#অনাকাঙ্ক্ষিত_অসুখ
#লিমা_ইমরাত
#শেষাংশ
নবীন বরণ উৎসব শেষ করে ভার্সিটির ক্যাম্পাসের ডানদিকে বিশাল বড় কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে বেঞ্চে বসে ছিলো অনন্যা। ভ্যাপসা গরমে শাড়ি পড়ার দরুন তার অবস্থা নাজেহাল। গাছের ছায়ায় বসে বসে আনমনেই ভাবছিল সেই ডাইরি টির কথা। কোনো নাম লিখা না থাকায় সে আজও খুঁজে পায়নি ডায়রির মালিক কে। লাইব্রেরিতে গিয়ে অনেক বার জিজ্ঞাসা করা হয়েছে । ফলাফল শূন্য। ভাগ্য তার সহায় হয়নি। সে খুঁজে পায়নি সেই নারীকে। আর না জানতে পেরেছে কি হয়েছিলো তার সাথে। মেয়েটি বেঁচে আছে তো? আচ্ছা তার বাচ্চাদের কি হয়েছিলো? আর রিহান নামক পুরুষ টির কি হয়েছিলো?
“তার আকাশ পাতাল ভাবনার মাঝে একটি ছোট্ট ফুটফুটে পরীর বাচ্চা এসে তার শাড়ির আঁচল টেনে ধরে। স্কাই ব্লু কালারের বার্বি গাউন পড়া ধবধবে ফর্সা শরীরে। ডাগর ডাগর চোখে অনন্যার দিকে তাকিয়ে আছে সে। বাচ্চাটিকে দেখে এক মুহুর্ত দেরি না করে ঝট করে তাকে কোলে তুলে নিলো। টপাটপ চুমু খেলো গালে চোখে কপালে। আস্ত এক জীবন্ত পুতুল বাচ্চাটা । এরপর আশেপাশে তাকালো কাউকে খুজতে। বাচ্চাটা কার সাথে এলো এখানে? বাচ্চাটার বয়স কত হবে ? দের বা দুই বছর। পরপর চোখ ঘুরালো আসে পাশে।
হঠাৎ তার সামনে দৌড়ে এলো ফর্মাল ড্রেস পরিহিত এক সুদর্শন পুরুষ। অনন্যা থমকায় যখন বাচ্চা মেয়েটির সাথে লোকটার চেহারার অনেকাংশে মিল খুঁজে পায়। কোলে থাকা বাচ্চা মেয়েটি হাত বাড়িয়ে দিয়ে আদো আদো গলায় ডাকে – বাবাহ্! বাবাহ”
মুহূর্তেই মেয়েকে কোলে তুলে নিলো লোকটা। কপালে গালে চুমু খেয়ে বললো –
” এভাবে কোথায় গেছিলে মা? বাবা তোমাকে খুঁজেছি । না বলে কোথাও যেতে নেই। যদি তুমি হারিয়ে যেতে ? তখন কোথায় খুঁজতাম বলো?
বাচ্চাটা কি বুঝলো কে জানে। দুই হাতে বাবার গলা জড়িয়ে ধরলো । ঘাড়ে মাথা রাখলো আবেশে চোখ বুঝে নিলো। যেনো সে তার সর্গ খুঁজে পেয়েছে। অস্পষ্ট সুরে বললো ” সয়ি বাবা ” ।
এত কিছুর মাঝে নীরব দর্শক ছিলো অনন্যা। বুঝতে পারলো বাচ্চাটা একা একা হাঁটতে হাঁটতে এদিকে চলে এসেছিল। সামনে থাকা পুরুষটি তার বাবা। তাকে যখন #রিহান ধন্যবাদ দিতে ব্যাস্ত তখনই আবির্ভাব ঘটে সেই কাঙ্ক্ষিত রমণীর। #রাই তার আরেক মেয়েকে কোলে নিয়ে এসে দাঁড়ালো তাদের সামনে। অধৈর্য গলায় বললো ”
” ওকে কোথায় পেলে তুমি? কোথায় চলে গেছিলো? এই মেয়ে এক নিমেষে হওয়া হয়ে গেলো ! এত দূরে চলে এলো একা একা?
মায়ের কথায় বাবার গলা থেকে মুখ তুললো #হিয়া । মায়ের কোলে তার আরেক বোন #দিয়া কে দেখে খুশি হলো। বোনে বোনে ভীষণ ভাব তাদের। এক জন আরেক জনকে ছাড়া কিছুতেই থাকবে না। তখন বাবার কোল থেকে নেমে মায়ের সঙ্গে দাঁড়ায় বাচ্চা দুটো। রিহান গিয়েছিল রাইয়ের জন্য পানি আনতে । হিয়া রাইয়ের শাড়ির কুচি টানতেই এলোমেলো হয়ে যায় । শাড়ী ঠিক করার মাঝেই হিয়া হাঁটতে হাঁটতে চলে আসে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে। সেখানে অনন্যাকে মায়ের মতো শাড়ি পরে বসে থাকতে দেখে সে। ছোট ছোট পায়ে কাছে এসে আঁচল টেনে ধরে অনন্যার ।
_______
তাদের এমন সুন্দর সংসার দেখে খুশি হয় অনন্যা। আবারো মনে পরে ডাইরিতে থাকা মেয়েটির কথা। সেই মেয়েটির ও তো এমন একটা সংসার থাকতো । এমন ফুটফুটে দুটি বাচ্চা থাকতো। ভালোবেসে আগলে রাখার মতো একটা স্বামী থাকতো। অনন্যা আনমনেই জিজ্ঞাসা করে বাচ্চাদের নাম । রাই ঠোঁটে মনোমুগ্ধকর হাসি নিয়ে উত্তর দিলো –
” রিদিতা খান দিয়া ” আর “রিশীতা খান হিয়া”
মেয়েদের নাম ” রিহান ” এর সাথে মিলিয়ে আমার শাশুড়ি মা রেখেছেন।
রাইয়ের কথায় বিদ্যুতের ন্যায় চমকালো অনন্যা। মাত্রই কি নাম বললো মেয়েটা। রিহান? সে কি ঠিক শুনলো? কনফিউশন দুর করতে অনন্যা জিজ্ঞাসা করলো ” আপনাদের নাম জানতে পারি কিছু মনে না করলে?
রাই এবং রিহান দুজনেই সৌজন্য হাসলো। একসাথে কি দারুন মানিয়েছে তাদের। কোনো এক রূপকথার জগতের রাজা রানীর মতোই লাগলো তাদের। বাচ্চা দুটো তাদের রাজকন্যা। রিহান এবার হালকা হেসে দিয়া কে ও কোলে তুলতে তুলতে বললো ”
আমি “সাজ্জাদ খান রিহান” আর আমার স্ত্রী ” অঞ্জনা খান রাই”
নাম গুলো শুনতেই হতবাক অনন্যা। রিহান খান? তার মানে সেই কি সেই রিহান যাকে খুঁজে চলেছে মাসের পর মাস। রাই কি তবে সেই নারী যাকে একবার দেখার দেখার জন্য অনন্যা এত টা ছটফট করেছে? এরাই
কি ডায়রির সে প্রেমযুগল ? সেই প্রেমিক পুরুষ আর তার ভাগ্যবতী নারী?
অনন্যা নিজেকে আর দমিয়ে রাখতে পারলো না। উদ্বিগ্ন গলায় প্রশ্ন করলো ” কোন রিহান? মানে ডায়রির সেই নারী যাকে অসম্ভব ভালোবাসতো তার স্বামী? আপনরা কি সেই কাপোল? আর এই বাচ্চা দুটো?
অনন্যার কথায় কিছুটা অবাক হলো রাই এবং রিহান। কি বলতে চাচ্ছে মেয়েটি ? তাদের সম্পর্কে কিভাবে জানলো এই মেয়ে? হঠাৎ রাইয়ের মনে পড়লো ডায়রির কথা। যেটা আজ থেকে প্রায় সাত আট মাস আগে লাইব্রেরিতে গিয়ে হারিয়ে ফেলেছিল সে। তার জীবনের অনেক ঘটনাই লিখা ছিলো ডাইরিতে। তার বাচ্চারা দুনিয়ায় আসার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সব ঘটনাই লিখেছিল সে। এরপর তার অসুস্থতা আর বাচ্চাদের সামলাতে গিয়ে লিখা হয়ে ওঠেনি। আর একদিন ভুলবশত হারিয়ে ফেলে ডায়েরিটি। কিন্তু সেটা এই মেয়ের কাছে কিভাবে এলো?
“হ্যাঁ আমার স্বামী রিহান। আপনি সম্ভবত আমার ডায়রির কথা বলছেন যেটা আমি লাইব্রেরিতে হারিয়ে ফেলেছিলাম কয়েক মাস আগে। কিন্তু সেটা আপনি পেলেন কিভাবে?
রাইয়ের কথায় আকাশের চাঁদ পাওয়ার ন্যায় লাফিয়ে ওঠে অনন্যা। খুশিতে আত্মহারা সে। অবশেষে খুঁজে পেয়েছে কাঙ্ক্ষিত সেই ভাগ্যবতী নারীকে। খুঁজে পেয়েছে সেই বউ পাগলা রিহান কে। সঙ্গে তাদের ফুটফুটে দুই মেয়েকে। নিজেকে সামলাতে না পেরে ঝাপটে ধরলো রাইকে। খুশিতে গদগদ হয়ে বললো ”
ওহ ইয়েস আমি খুঁজে পেয়েছি তোমাদের। তুমি ভাবতে পারবে না আমি কত দিন ধরে খুজছি তোমাদের। লাইব্রেরী থেকে তোমার ডায়েরিটি পাওয়ার পর যখন তোমার জীবনী পড়লাম তখন থেকেই খুঁজে চলেছে। তোমার অপারেশন এর পর কি হয়েছিলো সেটা জানার জন্য আমি কত রাত জেগে পার করেছি কি বলবো।
তোমার নাম লিখা ছিলো না ডাইরিতে । শুধু #অনাকাঙ্ক্ষিত_অসুখ লেখা থাকায় কোনো ভাবেই তোমার খোঁজ পাইনি আমি। দিনের পর দিন শুধু ভেবেছি কি হয়েছিলো তোমার? তোমার সন্তানদের ? আর তোমার পাগল প্রেমিক তোমার ভালোবাসার মানুষটার ই বা কি হয়েছিলো? তোমাকে বলে বুঝাতে পারবো আজকে আমি কত টা খুশি!
রাই এবং রিহান দুজনেই হতবাক। একটা মেয়ে শুধু ডাইরি পরে কিভাবে তাদের খোঁজ পেতে এতটা মরিয়া হয়ে উঠেছে। পরপর সন্তুষ্ট হাসলো দুজনেই। রাই অনন্যাকে জড়িয়ে বললো –
এখন যখন খুঁজে পেয়েই গেছো তখন আর হারিয়ে যাবো না। আমাদের বাড়িতে বেড়াতে যেতে হবে তোমায়। আফটার অল আমাদের মেয়েদের নতুন খালামণি তুমি । আমাদের নতুন আত্মীয়। আমাদের যখন একই ভার্সিটি তখন বন্ধুত্ব করা যায় । কি বলো?
অনন্যা এক গাল হেসে উত্তর দিলো ” অবশ্যই। এত খোজা খুজির পরে পেয়েছি যখন এত সহজে ছাড়ছি না। আর পরীর বাচ্চা গুলো আরো ছাড়া যাবে না। আমি কিন্তু ওদের দেখতে যাবো মাঝে মাঝে। মানা করবে না ?
“তুমি যখন খুশি আসবে যাবে আমার মেয়েদের কাছে। খালামনিদের একটু বেশি দাবি থাকে তাই না। ”
রিহানের কথায় কৃতজ্ঞ হলো অনন্যা। সত্যি লোকটা অসাধারণ। এমন স্বামী পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। অনন্যার ভাগ্য কি এত টা ভালো হবে? ইস যদি কোনো ভাবে রাইয়ের মতো এমন ভাগ্যবতী হতো সে।
” আজ তাহলে আসি। মেয়েদের নিয়ে একটু ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। এরপর মেয়ের মাকে নিয়ে ঘুরতে যাবো “!
বলেই স্ত্রী সন্তান দের নিয়ে সামনের দিকে পা বাড়ালো রিহান। অনন্যা এক রাশ প্রশান্তি এবং মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে রয় তাদের যাওয়ার পানে। সৃষ্টি কর্তার অশেষ রহমত। অনন্যা বিড়বিড় করে বলে ওঠে ” নশ্বর এই পৃথিবীতে অবিনশ্বর হোক তোমাদের ভালোবাসার বন্ধন। আমৃত্যু জড়িয়ে থাকো একে অপরের মাঝে। পৃথিবীর সব সুখ তোমাদের ভাগ্যে লিখে দেওয়া হোক।যতবার #অনাকাঙ্ক্ষিত_অসুখ আসবে জীবনে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরো দুজন দুজনাকে”।
সমাপ্তি…..
____________________________________________
[ #অনাকাঙ্ক্ষিত_ অসুখ এর কোনো সমাপ্তি নেই। সুখের পরে দুঃখ আসবে। তবে প্রিয়দের ভালোবাসার জাদুতে সেই অসুখ একদিন সেরে উঠবে। আপনজনদের যত্নে রাখুন আগলে রাখুন। হারিয়ে যাওয়ার পরে আফছস করা চেয়ে থাকতে মূল্য দিন।আজকের মত এখানেই শেষ। আবার নতুন গল্পঃ নিয়ে আসবো ইনশাল্লাহ। ]
