#বেলীফুলের_ইতিকথা(২২)
#মীরাতুল_নিহা
ফারহানের হাতজোড় করে ক্ষমা চাওয়ার দৃশ্যটা বেলীর মনে কোনো করুণার উদ্রেক করল না। সে ফারহানের দিকে এক পা এগিয়ে এসে অত্যন্ তীব্র অপমান মেশানো গলায় বলল,
“হাত জোড় করছেন কেন ফারহান সাহেব? এই হাত দিয়ে তো সেদিন আমাকে ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করেছিলেন। আপনি ফিরিয়ে নিতে এসেছেন কোন সাহসে? ধর্মমতে আমাদের বিয়ে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। আপনি সবাইকে সাক্ষী রেখে তিন তালাক দিয়েছেন। আমার কাছে ধর্মের চেয়ে বড় আর কিছু নেই, আপনার ওই আইনি মারপ্যাঁচও না।”
ফারহান অপরাধীর মতো মুখ নিচু করে ক্রাচে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বেলী থামল না, সে সোজা ফারহানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ধর্মের বিধানে আপনি আমার পরপুরুষ। আপনার ছায়া মাড়ানোও আমার জন্য গুনাহ। আইনের চোখে ৯০ দিন সময় আছে ঠিকই, কিন্তু সেই আইন এখন আপনাকে আমার স্বামী বানানোর জন্য নয়, বরং আইনমতে আপনার কাছ থেকে আমার দেনমোহরের এক একটি টাকা কড়ায়-গণ্ডায় উসুল করার জন্য।”
ফারহান এবার কাঁপাকাঁপা গলায় আকুতি করল,
“বেলী, দোহাই তোমার, এভাবে বলো না। আমি খুব বিপদে পড়ছি। তুমি তো দেখছ আমি অসুস্থ, আমার একটা পা অচল হইয়া গেছে। আমা কাজও এখন নাই। আমি এখন এত টাকা কোথায় পাব বলো? আমাকে একটু মাফ কইরে দাও।”
বেলী ঠোঁটের কোণে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে তুলল। বলল,
“আপনার কর্মের ফল। আর অসুস্থতার কথা বলছেন? আমি তো অনেক আগেই শুনেছি যে আপনি এক্সিডেন্ট করেছেন। রাস্তায় ল্যাংড়া হয়ে ঘুরছেন। তাতে আমার কি?”
বেলীর মুখে এই কথাটি শুনে ফারহান স্তব্ধ হয়ে বেলীর দিকে তাকিয়ে রইল। তার মানে বেলী জানত! সে যে এক্সিডেন্ট করে হাসপাতালে ছিল, পা ভেঙে ঘরে পড়ে ছিল, এই সব খবর বেলী আগে থেকেই জানত। অথচ… অথচ সে একবারের জন্যও তাকে দেখতে আসেনি! একটাবারের জন্যও খোঁজ নেয়নি সে বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে! ফারহানের মনে পড়ে গেল সেই পুরোনো দিনগুলোর কথা। সামান্য একটু জ্বর হলে, কিংবা কাজ থেকে ফিরতে একটু দেরি হলে বেলী অস্থির হয়ে যেত। ফারহান একটু অসুস্থ হয়ে পড়লে বেলী মাথায় পানি ঢালত, রাত জেগে সেবা করত। যে মেয়েটা তাকে এতটা ভালোবাসত, যার পৃথিবী জুড়ে শুধু ফারহান ছিল—আজ সে কতটা নিষ্ঠুর, কতটা পাথর হয়ে গেছে! ফারহানের এত বড় বিপদেও সে একটু দেখতে আসার প্রয়োজন বোধ করেনি।
ফারহান বুঝলো, সে আসলে বেলীর ভেতরের সেই নরম মনের মানুষটাকে নিজের হাতে খুন করেছে।
বেলী আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। ঘরের দরজার দিকে ইশারা করে অত্যন্ত কঠোর গলায় বলল,
“আর একটা কথাও নয়। সম্মানে ঘাড় ধাক্কা খাইতে না চাইলে এখনই এখান থেকে চলে যান। আপনার মুখ দেখার রুচিও আমার নেই।”
ফারহান নড়ল না। সে মাথা নিচু করে, দেওয়ালের দিকে চোখ রেখে অত্যন্ত অপরাধী এবং লজ্জিত স্বরে বলল,
“বেলী… দু’টো ভাত হইব? খুব ক্ষিদে পেয়েছে গো। গতকাল রাত থেকে পেটে এক দানা দানাপানিও পড়ে নাই।”
বেলীকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে ফারহান পুনরায় বলল,
“ তৃষ্ণা… তৃষ্ণা আমাকে ফেলে চলে গেছে। আমার এই ভাঙা পা নিয়ে রান্না করার কোনো উপায় নেই।”
ফারহানের মুখে তৃষ্ণার চলে যাওয়ার কথা শুনে বেলী কিংবা আয়েশা—কারো চোখেই বিস্ময় বা সহানুভূতির লেশমাত্র ফুটল না। দুজনেই একদম শীতল হয়ে রইল। ফারহান যখন বুঝল এখানে তার ঠাঁই হবে না, সে অত্যন্ত ক্লান্ত পায়ে ক্রাচে ভর দিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। চলে যাওয়ার জন্য এক পা বাড়াতেই পেছন থেকে বেলী ডেকে উঠল,
“ভেতরে আসেন।”
ফারহান চমকে ফিরে তাকাল। বেলীর চোখের দিকে তাকানোর সাহস তার হলো না, সে নিঃশব্দে ঘরের ভেতর ঢুকল। একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসার পর সে চারপাশটা চোখ বুলিয়ে দেখল। ফারহানের বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। বেলী তার পুরোনো সংসারে যেমন একটু একটু করে নিজ হাতে সবকিছু গুছিয়ে সাজাত, এই নতুন ঘরটাকেও সে ঠিক তেমনি পরিপাটি করে সাজিয়েছে। ঘরের কোণে একটা ফুলদানিতে কটা বেলীফুল গোঁজা, যার সুঘ্রাণ সারা ঘরে ম ম করছে।
খানিক বাদে বেলী রান্নাঘর থেকে ভাতের থালা বেড়ে নিয়ে এল। থালায় ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত, সাথে টকটকে ঝোলের রুই মাছের তরকারি আর মাছের মাথা দিয়ে রান্না করা কচুর শাক। ফারহান থালাটা টেনে নিয়ে তৃপ্তি ভরে খেতে লাগল। সে এমনভাবে গিলছিল, যেন কত যুগ সে অন্নহীন, কতদিন পর সে ভাতের স্বাদ পাচ্ছে! তৃষ্ণা মাঝেসাঝে রাঁধলেও সেই খাবারে কোনো স্বাদ ছিল না, ছিল না কোনো আন্তরিকতা। এক প্লেট ভাত নিমেষের মধ্যে শেষ করে ফারহান বেলীর দিকে না তাকিয়ে অপরাধীর মতো থালাটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
“আরেকটু ভাত হবে বেলী? বড্ড খিদে লেগেছে।”
বেলী কোনো কথা বলল না। মুখ ফুটো করে একটা প্রশ্নও করল না। সে নিঃশব্দে থালাটা নিয়ে রান্নাঘরে গেল এবং আবার ভাত বেড়ে এনে ফারহানের সামনে রাখল। ফারহান পরম শান্তিতে খেতে লাগল, বেলী দূর থেকে দাঁড়িয়ে তার জীবনের এই চরম ধ্বংস আর পতনের দৃশ্যটা অবলোকন করতে লাগল।
এতক্ষণ ঘর জুড়ে হামাগুড়ি দিতে থাকা ছোট্ট ফিওনা হঠাৎ একটা কাঠের টুলের ওপর ভর দিয়ে নিজের ছোট্ট দুটি পায়ে ভর দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। সে ঘরের দেয়াল ধরে ধরে, এক পা দু পা করে টলমল পায়ে এগিয়ে আসতে লাগল ঠিক ফারহানের দিকে। ফারহানের আর একটুখানি দূরত্ব থাকতেই তার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেল, সে ধপাস করে পড়ে যেতে নিচ্ছিল ঠিক তখনই ফারহান নিজের খাওয়া ভুলে ক্রাচ ফেলে হাত বাড়িয়ে ফিওনাকে আগলে নিল। আলতো করে মেয়েটাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল সে। ফিওনাকে বুকে নিতেই ফারহানের শরীরের ভেতর দিয়ে যেন একটা বৈদ্যুতিক তরঙ্গ বয়ে গেল। এক অবর্ণনীয়, তীব্র এক অনুভূতি! এমন অনুভূতি তার জীবনে আগে কখনো হয়নি। অতীতে যখন বেলী বাচ্চার জন্ম দিয়েছিল, তখন ফারহান নিজের ভুলের অন্ধকারে এতটাই অন্ধ ছিল যে এই পবিত্র অনুভূতির মর্ম সে বোঝেনি। আজ এই চরম বিপদের দিনে, নিজের সর্বস্ব হারানোর পর মেয়ের শরীরের ওমে তার ভেতরটা হু হু করে কেঁপে উঠল। ফারহান পরম মমতায় মেয়ের মাথায় কাঁপা কাঁপা হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।
কিন্তু সেই সুখ সইল না মাত্র কয়েক সেকেন্ড। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আয়েশা চিলের মতো ছোঁ মেরে ফিওনাকে ফারহানের বুক থেকে ছিনিয়ে নিল। ফারহান বুকটা খালি হয়ে যেতেই আর্তনাদ করে বলে উঠল,
“আয়েশা, দাও না একটু! ফিওনা তো আমারও মেয়ে, আমার নিজের রক্ত।”
আয়েশা ফিওনাকে নিজের আড়ালে নিয়ে তপ্ত গলায় বলল,
“রাখেন আপনার মেয়ের বাহানা! আপনে এই বাপের যোগ্য না। যে লোক নিজের বউ-বাচ্চারে রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দিতে পারে, সে কখন নিজের বাচ্চার কী ক্ষতি কইরা বসে তার কোনো ঠিক নাই। আপনারে বিশ্বাস নাই।”
আয়েশার কোল থেকে ফিওনা কিন্তু চোখ সরাল না। সে বড় বড় নিষ্পাপ চোখ দুটো মেলে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল ফারহানের দিকে। সে যেন তার এই ছোট্ট মাথায় চেনার চেষ্টা করছে—কে এই লোকটা? কেন তার চোখে এত জল? অবুঝ শিশুটি জানেই না যে এই লোকটাই তার জন্মদাতা পিতা, অথচ আজ তাদের মাঝে কোনো বাবা মেয়ের সম্পর্ক অবশিষ্ট নেই।
মেয়ের সেই চাউনি দেখে ফারহান এক লহমায় অতীতে ঘুরে এল। ফিওনা যখন জন্মাল, সে তখন তৃষ্ণার সাথে পরকীয়ায় বুঁদ হয়ে ছিল। সারারাত বেলী যখন এই বাচ্চাটাকে বুকে নিয়ে একা একা জেগে থাকত, কাঁদত, ফারহান তখন ফোনের ওপাশে অন্য নারীর রূপের সাগরে ভাসত। মাঝেমধ্যে লোকদেখানো কোলে নিলেও ফিওনাকে তখন এত আদুরে, এত আপন লাগেনি তার। আজ কেন তবে বুকটা এভাবে ফেটে যাচ্ছে? এই মেয়েটা যে তারই অংশ, তারই রক্ত! এই মেয়েটাই একদিন তাকে ‘বাবা’ বলে ডাকত।
ফারহান আর কোনো জোর করল না, কোনো অধিকার খাটাতে গেল না। সে শুধু এক বুক মায়া আর অনন্ত আফসোস নিয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তার বড্ড ইচ্ছে করছিল ফিওনাকে আবার বুকে টেনে নিয়ে একটু প্রাণভরে আদর করতে, কিন্তু সেই ইচ্ছে প্রকাশ করার মতো মুখ বা অধিকার আজ কোনোটিই তার নেই। সে কেবল এক অপরাধী পিতার মতো নিঃশব্দে চোখের জল মুছল।
তৃপ্তি ভরে দুই প্লেট ভাত খাওয়ার পর ফারহানের শরীরে যেন সামান্য শক্তি ফিরে এল। সে এঁটো হাতটা ধুয়ে গামছা দিয়ে মুখ মুছল। তারপর অত্যন্ত করুণ আর যাচনামূলক দৃষ্টিতে বেলীর দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
“বেলী… একটা কথা বলি? ওই আইনি নোটিশের দেনমোহরের দুই লাখ টাকাটা… ওটা কি কোনোভাবেই মাফ করা যায় না? আমার এখন কোনো আয়-রোজগার নাই, শরীরটাও অচল।”
বেলী ফারহানের দিকে একপলক তাকাল। তার চোখে কোনো দয়া বা নমনীয়তা ফুটল না। সে ভাতের খালি থালাটা তুলে নিতে নিতে বরফশীতল কণ্ঠে বলল,
”খেতে চেয়েছেন তাই খেতে দিয়েছি। তার মানে এই না যে আপনি যখন যা চাইবেন, আমি হাত বাড়িয়ে সব দিয়ে দেব।”
বেলীর এই সোজাসাপ্টা জবাবে ফারহান তীব্র অপমানিত বোধ করল। মনে হলো, বেলী যেন তাকে কোনো মানুষই ভাবছে না, ঘরের দুয়ারে আসা কোনো অবলা কুকুর-বেড়ালকে মানুষ যেভাবে করুণা করে দুটো ভাত ফেলে দেয়, বেলীও ঠিক তা-ই করল।
ফারহান বুকে হাত দিয়ে কষ্ট চেপে বলল,
”আমার সাথে এমন ব্যবহার বাজে করছো বেলী?”
বেলী এবার ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখ দুটো জ্বলে উঠল। সে তীব্র ঝাঁঝালো গলায় বলল,
“ব্যবহারের কথা বলছেন ফারহান সাহেব? আপনি আমার ঘরে সতীন এনেছেন, আপনার সেই নতুন ভালোবাসার জন্য আমাকে আর আমার দুধের বাচ্চাটারে ঘর থেকে তাড়িয়ে দিয়েছেন। তালাক দিয়েছেন, সম্পর্ক শেষ করেছেন অথচ আপনার জন্য আমি সব ছেড়েছিলাম! আমি আপনার সাথে আজকে যা করছি, আপনি আমার সাথে যা যা করেছেন—তার চেয়ে অনেক কম, অনেক ভদ্র ব্যবহার করছি!”
ফারহান লজ্জায় আর অপরাধবোধে মুখ তুলে তাকাতে পারল না। সে কেবল মাথা নিচু করে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল। বেলী থালা-বাসনগুলো রান্নাঘরে রেখে এসে দরজার দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলল,
“খাওয়া তো শেষ, এবার দয়া করে আমার ঘর থেকে বিদায় হন। আর কোনোদিন যেন এই মুখ আমি না দেখি। মনে রাখবেন, আপনি এখন আমার কাছে পরপুরুষ। একজন পরপুরুষ যদি আমার ঘরে এভাবে বারবার আসে, তবে এবার আমি নিজেই পাড়ার লোক ডেকে আপনাকে চোর বা লম্পট সাজিয়ে গণপিটুনি খাওয়াব। তখন এই ভাঙা পা-টাও আস্ত থাকবে না।”
ফারহান স্তব্ধ হয়ে গেল। তার চোখের পলক পড়ছে না। এ কোন বেলী?
ফারহান নিজের ক্রাচ দুটো টেনে নিয়ে অতি কষ্টে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তারপর একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
“ঠিকই তো… আমি যা করেছি, এটা আমার সেই কৃতকর্মেরই ফল। পাপের কলসি যেদিন ভরে, সেদিন এভাবেই সব এক নিমেষে ছারখার হয়ে যায়। আজ আমি নিজের চোখে আমার ধ্বংস দেখে গেলাম বেলী। আমার আর কোনো ক্ষোভ নাই।”
ফারহান খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দরজার দিকে পা বাড়াল। উশকোখুশকো চুল আর অসহায় আত্মসমর্পণ দেখে বেলীর বুকের ভেতরটা হুট করেই কেমন যেন ওলটপালট হয়ে গেল। এক মুহূর্তের জন্য তার ভেতরের পুরোনো আবেগটা নড়েচড়ে বসল। এই লোকটাকেই তো সে নিজের সর্বস্ব দিয়ে ভালোবেসেছিল। এতটাই ভালোবেসেছিল যে তার জন্য নিজের বাবা-মা, পরিবার—সবকিছু এক লহমায় ছেড়ে চলে এসেছিল। আর সেই ভালোবাসার মানুষটাই তাকে জীবনের মাঝপথে, বাচ্চাসমেত এক বুক অন্ধকার নদীর পাড়ে একা ফেলে চলে গিয়েছিল।
বেলীর চোখ দুটো টলমল করে উঠল। কিন্তু সে চট করে নিজের চোখের জল আড়াল করে ফেলল। নিজের মনকে শক্ত করে সে ভাবল—না! এই লোকটার জন্য এক ফোঁটা সহানুভূতি দেখানোও এখন আমার পাপ। যে আমার আর আমার মেয়ের জীবনটা ধ্বংস করতে দ্বিধা করেনি, তার এই পরিণতি প্রকৃতির বিচার ছাড়া আর কিছুই নয়।
ফারহান চৌকাঠ পার হয়ে গলির অন্ধকারে পা বাড়াতেই বেলী আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করল না। সে দুই হাত দিয়ে ‘দড়াম’ করে ঘরের মূল দরজাটা বন্ধ করে দিল।
**#চলবে…**
#বেলীফুলের_ইতিকথা (২৩)
#মীরাতুল_নিহা
বিকেলে বস্তির সামনের খোলা জায়গাটাতে কতগুলো বাচ্চা মেতে উঠেছে নানারকম খেলনা নিয়ে। সেখানে প্লাস্টিকের ভাঙা গাড়ি, পুতুল আর হাড়ি-পাতিলের মেলা বসেছে। চার বছরের ছোট্ট বাচ্চাটাও দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিল। লোভ সামলাতে না পেরে সেও গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেল সেখানে। বাচ্চারাও সানন্দে তাকে নিজেদের দলে টেনে নিল। নতুন বন্ধুদের সাথে খেলনা বাটি খেলতে খেলতে কখন যে চারপাশটা আবছা হয়ে এল, সূর্য ডুবে সন্ধ্যা নেমে গেল, বাচ্চাটি তা টেরও পায়নি। সে তখন পুতুলের সংসার সাজাতে বড্ড ব্যস্ত! ঠিক তখনই হঠাৎ তার পিঠে ‘টাস টাস’ করে দুটো চড় পড়ল! আচমকা এই মার খেয়ে মেয়েটি পিঠ হাতড়ে কাঁদো কাঁদো দৃষ্টিতে পেছন ফিরে তাকাল। সামনে মায়ের চিবুক শক্ত করা রাগী মুখটা দেখেই অবুঝ মেয়েটার বুকটা কেঁপে উঠল, সে এবার হাপুস নয়নে কেঁপেই কেঁদে দেবে এমন অবস্থা।
বেলী দুই হাত কোমরে রেখে কড়া গলায় বলল,
“এতক্ষণেও তোমার খেলা শেষ হয়নি ফিওনা? দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে গেল, তোমার কোনো হুঁশ আছে?”
ফিওনা চোখ মুছে মায়ের ফ্রকটা টেনে ধরে ভাঙা ভাঙা গলায় বলল,
“সবাই খেলা করচে আম্মু… টাই আমিও…”
তুতলিয়ে কথাগুলো বলল ফিওনা। এখনো স্পষ্ট করে কথা বলা শিখেনি৷ কিছু কিছু শব্দ উচ্চারণ করতে পারে না। বেলী মেয়ের হাত ধরে টেনে সোজা করে দাঁড় করিয়ে বলল,
“সবাই খেলছে কারণ এদের বাড়ি এইখানেই। এরা বস্তির ভেতরেই থাকে। কিন্তু তোমার বাড়ি তো এখান থেকে দূরে! তোমাকে আম্মু কতবার বলেছি না, খেলার সময় শেষ হলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে সোজা বাড়ি চলে আসবে? ঘরের দরজায় তালা দিয়ে আমি সারা বস্তি খুঁজে বেড়াচ্ছি তোমাকে। আমার কতটা চিন্তা হচ্ছিল, সেই খেয়াল আছে?”
মায়ের বকুনি শুনে ফিওনা আর কোনো অজুহাত দিল না। সে নিজের দুটো ছোট্ট হাত দিয়ে কান ধরে টলমল চোখে বলল,
“আর হবে না আম্মু, স্যরি… আর ককনো দেরি কলব না।”
চার বছরের একটা ফুটফুটে বাচ্চার ওই কাঁদো কাঁদো মুখ, দুই হাত দিয়ে কান ধরে নিষ্পাপ ভঙ্গিতে ‘স্যরি’ বলা দেখে বেলীর ভেতরের সব রাগ এক পলকে জল হয়ে গেল। শত হলেও মায়ের মন তো! সন্তানের ওপর কি বেশিক্ষণ রাগ ধরে রাখা যায়?
বেলী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিওনাকে টেনে এক ঝটকায় নিজের বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিল। মেয়ের চুলে হাত বুলিয়ে আদুরে গলায় বলল,
“দুষ্টু মেয়ে একটা! আর কখনো না বলে এত দূরে আসবে না, কেমন?”
তারপর ফিওনাকে কোলে তুলে নিয়ে পরম মমতায় চুমু খেয়ে সে নিজের ঘরের দিকে রওনা দিল।
দেখতে দেখতে সময়ের খাতা থেকে পেরিয়ে গেছে তিন-তিনটি বছরেরও অধিক সময়। এই দীর্ঘ তিন বছরে ফিওনা যেমন একটু একটু করে বড় হয়ে চার বছরে নূপ নিয়েছে, তেমনি বেলীর জীবনের চাকাটাও বদলে গেছে আমূল। তিন বছর আগের সেই অসহায়, এক কাপড়ে ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়া মেয়েটি আজ আর কারোর করুণার পাত্রী নয়। তার সততা আর অক্লান্ত পরিশ্রমের জোরে বেলীর অনলাইনের কাপড়ের ব্যবসা এখন ছাড়িয়ে বাস্তবে রূপ নিয়েছে। শহরের একটা নামী মার্কেটেই সে এখন একটা ছোটখাটো নিজস্ব দোকান দিয়েছে। অনলাইন আর অফলাইন—দুই দিক সামলাতে বেলীকে হিমশিম খেতে হয় ঠিকই, কিন্তু মাস শেষে এখন সে বেশ ভালো অংকের টাকাই ইনকাম করে। নিজের উপার্জনের টাকা দিয়ে মা আর মেয়ের দিনকাল এখন বেশ রাজকীয়ভাবেই কেটে যায়। কারও কাছে হাত পাতার বা মাথা নোয়ানোর প্রয়োজন পড়ে না।
এদিকে গত বছর আয়েশার জীবনেও একটা বড় পরিবর্তন এসেছে। যে গার্মেন্টসে আয়েশা কাজ করত, ওখানকারই এক শান্ত-শিষ্ট, দায়িত্ববান ছেলের সাথে তার বিয়ে হয়ে গেছে। বিয়ে করে আয়েশা এখন নিজের নতুন সংসারে চলে গেছে। অবশ্য এই বিয়েটা বেলীই জোর করে ধুমধাম করে দিয়েছে। নয়তো আয়েশা কিছুতেই বেলী আর ফিওনাকে ছেড়ে যেতে রাজি হচ্ছিল না। আয়েশার মনে হতো, সে চলে গেলে বেলী একা হয়ে যাবে। কিন্তু বেলী তাকে বুঝিয়েছিল, প্রত্যেকেরই নিজের একটা সংসার থাকা দরকার। বিয়ের পর আয়েশা তার স্বামীকে নিয়ে বেশ সুখেই দিন কাটাচ্ছে।
আসলে পৃথিবীর নিয়মটাই এমন, কারো জন্য কোনো কিছু থেমে থাকে না। সময় তার নিজস্ব গতিতে চলে এবং মানুষকেও তার সাথে মানিয়ে নিতে হয়। প্রত্যেকেই যার যার মতো করে নিজেদের জীবনটা সুন্দর করে গুছিয়ে নিয়েছে।
বেলীও আর সেই পুরোনো অতীত আঁকড়ে ধরে রাখেনি। সেই পরিবেশ ছেড়ে সে এখন অনেক দূরে, একটা নিরিবিলি ও ভালো এলাকায় সুন্দর একটা বাড়ি ভাড়া নিয়েছে। নতুন এই বাড়িতে বেলীর পুরোটা পৃথিবী জুড়েই আছে তার মেয়ে ফিওনা। ব্যবসায়ের শত ব্যস্ততার মাঝেও বেলী ফিওনাকে সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখে, তাকে এটা-ওটা শিষ্টাচার ও পড়ালেখা শেখাতে থাকে। এই তো আর কিছুদিন পরেই ফিওনাকে একটা ভালো ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেবে সে।
দরজায় ঝনঝন করে কলিং বেলের আওয়াজ পেতেই বেলী হাতের কাজ রেখে এগিয়ে গেল। দরজা খুলতেই তার মুখে এক চিলতে অমায়িক হাসি ফুটে উঠল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে আদনান—সেই কঠিন দিনগুলোতে যে নিঃস্বার্থভাবে বেলীর পাশে ছায়ার মতো ছিল।
বেলী হাসিমুখে বলল,
“আরে আদনান! কেমন আছো ভাই? কতদিন পর আসলে!”
আদনান ভেতরে পা বাড়াতে বাড়াতে মুখটা একটু গোমড়া করল। কৃত্রিম অভিমানী সুরে বলল,
“তোমার মুখে এই ‘ভাই’ ডাকটা শুনতে একটুও ভাল্লাগে না।”
বেলী স্বভাবসুলভ মিষ্টি হেসে জবাব দিল,
“কেন লাগবে না? তুমি তো আমার নিজের ভাইয়ের মতোই।”
“নিজের ভাই তো আর না!”
আদনান একটু থমকে দাঁড়িয়ে সরাসরি বেলীর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“নাম ধরে ডাকলেই বোধহয় বেশি খুশি হতাম।”
বেলী আর কথা বাড়াল না, শুধু একটু হেসে তাকে ভেতরে আসার তাগিদ দিল,
“আচ্ছা আচ্ছা, অনেক হয়েছে। আগে ভেতরে এসে বসো তো।”
আদনান ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই চার বছরের চঞ্চল ফিওনা এক দৌড়ে এসে ‘মামা!’ বলে আদনানের গলা জড়িয়ে ধরল। আদনান ফিওনাকে কোলে তুলে নিয়ে তার কপালে একটা চুমু খেল। তারপর ফিওনার গাল টেনে দিয়ে বলল,
“তুই আমাকে ‘কাকু’ বা আংকেল বললেও তো পারিস রে ফিওনা? তোর এই মা-ই তোকে জোর করে ‘মামা’ বলা শিখিয়েছে, তাই না?”
ফিওনা আদনানের কোল ঘেঁষে খিলখিল করে হেসে উঠল। বেলী রান্নাঘর থেকে পানির গ্লাস নিয়ে আসতে আসতে বলল,
“তোমাকে আমি যদি ‘ভাই’ বলে ডাকি, তবে সম্পর্কে ও তো তোমাকে ‘মামা’ই বলবে। নাকি অন্য কিছু বলবে?”
আদনান পানির গ্লাসটা হাতে নিয়ে হেসে বলল,
“তোমার যুক্তির সাথে কি আর কেউ কোনোদিন পেরেছে? তোমার সাথে কথায় জেতা অসম্ভব।”
একটু গম্ভীর হয়ে আদনান আসল কথায় এল,
“আসলে একটা বিশেষ দরকারি খবর নিয়ে এসেছি। মাহির বিয়ে! এই নাও বিয়ের কার্ড। মাহি জোর করে বলে দিয়েছে, তুমি যেন কোনোভাবেই মিস না করো। যেতে হবে কিন্তু।”
বেলী বেশ অবাক হয়ে কার্ডটা হাতে নিল। মাহি তো সেদিনও ছোট ছিল! সে পড়াতে যেতো মেয়েটাকে। যদিও ছয় মাসের বেশি পড়ায়নি৷ কুলসুম বেগমের কটু কথা শুনে আর ইচ্ছে হয়নি বেলীর। সে বিস্ময় ভরা গলায় বলল,
”এত দ্রুত মাহির বিয়ে হয়ে যাচ্ছে? ও তো ছোটো!”
আদনান সোফায় হেলান দিয়ে বলল,
“আর দ্রুত কই? এবার উচ্চ মাধ্যমিকে উঠেছে, বয়স আঠারো পার হয়ে গেছে। তাই আর দেরি করতে চাইলাম না। তুমি তো জানোই বস্তির পরিবেশ কেমন! রোজ রোজ যেভাবে সম্বন্ধ আসছিল, কত আর না করা যায়? তাই ভালো একটা ঘর পেয়ে মা আর হাতছাড়া করেনি, রাজি হয়ে গেছে।”
বেলী কার্ডটা উল্টেপাল্টে দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করল,
“তা পাত্রের খোঁজখবর কেমন? ছেলে কী করে?”
আদনান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
“ছেলে খুবই ভালো। একটা সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক।”
বেলীর মুখেও একটা তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সে বলল,
“বাহ্! তাহলে তো বেশ শিক্ষিত মানুষ। মাহির জন্য এর চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে!”
আদনান মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলল,
“হ্যাঁ, ঠিক এই কারণেই মা আর এক মুহূর্তও দেরি করেনি। বোনটা আমার সুখে থাকবে।”
মাহির বিয়ের কার্ডটা টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে বেলী একটু রহস্যময় হাসি হাসল। আদনানের দিকে তাকিয়ে কৌতুকের সুরে বলল,
“তা বোনের বিয়ে তো দিয়ে দিচ্ছ। দেখতে দেখতে তো সবারই বিয়েশাদি হয়ে যাচ্ছে, আয়েশাও পার হয়ে গেল। এবার নিজের কথা কিছু ভাবো। তুমি কবে বিয়ে করছ আদনান?”
বেলীর এই আচমকা প্রশ্নে আদনান যেন কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। হাতের পানির গ্লাসটা সাবধানে টেবিলে নামিয়ে রেখে সে চুপ করে রইল। তার চোখের দৃষ্টিতে এক গভীর নীরবতা নেমে এল, যেন বুকের ভেতরের কোনো সুপ্ত কথা সে ঠোঁটের ডগায় এনেও আটকে রাখলো। আদনানকে এভাবে নীরব থাকতে দেখে বেলী সোফায় একটু এগিয়ে বসল। বড় আপার মতো স্নেহের সুরে বলল,
“কী হলো, চুপ করে আছো কেন? মনে মনে কাউকে পছন্দ করেছ নাকি? যদি কাউকে ভালোবেসে থাকো, তবে নির্দ্বিধায় বলে দিতে পারো। আমি নিজে গিয়ে খালাম্মার সাথে কথা বলব।”
আদনান এবার সোজা হয়ে বসল। বেলীর চোখের দিকে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো—সেই দৃষ্টিতে কোনো লুকোচুরি ছিল না। একটু গভীর শ্বাস নিয়ে আদনান বলল,
“হ্যাঁ মনে মনে একজনকেই চেয়ে এসেছি। এতদিন পরিস্থিতির কারণে, সময়ের অভাবে কিছু বলতে পারিনি। তবে তুমি ঠিকই বলেছ, এখন বোধহয় সময় এসেছে সবকিছু বলে দেওয়ার। খুব শীঘ্রই তাকে মনের কথাটা বলে দেব।”
আদনানের কথার অন্তর্নিহিত অর্থ বেলী কতটা বুঝতে পারল তা জানা গেল না, তবে সে বেশ খুশি হয়ে বলল,
“বাহ্! এটা তো খুব ভালো খবর। তা মেয়েটি কে? আমি কি তাকে চিনি?”
আদনান একটু ম্লান হেসে ফিওনার দিকে তাকাল, যে তখনো আদনানের ঘড়ির চেইনটা নিয়ে খেলছিল। আদনান অস্ফুট স্বরে বলল,
“নিজেকে নিজের চেয়ে ভালো আর কে চিনতে পারে?”
#চলবে
