#পাথরের_রাজপ্রাসাদ
#আরিবা_নাওশীন
#সূর্চনা_পর্ব
“বউটাকে প্রতিদিন না মা-রলে হয় না তোর,তাই না? প্রতিদিনের এই অত্যাচার সহ্য করতে করতে মেয়েটার চেহারার অবস্থা কী করে ফেলছিস বনি?”
সোফায় আধশোয়া হয়ে বসে টিভি দেখছিলেন রেখা বেগম। বনি তখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দামি ইতালিয়ান সুটটা গায়ে চাপাচ্ছিল। মায়ের কথায় সে বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না, বরং টাইয়ের নটটা শক্ত করতে করতে আয়নাতেই নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে একটা তৃপ্তির হাসি দিল। বনির এই হাসিটা ইরার কাছে এখন পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর দৃশ্য।
বনি নির্বিকার গলায় উত্তর দিল, “মা, তুমি তো জানো, ও কেমন। সারাদিন মুখ গোমড়া করে থাকে। আমি অফিস থেকে ফিরে একটু হাসি-খুশি মুখ দেখতে চাইব, না? তার ওপর আজকে সকালে ফাইলটা ব্যাগে গুছিয়ে রাখতে বলেছি, সেটাও ভুল করেছে। সরকারি গেজেটেড অফিসার আমি, আমার কাজের গুরুত্ব ও বুঝবে না তো কে বুঝবে? একটু আধটু শাসন না করলে স্ত্রীরা মাথায় ওঠে মা।”
রেখা বেগম আর কিছু বললেন না। তার কাছে শাসনের সংজ্ঞাটা কেবল মুখের সৌন্দর্য রক্ষা পর্যন্তই সীমিত। মেয়েটার মনে কী চলছে, সেই নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। তিনি বরং টিভির ভলিউমটা একটু বাড়িয়ে দিয়ে নিজের সিরিয়ালে মন দিলেন।
“মেহেরিন! চা দিয়ে যাও!” বনির হাঁকডাকে ইরার স্মৃতির জগত তছনছ হয়ে গেল।
ইরা রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। তার পায়ের শব্দে বনি ফিরে তাকাল। তার চোখে কোনো অনুশোচনা নেই, বরং একটা বিজয়ের তৃপ্তি। বনি বিশ্বাস করে, ভয় দেখিয়েই নারীকে বশ করতে হয়। সে ইশারায় ইরাকে কাছে ডাকল। ইরা ভয়ে ভয়ে পাশে গিয়ে দাঁড়ালে বনি তার চিবুকটা শক্ত করে চেপে ধরল।
“কান্নাকাটি করে মুখটা একদম বিশ্রী করে ফেলেছ। আজ রাতে ডিআইজি সাহেবের বাসায় ডিনার আছে। ভালো করে মেকআপ করে নিও যাতে দাগগুলো বোঝা না যায়। আমার ইজ্জতের প্রশ্ন, বুঝলে?”
ইরা কোনো কথা বলল না। শুধু চোখের জলটুকু গিলে নিল। বনির কাছে সে কেবল তার পদমর্যাদার একটা অলংকার, যার কাজ হলো সুন্দর সেজে বনির আভিজাত্য জাহির করা। তার ডান হাতের কব্জিতে কালকের সেই ধাক্কার কালশিটেটা এখন কালচে হয়ে উঠেছে। বনি যখন রাগের মাথায় তাকে দেওয়ালের সাথে চেপে ধরেছিল, তখন একবারের জন্যও মনে হয়নি সে তার জীবনসঙ্গী। মনে হয়েছিল বনি যেন কোনো অপরাধীকে জেরা করছে।
ইরা যখন প্লেটে নাস্তা সাজিয়ে ড্রয়িংরুমে নিয়ে এল, তখন বনি তার দিকে একবার আড়চোখে তাকাল। সেই চাহনিতে কোনো ভালোবাসা নেই, আছে কেবল মালিকানাবোধ। বনি চেয়ার টেনে বসতে বসতে কড়া গলায় বলল, “নাস্তা দিতে এত দেরি কেন মেহেরিন? কাল রাত থেকে দেখছি মেজাজটা চড়া তোমার। নিজেকে কী ভাবো তুমি? তোমার বাপের তো মুরোদ ছিল না একটা ভালো জায়গায় বিয়ে দেওয়ার, আমি দয়া করে ঘরে তুলেছি বলেই আজ এই এসি রুমে বসে আছো।”
ইরা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। প্রতিবাদ করার মতো শক্তি তার অবশিষ্ট নেই। সে জানে, একটা শব্দ উচ্চারণ করলেই বনির টাকার অহংকার আর পদের গরম আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়বে।
খাবার টেবিলের অন্য প্রান্তে বনির বাবা, ইরার শ্বশুর আফজাল সাহেব বসে ছিলেন। তিনি লোকটা সজ্জন, কিন্তু মেরুদণ্ডহীন। নিজের স্ত্রী আর ছেলের দাপটের সামনে তিনি তাসের ঘরের মতো অসহায়। তিনি একবার ইরার ফোলা চোখের দিকে তাকালেন, তারপর লজ্জিত ভঙ্গিতে চোখ নামিয়ে নিলেন।
তিনি নিচু স্বরে বললেন, “বনি, সকাল সকাল বউমা’র সাথে ওভাবে কথা বলিস না তো। ও তো একা হাতে সব সামলায়।”
বনি তৎক্ষণাৎ তার বাবার দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “বাবা, তুমি নিজের ওষুধ খেয়ে নিজের ঘরে যাও তো। সংসারের ব্যাপারে তুমি কথা না বললেই ভালো হয়। মেহেরিনকে আমি আমার মতো করে চালাব।”
আফজাল সাহেব আর একটি কথাও বললেন না। নিঃশব্দে উঠে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন। যাওয়ার সময় তার দীর্ঘশ্বাসটা ইরার কানে এসে বিঁধল। এই বাড়িতে এটাই নিয়ম অন্যায় দেখেও সবাই অন্ধ হয়ে থাকার ভান করে।
দুপুরের দিকে শাশুড়ি ঘরে ঢুকে কড়া গলায় বললেন, “বৌমা, বসে বসে আকাশ-পাতাল ভাবলে হবে না। রাতে বনির কলিগরা আসবে। দশ পদের রান্না করতে হবে। আর শোনো, ওই ছেঁড়া সুতির শাড়িটা পাল্টে লাল সিল্কটা পরো। বনি চায় না তার বন্ধুরা ভাবুক সে তার বউকে ঠিকমতো দেখাশোনা করে না।”
ইরা মনে মনে হাসল। বাইরের মানুষের কাছে সুখী দম্পতি সাজার এই অভিনয়টা করতে করতে সে ক্লান্ত। বনি তাকে মারে, গালি দেয়, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কিন্তু সবার সামনে তাকে দামী গয়নায় সাজিয়ে প্রদর্শনী করতে ভোলে না।
আলমারি খুলতেই ইরার চোখে পড়ল আরিফের দেওয়া সেই সস্তা নীল রুমালটা। যেটা সে অনেক কষ্টে লুকিয়ে রেখেছে। রুমালটা হাতে নিতেই তার মনে হলো, সে যেন এক জীবন্ত লা-শে পরিণত হয়েছে। বনি তাকে সব দিয়েছে, শুধু তার মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার অধিকারটুকু কেড়ে নিয়েছে।
ইরা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের গালের কালশিটেটা ভালো করে মেকআপ দিয়ে ঢাকতে শুরু করল। কারণ সে জানে, আজ রাতেও তাকে হাসিমুখে বনির পাশে দাঁড়িয়ে সুখী স্ত্রীর অভিনয়টা করে যেতে হবে।
চলবে????
#পাথরের_রাজপ্রাসাদ
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_২
আয়নার সামনে বসে মেকআপের ভারি প্রলেপ লাগাতে লাগাতে ইরা ভাবছিল, মানুষের জীবনটা বোধহয় একটা বড় রঙ্গমঞ্চ। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়েদের জন্য। যেখানে চোখের পানি আড়াল করে ঠোঁটে কৃত্রিম হাসি ঝুলিয়ে রাখতে হয় শুধু ‘সংসার’ নামক তাসের ঘরটাকে টিকিয়ে রাখার জন্য।
বিকেলের ম-রা আলোটা জানালার গ্রিল গলে ইরার মুখে এসে পড়েছে। বনি অফিস থেকে ফেরেনি, কিন্তু তার হুকুম জারি হয়ে গেছে অনেক আগেই। আজ রাতে ডিআইজি সাহেবের বাসায় ডিনার। ইরার গালের কালশিটেটা কনসিলার দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করতে করতে তার মনে হলো, সে আসলে ক্ষতটা ঢাকছে না, বরং নিজের সত্তাটাকে গুম করে ফেলছে।
দরজায় কোনো শব্দ না করেই রেখা বেগম ঘরে ঢুকলেন। ইরার সাজগোজের দিকে তীক্ষ্ণ নজর বুলিয়ে বললেন, “হাতের ওই চোটের দাগটা যেন দেখা না যায় বৌমা। বনির বন্ধুদের সামনে সাবধানে থেকো। আর হ্যাঁ, রান্নাবান্নাগুলো শেষ করে তারপর তৈরি হও। কাজের মেয়েটা তো কেবল পেঁয়াজ কাটতেই পারদর্শী, আসল স্বাদ তো তোমার হাতেই আসতে হবে। বনি চায় সব পারফেক্ট হোক।”
ইরা আয়না থেকেই শাশুড়ির দিকে তাকাল। মনে মনে ভাবল, এই নারীও কি কোনোদিন ভালোবেসে আগলে রাখার শিক্ষা পাননি? নাকি নিজের অতৃপ্ত জীবনের ঝাল তিনি পরের বাড়ির মেয়ের ওপর মিটিয়ে শান্তি পান?
ইরা মৃদু স্বরে বলল, “রান্না প্রায় শেষ মা। শুধু পোলাওটা দমে বসানো বাকি।”
“তাড়াতাড়ি করো। দেরি হলে বনি আবার চিল্লাইলে আমার শান্তি নষ্ট হবে।”বলেই তিনি নিজের ড্রয়িংরুমের সিংহাসনে গিয়ে বসলেন।
রান্নাঘরে আগুনের তাপে ইরার ফর্সা মুখটা লাল হয়ে উঠেছে। ঘাম আর বাষ্পের সাথে মিশে যাচ্ছে তার অব্যক্ত দীর্ঘশ্বাস। এটাই কি জীবনের পাওনা ছিল?
বনির সাথে বিয়ের সময় মেহেন্দির রঙ যখন টকটকে লাল হয়েছিল, পাড়ার ভাবিরা বলেছিল “মেয়ের ভাগ্য বটে! জামাই সরকারি অফিসার, রাজকপাল তোমার ইরা!”
ইরা এখন সেই রাজকপালের দিকে তাকিয়ে হাসে। বনি তাকে শপিং করতে নিয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু নিজের পছন্দ চাপিয়ে দেয়। সে কী রঙের শাড়ি পরবে, কার সাথে কথা বলবে, এমনকি নিজের মার সাথে কতক্ষণ ফোনে কথা বলবে সবই বনির ইশারায় হতে হয়।
একদিন মাত্র দশ মিনিট বেশি মায়ের সাথে কথা বলায় বনি ফোনটা কেড়ে নিয়ে আছাড় মে-রে ভেঙে ফেলেছিল। চিৎকার করে বলেছিল, “বাপের বাড়ির মায়া কাটাতে না পারলে আমার ঘরে থাকার দরকার নেই।”
সেই থেকে ইরা মাকেও সব সত্যি বলা বন্ধ করে দিয়েছে। বলবেই বা কী? বাবা তো খুশি হয়েই আছেন যে মেয়ে দামী গাড়িতে চড়ছে। অভাবের সংসারের মেয়েদের কি এর বেশি কিছু চাওয়ার অধিকার আছে?
হঠাৎ মনে পড়ে গেল আরিফের কথা। সেই যেবার ইরার খুব জ্বর হয়েছিল। আরিফের পকেটে তখন বড়জোড় একশ টাকা। সে সেই টাকা দিয়ে কোনোমতে কয়েকটা কমলা আর নাপা কিনে ইরার হলের গেটে দাঁড়িয়ে ছিল।
ইরা যখন নিচে নেমে এল, আরিফ ব্যাকুল হয়ে বলেছিল “ইরা, তুমি আমার ওপর রাগ করো না। আমি ঠিকমতো ফলও কিনে আনতে পারি না তোমার জন্য। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমার কলিজার সবটুকু দিয়ে তোমাকে সুস্থ করে তুলব।”
আরিফ সেদিন ইরার কপালে হাত দিয়ে ছটফট করছিল। সেই স্পর্শে কোনো দম্ভ ছিল না, ছিল না কোনো ‘অফিসার’ হওয়ার দাপট। ছিল শুধু এক পবিত্র ভালোবাসা। আর আজ বনি যখন ইরার গায়ে হাত তোলে, তখন ইরার মনে হয় এই আভিজাত্যের চেয়ে আরিফের সেই নুন-ভাতের সংসারটাও জান্নাতের মতো সুন্দর হতো।
রাত আটটা। বনি ঘরে ঢুকেই ধমকের সুরে বলল, “রেডি হওনি এখনো? তোমাকে দিয়ে কিচ্ছু হয় না মেহেরিন। একটা গাড়ি পাঠিয়েছিলাম পার্লারে যাওয়ার জন্য, গেছলে?”
“না, বাসায় অনেক রান্না ছিল তো, তাই…” ইরা বলতে চাইল।
বনি তার গায়ের সিল্কের চাদরটা সোফায় ছুড়ে ফেলে বলল, “থামাও তোমার রান্না। সব সময় কি ঘরকুনো হয়ে থাকবে? আমি চাই তোমাকে দেখে সবাই জ্বলুক। আমার স্ত্রী হিসেবে তোমার একটা প্রেজেন্টেবল লুক দরকার। যাও, এখনই তৈরি হও। আর শোনো, ওই নেকলেসটা পরবে যেটা গত মাসে হীরা থেকে কিনে দিয়েছি।”
বনি যখন ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে পারফিউম মাখছিল, তখন আয়নায় সে আর ইরার চোখাচোখি হলো। বনির চোখের সেই শীতল চাহনি ইরাকে মনে করিয়ে দেয় সে কেবলই এক দামী পুতুল।
ইরা তার আলমারির সেই লুকানো নীল রুমালটা একবার ছুঁয়ে দেখল। ওটাই তার একমাত্র অক্সিজেন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে লাল সিল্কের শাড়িটা হাতে নিল। আজ রাতেও তাকে ‘পারফেক্ট ওয়াইফ’ হয়ে ডিআইজি সাহেবের ড্রয়িংরুমে বসে থাকতে হবে, যেখানে লোকে বলবে “বনির বউটা কী সুখে আছে!”
কেউ জানবে না, এই দামি মেকআপের আড়ালে একটা প্রাণ প্রতিদিন তিলে তিলে মা-রা যাচ্ছে।
চলবে…
