#অগ্নিশিখা
পর্ব ০৩ শেষ পর্ব
লেখক The Story Haven
ফোনের ওপাশের কণ্ঠস্বরটা শুনে আমার মেরুদণ্ড দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। কিন্তু আমি ভয় পেলাম না। আমি জানি, ভয় মানেই পরাজয়। আমি শান্ত গলায় বললাম, “কে আপনি?”
ওপাশ থেকে একটা কর্কশ হাসি শোনা গেল। “আমি কে, সেটা বড় কথা নয় শারমিন সাহেব। বড় কথা হলো, আরমান তো কেবল একটা ঘুঁটি ছিল। আপনার স্বামীর মৃ**ত্যুর পর ‘আহমেদ লেগেসি’র যে শেয়ারগুলো বাজারে ছেড়েছিলেন, তার একটা বড় অংশ এখন আমার হাতে। আরমানকে দিয়ে আপনার সই করানো সেই কাগজগুলো আসলে শুধু টাকা তোলার ছিল না, ওটা ছিল কোম্পানির মালিকানা হস্তান্তরের গোপন চুক্তি। আপনার ছেলে লোভের মুখে পড়ে নিজের মায়ের সাম্রাজ্য বিক্রি করে দিয়েছে আমার কাছে।”
কলটা কেটে গেল। আমি বুঝলাম, আরমান শুধু চো*র নয়, সে আমার পিঠে ছু*রি মে*রেছে চরম মূর্খতায়। সে জানতও না সে কী সই করেছে।
আমি আর সময় নষ্ট করলাম না। গাড়ি ঘোরাতে বললাম ব্যারিস্টার রফিকের অফিসের দিকে। রাত তখন গভীর। রফিকের চেম্বারে বসে আমরা নথিপত্রগুলো আবার পরীক্ষা করলাম। রফিক কপালে হাত দিয়ে বলল, “শারমিন, আরমান যদি আসলেই সেই বিশেষ ‘ক্লজ’ (Clause) পেপারে সই করে থাকে, তবে আমাদের হাতে সময় খুব কম। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বোর্ড মিটিং ডেকে এটা বাতিল করতে হবে।”
আমি জানতাম, এই রহস্যময় ব্যক্তিটি আর কেউ নয়—আমাদের ব্যবসার পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বী জহির দস্তগির। সে ১২ বছর ধরে এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল।
পরদিন সকালে আমি যখন কোম্পানির হেড অফিসে পৌঁছালাম, দেখলাম জহির দস্তগির তার দলবল নিয়ে আমার চেয়ারে বসে আছে। আমাকে দেখে সে তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল, “শারমিন সাহেব, বয়সের ভারে আপনি বোধহয় ভুলে গেছেন যে আবেগের চেয়ে আইনি কাগজ বেশি শক্তিশালী। আপনার ছেলে এই কোম্পানি আমার কাছে হস্তান্তর করেছে।”
আমি কোনো কথা না বলে আমার পার্স থেকে একটা ছোট পেনড্রাইভ বের করলাম। টেবিলের ওপর রেখে বললাম, “জহির সাহেব, আপনি ঠিকই বলেছেন। আইনি কাগজই শেষ কথা। আরমান যখন সই করছিল, তখন সে অসুস্থ মায়ের সেবা করছিল না, সে সই করছিল আমার বিছানার পাশে রাখা সিসিটিভি ক্যামেরার সামনে। সেখানে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে আপনি আরমানকে ব্ল্যা*কমেইল করছেন এবং তাকে দিয়ে জোর করে সই নিচ্ছেন।”
জহিরের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। আমি আরও যোগ করলাম, “আর সবচেয়ে বড় কথা—আরমান যে কোম্পানির মালিকানা হস্তান্তরের কাগজে সই করেছে, সেই কোম্পানিটির নাম ‘আহমেদ লেগেসি হোল্ডিংস’। কিন্তু আপনি কি জানেন, গত মাসেই আমি আমার সমস্ত মেইন অপারেশন এবং এসেট ‘সাইফুল-শারমিন ফাউন্ডেশন’ নামে একটি ট্রাস্টে মুভ করে দিয়েছি? আরমান যে কোম্পানির সই দিয়েছে, ওটা এখন কেবল একটা কাগুজে খোলস। ওর ভেতরে কোনো সম্পদ নেই। আপনি আসলে একটা শূন্য বাক্স কিনেছেন।”
জহির চিৎকার করে উঠল, “এটা অসম্ভব!”
ঠিক তখনই দরজায় পুলিশ আর ডিবির অফিসাররা ঢুকলেন। জহির দস্তগিরকে জালিয়াতি এবং ষড়যন্ত্রের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হলো।
এক সপ্তাহ পর।
আমি সেন্ট্রাল জেলের গেটে দাঁড়িয়ে আছি। আরমানকে আনা হলো। তার পরনে কয়েদির পোশাক, চোখ নিচে নামানো। সে আমাকে দেখে ডুকরে কেঁদে উঠল। “মা, আমাকে ক্ষমা করে দাও। মেহরিন আমাকে বলেছিল এই টাকা দিয়ে আমরা বিদেশে সেটেল হবো। জহির সাহেব আমাকে ভয় দেখিয়েছিল। আমি বুঝতে পারিনি…”
আমি তার দিকে তাকালাম। আমার চোখে আজ আর ঘৃণা নেই, আছে এক গভীর শূন্যতা। আমি বললাম, “আরমান, আমি তোমাকে ছোটবেলা থেকে সব দিয়েছি, শুধু একটা জিনিস দিতে ভুলে গিয়েছিলাম— অভাবের শিক্ষা। তুমি আজ যে জায়গায় আছ, সেটা তোমার নিজের কর্মফল। আমি চাইলেই তোমাকে আজ জামিনে বের করতে পারতাম। কিন্তু আমি করব না।”
আরমান অবাক হয়ে তাকাল। আমি বললাম, “জেল থেকে যখন বের হবে, তখন তুমি আর শারমিন আহমেদের ছেলে হবে না। তুমি হবে একজন সাধারণ মানুষ। তোমাকে শূন্য থেকে শুরু করতে হবে। যদি তুমি নিজের চেষ্টায় একটা রুটি কামাই করতে পারো, সেদিন বুঝবে তোমার বাবা আর আমি কীভাবে এই সাম্রাজ্য গড়েছিলাম। সেই দিন আমি তোমাকে আবার ‘মা’ ডাকার অধিকার দেবো।”
আমি ফিরে এলাম কক্সবাজারের সেই বারান্দায়। সামনে অসীম সমুদ্র। ঢেউগুলো আগের মতোই আসছে যাচ্ছে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে আমি মেহরিনের প্রোফাইল দেখলাম। সে এখন উধাও, তার সোশ্যাল মিডিয়া ডিলিট করা। লোভি মানুষরা ঠিক এভাবেই হারিয়ে যায়।
আমি কফির কাপে চুমুক দিলাম। আজ আমার কোনো তাড়া নেই। আমি জানি, আমার সম্পদ সুরক্ষিত, আমার আত্মসম্মান অটুট। আর সবচেয়ে বড় কথা—আমি একজন মাকে হারতে দেইনি।
সূর্য ডুবছে সমুদ্রে। আমি মনে মনে বললাম— “সাইফুল, দেখো, আমাদের ‘সুইট ওভেন’ আজও জ্বলছে। তার আগুন কোনো ঝড়ে নেভেনি, বরং আরও উজ্জ্বল হয়েছে।”
আমি হাসলাম। এই হাসিটা বিজয়ের, এই হাসিটা শান্তির।
[সমাপ্ত]
