#অনাকাঙ্ক্ষিত_অসুখ
#লিমা_ইমরাত
#তৃতীয়াংশ
চোখ বন্ধ অবস্থায় বিছানায় নেতিয়ে পরে আছি আমি। জ্ঞান ফেরার পরে নিজেকে আবিষ্কার করেছিলাম হাসপাতালের ইমার্জেন্সী রুমে। রিহান আমার ক্যানোলা লাগানো হাত জড়িয়ে পাশে বসা। কাদতে কাদতে চোখ মুখ লাল হয়ে ফুলে গেছে তার। ছেলে মানুষ এত কাদতে পারে? আচ্ছা বিয়ের আগের সেই গম্ভীর ব্যক্তিত্বের পুরুষ আর এখন আমার সামনে বসে থাকা পুরুষের মধ্যে এত কেনো পার্থক্য? দাম্ভিকতা আর গাম্ভীর্যের দেওয়াল ভেঙে চৌচির হয়ে গেছে ।হয়তো ভালোবাসা এমনি। যাকে ভালোবাসো তার সামনে তুমি ভীষণ দুর্বল আর অসহায়। বাহিরের শক্ত খোলসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কোমল হৃদয়ে শুধু হারানোর ভয়। সামান্য দূরত্বে ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠে বক্ষপিঞ্জর।
অতিরিক্ত ব্যথায় আর ব্লিডিং হওয়ার কারণে জ্ঞান হারিয়ে ছিলাম । জরুরী ভিত্তিতে অপারেশন করতে হবে আমার। তবে সমস্যা হচ্ছে অন্য জায়গায়।প্রেগন্যান্সির কয়েক মাস পরেই আমার পেটে ফাইব্রয়েড টিউমার ধরা পড়ে। সময়ের সাথে সাথে সেটা আরো বেশি বড় হয়। প্রথমত টুইন বেবি তারপর আবার এমন টিউমার এর কারণে লাইফ রিস্ক রয়েছে ব্যাপক।দুটো বাচ্চার মধ্যে একটি বাচ্চার গ্রোথ সাভাবিক তবে অন্য বাচ্চাটি বেশ ছোট এবং দুর্বল।
এত দিন জানা ছিলো না আমার এই সম্পর্কে। অর্ধ জ্ঞান অবস্থায় রিহান যখন কথা বলছিলো ডাক্তারের সাথে তখন কানে আসে আমার। এই কারণেই কি তবে রিহান এত টা ভেঙে পড়েছিল? রিহান শুরু থেকেই জানতো আমার এই অসুখের কথা? আমাকে একটা বারও জানায়নি হয়তো ভেবেছে আমি ভেঙে পড়বো ভয় পাবো।
কিছু চেকাপ করার পর আমাকে প্রস্তুত করা হলো অপারেশন এর জন্য। আমার শশুর শাশুড়ি দুজনেই উপস্থিত। আমাকে জড়িয়ে ধরে নিশ্চুপ কাদলেন কিছু ক্ষণ।মাথায় হাত বুলিয়ে সাহস দিলেন দুজনেই।হঠাৎ করেই বুকে মোচড় দিয়ে উঠলো। চোখ দুটো মাকে খুঁজলো ভীষণ করে।
” আমার মা নেই । চলে গেছেন বহুকাল আগেই। বাবা আমাকে ফেলে দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন আর তখন থেকেই আমি একা। সবার জীবন সুন্দর ভাবেই চলছিল । মাঝ খান থেকে থমকে গিয়েছিল শুধু আমার জীবন।নিজের কান্না গিলে গিলে অবহেলায় অযত্নে বড়ো হয়েছি ।আমার ব্যথা কষ্ট দুঃখ দেখার মতো কেউ ছিলো না।মায়ের অভাব ভালোবাসার অভাব আমাকে ঘিরে ধরেছিলো ভীষণ রকম।
এত কিছুর মাঝে ইন্টারমিডিয়েট শেষ করে ভার্সিটিতে উঠতেই রিহানের সাথে পরিচয় হয়। সে ফাইনাল ইয়ার এর মেধাবী ছাত্র। তারপর আবার বড়লোক ঘরের সন্তান। এই ভেবে তাকে এড়িয়ে চলতাম।কোনো এক দুর্ঘটনায় তার সাথে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে গেলাম আমি।যত দূরে সরিয়ে দিতাম ছেলেটা ততই কাছে চলে আসতো আমার।
এরপর একাকি জীবনে রিহান আমার জন্য এক মুঠো সুখ নিয়ে হাজির হয়। বন্ধুর মতো পাশে থাকে । আমার ছোট ছোট বিষয় গুলো নিয়ে ভাবে। ধীরে ধীরে আমরা একে অপরকে ভালোবেসে ফেলি। এক অজানা মায়ায় এমন ভাবে জড়িয়ে যাই যা থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়।
এক বছরের মাথায় সে আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে যায়। আমাকে বিয়ে করতে চাইলে রিহানের পরিবার এতে আপত্তি জানায়।
“মা নেই বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন এমন মেয়েকে তারা ছেলের বউ করবেন না। ”
উত্তরে রিহান শুধু বলেছিলো ” যদি ওকে মেনে নিতে তোমাদের আপত্তি থাকে তাহলে আমিও থাকবো না এই বাড়িতে। আমি ছাড়া আর কেউ নেই ওর। আমি ওর হাত ছেড়ে দিলে ওকে আগলে নিবে এমন কেউ নেই আম্মু। আমি ভীষণ ভালোবাসি ওকে ঠিক যতটা তোমাদের । আমি তোমাদের কাউকে ছাড়তে পারবো না।”
রিহানের পরিবার তবুও মেনে নিতে পারেনি তাদের এক মাত্র ছেলে আমার মত মেয়েকে বিয়ে করবে।তাদের ছেলে নিঃসন্দেহে হাজার গুন ভালো মেয়ে ডিজার্ভ করে।আমি কোনো দিক থেকেই তাদের ছেলের জন্য উপযুক্ত ছিলাম না।
পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে রিহান আমার হাত ধরে বেরিয়ে এসেছিল বাড়ি থেকে। বার বার নিষেধ করার পরও সে নিজের বাড়ি এবং বিলাসবহুল জীবন ছেড়েছিল আমার জন্য।কোনো কিছুর বিনিময়ে আমাকে হারাতে পারবে না ব্যাস।
__________
কল্পনার জগতে ছেদ পড়লো যখন আমাকে ওটির জন্য নিয়ে যাওয়া হলো। রিহান তখনো আমার হাত ধরে রেখেছিল শক্ত করে। ছেড়ে দিলে যদি হারিয়ে যাই।ওটির সামনে আসতেই বেসামাল হলো ছেলেটা।এতক্ষণ নিজেকে ধরে নিজেকে শক্ত রাখতে পারলেও এবার আর সম্ভব হলো না। সকলের সামনে আমাকে জড়িয়ে বুকে মুখ গুঁজে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো।
চোখের পানি আজ বাঁধ ভেঙেছে।তাকে শান্ত করা যাচ্ছে না কোনো ভাবেই। ডাক্তার বার বার বোঝাতে চাচ্ছেন রিহানকে।কিন্তু আজ তাকে বোঝানো যাচ্ছে না।আমিও পারছি না ওকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করতে। পুরো শরীর অবশ হয়ে আসছে। বুক থেকে মুখ তুলে দুই হাতের তালু স্পর্শ করালো আমার গালে। কান্না জড়িত গলায় থেমে থেমে বললো –
“আমার পাখি ! আমাকে কথা দাও আবার আমার বুকে ফিরে আসবে তুমি। তুমি ছাড়া আমি অসহায় জান। আমি পাগল হয়ে যাবো তুমি ছাড়া। আমি আমার বাচ্চাদের থেকে ও তোমায় বেশি ভালোবাসি জান। ওদের নিয়ে সুস্থ ভাবে ফিরে এসো ।
” এখনো অনেক টা পথ বাকি আছে। তোমাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন বোনা বাকি। আমাকে ছেড়ে কোথাও যাওয়ার কথা ভেবো না। তুমি নেই তো আমিও নেই।আমাদের বাচ্চাদের এতিম হয়ে বাঁচতে হবে তখন।আমি অপেক্ষায় থাকবো তোমার ”
আমার দুই চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। আর তাকিয়ে থাকতে পারলাম না। ডাক্তার তাড়া দিলেন ওটির জন্য। অনেক চেষ্টার পর রিহানের কাছ থেকে আমাকে ছড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হলো অপারেশন থিয়েটারে”।
“ডায়রির খণ্ডাংশ”
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
ব্যাস আর কিছু লেখা নেই ডায়রী তে। অনন্যা ডাইরিটির পাতা উল্টালো পর পর। না আর কিছু লেখা নেই পরের পাতা গুলোতে। মুহূর্তেই খেই হারিয়ে ফেললো অনন্যা। ভার্সিটির লাইব্রেরিতে থেকে কিছু বই সংগ্রহ করতে গিয়ে শেলফ এর নিচ থেকে পেয়েছিলো ডায়রী টা। কারো নাম লেখা ছিলো না শুধু প্রথম পৃষ্ঠায় লেখা ছিলো #অনাকাঙ্ক্ষিত_অসুখ । ডায়রী তে এমন শিরোনাম দেখে কিছুটা অবাক হয়েছিল অনন্যা। পরবর্তীতে সেটা নিজের সাথেই নিয়ে এসেছিল। যদি কেউ খোঁজ করে সেই জন্য।
“বেশ কিছু দিন পার হওয়ার পরে যখন ডায়রি টির কথা মনে পড়লো । বেশ আগ্রহ নিয়ে ডায়রির পাতা খুলতেই শেষের দিকে চোখে পড়লো কারোর প্রেগন্যান্সির সময়ের কয়েক মাসের ঘটনা লেখা। আগের পৃষ্ঠা গুলো পড়ে দেখা হয়নি এখনও। তবে শেষের দিকটা পড়তেই থমকে গেলো অনন্যা। কারো জীবনের বাস্তবতা এটা উপলব্ধি করতে পারলো সে। উদ্বিগ্ন পায়ে উঠে দাড়ালো অধৈর্য হলো মন। অস্থিরতা কাজ করছে ভিতরে।
বাকি পৃষ্ঠা গুলো খালি পরে আছে ।ওলট পালট করেও মেয়েটির নাম পেলো না কোথাও। বিতৃষ্ণায় ভরা এক নারীর জীবনী লেখা। পাতায় পাতায় চোখের পানির স্পষ্ট দাগ। না জানি কতটা কষ্ট দুঃখ নিয়ে সে লিখেছিল কথা গুলো।
অনন্যার মন ব্যাকুল হলো জানতে কার ডায়রী এটা? কার জীবনের ঘটনা আগুলো? কে এই নারী যার জন্য তার স্বামী এত টা পাগোল?এরপর কি হয়েছিলো ? রিহানের ভালোবাসা কি এখানেই সমাপ্তি ঘটে ছিল? বাচ্চা দের কি হয়েছিলো তারপর? চারটে জীবন কি এভাবেই শেষ হয়ে গিয়েছিলো ?
#চলবে……
