#হৃদিতে_রিদি
#নীতি_জাহিদ
#শুভ_বিবাহ
১৫.
রিদনকে বাসায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না সকাল থেকে। আগামীকাল দ্বীপ এবং রিদির বিয়ের দিন ধার্য করা হয়েছে। আজ গায়ে হলুদ, কত কাজ। কমিউনিটি সেন্টার বুক দিয়ে এসেছেন মিজান সাহেব এবং জাবেদ সাহেব। বিয়ে এবং ওয়ালিমা একসাথেই হয়ে যাবে। পরশু ঈদ বলে কথা। দুই পরিবার ই চায় আত্মীয়তার সম্পর্ক ঈদের আগেই হোক।
দ্বীপ বাইরে থেকে এসেছে কেবল। বাসার পরিস্থিতি উত্তাল দেখে মাকে জিজ্ঞেস করল, ‘ আম্মু কি হয়েছে? আপনার হাতে ঝাড়ু কেন?’
রাহেলা রেগে দ্বীপকে বললেন, ‘ ওই হতচ্ছাড়া ছেলেটাকে ধরে আন। এত বেয়াদব হলো কেমন করে জিজ্ঞেস করব। সকাল বেলাই অশান্তি টা লাগিয়ে দিয়েছে বাসায়। ‘
মায়ের হাত থেকে ঝাড়ু নিয়ে সরিয়ে রাখল। বাসায় কান্নার গুন গুন রব পেয়ে সাজিনার দিকে তাকাল দ্বীপ। সাজিনা হাতের ইশারায় দেখালো মায়ের মেজাজ গরম হওয়ার কারণ। আঙুলের ইশারায় বুঝাল কাহিনি ওই রুমে। সাজিনার ইশারা ওয়ালা কামরায় তফুরা ফুফু ঘুমাচ্ছে। দ্বীপ এগিয়ে এসে দেখে তফুরা রেগে ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। দ্বীপকে বলল, ‘ আমার বাপের ভিটা থেকে আমাকে যে তোরা উচ্ছেদ করে দিচ্ছিস, আল্লাহ তোদের বিচার করবে।’
সাজিনা আগুনে ঘি ঢেলে বলল, ‘ এটা আমারই বাপের ভিটা না, তোমার বাপের ভিটা কেমনে হল? এটা ভাইয়ার ছেলে মেয়ের বাপের ভিটা। ‘
দ্বীপ বোনের দিকে তাকাতেই সাজিনা শান্ত হয়ে গেল। অধৈর্য্য হয়ে মিজান সাহেব হুংকার ছাড়লেন, ‘ সমস্যাটা কোথায় খুলে বলবি তো! মরা কান্না কানছিস ক্যান?’
মাহফুজ সাহেবের স্ত্রী রিতা বলে উঠল, ‘ ভাইজান আম্মা ছোট আপার চুল সব কেটে ফেলছে।’
থতমত খেয়ে গেল মিজান সাহেব, মাহফুজ সাহেব এবং দ্বীপ। ততক্ষনে তফুরা বাসা থেকে বের হয়ে গেল। রাহেলা গজগজ করে বলে, ‘ সব তোমার ওই বান্দরের কাজ। নিশ্চয়ই আম্মারে এমন কিছু বলছে যে আম্মা ওর চুল কেটে দিছে।’
সাজিনা মুখে ওড়না গুজে হাসছে। এদিকে রিতাও সরে গিয়েছে হাসির ধকল সামলাতে না পেরে। এখানে হাসলে অন্যায় হবে। দ্বীপ রিদনকে বেশ কয়েকবার ফোন দিয়েও পেল না। শেষমেষ দাদীর কাছে এসে দেখল দাদী সাজিনার ছেলে শান এর সাথে ফোনে ওগি এন্ড ককরোচ কার্টুন দেখছে আর চকলেট খাচ্ছে। সাজিনা এগিয়ে এসে ভাইকে গতকাল রাতের কাহিনি শোনাচ্ছে,
” গতকাল রাতে রিদন ড্রইং রুমে শুয়ে শুয়ে চকলেট খাচ্ছিল। দাদী রাতে পানি খেতে উঠেছেন। আমি পাশে ছিলাম। রিদনকে চকলেট খেতে দেখে ওর কাছে চাইল। রিদন দেয় নি। দাদী অনুরোধ করে বলল, ‘ এক টুকরা দে, তুই যা কইবি তাই হুনমু।’
তখন রিদন আফসোস নিয়ে বলল, ‘ কচু শুনবা। পারলে যে ডাইনীটার পাশে রাতে শুইবা ওইডার চুল কাইটা দিও তো।’
দাদী মন খারাপ করায় চকলেট শেষে দিয়েছিল। এরপর ওর আর দোষ নেই। সকালে সবাই ঘুম থেকে উঠে দেখি ফুফুর চুল সব মেঝেতে। দাদী ফুফুর চুল কেটে রিদনের কাছে এসে চকলেট চাচ্ছে। আম্মু সব শুনে আগুন হয়ে আছে। আর রিদন পরনের কাপড় চোপড় সমেয় বাসা থেকে পলাতক। ”
দ্বীপ ক্রোধ সংযত করে বলল, ‘ আমি আর পারলাম না ওকে নিয়ে। তোদের কেন মাথায় থাকে না যে দাদী শারীরিক এবং মানসিক ভাবে অসুস্থ। আজকে ফুফুর চুল কেটেছে, আগামী কাল যদি কাউকে খুন করতে বলে দাদী তাতেও রাজি হয়ে যাবে। ফাইযলামির লিমিট আছে। আম্মু লাগবে না। আজকে আমিই ওর পা ভেঙে দিব। বেশি লাফাচ্ছে৷ ফাজিল কোথাকার। ‘
সাজিনা বলল, ‘ ভাই ও তো মজা… ‘
সাজিনাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে দ্বীপ আঙুল তুলে বোনকে বলল, ‘ মজা সুস্থ মানুষের সাথে করতে হয় সাজিনা, অসুস্থ মানুষ মজাকে অপরাধে পরিণত করে। ‘
__
শপিং মলের সামনে পুরোনো ট্রাউজার এবং ছেড়া টি শার্ট পরে উসকোখুসকো চুলে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। পায়ের জুতার দিকে তাকালে মনে হচ্ছে খুবই নিম্ন-বংশের ভিক্ষুক।
ভিক্ষুকের আবার কয়েক ধরনের ক্যাটেগরি আছে। এই ধরুন উচ্চ-বংশীয় ভিক্ষুক। এরা একটা কাগজের বাক্স নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে এই রোগ, ওই রোগ অথবা ঠিকানা হারিয়ে ফেলেছে, মানি ব্যাগ চুরি হয়েছে, হাত ভাঙ্গা, পা ভাঙ্গা সাহায্য চাই বলে ভিক্ষা চাইবে। এদের আপনি পঞ্চাশ টাকা দিলে আপনারই লজ্জা লাগবে এই ভেবে যে আহারে আমি এত কৃপন! কিন্তু এরা আদতেও কোনো রোগ বালাই কিংবা দূর্ঘটনার স্বীকার হয়েছে কিনা সন্দেহ আছে। এদের কারণে প্রকৃত বিপদে পড়া মানুষজন সাহায্য পায় না।
এরপর আসুন মধ্যম-বংশীয় ভিক্ষুক। এরা আপনার পেছনে সুপার গ্লু এর মতো লেগে থাকবে। টাকা আদায় না করে এরা শান্তি পায় না। এদের কম হলেও বিশ টাকা দিতে হয়। দেখবেন পথে ঘাটে এমন অনেক বাচ্চাদের, তাদের মায়েরা ভিক্ষা করতে ছেড়ে দেয়।
সর্বশেষ হচ্ছে নিম্ন-বংশীয় ভিক্ষুক। এদের দেখতে অনেক টা চোরের মত। গাঞ্জা খেয়ে বেড়ায়। এদের কাপড় চোপড় দেখলে মনে হয় জীবনেও গোসল করে না। ইচ্ছাকৃত নোংরা থাকে।
আপাতত শপিং মলের সামনে দাঁড়ানো নিম্ন-বংশীয় ভিক্ষুক তার দানকারীর জন্য অপেক্ষায় আছে। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে সিঁড়িতে বসে মাথা নামিয়ে রাখল। ঠিক তখন পাশ থেকে একজন বলল,
‘ মামা আপনার থালা কই। টাকা কোথায় দিব?’
তথা কথিত ভিক্ষুক মাথা তুলতেই মেয়েটি চমকে বলল, ‘ হে আল্লাহ! এই বেশভূষাই দেখার বাকি ছিল। তুমি কি শোধরাবে না রিদন?’
রিদন কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ‘ আমাকে তোমার কোন এঙ্গেল থেকে ভিক্ষুক মনে হয়েছে? ‘
‘ এসব কি পরে আছ? ভিক্ষুক মনে হয়েছে এই অনেক। চোর মনে হলে তো কাছেই আসতাম না।’
‘ এখন যে গরম কাল মাথায় নেই? গরম কালে মানুষ কি রাতে ঘুমানোর সময় লাক্সারি স্যুট প্যান্ট আর টাই পরে ঘুমায়? ছেঁড়া ত্যানা পরে ঘুমায়। আর এই যে আমার গায়ের জামা পায়জামার গুলোর বয়স দুই বছর। আম্মু কালকে ঘর মুছতে দিতে চেয়েছিল। আমি দি নাই। এটা পরতে আরাম বেশি। আর ছেঁড়া কাপড় এখন স্টাইল। ব্যাগে সান গ্লাস থাকলে দাও। পরি। এতে লোকে ভাববে বলিউড বাদশাহ এসেছে।’
প্রমি কপাল চাপড়ে বলে, ‘ আয়নায় একবার নিজের চেহারা দেখেছ? ‘
‘ হ্যাঁ দেখেছি এবং জানি আমি দেখতে মাশা আল্লাহ টম ক্রুজের মত।’
‘ ইছ! জেনে শুনে টম ক্রুজকে অপমান করবে না। ‘
‘ মেজাজ খারাপ করবানা। এমনিতে আব্বু আর ভাইয়ার ভয়ে বাসা থেকে পালিয়ে এসেছি। আম্মু ঝাড়ু নিয়ে দৌঁড়েছে। একটু তো রহম করো। নাস্তা করিনি সকালে।’
‘ তোমাকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে গেলে ওরা ভাববে আমি কোনো এক গাঞ্জুটি নিয়ে যাচ্ছি। ‘
রিদন মন খারাপ করে উঠে দাঁড়াল। প্রমি চলে যাওয়ার জন্য রিকশা ডাকল। এতদিন পরে দেখা করতে এসেছে অথচ সে চোরের বেশে এসেছে। এই সম্পর্কটাকে একদম সিরিয়াসলি নেয় না রিদন। পরিচিত কেউ যদি এই অবস্থায় তাকে দেখে কি হবে?
রিদন পেছন থেকে ডাকতেই প্রমি রাগ উগড়ে বলল,
‘ এ্যই তোমার সমস্যা কি, হ্যাঁ? তোমাকে একটা কথা স্পষ্ট বলি মনে রাখবে। তোমার সাথে আমি আর এই মুহুর্ত থেকে কোনো সম্পর্ক রাখবো না। কেন রাখব না জানো? আসলে তোমার সাথে কোনো মানুষের সম্পর্ক রাখা উচিত না। তুমি আসলে একটা তেলাপোকা বুঝছো। তেলাপোকা যেমন মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করে দেয়, তুমিও আমার জীবনটা এমন বানিয়ে রেখেছো। তেলাপোকা ডানা থাকলেও শুধু হেঁটে হেঁটে ঘুরে সারাঘরে আর উড়লে তিড়িংতিড়িং করে দিকবিদিকশুন্য হয়ে উড়ে। তুমিও তাই, নিজেকে হিরো মনে কর অথচ নিজের কোনো পারফেক্ট ডেস্টিনেশন নাই লাইফ নিয়ে। জিরো তুমি।মোদ্দা কথা, তেলাপোকা যেমন বিরক্তিকর তুমিও তাই। ‘
রিদন প্রমির মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,’ আমি যদি তেলাপোকা হই, তুমি টিকটিকি। দেয়ালে যেমন চিপকায় থাকে, তুমিও এমন চিপকায় থাকো তোমার লজিকে। নিজেরে টিকটিকির মতো সর্বজ্ঞানী ভাব। টিকটিকি যেমন সারাক্ষণ ঠিক ঠিক করে সবাইকে বুঝায় আমি জ্ঞানী, তুমিও তাই। আসলে কচু। খালি কলসি বাজে বেশি। প্রবাদ বাক্যটা যদি এভাবে হত, ‘ চিকনা টিকটিকি টিকটিক করে বেশি। তবে বেশি ভাল হত।’
প্রমি রাগ করে রিকশায় উঠে চিৎকার দিয়ে বলল, ‘ তুই একটা গুড ফর নাথিং। আর যদি ফোন দেস তোর কানের ডিগডিগি ফাটায় দিব।’
প্রমির রিকশা চলে যাচ্ছে। রিদন মাথা চুলকে নিজেকে প্রশ্ন করলো, ‘ ডিগডিগি কী? কানের ভেতর তো পর্দা থাকে জানতাম। ডিগডিগি থাকে তো জানতাম না। ‘
দুই মিনিটের মাথায় প্রমির রিকশা আবার ঘুরে এলো। রিদনকে রিকশায় উঠিয়ে হাতে নিজের সানগ্লাসটা দিল। এরপর বলল, ‘ এটা পরো। পরলে বলিউড বাদশাহ না লাগলেও আমি সবাইকে বলব প্রমির বাদশাহ লাগছে। ‘
রিদন সব কটা দাঁত দেখিয়ে হেসে বলল, ‘ দোস্তো আমি তোমাকে এজন্য ভালোবাসি। তুমিই আমাকে একমাত্র বুঝলা। তেলাপোকা আর টিকটিকি দুই বন্ধু মিলে আমাদের বাড়ির সব পোকা মাকড় খেয়ে ফেলব কেমন?’
প্রমি রিদনকে পাত্তা না দিয়ে প্রশ্ন করল, ‘ ভাবী আর ভাইয়ার শাড়ির কালার কি বলো তো? আমি ম্যাচ করতে চাচ্ছি।’
রিদন প্রশ্ন করল, ‘ তোমারে দাওয়াত দিল কে?’
প্রমি ভ্রু কুচকে বলল, ‘ আমাকে আবার কে দাওয়াত দিবে? আমি এমনিই যাব। হবু ভাসুরের বিয়ে বলে কথা। ভবিষ্যতে বাচ্চা কাচ্চা জিজ্ঞেস করলে বলতে পারব ওদের জেঠুর বিয়ে খেয়েছি।’
রিদন অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে বিড়বিড় করে বলল, ‘ লে, বেগানা সাদি মে আবদুল্লাহ দিবানা।’
__
রিদিদের বাসায় হলুদের ঘরোয়া আয়োজন করা হয়েছে ড্রইং রুমে। মেঝেতে শীতল পাটি বিছিয়ে, দেয়ালে কিছু আম পাতা, আর কাঁচা ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে। রিদি আমিনার শাড়ি পরতে চাওয়াতে আমিনা তার গায়ে হলুদের শাড়িটা মেয়েকে দিলেন। পাত্রপক্ষের পাঠানো শাড়ি রিদি পরতে চায় নি। মায়ের শাড়ির সাথে স্মৃতি জড়িয়ে গায়ে হলুদ সম্পন্ন করতে চাইল।
দাদী আর ফুফু মিলে রিদিকে এক প্যাচের শাড়ি পরিয়ে দিল। রাহা সাজিয়ে দিল। দাদীর হাতের বালা জোড়া নাতনীকে পরিয়ে দিয়ে কপালে চুমু দিলেন। আমিনা ভীষন অবাক হলেন শাশুড়ীর এই রূপ দেখে। রিদির ফুফুও কম চমকায় নি। তিনি তো প্রশ্নই করে বসলেন, ‘ আম্মা বালা কি আজ পরতে দিলেন নাকি একেবারে…?’
আম্বিয়া বেগম মেয়েকে থামিয়ে বললেন, ‘ বয়স হইছে আমার। নাতী নাতকুর গো কিছুই দিবার পারিনাই। কিন্তু রিদি আমার কইলজা। ওরে কোনো দিন কইতে পারি নাই। থাউক ওর কাছে আমার বালা জোড়া। তোরা সবে তো সম্পদ নিবি। এই বালা জোড়ার দাবী ছাইড়া দে।’
একথা বলেই তিনি আঁচলে চোখ মুছলেন। রিদির চাচী বললেন, ‘ আম্মা এতে তো আপনার বাকি নাতনীরা রাগ করবে।’
আম্বিয়া বেগম দু হাত নেড়ে নাক টেনে বললেন, ‘ হে গো বাপেরে মায়েরে কম দি নাই। বরং বড় বউ এর গহনা সব বেইচ্চা হেগো রে বিদেশ পাডাইছি। দাদীর দোয়াও নেয়া জানতে অয় নাতী গো। কাইল আমারে নয়া নাত জামাই সালাম দিয়া সবার আগে জিগাইছে, দাদী আপনের শরীর কেমন আছে? পায়ের ব্যাথা কি এহনো আছে? এলার্জি গেছে?’ এসব কতা কি তোমাগো ঝি জামাই রা জিগাইছে?’
আমিনার আজ খুব কান্না পেল। কেন পেল সে জানে না। এই শাশুড়ী কত রূঢ় আচরণ করেছে তার সাথে অথচ আজ নাতনীর বেলায় এমন নমনীয় আচরণ আমিনার অন্তরকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
খুব সাধারণ ভাবে রিদির হলুদ সম্পন্ন হয়েছে। তখন ঘড়িতে রাত বারোটা। আচমকা কলিংবেলের আওয়াজ হল। সীমা দরজা খুলে দেখে দ্বীপ। বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে আছে। সীমাকে সালাম দিতেই সীমা লজ্জা পেয়ে রাহাকে ডাকল, দ্বীপকে দরজায় দাঁড় করিয়ে। ড্রইং রুমে বিছানা করে সবাই শুয়ে পড়েছে। মা চাচীরা রান্না ঘরে ব্যস্ত নিজেদের কাজে। রায়হান দ্বীপকে ড্রইং রুমে ঢুকাল। রিদি দু হাত ভর্তি মেহেদী নিয়েই সোফার উপর ঘুমাচ্ছে। পরনে শাড়ি নেই তার। স্কার্ট আর ফতুয়া। মুখের উপর চুল গুলো উড়ছে। গায়ে ওড়না জড়ানো। রায়হান দ্বীপের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘ কিছু করার নেই, আমাদের রিদি একটু ঘুম কাতুরে। কলিংবেলের আওয়াজেও তার ঘুম ভাঙে না। ‘
দ্বীপ চমকে উঠল। রিদি ঘুম কাতুরে! এই মেয়ে ফযরের সময় পর্যন্ত ফোনে কথা বলত। ঘুম কাতুরে হলো কখন? দ্বীপ এসেছে শুনে মা চাচীরা সবাই খাবারের ব্যবস্থা করতে চাইল। দ্বীপ খেয়ে এসেছে বললেও শুনে নি। রিদিকে রাহা উঠিয়ে দিলো ঘুম থেকে। রিদি ঘুম ঘুম চোখে দ্বীপকে দেখে ঘুমন্ত গলায় বলল,
‘ কি ভাই কেনো এসেছেন এত রাতে? এসেছেন যখন থেকে যান। কাল আমার বিয়ে, দাওয়াত খেয়ে যাবেন। একটু ঘুমাতে দেন। বিরক্ত করবেন না। ‘
কাজিনরা সব মুখে হাত দিল। শেষমেশ জামাইকে ভাই বলে ডাকছে এই মেয়ে?
দ্বীপ লজ্জা পেয়ে বলল, ‘ একটু কথা ছিল। ‘
রিদি পুনরায় ঘুমের ঘোরে হাসতে হাসতে বলল, ‘ আচ্ছা, গুড নাইট। আগামীকাল দেখা হবে। আমি ফুটবল খেলব আমার বরের সাথে, এরপর বিয়ে খেতে যাব।’
উপস্থিত সবাই মুখ চেপে হাসছে রিদির আবোল তাবোল বকা দেখে। দ্বীপ লজ্জা পেয়ে মাথা নোয়াল। আমিনা বকতে বকতে রিদিকে উঠিয়ে দিয়ে বলল, ‘ এ্যই রিদি উঠো ,জামাই আসছে। কথা বলো যাও।’
রিদি বলল, ‘ কার জামাই? এই যে গোলটা মিস হয়ে গেল আম্মু।’
রাহাকে ইশারা দিতেই পানির জগ নিয়ে এলো। আমিনা রিদিকে পানি মারার আগেই দ্বীপ বাধা দিয়ে বলল, ‘ আন্টি থাক, ঘুমাক। এত ইম্পর্ট্যান্ট কিছু না। কাল বলব।’
আমিনা দ্বীপের কথা না শুনেই রিদির চোখে মুখে পানি মারল। রিদি হকচকিয়ে সেন্সে এসে চিৎকার দিয়ে বলল, ‘ চোর চোর, এই কে কোথায় আছিস ধর। আমার ফুটবল নিয়ে গেল।’
রায়হান হাসতে হাসতে মেঝেতে বসে গিয়েছে। পুরো রুম জুড়ে অট্টহাসি । রায়হান বলল,’ হ্যাঁ চোরই তো, তোর মন চুরি করতে মস্ত বড় এক চোর এসেছে। ইশ রে ফুটবল ছাড়া কিছুই ভাবতে পারছে না মেয়েটা। জিহান ফুটবল আছে তো বাসায়, নাকি কাল কিনে দিতে হবে একটা?’
রিদি সামনে তাকিয়ে দ্বীপকে দেখে চোখ বড় বড় করে ফেলল। লজ্জা পেয়ে ওড়নায় মুখ ডাকল। দ্বীপ নিজেও বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে নিজেকে বকতে লাগল। সারপ্রাইজ দিতে এসেছিল রিদিকে। অথচ কি থেকে কি হয়ে গেল?
রিদি ধীরে ধীরে ওড়নার আড়াল থেকে মুখ বের করল। লজ্জায় তার গাল লাল হয়ে গেছে। চোখ তুলতে পারছে না ঠিকমতো। ঘুম জড়ানো কণ্ঠে ছোট করে বলল, ‘আপনি… কবে এসেছেন?’
বাহ! এত সম্মান। তুমি থেকে একেবারে আপনি! দ্বীপ মৃদু হেসে উত্তর দিল, ‘অনেকক্ষণ হলো। তবে তোমার ফুটবল ম্যাচটা দেখে মনে হচ্ছে আমি ভুল সময়েই এসেছি।’
আবারও সবাই হেসে উঠল। রিদি এবার আরও লজ্জা পেয়ে আমিনার পেছনে দাঁড়িয়ে মুখ লুকাল। আমিনা মেয়ের মাথায় আলতো চাপড় দিয়ে বললেন, ‘এই মেয়েরে নিয়ে আমি আর পারি না।’
সবাই ভেতরের কামরায় চলে গেল ওদের কথা বলতে দিয়ে৷ রিদি আর দ্বীপ একা ড্রইং রুমে দাঁড়িয়ে। রিদির হাতের মেহেদীর সুবাস পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে। সে এখনো মেঝের দিকে তাকিয়ে নখ খুঁটছে, যেন মাটির নিচে কোনো গুপ্তধন লুকানো আছে।
দ্বীপ এক পা এগিয়ে রিদির খুব কাছে এসে দাঁড়াল। পকেট থেকে একটা ছোট্ট, মখমলের লাল বাক্স বের করল। তবে সেটা কোনো আংটি বা গহনার বাক্স নয়, আকৃতিটা একটু লম্বাটে।
রিদি কৌতুহল সামলাতে না পেরে আড়চোখে তাকাল। দ্বীপ বাক্সটা খুলে রিদির সামনে ধরল। ভেতরে জ্বলজ্বল করছে রুপালি রঙের একটা চাবির রিং, আর তার সাথে ঝুলছে ছোট্ট,একটা রুপার ফুটবল। ফুটবলটার গায়ে খুব সুক্ষ্মভাবে খোদাই করে লেখা ‘মাই পার্মানেন্ট স্ট্রাইকার’।
রিদি হাঁ করে তাকিয়ে রইল। দ্বীপ মৃদু হেসে বলল, ‘ বিয়েতে সবাই তো গহনাগাটি দেয়। আমি ভাবলাম, ভিন্ন কিছু দিই। কিন্তু মাথায় এলো যেহেতু কোমড় ভেঙ্গেই যাত্রা শুরু করেছিলাম। তাই পরিণয়েও না হয় ফুটবল থাকুক। এখন তো এসে দেখি ম্যাডাম ঘুমের ঘোরে আমাকে ছাড়া ফুটবল নিয়ে ব্যস্ত। ম্যাচের প্রথমার্ধ তো একাই খেললেন , আগামীকাল থেকে দ্বিতীয়ার্ধটা নাহয় একসাথেই শুরু করা যাবে, কি বলেন?’
দ্বীপের এমন কথা, অদ্ভুত সারপ্রাইজ দেখে রিদির লজ্জারা আরও ভিড় করল। দু হাত ভর্তি মেহেদী থাকায় চাবিটা ধরতে পারছিল না, তাই দ্বীপ নিজেই আলতো করে চাবির রিংটা রিদির ফতুয়ার পকেটে গুঁজে দিল।
রিদি মাথা উঁচু করে দ্বীপের চোখের দিকে তাকিয়ে মিনমিনিয়ে বলল, ‘ চোর তো তাহলে সত্যিই এসেছে। কালকের ম্যাচের ট্রফিটা নিতে ।’
দ্বীপ ঠোঁট চেপে হাসল। সামান্য এগিয়ে রিদির কানে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘ ইয়েস, আর ট্রফির নাম রিধিমা জাবেদ। ‘
চলবে…
