#Standing_next_to_you
#অনামিকা_আহমেদ
পর্ব:০৩
ছুটির দিন গুলোতে রুমা আর ইফতীয়ার এর ঘুম সময়মতো ভাঙলেও শীতলের নিদ্রার ঘর কাটতে কাটতে প্রায় দুপুর গড়িয়ে যায়। তারপর শুরু হয় খাওয়া নিয়ে তাল বাহানা। রুমা জোর করে এক দলা ভাত মুখে গুঁজে না দিলে শুভ্রতার আধখোলা চোখে ঘুমের রেশ যেনো কাটতেই চায় না। পঁচিশ বছরের মেয়ের মাঝে বড়দের পরিপক্কতার কোনো লক্ষণ নেই বরং বাচ্চাদের মত ছেলেমানুষী সরে নি দেখে প্রায়ই রুমা রাগ দেখিয়ে থাকে শীতল কে। তাতে কি? ইফতীয়ার তার মেয়ে ঠিকই প্রশ্রয় দেয়। এতে মাঝে মাঝে রুমা মুখ বাঁকিয়ে বলেন,
– দিনে দিনে বাচ্চামো যেনো তোর মাথায় জেঁকে বসছে। বলি, বয়সটা বাড়ছে না কমছে। পরের বাড়ীতে যেতে হবে নাকি? সব হয়েছে তোমার আস্কারায়। আর মাথায় তোলো মেয়েকে। আমি একটু শাসন ও করতে পরি না নিজের মেয়েকে। পরের বাড়ি থেকে যখন নালিশ আসবে তখন বুঝবে কত ধানে কত চাল।
রুমার এমন কঠোর কথায় শুভ্রতা কিছু মনে করে না। রুমা কে দেখিয়ে হাসলেও তার মনে একটু খারাপ লাগা কাজ করে। একদিন কি সত্যি তাকেও বাবা মা কে ছেড়ে চলে যেতে হবে? কি করে থাকবে সে সেখানে?
তবে আজ বেতিক্রম ঘটনা ঘটেছে। আজ রুমা কে বার বার তাগাদা দিতে হয়নি শুভ্রতা কে জাগানোর জন্য।ঘণ্টার কাটা আট কে ছুঁতেই নিজে থেকে উঠে বসে শুভ্রতা। মেয়ের এমন কাণ্ড দেখে রুমা অবাক হয় ।
– যাই হোক, মেয়ের সুমতি হয়েছে।
বিকেলে তখন রুমা নাস্তার আয়োজন করতে ব্যস্ত। শুভ্রতা পা টিপে টিপে রান্নাঘরে গিয়ে রুমা কে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে।
– আজ এত আহ্লাদ? ব্যাপার কি ডাক্তার মেম এর?
– অফ মা, এমনভাবে বলছ যেনো আমি তোমায় ভালবাসি না?
– হুম বাসিস যখন দরকার লাগে। এখন কি লাগবে?
– পথের পাঁচালী বইটা। দাওনা মা প্লীজ।
– ডাক্তার না তুই? সাহিত্য পড়ে কি করবি?
– তুমিও তো ডাক্তার, তাহলে তুমি পড় কেনো?
– আমার আর তোর ব্যাপার আলাদা, শুভ্রতা ।
– দাও না মা প্লীজ প্লীজ।
– আচ্ছা আচ্ছা হয়েছে। তোর জেদের সাথে আমি পারি না। আমার বুকশেলফ এ রাখা আছে নিয়ে নে।
– থ্যাংকস মা।
এই বলে শুভ্রতা রুমার গালে একটা চুমু খেয়ে মায়ের রুমের দিকে হাঁটা দেয়।
রুমা শৌখিন মানুষ। বাংলা ইংরেজি বিভিন্ন ভাষার বই সংরক্ষণ করা তার নেশা। সেই সূত্রেই তাদের বাসায় বইয়ের অভাব নেই। শুভ্রতা অনেক খুঁজে অবশেষে কাঙ্ক্ষিত বইয়ের খোঁজে পায়। কিন্তু বই টা হাতে নিতেই বইয়ের পাতার ভিতর থেকে একটা ছবি পড়ে মেঝেতে।
শুভতা সেই ছবিতে হাতে নিতেই এক এক দেড় বছরের বাচ্চা ছেলেকে দেখতে পায়। লাল গেঞ্জি আর লাল টুপি পড়ে খেলনা গাড়ির ওপর বসে আছে। বেশি হাসিখুশি মায়াবী চেহারা, যে কেও দেখলেই মায়ায় পড়ে যাবে ছেলেটার।
– এই ছেলেটা কে? আর এই বাচ্চাটার ছবিই বা মায়ের বইয়ের ভিতর কি করছে? আচ্ছা পরে না হয় মায়ের কাছ থেকে জেনে নেব।
_________________________________________
আজকাল হাসপাতালের সকল স্টাফ , ডাক্তার সময় মতো আসা শুরু করেছে, হয়তো নতুন বসের রগ*চটা স্বভাবের কারণে। সকলে মনে মনে বসকে গা*লি দিলেও নিজেদের মধ্যে পানচূয়ালিটি ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য নিজেদের অজান্তেই সাজ্জাদের প্রতি সকলে কৃতজ্ঞ।
ঘুম ঘুম চোখে শুভ্রতা নিজের কেবিনের দরজা খুলতেই অবাক চোখে তাকায় চারদিকে। পুরো রুমের প্রতিটা কোনায় বিশেষত তার টেবিলের ওপর লাল রঙের গল্পের সমাহার। লাল গোলাপ শুভ্রতার ভীষণ পছন্দের। তাই হয়তো কেও তার প্রতি নিজের তীব্র ভালবাসা প্রকাশ করতে এই গোলাপ কেই প্রতীকী হিসেবে ব্যবহার করেছে।
শুভ্রতা একটু কাছে যেতেই গোলাপের সুবাসে তার প্রাণ ছুঁয়ে যায়। এত গোলাপ!! অবাক হলেও বেশ ভালো লাগছে তার।
ঠিক সেই সময় রিফাত শুভ্রতার রুমে প্রবেশ করে। শুভ্রতা পেছন ফিরে চায়। রিফাতের মুখে নেই আগের প্রাণোচ্ছলতা, কেমন গোমরা হয়ে আছে মুখখানা।
– কি হয়েছে? মুখে বা*জ পড়েছে নাকি?
– স্যার আমাকে ট্রান্সফার করিয়ে দিয়েছে।
– এমা কেনো?
– জানি না। তোকেও দেখেছেন ওনার কেবিনে।
এ কথা শুনে শুভ্রতার গোলা শুকিয়ে যায়। তোতলাতে তোতলাতে বলে সে,
– কি আমাকে? এক্ষনি যেতে হবে?
– হে এক্ষুনি যেতে হবে।
শুভ্রতা আর কথা বাড়ায় না। তবে রিফাত কে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় রিফাত গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
– আমি চলে গেলে আমায় মিস করবি শুভ্রতা? আমি না থাকলে তোকে কে জ্বালা*বে?
শুভ্রতা উত্তর দেয় না। তারও মনটা খারা*প হয়ে আছে। এত পুরাতন বন্ধুর সাথে দেখা হবে না ভেবেই হুহু করে উঠছে তার মন। তাই শুভ্রতা পা চালিয়ে বের হয়ে যায় রুম থেকে।
চলবে……………….
#Standing_next_to_you
#অনামিকা_আহমেদ
পর্ব:০৪
– স্যার, may I come in?
দরজার ওপাশ থেকে কোনো শব্দ না আসায় শুভ্রতা দ্বিতীয় বারের মতো দরজায় নক করে। কিন্তু এবারেও পারমিশন পাওয়া তো দূরের কথা রুমের ভিতরে কোনো মানুষের সাড়া শব্দ ও আসছে না। মনের কৌতূহল দমাতে শুভ্রতা দরজাটা একটু ফাঁক করে ভিতরে উঁকি মারে। না, স্যার ভেতরে নেই। শুভ্রতা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ।
– যাক বাবা, এবারের মতো বেঁচে গেলাম।
তার বলা কথাটা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই পেছন থেকে কেও একজন শুভ্রতার মুখ চেপে তাকে রুমের ভিতরে চলে যায়। হঠাৎ আক্র*মণের কারণে শুভ্রতা মানুষটার মুখ দেখার সময় পায় না। লোকটা শুভ্রতাকে দেওয়ালের সাথে চেপে ধরে, আর ঠিক সেই মুহূর্তেই রুমের লাইট অফ হয়ে যায় যার দরুন এবারেও শুভ্রতার সেই মানুষটার মুখ দেখা হয় না।
অন্ধকারে আচ্ছন্ন রুমে তরতর করে ঘমছে শুভ্রতা। জানা নেই, শোনা নেই, একজন অপরিচিত মানুষ তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছে। তাকে নড়াচড়া করার বিন্দুমাত্র সুযোগ না দিয়ে মানুষটা তার চোখে মুখে সমানে চুমু খেয়ে যাচ্ছে। এক হাত দিয়ে শুভ্রতার মুখ চেপে ধরায় তার মুখ দিয়ে কেবল ” উম উম” শব্দ ই নের হচ্ছে।
– কিছুই করলাম না তাতেই এমন উম উম করছ কেনো, বসন্ত? জাস্ট কয়েকটা চুমু খেয়েই এই অবস্থা, তাহলে আরো কিছু করলে যে তোমাকে হসপিটালাইজড করতে হবে।
শুভ্রতার শ্বাস আটকে আসছে। লোকটার কন্ঠ সাংঘাতিক রকমের গভীর, তারওপর কানের কাছে আস্তে আস্তে বলায় অদ্ভুত নে*শা লাগছে শুভ্রতার। লোকটা শুভ্রতার গাল ছেড়ে এবার কানে চুমু বসায়। শেষে আস্তে করে কানের লতিতে কা*মড় ও দেয়।
– লাভ বাইট দিলাম বসন্ত, আশা করি এমন চিহ্ন তোমার সারা শরীরে আরও থাকবে। আমার কথা মতো চললে আমার ভালবাসা বড়ই সুন্দর। আর যদি আমার অবাধ্য হও তবে ভি*লেন হতে আমি বেশি সময় নিবো না। আমি যেমন তোমার জন্য মরতে পারি তেমনি তোমাকে পাওয়ার জন্য মারতেও পারি।
লোকটা আবারো শুভ্রতার কপালে চুমু খায়।
– আসছি বসন্ত , রাতে দেখা হবে। আর হ্যাঁ, বারান্দার দরজাটা যেনো খোলা থাকে।
লোকটা সাথে সাথেই শুভ্রতা কে ছেড়ে দিয়ে অন্ধকারে কোথাও হারিয়ে যায়। শুভ্রতা ছাড়া পেয়ে বড় বড় শ্বাস নিতে থাকে। এই কয়টা মুহূর্ত কি স্বপ্ন ছিল নাকি বাস্তবেই এমন ঘটেছে কিছুই বুঝতে পারছে না সে। হঠাৎ করেই লাইট জ্বলে ওঠে রুমের আর সেই সাথে রুমে বসের প্রবেশ।
শুভ্রতা কে হতভম্বের মত দেওয়ালে ঠেক দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সাজ্জাদ দুই হাত ভাজ করে দাঁড়ায়।
– মিস শুভ্রতা, আপনি এখানে? ওহ হ্যাঁ আমিই তো আপনাকে ডেকেছিলাম। আসলে ফিফথ ফ্লোরের ইলেক্ট্রিসিটি তে একটু প্রবলেম হয়েছিল তাই একটু – আপনি ঠিক আছেন? এভাবে ঘামছেন কেনো?
শুভ্রতার হুশ ফিরে আসে। গোলগোল চোখে তাকায় সে সাজ্জাদের দিকে।
– না স্যার আমি ঠিক আছি। আসলে হঠাৎ করে কারেন্ট চলে গেছিল তাই একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম।
সাজ্জাদ তাচ্ছি*ল্যের হাসি হেসে নিজের চেয়ারে বসে পড়ে।
– so funny, এই বয়সেও ভু*তে ভয় পান দেখছি। টা এই হার্ট নিয়ে কিভাবে চিকিৎসা করবেন ? রুগীর অবস্থা দেখে তো মনে হয় আপনিই হার্ট ফেইল করবেন। তখন আবার আপনার জন্য আরেকটা ডাক্তার আনতে হবে।
সাজ্জাদের কথা শুনে শুভ্রতার মুখ শুকিয়ে যায়। তাকে কি এখানে অপমান করার জন্য লোকটা ডেকে এনেছে।
– আচ্ছা এখন আসল কথায় আসি। যেহেতু ডাক্তার রিফাতের বদলি হয়ে যাচ্ছে তাই আজকে থেকে আপনি আমার এসিস্ট্যান্ট।
– কি? না এটা কি করে সম্ভব?
– কেনো সম্ভব না?
– মানে স্যার আমি তো এখনো তেমন কিছুই শিখি নি, তাহলে আপনার এসিস্ট্যান্ট কিভাবে হবো?
– my order is order Dr Shuvrota. আমি আপনার কোনো এক্সকিউজ শুনতে চাই না। আর আপনি কিছু পারেন না তাই আপনাকে নিজের সাথে রাখছি যেনো আপনি কোনো আকাম করতে না পারেন। এখন যান, আমার অনেক কাজ আছে। আর হ্যাঁ, নিজের কেবিন থেকে জিনিস গুছিয়ে আমার এখানে শিফট করবেন, কালকে থেকে আপনার ডিউটি শুরু।
____________________________________________
সন্ধ্যায় সোফার ওপর শুভ্রতাকে মুখ ভার করে বসে থাকতে দেখে ইফতিয়ার অবাক হয়। তার মেয়ে তো মুখ গোমড়া করে রাখার মেয়ে নয়, তাহলে আজ এমন কি হলো যে এভাবে বসে আছে? ইফতীয়ার জিজ্ঞাসু চোখে রুমার দিকে তাকায়। রুমা তাকে ইশারায় বোঝায় যে সে কিছুই জানে না।
– আমার মামুনিটার কি হয়েছে? এমন চুপচাপ থাকলে তো আমার মামুনি কে ভালো লাগে না।
শুভ্রতা বাবা কে দেখেই নাকি কান্না শুরু করে দেয়।
– বাবা, ওই লোকটা অনেক পঁচা, রিফাত হাসপাতাল থেকে ট্রান্সফার করেছে , এখন আমাকেও তাড়িয়ে ছাড়বে।
– কোন লোকটা?
– ঐযে নতুন বস, সাজ্জাদ শিকদার।
চলবে……………
