#Standing_next_to_you
#অনামিকা_আহমেদ
পর্ব:০৫
শুভ্রতার মুখে সাজ্জাদ শিকদার নাম টা শোনা মাত্র রুমার বুক তো মোচড় দিয়ে ওঠে। পুরোনো কিছু স্মৃতি মনে পড়ে যায় তার। সাদ্দাজ নাম টা তার ভীষণই প্রিয়, ইচ্ছা ছিল নিজের ছেলের নাম রাখবে সে সাজ্জাদ। কিন্তু তার শ্বাশুড়ি যখন শুনেছিল রুমা নিজের ছেলের নাম আগেই ঠিক করে রেখেছে তখন সে মুখ বাঁকিয়ে পান চিবাতে চিবাতে বলেছিল,
– মেয়ে মাইনষের এত শখের কি আছে বুঝি না বাপু। আমার নাতি, আমার বংশের বাতি, আর তার নাকি হেই বেডি রাখবো। এই বাড়ি থেকে আমার পাট চুকলো বুঝি। এখন তো আমার কোনো দাম থাকবেই না, নতুন মাতব্বর এসে গেছে কিনা।
সব শেষে তার শ্বাশুড়িই জিতলো। রুমা ও নিজের মনের মাঝেই সুপ্ত ইচ্ছাটা কে কবর দিলো। আজও গোধূলি লগ্নে একাকী থাকাকালে রুমা নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করে আজ প্রায় পঁচিশটা বছর হতে চলল একবারের জন্য কি নিজের ছেলের কথা মনে পড়েনি তার? একবারের জন্য কেনো নিজের ছেলেকে দেখতে মন চায়নি? শুভ্রতা কি আসলেই তার ছেলের জায়গাটা পূর্ণ করতে সক্ষম হয়েছে?
তখন মনের গভীর থেকে একটা উত্তরই ভেসে আসে, না, তার ও মন চেয়েছে নিজের ছেলেকে একটা বার দেখার জন্য। একবারের জন্য হলেও একটুখানি ছুঁয়ে আদর করবার জন্য। কিন্তু বিবেক তাকে এ কাজে বাঁধা দিয়েছে। আত্মসম্মানের জন্য সে শিকদার বাড়ি ছেড়েছিল, আজ নিজের সন্তানের জন্য আবারও সে সেখানে যাবে? না, ছেলেতে বড় হয়ে নিজের বাবার মতই এক*রোখা, স্বার্থ*পর, আর দুশ্চরি*ত্রের অধিকারী হবে। কারণ শরীরে তো একই র*ক্ত বইছে, আর সেখানে তাকে ভালো শিক্ষা দেওয়ার মতো কেউ নেই।
রুমা দিনের পর দিন কেঁদেছে, শুধু একটা ছবি কে সম্বল করে জীবন পার করে দিয়েছে। বাচ্চা অবস্থায় সবাই নিষ্পাপ ফেরেশতা থাকে, তার ছেলেও নাহয় এমন নিষ্পাপ থাকুক তার কাছে। বড় বেলার সেই আগ্রা*সী চেহারা রুমা দেখতে চায় না।
এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে রুমার চোখে দুফোঁটা অশ্রু এসে জমা হয়েছে সেটা সে নিজেও বুঝতে পারে না। ঘোর ভাঙলে দুর থেকে সে বাবা মেয়ের কথায় কর্ণপাত করে।
– লোকটা কি এমন করেছে যে আমার মামুনি তাকে পঁচা বলছে?
– শুধু পঁচা না লোকটা ভীষণই বদমে*জাজি, একরো*খা । সবাইকে ঝাড়ির ওপর রাখে জানো। আমি মাত্র পাঁচ মিনিট দেরি করেছিলাম বলে পঞ্চাশ মিনিট আমাকে দাড়া করিয়ে যা ইচ্ছা হয় তাই বলেছে। আর রিফাত কেও বদলি করে দিয়েছে।
– ওহ এই ব্যাপার, রিফাত থাকবে না তাই আমার মামুনির মন খারাপ?
– হুম, খারাপ লাগছে অনেক।
– ব্যাস, ব্যাস অনেক কথা হয়েছে, খেতে এসো এখন। চারটি মুখে তুলে আমাকে উদ্ধার করে প্রচণ্ড মাথা ব্যথা করছে আমার।
___________________________________________
খাবার শেষে ইফতিয়ার রুমে চলে গেলেও শুভ্রতা রুমার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে রান্নাঘরে। ইফতিয়ারকে রাতের ঔষুধ দিয়ে রুমা রান্নাঘরে এসে শুভ্রতা কে দেখে ভীষণই অবাক হয়।
– কিরে এখনও ঘুমাতে যাস নি যে?
– মা কাল বইয়ের ভিতর থেকে এই বাচ্চার ছবিটা পেলাম। এই বাচ্চাটা কে? দেখে তো ঠিক চিনলাম না।
রুমা শুভ্রতার হাতে নিজের ছেলের ছবিতে দেখে তৎক্ষণাৎ সেটাকে কেড়ে নেয়।
– ও আছে আমার একটা পরিচিত একজন। তুমি তাকে চিনো না।
– কে সে যার ছবি তুমি বইয়ের মধ্যে রেখেছিলে?
– শুভ্রতা কথা বাড়িয় না, যা বলছি তাই কর। প্রত্যেকটা মানুষের কিছু পার্সোনাল বিষয় থাকে, সেখানে নাক গলাতে নেই। যাও ঘুমাতে যাও।
মায়ের কাছে টাটকা ঝাড়ি খেয়ে শুভ্রতার মুখ চুপসে যায়। মনটা খারাপ করে সে রুমে চলে যায়। না, আজ বই পড়াতে মন বসছে না তার। তাই কিছুক্ষন fb চালিয়ে শুভ্রতা ঘুমিয়ে পড়ে। অথচ আজ যে একজনের আসবার কথা ছিল সেটা সে বেমালুম ভুলে গেছে।
রাত তখন দুইটা বেজে দশ মিনিট। মানুষটার ইচ্ছা ছিল ঠিক দুইটায় শুভ্রতার ঘরে প্রবেশ করবে কিন্তু বারান্দার দরজা লক করে রাখায় সেটাকে খুলতে তার দশ মিনিট লেগে যায়। কথা না মানায় তার মেজাজ এমনিতেই চড়ে আছে শুভ্রতার প্রতি।
কিন্তু বিছানার ওপর ঘুমন্ত শুভ্রতা কে দেখে তার সব রাগ পড়ে যায়। আস্তে করে তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। একটা মানুষ কতটা নিখুঁত হতে পারে সেটা শুভ্রতা না দেখলে হয়তো সে জানতে পারত না। অন্ধকারের মাঝেও তার মুখ থেকে জ্যোতি বের হচ্ছে। অনেক ইচ্ছা ছিল লোকটার শুভ্রতা কে জ্বালানোর কিন্তু কেনো জানি তাকে আর জাগানো হলো না। শুভ্রতা রূপের প্রশংসা করতে করতেই ফজরের আজান দিয়ে দিলো। এবার তাকে উঠতে হবে নাহয় ধরা পড়ে যেতে পারে সে।
কিন্তু যাওয়ার পূর্বে আলতো করে শুভ্রতার কপালে চুমু খেয়ে নেয় লোকটা। তারপর পকেট থেকে একটা মার্কার বের করে শুভ্রতার হাতের ওপর কিছু লিখে যায়।
চলবে………………..
#Standing_next_to_you
#অনামিকা_আহমেদ
পর্ব:০৬
রাত সাড়ে এগারোটার দিকে বাসস্ট্যান্ডে বসে আছে রাহাত। রাতে জার্নি করার মজাই আলাদা বিশেষ করে পথটা যদি দীর্ঘ হয়। শীত যে ঘনিয়ে এসে গেছে সেটা রাতে কাঁপুনি দেওয়া ঠান্ডায় জমে রাহাত ভালই বুঝতে পারছে, সেই সাথে মশার কামড় ভালই কম্বিনেশন। চোখে তার রাজ্যের ঘুম তবুও কেনো জানি ঘুমে ঢলে পড়ছে না সে। বাস আসবে কম করে হলেও এক ঘণ্টা পর, গন্তব্য সিলেট।
চায়ের স্টলে কাঠের পুরোনো চেয়ারে বসে গরম তরলে ঠোঁট ডুবিয়ে দিয়ে উদাস মনে আকাশের দিকে চেয়ে আছে রাহাত। মনটা তার ভালো নেই একদমই, শুভ্রতা কে ছেড়ে এতদূরে থাকবে কি করে সে। ইচ্ছে করছে চাকরিটা ছেড়ে দিতে। না খেয়ে থাকলেও তো শুভ্রতা কে দেখতে পাবে সে রোজ। কিন্তু নিজে না খেয়ে থাকার চেয়েও বড় যন্ত্র*ণা হলো পরিবারের না খেয়ে থাকা। তার এই রোজগারের ওপর নির্ভর করে যে আরো তিনটা পেটের যোগান চলে। ছোট ভাইয়ের পড়াশোনা সেই সাথে মা বাবার ওষুধের খরচ তো আছেই। ঢাকা থেকে সিলেটে বদলি হওয়ায় বেতনের টাকার পরিমাণ বাড়ছে তাতে তার আর্থিক কষ্ট কিছুটা কমলেও মানসিক কষ্ট ও যে অনেক বেড়ে যাচ্ছে। বন্ধুত্ব থেকে কখন যে শুভ্রতা কে সে ভালবেসে ফেলল রাহাত নিজেও জানে না। সেসব ভাবার সময় হয়নি তার, শুভ্রতার সামনে সারাক্ষণ ভালো বন্ধুর অভিনয় করতে করতে তার প্রেমিক হৃদয়ের প্রকাশ ঘটেনি।
রাহাত পকেট থেকে ফোন বের করে। লক স্ক্রিনে শুভ্রতা আর নিজের ছবি। সম্ভবত ছবিটা তোলা হয়েছে কক্সবাজারে। মেডিকেলের প্রথম বছরে তাদের সেখানে ঘুরতে নেওয়া হয়েছিল। শুভ্রতার হাসিমুখ চোখে পড়তেই রাহাত নিজের অজান্তেই হেসে দেয়। মনের অপ্রকাশ্য অগোছালো কথাগুলোকে এক লাইনে সাজাতে সে ব্যর্থ তাই হাজার প্রেমিক পুরুষের মতো ভালোবাসার নারীর জন্য কবিতা লিখতে পারেনি চেষ্টা করেও।
পর পর তিনবার শুভ্রতা কে কল দিলেও কল রিসিভ করেনি কেও। রাহাত একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে শেষে একটা ভয়েজ মেসেজই পাঠায় শুভ্রতা কে।
– শুভ্রতা চলে যাচ্ছি রে। আজ রাতের বাসেই সিলেট রওয়ানা দিবো। হয়তো কাল পৌঁছেও যাবো। কাল থেকে আর তোকে জ্বালানো হবে না আমার। তোর হয়তো ভালো লাগবে, কিন্তু আমার তো তোকে জ্বালানোর জন্য মন টা আনচান করবে।
( একটু থেমে )
শুভ্রতা একটা কথা রাখবি। কালকে রাতে পারলে আমাকে একটা কল দিস। কিছু কথা আছে তোর সাথে।
এই বলে রাহাত ভয়েস মেসেজ টা পাঠায়। তারপর ফোনটা আবারো পকেটে রেখে চা টা শেষ করে। চায়ের বিল মিটিয়ে কালো রংয়ের ব্যাগ টা কাঁধে নিয়ে বাসস্ট্যান্ডের সামনে খালি জায়গায় একটু পায়চারি করছিল রাহাত। এমন সময় সেখানে এক অল্পবয়সী মেয়ে উপস্থিত হয়। পরনে লাল রঙের কামিজ, মুখটা ওড়না দিয়ে ঢাকা। মেয়েটা হাঁপাচ্ছে, যেনো একটু আগেই অনেক খানি দৌড়ে এখানে এসেছে সে। রাহাত এতটাও গুরুত্ব দেয়না তাকে। মেয়েটা এদিক ওদিক তাকায়। রাহাতের দিকে তার দৃষ্টি আটকে যায়। অপরিচিত এক মেয়ে কে নিজের দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে রাহাত ও কিছুটা অস্বস্তির মধ্যে পড়ে। একে তো রাত, তার ওপর মেয়ে মানুষ, কেমন মেয়ে আল্লাহ জানে। বে*শ্যা, পতি*তা হলে তো কথাই নেই। এরা টাকার জন্য সব কায়দায় করতে পারে।
– ভাইয়া আপনি কি একা নাকি আপনার সাথে কেও আছে?
হঠাৎ কানের গোড়ায় এক মেয়েলি কন্ঠ শুনে রাহাত বেশ অবাক হয়, হকচকিয়ে ও যায় একটু।
– জি আমি একলা, কেনো?
– ভাইয়া অনেক বিপদে পড়ে আপনার কাছে এসেছে। প্লীজ আমাকে সাহায্য করুন।
রাহাত রীতিমত ঘামছে। মেয়েটা কি সত্যিই বিপদে পড়েছে নাকি তাকে বিপদে ফেলতে এসেছে সে কিছুই বুঝতে পারছে না। তাও পুরুষত্ব বজায় রাখতে সে নিজের মনে কিছুটা সাহস জমিয়ে বলে,
– কি রকম সাহায্য করতে পারি আমি?
– আমার নাম চৈতি। বাবা মা টাকার জন্য আমায় এক বুড়ো চেয়ারম্যানের সাথে বিয়ে দিচ্ছিল। আমি সেখান থেকেই পালিয়ে এসেছি। এখন ওই চেয়ারম্যানের লোকজন আমাকে খুঁজছে। প্লীজ আমাকে সাহায্য করুন। কেও আমার পরিচয় জানতে চাইলে বলবেন আমি আপনার স্ত্রী। আর আমরা একসাথে সিলেট যাচ্ছি।
__________________________________________
সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই মেয়ের রুম থেকে একদফা চিৎকারের আওয়াজ কানে আসলেই রুমা দৌড়ে যায় সেখানে। দরজায় একের পর এক করাঘাত পড়ছে কিন্তু শুভ্রতা হতভম্বের মত নিজের হাতের দিকে চেয়ে আছে। ফর্সা চামড়ার ওপর কালো কালি দিয়ে লেখা ” তুমি শুধুই আমার ” বড়ই নজর কাড়ছে তার। রাতে কেও এসে তার হাতে এটা লিখে দিয়ে গেছে শুনতে যেমন অদ্ভুত তেমনি অবিশ্বাসকর। শুভ্রতা দৌড়ে বারান্দার দরজার দিকে যায়। নাহ, ভিতর থেকে লোক করা তাহলে কি তার রুমে ঢুকলো?
হঠাৎ ই শুভ্রতার মনে পরে যায় গতকালকের কথা। অচেনা মানুষটা বলেছিল যে সে রাতে আসবে, তারজন্য যেনো বারান্দার দরজা খুলে রাখা হয়। কিন্তু সেটা তো সে করেনি তাহলে কিভাবে লোকটা ভিতরে ঢুকলো?
দরজায় নক করার শব্দ আরো জোরালো হলে শুভ্রতার ভাবনায় ছেদ পড়ে। কোনরকমে আরেক হাত দিয়ে লেখাটা ঢেকে সে মায়ের সামনে যায়।
– কি রে ঠিক আছিস? এত জোড়ে কেও চিৎকার দেয়? কি দেখে এত ভয় পেলি?
– কিছু না মা, তেলাপোকা।
– তেলাপোকা? ঢেঙ্গি মেয়ের কথা শোনো , এখনও তেলাপোকা দেখে ভয় পায়।
– হে আমি পাই, এখন তুমি যাও তো আমাকে হাসপাতালে যেতে হবে।
রুমা আর কিছু না বলে চলে যান সকালের নাস্তা তৈরি করতে। এদিকে শুভ্রতা একটা টিস্যু ভিজিয়ে লেখাটা উঠানোর চেষ্টা করছে। বেশি ঘষাঘষির কারণে জায়গাটা লাল হয়ে গেছে তবুও লেখা উঠছে না।
ঠিক সে সময় শুভ্রতার ফোনে একটা নোটিফিকেশন আসে। শুভ্রতা ফোন গায়ে নিয়ে দেখে এক অপরিচিত নম্বর থেকে তাকে মেসেজ করা হয়েছে।
– এই লেখা মুছে ফেলার চেষ্টা করবে না বসন্ত। আর যদি অবাধ্য হও তবে কাল এসে ছুরি দিয়ে তোমার হাতে লিখে দিয়ে যাব।
চলবে………………
