#মনে_মনে_ব্যাকুলতা ||৬||
#লেখিতেঃশিরিন_পিয়াদা
আলফা খানম অনেক রাত করে বাড়ি ফিরছেন,এটা নতুন না। নিজের ঘরে চেয়ারে বসে জয়নাল শেখ চা খাচ্ছেন আর বই পড়ছেন। আলফা খানম ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আয়নার সামনে বসে নিজেকে পরিপাটি করে নিচ্ছে। তা অবশ্য জয়নাল শেখ বেশ খেয়াল করছেন। বয়স বাড়লেও নিজেকে বয়স্কদের থেকে বেশ সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখেন তিনি। নিজের একটা আলাদা ফ্যাশন আছে বলা যায়। হাতে-পায়ে লোশন মেখে মাথায় চিরুনি করতে করতে বলল,
-“বাহ্ জয়নাল, তুমি দেখি টাকা দিয়ে মেয়ের জামাই কিনে এসেছো! আজকাল ভালোই টাকা দিয়ে মেয়েকে সুখ কিনে দেওয়া হচ্ছে। বাবা হয়ে এমন কী করে পারলে তুমি? আমি মেয়েটাকে দেখভাল করিনি বলে দিনে কত কথাই না শুনিয়েছো, আর আজ মেয়ের মন নিয়ে খেলা করছো! দৌরুতি কিন্তু আর ছোট বাচ্চা নয় যে তুমি তাঁকে ভুলিয়ে ভালিয়ে রাখবে।”
জয়নাল শেখ চোখমুখ কুঁচকে বলল,
-“এই সব বিষয়ে তুমি জানলে কী করে? কে বলছে তোমাকে? বাজে কথা বলবে না, বুঝলে! আর ওরা একে অপরকে ভালোবাসে বলেই আমি নিজ দায়িত্বে কাজি অফিসে ওদের নিয়ে গিয়ে বিয়ে পড়িয়ে এনেছি।”
আলফা খানম তাচ্ছিল্য হাঁসি হেসে বলল,
-“কি পাগল তুমি! ছেলে-মেয়ে সবার কাছে মিথ্যা বলা যায়, কিন্তু ঘরের বউয়ের কাছে যে মিথ্যা বললে একদিন ধরা পড়তেই হবে,এটা তোমাকে কেউ বলেনি? শোন জয়নাল, ব্যাংক থেকে টাকা তুলেছো। ব্যাংকের লোকদের বলে আসতে তো পারতে! এতগুলো টাকার ব্যাপার লুকাতে তো আর পারলে না তুমি।”
জয়নাল শেখ ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
-“ওই টাকাগুলো আমার, তাই আমার প্রয়োজন পড়েনি আমি কাকে বলে খরচ করব। আর আমি আমার মেয়ের জন্য সব করতে পারি, আলফা। আর তুমিও তো ছোট ওই টাকার পেছনে পেছনে। মনে রাখো একদিন ক্লান্ত হয়ে আমাদের কাছেই তোমাকে ফিরতেই হবে, আরো মনে রেখো, টাকা সব না কিন্তু!”
আলফা খানম জয়নাল শেখের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“আমি টাকা ঘরে তুলে আনছি আর তুমি টাকা দিয়ে মেয়ের জন্য মিথ্যা সম্পর্ক গড়ে তুলছো। মা হয়ে তার কখনো খারাপ চাইনি, কিন্তু! হ্যাঁ, তার থেকে সব সময় দূরে থেকেছি। কখনো এমন কিছু হয়তো করিনি যাতে তাকে কষ্ট পেতে হয়। কষ্ট পাবে কেন? আমি তো কখনো তার কাছেই বসিনি। আর তুমি কী করলে, মেয়েটার সব থেকে আপন মানুষ হয়ে তাকে ডুবিয়ে দিলে! কখনো ভেবে দেখেছো, দৌরুতি ভালোবাসার মানুষ পেলেও মানুষটা তাকে ভালোবাসল কি না? এই ধরনের সম্পর্ক পাওয়ার থেকে না পাওয়াই ভালো আমার কাছে মনে হয় ।যাই হোক, আর এই ছেলেটাই বা কেমন? ছেলেটার বোন যখন বাঁচবেই না, কেন এত টাকা খরচ করে সে বোকার মতো হাসপাতালে ফেলে রেখেছে? বিরক্তিকর, বোকা সব!”
জয়নাল শেখ এই কথা শুনে রাগি মুখে তাচ্ছিল্য হাসি হেসে বলল,
-“তুমি সম্পর্কে রেখেছো নামে। তুমি নিজের স্বার্থে আমাকে বিয়ে করেছো, আলফা। তুমি রক্তের টান মানে বুঝবে না। ও হ্যাঁ, তুমি বুঝবে কী করে,তোমার তো আপন কেউ হারায়নি আজ পর্যন্ত! তুমি কি বলতে চাইছো, তৌকির জানে ওর বোন মারা যাবে, এর পরেও বেঁচে থাকা মানুষকে বিনা চিকিৎসায় মেরে ফেলবে? আমি বললাম না, তুমি ভালোবাসা, মায়া, টান—এগুলো কখনো ফিল করতে চাওনি। তবে আমারও ভরসা একটা জায়গায়, যে ছেলেটা তার বোনকে এত ভালোবাসতে পারে, না জানি আমার মেয়েটাকে কতোই না ভালোবাসলে কী কী করবে! আমি বিশ্বাস করি, একটা সময়ে আমার মেয়ে অনেক সুখী হবে। তাই বলছি, এসব নিয়ে আর কথা বলবে না। আর রইল আমার টাকার কথা, ওগুলো আমার টাকা। মানে আমার মেয়ে-জামাইয়ের টাকা। ওরা ইচ্ছে মতো খরচ করতে পারে। এতে আমার বিন্দু পরিমাণ আফসোস হবে না।”
আলফা খানম আর কিছু বলতে পারলেন না। দুজন দুজনকে কিছুক্ষণ দেখে নিল।
—————-
সকালে ঘুম ভাঙার পরপর তৌকির আর দৌরুতি একসঙ্গে নাস্তা করে নিলো। যাওয়ার পথে তৌকির দৌরুতিকে বলে যায়, রেডি হয়ে থাকতে। বিকেলের দিকে তারা বেরিয়ে পড়বে জেসমিনকে দেখতে যেতে।
বরাবরের মতোই আজও যে যার মতো ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করে বেরিয়ে পড়েছে। কিন্তু কাফেল দৌরুতির খাবার টেবিলে সামনাসামনি বসে একে অপরকে চোখে চোখে ইশারা করছে কিছু বলার জন্য। দৌরুতি তো তার বাবার উপর আগে থেকেই অভিমান জমে রেখেছে। তাই সে কাফেলকে বারবার ইশারা করে বলছে,
-“সে এই সব কথা বলতে পারবে না।”
কাফেল তবুও তার পিছু ছাড়ছে না। জয়নাল শেখ তাদের এমন অদ্ভুত আচরণ দেখে একবার বলেছিলেন,
-“কিছু বলবে তোমরা?”
কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারেনি। সারাদিন এই করেই কেটে গেছে। কাফেল বেশ বিরক্ত হয় এবার দৌরুতির উপর। শেষমেশ হার মেনে ঘরে ফিরে, তারপর বন্ধুদের সঙ্গে বাইক রেসে বেরিয়ে পড়ে। তার খেয়ে-দেয়ে কাজকাম নেই বললেই চলে। সারাদিন বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে রাতে ঘরে ফিরে। অডগুটে কাজের জন্য বাবা জয়নাল শেখ কিছুটা অপছন্দের তালিকায় রেখেছে তাকে। ভালোবাসো ও খুব আদরের মেয়ে দৌরুতি, নয়তো সব ছেলের মধ্যেই কিছু না কিছু ঘাপলা আছে বা ছিল। এই তো ছোট ছেলের জন্য একবার পুলিশ স্টেশনে যেতে হয়েছিল। আর বড় ছেলে অন্যের মেয়েকে পালিয়ে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করে ফেলেছে। আর কাফেল তো মাঝে মাঝে মদ-মাদকে আসক্ত বলা চলে। রাতে ক্লাবেও কাটায় মাঝে মাঝে, অনেক রাত করে বাড়ি ফেরে সে।
এত কিছু করেও কাফেলের লাভ হয় না। বাবার আর মেয়ের মন গলাতে পারে না, তার কাজও হাসিল হয় না।
————–
বিকেলে দৌরুতি গোলাপের রঙের আচলে সিলভার কাজ করা শাড়ি পরে, হাতে চুড়ি, কপালে টিপ পরে বেশ সেজেগুজে রেডি হয়ে গেছে। আর এটাও ভাবছে’ -এতে কি তাকে খারাপ দেখাচ্ছে? সে কি বেশি সেজে ফেলেছে নাকি? কী আজব! সে কারো বিয়ে খেতে যাচ্ছে নাকি? ঘুরতেও তো যাচ্ছে না সে! এই সব ভেবে অস্থিরতা কাজ করছে তার মধ্যে। পায়চারি ও করে বেশ কিছুক্ষণ ধরে। তবুও বুকের একপাশে ধুকধুক বেড়েই চলেছে তার। আবার ভাবছে, পোশাক কি পরিবর্তন করা উচিত তার? তৌকির কি ভাববে,তার অসুস্থ বোনের জন্য তো তাকে নিয়ে যাচ্ছে!
এই সব ভাবতে ভাবতেই তৌকির চলে আসে। আর ঘরে এসেই কোনো কথা না বলে দৌরুতিকে দ্রুত বলে ফেলে,
-“কই, হয়েছে তোমার? এবার আমরা যেতে পারি। বেশি সময় থাকা যাবে না। এই তিন ঘণ্টার ছুটিতে আসলাম, আবার যেতে হবে রেস্টুরেন্টে।”
এই বলার সময় একবারও তৌকির দৌরুতির দিকে তাকিয়ে দেখল না বা খেয়াল করল না। তা দেখে দৌরুতি নিজেই তৌকিরের কাছে গিয়ে তার শার্ট খামচে ধরে ইশারা করে বলল, তাকে এই পোশাকে একদম মানাচ্ছে না। আর একটু সময় কি সে দেরি করবে? তাহলে পোশাক চেঞ্জ করত।
তৌকির এবার দৌরুতির দিকে তাকিয়ে পর্যবেক্ষণ করে নিল, আর বলল,
-“এই সাজ ঘরে মানায়, বাইরে না। এমন সাজ নিজের স্বামীর জন্য তুলে রাখা উচিত । তোমাদের বাড়ির কেউ হয়তো জানে না, মেয়েদের বাইরে বের হলে পর্দা করে বেরোতে হয়। যাই হোক, বোরখা আছে?”
এমন প্রশ্নে দৌরুতি তৌকিরকে হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে আলমারিতে রাখা অনেক রঙিন সব গুলো টপ আর বোরখা দেখাল, যেগুলোতে চকচকে জরির কাজ করা। তৌকিরের এই সব ভালো লাগল না।
দৌরুতি তার চোখমুখ দেখেই বুঝতে পারল। তাই সে সাধারণ একটা টপ আর ওড়না দিয়ে হিজাব বেঁধে রেডি হলো।
সে ইশারা করে তৌকিরকে বলল,
-“আমার জামাকাপড়ের মূল্য বেশি হলেও দেখতে মোটেও ভালো নয়। তুমি কি তোমার কম রুজগারে একটা সস্তা বোরখা কিনে দেবে আমায়? আমি যত্ন করে রেখে দেব।”
তৌকির তার ইশারা না বোঝার ভান করে তাকে হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল।
চলবে…
