Friday, June 5, 2026







ডাকঘর পর্ব-০৩

#_ডাকঘর_
#_মারিয়া_রশিদ_
#_পর্ব_৩_

সন্ধ্যা নেমে এসেছে ধীরে ধীরে।
হাসপাতালের করিডোরে এখন কৃত্রিম আলো জ্বলছে। জানালার কাঁচে বাইরে নামতে থাকা অন্ধকারের ছায়া পড়েছে। করিডোরের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে পিয়াস। ছোট্ট শরীর, পরনে হালকা নীল টি-শার্ট। আর ঠিক তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে পুষ্পিতা। চোখে ক্লান্তি, মুখে চাপা রাগ। সারাদিন হাসপাতাল, বাবার অসুস্থতা, সংসারের চিন্তা, সবকিছু মিলিয়ে তার ধৈর্যের বাঁধটা একটু একটু করে ভেঙে পড়ছে। পিয়াস করিডোরে দৌড়াদৌড়ি করতে চাইছে, বারবার নিষেধ করার পরও শুনছে না। পুষ্পিতা এবার গলা শক্ত করে বলে ওঠে,
–” এইটা হসপিটাল, পিয়াস! এখানে একদম দুষ্টুমি করবে না। করলে তোমাকে একা একা বাসায় রেখে আসবো।”

কথাটা শেষ হতেই পিয়াসের চোখে ভ’য় জমে ওঠে।
সে ক্লাস থ্রি-তে পড়ে। বয়স অনুযায়ী দুষ্টুমি তার রক্তে, কিন্তু একা থাকার ভ’য়টা তার চেয়েও বড়। বাসা মানে তার কাছে শুধু চারটা দেয়াল না, বাসা মানে মা, আপুনি, বাবার ডাক। সেই জায়গায় যদি কেউ না থাকে, এই ভাবনাটাই তার বুকটা কাঁপিয়ে দেয়। কাঁপা গলায় সে বলে ওঠে,
–” বাসায় কেউ নেই তো, আপুনি?”

পুষ্পিতা চোখ ফিরিয়ে নেয়। দৃঢ় স্বরে বলে,
–” হ্যাঁ! একা থাকবে তুমি।”

এই কথাটুকুই যথেষ্ট। পিয়াস আর এক সেকেন্ড দেরি করে না। ছোট্ট দুই হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরে পুষ্পিতাকে। গলার স্বর ভেঙে আসে,
–” আপুনি! না, না, না। আমাকে একা রেখো না।”

পুষ্পিতার বুকের ভেতরটা হঠাৎ নরম হয়ে আসে। রাগটা গলে যায় মুহূর্তেই। সে জানে, ভ’য় দেখানোটা ঠিক হয়নি। এই বয়সে বাবার হাসপাতালে থাকা, মায়ের ব্যস্ততা, সব মিলিয়ে পিয়াস ভেতরে ভেতরে কতটা আতঙ্কে আছে, সেটা সে বুঝতে পারে। নিচু হয়ে পিয়াসের মাথার ওপর হাত রাখে সে। গলার স্বর নরম হয়ে আসে,
–” তাহলে একদম দুষ্টুমি করবে না, কেমন?”

পিয়াস তাড়াতাড়ি মাথা নাড়ে।
–” ঠিক আছে, আপুনি! একদম দুষ্টুমি করবো না।”

পুষ্পিতার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে ওঠে। সে ধীরে ধীরে পিয়াসের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। ছোট্ট শরীরটা একটু শান্ত হয়। ঠিক তখনই পুষ্পিতার ফোনটা কেঁপে ওঠে। হঠাৎ হওয়া শব্দে সে সামান্য চমকে ওঠে। ব্যাগের ভেতর হাত ঢুকিয়ে ফোনটা বের করে তাকাতেই চোখে পড়ে পরিচিত এক নাম, শুভ্র। মুহূর্তের মধ্যেই ঠোঁটের কোণে অজান্তে একটা হালকা হাসি ফুটে ওঠে। সারাদিনের ক্লান্তি, দুশ্চিন্তা আর হাসপাতালের গুমোট পরিবেশের মাঝখানে এই নামটা যেন অকারণেই একটু স্বস্তি এনে দেয়। কল রিসিভ করে পুষ্পিতা।
–” আসসালামু আলাইকুম!”

ওপাশ থেকে শান্ত, পরিচ্ছন্ন কণ্ঠ ভেসে আসে,
–” ওয়ালাইকুম আসসালাম! আংকেল কেমন আছেন?”

–” জি, আলহামদুলিল্লাহ! এখন একটু ভালো।”

–” হসপিটালেই আছেন, তাই তো?”

–” জি!”

ওপাশে এক সেকেন্ডের নীরবতা। তারপর শুভ্র বলে ওঠে,
–” আপনি যদি একটু নিচে আসতেন, আমি নিচেই দাঁড়িয়ে আছি।”

কথাটা শুনে পুষ্পিতা অবাক হয়ে যায়। ভ্রু দুটো সামান্য উঁচু হয়ে ওঠে।
–” আপনি এখানে এসেছেন?”

শুভ্র হালকা হেসে বলে,
–” জি, হ্যাঁ। আপনি আসতে পারলে আমি অপেক্ষা করবো। আর না পারলে, চলে যেতে হবে। আর কি করার।”

পুষ্পিতার কণ্ঠে তাড়াহুড়োর ছাপ পড়ে,
–” না না, আমি আসছি। একটু সময় দিন।”

–” ওকে!”

কল কেটে যায়। পুষ্পিতা কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। বুকের ভেতরটা হঠাৎ অদ্ভুত এক অনুভূতিতে ভরে ওঠে। যেন কোথা থেকে এক ঝাঁক প্রজাপতি উড়ে এসে তার বুকের ভেতর ছুটোছুটি শুরু করেছে। এই কঠিন সময়ের মাঝেও কেউ একজন শুধুই তার জন্য অপেক্ষা করছে, এই ভাবনাটাই তাকে অকারণেই ভালো লাগায় ভরিয়ে দেয়। ঠিক তখনই পিয়াস তার হাতটা টান দেয়।
–” আপুনি! কোথায় যাবে?”

পুষ্পিতা নিচু হয়ে পিয়াসের দিকে তাকায়। পিয়াস আবার বলে,
–” কি হলো আপুনি? কথা বলছো না কেন? কোথায় যাবে?”

পুষ্পিতা হালকা হাসে।
–” একটু কাজে যেতে হবে। চলো, তোমাকে আগে কেবিনে দিয়ে আসি।”

পিয়াস কিছু না বলে মাথা নাড়ে। পুষ্পিতা তার হাত ধরে কেবিন পর্যন্ত নিয়ে যায়। বাবার দিকে একবার তাকিয়ে আসে, তারপর পিয়াসকে বুঝিয়ে বসিয়ে দেয়।
–” আমি একটু পরেই আসবো, ঠিক আছে?”

পিয়াস চুপচাপ ঘাড় কাত করে। কেবিনের দরজা বন্ধ করে পুষ্পিতা দ্রুত করিডোর পেরিয়ে নিচে নেমে আসে। হসপিটালের নিচে শুভ্র অপেক্ষা করছে। অচেনা মানুষটা যেন অতিরিক্ত চেনা হয়ে উঠছে পুষ্পিতার কাছে। অতিরিক্ত ভালো লাগায় ভরিয়ে দিচ্ছে পুষ্পিতাকে।

নিচে নেমেই পুষ্পিতার চোখ সোজা গিয়ে পড়ে হাসপাতালের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা চকচকে কালো রঙের গাড়িটার দিকে। গাড়িটার সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শুভ্র। হাসপাতালের সাদা কৃত্রিম আলো শুভ্রর ফর্সা মুখে পড়ে তাকে ঝলমল লাগছে। সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট, একদম ফর্মাল পোশাক, চুলগুলো একটু এলোমেলো, তবুও মানুষটাকে আলাদা করে চোখে পড়ার মতো লাগছে।

পুষ্পিতাকে দেখতে পেয়ে শুভ্র গাড়ি থেকে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। সারাদিনের দৌড়ঝাঁপ, দুশ্চিন্তা আর ক্লান্তিতে তার শ্যামলা গায়ের রঙে তামাটে ছাপ পড়েছে। চোখের নিচে হালকা ছায়া। বোঝাই যাচ্ছে, মেয়েটার ওপর দিয়ে সময়টা খুব সহজ যাচ্ছে না। তবুও মুখের আদলে মায়া ছড়িয়ে আছে তাকে ঘিরে। পুষ্পিতা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে।
–” আপনি এসেছেন, আমি ভাবতেই পারছি না।”

শুভ্র হালকা হাসে। গলার স্বর শান্ত,
–” মন বললো, একটু দেখে যাই। তাই চলে এলাম।”

পুষ্পিতা হালকা হাসে। একটু লজ্জাও লাগছে তার।শুভ্র জিজ্ঞেস করে,
–” রাতে খেয়েছেন?”

পুষ্পিতা মাথা নেড়ে বলে,
–” এখনো খাওয়া হয়নি। ছোট ভাইকে খাইয়ে তারপর খাবো।”

শুভ্রর ভ্রু দুটো সামান্য কুঁচকে যায়।
–” ছোট ভাই?”

–” হ্যাঁ! আমার ছোট্ট আদুরে ভাই। পিয়াস! ক্লাস থ্রিতে পড়ে।”

–” নাইস! আপনার থেকে অনেক ছোট।”

–” জি, হ্যাঁ!”

এক মুহূর্তের নীরবতা। তারপর শুভ্র আবার বলে ওঠে,
–” আমি খাবার কিনে দিই?”

পুষ্পিতা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ে।
–” না না, তার কোনো প্রয়োজন নেই। কেবিনে খাবার আছে, পর্যাপ্ত।”

–” ওকে!”

পুষ্পিতা হালকা করে হাসে। শুভ্র কথা না বলে তাকিয়ে থাকে পুষ্পিতার মুখের দিকে। পুষ্পিতা হালকা কণ্ঠে বলে ওঠে,
–” বাবাকে দেখবেন, চুলন?”

শুভ্র একটু চমকে যায়। এমন প্রস্তাব সে বোধহয় প্রস্তুত ছিল না। মুহূর্তের মধ্যেই ভদ্র এক সংকোচ তার মুখে ফুটে ওঠে। মাথা সামান্য নেড়ে সে বলে,
–” না থাক। পরে আংকেল কী মনে করবেন, না করবেন।”

পুষ্পিতা হালকা করে হাসে।
–” এখানে মনে করার কী আছে? বরং বাবা-মা আপনাকে দেখলে বেশি খুশি হবে।”

–” যেতেই হবে?”

–” গেলে আমার ভালো লাগবে।”

এই কথাটুকুই যথেষ্ট। শুভ্র ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলে,
–” তাহলে আর না গিয়ে কী করে পারি?”

পুষ্পিতা এবার শব্দ করেই হেসে ওঠে। দীর্ঘ সময় পর এমন একটা নির্ভার হাসি তার মুখে দেখা গেল। হাসি থামিয়ে বললো,
–” চুলন।”

–” ওয়ান মিনিট।”

পুষ্পিতাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই শুভ্র হেঁটে যায় হাসপাতালের ঠিক বিপরীতে থাকা ফলের দোকানের দিকে। পুষ্পিতা কিছুটা অবাক, কিছুটা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। কিছুক্ষণ পর শুভ্র ফিরে আসে হাতে কয়েক প্রকার ফল, তার সঙ্গে পাশের বেকারি থেকে কেনা বড়সড়, বেশ দামি একটা চকলেট। পুষ্পিতা একটু বিরক্তির সুরে বলে,
–” এগুলো কেন কিনতে গেলেন? এইসবের তো কোনো প্রয়োজন ছিল না।”

শুভ্র শান্ত গলায় উত্তর দেয়,
–” অবশ্যই প্রয়োজন আছে, চুলন।”

পুষ্পিতা আর কিছু বলে না। শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।
–” ওকে, চলুন।”

দুজন পাশাপাশি এগিয়ে যায় হাসপাতালের ভেতরের দিকে। কেবিনের দরজার সামনে এসে শুভ্র হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়। বুকের ভেতরটা কেমন যেন অস্বস্তিতে ভরে ওঠে। হাসপাতালের কেবিনের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার ভেতরে তখন অদ্ভুত এক টানাপোড়েন চলছে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুষ্পিতা বিষয়টা লক্ষ্য করে। শুভ্রকে দাঁড়িয়ে যেতে দেখে সে একটু অবাক হয়ে তাকায়।
–” কি হলো? দাঁড়িয়ে গেলেন কেন?”

শুভ্র যেন হঠাৎ বাস্তবে ফিরে আসে। তাড়াতাড়ি মাথা নাড়ে।
–” না না, কিছু না।”

পুষ্পিতা হালকা হাসে।
–” চলুন।”

–” হুম!”

পুষ্পিতা দরজার হাতল ঘুরিয়ে দেয়। দরজা খুলতেই কেবিনের ভেতরের উষ্ণ আলো বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। দুজন একসাথে ভেতরে ঢোকে। কেবিনের ভেতরে ফিরোজ রহমান আধশোয়া অবস্থায় বিছানায় বসে আছেন। মুখে অসুস্থতার ছাপ স্পষ্ট। পাশে চেয়ারে বসে পাখি বেগম কিছু একটা গল্প করছিলেন। আর এক কোণে ছোট্ট পিয়াস মনোযোগ দিয়ে ফোনে গেম খেলছিলো।

পাখি বেগমের চোখ প্রথমেই শুভ্রর ওপর পড়ে। মুহূর্তের মধ্যেই তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
–” আরে! শুভ্র বাবা! তুমি এসেছো?”

পাখি বেগম উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে আসেন।
–” এসো, এসো।”

অন্যদিকে ফিরোজ রহমান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকেন। চোখে প্রশ্ন। শরীরের অসুস্থতার কারণে আগের দিন শুভ্রকে ভালো করে লক্ষ্য করা হয়নি। ফলে এই মুহূর্তে শুভ্র তার কাছে সম্পূর্ণ অচেনা একজন। শুভ্র এক মুহূর্তের জন্য ফিরোজ রহমানের দিকেই তাকায়। সেই দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। কিন্তু পাখি বেগমের কণ্ঠে ডাক শুনে মুহূর্তেই চোখের ভাষা বদলে যায়। কণ্ঠ নরম করে সে বলে,
–” ভালো আছেন আন্টি?”

পাখি বেগম মৃদু হাসেন।
–” আল্লাহ যেমন রাখছেন। এসো, তোমার আংকেলের সাথে পরিচিত হও।”

পুষ্পিতার দিকে তাকিয়ে শুভ্র হাতে থাকা প্যাকেটগুলো এগিয়ে দেয়। পুষ্পিতা প্যাকেটগুলো নিজের হাতে তুলে নেয়। তারপর পাখি বেগম শুভ্রকে নিয়ে যান বিছানার পাশে। পুষ্পিতা দ্রুত একটা চেয়ার টেনে আনে। শুভ্র ধীরে ধীরে চেয়ারে বসে। বসার পরই বুঝতে পারে, তার শরীর হালকা কাঁপছে। বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে গেছে। সে নিজের হাত দুটো মুঠি করে ধরে রাখে, নিজেকেই শক্ত করে ধরে আছে। বাইরে থেকে যতটা শান্ত দেখাচ্ছে, ভেতরে সে ততটাই অস্থির। পাখি বেগম হাসিমুখে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে ফিরোজ রহমানের দিকে ঘুরে তাকায়।
–” ওর নাম শুভ্র! তুমি অসুস্থ থাকার সময় পুষ্প কোনো গাড়িই পাচ্ছিলো না। এই ছেলেটাই আমাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো। ওর গাড়িতেই করে তোমাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলাম আমরা।”

ফিরোজ রহমান ধীরে ধীরে শুভ্রর দিকে তাকান। চোখের ভেতর কৃতজ্ঞতার আলো স্পষ্ট। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে তিনি বলেন,
–” তোমাকে যে কী বলে ধন্যবাদ দেবো, বাবা। সত্যিই বুঝতে পারছি না।”

শুভ্র তৎক্ষণাৎ মাথা নেড়ে, হাসিমুখে উত্তর দেয়,
–” ধন্যবাদের কোনো প্রয়োজন নেই, আংকেল! মানুষের বিপদে এগিয়ে যাওয়া আমার মা আমাকে শিখিয়েছেন। আমি অন্য সবার মতো বিপদে পড়া মানুষকে আরও বিপদে ঠেলে দিতে পারি না।”

কথাগুলো শুনে ফিরোজ রহমান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে তিনি ধীরে বলেন,
–” খুব মহৎ শিক্ষা দিয়েছেন তোমার মা! একদিন আমাদের বাড়িতে এই রত্নগর্ভা নারীকে নিয়ে এসো, বাবা! যিনি তোমার মতো রত্নকে গর্ভে ধারণ করেছেন।”

এই কথার সঙ্গে সঙ্গেই শুভ্রর বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। গলার শিরাগুলো টানটান হয়ে ওঠে, হাত দুটো অজান্তেই কাঁপতে শুরু করে। চোখের কোণে হালকা জ্বালা অনুভব করে সে। একবার, দুই বার ঢোক গিলে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে। বাইরে থেকে যতটা স্থির দেখাচ্ছে, ভেতরে সে ততটাই এলোমেলো। পাখি বেগম এই আবেগী মুহূর্তটাকে আরও উষ্ণ করে বলেন,
–” অবশ্যই বাবা। তোমার মা-বাবাকে নিয়ে একদিন আমাদের বাসায় আসবে কিন্তু।”

শুভ্র হালকা হাসে। নিচু গলায় সে বলে ওঠে,
–” আমার বাবা নেই, আন্টি।”

ফিরোজ রহমান সঙ্গে সঙ্গে নরম স্বরে বলেন,
–” আহারে! কষ্ট পেয়ো না, বাবা! সবাই তো আর চিরকাল বেঁচে থাকে না। আর, আমি তো তোমার বাবার মতোই। তোমার মাকে নিয়েই নাহয় এসো একদিন।”

পাখি বেগমও সায় দেন,
–” হ্যাঁ, বাবা! তোমার মাকে নিয়ে এসো।”

শুভ্র মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মতি জানায়।
–” আসবো। আজ তাহলে উঠি। আপনারা নিজেদের খেয়াল রাখবেন। আর সাবধানে থাকবেন।”

–” তুমিও সাবধানে যেও, বাবা!”
পাখি বেগম স্নেহভরে বলেন। শুভ্র সম্মতিসূচকভাবে মাথা নাড়ে। ধীরে উঠে দাঁড়ায়। বুকের ভেতরের অস্থিরতা তখনো পুরোপুরি থামেনি, তবুও সে নিজেকে গুছিয়ে নেয়।

শুভ্রর চোখ ঘুরে যায় কেবিনের এক কোণায়। চেয়ারে বসে থাকা ছোট্ট ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থাকে সে কয়েক সেকেন্ড। এইটাই তাহলে পিয়াস। গোল গোল চোখ, মুখে শিশুসুলভ কৌতূহল। ফোনটা এক হাতে ধরে রেখেছে, কিন্তু মনোযোগ পুরোপুরি শুভ্রর দিকেই। শুভ্রর দৃষ্টি অনুসরণ করে পুষ্পিতা পিয়াসের দিকে তাকায়। হালকা কণ্ঠে বলে ওঠে,
–” পিয়াস! এদিকে এসো।”

পিয়াস ফোনটা চেয়ারে রেখে ধীরে ধীরে উঠে আসে। একটু সংকোচ, একটু কৌতূহল, দুটোই তার চোখেমুখে স্পষ্ট। পুষ্পিতা তার কাঁধে হালকা করে হাত রেখে বলে,
–” এইটা তোমার এক ভাইয়া। সালাম দাও।”

পিয়াস মাথা তুলে শুভ্রর দিকে তাকায়। গলা পরিষ্কার করে ছোট্ট কিন্তু স্পষ্ট কণ্ঠে বলে,
–” আসসালামু আলাইকুম, ভাইয়া!”

শুভ্রর মুখে হাসি ফুটে ওঠে। সে সামান্য ঝুঁকে পিয়াসের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
–” ওয়ালাইকুম আসসালাম। প্যাকেটে তোমার জন্য চকলেট আছে। হয়তো তোমার পছন্দ হবে।”

পিয়াসের চোখ মুহূর্তেই চকচক করে ওঠে। পুষ্পিতা হালকা হাসি চেপে বলে,
–” ভাইয়াকে থ্যাংকস বলো।”

পিয়াস একটু লজ্জা পেয়ে আবার বলে,
–” থ্যাংকস, ভাইয়া!”

শুভ্র হালকা করে হেসে মাথা নাড়ে। এই ছোট্ট মুহূর্তটুকু তার বুকের ভেতরে কোথায় যেন আলতো করে খোঁচা দিয়ে যায়। আর কথা না বাড়িয়ে সে সবার দিকে তাকিয়ে বিদায়ের ইঙ্গিত দেয়। পাখি বেগম স্নেহভরে তাকিয়ে থাকেন, ফিরোজ রহমান চোখে কৃতজ্ঞতা নিয়ে মাথা নেড়ে দেন। শুভ্র ধীরে কেবিন থেকে বেরিয়ে আসে।

পুষ্পিতা এগিয়ে দিতে আসে তাকে। গাড়ির সামনে আসতেই, শুভ্র থেমে বলে,
–” আসি। নিজের খেয়াল রাখবেন।”

পুষ্পিতা হালকা করে মাথা নাড়ে।
–” জি! আর আপনিও সাবধানে যাবেন। গিয়ে একটা ম্যাসেজ করে জানালে খুশি হবো।”

শুভ্র এক মুহূর্ত থেমে তার দিকে তাকায়। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি।
–” এতো চিন্তা আমার জন্য?”

এই কথায় পুষ্পিতার গাল লাল হয়ে ওঠে লজ্জায়। সে চোখ সরিয়ে নেয়।
–” ধু’র! রাত হয়ে যাচ্ছে। বাসায় যান।”

শুভ্র হেসে ফেলে।
–” ওকে, বাই!”

–” বাই!”
পুষ্পিতা নরম স্বরে উত্তর দেয়। শুভ্র গাড়িতে উঠে পড়ে। ইঞ্জিন স্টার্ট হয়। গাড়িটা ধীরে ধীরে হাসপাতালের গেট পেরিয়ে অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যায়। পুষ্পিতা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকে। যতক্ষণ না কালো গাড়িটা তার দৃষ্টিসীমার বাইরে মিলিয়ে যায়, ততক্ষণ সে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে।
তারপর বুকের ভেতরে একরাশ অনুভূতি নিয়ে আবার হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে পড়ে।

#_চলবে_ইনশাআল্লাহ_🌹

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ