#নিষিদ্ধা
#পর্ব_১
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া
“ওই মেয়েগুলো! আমি…প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে রুমে মেয়েদের উলঙ্গ লাশ ভাসতে দেখতে পাই ডক্টর। ”
এতটুকু বলেই থামলো মেহরাব। সামনে বসে থাকা ডাক্তার শিয়া এবার ভালো করে তাকাল মেহরাবের দিকে। লোকটার চুলগুলো উস্কখুস্ক, চোখমুখ কেমন বসে গেছে, চেহারায় খুব ক্লান্তির ছাপ। দেখে মনে হচ্ছে তার ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া, ঘুম কিছুই হচ্ছে না।
” মেয়েগুলোকে কি আপনি চেনেন? ”
” নাহ। কখনো দেখেছি বলে মনে পড়ে না। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে তাদের লাশ দেখি, কিন্তু ঘণ্টাখানেক পর সেগুলো নিজে নিজেই উধাও হয়ে যায়। আমি আর এসব নিতে পারছি না। প্লিজ আমাকে সাহায্য করুন ডক্টর। ”
” মিস্টার মেহরাব আপনি প্লিজ শান্ত হোন। ”
ডাক্তার শিয়া এ কথা বলে মেহরাবের দিকে পানি ভর্তি গ্লাস এগিয়ে দিল। ভয়ে কুঁকড়ে আছে মেহরাব। গ্লাস হাতে পেয়েই এক নিঃশ্বাসে সবটুকু পানি ঢকঢক করে শেষ করে ফেলল। মেহরাব এই মুহূর্তে ঢাকা শহরের অন্যতম সাইকিয়াট্রিস্ট শিয়া চৌধুরীর চেম্বারে বসে আছে।
” সরি ডক্টর শিয়া। আসলে আমি কিছুতেই ঠিক থাকতে পারছি না। ওই লাশগুলো! ”
” আচ্ছা কবে থেকে ঘটছে এসব ? ”
” এই পাঁচ, ছয়দিন ধরে! প্রতিদিন একটা করে মেয়ের উলঙ্গ লাশ দেখতে পাই, অথচ তাদের কাউকে চিনিও না। ”
শুকনো ঢোক গিলে বললো মেহরাব। ডাক্তার শিয়া মেহরাবকে আস্বস্ত করতে শান্ত কণ্ঠে বললো,
” আপনাকে সাহায্য করতে হলে আমাকে প্রথমে সবকিছু জানতে হবে। কাইন্ডলি সবকিছু খুলে বলুন। ”
ডাক্তার শিয়ার প্রশ্নে বেশ উদভ্রান্ত দেখাচ্ছে মেহরাবকে। সবকিছু খুলে বলতে বেশ অস্বস্তি লাগছে তার। কিন্তু কিছু করার নেই। এই ঝামেলা থেকে মুক্তি পেতে গেলে ডাক্তার শিয়ার সাহায্য দরকার । এসবকিছু ভেবে নিজেকে কিছুটা সামলে নিলো মেহরাব। তারপর লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে বলতে লাগলো,
“ঘটনার সূত্রপাত আজ থেকে ছয় দিন আগে। সেদিনও প্রতিদিনের মতো স্বাভাবিকভাবেই ঘুম থেকে উঠেছিলাম। চোখ মেলে তাকাতেই বুঝলাম, আমার শরীরে কোনো জামাকাপড় নেই। আমি সম্পূর্ণ বিবস্ত্র। বিষয়টা বুঝতে পেরে আশেপাশে তাকাতেই দেখি, একটি মেয়ের লাশ শূন্যে ভাসছে। তার চোখ-মুখের অবস্থা ভীষণ ভয়াবহ! খুব খারাপভাবে কেউ তাকে খু/ন করেছিল। ভয়ে প্রাণ যায় যায় অবস্থা আমার। চারপাশে তাকিয়ে দেখি, আমার পরনের পোশাকগুলো মেঝেতে পড়ে আছে। কোনোরকমে জামাকাপড় পরে রুম থেকে বেরিয়ে আসি। পরে ভয়ে ভয়ে আবার রুমে ফিরে দেখি, সবকিছু একদম স্বাভাবিক! ভেবেছিলাম, হয়তো সবটাই আমার মনের ভুল। কিন্তু না, আমার ধারণা বদলে গেল পরের দিন সকালে। তারপর থেকে প্রতিদিন একই ঘটনা ঘটে চলছে। ঘুম থেকে ওঠার পর মনে হয়, আমি কারো সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছিলাম। তাছাড়া দিনের বেলায়ও নানা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটে। মনে হয়, আমার আশেপাশে কেউ আছে, সবসময় আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ”
ডাক্তার শিয়া মেহরাবের দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। লোকটার চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া না করার ফলে শারীরিকভাবে কিঞ্চিৎ দূর্বল, পাশাপাশি মানসিকভাবেও।
” এসব যখন ঘটে, তখন আপনার পরিবারের লোকজনকে কিছু বলেন না? তারা কি এসে লাশ দেখতে পায়?”
” বাসায় আমি একাই থাকি । পরিবার বলতে আমার আর কেউ নেই। ”
ডাক্তার শিয়া স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। লোকটা নিশ্চিত একা থাকতে থাকতে এসব কিছু হ্যালুসিনেট করছে। দীর্ঘদিন একা থাকলে মানুষ কখনো কখনো মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। মেহরাব শিয়ার দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
“বুঝতে পেরেছি। আপনি কাল আবার আসবেন। কিছু ওষুধ দিচ্ছি, এগুলো খেয়ে আজ রাতে ঘুমাবেন।”
“কিন্তু ডাক্তার, ঘুমালে যদি আবার কোনো মেয়ে খু/ন হয়!”
মেহরাবের চোখেমুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। ডাক্তার শিয়া তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে।
” আপনি নিজের মনকে বোঝান, এসবকিছুই আর হবে না। বাকিটা কাল দেখা যাবে। ”
সেদিন আরকিছু না বলে ডাক্তার শিয়ার চেম্বার থেকে বেরিয়ে আসে মেহরাব। বাসায় এসে বেশ মন খারাপ হয় তার। মেহরাব ভালো করেই বুঝতে পারছে ডাক্তার শিয়া তার কথা বিশ্বাস করেনি। সে ভাবছে, একাকীত্বের ফলে সবকিছু হ্যালুসিনেশন করছে। কিন্তু মেহরাব তো জানে, সে কোনো ভ্রম দেখছে না। সবকিছু সত্যি, সব! নাহ স্থির থাকতে পারছে না মেহরাব। কাছের বন্ধু মিরাজকে সবকিছু জানাবে বলে ঠিক করে সে। মিরাজকে সাথে নিয়ে ভালো হুজুর খুঁজবে। ডাক্তারের পাশাপাশি হুজুরের থেকেও চিকিৎসা নিবে । কিন্তু তার আগে মেহরাবের প্রাক্তন প্রেমিকা নুসরাতের সাথে কথা বলবে সে। কারণ গতমাসে যখন ওদের দুই বছরের সম্পর্কের ইতি ঘটেছিল, তখন নুসরাত রেগেমেগে বলেছিল মেহরাবকে সে শান্তিতে থাকতে দিবে না। দরকার পড়লে কালোজাদু করে মেহরাবকে নিজের করবে সে! বিষয়টা তখন আমলে না নিলেও এখন বেশ ভাবাচ্ছে মেহরাবকে। নুসরাত বড়োলোক বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে। মেহরাবের সাথে সম্পর্কে থাকলেও কখনো সুখী হয়নি দু’জন। সামান্য সামান্য বিষয় নিয়ে সব সময় ঝামেলা করতো নুসরাত। যাকে বলে পান থেকে চুন খসল তো ঝামেলা শুরু! তাই নুসরাতের প্রতি বিরক্ত হয়ে শেষমেশ মেহরাব নিজেই বিচ্ছেদের দেয়াল তৈরি করে দেয় দু’জনের মাঝে।
সেদিন বিকেলেই মিরাজের সাথে দেখা করে মেহরাব। মিরাজকে সবকিছু খুলে বলে। সে সবটা শুনে প্রাথমিকভাবে নুসরাতকে কল দিতে বলে। মেহরাব তাই করে। কিন্তু নুসরাতের সাথে কথা বলে তেমন কিছু মনে হয় না। ফলশ্রুতিতে মিরাজ মেহরাবকে নিয়ে আগামীকাল একজন ভালো হুজুরের কাছে যাবে বলে ঠিক করে।
মিরাজকে বিদায় দিয়ে মেহরাব ক্লান্ত শরীরে সন্ধ্যাবেলায় বাসায় ফিরে আসে। দু’দিনের অনিদ্রা, চিন্তা এবং ঠিকমতো খাওয়া না হওয়ার কারণে তার শরীর ভেঙে পড়েছে। গা থেকে ক্লান্তি মুছে ফেলতে সে লম্বা একটা গোসল করে। কিন্তু গোসল শেষ করে রুমে ফিরে আসতেই তার মনে হয়, চারপাশে যেনো এক অস্বাভাবিক ভারী অনুভূতি ছড়িয়ে আছে। ঘরের বাতাস কেমন যেন ঘন ও নিঃশব্দ হয়ে গেছে। হঠাৎ, বারান্দা থেকে কারো মৃদু নড়াচড়ার শব্দ শোনা যায়।
মেহরাব তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে কৌতূহল সংবরণ করতে ধীরে ধীরে বারান্দার দিকে এগিয়ে যায়। বারান্দায় পা রাখতেই তার গা শিরশির করে ওঠে। সেখানে, ধবধবে সাদা শাড়ি পরা এক মধ্যবয়সী মহিলা দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখের গড়ন একদম ফ্যাকাশে, চোখ দুটো গভীর অন্ধকারের মতো শূন্য আর স্তব্ধ। সেই শূন্য জায়গা থেকে রক্ত ও পুঁজ বের হচ্ছে। তার চুলগুলো ঢেউয়ের মতো খুলে আছে, আর হালকা বাতাসে মাঝে মাঝে সামান্য নড়ে ওঠে, যেন মৃত কেউ জীবনের চিহ্ন নিয়ে মেহরাবের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
মেহরাবের গলা শুকিয়ে যায়, হাত-পা কাঁপতে থাকে। ভয়ে ভয়ে একসময় ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে,
“কে… কে আপনি?”
মহিলা এক পলকও না নড়ে, শূন্য চোখে তাকিয়ে থাকে মেহরাবের দিকে। মুখে কোনো শব্দ নেই, তবুও তার চোখে ভাসছে এক গভীর শূন্যতা, যা যেনো মেহরাবের আত্মার ভেতর ছুরি বসিয়ে দিচ্ছে।
মেহরাবের পেট গুলিয়ে উঠেছে। শরীর খারাপ লাগছে। ছেলেটা ভয়ে চিৎকার করতে চাইলেও গলা থেকে কোনো আওয়াজ বের হলো না। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে, কোনোরকমে বারান্দা থেকে চলে আসে মেহরাব। নিজের রুমে এসে বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকে, দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে আসে, পুরো শরীর অবশ হয়ে যাচ্ছে। সবকিছু ভ্রম, নিজেকে এসব বুঝিয়ে শান্ত হতে চায়। একটু সময় নেবার পর, আবারও বারান্দার দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু এবার সেখানে গিয়ে দেখে, কেউ নেই! ঘরের অন্ধকারে মেহরাবের বুক থেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে। সবকিছুই দৃষ্টিভ্রম বলে নিজেকে বোঝায়।
তবে কিছুটা অস্থির হয়ে, রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষে ডাক্তার শিয়ার দেওয়া ঔষধগুলো খেয়ে ঘুমানোর উদ্দেশ্যে শুয়ে পড়ে। মনে মনে শান্তির খোঁজে, চোখ বন্ধ করে সে গভীর নিঃশব্দে ঘুমানোর চেষ্টা করে।
পরেরদিন সকালে যথারীতি ঘুম ভাঙে মেহরাবের। আবারো একইভাবে রুমে একটি অচেনা মেয়ের উলঙ্গ লাশ শূন্যে ভাসছে। সারা শরীরে আঘাতের দাগ মেয়েটির। চোখগুলো ফাঁকা, মানে চোখের কোটর শূন্য। সেই ফাঁকা জায়গায় সব রক্ত দিয়ে পূর্ণ। মেহরাব প্রচন্ড ভয় পাচ্ছে। নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে দেখে সে আজও বিবস্ত্র ! ভীষণ অসহ্য লাগছে তার। কোনোরকমে জামাকাপড় পরে বাসা থেকে বেরিয়ে যায় মেহরাব। উদ্দেশ্য মিরাজকে সাথে নিয়ে হুজুরের কাছে যাওয়া। কিন্তু তার আগে ডাক্তার শিয়ার কাছে যেতে হবে একবার। এভাবে চললে পাগল হয়ে যাবে সে। ভয়ে কলিজা শুকিয়ে গেছে মেহরাবের।
চলবে….
