#Standing_next_to_you
#অনামিকা_আহমেদ
পর্ব:০১
প্রস*ব ব্য*থায় কা*তরাতে কা*তরাতে মরা*র আগে সদ্য জন্ম নেওয়া ফুটফুটে মেয়েটাকে নিজের বোনের কোলে তুলে দেয় উমানা। শ্বাস আটকে আসছে তার, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেছে অনেক আগেই। যার বুঝতে বাকি নেই যে মৃ*ত্যুর সময় ঘনিয়ে এসেছে তার।
– আমার মেয়েটাকে দেখিস বোন।
তারপর চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায় তার কন্ঠস্বর। মৃতদে*হের চোখ তখন ও খোলা। রুমা বাচ্চাটাকে তোয়েলেতে জড়িয়ে মৃ*ত মায়ের পাশে রেখে দেয়। বোনের হাতটা শক্ত করে ধরে মেঝেতে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ে রুমা।
– তুই এত স্বার্থ*পর আপু, আমি এখন দুলাভাই কে কি জবাব দিব বল? আর এই বাচ্চা মেয়েটার ই বা কি হবে? জন্মের পর মুহূর্তেই ওকে এতিম করে চলে গেলি তুই।
রুমা বাচ্চাটাকে কোলে করে ওটি থেকে বাইরে বের হয়ে আসে। বর্ষা বাদলের রাত, হাসপাতালে কয়েকটা নার্স আর ওয়ার্ডবয় ছাড়া কেও নেই তেমন। ওটির সামনে দাড়িয়ে আছে ইফতিয়ার মাহতাব। সে নিজের স্ত্রী আর ভূমিষ্ঠ সন্তানের মুখ দেখবার জন্য করিডোরে দাঁড়িয়ে আছে বহুক্ষণ। ভেতর থেকে বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শুনতেই সে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে। নিজের সৃষ্টিকর্তা কে ধন্যবাদ জানিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে শেলিকার মুখ থেকে স্ত্রী সন্তানের খবর শোনার জন্য।
রুমা কে কা*ন্নারত এক বাচ্চা নিয়ে বের হতে দেখে ইফতীয়ার হাসি মুখে তার কাছে যায়। মেয়ের ফুটফুটে মুখের দিকে চাইতেই মনটা যেনো গোলে যায় তার, চোখ বেয়ে পড়ে আনন্দের অশ্রু।
– একেবারে মায়ের মুখটা পেয়েছে আমার মেয়ে।
কথা গুলো আপনাআপনি মুখ থেকে বের হয়ে যায় তার। নিজ সন্তান কে কোলে তোলে কপালে একখানা চুমু খেয়ে ইফতীয়ার রুমার দিকে তাকায়।
– উমানাকে কি এখন বেড়ে দিবে? এখন কি দেখা করা যাবে ওর সাথে? শরীর কেমন ওর?
রুমা নিঃস্তব্ধ। ইফতীয়ার এর মুখের দিকে চাওয়ার শক্তি নেই তার। তার মেকজের দিকে তাকিয়ে সে বলে,
– আপু আর নেই। সন্তান কে জন্ম দিতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে সে। বাচ্চারা জন্মের পরমুহুর্তেই মা কে হারিয়েছে।
– তুমি মজা করছ তাই না? উমানা শিখিয়ে দিয়েছে তোমায়, তাই না? আচ্ছা আমিই ভেতরে যাচ্ছি।
রুমা ইফতিয়ার কে থামানোর চেষ্টা করলেও সে ওটির ভেতর ঢুকে পড়ে। সাদা কাপড়ে ঢাকা নিজের স্ত্রী কে দেখে সে যেনো পাথরের মতো থেমে যায়। রুমের চারটা দেওয়ালে শুধুমাত্র বাচ্চার কান্না প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। ইফতিয়ারের সাহস হয় না কাপড় তুলে নিজের স্ত্রীর মুখটা শেষ বারের জন্য দেখতে। একবার নিচু কন্ঠে ইফতিয়ার বলে,
– তোমায় আমি কখনও ক্ষ*মা করবো না উমানা। মৃত্যু*র পর যখন আমাদের আবার দেখা হবে তখন এই বিচ্ছে*দের দশগুণ ক*ষ্ট আমি তোমায় দিবো।
______________________________________________
পঁচিশটা বসন্ত কেটে গেছে। ইফতীয়ার নিজের মেয়ের নাম রেখেছে শুভ্রতা। নামের সাথে মানুষটার মিল আছে আছে অনেক। ফর্সা গায়ের রং, লাল টসটসে দুখানা অধর, কাজল কালো চোখ, সবমিলিয়ে অপূর্ব মুখশ্রী তার।
রুমের বাবা সাজেদ আলী বলতে গেলে জোর করেই রুমা আর ইফতিয়ারের বিয়ে টা দেয়। নাতনির ভবিষ্যৎ চিন্তায় যে সে এমন এক সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা নিয়ে কারো সন্দেহ নেই। ইফতিয়ার প্রথমে এই সম্পর্ক মানতে না চাইলেও মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রুমা কে স্ত্রী হিসেবে মেনে নেয়। এখন তাদের দেখলে বোঝা যায় না যে একসময় তারা সম্পর্কে শ্যালিকা দুলাভাই ছিল।
রুমারও এর আগে বিয়ে হয়েছিল। সে পক্ষে একটা ছেলেও আছে নাকি শোনা যায়। কিন্তু বনিবনা না হওয়ার তা*লাক দিয়ে দম্পতি আলাদা হয়। তারপর থেকে রুমার সাথে তার প্রাক্ত*ন স্বামী এমনকি ছেলের কখনও দেখা হয়নি। সে নিজেকে তার বর্তমানের সাথে মানিয়ে নিয়েছে খুব। শুভ্রতা ও জানে না যে রুমা আসলে তার নিজের মা নয়।
– শুভ্রতা না খেয়ে বাইরে যেতে নেই মা। কিছু মুখে দিয়ে যা।
বাঙালি মেয়ের সাবলীল কন্ঠে চিরচেনা কথাগুলো কানে এলে ও শুভ্রতা দাঁড়ায় না। তাড়াহুড়ো করে জুতোজোড়া পায়ে দিয়ে গিয়ে কয়েকবার হোঁ*চট খায় সে। তবুও দাঁড়াবার উপায় নেই। এমিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। আবার আজকে নতুন এক প্রফেসর আসবেন তার হাসপাতালে। এমবিবিএস পাস করে শুভ্রতা সদ্য ওই হাসপাতালে যোগ দিয়েছে, এরই মধ্যে কয়েকদিন দেরি করে যাওয়ার কর্তৃপক্ষের রোষা*নলে পড়েছে সে। সবই হয়েছে শুভ্রতার নিদারুণ ঘুমের জন্য। ঘুমালে মেয়েটার দিন দুনিয়ার কোনো খবর ই থাকে না।
– আসতে জুতা পর, পড়ে যাবি তো। মায়ের তো একটা কথাও কানে নিস না। একটু আগে ঘুম থেকে উঠলে তো নাস্তা করে যেতে পারতি।
বাবার আরেকদফা উপদেশ শোনার আগেই শুভ্রতা তার হাত চেপে ধরে বলে,
– মা কে প্লীজ কিছু বলো না। আমি আসি, কেন্টিন থেকে কিছু খেয়ে নিব।
এই বলেই শুভ্রতা বাসা থেকে বের হয়ে যায়। ইফতিয়ার মেয়ের এমন চঞ্চলতা দেখে নিজ মনে হেসে বলে,
– ঠিক মায়ের মত হয়েছে।
________________________________________
হাসপাতালে পৌঁছে শুভ্রতা হাতঘড়ির দিকে চায়। না বেশি দেরি হয়নি, নয়টা বেজে পাঁচ মিনিট। এই পাঁচ দশ মিনিট তো দেরি হতেই পারে, এর জন্য আর যাই হোক, হাসপাতাল থেকে কমপ্লেন আসবে না।
শুভ্রতা খুশি মনে হাটতে হাঁটতে নিজ কেবিনে যাওয়ার আগে তার চোখে পড়ে তার কলিগরা কাউকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে।
– বস কি তাহলে এসে গেলেন? কিন্তু বসের তো দশটায় আসার কথা।
কৌতূহল নিয়েই শুভ্রতা ভিড় থেকে সামনে যায়। সকলের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু তখন তার এক কলিগকে উচ্চস্বরে ধমকে যাচ্ছে। শুভ্রতা লোকটার পিঠ দেখতে পায়, মুখ দেখার ইচ্ছেও নেই। প্রথম দিন এসেই যে ধ*মকে সকলের বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে সে যে কতটা রা*গী প্রকৃতির হবে শুভ্রতা সেটা ভালই আন্দাজ করতে পারছে।
শুভ্রতা পেছন ফিরে চলে যেতে নিলে এক রাশ*ভারী কন্ঠ তাকে স্থবির করে দেয়।
– Shuvrota Mahtab, you are ten minutes late. Come to my cabin right now.
চলবে……………..
#Standing_next_to_you
#অনামিকা_আহমেদ
পর্ব:০২
– একজন ডাক্তারের সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটা থাকতে হয় সেটা হলো সময়জ্ঞান। কিন্তু আপনার দেখছি সময়জ্ঞান বলতে কিছুই নেই। কতদিন ধরে এই হাসপাতালে কাজ করছেন আপনি?
– স- স্যার এক- একমাস।
– একমাস এই হাসপাতালে এমন একজন irresponsible ডাক্তার কাজ করছে!! তাও আবার একজন না বেশ কয়েকজনই। তারজন্যই বোধয় হাসপাতালটার নামে দুর্না*ম রট*ছে চারদিকে। আপনারা যদি দেরি করে আসেন তাহলে রোগীকে চিকিৎসা কে করবে? নার্স আর ওয়ার্ডবয়? কি হলো ডাক্তার শুভ্রতা, speak up.
বসের একেকটা ঝা*ড়ি কানে আসতেই শুভ্রতার পুরো শরীর কেঁপে উঠে। সারা জীবনেও মনে হয় মা বাবার কাছ থেকে এতটা বকা শুনতে হয়নি যতটা না তাকে এই দশমিনিট এ শুনতে হচ্ছে। দুই হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরে শুভ্রতা মাথা নিচু করে ক্ষীণ কন্ঠে বলে,
– স্যার মাত্র পাঁচ দশ মিনিট ই তো দেরি হয়েছে। এটা তো হতেই পারে। রাস্তায় যে জ্যাম –
শুভ্রতা আর কথা বলতে পারে না। কারণ তার কথা শেষ হবার আগেই তার বস টেবিলের ডেস্কের ওপর সজোরে এক ঘু*ষি মারে। বিকট শব্দ, তার ওপর বদ্ধ রুমের প্রতিটা দেওয়ালে সেটা প্রতিধ্বনিত হয়ে শুভ্রতার কানে পৌঁছায়। শক্তপোক্ত মনের মেয়েও এবার কেঁ*দে ফেলে শব্দ করে। নিজের সামনে একটা মেয়েকে এভাবে কাদতে দেখেও মনে গলেনি তার। বরঞ্চ ভীষণ রা*গ হতে তার এসবে, ন্যাকা*মি বলে সম্বোধন করে সে শুভ্রতার মুখোমুখি দাঁড়ায়।
– What rubb*ish? পাঁচ দশ মিনিট দেরি হতেই পারে? এই পাঁচ দশ মিনিটে একটা রোগীর জীবন বি*পন্ন হতে পারে, সে মৃত্যু*র মুখে চলে যেতে পারে এগুলো বুঝেন আপনি? মাথায় ঢোকে সেগুলো? আপনাদের দায়িত্বহীনতার কারণে একটা রোগীর কিছু হয়ে গেলে সে দায়ভার কে নিবে? আপনি নিবেন? নাকি তখন বলবেন রাস্তায় অনেক জেম ছিল। তখন হাসপাতালের ওপর দায়ভার চাপিয়ে নিজেকে সাধু প্রমাণের জন্য উঠেপড়ে লাগবেন।
শুভ্রতা কেঁদেই চলেছে, নিজের পক্ষে একটা যুক্তি তর্ক করার সা*হস তার নেই। মন চেয়েছিল তার খুব লোকটাকে দুটো ক*ড়া কথা শুনিয়ে দিতে, চাকরি নাহয় সে ছেড়ে দিবে। কিন্তু ভয়ে তার গলা শুকিয়ে কাঠ, কান্নার গোঙ*রানির শব্দই বের হচ্ছে না সেখানে তর্ক করার কোনো প্রশ্নই উঠে না।
লোকটা কপাল কুঁচকে অন্যদিকে চেয়ে বলে,
– গেট লস্ট, আর যেদিন আপনি এরকম দেরি করে আসবেন সেদিনটা আপনার জন্য বিভীষি*কাময় হবে। That’s my promise Doctor Shuvrota. Now leave.
শুভ্রতার সারা শরীর ভ*য়ে কেঁপে উঠে। আর কয়েক মুহূর্ত এখানে থাকলে হয়তো তার প্যানি*ক এ্যাটাক হয়ে পারে। তাই শুভ্রতা আর দেরি করে না। চোখের পানি মুছতে মুছতেই বসের কেবিন থেকে বের হয়ে যায়। তবে যাওয়ার আগে টেবিলের নেমপ্লেটের দিকে চোখ যায় শুভ্রতার। ” সাজ্জাদ শিকদার” সোনালী রঙের অক্ষরে লেখা নামটা বেশ জ্বলজ্বল করছে।
শুভ্রতা করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নিজ মনে বলতে থাকে,
– ওহ তাহলে ঐ ব*জ্জাত লোকটার নাম সাজ্জাদ শিকদার। তোর নাম সাজ্জাদ না, বজ্জা*ত শিকদার রাখা দরকার ছিল। তাহলে নামের সাথে কামের মিল থাকতো।
__________________________________________
শুভ্রতা ওয়াশরুম থেকে চোখ মুখ ভালো করে ধুয়ে কা*ন্না করার আলামত মুখ থেকে সরায়। যেনো কেও বুঝতে না পারে ।
শুভ্রতা সবে মাত্র টিস্যু দিয়ে মুখে লেগে থাকা পানি মুছে চেয়ারের ওপর আরাম করে বসেছে ঠিক সে সময় তার কেবিনে আগমন ঘটে রিফাতের। রিফাত শুভ্রতার ছোটবেলার বন্ধু, একসাথে স্কুল কলেজ এমনি একই মেডিকেল কলেজে পড়েছে তারা। অনেকেই মজা করে তাদের মানিকজোড় বলে। এক মুহুর্ত এক অপরকে ছাড়া থাকতে পারে না তারা, তবুও একজন আরেকজন কে খেপা*তে ভুলে না। রা*গানোর দিক দিয়ে শুভ্রতার চেয়ে রিফাত কয়েক ধাপ এগিয়ে। কেনো জানি রিফাত কে কুপোকাত করতে গিয়ে বারবার বো*কা বনে যায় শুভ্রতা। একারণে রিফাতের কাছ থেকে “বল*দি” উপাধিও পাওয়া হয়ে গেছে তার।
– কিরে, শুনলাম বস নাকি তোকে নিজের কেবিনে ডেকে আপ্যায়ন করেছে। কথাটা কি সত্যি? কেমন বন্ধু রে তুই, আপ্যায়ন খাওয়ার সময় বন্ধুর কথা মনে হলো না। Sha*me, so sha*me.
– শা*লা সরবি তুই আমার সামনে থেকে? একবার বসের ধমকানি শুনলে এক সেকেন্ডের মধ্যে পেন্ট ভিজিয়ে ফেলতি।
– তুই জানলি কি করে? নিশ্চই তুই ও ভিজিয়েছিস তাই না? এক্সট্রা পেন্ট নিয়ে এসেছিলি নাকি ঐ ভেজা পেন্ট ই পড়ে আছিস? অফ কি গন্ধ!!
– রিফাত বাড়াবাড়ি হচ্ছে কিন্তু। সামনে থেকে সর নাহলে একটা মা*ইর মাটিতে পড়বে না।
শুভ্রতার কথা শুভ্রতা বলেছে, রিফাত কে কি সেই কথা শুনতে হবে নাকি। রিফাত নিজের মতো শুভ্রতা কে জ্বালি*য়েই চলেছে। একসময় রিফাতের সামনে টিকতে না পেরে শুভ্রতা কনুই এ এপ্রোন টা ঝুলিয়ে ওয়ার্ডে চলে যায়। সেখানেও তার নিস্তা*র নেই। কারণ রিফাত ও তার পিছু নিয়েছে।
দুই বন্ধুর এই খুনশুটি যে কারো চরম রাগে*র কারণ হচ্ছে সেটা তারা খেয়াল করেনি। সাজ্জাদ দুর থেকে তাদের দিকে চোখ পাকিয়ে তাকায়। হাতে থাকা ফোন টা আছা*ড় মেরে বলে,
– You have to pay for this Shuvrota. আর রিফাতের ব্যাপারটা আমাকেই দেখতে হবে।
চলবে…………….
