#প্রেমচিত্র-[৪]
লেখনীতে:ইশা আহমেদ
চাঁদনী আপাও উপায় অন্তর না পেয়ে তুশিকে নিয়ে সাবধানে বাড়ির পেছন দিকটায় আসলো। অয়ন ভাই তখন অন্ধকারে দাঁড়িয়ে। তুশি বেশ অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে। অয়ন ভাই চাঁদনীকে আপাকে জড়িয়ে ধরেছিলো এটা তুশি চুপিচুপি দেখে নিয়েছে। চাঁদনী আপা পাঁচ মিনিটে বিদায় দিয়ে আবারও তুশিকে নিয়ে ফিরে আসলেন বাড়িতে। বাড়ির মানুষ সবাই ব্যস্ত। তুশির ও টুকটাক ডাক পরছে। ছোট চাচি তুশিকে ডেকে বললেন,
-“ বাইরে যা তো তুশি। জাওয়াদ ফুল আর মেহেদী নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওর আবার কি কাজ আছে। যেতে হবে ওকে।”
তুশি কোনো রকম হাত খোঁপা করে আঁচল টেনে ছুটে বাইরে আসে। জাওয়াদ ভাই বিরক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তুশি জাওয়াদ ভাইয়ের কাছ থেকে ফুল নিয়ে দেখছিলো সব কিছু ঠিক আছে কি না। সামনের চায়ের দোকানে চোখ পরতেই পার্থকে দেখলো তুশি। চমকালো, ফুলের ডালাটা হাত ফসকে গিয়েছিলো তুশির কোনো মতে নিজেকে সামলে ছুটে বাড়ির ভেতরে ঢুকলো। তুশির খেয়ালে আসলো চুলের কথা। আঁচল পরে, খোঁপা খুলে তার প্রায় হাঁটু অব্দি চুলগুলো দেখা গিয়েছে। পার্থ বুঝি এ জন্য তাকিয়ে ছিলো? ছিহ্! কি লজ্জার বিষয়। তুশির মনটা খারাপ হলো। তার লম্বা চুল সে কখনো কাউকে দেখায়নি। আজ অযাচিত ভাবে পার্থ দেখে নিলো। আশেপাশের লোকও দেখছে ভাবতেই খুব খারাপ লাগলো তুশির।
রিক্তা তুশিকে ডেকে রুমে আসে। মেহেদী আর্টিস্ট ততক্ষণে চাঁদনী আপাকে মেহেদী পরানো শুরু করে দিয়েছে। রিক্তা ফুলের ডালা থেকে একটা বেলী ফুলের মালা তুলে তুশির লম্বা বিনুনিতে একেঁ বেঁকে গেঁথে দিয়েছে। তুশির সৌন্দর্য যেনো আজ উপচে পরছে। মিমি টিনটিন সবাই সেজেছে। সে সন্ধ্যা কাটলো সবার ভীষণ আনন্দ উল্লাসে। রিক্তা বেচারি মেহেদী দিয়ে ক্লান্ত। অনুষ্ঠান শেষ করে তুশি এক প্রকার বাধ্য করেছে সবাইকে তার রুম গুছিয়ে দিতে। সব কিছু গোছগাছ করে শুতে শুতে তুশির রাত বারোটা বাজলো। তুশির রুমে শুয়েছে তুশি আর রিক্তা। তুশির বান্ধবী বলতে রিক্তাই।
–
বিয়ের দিন চাঁদনী আপা খুব ব্যস্ত। তুশির অনেক কান্না পাচ্ছে। চাঁদনী আপা চলে যাবে। বাড়িতে এই একটা মানুষ ছিলো যাকে তুশি ভীষণ ভালোবাসতো, যার সাথে তুশির প্রতিটা সময় কাটানো হতো। এরপর তুশি খুব একা হবে খুব। তুশি আজ অফ হোয়াইট শাড়ি পরেছে, সাথে ম্যাচিং হিজাব,চুড়ি, গহনা। রিক্তা তুশির সাথে সাথে ই আছে। অয়ন ভাই আসলে তুশিরা গেট ধরে, জুতা চুরি করে আরো কত কি! মজা করে বাকিটা সময় কাটলেও, বিয়ের সময় বেঁধে যায় এক কান্ড। কাবিন নিয়ে ঝামেলা লেগে যায় দুপক্ষের ভেতর। বর পক্ষ বলে এক অঙ্ক, কনে পক্ষ বলে আরেক।এই নিয়ে ঝামেলা শুরু!
অনেক কথা কাটাকাটির পর অয়ন ভাই নিজেই সবাইকে থামতে বলেন। অয়ন ভাই নিজে গিয়ে চাঁদনী আপাকে সরাসরি প্রশ্ন করলেন প্রথমে ঠিক করা কাবিনে সে বিয়ে করবে কি না? চাঁদনী আপা সরাসরি উত্তর দিলেন তার সমস্যা নেই। এরপর সুষ্ঠু ভাবেই বিয়েটা শেষ হয়। বিদায়ের আগে সে কি কান্না চাঁদনীর। তুশিও কম কিসে? আপাকে জড়িয়ে একাধারে কেঁদে যাচ্ছিল। কেউ একজন গম্ভীর চোখে তুশির আপাদমস্তক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলো, যা তুশি কল্পনাও করতে পারে না।
নাকের পানি চোখের পানি এক করে তুশি যখন কান্নায় ব্যস্ত তখন পার্থ ব্যাস্ত সিগারেট ফুঁকতে। তার চোখ আবদ্ধ তুশি নামক বোকাফুলের দিকে।
পার্থ মনে মনে আওড়ালো, “সময় এসেছে বোকাফুল”
–
তুশির পার্থর সাথে দেখা হলো গুনে গুনে চাঁদনী আপার বিয়ের পাঁচদিন পর। তুশি তখন সন্ধ্যে বেলা কোচিং শেষে বাড়িতে ফিরছে। তুশি আশপাশ ভালো করে দেখে নিলো কেউ আছে কি না চেনা পরিচিত! কাউকে না দেখে ভীরু মেয়েটা এগিয়ে গেলো পার্থ নামক বখাটে লোকটার পাশে। তুশি মনোযোগ পেতে কেশে উঠলো। পার্থ ফিরে তাকালো। বললো,
-“কি চাই?”
তুশি ইতস্তত করে বলল,“ধন্যবাদ!”
-“কেনো?”
তুশি নিচু স্বরে শুধাল,
“সেদিন ওই লোকটাকে আমার হয়ে মারার জন্য”
-“তোমার জন্য মারিনি”
তুশি হতভম্ব হলো। রিক্তা যে বলল পার্থ ভাই নাকি কষিয়ে থাপ্পড় মেরেছে, নাক বরাবর নাকি ঘুষিও মেরেছে। তাহলে কি রিক্তা ভুল বললো? প্রশ্নবোধক চাহুনিতে জিজ্ঞেস করলো,
-“তাহলে কেনো মেরে ছিলেন?”
পার্থ বিরক্ত হলো। ধমকে বলল,“এই মেয়ে আমাকে ভয় করছে না? তুমি প্রশ্ন করার সাহস পেলে কোথায়?”
তুশির বোধ ফিরলো। দুঃখিত বলে চলে যেতে চাইলো। দু’পা এগোতেই ভেসে আসলো পার্থর গম্ভীর কন্ঠস্বর।
-“এই মেয়ে চুল ছেড়ে বের হবা না আর!”
তুশি তাকালো না। তাকানোর সাহস নেই। লজ্জায় বেচারির অবস্থা খারাপ। পেছন থেকে মাথা নেড়ে সম্মতি দিয়ে ছুটে চলে গেলো। পার্থ মৃদু হাসলো। তুশি বাড়ি এসে চমকে গিয়েছে। চাঁদনী আপা, অয়ন ভাই অপেক্ষা করছে তার জন্য। মিমি, মাইশা জাওয়াদ ভাই সবাই রেডি। তার জন্যই বসে থাকা। তুশিকে মিনিট দশেকের মাঝে তৈরি হয়ে আসলো।
অয়ন ভাই আজ সবাইকে ঘুরতে নিয়ে যাবে। ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার কারণ হচ্ছে অয়ন ভাই দু’দিন বাদেই ফিরে যাবেন। শালা-শালিদের আজ দারুন ভাবে ঘুরাবে। সবাই অটোতে করে ঘুরলো শহরের আনাচে কানাচে। তুশির সাথে বখাটে ছেলেটার আবারও দেখা হলো মোড়ের ফুসকার দোকানের সামনে। তুশি আড় চোখে দেখছিলো।
সেই সন্ধ্যে তুশির আসলেই দারুন কাটলো। রাতে বাড়ি ফিরে তুশি চিন্তায় পরলো। পার্থ কেনো তাকে ওই কথা বললো? পার্থ কি ভালোবাসে তুশিকে? বা পছন্দ করে?
–
এক মাস পরের কথা। বিকালের সময়টাতে তুশির একা লাগছিলো। রিক্তাকে কল করে আসতে বলল। দু’জন ঠিক করলো নদীর পারে যাবে। দুই বান্ধবী রিকশায় চড়ে আসলো নদীর পাড়ে। নদীর পাড় জুড়ে অনেকগুলো চায়ের দোকান। তুশি রিক্তাকে নিয়ে বসলো সেখানে। দু’কাপ চায়ে সেই বিকাল আড্ডায় মেতে উঠলো। তুশিরা উঠলো আজানের কিছুক্ষণ আগে। রিক্তা বিল দিয়ে এসে দেখে তুশিকে ঘিরে আছে তিন জন ছেলে। একজনের সাথে তুশি কথা বলছে। রিক্তা কিছুটা এগিয়ে আসতেই বুঝলো ছেলেটা তুশিকে বিরক্ত করছে। রিক্তা নিজেও খুব ভিতু। তবুও বুকে সাহস নিয়ে রিক্তা তুশিকে নিয়ে সেখান থেকে আসার চেষ্টা করে। রাস্তায় উঠতেই ছেলে তিনজন আবারও হাজির হয় তাদের সামনে।
তুশি না পেরে অনুরোধ করে যেতে দেওয়ার জন্য। ছেলে তিনজন শব্দ করে হাসতে থাকে। তুশির জঘন্য অনুভূত হয়। অনেক অনুরোধের পরও যখন পিছু ছাড়ছিলো না তুশি ভয়ংকর সাহস দেখিয়ে ফেলে। তুশি চড় মেরে বসেছে ওদের মাঝের একজনকে। তিনজনই খেপে গিয়েছে। তুশি ভেতরে ভেতরে প্রচন্ড ভয় পেলেও মুখ মন্ডলে তা প্রকাশ করলো না। তুশি যাকে থাপ্পড় মেরেছে ছেলেটা রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে আছে।
তুশি রিক্তার হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলো। পেছন থেকে তুশির হিজাবে টান মারে ছেলেটা। হিজাব খুলে তুশির অধাংশ চুল বেরিয়ে যায়। তুশির পরনে ছিলো সুতির সেলোয়ার-কামিজ। এক সাইডে ওড়না ভাজ করে দেওয়া ছিলো। তুশি দুহাতে নিজেকে ঢাকার আপ্রাণ চেষ্টা করে। ছেলেটার হাতে তুশির হিজাবের এক পাশ। তুশি ফুপিয়ে উঠে। আশেপাশের সবাই তাকিয়ে নাটক দেখছে। হঠাৎই তুশি নিজেকে কারো বাহুডোরে আবিষ্কার করলো। কেউ একজন খুব যত্নে তার হিজাব খানা মাথায় তুলে দিলো। পার্থ! পার্থ শেখের বাহুডোরে আবদ্ধ তুশি। মেয়েটা বিষ্ময়কর চাহুনিতে তাকিয়ে আছে। পার্থ এক পলক তাকিয়ে তুশিকে সোজা করে দাঁড় করিয়ে দিলো। এরপর! এরপর বখাটে ছেলেটা তুশির জন্য মারামারি করলো।
তুশি রিক্তার সাথে ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিছু সময় পেরোতেই তুশি নিজের বাম গালে ব্যাথা অনুভব করলো। মেয়েটা দু’পা পিছিয়ে গিয়েছে। রিক্তা না ধরলে বোধ হয় টাল সামলাতে না পেরে রাস্তায় মুখ থুবড়ে পরতো! পার্থ তুশির হাত শক্ত করে ধরে টান মেরে কাছে আনলো। ব্যাথায় তুশির চোখে পানি চলে এসেছে।
-“এই মেয়ে, একা আসার সাহস পেলে কীভাবে?”
চলবে
