে হেসে হাতের কোণ আইসক্রিম টা বাড়িয়ে ধরে বলল,
–”এত স্নিগ্ধ হাসি দেখানোর জন্য এই অধমের সামান্য উপহারটুকু গ্রহণ করো, মিস।
–”ফ্ল্যাটিবাজ!
জাহানারা পুতির বাহুতে আলতো কিল বসিয়ে বললেন কথাটা। পাভেন উনাকে চোখ টিপে দিয়ে প্রতিত্তোরে,
–”তবুও দেখো তোমাকে পটাতে পারলাম না। আপসোস!
প্রাণখোলা হাসল তিনজনই। প্রাণ স্ব-লজ্জ ভঙ্গিতে আইসক্রিমটা নিল। সে শুনেছিল কোথাও ‘ভালোবেসে কেউ কিছু দিলে না বলতে নেই’। ইন্টারকমে কল করবে তার পূর্বেই হাজির হলো প্রণয়। মজার সুর কণ্ঠে,
–”বাহ! চাঁদের হাট বসেছে দেখি।
–”বাবাই, চাঁদের কলঙ্কও রয়েছে। তাতো চোখে পরল না তোমার। ভ্যারি ব্যাড!
–”বদমাশ!
প্রণয় পাভেলের কান মলে দিল। দাদি আর ভাগ্নেকে নিজের কেবিনে নিয়ে চলল। পেছনে এসেছিল বসির। উনি গেলেন বাইরে গাড়ি হতে খাবার পিক করতে। প্রণয়ের নজর এড়ালো না প্রাণের ডিব্বায় থাকা পান্তা ভাত। ওদের যেতে যেতে প্রাণের কানে এলো জাহানারার প্রসন্ন গলা,
–”ডক্টর দেখিয়ে ভাবলাম আজ অফিসে জামাইয়ের সাথে লাঞ্চ করি।
অজান্তেই প্রাণের চোখ ভরে উঠল। কোথাও যেন হাহাকার করছে খুব করে। পরিবার বুঝি এমন হয়?
•
প্রণয়ের হাতে ট্রে চাপা। স্ব দর্পে হেঁটে আসছে সে। এখন ব্রেক টাইম জন্য স্টাফদের আনাগোনা তেমন একটা নেই। ভালোই হলো ওর জন্য। নাহলে রটনা রটে যেতে সময় লাগবে না। প্রাণ নিজ মনে খাচ্ছে বাকি খাবার টুকু। প্রণয় এসে শুকনো কাশলো রমণির ধ্যান টানতে। হলোও তাই। প্রাণ চোখ বড় বড় করে তাকাল তার দিকে। হতবাক ওর মুখ দিয়ে বের হলো,
–”এসব কি, স্যার?
–”খাবার। আপনার জন্য। নিন ধরুন।
–”দেখুন স্যার, স্টাফদের সুযোগ-সুবিধা দেখা আপনার কর্তব্য সেটা মানলাম। তবে আমার খাতিরে কারো হস্তক্ষেপ করা পছন্দ নয় আমার। সকাল থেকে আপনি বেশি বেশি করছেন।
প্রাণের কাটকাট কথা। সে চায় না এসব দু’দিনের যত্ন-আত্তি। প্রণয়ও হার মানার পাত্র নয়,
–”আপনি সবার থেকে আলাদা। আর আপনি তো একা নন। ধরে নিন, আপনার টাম্মি’তে যে রয়েছে তার জন্য করছি।
তেতো হয়ে উঠল প্রাণের মুখ। অসহ্য লাগছে এই লোককে। নেহাৎ তার হাত-পা বাঁধা তাই জোর গলায় কিছু বলতে পারছে না। তবে এবার সত্যি চড়াল হলো প্রণয়ের কণ্ঠ,
–”প্রাণ,
নিজের নাম সম্বোধনে ভীত সন্ত্রস্ত হলো প্রাণ। ঈষৎ কেঁপে উঠল। এই ভয়টাই পাচ্ছিল এতক্ষণ ধরে। এখন শুধু ঝড়ের তাণ্ডব লীলা প্রকট হওয়া বাকি। প্রণয়ের আদলের ন্যায় কণ্ঠনালী দ্বারা নিঃসৃত হলো গুরুগম্ভীর স্বর,
–”ভিক্ষুককে ভিক্ষা দিচ্ছি। খুশি এবার?
–”হুম, ‘যা মন পোড়ায়, তা সবসময় মানুষরুপী আগুন হয়।’
(রংপুরে আঞ্চলিক সম্বোধনে অনেকেই মায়ের দাদি বা নানিকে বড়আম্মার পরিবর্তে “বমা” বলে ডেকে থাকেন)
#লেখনীতে_নাহিদ_রহমান_
#চলমান________________________________________
