#অনাকাঙ্ক্ষিত_অসুখ
#লিমা_ইমরাত
#চতুর্থাংশ
ভার্সিটির সুবিশাল ক্যাম্পাস এর এক পাশে পার্কিং এরিয়ায় দাঁড়িয়ে আছে কালো ফোর্ড গাড়িটি। গাড়ি থেকে কিছুটা দূরে অবস্থান করছে এক সুদর্শন পুরুষ। ফর্মাল গেটাপে থাকা পুরুষটির কোলে দুটি ফুটফুটে কন্যা শিশু সকলের দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু। এ যেনো জীবন্ত দুটি ফুল । বাবার কোলে থাকা দুটো রাজকন্যা ।
দুজনের গায়ে স্কাই ব্লু কালারের প্রিন্সেস ফ্রক ।দুজনের চুল একই ভাবে ঝুটি করা। বয়স কত হবে? দের বা দুই বছর । অমায়িক সৌন্দর্য আর মায়ার অধিকারী বাচ্চা দুটো ডাগর ডাগর চোখ ঘুরিয়ে চারপাশে দেখতে ব্যাস্ত। পাশে থেকে যেই যাচ্ছে একবার তাদের দিকে তাকাচ্ছে। বাবার কোলে কি সুন্দর লেপ্টে আছে তারা।
” আম্মা! আম্মা ! ”
বলে দুটো বাচ্চা এক সাথেই হৈচৈ শুরু করলো বাবার কোল থেকেই। অর্থাৎ এবার তাদের নামিয়ে দেওয়া হোক। তাদের মা এসেছে ।এবার মায়ের কাছে যাবে ।
লোকটা তাদের নামালো না কোল থেকে। বরং আরো খানিকটা চেপে ধরলো নিজের বুকে। যে ভাবে উথাল পাথাল করছে মেয়ে দুটো যেকোনো সময় পরে যাবে।
“কিছুটা দূরেই শাড়ি পরিহিত এক অপরুপা এগিয়ে আসছে তাদের দিকে। সুতি মেরুন রঙের শাড়ি পড়া চুল গুলো হাত খোপা করে তাতে ফুল গোঁজা। হাতে খয়েরী রেসমি চুড়ি গুলো রিনরিনে উঠছে হাঁটার তালে। মুখে সামান্য প্রসাধনী ব্যবহার করেছে মেয়েটা। তাতেই কি অপূর্ব মায়াবিনী দেখালো তাকে”।
মেঘাচ্ছন্ন চোখে সেই অপরুপা কে দেখতে ব্যাস্ত রিহান। চোখের পলক ফেলতে ভুলে গেলো। বাচ্চাদের কোলে নিয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রয় সেখানেই। #রাই তাদের কাছে এসে দাঁড়াতেই মেয়ে দুটো হাত বাড়ালো কোলে যাওয়ার জন্য।
” এই সেই নারী যার জন্য তার জীবনে এত সুখ এত ভালোবাসা। সেই প্রথম থেকে যাকে নিজের সবটা দিয়ে ভালোবেসে এসেছে রিহান । যাকে পাওয়ার জন্য নিজেকে হারিয়েছে। যার সাথে সুখের সংসার গড়েছে। তাকে হারানোর ভয়ে পাগলের মতো কেঁদেছে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে। প্রতি মুহূর্তে অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করেছে। বারংবার আল্লাহর কাছে ভিক্ষা চেয়েছে নিজের প্রাণপ্রিয় অর্ধাঙ্গিনী জীবন। বুকে তীব্র ব্যথা অনুভব করেছে প্রতিটা মুহূর্ত যখন এই নারী তাকে ছেড়ে যাওয়ার পাঁয়তারা করছিলো” ।
_____
” সেই দিন রাই কে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়ার পরমুহুর্তে জ্ঞান হারায় রিহান। অতিরিক্ত মানসিক চাপ আর স্বাস্থ্যের ঘাটতি থেকে ছোট খাটো হার্ট এ্যাটাক করেছিল সে। জরুরী ভিত্তিতে তাকে একই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এক দিকে রাইয়ের সি সেকশন হচ্ছে ওপর দিকে রিহানকে নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলেন সকলে।
রাইয়ের অপারেশন শুরু হওয়ার ঘণ্টা খানিক পড়ে বাচ্চার কান্নার শব্দ পাওয়া যায়। দুটো বাচ্চাই সুস্থ ছিলো । তাদের অবজারভেশন এ রাখা হয় ।তবে সমস্যা হয় রাইকে নিয়ে। এক দিকে বাচ্চাদের পেয়ে কেউ খুশি হতে পারছিল না রাই আর রিহানের কথা ভেবে ।অতিরিক্ত রক্ত যাওয়ায় রাইয়ের শরীর ছেড়ে দিচ্ছিলো ক্রমশ। অপারেশন সাকসেসফুল হওয়ার পরও রাইকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। অবস্থা খারাপ হচ্ছিলো সময়ের সাথে।
দীর্ঘ সময় পরে জ্ঞান ফেরে রিহানের। চোখ খুলতেই শুরু হয় তার পাগলামি। হাতের লাগানো ক্যানলা টেনে ছিঁড়ে ফেলে বের করে যায় কেবিন থেকে। রিহানের মা বাবা দুজন গিয়ে ঝাপটে জড়িয়ে ধরে ছেলেকে। এমনিতেই ছেলেটার শরীর খারাপ তারপর আবার এখন পাগলামি করলে বড় কোনো ক্ষতি হয়ে যাবে।
রিহানকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করতে চাইলো তারা। কিন্তু তা আর সম্ভব হলো না। নিজের প্রেয়সীর খোঁজে উম্মদ প্রেমিক ভাংচুর জুড়ে দিলো হাসপাতালে। তার দাবি একটাই।
বউ কে চাই। তার বউকে এনে দিতে হবে এখনই। তার বউয়ের কিছু হলে সে বাঁচবে না।
” অনেক জোরাজুরির পড়ে ডাক্তার রিহানকে জানালেন রাই আছে। লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে তাকে। এখন আল্লাহ চাইলে তার বউকে বাঁচাতে পারেন। তবে তার বাচ্চারা সুস্থ আছে ।
ব্যাস এতটুকুই যথেষ্ট ছিলো রিহানের জন্য। তার বউ বেঁচে আছে। তাকে ছেড়ে যায়নি।যেভাবেই হোক আল্লাহর কাছ থেকে ভিক্ষা চেয়ে নিবে সে তার বউকে। যদি আল্লাহ তার বুকে তার রাইকে ফিরিয়ে না দেয় তাহলে সে ও চলে যাবে তার সাথে। এই নিষ্ঠুর দুনিয়ায় রাইকে ছাড়া বেঁচে থাকা সম্ভব নয় তার পক্ষে। বাচ্চাদের দেখার জন্য তার মা বাবা আছেন। তবুও সে পারবে না একা রাইকে ছাড়া থাকতে।
____
এরপর শুরু হলো রিহানের লড়াই নিজের প্রাণ এবং অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার লড়াই। দিন রাত আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা আর নিজের স্ত্রীর পাশে থাকা। এর মাঝে রাইয়ের অবস্থা কিছুটা ভালো হলে তাকে ইমার্জেন্সী রুমে শিফট করা হয়। জানা যায় রিহার শরীর প্যারালাইসিস হয়ে আছে তবে মস্তিষ্ক সচল। তাতে ও হাল ছাড়েনি রিহান। বউয়ের সব কাজ সে নিজেই করে ফেলতো। তার মেয়ে দুটোকে দেখা শোনা করার জন্য আলাদা নার্স রাখা হলো। তবে রাইয়ের কাছে তাদের আসা নিষেধ। ডাক্তার ব্যতীত কাউকে ছুঁতে দিত না।
এভাবে তিন মাসের মাথায় রাইয়ের শরীর রেসপন্স করতে শুরু করে। সেদিন রিহানের কান্না আবারো দেখেছিল সকলে। হাসপাতের ডাক্তার নার্স সকলেই কেঁদেছিল সেদিন এক পাগল প্রেমিকের কান্নায়। আল্লাহর দরবারে হাত তুলে দোয়া করেছিল অসংখ্য মানুষ। আল্লাহর অশেষ রহমতে ছয় মাসের মাথায় সুস্থ হয়ে উঠলো রাই।
রাইকে জড়িয়ে ধরে হাজারো চুমুতে ভিজিয়ে দিয়েছিল রিহান। দীর্ঘ দিনের তৃষ্ণার্থ সে। নিজের প্রেয়সীকে ছাড়া নিজেকে কল্পনা করতে পারেনি রিহান। তার এমন ভালোবাসা আর আল্লাহর দয়ায় আজ রাই আবারো তার বুকে ফিরে এসেছে। তাকে ছেড়ে যায়নি। তাদের সন্তান ও এখন সুস্থ আছে। দীর্ঘ এক অমাবশ্যার পড়ে তাদের জীবন আবার আলোকিত হলো তাদের জীবন।
____________________________________________
শরীরে রাইয়ের স্পর্শ লাগতেই ভ্রম কাটলো রিহানের। এটা স্বপ্ন নয় সত্যি। তার ব্যক্তিগত নারী তার ভালোবাসা তার সামনে দাঁড়িয়ে। কোল ভর্তি সুখ তার।স্ত্রী সন্তান নিয়ে ভরা সংসার। অতীত ঘটে যাওয়া ঘটনা আর সেই #অনাকাঙ্ক্ষিত_অসুখ ভুলে যাওয়া এত সহজ নয় তার জন্য। এখনো মাঝ রাতে ঘুম ভেংগে যায় সেই সব দিনের কথা স্মরণ করলে। খারাপ স্বপ্নের ন্যায় তার পিছনে পড়ে থাকে সেসব। সেই দিন গুলো তাদের জীবন পুনরায় না আসুক।আধারের দেওয়াল ভেঙে চুরমার হয়ে যাক।
রাই বাচ্চাদের কোলে তুলে নিলো দুইহাতে। মেয়ে দুটো দেখতে পুরোটাই বাবার মতো । তবে চুল গুলো মায়ের মতোই বড় এবং ঘন। স্বভাব চরিত্রে বাবার সাথে বেশ মিল তাদের। তাদের বাবা যেমন রাইয়ের জন্য পাগল ঠিক তেমনি তারাও রাইয়ের জন্য পাগল। মা ছাড়া তাদের চলে না। আজকে ভার্সিটিতে একটা ছোট খাটো অনুষ্ঠান ছিলো। যার দরুন বাধ্য হয়েই বাচ্চাদের নিয়ে আসতে হয় রাইকে । আর বাচ্চাদের সামলানোর জন্য বাচ্চাদের বাবা কে ও। এত খন রিহানের কাছে রেখে গিয়েছিল মেয়েদেরকে। নয়তো তাকে জীবনেও টিকতে দিতো না রিহানের পাজি মেয়ে গুলো। বাপের কার্বন কপি বলে কথা।
“অনেক্ষন অপেক্ষা করালাম না? আসলে অনুষ্ঠান শেষ করে সবার সাথে কথা বলতে গিয়ে দেরি হতে গেলো। এত গরমে তুমি বাচ্চাদের কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছো। আমি ভীষণ সরি!
মন খারাপ করেই কথা গুলো বললো রাই। লোকটা অফিস না গিয়ে বাচ্চাদের নিয়ে এখানে রয়েছে শুধু তার জন্য। বেশ খারাপই লাগলো রাইয়ের।
” রিহান দুই কদম এগিয়ে এসে পকেট থেকে রুমাল বের করে রাইয়ের কপালের জমে থাকা বন্ধু বন্ধু ঘাম মুছতে মুছতে বললো”
” তোমাকে একটু কাছে পাওয়ার নেশায় সারা জীবন অপেক্ষা করতে রাজি। তোমায় একটু ছুয়ে দেওয়ার জন্য হাজার জনম দাঁড়িয়ে থাকতে রাজি। তোমায় একটু ভালোবাসার লোভে নিজেকে বিলীন করতে রাজি। তোমাতেই আমার শুরু তোমাতেই আমার সমাপ্তি।”
#চলবে
