#_ডাকঘর_
#_মারিয়া_রশিদ_
#_পর্ব_৪_
ফিরোজ রহমান হেলান দিয়ে বেডে বসে আছে। হাত দুটো হাঁটুতে ঠেকিয়ে রেখেছে, চোখগুলো কিছুটা গম্ভীর, মুখের কোণে চিন্তার রেখা ফুটে আছে। পাশে চেয়ারটিতে বসে আছে পাখি বেগম। হাতে প্লেট, ফল কেটে সাজানো। পাখি বেগম স্বামীকে এমন চুপচাপ দেখে বলে ওঠে,
–” কি হয়েছে তোমার?”
ফিরোজ রহমান হালকা করে মাথা নেড়ে তাকালেন। ধীরে ধীরে বললেন,
–” শুভ্র ছেলেটাকে কোথায় যেন দেখেছি।”
–” মানে? কোথায় দেখেছো?”
ফিরোজ রহমান ভ্রু সামান্য কুঁচকে, কিছুটা চিন্তায় গলাকাটা স্বরে বললেন,
–” তাতো জানি না। কিন্তু বিশেষ করে শুভ্রের চোখ দুটো খুব চেনা মনে হলো। অনেকবার দেখেছি, সেরকমই লাগছিলো।”
পাখি বেগম চোখ বড় করে তাকালেন, হাসিমিশ্র কণ্ঠে বললেন,
–” কিসব বলছো বলোতো?”
–” ঠিকই বলছি! বিশ্বাস করো, পাখি।”
–” থামো। এতো সব না ভেবে। ধরো এই ফলগুলো খাও।”
বলেই তিনি ফিরোজ রহমানের সামনে প্লেট এগিয়ে দিলেন। ধীরে ধীরে তিনি ফিরোজ রহমানের মুখে এক টুকরো ফল তুলে দিলেন। ফিরোজ রহমান আর বেশি না ভেবে খেতে লাগলেন। ঠিক সেই সময় কেবিনের দরজাটা খুলে পুষ্পিতা ভেতরে ঢুকে। এক পলক চোখ বুলিয়ে নিলো বাবা-মায়ের দিকে। তারপর, সে এবার পিয়াসের দিকে এগিয়ে যায়। পিয়াস তখন বসে চকলেটের মোড়কটা নেড়েচেড়ে দেখছে। পুষ্পিতা কাছে এসে বললো,
–” আগে থেকে চকলেটটা খুলো না। আমি খাবার নিয়ে আসি, খাবার শেষ করে তারপর খুলবে।”
পিয়াস মুখ কুঁচকে তাকালো।
–” ওকে। কিন্তু, এখন আমি কী খাবো? বাসা থেকে কী এনেছো?”
–” ভাত, ডাল, আলু ভাজি আর রুই মাছ ভুনা।”
পিয়াস সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁট উল্টে বললো,
–” মাংস কেন আনোনি, আপুনি?”
এই প্রশ্নে পুষ্পিতার কণ্ঠে একটু রাগ ঢুকে গেলো,
–” তোমার সব সময় মাংস, তাই না? এতো মাংস খাওয়া যাবে না। এখন চুপচাপ বসো, আমি খাবার নিয়ে আসছি। শান্ত ছেলের মতো থাকবে।”
পিয়াস আর কিছু বললো না। ঠোঁট উল্টে চুপ করে বসে রইলো। তার এই অভিমানী চেহারা দেখে ফিরোজ রহমান আর পাখি বেগম একে অপরের দিকে তাকিয়ে হালকা করে হেসে উঠলেন। অসুস্থতার মাঝেও সন্তানের এমন ছোট ছোট আবদার যে কতটা জীবনের, তা তাঁদের চোখেই ফুটে উঠলো। পুষ্পিতা খাবার বেড়ে নিয়ে এসে প্রথমে মায়ের দিকে তাকালো।
–” মা, বাবার ফল খাওয়া হয়ে গেলে তুমি ভাত খেয়ে নিও।”
পাখি বেগম আদুরে স্বরে বললেন,
–” আচ্ছা, আমি খেয়ে নেবো। তুই আগে পিয়াসকে খাইয়ে দে, তারপর নিজেও খেয়ে নিস। গতকাল থেকে তোর অনেক ধকল যাচ্ছে।”
–” ঠিক আছে!”
পুষ্পিতা ডাল দিয়ে ভাত মেখে তাতে একটু মাছ তুলে পিয়াসের দিকে বাড়িয়ে দিলো। পিয়াস চুপচাপ মুখ খুলে খেতে লাগলো। কোনো বায়না নেই, কোনো অভিযোগ নেই। অথচ এই খাবারগুলো তার একদমই পছন্দের না। বাসায় থাকলে এখন অন্তত ডিম ভাজির জন্য জেদ ধরতো সে। কিন্তু, হাসপাতালের সাদা দেয়াল, চারপাশের নিস্তব্ধতা আর বাবার অসুস্থ মুখটা দেখে পিয়াস আজ নিজের সেই বায়নাটাকে নিঃশব্দে বিদায় জানালো।
…
বিকেল বেলা!!
শুক্রবার মানেই শহরের অন্যরকম একটা রূপ। অফিস আদালতের ব্যস্ততা নেই, কিন্তু অলসতাও নেই। বরং, মানুষ যেন এই একটা দিনের জন্য সারা সপ্তাহের জমে থাকা ক্লান্তিটা ঝেড়ে ফেলতে বেরিয়ে পড়ে। পার্ক, ফুটপাত, রেস্তোরাঁ, সবখানেই মানুষের ভিড়। পরিবার নিয়ে, বন্ধু নিয়ে, কেউ আবার একা একা, শহরটা যেন আজ একটু বেশি জীবন্ত।
শুভ্র বসে আছে ছাদের ওপর বানানো এক ক্যাফেটেরিয়ায়। চারপাশটা খোলামেলা। ওপরে আকাশ, চারদিকে শহরের আলো-আঁধারি। হালকা ঠান্ডা হাওয়া বইছে। আকাশে পাতলা মেঘ জমেছে। বৃষ্টির আগমুহূর্তের ঠান্ডা বাতাসে একটা শান্তি লুকিয়ে থাকে, যেটা অকারণেই মন ভালো করে দেয়।
শুভ্রর হাতে থাকা ফোনটার স্ক্রিন জ্বলে উঠছে বারবার। শুভ্র মনোযোগ দিয়ে কারো সাথে চ্যাট করছে। তার ঠিক উল্টো পাশে বসে আছে জেরিন আর রোহান। জেরিন চোখ সরু করে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে ওঠে,
–” কিরে? কী হয়েছে তোর? এমন করে ফোনে ঝুলে আছিস। তুই তো এমনিতে কারোর সাথেই খুব একটা টেক্সট করিস না।”
শুভ্র চোখ না তুলেই সংক্ষিপ্ত উত্তর দেয়,
–” এমনি।”
জেরিন সন্দেহের দৃষ্টি সরায় না।
–” এমনি মানে কী?”
রোহান মুচকি হেসে বলে ওঠে,
–” কাউকে পেয়ে গেছে মনে হয়।”
জেরিন কটমট করে তাকায় রোহানের দিকে। শুভ্র এবার ফোন থেকে চোখ তুলে তাকায়। হালকা বিরক্তি আর চাপা লজ্জা মিশ্রিত দৃষ্টিতে।
–” আজব! কিছুই হয়নি।”
জেরিন চেয়ার ঠেসে হেলান দিয়ে বসে।
–” আচ্ছা বাদ দে। কী খাবি? জুস?”
–” না! কোল্ড কফি খাবো।”
–” ওকে!”
জেরিন আর রোহান দুজনেই উঠে দাঁড়ায়। ক্যাফেটের ভেতরের দিকে চলে যায় অর্ডার দিতে। শুভ্রর ফোনটা বেজে ওঠে। শুভ্র এক মুহূর্তের জন্য স্ক্রিনের দিকে তাকায়। যেন এই কলের অপেক্ষায় ছিলো সে। তাড়াতাড়ি সে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
–” আমি একটু কথা বলে আসছি।”
জেরিন কিছু বলার আগেই শুভ্র ছাদের একদম কোণার দিকে হেঁটে যায়। সেখানে আলো একটু কম, হাওয়া একটু বেশি। শহরের নিচের কোলাহলটা এখানে এসে যেন হালকা হয়ে যায়। শুভ্র কল রিসিভ করে।
–” পুষ্প! চলে গেছো বাসায়?”
ওপাশ থেকে পুষ্পিতার কণ্ঠ ভেসে আসে, ক্লান্ত কিন্তু শান্ত,
–” জি! চলে এসেছি। একটু আগেই আসলাম। আমি একটু পর কল করছি, ফ্রেশ হয়ে নিই।”
–” ওকে!”
কল কেটে যায়। শুভ্র কিছুক্ষণ ফোনটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে পকেটে ঢুকিয়ে দেয়। মুখে কোনো হাসি নেই, আবার বিষণ্ণতাও নয়, এক ধরনের গভীর ভাবনায় ডুবে থাকা চেহারা। এই দৃশ্যটা দূর থেকেই লক্ষ্য করছিল জেরিন। শুভ্রকে এমন করে উঠে যেতে দেখে তার ভ্রু দুটো অজান্তেই কুঁচকে যায়। রোহান সেটা খেয়াল করে বলে ওঠে,
–” মনে হয় অফিস কল। এতো আপসেট হচ্ছিস কেন?”
জেরিন চোখ না সরিয়েই বলে,
–” আজ অফিস ছুটির দিন। আর অফিস কল হলে এমন করে কি উঠে যায় ও? আগে কখনো দেখেছিস?”
রোহান কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়। তারপর একটু গম্ভীর গলায় বলে,
–” আমি কতোদিন ধরে তোকে বলেছি, বলে দে মনের কথাটা। তুই তো বললি না।”
জেরিন ধীরে মাথা নামিয়ে নেয়। চোখে হালকা অস্থিরতা।
–” ভয় লাগে, রোহান! ভালোবাসা পেতে গিয়ে যদি বন্ধুত্ব হারিয়ে ফেলি?”
রোহান হালকা করে হাসে। কিন্তু সেই হাসিতে কোনো আনন্দ নেই। মনে মনে সে বলে ওঠে,
–” এই একই ভয়েই তোকেও আমি মনের কথা বলতে পারি না।”
ঠিক তখনই শুভ্র ফিরে আসে। তার সঙ্গে সঙ্গেই ওয়েটার কোল্ড কফি আর কিছু স্ন্যাক্স টেবিলে রেখে যায়। শুভ্র বসে পড়ে। জেরিন আর রোহান কেউই আর কিছু জিজ্ঞেস করে না। তিনজনেই গল্প করতে থাকে। হাসি আছে, কথাবার্তা আছে, কিন্তু তিনজনের মনেই আলাদা আলাদা একেকটা কথা চাপা পড়ে থাকে, যেগুলো কেউই মুখে আনে না।
…
ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামছে। পুষ্পিতা জানালার ধারে বসে আছে। জানালার ফাঁক গলে বাইরে তাকালেই চোখে পড়ে ধূসর আকাশ, যেখানে হালকা মেঘের আনাগোনা। বর্ষার আগমনী বার্তার মতোই তারা ভেসে বেড়াচ্ছে। এই মেঘে আজ বৃষ্টি নামবে না, তবুও আকাশে মেঘের এমন এলোমেলো উড়াউড়ি দেখতে ভালো লাগে।
আজ এক সপ্তাহ পর বাবাকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছে পুষ্পিতা। এই এক সপ্তাহ যেন সময়ের হিসেবে নয়, ধকলের হিসেবে কেটেছে। পুষ্পিতার জীবনে এই কয়টা দিন ছিলো ভীষন ব্যস্ত সময়। বাবার প্রতি সারাক্ষণ নজর রাখা, ডাক্তারদের সাথে কথা বলা, সময়মতো টেস্ট করানো, ওষুধের হিসাব রাখা, একটার পর একটা দায়িত্ব। তার মাঝেই পিয়াসকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া, স্কুল থেকে এনে ফ্রেশ করানো, তড়িঘড়ি রান্না সেরে আবার হাসপাতালে ছুটে যাওয়া। রাত জেগে বসে থাকা, মায়ের খেয়াল রাখা, সব মিলিয়ে পুষ্পিতার নিজের জন্য সময় বলতে কিছুই ছিলো না। শরীর ক্লান্ত ছিলো, কিন্তু তার থেকেও বেশি ক্লান্ত ছিলো মন। তবু আজ, বাবাকে ঘরের ভেতর বিশ্রাম নিতে দেখে বুকের ভেতর একটা স্বস্তি নামছে। বাবা আগের মতো সুস্থ নন, তবুও আগের চেয়ে ভালো, এইটুকুই এখন বড় পাওয়া।
এই ব্যস্ততা আর ক্লান্তির মাঝেই, জীবনে ঢুকে পড়েছে একটুখানি হালকা আনন্দ, শুভ্র নামের মানুষটি। প্রতিদিন হাসপাতালের এসে নিচে নামলেই শুভ্রর দেখা মিলতো। কখনো পাঁচ মিনিট, কখনো দশ, এই অল্প সময়ের মধ্যেই কথা হতো অনেক। দিনের ছোট ছোট ঘটনা, ক্লান্তি, বিরক্তি, এমনকি হাসির মুহূর্তগুলোও ভাগাভাগি হয়ে যেত। ফোন কল আর চ্যাটিংয়ের মাঝেও কথা জমেছে অজস্র। আপনি থেকে কখন যে কথোপকথন নেমে এসেছে তুমি তে। শুভ্র নিজেই একদিন বলেছিলো, তুমি বললেই ভালো লাগবে। পুষ্পিতা তখন লজ্জা পেয়েছিল। কান দুটো গরম হয়ে উঠেছিল। তবু অস্বীকার করেনি। ব্যাপারটা তার মনেও খারাপ লাগেনি। ভাবতেই হালকা হাসি খেলে যায় তার ঠোঁটে।
রাস্তায় এক অচেনা মানুষ সাহায্য করেছিলো তাদের যে মানুষটা, সেই শুভ্র এখন আর অচেনা নয়। দিন দিন সে খুব চেনা হয়ে উঠছে। খুব স্বাভাবিকভাবে, কোনো জোর না করেই। মানুষ আসলে কতো সহজে, কতো কোমলভাবে, কতো অল্প সময়ের মাঝেই কাছের হয়ে যেতে পারে, এই ভাবনাটা পুষ্পিতাকে কাঁপিয়ে দেয়।
#_চলবে_ইনশাআল্লাহ_🌹
