#দ্বিতীয়_বউ
#পর্ব_৫
#আলভিয়া_সামরিন_রায়া
রায়হান আয়েশাকে আলমারির সঙ্গে চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
— “তোমার সমস্যা কী বলো? পাগল হয়ে গেছো?”
আয়েশার মাথা এখনও ঘুরছে। পিঠে ব্যথা করছে। তবুও সে কোনো উত্তর দিল না।
রায়হান আবার বললো,
— “একটা বাচ্চা গেছে তো কী হয়েছে?এত নাটক করার কী আছে?”
এই কথাটা যেন বিষ হয়ে ঢুকে গেলো আয়েশার রক্তে। ক্ষোভে ফেটে পড়লো।
— “নাটক?” ও আপনার ও বাচ্চা। নিজের বাচ্চার জন্য আপনার মনে একটু ও মায়া নেই? আপনি খুনি।খুন করেছেন আমার বাচ্চা কে। এরপর ও বলছেন আমি নাটক করছি?
রায়হান থামলো না।
— “হ্যাঁ, নাটক!
তোদের কী আছে বল? আমি ছেড়ে দিলে কোথায় যাবি? বাপের বাড়িতে? কতদিন রাখবে তোকে? দুইদিন পরই আবার ফিরিয়ে দেবে। তখন কোথায় দাঁড়াবি?”
প্রতিটা শব্দ যেন আয়েশার আত্মসম্মানে ছুরি বসাচ্ছে।
— “আমি না থাকলে তোর কিচ্ছু থাকবে না। মাথার ওপর ছাদটা পর্যন্ত আমার দয়ায় পাওনা।”
আয়েশা ঠোঁট কামড়ে ধরলো।এত অপমান!
কেনো বিয়ে করেছেন আমাকে? আপনি জানতেন না আমাদের কিছু নেই।
রোহিনীর জন্য করেছি। যাতে ও ভালো থাকে।
— “আজ রোহিনীর সঙ্গে যা করেছো… যদি ওর কিছু হয়ে যেত?তোমাকে আমি এক মুহূর্তও এই বাড়িতে রাখতাম না।”
সন্তান এর জন্য দয়া-মায়া আছে না-কি আপনার? আজকে যদি রোহিনী কি..
হঠাৎই রায়হান আয়েশাকে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে এক থাপ্পড় দিলো।
চড়ের শব্দটা এত তীব্র ছিলো যে মনে হচ্ছে পুরো রুম কেঁপে উঠলো।
আয়েশার মাথার একপাশে কেঁপে উঠলো। ঠোঁটের কোণ দিয়ে রক্তের স্বাদ পেলো সে।
— রোহিনী কে নিয়ে একটা বাজে কথা ও বলবি না।ও আমার মেয়ে। ওকে আমি সবসময় আগলে রাখবো।
হঠাৎ আয়েশা হেসে ফেললো। অদ্ভুত ভাবে হেসে বললো,
— “মারুন। সব শেষ তো করেই দিয়েছেন। আর কী বাকি?আমাকে ও মেরে ফেলুন।
রায়হান থমকে গেলেও রাগে অন্ধ হয়ে আয়েশা কে ধাক্কা দিলো। বলে উঠলো,
— “নিজেকে ঠিক করো। না হলে… ভালো হবে না।” যেভাবে আছো ওইভাবে থাকো রোহিনী কে নিয়ে। নাহলে তোমাকে তালাক দিতে আমার পাঁচ সেকেন্ড ও লাগবে না।
শব্দ করে দরজা খুলে রায়হান বেরিয়ে গেলো।
ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে রইলো। আয়েশা ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়লো। তার কান ঝাঁ ঝাঁ করছে। চোখের সামনে ভাসছে ছোট্ট একটা মুখ… যে কোনোদিন পৃথিবীর আলো দেখলো না।
তোমার বাবা তোমাকে অস্বীকার করেছে।তুমি তার মেয়ে না। ভালো হয়েছে তুমি চলে গেছো। নাহলে এই বাড়িতে এসে পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ বাবার সম্মুখীন হতে তুমি।
রায়হান আর রুমে আসে নি। মাঝরাতে আয়েশা নিঃশব্দে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়ালো। গালে আঙুলের দাগ। ঠোঁট ফুলে আছে।
সে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললো,
— “তুমি দুর্বল না। তুমি কাঁদবে না।”
তোমাকে ওদের শাস্তি দিতে হবে। শক্ত হও আয়েশা।
–
রান্নাঘর থেকে ভাজার গন্ধ ভেসে আসছে।কেউ রান্না করছে।
সাহেরা বেগম প্রথমে ভেবেছিলেন, আজ বাড়িতে রান্না বান্না হবে না।নিজেকে করতে হবে সব। আয়েশা এই বাড়িতে আসার পর থেকে আয়েশাকে হুকুম দিয়ে সব করিয়েছে। কিন্তু রান্নাঘরে গিয়ে তিনি থমকে গেলেন।
আয়েশা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে চুল বাঁধা, পরিষ্কার শাড়ি পরে রান্না করছে। সাহেরা বেগম কে দেখে বললো,
— “চা দেবো মা?”
সাহেরা বেগম অবাক হয়ে তাকালেন। আয়েশা এমন ভাবে কথা বলছে যেন কাল রাতের কিছুই ঘটেনি।
টেবিলে দাও বলে সাহেরা বেগম দ্রুত রান্নাঘর পরিত্যাগ করলো। রায়হান এসে টেবিলে বসেছে। আয়েশাকে স্বাভাবিক ভাবে কাজ করতে দেখে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।
আয়েশা নাস্তা নিয়ে এলো। যার যার প্লেটে খাবার তুলে দিলো।
আয়েশা শান্ত গলায় বললো,
রোহিনীর হাত টা বেশি পুড়েছে?
না।ওষুধ দিয়েছি। সেরে যাবে।
সাহেরা বেগম বললেন।
আমি রোহিনীর কাছে যাচ্ছি।
আয়েশা সাহেরা বেগম এর রুমের দিকে অগ্রসর হলো।
কিন্তু,পিছনে থাকা দু’জন অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
আয়েশা রুমে গিয়ে রোহিনীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো।
— “কাল মা ভুল করেছে। রাগ করো না।”
রোহিনী হাসলো।গলা জড়িয়ে ধরে বললো,
— তুমি আর কাঁদবে না তো?”
আয়েশা মৃদু হাসলো।
— “না।”
আয়েশা রোহীনি কে নিয়ে খাবার টেবিলে বসলো।
সবার খাওয়াদাওয়া শেষ হলে আয়েশা বললো,
— “আমি একটু বাজারে যাচ্ছি।”
কেউ কিছু বললো না। রায়হান উঠে রোহিনীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলো।
একটু পর আয়েশা ও বেরিয়ে গেলো।
মুদি দোকানে গিয়ে সে খুব স্বাভাবিক গলায় বললো,
— “ইঁদুর মারার ওষুধ আছে?”
দোকানদার প্যাকেটটা এগিয়ে দিলো।
—ছোট বাচ্চাদের থেকে দূরে রাখবেন।
আয়েশা শুধু মাথা নেড়ে বাড়ি ফিরলো।
আয়েশা আজকে রাতে নিজ হাতে গুছিয়ে রান্না করলো, ভাত, ডাল, আলুর ভর্তা, ডিমের কারি।
খাওয়ার সময় সবাই টেবিলে বসলো।
রোহিনী হঠাৎ বললো,
— “আমি আজ দাদুর হাতে খাবো।”
সাহেরা বেগম হাসলেন।
— “আয়, আমার পাশে বস।”
কিন্তু আয়েশা বাঁধা দিলো। বললো,
মা,তোমার জন্য খিচুড়ি রান্না করেছি। তুমি না বললে বিকালে খাবে। এসো।
রোহিনী খুশি হয়ে গেলো। তাড়াতাড়ি করে আয়েশার কাছে গিয়ে বসলো।
আয়েশা প্লেট এর মধ্যে খিচুড়ি নিয়ে অল্প অল্প করে রোহিনী কে খাওয়াচ্ছে।
রায়হান ফোনে কিছু একটা দেখতে দেখতে খাচ্ছে।
আয়েশা উঠে হাত ধুয়ে নিলো। এরপর খাবার টেবিলের মাঝখানে রাখা ডালের বাটিটা সে নিজে পরিবেশন করলো। কারও প্লেটে একটু বেশি, কারও একটু কম।
কিন্তু নিজের প্লেট সে নিলো না।
— “তুমি খাচ্ছো না?” রায়হান জিজ্ঞেস করলো।
—আয়েশা স্বাভাবিক ভাবে উওর দিলো।
—“খাবো পরে“।
কয়েক মিনিট পর সাহেরা বেগম কপাল কুঁচকে বললেন,
— “কেমন যেন লাগছে শরীরটা…”
রায়হান ও গ্লাসের পানি ধরতে গিয়ে হাত কাঁপতে লাগলো।
— “আমার…
কথা শেষ করার আগেই তার গলা শুকিয়ে গেলো।
সাহেরা বেগম মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন। রায়হান ও চেয়ার থেকে পড়ে গেলো।
রায়হান শ্বাস নিতে পারছে না। চোখ বিস্ফারিত হয়ে আয়েশার দিকে তাকালো।
আয়েশা ধীরে ধীরে দাঁড়ালো।তার মুখে অদ্ভুত শান্তি।
— “মা!” বাবা?
আয়েশা তাকালো। চোখে পানি টলমল করছে।
চলবে….?
ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
