#সূচনা_পর্ব
#নাবিলা_সৈয়দ
#তোমায়_নিয়ে_সন্ধ্যা_নামে
ভাইয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে বিয়ে করার মতো জঘন্য বিষয় এই পৃথিবীতে দুটো নেই। যাকে সারাজীবন বড় ভাইয়ের নজরে দেখে এসেছি তাকে বিয়ে করার জন্য আজ কবুল বলতে হবে এটা ভেবেই তো গা গুলিয়ে আসছে। আমার মা ভদ্রমহিলা এক পায়ে খাড়া হয়ে আছেন লোকটার সাথে আমার বিয়ে দেওয়ার জন্য, কিন্তু আমি অটুট, বিয়ে করব না এই সিদ্ধান্তে। মা বলে গিয়েছেন কাপড় পরে রেডি হয়ে যেন বসে থাকি,নাহলে এই বাড়িতে আজ আমার শেষ দিন হবে, না হয় তার। বিছানার উপর কিয়ান হায়দারের বাড়ির পক্ষ থেকে আসা এমারেল্ড গ্রিন কালার জামদানী শাড়ী রাখা। কালারটা কিয়ান হায়দারের পছন্দের। তাই এই কালারের শাড়ী আমাকে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু আমি যে ভেবেছিলাম, বিয়েতে লাল টুকটুকে শাড়ী পরে, লাল বঁধু সেজে, জামাইকে নিজের রুপের আগুনে পুড়িয়ে একদম অজ্ঞান করে দিব সেই ভাবনাটার কী হবে! কিয়ান হায়দারের জন্য আমাকে কী তা জলাঞ্জলি দিতে হবে, একদম না, কক্ষনো না, নেভাআয়ারর!
আমি মাহিরা মূর্তজা! বর্তমানে এইচ-এস-সি ক্যান্ডিডেট! এই মুহুর্তে বিয়ে করার কোনো ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষা আমার নেই, আর যদি থাকত তবুও কক্ষনো কিয়ান হায়দারকে বিয়ে করে স্বামী বানানোর ইচ্ছে নেই। জনাব কিয়ান হায়দার হলেন আমার ভাইয়ের খুবই কাছের বন্ধু। বলতে গেলে একে অন্যের জন্য জান প্রাণ দিয়ে দিবেন টাইপ বন্ধু। স্কুল, কলেজ, এমনকি ভার্সিটি জীবন কাটিয়েছেন তারা একইসাথে। কিয়ান হায়দারের পৈতৃক নিবাস মৌলভীবাজার হওয়ার দরুন সাস্টে পড়াকালীন নিজ বাড়িতে খুব কম যেতেন, হোস্টেলে থেকেই ভার্সিটি জীবনের অন্তিম করছেন তিনি। সাস্টের পদার্থ বিভাগের A ইউনিটের তৃতীয় আসনের ছাত্র ছিলেন,নাক উঁচু হনুমানটা। সিলেটে পড়াকালীন সময়ে অসময়ে বেড়াতে আসতেন না আমাদের বাড়িতে,একটি নির্দিষ্ট টাইমে আসতেন। যখন আমি স্কুল, কলেজ ছুটি শেষে নানু বাড়ি বা দাদু বাড়ি যেতাম। আমাদের সরাসরি দেখা তেমন একটা হয়নি। দূর থেকে এক-পলক দু-পলক দেখা হয়েছে। আমি এখনো পর্যন্ত উদ্ধার করতে পারিনি জিনিসটা কোয়েন্সিডেন্স নাকি! আমি যেদিনই বেড়াতে যেতাম সেদিনই তার এ বাড়িতে পর্দারপণ ঘটত। যখন বড় হলাম তখন মনে হলো বন্ধুর বোনকে কোনো প্রকার অস্বস্তিতে না ফেলতে উনি এখানে আসতেন না,কিন্তু আমাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করা হলো গতকাল রাতে।
কী আশ্চর্য! আমার ভাইয়ের বয়স কাটায় কাটায় ত্রিশ বছর যদি হয়, ওই শালা, আই মিন সম্মানীয় বিগ ব্রাদার কিয়ান হায়দারের বয়স কত হবে! অবশ্যই কাটায় কাটায় ত্রিশ! হাঁটুর বয়সী মেয়ে বিয়ে করতে আসছে ওই লোক আজ। আমি শিওর ডিংডং করে নাচতেছে সফেদ কালার হনুমানটা। হনুমানটার নামে বাল্য বিবাহের মামলা ঠুকে দিলে কেমন হবে! আমি মুখে নখ ঢুকিয়ে কামড়ে ভাবতে লাগলাম, পর মুহুর্তে এই চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেললাম৷ না এটা কোনোভাবে করা যাবে না, নাহলে আমার মাতা আমাকে নিজের মাথায় তুলে আছাড় মারবেন। উনার আবার কিয়ান হায়দারের সাথে গদগদ টাইপ সম্পর্ক।
যখন আমি স্কুলে পড়াশোনা করতাম তখন আমার মায়ের ভীষণ শখ ছিল কিয়ান হায়দারের সাথে আমার বিবাহ সম্পাদন করার, এখন গিয়ে যখন বিয়েটা নিজে নিজে হয়ে যাচ্ছে, আমার মা কখনোই তা ভাঙতে দিবে না।
আমাদের সিলেটিদের একটা জন্মগত রোগ আছে। বাংলাদেশি কোনো ছেলের যদি মাসিক বেতন তিন চার লাখটাকা হয় তাহলে সিলেটি মা-বাবারা তার সাথে বিয়ে দেবেন না, বিয়ে দেবে কার সাথে জানেন, বিদেশে থাকা, গ্রীন কার্ড হোল্ডার, রেস্টুরেন্টে কাজ করা, না হয় ড্রেইন পরিস্কার করা কোনো লোকের সাথে। আর যদি ভুলক্রমে গ্রীন হোল্ডার বিশিষ্ট লোকটা নিজস্ব দু-একটা রেস্টুরেন্ট, দোকান, বা কোনো পারফিউম শপের ওনার হয় তাহলে তো সোনায় সোহাগা। লোভী, লোভী, লোভী, সবগুলো মা-বাবা লোভী!
আমার সাথেও আজ তাই হয়েছে। সারাজীবন দেখেছি পেট উঁচু বিদেশিদের সাথে ধরে ধরে কাজিনদের অমতে তাদের বিয়ে দেওয়া হচ্ছে, আজ আমাকেও বিয়ে দিচ্ছে আমার অমতে, এদিক থেকে পরিবারের প্রতি সামান্য প্রসন্ন আমি, পেট উঁচু কোনো লোকের সাথে আমার বিয়ে দেওয়া হয়নি, কিন্তু বয়সের দিক থেকে গণে গণে বারো বছরের এক বুড়োর সাথে তো বিয়ে দিচ্ছে, কিয়ান হায়দারের বয়স আনমান আমি এখন সদ্য জন্ম নেওয়া এক বাচ্চা।
বিয়ের প্রস্তাব এসেছে উনাদের থেকে দু-দিন পূর্বে, আমার পিতা-মাতা কিয়ান হায়দারের কাছ থেকে বিয়ের সম্বন্ধ পেয়ে, আমাকে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন বোধ না করেই, হ্যাঁ বলে দিয়েছেন, লাফিয়ে ঝাপিয়ে। কথা পাকাপাকি মোবাইলে শেষ করে ফেলেছেন, এখন নাকি তারা আজ আকদ করতে আসছেন। আর আমাকে জানিয়েছেন সব গতকাল রাতে।
গতকাল রাতে যখন আমাকে জানানো হলো কিয়ান হায়দারের ব্যাপারে বিস্তারিত, তখন আমার মাথায় হিন্দি সিনেমার মতো তিনবার করে বাজ পড়ল। এই জীবনটা কোনো ড্রামা বা সিরিজ এর অংশ হতো তাহলে সবাই স্ক্রিনে দেখতে পেত আমার হাসি খুশি মুখ কীভাবে অন্ধকারে তলিয়ে গেছিল। মুখের ভেতর একদলা ভাত ছিল, সব বমির ঠেলায় প্লেটেই পড়ে গেছে। উনারা সব পাকাপাকি করে আমার মত জানতে এসেছেন, আবার বলে দিয়েছেন উত্তর জেনো হ্যাঁ হয়, তাহলে আমার মত জানতে চাইল কেন! বিয়ে দিয়ে এসে জানাত, তোর বিয়ে দিয়ে দিয়েছি।
কিয়ান হায়দার আমার সোয়ামি ভাবতেই গা ঘোলাচ্ছে, এখনই এই অবস্থা, বিয়ের পর কী হবে, কীভাবে সংসার হবে, এই লোকের সাথে আমার বসতি হবে কীভাবে,এসব ভেবে ভেবে আমি এখনই আধমরা হয়ে যাচ্ছি। চোখের নিচে একটা মোটা ডার্ক সার্কেল এর যে আস্তরণ পড়ে যাচ্ছে তা আমি আমার মনের দৃষ্টি দিয়ে অনুভব করে ফেলেছি।
আমার মাথায় চিন্তাভাবনার অন্তিম হলো যখন গ্রাউন্ড ফ্লোর থেকে পরপর গাড়ি এসে ঢোকার আওয়াজ পেলাম, এরপর শব্দ করে একাধিক বার বাজানো হলো হর্ণের শব্দ। এই কিয়ান হায়দার কী মনে করে, আমি কাল, কানে কম শুনি, এত হর্ণ বাজানোর মানে কী! নাকি ও প্রমাণ করতে চায় ওরা আমাদের থেকে বড়লোক। হতে পারে, হঠাৎ ধনী হলে মানুষ নিজেকে মানুষ মনে করে না, মনে করে সে দুনিয়ার বাদশা, আমি এই লক্ষণ কিয়ান হায়দারের মধ্যে লক্ষ করছি।
মুখ ঝামটা মেরে নিজের উল্টাপাল্টা চিন্তা মাথার একপাশে ফেলে রেখে দিংতানা দিংতানা করে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। চোখ সরু করে পর্দার আড়াল থেকে গাড়ি হতে বের হওয়া সবাইকে লক্ষ করতে শুরু করলাম।
কিয়ান হায়দারকে লাস্ট যখন দেখেছিলাম উনার বয়স ছিল চব্বিশ বছর। লাস্ট ছয় বছরে উনার টিকিটুকু দেখিনি, দেখব কীভাবে নিউইয়র্ক এ ছিল এজন্য। এই ছয় বছরে কতটুকু চেঞ্জ হলো দেখতে আমি উৎসুক। আগে যে দু-বার দু-পলকের জন্য দেখেছিলাম কিয়ান হায়দারকে তখন উষ্কখুষ্ক চুল, মুখ সবসময় গোমড়া করে রাখা দেখা যেত। শার্ট কখনো ইন করে পরত না। ট্রাউজারের সাথে ঢিলেঢালা চেক শার্ট পরে চলে যেত গাধাটা, ইরেস্টাইল বলতে কিছু ভেতরে ছিল না। স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি উঁচু লম্বা হওয়ায় সাধারণ স্বাস্থ্যে দেখলে মনে হতো এই বাতাস দিবে আর বাচ্চা ছেলেটা উড়ে যাবে। কিছুটা কাকতারুয়ার মতো লাগত। এটা মনে হতেই হেসে ফেললাম সামান্য। কিয়ান হায়দার নাম বদলে কাকতারুয়া হায়দার রাখলে বেশি ভালো হয়, তাই না? আমি আজ থেকে কাকতারুয়া হায়দার বলেই এই লোককে ডাকব।
উঁকি ঝুঁকি মারার জন্য যে পজিশনে দাঁড়িয়েছি যদি কখনো উল্টে পড়ি, তাহলে কোমর হাত পা ভাঙবে। আমার পুরো রুম জুড়ে নতুন আত্মীয়, কিয়ান হায়দারদের সাথে পাঠানোর জন্য উপহার সামগ্রী রাখা হয়েছে। উপহারের উপর উঠে এক পায়ে ভর দিয়ে নিচে নজরদারি করছি আমি। কিন্তু এখন রাগ লাগছে, এই ব্যাটা কিয়ান হায়দার গাড়ি থেকে বের হচ্ছে না কেন। আমি তো অপেক্ষায় আছি তাকে দেখার আশায়। এক পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ানো তে পা টনটন করে ব্যথা করছে, আরে ভাই বের হয়ে যা গাড়ি থেকে। তোকে বের করার জন্য কী মিডিয়া আসবে, নাকি আর্মি ফোর্স আসবে, যত্তসব!
আমার অপেক্ষার অন্তিম করে কিয়ান হায়দার গাড়ি থেকে বের হলেন। গাড়ি থেকে বের হলো কই, শুধু এক পা বাহিরে বের করেছে। আমি তো শুধু রক্ত জমাট হওয়া লাল বর্ণের স্লিপার পরা এক জোড়া পা দেখতেছি৷
জানালার এক কোণো থেকে কোণা চোখে সামনে নজর রাখায় চোখ সামান্য ব্যথা হচ্ছে। সাথে রাগে মাথা ফাটছে। দাউদাউ করে মগজে আগুন জ্বলছে। বের হচ্ছে না কেন গাড়ি থেকে, ওর জন্য কী কেউ অপেক্ষায় আছে নাকি ও বের হবে আর ওকে দেখবে। নিজের মনের ভেতর হামাগুড়ি দিয়ে চলা নিজের কথায় সামান্য লজ্জা পেলাম আমি। নিজেই তো লটকে, ঝুলে দেখার জন্য দাঁড়িয়ে আছি। এবার হয়তো গাড়িতে বসা কিয়ান হায়দার প্রসন্ন হলেন আমার উপর একটু, ধীরে ধীরে বের হতে দেখা গেল তাকে পুরো শরীর নিয়ে। আমাকে অত্মাশ্চার্য করে দিয়ে নিজের রঙ রুপ মেলে ধরলেন। আমার মুখ হা হয়ে গেল, একটা লোক আমেরিকা থেকে ঘুরে এসেছে তারপরও কিছুর পরিবর্তন নেই, চিৎকার করে পৃথিবী, সমগ্র বায়ূমন্ডলকে জানিয়ে দিতে ইচ্ছে হলো, এই কিয়ান হায়দার একটু ও পরিবর্তন হয়নি। এক ফোটা ও না!
আমার প্রথমেই বোঝা উচিত ছিল যে স্লিপার পরে বিয়ে করতে আসে, সে আবার কীভাবে ফর্মাল লুকে আসবে। যাই হোক আমার তাতে কী! যা ইচ্ছে করুক।
সাত আট বছর পূর্বের সেই বিখ্যাত কালো ট্রাউজার আর গ্রে কালার ঢিলেঢালা টি-শার্ট পরে আসছে আমাকে, মাহিরা মূর্তজাকে বিয়ে করতে৷ চুলে একটু তেল-পানি দেয়নি। দেখেই মনে হচ্ছে গত একমাস পানির ধারে কাছে যায়নি এই লোক।
আমার মাথায় তখনই এটে গেল একটা কথা, কিয়ান হায়দার নামের লোকটা আস্তো খাচ্চোর, আস্তো অপরিস্কার, আস্তো নোংরা, ওয়াক থু!
চলবে…
[অনুমতি ছাড়া কপি করা কঠিনভাবে নিষিদ্ধ]
