Friday, June 5, 2026







আকাশ যেমন করে হাসে পর্ব-০১

#আকাশ_যেমন_করে_হাসে – [০১]
লাবিবা ওয়াহিদ

ইদানীং এক রং নাম্বার খুবই বিরক্ত করছে আমাকে। দূরের কলেজে যাই বিধায় বাবা মোবাইল কিনে দিয়েছেন ঠিক মতো পৌঁছেছি কিনা তা জানতে। কিন্তু মোবাইল কিনেও শান্তি নেই। ফ্লেক্সিলডের দোকান থেকে এলাকার বখাটেগুলো কীভাবে কীভাবে যেন নাম্বার পেয়ে রাত-দিন এক করে কল দিতেই থাকবে। এই সমস্যার কথা আবার চাইলেও বাবাকে বলা যায় না, দুশ্চিন্তা করবেন। এমনিতেই মা ছাড়া মেয়ে ছোটো বিধায় বাবার দুশ্চিন্তার শেষ নেই। তাই কিছু কিছু সমস্যা আমি নিজের মধ্যেই চেপে রাখার চেষ্টা করি। বর্তমানে আমার আপাতত সমস্যা একটিই— এই রং নাম্বার।

দিন নেই রাত নেই, এই নাম্বার থেকে যখন তখন কল চলে আসছে। দুইদিনের মাথায় সুরাহা খোঁজার চেষ্টা করলাম। কল ধরতেই এবার আমাকে চমকে দিয়ে এক মহিলার কণ্ঠস্বর শোনা গেল। ভদ্রমহিলা বিরক্ত হয়ে বললেন,
–“কিরে সুমি! মোবাইল কোথায় থাকে তোর? দুইদিন যাবৎ কল করছি তুই ধরছিস না! তুই কাছে নেই বলে তোকে কষে দুটো দিতে পারছি না।”

আমি হতবুদ্ধি হয়ে বসা। এত এত ছেলের চক্করের পর কোনো এক ভদ্রমহিলার খপ্পরে পড়ব কে জানত? অথচ আমি এদিকে কতশত আকাশ পাতাল ভেবে ফেলেছি। মহিলা ভুলবশত কল দিয়ে ফেলেছেন। এখনো হয়তো জানেনই না, সুমি নামক ব্যক্তিটি আমি নই। এটা সম্পূর্ণ রং নাম্বার। মুহূর্তেই আমার মধ্য থেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো। কিন্তু তবুও, নাম্বারটা এখনো রং নাম্বারই। আমি বলার প্রস্তুতি নিলাম, যে আমি কোনো সুমি নই। রং নাম্বার। কিন্তু তখনই বাইরে শব্দ এলো। আপা এসেছে। আমি খট করে কলটা কেটে দিয়ে মোবাইল ফেলেই রুমের বাইরে চলে এলাম। আমার বড়ো আপা, অর্থাৎ ইতি আপা তখন ক্লান্ত হয়ে ফ্যানের নিচে বসা। নিশ্চয়ই রিকশা পায়নি, হেঁটে হেঁটে ফিরেছে। আপা আবার তুলনামূলক দ্রুত গতিতে হাঁটে। তাই তার হাঁপানিটাও বেশি। আমি আপার ব্যাগের দিকে তাকালাম প্রতিদিনের মতোই। আমার এখনো বাচ্চামো কাটেনি, বাইরের জুস-সেভেনআপের প্রতি আমার আবার বেশ নেশা। আপা আমার চোখ যেন নিমিষেই পড়ে ফেলল।
–“বলেছি না, এ মাসের শেষ দশদিন জুস-কোক বন্ধ? শেষ যে পরীক্ষা দিলি ওটায় ফেইল করেছিস পদার্থ বিজ্ঞানে, মনে নেই?”

মুহূর্তেই আমার মুখ কালো হয়ে গেল। আপা তা পাত্তা না দিয়ে আমাকে সরবত বানাতে পাঠিয়ে দিল। এখনো শুনিয়ে শুনিয়ে বলছে,
–“প্রতিদিন তাকে সরবত বানানোর কথা মনে করিয়ে দেওয়া লাগে। আপাই শুধু অফিস খাটবে আর উনি ঘরে বসে বসে ফেইল মার্ক নিয়ে আনবে।”

আমার মুখ তেঁতো হলো, তবুও ফেইল করার কারণে দমে রইলাম। আপার সাথে আমার সাপে-নেউলে সম্পর্ক এমনও নয়, তবে আপা আমাকে খুব শাসন করেন। বাড়িতে আমি একা থাকলেও মনে হয় আপার চোখ সব জায়গায়। অকাজ করলেও কীভাবে কীভাবে যেন ধরে ফেলবে। কখনো অনুভবই হয়নি আমার মা নেই।কে বলেছে আমার মা নেই? আপাই তো আমার মা। মায়েদের মতো তার তেজ, শাসন, মমতা— সবকিছুই।

সরবতটা শেষ করার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আপা আবার রান্না শুরু করে দিল। বাবার ফির‍তে ফিরতে রাত হবে। প্রায়ই বাবার ব্যবসার কাজে বাইরে থাকা লাগে। কিছু বছর যাবৎ বাবা চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় হাত দিয়েছে। যদিও এখনো লাভজনক কোনো সফলতা আসেনি, তবে বাবার বিশ্বাস একদিন তিনি ঠিকই সেই সফলতা দেখবেন।

ইতি আপাকে অবশ্য কেউ বলেনি চাকরি করতে। আপা তার সিদ্ধান্তে স্বাধীন। নিজের সম্পূর্ণ ইচ্ছেতেই সে চাকরি নিয়েছে। তার সবসময়েরই ইচ্ছে ছিল, সাবলম্বী হওয়ার। সেই স্বপ্নকেই বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। চাকরি তো করছেই আবার সারাদিনের ঝাল ঘরে এসে মেটাবে আমার ওপর। কি যে যন্ত্রণা। আবার এই আপাই মাস শেষে বেতন পেলে আমাকে কিছু না কিছু উপহার দিবে। ওই একদিনেই কীভাবে যেন আমি গলে যাই, আমার পুরো মাসের অভিযোগ-অভিমান কেটে যায়।

ইতি আপা বিবাহিত, তবে ভাইয়া আর্মিতে চাকরি করেন। প্রায়ই তিনি ব্যস্ত থাকেন দেশরক্ষায়। ভাইয়ার পরিবার বলতে সেভাবে কেউ নেই। তাই ইতি আপা আমাদের সাথেই থাকেন। ভাইয়া ছুটিতে আসলে এখানেই আসেন। এর জন্য আবার আপা ভাইয়ার বাড়ি ভাড়ার অদ্ভুত চুক্তি করেছে। রাত প্রতি ভাইয়াকে নির্দিষ্ট পরিমাণের টাকা আপার হাতে জমা দেওয়া লাগবে। এটা নাকি ভাইয়ার দূরে থাকার শাস্তি। ভাইয়াও এই মিষ্টি শাস্তি মাথা পেতে নেন। তার জীবনে আছেই তো শুধু ইতি আপা, বউদের টুকটাক শাস্তি মেনে নেওয়াটা অন্যায়ের কিছু নয়। এই ব্যাপারগুলো অদ্ভুত হলেও আমার খুব মিষ্টি লাগে।

আপার বিয়ে হয়েছে দুই বছর হবে হয়তো। আপাদের এরেঞ্জ ম্যারেজ হলেও আমার কখনো এমন লাগেনি। বরঞ্চ সবসময় মনে হয় এক জোড়া প্রেম পাখির বিয়ের মাধ্যমে মিলন নিশ্চিত ঘটেছে। কিছু কপোত-কপোতী দেখলে যেমন বিরক্ত আসে না, আপারা ঠিক তেমনই। ওদের আশেপাশে থাকলে আমার নিজেরও সুখ, সুখ অনুভূতি হয়।

রাতের খাওয়া-দাওয়ার পর আবারও সেই একই নাম্বার থেকে কল এলো। এবার আমি বিশেষ মাথা না ঘামিয়ে রিসিভ করলাম। কারণ, আমার জানা আছে.. এটা একজন ভদ্রমহিলা। এছাড়া ভদ্রমহিলা সুমি ভেবে যেই ভুল ধারণা চেপে বসে আছেন, তা ভাঙানোও যে জরুরি।

আমি “হ্যালো” বলতেই ওপাশ থেকে এক শক্ত, পরিণত, গম্ভীর পুরুষালি কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। মুহূর্তেই মনে হলো আমি জমে গেছি। ওপাশ থেকে জিজ্ঞেস করছে,
–“আপনি কে বলছেন?”

আশ্চর্য! নিজে কল করে আবার নিজেই আমাকে প্রশ্ন করছে কে বলছি? আমি সময় নিলাম। মেপে মেপে বললাম,
–“আমি সুমি নই, আমি অরিত্রী।”

মুহূর্তেই আবার জিভ কাটলাম। এ কি! আমি এক অজানা অচেনা ছেলেকে নিজের নাম কেন বলে বসলাম? ইতি আপা ঠিকই বলে, আমি একটা মাথা-মোটা। ভয়ে এবার বুক কাঁপছে। এমনিতেই মোবাইল কেনার পর থেকে আমি কতটা অনিশ্চয়তায় ভুগি, ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়। সেখানে অচেনা একজন মানুষকে আমি আমার নাম বলে বসলাম?

ওপাশ থেকে মুহূর্তেই বিনয়ী কণ্ঠ ভেসে আসল,
–“আমি অত্যন্ত দুঃখিত। আসলে আমার মা আমার খালা অর্থাৎ সুমিকে কয়েকদিন যাবৎ কল করছেন, কিন্তু কেউ রিসিভ করছে না দেখে আমার খটকা লেগেছিল। আমার মায়ের অন্ধ বিশ্বাস আপনিই আমার খালা। সেই খটকা থেকেই জানতে চাওয়া। এক্সট্রেইমলি সরি। রং নাম্বারের জন্য দুঃখিত।”

আমি কিছুটা শান্ত হলাম। যাক, এবার কোনো ঝামেলার কিছু নেই। আবারও মেপে মেপে উত্তর দিলাম,
–“ঠিক আছে।”

ভদ্রলোক কিছু বলল না। আবারও দুঃখিত আওড়ায়। কল কাটতেই নিচ্ছিল ওমনি আমি শুনলাম ওপাশের ভদ্রলোকের গলা। ভদ্রলোক সম্ভবত তার মায়ের সাথে কিছু বলছেন, কিন্তু কল কাটতে ভুলে গেছে।

–“মা, তোমাকে বলেছিলাম নাম্বারটা দেখে-শুনে মোবাইলে তুলবে। দেখলে তো রং নাম্বারে চলে গেছ। একটা বাচ্চা মেয়েকে তুমি দুইদিন বিরক্ত করেছ। ভয় পেয়েছে না সে..”

আমি বাকি কিছু শোনার আগেই খট করে কল কেটে দিলাম। আমার মাথা থেকে বেরই হচ্ছে চাচ্ছে না, আমি বাচ্চা? আমার বয়স আঠারো এখন! ভদ্রলোক কী করে তাকে না জেনেশুনে তার মায়ের সাথে বাচ্চা বাচ্চা করছে? বাচ্চাকাল তো আমি কত আগেই পেরিয়ে এসেছি। কৈশোর পেরিয়ে তরুণী বয়সে পা দিয়েছি। বাচ্চাদের কি বাবা-মা মোবাইল দেয় নাকি? আশ্চর্য! জীবনে প্রথমবারের মতো কোনো ছেলের প্রতি আমার অন্য রকম বিরক্তি আসল। প্রেম ঘটিত ব্যাপারে নয়, খুবই নগন্য এক কারণে। ভদ্রলোক আমাকে “বাচ্চা” বলেছে, তাই।

ভেবেছিলাম সেই রং নাম্বারের ইতি সেই রাতেই টেনে নিয়েছি। কিন্তু তা আমার ভাবনা অবধিই।

দুইদিন পর বিকালে খুব বৃষ্টি নামে। কালবৈশাখীর ঝড় যাকে বলে। প্রতি গ্রীষ্মেই আমার ওদিকের গোলাপবাড়ির দিকে নজর পড়ে। আমার অন্য ফলের প্রতি খুব একটা আগ্রহ না থাকলেও কাচা আমের প্রতি দারুণ আগ্রহ। গাছ থেকে পেরে নেওয়ার আনন্দটা আমার জন্য পদার্থ বিজ্ঞানে পাশ করার মতোই। এর কারণ দুটোর একটিতেও আমার সহজে পাশ আসে না। গোলাপবাড়ির উঁচু দালান আমাকে প্রতিবার আমের থেকে বিচ্ছিন্ন করে। অথচ এই গাছের আমই এই মফস্বলে আমার সবচেয়ে বেশি সুস্বাদু লাগে। বাড়ির মালিক অনেক সৌখিন, তার অন্যান্য ফল-ফুলের গাছও আছে.. তবে এসব ধরার স্পর্ধা কারো হয় না। ভদ্রলোক ভাড়া দিতেন না তার বাড়ি। কিন্তু আজকাল “টু-লেট” প্লেট দেখছি। আফসোস হয় বড্ড, নিজেদের বাড়ি না হলে কবেই সেই বাড়ির দোতলা নিজের নামে করে নিতাম। কিন্তু হায় আফসোস!

আমি অসহায় চোখে বৃষ্টি দেখছি। মনেই হচ্ছে না এখন বিকাল। উলটো মনে হচ্ছে রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকার। আপা নির্ঘাত আজ ঝড়ের তোপে আটকে পড়বে। আসতে সম্ভবত দেরীও হতে পারে। আমি তাই জানালা বন্ধ করে একা চুপচাপ বসে রইলাম। মোম কিংবা হারিকেন খোঁজার চেষ্টা করলাম না। কী দরকার খামাখা আবার উঠে সেসব খোঁজাখোঁজি করার? হাতের কাছে ফোনটা আছে, আর কিছুর প্রয়োজন নেই।

আমি ঘরে বসে থাকলেও মন তখনো পড়েছিল গোলাপবাড়ির আমের গাছটায়। নিশ্চয়ই ঝড়ে কতশত আম পড়ছে। গোলাপবাড়ির মালিক প্রায় সময়ই সেসব আম নিজেদের পাশাপাশি আত্নীয়দের বিলান। আর প্রতবেশিদের ইচ্ছা হলে কয়েকটা দিবেন ভদ্রতার খাতিরে— এই যা!

এমন মুহূর্তে মোবাইল বেজে উঠে। স্ক্রিনে অচেনা নাম্বার থেকে কল। নাম্বার চিনতে ভুল হয়নি আমার, কেন যেন এই নাম্বার কখনো ভুলতে পারব না। আমার এবার দুশ্চিন্তা হয়। এবার কে কল দিয়েছে? ভদ্রলোক নাকি ভদ্রলোকের মা? তার কী কলটা ধরা উচিত? সেদিনই তো হিসাব চুকে গিয়েছিল.. তাহলে আবার কেন কল করছে?

আমার কপালে যেন প্রতিটা প্রশ্নের ভাজ পড়ল। নিজের অজান্তেই রিসিভ করে বসলাম৷ তবে শুরুতে হ্যালো বললাম না। নিজের সাথে পণ করেছি, পুরুষ মানুষের গলা শুনলেই কল কেটে দিব। কিন্তু কল কাটতে হলো না। ভদ্রমহিলার গলাই শোনা গেল।

–“তুমি সেই মেয়েটা না?”

আমি বোকা বনে সালাম দিয়ে বসলাম। ভদ্রমহিলার হাসি শোনা গেল ওপাশ থেকে। খুব সুন্দর করে সালামের উত্তর দিয়ে বললেন,
–“কেমন আছ মা? রং নাম্বার শোনার পর মনে হলো আমার নিজের তোমাকে সরি বলা উচিত।কয়েকদিন বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত, মা। আসলে বয়স বেড়েছে তো। শেষে ফোর টিপতে গিয়ে সেভেন টিপে ফেলেছি।”

কথা-বার্তায় ঢের বোঝা গেল ভদ্রমহিলা বেশ শিক্ষিত এবং আন্তরিক। নরম মনেরও মনে হলো।
–“ঠিক আছে আন্টি, সমস্যা নেই। মানুষ মাত্রই ভুল।”

ওপাশ থেকে ভদ্রমহিলা শুনে যেন স্বস্তি পেলেন।
–“এখন আবার বিরক্ত করছি না তো?”

–“জি না।”

–“যাক। আসলে সারাদিন একা থাকি তো। একাকীত্ব ঘুচাতে বোন-ভাইদের কল দিয়ে সময় কাটাই। ব্যালেন্স যেন নাকি কি.. আমার ছেলে রোজ সিমে ঢুকিয়ে দিবে। প্রায় তো বলেই বসে.. এত কি কথা বলি? কিন্তু যে বাড়ির বাইরে থাকে সে কী করে বুঝবে কি করি, তাই না বলো মা?”

আমি ভদ্রমহিলার কথা চুপ করে শুনছি। আমার অবশ্য এত বলার অভ্যাস নেই। একা থাকতে থাকতে কেমন যেন একঘেয়ে হয়ে গেছি। যার দিনের বেশিরভাগ সময় কথা না বলে থাকতে হয় তার জন্য হঠাৎ কথা-বার্তা বলাটা মুশকিলই বটে। তবুও আমি যে তার কথা শুনছি, তা বোঝাতে বললাম,
–“জি।”

ভদ্রমহিলার যেন হুঁশ ফিরল। নিজে কিছু আমতা আমতা করে বললেন,
–“এইরে, আমি নিজে শুধু বলেই গেলাম অথচ তোমার নাম জিজ্ঞেস করতেই ভুলে গেছি। নাম কি তোমার, মা?”

ভদ্রমহিলা কথায় কথায় “মা” বলে সম্বোধন করেন। এটা অদ্ভুত অনুভূতি দেয় আমাকে। আমার বড়ো ফুফুও আমাকে মা ডাকেন। বাবা তো প্রতিদিনই ডাকবেন। সেদিন বোধ হয় আন্টির ছেলে আমার নামটা শুনতে পায়নি সেভাবে। শুনলে নিশ্চয়ই এই আন্টির জানা থাকত। আমি নাম বলব না, বলব না করেও গলে গিয়ে বলে ফেললাম,
–“অরিত্রী।”

ভদ্রমহিলা আমার নাম আওড়ালেন,
–“অরিত্রী। কি সুন্দর নাম। শক্ত তবে ইউনিক। খুব একটা শোনা যায় না।”

আমার নামের প্রশংসা শুনতে মন্দ লাগল না। নিজের অজান্তেই আমি আমের চিন্তা ভুলে ভদ্রমহিলার গল্প শুনতে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। কথোপকথনের ইতি ঘটলো ভদ্রমহিলার ব্যালেন্স ফুরানোতে। দীর্ঘসময় একজন অচেনা-অজানা মানুষের কথা শোনাটা অদ্ভুত শোনালেও আমার অদ্ভুত লাগছে না। বরঞ্চ মনে হলো এই শেষ বিকালটা দারুণ কেটেছে। মানুষের কথা শুনলেই বোঝা যায় তার কোনো বদমতলব আছে কিনা। কিন্তু ভদ্রমহিলা খুবই নরম স্বভাবের মানুষ। নয়তো আজকাল কেউ রং নাম্বারে এত কথা বলে?

পরপর আরও কয়েকদিন কথা হলো আমাদের। বান্ধবী, বান্ধবী যেভাবে কথা বলে না? সেই ধরণের আলাপ হলো আমাদের। জানতে পারলাম ওনারা মানিকগঞ্জ থাকেন। তাদেরও মফস্বলই। আন্টির ছেলের নাম কখনো শোনা হয়নি আমার। এমনকি উনি কখনো ছেলের প্রসঙ্গ টানেননি। একবার শুধু বলেছিলেন,
–“আমার ছেলের মতো বোরিং জীবনে দুটো দেখিনি। একদম তার মরহুম বাপের স্বভাব পেয়েছে।”

এছাড়া আন্টি আর কিছু বলেননি। আমিও তো একবার হাসতে হাসতে বোকার মতো নিজের ঠিকানা বলে দিলাম। ভাবলাম.. আর যাই হোক, কেউ তো আর ঠিকানা শুনে মানিকগঞ্জ থেকে ঢাকা আসতে পারবে না। আমি অবশ্য নিজের বাড়ির কথা ভুলে গোলাপবাড়ির কথাই বলেছি বেশি। তাদের দোতলার বারান্দা, বাগানের ফুল, গাছের আম— এমনকি ও বাড়ির ছাদটাও আমার পছন্দ। আমার নিজস্ব আলাপ বলতে আমি এটাই বুঝি। এরপর আমাদের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেল কিছুদিনের মাঝে। কারণ কি জানা নেই, জানার ইচ্ছেও হলো না। কারণ আমি আবারও আমার বিভিন্ন পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাই। এবার যে করেই হোক পদার্থ বিজ্ঞানে আমার পাশ নম্বর তুলতেই হবে। কিন্তু আফসোস, এবারও ফেইল আসে। এবারও ইতি আপার কড়া ঝাড়ি থেকে মুক্তি মিলল না।

একদিন বাড়ি ফিরছিলাম কাঠ ফাটা রোদ মাথায় নিয়ে। কলেজের ড্রেস এবং মাথার এক বেণি। অনেকেই কলেজে উঠলে ফ্যাশনেবল হয়ে যায়। কাজল পরে, মেকআপ করে। আমার ওসব পরিবর্তনে খুব একটা আগ্রহ নেই। স্কুলে দুই বেণি করতাম, কলেজে এসে এক বেণি হয়েছে— আমার পরিবর্তন বলতে এটুকুই। ২০০৭ সালের মরশুমে এই পরিবর্তনই ঢের।

দূর থেকে দেখলাম গোলাপ বাড়ির সামনে ফার্ণিচার-বাহী ট্রাক। খুবই ব্যস্ত হাতে লোকজন মালপত্র নামিয়ে ভেতরে নিয়ে যাচ্ছে। গোলাপবাড়ির পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে আমি উঁকি দিয়ে সবার আগে দোতলার বারান্দা দেখলাম। না জানি, ওই বারান্দার ঘরটায় ভাড়াটে আসেনি তো? কিন্তু আমি যতদূর শুনেছি মালিক ওই ঘরটা ভাড়া দেন না। ওটা তাদের নিজেদের জন্য সংগ্রহ করে রাখা। চলে যাওয়ার মুহূর্তে দেখলাম এক স্বাস্থ্যবতী, সুন্দরী মধ্যবয়সী ভদ্রমহিলা। আর সাথে থাকা লম্বাটে পুরুষটা খুব সম্ভবত ওনার ছেলে। শ্যামলা গড়নের লোকটার চোখ-মুখে রোদ পড়েছে। রোদের জন্যই কিনা কে জানে, কপাল অসম্ভব কুঁচকে রেখেছে.. হাতের রোদ-চশমাটা বোধ হয় পরতে চাচ্ছে— কিন্তু ভদ্রমহিলা বারবার থামিয়ে দিচ্ছেন।

–“ভালো করে দ্যাখ না বাড়িটা। তুই নিশ্চিত এটাই ‘গোলাপ বাড়ি’? কিন্তু এখানে তো গোলাপ ফুলই নেই। বুঝব কেমন করে এটাই গোলাপ বাড়ি? অরিত্রী তো বলেছে নাম গোলাপবাড়ি।”

নিজের নাম শুনে আমি থমকে যাই। পুরুষটা অত্যন্ত বিরক্ত নিয়ে বলল,
–“নেমপ্লেটে অলরেডি বাড়ির নাম বড়ো অক্ষরে লেখা আছে মা। তুমি কী দেখতে পারছ না? এই পুরো এলাকাতে গোলাপ বাড়ি একটাই। আর কতবার জিজ্ঞেস করবে বলো তো? তোমার ছেলের থেকে অচেনা-অজানা মেয়ের ওপর বেশি বিশ্বাস করছ দেখছি। ফ্রড-ট্রড হলে কী হবে বুঝতে পারছ? যদিও আমি এখানে খোঁজ-খবর নিয়েই এসেছি।”

চলবে~~

গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ