#পাথরের_রাজপ্রাসাদ
#পর্ব_৫
#আরিবা_নাওশীন
সকাল থেকেই বনির মেজাজ সপ্তমে চড়ে আছে। ব্রেকফাস্ট টেবিলে বনি যখন খবরের কাগজটা ভাঁজ করে রাখছিল, তখন তার চোখেমুখে এক ধরণের ক্রুর আনন্দ খেলা করছিল। আজ সকালে সে ইরাকে কোনো গালাগাল দেয়নি, এমনকি মা-রধরও করেনি আর এই অস্বাভাবিক নীরবতা ইরাকে আরও বেশি আতঙ্কিত করে তুলছে।
বনি কফি শেষ করে ইরার খুব কাছে এসে দাঁড়াল। তার গা থেকে আসা দামী আফটারশেভের কড়া গন্ধে ইরার দম বন্ধ হয়ে আসছে। বনি তার চুলে আলতো করে হাত বুলিয়ে বলল, “আজ একটা সারপ্রাইজ আছে মেহেরিন। তোমার ওই পুরনো বন্ধু, যে এখন বিসিএস ক্যাডার হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে আরিফ সাহেব তাকে আজ ইনভাইট করেছি আমার ব্যক্তিগত এক কাজে। আমি চাই আমার স্ত্রীকে দেখে যেন তার চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। ভালো করে সাজো আজ।”
ইরার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল। বনি কেন আরিফকে ডাকবে? সে কি তবে সব জেনে গেছে? নাকি এটা নতুন কোনো নির্যাতনের নীল নকশা?
একই সময় আরিফ তার অফিসে বসে ফাইলের পর ফাইল সই করছিল। তার মাথার ভেতর তানিয়ার সকালের সেই কথাগুলো তীরের মতো বিঁধছে। তানিয়া তাকে আজ বলেছে “আরিফ, আমার বাবার ব্যবসায় নাকি একটু লস হচ্ছে। তুমি কি তোমার ক্ষমতার জোরে সেই ফাইলটা একটু পাশ করিয়ে দিতে পারো না? তোমার ওই সততা দিয়ে তো আমার দামী শাড়ি আসবে না!”
আরিফ ফাইলটা সরিয়ে দিয়ে নিজের কপালে হাত রাখল। তানিয়ার লোভ এখন পারিবারিক গণ্ডি ছাড়িয়ে দুর্নীতির দিকে মোড় নিচ্ছে। ঠিক তখনই তার ফোনে একটা মেসেজ এল। বনি আমিনের মেসেজ। বনি তাকে আজ রাতে তার বাসায় ডিনারের নিমন্ত্রণ জানিয়েছে।
আরিফ জানত এটা একটা ম-রণফাঁদ। কিন্তু ইরার সেই বিধ্বস্ত মুখটা দেখার পর থেকে সে স্থির থাকতে পারছে না। তাকে যেতেই হবে। হয়তো এটাই সুযোগ ইরাকে এক নজর দেখার।
রাত ন’টা। বনির ড্রয়িংরুমটা সুগন্ধি মোমবাতির আলোয় সাজানো। ইরা পরনে ভারি নীল সিল্কের শাড়ি, গলায় হীরা আর মুক্তার সেট। বনি তাকে রাজকুমারীর মতো সাজিয়েছে ঠিকই, কিন্তু ইরার মনে হচ্ছে সে যেন কোরবানি দেওয়ার জন্য সাজানো কোনো পশু।
আরিফ যখন বেল বাজিয়ে ভেতরে ঢুকল, তখন বনি তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাল। বনি আরিফের পিঠে হাত রেখে অট্টহাসি দিয়ে বলল, “আরে আরিফ সাহেব! আসুন আসুন। আপনার কথা তো আমার স্ত্রী মাঝে মাঝেই বলে। আপনি নাকি ওর কলেজের খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন?”
আরিফের চোখ সরাসরি গিয়ে পড়ল ইরার ওপর। সেই একই চোখ, সেই মায়া কিন্তু সেখানে আজ আত্মবিশ্বাসের বদলে জমাটবদ্ধ আতঙ্ক। ইরা পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। সে আরিফের দিকে তাকাতে পারছে না।
তানিয়াও সাথে এসেছে। সে ড্রয়িংরুমের আসবাবপত্র আর ইরার গয়নার দাম মনে মনে হিসাব করতে ব্যস্ত। তানিয়া ইরার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলল, “মেহেরিন আপু, আপনার কপালটা তো বেশ ভালো! ভাইয়া আপনাকে এত দামী গয়নায় সাজিয়ে রেখেছেন। আমাদের আরিফ তো কেবল ফাইল নিয়েই ব্যস্ত থাকে।”
খাবার টেবিলে বনি ইচ্ছাকৃতভাবে ইরার ওপর তার মালিকানা জাহির করতে লাগল। সে বারবার ইরার পাতে খাবার তুলে দিচ্ছিল আর বলত “আমার বউটা একদম খেতে চায় না আরিফ সাহেব। আমি ছাড়া ওকে সামলানোর মতো কেউ নেই। আপনি তো জানেনই, অবলা নারীদের একটু শাসনে আর আদরে রাখতে হয়।”
আরিফের হাতের মুঠো শক্ত হয়ে আসছিল। সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে ইরার কব্জিতে মেকআপের নিচ দিয়ে উঁকি দেওয়া সেই কালশিটে দাগ। বনি যে ইচ্ছে করেই আরিফকে ডেকে এই দৃশ্য দেখাচ্ছে, তা বুঝতে আর বাকি নেই।
ডিনার শেষে ড্রয়িংরুমে যখন পুরুষেরা আলাদা হলো, তখন তানিয়া বাথরুমে যাওয়ার বাহানায় সরে গেল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য ইরা আর আরিফ একা হয়ে পড়ল।
আরিফ নিচু স্বরে দ্রুত বলল, “ইরা, তুমি কি ঠিক আছো? তোমার কব্জিতে ওটা কিসের দাগ?”
ইরা আঁতকে উঠে নিজের আঁচল দিয়ে হাতটা ঢাকল। চোখভর্তি পানি নিয়ে কাঁপা গলায় বলল, “আপনি কেন এসেছেন আরিফ? প্লিজ চলে যান। ও আপনাকেও শেষ করে দেবে। আমরা এখন দুই মেরুর মানুষ। আমাদের মাঝে এই পাথরের রাজপ্রাসাদ কোনোদিন ভাঙবে না।”
আরিফ কিছু বলতে চাইল, কিন্তু ঠিক তখনই বনি ঘরে ঢুকল। তার হাতে একটা ক্যামেরা। বনি মৃদু হেসে বলল, “আরিফ সাহেব, একটা গ্রুপ ছবি হয়ে যাক? স্মৃতি হিসেবে থাকবে।”
বনি যখন ইরার কাঁধে তার শক্ত হাতটা রাখল, ইরা শিউরে উঠল। সে বুঝল, এই রাতের শেষে তার জন্য নতুন কোনো নরক অপেক্ষা করছে। আর আরিফ বুঝল, ভালোবাসা রক্ষা করার জন্য শুধু চাকরি আর টাকাই যথেষ্ট নয়, দরকার ছিল সেই সময়টার যা সে হারিয়ে ফেলেছে।
আরিফ আর তানিয়া বিদায় নেওয়ার পর বাড়িটা যেন শ্মশানের মতো নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কিন্তু এই নিস্তব্ধতা কোনো শান্তির বার্তা নয়, বরং এক প্রলয়ংকরী ঝড়ের পূর্বাভাস। বনি ড্রয়িংরুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ধীরেসুস্থে তার গায়ের টাইটা খুলল। তার চোয়াল শক্ত, চোখে এক ধরণের আদিম হিংস্রতা।
সে ইরার দিকে না তাকিয়েই বরফশীতল গলায় বলল, “মেহেরিন, তোমার পুরনো প্রেমিকের সামনে খুব তো সতী সাজলে। ভাবলে আমি কিচ্ছু বুঝিনি? ওর চোখের দিকে যখন তাকিয়েছিলে, তখন মনে হচ্ছিল সব ভুলে ওর বুকে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে, তাই না?”
ইরা সোফার এক কোণে গুটিসুটি মে-রে বসে থরথর করে কাঁপছিল। সে ক্ষীণ স্বরে বলল, “বিশ্বাস করো বনি, আমি একটা কথা ছাড়া আর কিছুই বলিনি। উনি শুধু জানতে চেয়েছিলেন আমি কেমন আছি…”
“থাম!”বনির প্রচণ্ড একটা চিৎকার দেয়ালের প্রতিটি ইটে যেন প্রতিধ্বনিত হলো। সে এক ঝটকায় ইরার চুল মুঠো করে ধরল। “কেমন আছিস তা ও জানতে চায়? তোর শরীরের প্রতিটি দাগ বলে দিচ্ছে তুই কেমন আছিস। আর এটাই তোর কপাল মেহেরিন। তুই রাজপ্রাসাদে আছিস, কিন্তু আমার কেনা বান্দী হয়ে থাকবি।”
অন্যদিকে, ফেরার পথে গাড়িতে তানিয়া আরিফকে বিঁধতে ছাড়ল না। সে মুখ বাঁকিয়ে বলল, “আরিফ, তোমার ওই বান্ধবীর গয়নাগুলো দেখেছো? আর ওর স্বামী বনি ভাই কত স্মার্ট! আর তুমি? ডিনারে পুরো সময়টা এমন মুখ করে ছিলে যেন কেউ তোমাকে জোড় করে বিষ খাইয়েছে। তোমার ওই পুরনো প্রেমটা এখনো ভেতরে গজগজ করছে না তো?”
আরিফ স্টিয়ারিং হুইলটা এত জোরে চেপে ধরল যে তার হাতের রগগুলো ফুলে উঠল। সে তানিয়ার দিকে না তাকিয়েই শান্ত অথচ কঠোর গলায় বলল, “তানিয়া, আজ রাতটা অন্তত চুপ থাকো। টাকা আর স্মার্টনেস দিয়ে যে পশুত্ব ঢাকা যায় না, সেটা তোমার মতো লোভী নারী কোনোদিন বুঝবে না।”
তানিয়া স্তম্ভিত হয়ে গেল। আরিফ তাকে সচরাচর এভাবে উত্তর দেয় না। আরিফের ভেতরের শান্ত সমুদ্রটা আজ উত্তাল হতে শুরু করেছে।
বাসায় ফিরে আরিফ আয়নার সামনে দাঁড়াল। তার চোখে ভাসছে ইরার সেই আর্তনাদভরা চাহনি। সে ভাবছে, সে কি আসলেই কিছু করতে পারবে না? একজন ক্যাডার অফিসার হয়েও সে কি সমাজের তথাকথিত ‘সংসার’ নামক এই কারাগার ভাঙার ক্ষমতা রাখে না?
আরিফ আজ বুঝতে পেরেছে, সে চাকরি পেয়েছে, টাকা পেয়েছে, কিন্তু নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছে। তানিয়া তাকে কেবল একটা দামী শোপিস হিসেবে ব্যবহার করছে, ঠিক যেভাবে বনি ইরাকে করছে। তফাৎ শুধু এটাই আরিফকে শারীরিকভাবে আঘাত করা হয় না, কিন্তু মানসিকভাবে প্রতিদিন তার আত্মাকে ছিঁড়ে খাওয়া হয়।
বনির ঘরে তখন অত্যা-চারের উৎসব চলছে। বনি ইরার হাতটা মুচড়ে ধরে বিছানায় ছুড়ে ফেলল। ইরার নীল সিল্কের দামী শাড়িটা আজ তার কাছে কাফনের কাপড়ের মতো মনে হচ্ছে।
বনি তার কানে মুখ ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আরিফ সাহেব তো বড় সরকারি অফিসার হয়েছেন। দেখা যাক, ও কি পারে ওর সেই পুরনো রানীকে আমার হাত থেকে বাঁচাতে। কাল সকালে তোর বাপের বাড়ি যাওয়ার সব রাস্তা আমি বন্ধ করে দেব। তুই এই ঘরেই পচে ম-রবি।”
ইরা আর কাঁদছে না। সে শুধু সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ভাবছে, মানুষের দেওয়া এই পাথরের রাজপ্রাসাদ আসলে কত বড় একটা মিথ্যা। বাইরে থেকে সবাই যাকে সাফল্য ভাবে, ভেতরে তা আসলে এক একটা জীবন্ত সমাধি।
আরিফ আর ইরা দুজনই আজ হার মেনে যাওয়া দুই সৈনিক। একজনের কাছে ক্ষমতার চাবিকাঠি আছে কিন্তু মায়া নেই, আর অন্যজনের কাছে মায়া আছে কিন্তু মুক্তি নেই।
চলবে,,,,
