#দ্বিতীয়_বউ
#পর্ব_৭ (সমাপ্তি পর্ব)
#আলভিয়া_সামরিন_রায়া
রোহিনী এসে আয়েশাকে বললো,
— মা, বাবা তোমাকে ডাকছে।
আয়েশা একটু থেমে রোহিনীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠলো।
এই ডাকটার জন্যই যেন এতক্ষন অপেক্ষা করছিল।
আয়েশা ধীরে ধীরে রায়হানের রুমের দিকে এগিয়ে গেল।
রুমে ঢুকতেই দেখলো রায়হান বিছানায় বসে আছে। পাশে সাহেরা বেগম আর মারিয়াম বেগম বসে আছে। পরিবেশটা অদ্ভুত ভারী মনে হচ্ছে আয়েশার কাছে।
আয়েশা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় বললো,
— ডাকছিলেন?
রায়হান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো। তারপর ঠান্ডা গলায় বললো,
— হ্যাঁ। বসো।
আয়েশা বসল না। একইভাবে দাঁড়িয়ে রইল।
— যা বলার দাঁড়িয়েই শুনবো।
রায়হান কিছুটা বিরক্ত হলো। তারপর বললো,
— আমি সোজা কথা বলবো। তোমার সাথে আমার আর থাকা সম্ভব না।
রুমের ভেতর মুহূর্তেই নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
রায়হান আবার বললো,
— আমি তোমাকে ডিভোর্স দিতে চাই।
আয়েশার চোখে এক মুহূর্তের জন্য একটা ঝিলিক দেখা গেলো। কিন্তু সেটা খুব দ্রুত মিলিয়ে গেলো।
সে ধীর স্বরে বললো,
— কারণ?
সাহেরা বেগম তখনই বলে উঠলেন,
— কারণ আবার কী! তুই এই বাড়ির অশান্তি। আমার ছেলে তোকে নিয়ে আর থাকতে চায় না। তুই আমাদের মেরে ফেলতে চেয়েছিস। তোকে এই বাড়িতে থাকতে দেয়া যাবে না।
মারিয়াম বেগম তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললো,
— তোর মতো মেয়েকে তো অনেক আগেই বের করে দেওয়া উচিত ছিল।
রায়হান একটা কাগজ এগিয়ে দিলো।
— এখানে সাইন করে দাও। সব শেষ হয়ে যাবে।
আয়েশা কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইলো। ভেবেছিলো রায়হান মারবে,কথা শুনাবে। এই সিদ্ধান্ত নিবে যে কল্পনা ও করে নি আয়েশা।
এই সংসারে কত অপমান, কত কষ্ট, কত অবহেলা সহ্য করেছে সে। একটা সময় সে ভেবেছিলো ভালোবাসা দিয়ে সব ঠিক করে ফেলবে।
কিন্তু…
আয়েশা ধীরে ধীরে কলমটা তুলে নিলো।
এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করতেই রোহীনির মায়াবী মুখ চোখের সামনে ভেসে উঠলো। রায়হানের সাথে কাটানো পাঁচ টা বছর,চাইলে কী সব ভুলে থাকা যায়? এই সংসার টা তার কোনদিন ছিলো না। তবুও এই সংসার টা কে আপন করে নিয়েছে। কী করে থাকবে এত কিছু ভুলে?
আয়েশা নিজেকে শক্ত করলো। গলা দিয়ে কথা বের হচ্ছে না। কথা বলতে গিয়ে কান্না চলে আসছে। তবুও কোনমতে কান্না চেপে বললো,
আমি রোহিনীর সাথে দেখা করতে আসবো। আপনারা যদি না চান তবুও আসবো। ও আমার মেয়ে। এই সংসারে আমি রোহীনি কে আগলে ধরে ছিলাম।আমি..
আয়েশা আর কিছু বলতে পারছে না। এত কষ্ট কেনো হচ্ছে?
রায়হান আয়েশার দিকে শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এত বছরের সংসার কোথাও কোনো একটা মায়া কাজ করছে।
ধীর কন্ঠে বললো,
“তুমি যখন খুশী আসতে পারো।”
আয়েশা আর কিছু না ভেবে সাইন করে দিলো। পাঁচ বছরের সংসার এখানেই শেষ।
রায়হান একটু অবাক হলো।
সে ভাবেনি আয়েশা এত সহজে রাজি হবে।
আয়েশা শান্ত গলায় বললো,
— আর কিছু বলবেন?
কেউ কিছু বললো না।
আয়েশা রুমটাতে একবার চোখ বুলিয়ে নিলো।এই রুমে থাকার আর অধিকার নেই।আয়েশা ধীরে ধীরে রুম থেকে বের হয়ে গেল।
রোহিনী তখন বারান্দায় খেলছিল। আয়েশা এসে তাকে কোলে তুলে নিলো।
— মা, তুমি কাঁদছো?
আয়েশা জোর করে হাসলো।
— না তো।
সে রোহিনীর কপালে একটা চুমু দিলো। শক্তি করে জড়িয়ে ধরলো।
— তুমি ভালো মেয়ে হয়ে থাকবে, ঠিক আছে?
— তুমি কোথায় যাবে মা?
— একটু বাইরে।
রোহিনী কিছু বুঝতে পারলো না। মাথা নেড়ে আবার খেলায় মেতে উঠলো।
রাত গভীর হলো। আয়েশা রান্নাঘরে জিনিস গুলোকে ছুঁয়ে দেখছে। চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে। অস্পষ্ট ভাবে বললো,
কী করে থাকবো আমি? কেন এত কষ্ট হচ্ছে? কোথায় যাবো আমি?
শেষ বারের মতো সবকিছু চোখ বুলিয়ে নিলো।
আয়েশা ধীরে ধীরে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো।
আজকে আকাশটা অদ্ভুত শান্ত। চারপাশে নিস্তব্ধতা।
আয়েশা হাঁটতে লাগলো গন্তব্যহীন পথে।
তার মনে হচ্ছিল বুকের ভেতর জমে থাকা সব কষ্ট যেন আজ বেরিয়ে আসতে চাইছে। বিয়ের পর থেকে এই বাড়িতে সে ছিল শুধু বোঝা।
কেউ তাকে বোঝার চেষ্টা করেনি।কেউ তার পাশে দাঁড়ায়নি।স্বামী থকেও সে স্বামীর ভালোবাসা পায়নি।
শাশুড়ির কাছে সে ছিল শুধু অপছন্দের মানুষ।
একটা সময় সে ভেবেছিল এই সংসারটাই তার পৃথিবী।
কিন্তু আজ বুঝলো, সে এখানে কখনোই আপন ছিল না।
আয়েশা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে রইলো।চোখ দিয়ে নীরবে পানি পড়ছে।
আয়েশা রাস্তা পার হতে গেলো।ঠিক তখনই হঠাৎ একটা ট্রাক দ্রুত গতিতে সামনে দিয়ে আসছিল।
ড্রাইভার ব্রেক করলেও ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।
একটা বিকট শব্দ হলো। চারপাশে মানুষ ছুটে এলো।
রাস্তার মাঝে পড়ে আছে আয়েশা।চোখ দুটো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে আসছে।
শেষবারের মতো তার মনে পড়লো রোহিনীর মুখটা।
ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে সে ফিসফিস করে বললো,
— আমার মেয়েটাকে ভালো রেখো আল্লাহ…
তারপর সব নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
–
পরদিন সকালে খবরটা যখন রায়হানদের বাড়িতে পৌঁছালো, পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সাহেরা বেগম এর চোখে ও পানির আভাস দেখা গেলো। আর রায়হান?
রায়হান শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। রোহিনী কিছুই বুঝতে পারছিল না।
সে শুধু বারবার বলছিল,
— আমার মা কোথায়?
কেউ উত্তর দিতে পারছিল না।
“আয়েশা হয়তো নিজে হাতে মৃত্যুকে ডাকেনি। কিন্তু তাকে এমন এক জায়গায় ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, যেখানে বেঁচে থাকাটাই আর সম্ভব ছিল না। এই সংসারে সে এসেছিল দ্বিতীয় বউ হয়ে, আর তাই নিজের সংসারেও কোনোদিন প্রথম হয়ে ওঠা হয়নি তার।”
“একটা অবহেলিত সংসার শেষ পর্যন্ত একটা জীবনের ইতি টেনে দিল। কিছু মানুষ শুধু একটু ভালোবাসা চায়, সবকিছু নিয়ে সুখে থাকতে চায়। কিন্তু তাদের চারপাশে থাকা মানুষের অবহেলা আর নিষ্ঠুরতা ধীরে ধীরে সেই মানুষটাকেই শেষ করে দেয়।”
সমাপ্ত।
