#দ্বিতীয়_বউ
#পর্ব_৩
#আলভিয়া_সামরিন_রায়া
আজ সকালের বাতাসটা কেমন যেন ভারী লাগছিল আয়েশার কাছে। ভোরেই উঠে গেছে, তবুও শরীর ক্লান্ত। মাথা ঝিমঝিম করছে, হালকা বমি বমি ভাব।
রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে রুটি বেলতে বেলতে হঠাৎ থেমে গেল সে। চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে আসছে। গত কয়েকদিন ধরেই এমন হচ্ছে।
প্রথমে ভেবেছিল কাজের চাপ। কিন্তু আজ ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে তার বুক ধক করে উঠলো। তারিখগুলো গুনে গুনে মিলিয়ে নিতে গিয়ে হাত কেঁপে উঠলো।
“না… এটা কি সত্যি?” — নিজের মনেই বললো আয়েশা।
রোহিনীকে স্কুলে পাঠিয়ে সে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করলো। আলমারির ভেতর থেকে লুকিয়ে রাখা একটা ছোট্ট টেস্ট কিট বের করলো। হাত কাঁপছে, বুক কাঁপছে।
কয়েক মিনিটের অপেক্ষা যেন কয়েক ঘণ্টার সমান মনে হচ্ছে।
ফলাফল দেখার মুহূর্তে তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো।
দুটি স্পষ্ট দাগ।
আয়েশা ধপ করে বিছানায় বসে পড়লো। মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগলো হাজার চিন্তা। সে… মা হতে চলেছে?
চোখ ভিজে উঠলো তার। অদ্ভুত এক অনুভূতি—ভয়, আনন্দ, বিস্ময় সব মিলেমিশে একাকার।
পাঁচ বছরের দাম্পত্য জীবনে কোনোদিন মুখ ফুটে একটা সন্তানের কথা বলতে পারেনি। এই নতুন প্রাণ… হয়তো তার ভাঙা সংসারে নতুন আশার প্রদীপ হতে পারে।
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই আরেকটা চিন্তা মাথা চেপে ধরলো—রায়হান কী বলবে?
রায়হান তো বহুদিন ধরেই দূরে সরে আছে। সংসারের দায়িত্ব পালন করে, মেয়ের প্রতি কর্তব্যও পালন করে—কিন্তু আয়েশার প্রতি ভালোবাসা? কোনোদিন কি সে আয়েশাকে বুঝতে চেয়েছে?
সারাদিন মন অস্থির হয়ে রইলো। সাহেরা বেগমের সামনে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলো, কিন্তু শাশুড়ির তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়াতে পারলো না।
দুপুরে সাহেরা বেগম হঠাৎ বললেন,
— “কী হয়েছে তোমার? মুখ শুকনো কেন?”
আয়েশা চমকে উঠলো।
— “না… কিছু না।”
সাহেরা বেগম ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন,
— “দেখো, আবার যদি কোনো ঝামেলা বাঁধাও, আমি কিন্তু চুপ করে থাকবো না।”
কথাটা শুনে আয়েশার বুক ধক করে উঠলো। তিনি কি কিছু আঁচ করতে পেরেছেন?
বিকেলে রোহিনীকে নিয়ে সময় কাটালেও তার মন অন্য কোথাও। ছোট্ট মেয়েটা খুশিতে গল্প করছে, আর আয়েশা বারবার পেটের ওপর হাত রেখে অনুভব করতে চাইছে—ভেতরে কি সত্যিই একটা প্রাণ বেড়ে উঠছে?
রাত হলো। রায়হান ফিরলো স্বাভাবিক মতোই—ক্লান্ত, চুপচাপ। খাবার টেবিলে নীরবতা। রোহিনী নিজের গল্প বলে চলেছে।
রোহিনী ঘুমিয়ে পড়ার পর আয়েশা সাহস সঞ্চয় করলো। আজ না বললে আর পারবে না।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা রায়হানের পাশে গিয়ে ধীরে বললো,
— “আপনার সাথে একটা কথা ছিল…”
রায়হান চোখ না তুলেই বললো,
— “কী কথা?”
আয়েশার গলা শুকিয়ে গেলো। তবুও বললো,
— “আমি… মনে হয় মা হতে চলেছি।”
কয়েক সেকেন্ডের জন্য চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর রায়হান ধীরে মাথা তুললো। তার চোখে কোনো বিস্ময় নেই, কোনো আনন্দ নেই। চোখ দেখে বোঝার উপায় নেই ভেতরে কী চলছে।
— “তুমি নিশ্চিত?”
— “হ্যাঁ… আজ টেস্ট করেছি।”
রায়হানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো। রেলিং থেকে সরে এসে কঠিন গলায় বললো,
— “এই বাচ্চা আমরা রাখবো না।”
আয়েশার বুক কেঁপে উঠলো।
— “মানে?”
— “মানে খুব সোজা। আমার আর সন্তান দরকার নেই।
একটা মেয়ে আছে। আমি আর কোনো ঝামেলা চাই না।”
“ঝামেলা?” — শব্দটা যেন আয়েশার কানে বাজলো।
— “তুমি কালই ডাক্তারের কাছে যাবে। এবোরশন করাতে হবে।”
আয়েশা যেন জমে গেলো।
— “আপনি… আপনি চাইছেন আমি আমার সন্তানকে মেরে ফেলি?”
রায়হান বিরক্ত হয়ে বললো,
— “ড্রামা করো না।”
এই কথাটা যেন তার বুক চিরে গেলো। পাঁচ বছর আগে যখন রোহিনী আসছিলো, তখনও কি সে এমন ছিল? না-কি এটা আয়েশার সন্তান বিধায় আজ এই ব্যবহার। না-কি সময়ই মানুষটাকে বদলে দিয়েছে?
আয়েশার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো।
— “আমি পারবো না। আমি এটা পারবো না।”
রায়হান গম্ভীর গলায় বললো,
— “তাহলে ভেবে নাও। আমার সিদ্ধান্ত বদলাবে না।”
আয়েশা আর কিছু বললো না। কোনোরকমে কান্না চেপে রোহিনীর পাশে গিয়ে শুয়ে পড়লো। ঘুম কি আদৌ আসবে?
রায়হান এখনো বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইলো।
সকালবেলা রোহিনী টেবিলে বসে নাস্তা করছে। রায়হান রেডি হয়ে নিচে এলো।
আয়েশা রোহিনীর পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
রায়হান ঠাণ্ডা গলায় বললো,
— “একটু পর রেডি থাকবে। একটা কাজ শেষ করে এসে তোমায় নিয়ে হাসপাতালে যাবো। কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। আমি সিদ্ধান্ত পাল্টাবো না।”
ঠিক তখনই পেছন থেকে সাহেরা বেগমের কণ্ঠ ভেসে এলো,
— “কীসের সিদ্ধান্ত?”
দুজনেই চমকে তাকালো।
রায়হান দ্রুত বললো,
— “রোহিনী, ভেতর থেকে স্কুল ব্যাগ নিয়ে এসো। ফাস্ট।”
— “ওকে বাবা।”
রোহিনী ভেতরে চলে যেতেই সাহেরা বেগম আয়েশার দিকে এগিয়ে এসে নিচু গলায় বললেন,
— “পেট বাঁধিয়েছো নাকি?”
আয়েশা লজ্জায় মাথা নিচু করলো। নিজের সন্তান চাওয়া কি পাপ?
সাহেরা বেগম ঠাণ্ডা গলায় বললেন,
— “এই সংসারে আরেকটা বাচ্চা আনলে সংসার ভেঙে যাবে। রায়হান ঠিকই বলেছে। আজকের মধ্যে ব্যবস্থা করো।”
চারপাশ যেন অন্ধকার হয়ে এলো আয়েশার কাছে।আমি একা… একদম একা।
রায়হান আর কোনো কথা না বলে ভেতরে চলে গেলো। সাহেরা বেগমও সরে গেলেন।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে আয়েশা পেটের ওপর হাত রাখলো। চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে অবিরত।
“তুমি কি শুনছো? তোমার বাবা তোমাকে চায় না…” ফিসফিস করে বললো আয়েশা।
তার ভেতরে অদ্ভুত এক শক্তি জেগে উঠলো। মা হওয়া মানে শুধু জন্ম দেওয়া নয়, রক্ষা করাও দায়িত্ব।
কিন্তু সে কি পারবে একা লড়তে? এই বাড়িতে, যেখানে তার অস্তিত্বই প্রশ্নবিদ্ধ?
দুপুর হয়ে এলো। রায়হান এখনো ফেরেনি। ঘরে ফিরে টেবিলের উপর রাখা রোহিনীর ছবিটা হাতে নিলো আয়েশা। ছোট্ট মেয়েটার মুখে যেন মায়ার শেষ নেই।
সে ভাবলো—যদি রোহিনী না থাকতো, তাহলে হয়তো এতদিনে সে ভেঙে পড়তো। হয়তল সংসার টা ও থাকতো না।
কিন্তু এখন? তার ভেতরে আরেকটা প্রাণ। কী হবে, কিছুই বুঝতে পারছে না।
তবুও বুকের ভেতর একটাই প্রতিজ্ঞা জন্ম নিলো—
“আমি মা। আমার সন্তানের জন্য আমি লড়বো।”
ঠিক তখনই বাইরে গাড়ির হর্নের শব্দ শোনা গেলো। রায়হান এসেছে।
তবে কি সত্যিই বাচ্চাটা রাখা হবে না…?
চলবে…..?
ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
