#_ডাকঘর_
#_মারিয়া_রশিদ_
#_অন্তিম_পর্ব_
১ বছর পর!!
নরম রোদের আলো জানালা বেয়ে ঘরে ঢুকেছে। পর্দার ফাঁক গলে আসা আলোটা ঠিক এসে পড়েছে বিছানার উপর। সাদা চাদরের মাঝখানে শুয়ে আছে একটা ছোট্ট মানুষ, মাত্র দুই মাসের। হাত-পা ছুঁড়ে ছুঁড়ে নিজের মতো করে খেলছে। কখনো আঙুল মুখে ঢোকাচ্ছে, কখনো অস্পষ্ট আওয়াজ বের করছে।
ওর নাম শুকরান চৌধুরী! শুভ্রর জীবনের একমাত্র আলো, আর পুষ্পিতার প্রাণের পর প্রাণ।
বিছানার পাশে হেলান দিয়ে বসে আছে পুষ্পিতা। দৃষ্টি একদম শুকরানের মুখে আটকে আছে। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি থাকলেও চোখ দুটো ভারী। গভীরে জমে থাকা ক্লান্তি আর অভিমান লুকিয়ে আছে সেখানে। একটা বছর হয়ে গেছে। ঠিক এক বছর। এই এক বছরে সে আর একবারও বাবার মুখ দেখেনি। মায়ের কণ্ঠ শোনেনি। ছোট্ট ভাইটার গাল টিপে দেওয়া হয়নি। নিজের রক্তের মানুষেরা যেন হঠাৎ করেই অন্য গ্রহে চলে গেছে।
কতোবার যে শুভ্রকে বুঝিয়েছে, একবার যেতে দাও, একবার ফোন করতে দাও, অন্তত মায়ের কণ্ঠটা শুনতে দাও। কিন্তু শুভ্রর উত্তর একটাই, না। কোনো তর্ক নেই, কোনো ব্যাখ্যা নেই। শুধু কঠিন একটা শব্দ না। পুষ্পিতার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে প্রতিবার। সে বোঝে শুভ্রর যন্ত্রণা আছে, রাগ আছে। কিন্তু তার নিজেরও তো একটা পরিবার আছে।বাবা-মা আছে। ভাই আছে।
চিন্তার মাঝেই দরজা খুলে যায়। পুষ্পিতা সেই দিকে তাকায়। ঘরে ঢোকেন মিলি ইয়াসমিন। মুখে চিরচেনা মায়াভরা হাসি। পুষ্পিতাকে অনেক আদর করে মিলি ইয়াসমিন। পুষ্পিতা এখনো মিলি ইয়াসমিনকে ফুপুমনি বলেই ডাকে। সে ফুপুমনি ডাকতে পারেনি জীবনে কাউকে, এখন সে ডাকটা মিস করতে চায় না। শুভ্র প্রথমে আপত্তি জানালেও, মিলি ইয়াসমিন থামিয়ে দিয়েছে তাকে। পুষ্পিতা যেইটাই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে সেইটাই ডাকতে বলেছে মিলি ইয়াসমিন। তিনি
ঘরে ঢুকেই তার চোখ চলে যায় বিছানার দিকে।
–” এই যে আমার দাদুভাই!”
মিলি ইয়াসমিন এগিয়ে এসে বিছানার পাশে বসেন। পুষ্পিতা একটু সোজা হয়ে বসে। মিলি ইয়াসমিন ঝুঁকে ছোট্ট শুকরানের দিকে তাকান। বাচ্চাটা তখন নিজের আঙুল মুখে ঢুকিয়ে চুষছে। মুখভর্তি লালা, চোখে দুষ্টুমি। মিলি ইয়াসমিন আদুরে গলায় বলেন,
–” দাদুভাই! কী করছেন আপনি? আঙুল খাচ্ছেন? আঙুল খায় না দাদা।”
শুকরান যেন কথাগুলো বুঝতে পেরেছে এমন ভাব করে। হাত-পা আরও জোরে ছুঁড়তে থাকে। মুখ দিয়ে অস্পষ্ট আওয়াজ বের হয়। দাদীর কণ্ঠে সে যে বেশ আনন্দ পাচ্ছে, সেটা স্পষ্ট। মিলি ইয়াসমিন হেসে ওঠেন। তিনি আলতো করে শুকরানের পেটের উপর হাত রাখেন।
–” এই ছেলে একদম তার বাবার মতো দুষ্টু হবে, দেখিস।”
মিলি ইয়াসমিন পুষ্পিতার দিকে তাকায়। তারপর তিনি নরম গলায় বললেন,
–” কী রে, মা! তোর মুখটা এমন শুকনো কেন?”
পুষ্পিতা দ্রুত চোখ নামিয়ে নেয়। শুকরানের হাতটা ধরে আঙুল দিয়ে খেলাতে খেলাতে বলে,
–” কিছু না, ফুপুমনি!”
–” ফুপুমনিকে বলবি না? বল, কী হয়েছে?”
এই একটা কথাই যথেষ্ট ছিল। পুষ্পিতার চোখের কোণে জমে থাকা পানিটা আর ধরে রাখা যায় না। টুপ করে এক ফোঁটা গড়িয়ে পড়ে। সে মুখ ফেরাতে চায়, কিন্তু মিলি ইয়াসমিন সেটা দেখে ফেলেন।
–” একি! চোখে পানি কেন? পুষ্প! কী হয়েছে মা?”
মিলি ইয়াসমিনের কণ্ঠে উদ্বেগ। পুষ্পিতা আর নিজেকে সামলাতে পারে না। গলা ধরে আসে।
–” ফুপুমনি! আজকাল বাবা-মায়ের শূন্যতা খুব তীব্র যন্ত্রণা দিচ্ছে আমাকে।”
মিলি ইয়াসমিন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। যেন ঠিক কোন শব্দটা ব্যবহার করবেন, সেটা খুঁজে পাচ্ছেন না। তিনি জানেন, এই যন্ত্রণার গভীরতা কতোটা। কিছুক্ষণ পর ধীরে বলেন,
–” আমি বুঝানোর চেষ্টা করেছি শুভ্রকে, মা। কিন্তু ছেলেটা কথা শুনলেই চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দেয়।”
–” আমিও অনেক চেষ্টা করেছি, ফুপুমনি! কিন্তু তোমার জেদি ছেলে কোনোভাবেই কথা মানতে চায় না।”
মিলি ইয়াসমিন দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
–” ভাইজান অনেক কষ্ট পেয়েছেন এতলদিনে। রাগটা এখনো শুভ্রের বুকের ভেতরে জমে আছে। তবু দেখি, আমি আবার বোঝাবো শুভ্রকে। তুই চিন্তা করিস না, মা! ওকে মানাবো।”
এই কথাগুলো পুষ্পিতার বুকের ভেতরে সামান্য হলেও স্বস্তির বাতাস ঢুকিয়ে দেয়। কিন্তু সে আর কিছু বলে না। শুধু মাথা নেড়ে চুপচাপ বসে থাকে। মিলি ইয়াসমিন উঠে দাঁড়ান। যাওয়ার আগে আরেকবার শুকরানের গালে আলতো করে চুমু দেন। তারপর চলে যায়।
পুষ্পিতা ধীরে শুকরানকে কোলে তুলে নেয়। বুকের সাথে চেপে ধরে। তার নাড়িছেঁড়া ধন, আদরের মানিক। এই ছোট্ট মানুষটাই তার সমস্ত শক্তি। শুভ্র তো ছেলে বলতে একদম অজ্ঞান। ছেলেকে কোলে নিলে শুভ্রর যেন আর দুনিয়াতে কিছু লাগে না। এই কথা ভাবতেই পুষ্পিতার ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটে ওঠে। সে শুকরানকে নিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। বাইরে নরম আলো, বাতাসে হালকা শীতলতা। পুষ্পিতা আদুরে গলায় বলতে থাকে,
–” আমার সোনা বাবু! তুমি বড় হলে মায়ের বাড়ি নিয়ে যাবে না? নানুকে ডাকবে না?”
শুকরান অস্পষ্ট আওয়াজ করে। ছোট্ট হাতটা মায়ের গালে ছুঁয়ে দেয়। পুষ্পিতার চোখ আবার ভিজে ওঠে।
…
রাত নেমেছে ধীরে ধীরে।
জানালার বাইরে অন্ধকার গাঢ় হলেও ঘরের ভেতর আলোটা নরম। বিছানায় হেলান দিয়ে শুয়ে আছে শুভ্র। বুকের ওপর ছোট্ট শরীরটা নিশ্চিন্তে লেপ্টে আছে। শুকরান! বাবার বুকে মুখ গুঁজে গভীর ঘুমে ডুবে আছে সে। ছোট্ট ঠোঁট দুটো হালকা ফুলে আছে, নিঃশ্বাস ওঠানামার তালে বুকটা ধীরে ধীরে দুলছে।
শুভ্র এক দৃষ্টিতে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। দিনের সমস্ত ক্লান্তি, জমে থাকা রাগ, না বলা কষ্ট, সবকিছু যেন এই ছোট্ট বুকের স্পর্শে ধুয়ে মুছে যায়।শুভ্র ছেলেকে কোলে নিয়ে বসে থাকতে ভালোবাসে। শুকরান ঘুমিয়ে থাকলেও। আর যদি কান্না করে, সেটা তো একদমই সহ্য হয় না শুভ্রর। বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে। ছেলেকে আঁকড়ে ধরে তখন। শুকরানও বাবার সঙ্গ পছন্দ করে ভীষণ। বাবার বুকেই তার ঘুমটা সবচেয়ে গভীর হয়। দেখতেও শুভ্রর মতো হয়ে উঠছে সে। গড়ন, রং, সবকিছুতেই বাপ-বেটার মিল স্পষ্ট। সেই মিল দেখলেই শুভ্রর ঠোঁটের কোণে একটা হাসি চলে আসে।
এই সময় নিঃশব্দে ঘরে ঢোকে পুষ্পিতা। দরজা বন্ধ করার শব্দটাও সে খুব সাবধানে করে। চোখ পড়ে বিছানার দিকে। দেখে থমকে যায় এক মুহূর্ত। শুভ্র বুকের ওপর ছেলেকে নিয়ে শুয়ে আছে। শুকরান ঠোঁট ফুলিয়ে ঘুমাচ্ছে। বাবার এক হাত ছেলের পিঠে, অন্য হাত বালিশের পাশে। দৃশ্যটা তার কাছে নতুন নয়। তবু প্রতিবারই বুকের ভেতরটা কেমন নরম হয়ে আসে। পুষ্পিতার ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে ওঠে। পুষ্পিতা বোঝে, শুভ্র যত কঠিনই হোক, এই ছোট্ট মানুষটার কাছে সে একেবারেই অসহায়। পুষ্পিতা ধীরে বলে,
–” ছেলেকে নিয়ে উঠে দাঁড়াও। আমি বিছানা ঠিক করে দিই।”
শুভ্র কোনো কথা না বলে সাবধানে উঠে দাঁড়ায়। শুকরানের ঘুম যেন না ভাঙে, এই চিন্তায় তার প্রতিটা নড়াচড়া খুব হিসেবি। পুষ্পিতা দ্রুত বিছানার চাদর টেনে ঠিক করে, বালিশ গুছিয়ে নেয়। তারপর খুব যত্ন করে শুকরানকে শুইয়ে দেয়। শুকরান একটু নড়ে, কিন্তু ঘুম ভাঙে না।
শুভ্র ফ্রেশ হয়ে আসে। ঘরে ফিরে এসে দেখে পুষ্পিতা বিছানার মাঝখানে শুয়ে পড়েছে। শুভ্র এসে পাশে শুয়ে পড়ে। দেয়ালের দিকে শুকরান, তার পাশে পুষ্পিতা, আর একেবারে প্রান্তে শুভ্র। পুষ্পিতা ধীরে শুভ্রর দিকে ফিরে আসে। বুকের ভেতরে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসটা চাপা দিয়ে শুভ্রর বুকে মাথা রাখে। পরিচিত উষ্ণতা। শুভ্র কিছু না বলে পুষ্পিতার কোমরে হাত রাখে। টান দিয়ে আরও কাছে টেনে নেয় তাকে। যেন নিজের বুকের ভেতর লুকিয়ে ফেলতে চায়। পুষ্পিতা অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর খুব নিচু স্বরে বলে,
–” শুভ্র!”
–” হুম!”
পুষ্পিতা চোখ বন্ধ করে নেয়। শব্দগুলো যেন গলায় আটকে আছে।
–” আমি, আমি একটু আমার বাবা-মায়ের কাছে যেতে চাই।”
শুভ্রর শরীরটা মুহূর্তে শক্ত হয়ে যায়।
–” সম্ভব না।”
পুষ্পিতার বুকটা হঠাৎ ফাঁকা হয়ে আসে। তবু সে হাল ছাড়ে না।
–” আমার বাবা অন্যায় করেছে, আমি জানি। কিন্তু মা তো কিছু করেনি, শুভ্র। আমার ছোট ভাইটাও না। আমি নিজেও তো কোনো অন্যায় করিনি। তাহলে আমাদের কেন শাস্তি দিচ্ছো?”
শুভ্রর নিঃশ্বাস ভারী হয়। কণ্ঠে জমে থাকা রাগটা এবার স্পষ্ট।
–” শাস্তি দিচ্ছি না। কিন্তু ঐ ঘৃণ্য লোকটাকে আমি যেমন দেখতে চাই না, ঠিক তেমনই আমার স্ত্রী আর সন্তানের কাছেও আমি তাকে আসতে দিতে চাই না।”
পুষ্পিতার চোখ ভিজে আসে।
–” প্লিজ, শুভ্র! এমন করো না।”
–” না, বললাম তো। সেকেন্ড আর কোনো কথা হবে না।”
এই কথাটার সাথে সাথেই যেন সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়। পুষ্পিতা আর কিছু বলে না। শুভ্রর বুক থেকে সরে আসে। পাশ ফিরে শুকরানের দিকে মুখ করে শুয়ে পড়ে। ছোট্ট শরীরটা ঘুমের ঘোরে নড়েচড়ে ওঠে। পুষ্পিতা ছেলেকে একটু কাছে টেনে নেয়। শুভ্র বিষয়টা লক্ষ্য না করে পারে না।
–” এইটা কী হলো?”
কোনো উত্তর আসে না। শুভ্র আবার বলে ওঠে,
–” আমার বুক থেকে সরে গিয়ে ঐদিকে ফিরে শুলে কেন?”
পুষ্পিতা চুপ। শুভ্রর ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। সে হাত বাড়িয়ে জোর করে পুষ্পিতাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেয়।
–” চুপচাপ বুকে মাথা দিয়ে শুয়ে থাকবে। না হলে খুব খারাপ হয়ে যাবে।”
পুষ্পিতার চোখ দুটো আগুনের মতো জ্বলে ওঠে।
–” সব সময় তোমার মর্জি।”
শুভ্র বিরক্ত হয়ে বলে,
–” বুকে মাথা নিয়ে কোনো কথা শুনবো না। আর আমার মর্জি কী? ঐ বাড়ির সাথে যোগাযোগ করা বাদে বাকি সব কথাতেই তো আমি তোমার কথা শুনি।”
পুষ্পিতার গলা ভেঙে আসে।
–” আমার ওদের জন্য কষ্ট হয়, শুভ্র! খুব কষ্ট হয়।”
শুভ্র কোনো উত্তর দেয় না। শুধু হাত বাড়িয়ে পুষ্পিতাকে জড়িয়ে ধরে।
–” তখন শুকরানকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকবে।তাহলে আর কোনো কষ্ট হবে না।”
এই কথার পর আর কিছু বলার থাকে না। পুষ্পিতা বুঝে যায়, এই মানুষটার সাথে এই বিষয়ে কথা বাড়ানো মানে নিজেকেই আরও ভাঙা। সে আর প্রতিবাদ করে না। ব্যর্থ হয়ে, ক্লান্ত হয়ে, নিঃশব্দে শুভ্রর বুকে মাথা রেখে পড়ে থাকে।
…
সকাল ৯টা!!
ঘরের ভেতর হালকা ব্যস্ততা। শুভ্র অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে বেরিয়েছে মাত্র। সাদা শার্টের বোতামটা শেষবার ঠিক করতে করতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো। পুষ্পিতা তখনো রুমেই। হাতে খাবারের ট্রে। স্বামীর তাড়া আছে জেনেও সে নিজ হাতে খাইয়ে দিয়েছে। এই ছোট্ট অভ্যাসটা সে ছাড়তে পারেনি এখনো। এর মাঝেই শুকরান ঘুম ভেঙে কেঁদে উঠেছে। ছোট্ট কান্নার আওয়াজে ঘরের পরিবেশ বদলে যায় মুহূর্তে। পুষ্পিতা তড়িঘড়ি করে বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নেয়। শুভ্র একবার পেছনে তাকায়। স্ত্রী আর ছেলেকে একসাথে দেখে বুকের ভেতরটা নরম হয়ে আসে। তবু অফিসের সময় হয়ে গেছে। সে আর দাঁড়ায় না।
–” আমি বেরোচ্ছি।”
সংক্ষিপ্ত করে বলে রুম থেকে বেরিয়ে আসে শুভ্র।
ড্রইংপ্লেসে পা রাখতেই কণ্ঠ শোনা যায়
–” শুভ্র!”
শুভ্র থামে। ঘুরে তাকায়। মিলি ইয়াসমিন দাঁড়িয়ে আছেন।
–” হুম! কিছু বলবে মা?”
শুভ্র বলে ওঠে। মিলি ইয়াসমিন এক পা এগিয়ে এসে বলেন,
–” তুই যদি খুব ব্যস্ত না থাকিস, তাহলে একটু কথা বলতাম।”
শুভ্র হালকা হাসে।
–” তোমার কাছে আবার কিসের ব্যস্ততা?”
মিলি ইয়াসমিন মাথা নেড়ে সোফার দিকে ইশারা করেন।
–” আয় তাহলে, বোস।”
দুই জনেই সোফায় বসেন। ঘরটা হঠাৎ খুব নিঃশব্দ মনে হয়। দেয়ালের ঘড়ির টিকটিক শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।
–” বলো।”
শুভ্র সংক্ষেপে বলে। মিলি ইয়াসমিন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। ধীরে শুরু করেন তিনি,
–” দেখ, শুভ্র! অনেক হয়েছে। এইবার শান্ত হ। সবকিছু একটু স্বাভাবিক কর।”
শুভ্র ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
–” কি হয়েছে, মা?”
মিলি ইয়াসমিন তার চোখে চোখ রেখে বলেন,
–” আমি ভাইজানের কথা বলছি।”
এই একটা বাক্যেই শুভ্রর মুখ মুহূর্তেই শক্ত হয়ে যায়। চোখের দৃষ্টিটা বদলে যায়। চোয়াল শক্ত করে ফেলে। শুভ্র চুপচাপ বসে আছে। চোখ দুটো সামনে স্থির, কিন্তু দৃষ্টিতে কিছু নেই। মিলি ইয়াসমিন ছেলের এই নীরবতা ভালো করেই চেনেন। এই নীরবতার ভেতরেই সবচেয়ে বেশি ঝড় জমে। তিনি ধীরে কথা শুরু করেন,
–” দেখ, শুভ্র! আমি মানছি ভাইজান যা করেছিলেন, খুবই অন্যায় করেছিলেন। কোনো অজুহাত নেই। কিন্তু ভাবি, ভাইঝি, ভাইপো, এরা তো কোনো অন্যায় করেনি, বাবা! তুই ঐ একটা মানুষকে শাস্তি দিতে গিয়ে আরও তিনটা মানুষকে বিনা অপরাধে শাস্তি দিচ্ছিস। এইটা কিন্তু তোর অন্যায়।”
শুভ্র নড়েচড়ে বসে। চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে, তবু কোনো কথা বলে না। মিলি ইয়াসমিন থামেন না,
–” আর পুষ্পর সাথে এক বছর আগে যা করেছিস তুই। নেহাত পুষ্প ভালো মেয়ে বলেই আজও তোর সাথে সংসার করছে। নিজের পরিবার ছেড়ে, নিজের মানুষগুলো থেকে দূরে থেকে। ভাইজান কতোবার আমাদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে জানিস? বাড়ির সামনে পর্যন্ত এসে দাঁড়িয়েছে। আর তুই? তুই তাড়িয়ে দিয়েছিস।”
শুভ্রর হাত দুটো মুঠো হয়ে আসে। মাথা নিচু করে বসে থাকে সে। মিলি ইয়াসমিন একটু কাছে সরে এসে বলেন,
–” একবার পুষ্পর কথা ভাব তো, বাবা! মেয়েটা কতো যন্ত্রণা পাচ্ছে। নিজের পরিবার থেকে দূরে থাকার যন্ত্রণা আমি খুব ভালো করেই বুঝি রে। আমি যখন তোর বাবার হাত ধরে ঐ বাড়ি ছেড়েছিলাম, ভাইজান আমার সাথে সব যোগাযোগ বন্ধ করে দিলো। আমার আব্বা তো আমি খুব ছোট থাকতে মারা যান। আর ঐ বাড়ি ছাড়ার পর, আমার মা মারা গেলেন। আমি দেখতে পর্যন্ত পাইনি রে বাবা। আমাকে দেখতে দেওয়া হয়নি। তারপর কী হয়েছে, তো সবই জানিস।”
একটু থেমে গভীর শ্বাস নেন মিলি ইয়াসমিন।
–” কিন্তু তাও বলছি শুভ্র, আমি সব ভুলে গেছি। ভাইজান এখন নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন। বিশ্বাস কর। আমার এখন ওদের কাছে খুব যেতে মন চায়। ভাইজানের সাথে গল্প করতে ইচ্ছে করে। আমার তো বয়স শেষ হয়ে যাচ্ছে, বাবা! তুই আর এইসব নিয়ে বাড়াবাড়ি করিস না। মেনে নে সব কিছু।”
এই প্রথম শুভ্র মুখ খুলে। কণ্ঠ ভারী, চাপা ক্ষোভে ভরা,
–” তুমি কি আমাকে সঙ্গে নিয়ে সেই যন্ত্রণাদায়ক দিনগুলো ভুলে গেছো, মা?”
মিলি ইয়াসমিন চোখ তুলে ছেলের দিকে তাকান।
–” আমি ভুলিনি, বাবা! ঐ দিনগুলো ভুলে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব না। মানুষের বাড়ি কাজ করে করে তোকে পড়িয়েছি। দিনগুলো কীভাবে পার করেছি, তোকে কীভাবে পড়ালেখা করিয়েছি, এইসব শুধু আমিই জানি।”
মিলি ইয়াসমিন একটু থামেন, তারপর ধীরে বলেন,
–” কিন্তু, তাও বলবো বাবা, আমার ভাইজানের সাথে এই দূরত্ব আর ভালো লাগছে না। পুষ্পর দিকে তাকিয়ে দেখিস, মেয়েটা ভেতর দিয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে।”
শুভ্র নিঃশ্বাস আটকে রাখে। মিলি ইয়াসমিন বলতে থাকে,
–” দুইদিন পর তোর সন্তানও এই শূন্যতা ভোগ করবে। তারও তো একটা নানা বাড়ি দরকার হবে। যদি এইসব তোর ভালো লাগে, তাহলে আর আমি কী বলবো বল। এরপর আর কোনোদিন তোকে এই কথা বলতে আসবো না আমি। কিন্তু, শুনে রাখ বাবা, আমিও আমার ভাইজানকে চাই। পুষ্প তার বাবা-মা, ভাইকে চায়। আর ভবিষ্যতে তোর সন্তান তার নানা বাড়ি চাইবে। এরপর তোর যেটা ভালো মনে হয়, সেটাই নাহয় করিস।”
শুভ্র আর বসে থাকতে পারে না। কোনো কথা না বলে উঠে দাঁড়ায়। চোখ চলে যায় দোতলার করিডোরের দিকে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে পুষ্পিতা। কোলে শুকরান। ছোট্ট শরীরটা মায়ের বুকে লেপ্টে আছে। পুষ্পিতার চোখ দুটো ছলছল করছে। কোনো অভিযোগ নেই, কোনো দাবি নেই, শুধু একরাশ না বলা আকুতি। শুভ্রর চোখের সাথে চোখ মিলতেই পুষ্পিতা আর এক মুহূর্ত দাঁড়ায় না। ধীরে ঘুরে রুমের ভেতরে চলে যায়।
শুভ্র একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে। বুকের ভেতরে কিছু একটা ভেঙে পড়ে নিঃশব্দে। সে আর পেছনে তাকায় না। দরজা খুলে বেরিয়ে যায়। মিলি ইয়াসমিন দাঁড়িয়ে থাকেন। ছেলের চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে। চোখের কোণে জমে ওঠা পানিটা আর লুকাতে পারেন না।
…
রাত গভীর হয়ে এসেছে।
বাইরে নিস্তব্ধতা, পুরো শহর ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘরের ভেতরের আলো নিভু নিভু, জানালার ফাঁক গলে চাঁদের ম্লান আলো এসে পড়েছে বিছানার এক কোণে।
শুভ্র চুপচাপ শুয়ে আছে। তার বুকের ওপর মাথা রেখে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন পুষ্পিতা। দিনের সমস্ত ক্লান্তি, আবেগ, কান্না আর সুখ, সবকিছু মিলিয়ে সে আজ ঘুমিয়ে পড়েছে অনেক শান্ত হয়ে। পাশে ছোট্ট শুকরান, মায়ের কাছ ঘেঁষে, নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। ছোট্ট বুকটা নিঃশ্বাসের তালে উঠানামা করছে। শুভ্রর এক হাত আলতো করে পুষ্পিতার চুলে বুলিয়ে যাচ্ছে। অন্য হাতটা পুষ্পিতার কোমর জড়িয়ে ধরে আছে।
আজ পুষ্পিতা অনেক খুশি। এই এক বছরে এতোটা হালকা সে আর কখনো অনুভব করেনি। আজ তার পরিবার এসেছিলো। সেই দৃশ্যগুলো বারবার শুভ্রর চোখের সামনে ভেসে উঠছে। ফিরোজ রহমান মিলি ইয়াসমিনের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় বারবার ক্ষমা চেয়েছেন। একসময় শক্ত মানুষ হিসেবে পরিচিত ফিরোজ রহমান আজ নিজের ভুলের ভারে ভেঙে পড়েছিলেন। মিলি ইয়াসমিনের হাত দুটো ধরে কেঁদে ফেলেছিলেন শিশুর মতো। মিলি ইয়াসমিনও নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। ভাইয়ের কাঁধে মাথা রেখে কেঁদেছেন তিনিও। এতোদিনের জমে থাকা অভিমান, দুঃখ, না বলা কথাগুলো সেই কান্নার মধ্যেই যেন গলে গেছে।
পুষ্পিতা তার মাকে জড়িয়ে ধরেছিলো শক্ত করে।কতোদিন পর মায়ের গায়ের গন্ধ পেয়েছে সে। দুজনেই কাঁদছিলো। কারও মুখে কথা ছিলো না, শুধু চোখের জল ছিল, ভালোবাসার, আফসোসের, পাওয়া আর হারানোর মিশ্র জল। আর পিয়াস!
ছোট ভাইটা। যাকে একসময় হাত ধরে স্কুলে নিয়ে যেতো পুষ্পিতা, যার সব কাজ সে নিজে করে দিতো। সেই ছোট্ট ভাইটাকে এক বছর পর কাছে পেয়ে পুষ্পিতা যেন আর নিজেকে সামলাতে পারেনি। চোখে জল নিয়ে অনেক আদর করেছে ছোট্ট ভাইকে। এই সুখ কতো বড়, তা শুধু পুষ্পিতাই জানে।
মিলি ইয়াসমিনও আজ অন্যরকম খুশি। নিজের পরিবারকে কাছে পেয়ে তার চোখেমুখে দীর্ঘদিন পর এক ধরনের তৃপ্তি ছিলো। ফিরোজ রহমান আর পাখি বেগম ছোট্ট শুকরানকে কোলে নিয়ে আদর করেছে ভরপুর। সোনার চেইন এনে দিয়েছে নাতির জন্য।
শুকরান যখন জন্মেছিলো, তখন তারা হাসপাতালে গিয়েছিলো। কিন্তু, শুভ্র তাদের দেখতে দেয়নি। আজ প্রথমবার মেয়ের ঘরের নাতিকে কাছে পেয়েছে তারা। ছোট্ট মুখটার দিকে তাকিয়ে দুজনের চোখেই পানি চলে এসেছিলো।
পিয়াস তো ভাগ্নেকে নিয়ে রীতিমতো মাতামাতি।
কারো কোলে দিচ্ছিলো না শুকরানকে। অবাক ব্যাপার, শুকরানও মামার কোল পছন্দ করে ফেলেছিল। পিয়াসের বুকে মাথা রেখে নিজের আঙুল চুষছিল আর মাঝেমাঝে অস্পষ্ট আওয়াজ করছিলো। সেই দৃশ্য দেখে পুষ্পিতার চোখ ভিজে উঠেছিলো বারবার। আজ যেন সব শূন্যতা একটু একটু করে পূর্ণ হয়েছে।
কিন্তু, এই সমস্ত আনন্দের কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেও শুভ্র যেন নিজেকে সরিয়ে রেখেছিলো। সব মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্তটা এসেছে মায়ের কথায়, পুষ্পিতার নীরব সহ্যশক্তিতে আর সবচেয়ে বেশি নিজের সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে। ফিরোজ রহমানের পরিবারকে সে অনুমতি দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু দাওয়াতটা তার মুখ থেকে আসেনি। দাওয়াত দিয়েছে মিলি ইয়াসমিন, আর পুষ্পিতা। শুভ্র শুধু সম্মতি জানিয়েছিলো।
নিজে যেমন আদর, ভালোবাসা, আপনজনের উষ্ণতা থেকে বঞ্চিত হয়ে বড় হয়েছে, সেই জন্য সে তার ছোট্ট শুকরানকে বঞ্চিত করতে পারেনি। সে চায়নি, তার সন্তানের চারপাশে শূন্যতা জমুক। চায়নি, তার ছেলেটা কখনো জানতে শিখুক, নানা নেই, নানি নেই, মামা নেই। শুকরানের চারপাশে যেন ভালোবাসার সমুদ্র বয়ে যায়, এই একটাই চাওয়ায় শুভ্র সব মেনে নিয়েছে। তবু, সারা দিন সে নিজেকে দূরেই রেখেছিল।
ফিরোজ রহমানকে দেখলেই তার চোখের সামনে ভেসে উঠছিলো অতীতের সেই কষ্টকর দিনগুলো। মায়ের অপমান, নিজের অপমান, না খেয়ে থাকা রাত, অপমানের ভারে নুয়ে পড়া শৈশব। সেই সব স্মৃতি মাথার ভেতর কাঁটার মতো খচখচ করছিল। তাই সে নিজেকে সরিয়ে রেখেছে। সময় লাগবে তার। সব মানিয়ে নিতে সময় লাগে। সহজে সব ভুলে যাওয়া যায় না।
একটা দীর্ঘ, ভারী নিঃশ্বাস ফেলে শুভ্র। সারাদিনের জমে থাকা চিন্তাগুলো ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসে।
রাত গভীর হয়েছে। ফিরোজ রহমানের পরিবার অনেক আগেই চলে গেছে। পুষ্পিতা আর মিলি ইয়াসমিন থাকতে বলেছিল, কিন্তু তারা হাসিমুখে জানিয়েছে, পরে একদিন থাকবে।
শুভ্র হালকা করে মাথা ঘুরিয়ে ছোট্ট শুকরানের দিকে তাকায়। ঘুমের ঘোরে ছোট্ট আঙুল মুখে ঢুকিয়ে চুষছে সে। নিঃশ্বাসের তালে তালে ছোট্ট বুকটা ওঠানামা করছে। দৃশ্যটা দেখে শুভ্রর ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটা নরম হাসি ফুটে ওঠে। এই ছোট্ট মানুষটাই তো তার জীবনের সব। শুভ্র ধীরে মাথা এগিয়ে শুকরানের নরম কপালে একটা চুমু আঁকে। তারপর পুষ্পিতার কপালেও আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ায়। এই মেয়েটাকে সে কবে, কখন, কীভাবে এতো গভীরভাবে ভালোবেসে ফেলেছে, তা শুভ্র নিজেও জানে না। শুধু জানে, এই মানুষটা তার জীবনের সবচেয়ে শক্ত জায়গা। শুভ্র পুষ্পিতাকে আরেকটু কাছে টেনে নেয়। নিজের বুকের উষ্ণতায় জড়িয়ে ধরে। তারপর ধীরে চোখ বন্ধ করে দেয়।
সময় এইভাবেই চলবে। একদিন যে অসহায় শুভ্র নিজেকে লুকিয়ে নিয়েছিল ডাকঘরের নিঃসঙ্গতায়, আজ সে নিজের জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। তখন তার পাশে ছিল শুধু মায়ের ছায়া। আজ তার পাশে স্ত্রী আছে, সন্তান আছে, জীবনের একটা সম্পূর্ণ পৃথিবী আছে।
জীবন থেমে থাকে না।
ভাঙে, গড়ে, আবার এগোয়।
এইভাবেই চলুক জীবন।
চলতে থাকুক!!
……………….🌹সমাপ্ত🌹……………..
