Friday, June 5, 2026







পাথরের রাজপ্রাসাদ পর্ব-৩+৪

#পাথরের_রাজপ্রাসাদ
#আরিবা_নাওশীন
#তৃতীয়_পর্ব

রাত দশটা। ডিআইজি সাহেবের ড্রয়িংরুমটা দামী ঝাড়লণ্ঠনের আলোয় ঝলমল করছে। চারদিকে আভিজাত্যের গন্ধ। বনি সাহেব গ্লাস হাতে তার কলিগদের সাথে অট্টহাসিতে মেতে আছে। আলোচনার বিষয় কার প্রমোশন আগে হবে, কে নতুন পাজেরো কিনল আর কার কত প্রতিপত্তি।

ইরা এক কোণে সোফায় বসে আছে। তার ঠোঁটে এক চিলতে কৃত্রিম হাসি, যা দেখলে মনে হবে সে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী নারী। পাশে বসে থাকা অন্য এক অফিসারের স্ত্রী সুয়া ভাবি ইরার হীরা বসানো নেকলেসের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ইরা ভাবি, তোমার নেকলেসটা তো দারুণ! বনি ভাই তো তোমাকে একদম রানীর মতো রাখে, তাই না? আমরা তো এমন গিফট বছরের একদিনও পাই না।”

ইরা মৃদু হেসে মাথা নিচু করল। সে মনে মনে ভাবল, “ভাবি, আপনি শুধু হীরার চমকটাই দেখলেন? এই নেকলেসটা গলায় পরানোর সময় বনি আমার ঘাড়ে যে নখের আঁচড়টা দিয়েছিল, সেটা তো দামী মেকআপে ঢাকা পড়ে আছে।”

এই সমাজের মানুষ চকমক করা পাথর চেনে, কিন্তু পাথরের চাপে পিষ্ট হওয়া মনটা কারোর নজরে আসে না।

ডিনার টেবিলে বসে বনি তার দাপট দেখানোর সুযোগ ছাড়ল না। মেনু নিয়ে আলোচনা করার সময় সে হঠাৎ ইরার দিকে তাকিয়ে সবার সামনে বলে উঠল, “মেহেরিন তো আবার একটু সেকেলে। গ্রামের দিককার মেয়ে তো, এখনো ঠিকঠাক কাঁটাচামচ দিয়ে পাস্তা খেতে শিখল না। তাই না মেহেরিন?”

টেবিলের সবাই হাহা করে হেসে উঠল। ইরা প্লেটের দিকে তাকিয়ে রইল। বনি তাকে ছোট করে আনন্দ পায়। সবার সামনে তার আত্মসম্মান নিয়ে খেলা করাটা বনির জন্য একটা বিনোদন। অথচ এই বনিই বিয়ের আগে বলেছিল, “মেহেরিনের সারল্যই আমার পছন্দ।”

সেই সারল্য এখন বনির কাছে ‘ক্ষ্যাত’ আর ‘সেকেলে’ বলে মনে হয়। বনি যখন অন্য নারীদের সাথে ফ্লার্ট করে হাসাহাসি করে, ইরার তখন বুকটা ফেটে যায়। কিন্তু প্রতিবাদের কোনো অধিকার তার নেই। বনি তাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, “আমি বড় চাকরি করি, আমার স্ট্রেস রিলিফ করার জন্য আমি যা খুশি করব। তুমি শুধু আমার ঘর আর সম্মান সামলাবে।”

রাত বারোটার পর বাড়ি ফিরে বনি সরাসরি নিজের ঘরে চলে গেল। ইরা যখন রান্নাঘরে গ্লাস রাখতে যাচ্ছিল, দেখল তার শ্বশুর আফজাল সাহেব বারান্দায় অন্ধকারে একা বসে আছেন।

ইরা কাছে যেতেই তিনি নিচু স্বরে বললেন, “বউমা, আজও কি বনি তোমার গায়ে হাত তুলেছে?”

ইরা চমকে উঠল। সে ভাবেনি এই বাড়ির কেউ তার নীরব চিৎকার শুনতে পায়। আফজাল সাহেব একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আমি জানি মা, তুমি খুব কষ্টে আছো। বনিটা ছোটবেলা থেকেই জেদী আর অহংকারী। ওর মা ওকে প্রশ্রয় দিয়ে দিয়ে দানব বানিয়েছে। আমি তো অপদার্থ বাবা, তোমার জন্য কিছুই করতে পারি না। শুধু দোয়া করি, আল্লাহ যেন তোমাকে সহ্য করার শক্তি দেন।”

ইরা কিছু বলল না। শ্বশুরের এই অসহায়ত্বের কাছে সে কি বিচার দেবে? এই বাড়িতে মায়া আছে, কিন্তু সেই মায়ার কোনো ক্ষমতা নেই। ক্ষমতা আছে শুধু বনির টাকার আর তার পদের।

সবাই ঘুমিয়ে পড়লে ইরা ড্রয়ারের একদম নিচে লুকানো আরিফের সেই শেষ চিঠিটা বের করল। চিঠিটা ভাঁজ হতে হতে ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম। সেখানে আরিফ লিখেছিল

“ইরা, আমি জানি আজ আমার পকেটে তোমার বাবার চাহিদামতো টাকা নেই। কিন্তু আমি সারাজীবন তোমাকে আমার বুকের বাম পাশে আগলে রাখতাম। কোনোদিন তোমার চোখের কোণে এক ফোঁটা জল আসতে দিতাম না। কিন্তু ভাগ্যের খেলায় আমি তোমায় পেলাম না। তোমার কোনো দোষ নেই, হয়তো আমিই কোনো পাপ করছিলাম যার কারণে এই অপূর্ণতা নিয়ে বেচে থাকার শাস্তি হলো আমার।”

ইরা চিঠিটা বুকে চেপে ধরল। তার মনে হলো, আরিফ হয়তো তাকে এসি রুম দিতে পারত না, কিন্তু তাকে ‘মানুষ’ হিসেবে সম্মান দিত। আরিফ তাকে শুধু ভোগ করার বস্তু মনে করত না, মনে করত তার অস্তিত্বের অংশ।

বনির দামী বিছানায় শুয়েও ইরার মনে হয় সে কোনো এক নোংরা বস্তিতে পড়ে আছে। যেখানে তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। বনি যখন ঘুমের ঘোরেও তার হাতটা জড়িয়ে ধরে, ইরার মনে হয় কোনো এক অজগর তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে পেঁচিয়ে ধরছে।

হঠাৎ বনি ঘুমের ঘোরেই কর্কশ গলায় বলল, “কাল সকালে আমার নীল শার্টটা যেন আয়রন করা থাকে। আর মেহেরিন, তোমার ওই বাপের বাড়ির সাথে যোগাযোগ একটু কমাও। ওসব ছোটলোকদের সাথে মেলামেশা করলে তোমার আভিজাত্য নষ্ট হয়।”

ইরা অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ফেলল। তার নিজের বাবা-মাও এখন তার কাছে পর হয়ে গেছে। কারণ তারা মনে করে, মেয়ে তো রাজপ্রাসাদে আছে, তার আবার দুঃখ কিসের?

বাস্তবতা হলো, এই রাজপ্রাসাদ আসলে একটা কবরস্থান। যেখানে প্রতিদিন একটা মেয়ের স্বপ্ন, ইচ্ছা আর হাসিগুলোকে জ্যান্ত কবর দেওয়া হয়। ইরা ভাবছে, সে কি এভাবেই সারাজীবন অভিনয় করে যাবে? নাকি এই পাথরের রাজপ্রাসাদ ভেঙে বেরিয়ে আসবে কোনো একদিন?

ভোরের আলোটা ঠিকমতো ফোটেনি এখনো। রান্নাঘরে চায়ের কেতলি বসিয়ে দিয়ে জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে ইরা। সারা রাত এক ফোঁটাও ঘুমাতে পারেনি সে। গতকাল ডিনার থেকে ফেরার পর বনি আবারও ক্ষেপে গিয়েছিল। কারণ? ডিআইজি সাহেবের স্ত্রী ইরার রান্নার খুব প্রশংসা করেছিলেন। বনির অহংকারে লেগেছে তার স্ত্রীর হাতের স্বাদ কেন অন্য কেউ জানবে? তার কাছে স্ত্রী মানে হলো অন্দরমহলের দাসী, যার গুণের প্রচার বাইরের জগতে হওয়া নিষিদ্ধ।

বনি রাগের মাথায় ইরার চুল মুঠি করে ধরে বলেছিল, “বেশি ঢং দেখানোর দরকার নেই। রান্নাবান্না পারো সেটা ঘরেই সীমাবদ্ধ রাখো। বাইরে গিয়ে অত নমনীয় সাজার চেষ্টা করবে না।”

ইরার মাথার তালুটা এখনো চিনচিন করছে। আয়নায় সে দেখেছে, চুলের গোড়াগুলো লাল হয়ে ফুলে আছে। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো, এখন আর তার কান্না পায় না। তার কান্নাগুলো বোধহয় শুকিয়ে পাথর হয়ে গেছে ঠিক এই বাড়িটার মতো।

সকালে মা ফোন করেছিলেন। ইরা ভেবেছিল মাকে সব বলবে। কিন্তু মায়ের প্রথম কথাটাই ছিল

“কীরে ইরা, ভালো আছিস তো? জামাই কেমন আছে? তোর বাবা তো সারাদিন পাড়ায় গল্প করে বেড়ায়, তার জামাই নাকি এ মাসেও বড় ইনক্রিমেন্ট পেয়েছে। আমাদের মুখটা তো তুই-ই উজ্জ্বল করলি মা। শত হলেও সরকারি অফিসারের বউ, কত মানুষের খাতির পাস!”

ইরা বলতে চেয়েছিল “মা, এই খাতিরের বদলে আমি যদি শুধু একটু শান্তি পেতাম?”

কিন্তু সে বলতে পারল না। সে জানে, তার এই কষ্টের কথা শুনলে বাবার প্রেশার বেড়ে যাবে, মা দুশ্চিন্তায় অসুস্থ হবেন। আর সমাজ? সমাজ বলবে “নিশ্চয়ই মেয়েরই কোনো দোষ আছে, নইলে এমন জামাই কি আর সাধে ম-ারে? সমাজ তো আগে মেয়েদের দোষই দেখে।”

ইরা কেবল গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসা কান্নাটা গিলে নিয়ে বলল, “হ্যাঁ মা, ভালো আছি। বনিও ভালো।”

নাস্তার টেবিলে বনি যথারীতি গম্ভীর। সে ইরার দিকে তাকিয়েও দেখছে না। রেখা বেগম প্লেটে ডিম সেদ্ধ নিতে নিতে বললেন, “বৌমা, বনির শার্টগুলো কি ড্রাই ওয়াশ থেকে এসেছে? ওর তো আজ একটা ইম্পর্ট্যান্ট মিটিং আছে। আর শোনো, বিকেলে আমার সাথে এক জায়গায় যেতে হবে। তোমার ওই ভারী গয়নাগুলো পরে নিও। আমার বান্ধবীদের দেখাবো বনি তার বউকে কত দামী জিনিস দেয়।”

ইরা মনে মনে হাসল। এই পরিবারে সে কোনো মানুষ নয়, বরং তাদের আভিজাত্য প্রদর্শনের একটা মাধ্যম। তারা তাকে গয়না দেয়, দামী শাড়ি দেয় কিন্তু একবারও জিজ্ঞেস করে না সে রাতে ঘুমাতে পেরেছে কি না।

দুপুরের দিকে বনির কিছু ফাইল অফিসে পৌঁছে দেওয়ার দরকার পড়ল। বনি নিজেই ফোন করে হুমকি দিল, “আধা ঘণ্টার মধ্যে ড্রাইভারের সাথে ফাইল পাঠিয়ে দাও। দেরি হলে কিন্তু খবর আছে।”

ইরা ফাইলগুলো নিয়ে নিজেই বের হলো, একটু বাইরের বাতাস নেওয়ার লোভে। অফিসের গেটে ফাইলটা ড্রাইভারের হাতে দিয়ে সে যখন গাড়িতে উঠতে যাবে, তখনই তার নজর গেল রাস্তার ওপারে।

একটা ট্যাক্সি থেকে নামছে একজন সুদর্শন যুবক। হাতে ল্যাপটপ ব্যাগ, চোখে চশমা। ইরা মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। বুকটা ধক করে উঠল তার। এ কি সেই আরিফ?

হ্যাঁ, সেই চিবুক, সেই চোখের চাহনি। কিন্তু আগের সেই মলিনতা আর নেই। আরিফ এখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। সে বোধহয় এখন বিসিএস ক্যাডার বা বড় কোনো পজিশনে আছে। আরিফ ট্যাক্সি ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে ঘুরে দাঁড়াতেই তার চোখ পড়ল ইরার ওপর।

দুজনের মাঝখানে পিচঢালা রাস্তার ব্যবধান, কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের জন্য সময় যেন থমকে গেল। আরিফের চোখে সেই পুরনো মায়াটা এখনো আছে, যা দেখে ইরার মনে হলো সে এই মুহূর্তেই সব আভিজাত্য ফেলে দিয়ে ওই রাস্তার ওপারে দৌড়ে চলে যায়।

আরিফ শুধু ঠোঁট নাড়িয়ে কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু ঠিক তখনই বনির অফিসের পিয়ন এসে ডাকল “ম্যাডাম, স্যার আপনাকে ভেতরে ডাকছেন।”

ইরার ঘোর কাটল। সে দেখল আরিফ ধীরপায়ে তার দিকেই এগিয়ে আসছে। ইরার হাত-পা কাঁপতে শুরু করল। বনি যদি দেখে ফেলে আরিফের সাথে সে কথা বলছে, তবে আজ রাতে তার কপালে কী জুটবে সেটা ভেবেই সে শিউরে উঠল।

বনি অফিসের জানালা দিয়ে নিচে তাকিয়ে ছিল। সে দেখল তার স্ত্রী এক অপরিচিত যুবকের দিকে তাকিয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। বনির চোয়াল শক্ত হয়ে এল। তার ভেতরে থাকা সেই টক্সিক দানবটা আবার জেগে উঠল।

ইরা গাড়িতে উঠে বসল ঠিকই, কিন্তু তার কানে বাজছে আরিফের সেই পুরনো কথাগুলো “ইরা, পরিস্থিতি বদলে যাবে একদিন।”

বাস্তবতা হলো, পরিস্থিতি বদলেছে ঠিকই। আরিফ আজ প্রতিষ্ঠিত, আর ইরা আজ এক সরকারি গেজেটেড অফিসারের ঘরে ‘রানী’ হয়ে বন্দি। কিন্তু এই রানীর শরীরের নীল দাগগুলো কেউ দেখতে পায় না।

(চলবে…)

#পাথরের_রাজপ্রাসাদ
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_৪

রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা আরিফের অবয়বটা ক্রমশ আবছা হয়ে আসছে। গাড়ির কালো কাঁচের আড়ালে ইরা তার চোখ দুটো লুকানোর বৃথা চেষ্টা করল। তার মনে হলো, আরিফ শুধু রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে নেই, সে দাঁড়িয়ে আছে এক দুর্ভেদ্য দেয়ালের ওপারে যে দেয়ালটা ইরা নিজের হাতে গেঁথেছে তার বাবার মান সম্মানের কথা ভেবে।

কিন্তু ইরা জানত না, এই চকমক করা সাফল্যের আড়ালে আরিফও একটা ভাঙা হৃদয়ের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে।

আরিফ এখন বিসিএস ক্যাডার। তারও বিয়ে হয়েছে প্রায় বছর দেড়েক আগে। স্ত্রী তানিয়া এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর মেয়ে। আরিফ যখন বেকার ছিল, তখন সে চেয়েছিল শুধু মায়া। আর আজ যখন তার পদমর্যাদা আছে, তখন সে যার সাথে ঘর করছে, সেই তানিয়া চেনে শুধু টাকা আর সোশ্যাল স্ট্যাটাস।

অফিস শেষে আরিফ যখন ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফেরে, তানিয়া একবারও জিজ্ঞেস করে না “এক কাপ চা খাবে?” বরং তানিয়ার প্রথম প্রশ্ন থাকে “শোনো, আমার ওই বিদেশি হ্যান্ডব্যাগটা কবে আসবে? আমার বান্ধবীর স্বামী তাকে হীরা জহরত দিয়ে মুড়িয়ে দিচ্ছে, আর তুমি একটা ব্যাগের জন্য মাস পার করে দিচ্ছ?”

তানিয়ার কাছে আরিফ একজন ‘ক্যাডার অফিসার’ ছাড়া আর কিছু নয়। তানিয়া ভালোবাসে আরিফের ক্ষমতাকে, আরিফের নীল বাতিওয়ালা গাড়িকে। আরিফের মনের কোণে জমে থাকা ধুলোবালি পরিষ্কার করার সময় তার নেই।

আরিফ মাঝে মাঝে একা বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট টানে আর ভাবে “ইরা থাকলে কি এমন হতো? ইরা তো আমার এক কাপ চায়েই খুশি ছিল।” আজ তার রাজকীয় ডাইনিং টেবিলে পদের অভাব নেই, শুধু অভাব সেই মানুষটার যে পরম মমতায় ভাতের থালাটা সামনে এগিয়ে দেবে।

গাড়ি থেকে নামার পর থেকেই বনি ইরার ওপর বাজপাখির মতো নজর রাখছিল। বাসায় ঢুকেই সে সজোরে দরজাটা লাথি মে-রে বন্ধ করল। ইরার বুকটা ভয়ে দুরুদুরু করছে।

বনি ইরার ঘাড়ের ওপর তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে হিসহিসিয়ে বলল, “অফিসের সামনে ওই ছেলেটা কে ছিল মেহেরিন? তোমার পুরনো কোনো মক্কেল নাকি? আমি তো দেখলাম তুমি ওর দিকে তাকিয়ে একদম হা হয়ে ছিলে। ভুলে যেও না তুমি কার স্ত্রী। আমার ইজ্জতে যদি সামান্যতম আঁচ লাগে, তবে ওই মুখ আমি জ্যান্ত পুড়িয়ে দেব।”

ইরা ফিসফিস করে বলল, “উনি কেউ না। চিনতে পারিনি তাই তাকিয়ে ছিলাম।”

“মিথ্যা কথা বলবে না!” বলেই বনি ইরার চিবুকটা এমনভাবে চেপে ধরল যে ইরার মনে হলো হাড়গুলো মটমট করে ভেঙে যাবে। “বাপের বাড়ি থেকে তো কিছুই আনোনি, এখন কি পরপুরুষের সাথে আদিখ্যেতা করে আমার মাথা নিচু করতে চাও? মনে রেখো, তুমি আমার কেনা গোলাম। আমি তোমাকে পেটাই আর আদরে রাখি, সেটা আমার ব্যাপার। অন্য কারো দিকে যদি চোখ যায়, তবে সেই চোখ আমি উপড়ে ফেলব।”

সেদিন রাতে আরিফও ঘুমাতে পারেনি। পাশে তানিয়া দামী নাইট ক্রিম মেখে অঘোরে ঘুমাচ্ছে। তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই যে তার স্বামী কেন বারবার এপাশ-ওপাশ করছে। আরিফের মাথায় ঘুরছে ইরার সেই ফ্যাকাশে মুখটা।

আরিফ স্পষ্ট দেখেছে ইরার গলার নিচে একটা কালচে দাগ। সে বুঝতে পারছে, ইরা সুখী নেই। তার ইরার চোখ বলে দিচ্ছিল সে এক দমবন্ধ করা খাঁচায় বন্দি। আরিফ ভাবল “আমি তো প্রতিষ্ঠিত হলাম, টাকা কামালাম। কিন্তু কী লাভ হলো? যার জন্য এই যুদ্ধ ছিল, তাকেই তো বাঁচাতে পারলাম না।”

অন্যদিকে ইরা অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ফেলছে। আরিফকে দেখে তার ভেতরে এক ধরণের অপরাধবোধ জেগেছে।

রাত গভীর হচ্ছে। বনি ঘুমানোর আগে বেশ খানিকটা মদ্যপান করেছে এটা তার নতুন অভ্যাস নয়, তবে ইদানীং বেড়েছে। সে এখন বিছানায় অঘোরে ঘুমাচ্ছে, আর ইরা বারান্দার এক কোণে গুটিসুটি মে-রে বসে আছে। তার শরীরটা ব্যথায় নীল হয়ে আছে, সারা শরীরে বনির অধিকারের প্রমাণ কিন্তু মনের ভেতরের ক্ষতটা আরও গভীর।

বনি আজ মা-রতে মা-রতে বলেছিল, “তোর ওই পুরনো প্রেমিকের কথা আমি ভুলিনি মেহেরিন। ওই ছেলেকে আজ অফিসের সামনে দেখে তোর চোখমুখ যেভাবে উজ্জ্বল হয়েছিল, আমি সব বুঝেছি। মনে রাখিস, আমি বনি আমিন। তোকে জ্যান্ত কবর দিলেও কেউ বিচার করার সাহস পাবে না।”

ইরা আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছে, এই কি সেই জীবন যার জন্য সে নিজের সবটুকু বিসর্জন দিয়েছিল? সে কি শুধুই বনির লালসা আর ক্রোধ মেটানোর একটা বস্তু?

অন্যদিকে, আরিফের আলীশান ড্রয়িংরুমে চলছে অন্যরকম এক লড়াই। তানিয়া তার দামী আইফোনটা আরিফের সামনে ছুড়ে দিয়ে চিৎকার করে বলছে, “আরিফ, এটা কী? তুমি এই মাসেও আমাকে দুবাই ট্যুরে নিয়ে যাচ্ছ না? তোমার ক্যাডার সার্ভিসের এই সামান্য বেতনে আমার শখ মিটছে না। আব্বুর কাছ থেকে টাকা চেয়ে নিতে তোমার লজ্জা লাগে?”

আরিফ ফাইল থেকে মুখ না তুলেই শান্ত গলায় বলল, “তানিয়া, সরকারি চাকরির একটা লিমিট আছে। আমি তো অবৈধ টাকা কামাতে পারব না। আর তোমার বাবার টাকা নেওয়ার প্রশ্নই আসে না।”

তানিয়া বিদ্রূপের হাসি হেসে বলল, “তবে কেন বিয়ে করেছিলে আমাকে? ওই যে তোমার পুরনো প্রেমিকা কী যেন নাম, ইরা? তার মতো কোনো গরিবের মেয়েকে বিয়ে করলেই তো পারতে! সারাদিন তোমার পায়ে পড়ে থাকত। আমি তো আর তেমন না!”

‘ইরা’ নামটা শুনতেই আরিফের কলিজায় যেন একটা টান পড়ল। সে ধীরপায়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। তানিয়া পেছনে দাঁড়িয়ে গালিগালাজ করেই যাচ্ছে, কিন্তু আরিফের কানে সেসব পৌঁছাচ্ছে না। সে শুধু ভাবছে আজ অফিসের সামনে দেখা হওয়া সেই বিধ্বস্ত মুখটার কথা। ইরার চোখের কোণে যে আতঙ্কের ছাপ সে দেখেছে, তা তাকে স্বস্তি দিচ্ছে না।

মাঝে মাঝে মধ্যবিত্ত সমাজ মেয়েদের শেখায় “স্বামী যেমনই হোক, সহ্য করে থাকাই সতীত্ব।” কিন্তু সমাজ শেখায় না যে, সম্মান ছাড়া বেঁচে থাকাটা পলে পলে ম-রে যাওয়ার চেয়েও ভয়ঙ্কর।

ইরা বুঝতে পারছে, বনি আর আগের মতো নেই। তার সন্দেহ এখন চরম পর্যায়ে। সে ইরার ফোনের সিম কার্ডটা খুলে নিয়ে গেছে। এমনকি বারান্দার দরজায় তালা ম-ারার পরিকল্পনা করছে। বনির কাছে ভালোবাসা মানে হলো শেকল পরানো।

আর আরিফ? আরিফ বুঝতে পারছে টাকা আর পদমর্যাদা তাকে সমাজ দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু তানিয়ার মতো লোভী এক নারীর সাথে জীবন কাটানো মানে হলো প্রতিদিন নিজের আত্মসম্মানকে বলি দেওয়া। তানিয়া তাকে মানুষ নয়, বরং একটা ‘টাকা ছাপানোর মেশিন’ আর ‘সোশ্যাল স্ট্যাটাস’ হিসেবে দেখে।

রাত তিনটে। ইরা আর আরিফ দুজনেই এক শহরের দুই প্রান্তে বারান্দায় দাঁড়িয়ে। মাঝখানে মাইলের পর মাইল দূরত্ব, কিন্তু দুজনের দীর্ঘশ্বাসের সুর একই।

ইরা মনে মনে বলছে, “আরিফ, তুমি কি এখনো কালো রঙের শার্ট পরো? তুমি কি জানো, তোমার দেওয়া সেই সস্তা রুমালটাই আমার বেঁচে থাকার শেষ সম্বল?”

আর আরিফ ভাবছে, “ইরা, আমি তো আজ প্রতিষ্ঠিত। আমার হাতে আজ ক্ষমতা আছে। কিন্তু আমি কি পারব তোমাকে ওই নরক থেকে টেনে বের করতে? নাকি সমাজের এই ‘পাথরের রাজপ্রাসাদ’ আমাদের কাউকেই মুক্তি দেবে না?”

বাস্তবতা হলো, বনির মতো পুরুষেরা কোনোদিন বদলায় না, আর তানিয়ার মতো নারীদের চাহিদা কোনোদিন ফুরায় না।

চলবে,,,,

গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ