‘আকাশ যেমন করে হাসে’ – [শেষ]
লাবিবা ওয়াহিদ
[অন্যত্র কপি সম্পূর্ণ নিষেধ]
ইতি আপার কান্নার ইতি ঘটল জিহাদ ভাইয়ের আসার পর। ভাইয়া আপাকে বোধ হয় কোনো কিছুর বুঝ দিয়েছিল। সেই থেকে আপাকে আর কাঁদতে হয়নি। তবুও বিষণ্ণতা যেন আপার পিছু ছাড়ছিল না। আমি তাদের ঘর পাশ কাটিয়ে যাওয়ার মুখে শুনতে পাই জিহাদ ভাইয়ার কিছু কথা। ভাইয়া বলছেন,
–“দুঃখ কোরো না। সন্তান আল্লাহর দান। তিনি আমাদের ভরপুর দিচ্ছেন, এতে মন বিষণ্ণের কি আছে? আমাদের অরিত্রী এখনো আমাদেরই আছে। এসব ভেবে দুশ্চিন্তা কোরো না। এই সেন্সিটিভ সময়ে দুশ্চিন্তা মোটেই উচিত নয়। আর হ্যাঁ, আপাতত চাকরির থেকে ছুটি নাও। দুজনকে একসাথে মানুষ করতে হবে তো। আমি নাহয় প্রতি রাতের ভাড়া একটু বাড়িয়েই দিলাম।”
পরের দিন বিকালে যখন আমি ছাদে ছিলাম, তখন দেখতে পাই গোলাপবাড়ির সেই পছন্দের বারান্দায় বসে আছে আমার পছন্দের মানুষটা। স্যান্ডো গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরে সে পত্রিকা পড়ছে। ডাক্তার মানুষের বুঝি দেশের আনাচে কানাচে কী হচ্ছে তাও জানতে হবে? হেনা আন্টির থেকে শুনেছিলাম নিশীথ ভাইয়া ক্রিকেটার, ফুটবলারদের ছবি পেপার থেকে কেটে সংরক্ষণ করে রাখত। এখন মানুষটার বয়স ছাব্বিশে ঠেকেছে। নিশ্চয়ই তার সেই পেপারকাটিং শখও বয়সের সাথে সাথে মিইয়ে গিয়েছে? যাক, বোরিং মানুষটার অন্তত এক সুন্দর শখ ছিল বটে।
এমন মুহূর্তে দেখলাম সিঁড়ি বেয়ে জিহাদ ভাইয়া আসছে। আমি দ্রুত অন্য দিকে ফিরে নিজের টবের দিকে নজর দিলাম।
–“অরিত্রী কী ব্যস্ত?”
–“না ভাইয়া। এইত, গাছগুলোকে পানি দেব ভাবছিলাম।”
আমার হাসি-মুখ। আজকাল অনুভূতি গোপন করার দক্ষতা অর্জন করেছি। যে কেউ চাইলেও ধরতে পারবে না যে আমি ঠিক কী অনুভব করি নিশীথ ভাইয়ের জন্য।
জিহাদ ভাইয়ের সাথে আমার তথাকথিত দুলাভাই-শালীর মাখোমাখো সম্পর্ক নেই। আপাকে যেমন মা ভেবে অনুভব করি, জিহাদ ভাইও আমাকে সেই একই মমতায় আগলে রেখেছে। দরকারের কথা ছাড়া সেরকম কথা আমাদের মধ্যে না হলেও ভাইয়া আমাকে স্কুলে পড়ুয়া বাচ্চার মতো ট্রিট করে। বাড়িতে আসলেই এটা সেটা কিনে দেয়া থেকে শুরু করে লুডু খেলা সবই হয় আমাদের মধ্যে। বরং ভাইয়া আসলে আমাদের “ছুটি” বাড়িটা যেন কিছুটা প্রাণ ফিরে পায়। তবুও, আমরা এখনো এক নির্দিষ্ট সীমাতে বন্দী। সেই সীমা লঙ্ঘনের ইচ্ছে কখনো আমারও হয়নি, ভাইয়ারও নয়।
–“ফ্রি থাকলে এই সুন্দর শরতের মরশুমে চলো আড্ডায় বসি।”
–“নিশ্চয়ই ভাইয়া। বসুন। আমি গাছে পানি দেই।”
জিহাদ ভাই তাই করলেন। আমি গাছে পানি দেওয়ার বাহানায় নিশীথ ভাইয়াকে দেখতেও ভুললাম না। টেস্ট পরীক্ষায় আমি পাশ করে গেছি পদার্থ বিজ্ঞানে। তাই নিশীথ ভাইয়ার পড়ানো লাগে না। তবুও মাঝেমধ্যে সমস্যা হলে ভাইয়াকে বললে সে সময় করে এসে দেখিয়ে দিয়ে যায়। আমার ওইটুকু সময় মন্দ লাগে না। ইচ্ছে তো হয় মানুষটাকে নিজের কাছে বন্দী করে রাখি। কিন্তু তাতে আর ভালোবাসা থাকল কই? এমন মুহূর্তেই নিশীথ ভাই কি মনে করে আমাদের ছাদে, আমার দিকে তাকাল। আমি চট করে চোখ নামিয়ে ফেলি। আজকাল কেন যেন মনে হয় আমাকে নিশীথ ভাইয়া পছন্দ করে। কিন্তু আমার ঠিক বিশ্বাস হয় না। আমার মধ্যে এমন কোনো গুণ নেই যেটা তার মতো পরিণত বয়সের একজন যুবককে আমার প্রেমে ফেলবে। অন্তত আমার তো তাই ধারণা।
জিহাদ ভাইয়া কথা ঘুরাল না। সময় নিয়ে সোজাসাপটাই বলল,
–“তোমার আপা মূলত বাচ্চার জন্য কাঁদছিল না। তোমার জন্য কাঁদছিল।”
মুহূর্তেই আমার হাত দুটো স্থির হয়ে গেল। আমি পানির পট ফেলে বিস্মিত চোখে তাকালাম ভাইয়ার দিকে। অস্ফুট স্বরে বললাম,
–“আমার জন্য?”
–“হ্যাঁ। যখন আমার শাশুড়ি-মা মা(১)রা গেলেন, তখন তোমার বয়স মাত্র আট, আর ইতির তখন কুড়ি চলছে। সেই থেকে সে পড়াশোনার পাশাপাশি তুমিসহ সবাইকে সমান গুরুত্ব দিয়েছে। বিশেষ করে তোমাকে। মায়ের কাছে কথা দিয়েছিল ও, তোমার বিয়ে অবধি তোমাকে একদম নিজের সাথে মিশিয়ে রাখবে। একটা সত্যি কথা জানো?”
–“বলুন ভাইয়া।”
–“ইতির আর আমার বিয়ে অ্যারেঞ্জ নয়। আমিই তোমার আপাকে পছন্দ করেছিলাম। কিন্তু তোমার আপা সাফ সাফ বলে দিয়েছে বাসায় বিয়ের প্রস্তাব দিতে। আমিও প্রস্তাব পাঠালাম, ওকে আংটি পড়িয়ে রাখলাম। কারণ, তোমার আপা দ্রুত বিয়ে করতে চাচ্ছিল না। আমিও তাই ওকে জোর করিনি। ওকে সবসময় ফুল সাপোর্ট দিয়েছি। আমিও এদিক থেকে আমার চাকরিতে ধ্যান-জ্ঞান দিলাম। আমাদের দুজনের মাঝে অদৃশ্য কম্পিটিশন চলছিল, যেন কে কার আগে এগিয়ে যাব, হাহা। ভালোবাসার মানুষকে উড়তে দিয়েছি। মেয়েটার যখন মনে হলো সে আমাকে বিয়ে করতে প্রস্তুত, তখনই আমাদের বিয়ে হলো.. এরপর প্রায় তিন বছর কিভাবে যেন কেটে গেল।”
ভাইয়া থামল। আমি ভাষা হারিয়ে ফেললাম। এবার ভাইয়া এই প্রসঙ্গে এসে কিছুটা ইতঃস্ততবোধ করল। তবুও আমাকে জানানো জরুরি ভেবে আবারও বলতে শুরু করল,
–“আমি তিন বছরে বাচ্চার কথা ভেবেছি বহুবার। কিন্তু তোমার আপা বাঁধ সেধেছে। বলেছে এখনো তোমার বিয়ের বয়স হয়নি। সে মাকে কথা দিয়েছে, তোমাকে আগলে রাখবে। যদি নতুন সদস্য এলে তোমাকে ভুলে যায়? তোমাকে সময় দিতে না পারে? সময় না দিলে যদি তুমি দূরে চলে যাও… এই ভয়ে তোমার আপা প্রায়ই দুশ্চিন্তা করত। বাচ্চা নিতে চাইত না। বলত, ‘অরিত্রী আছেই তো। ও তো আমার বাচ্চার মতোই। ওকে আগে পেলেপুষে বড়ো করি, মানুষের মতো মানুষ করি।’ সত্যি, তোমার বোনটা যে কি পাগলাটে। আমিও পাগল হয়ে তাকে সঙ্গ দিলাম। ভাবলাম, তাইতো, আমাদের অরিত্রী কী সন্তানের থেকে কম কিছু?”
আমি অনুভব করলাম আমার চোখ ঝাপসা হয়ে এসেছে। আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল আপার সেই রাগী রূপটা। যে সবসময় আমাকে রাগী রূপটাই দেখিয়েছে, চরম শাসন করেছে। ভেবেছিলাম আমি আপার বোঝা, আপা আমাকে লুজার মনে করে। অথচ অজানা ছিল আপার শাসনের চেহারার আড়ালেও এক মমতাসত্ত্বা ছিল। যে আমাকে সন্তানের মতো করেই আগলে রেখেছে। নিজে জখম সয়েছে কিন্তু কখনো আমাকে বেদনার ছায়াও মারাতে দেয়নি। জাহিদ ভাই আবারও বলল,
–“আব্বা তোমাকে নিয়ে ভয়ে থাকতেন। তুমি তো ইতির মতো এত কঠিন নও। তুমি খুবই নাজুক, সহজ-সরল। এজন্য তোমাকে নিয়ে ভয়টাও ছিল বেশি। কখন না জানি কোন কুনজরে পড়ে যাও। এজন্য ম্যাট্রিক এর সময়েই তোমাকে বিয়ে দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তোমার আপা সবসময় ঢাল হয়ে ছিল। সে স্বপ্ন দেখেছিল তুমি তার মতোই বহুদূর পড়বে। যেন তোমার কখনোই কারো ওপর নির্ভরশীল হতে না হয়।”
আমি চুপ করে মাথা নিচু করে রইলাম। কোনোমতে চোখের জলটুকু বের না করার আপ্রাণ চেষ্টা করলাম। কিন্তু চোখের অশ্রু বড্ড বেঈমানি করছে, টপটপ করে পায়ের কাছে গিয়ে পড়ছে। জাহিদ ভাই হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন। আমার মাথায় ভরসার হাত রেখে বলল,
–“কখনো নিজেকে একা ভেবো না। আমি এবং তোমার আপা সবসময় তোমার পাশে আছি বোন।”
সেই ঘটনার পর কিছুদিন আমার ইতি আপার চোখে চোখ রাখার সাহস হয়নি। কেমন যেন আপাকে এড়িয়ে যাচ্ছিলাম। ইতি আপা হয়তো জানে জাহিদ ভাইয়া আমাকে কিছু বলেছে। তাই আপাও আগ বাড়িয়ে কিছু জিজ্ঞেস করেনি। থাকুক না কিছু কথা একান্ত নিজস্ব। জাহিদ ভাই আবার আমাদের দুই বোনের মধ্যে পড়েছে গ্যাড়াকলে। তাই তিনি একদিন ঘোষণা দিল আমরা সবাই সোনারগাঁও যাব। আমি সোনারগাঁও শুনেই লাফিয়ে উঠলাম খুশিতে। ভুলে গেলাম আমার ভিমরতি চেপেছিল। সোনারগাঁও মানেই তো ইতিহাসের আরেক নাম। ইতিহাস যেখানে সেখানে অরিত্রী এক পায়ে দাঁড়ানো। জাহিদ ভাইয়া আরেকটা চমকও দিল। বলল,
–“নিশীথরাও যাবে। নিশীথের ক্যামেরা আছে। ওর ক্যামেরা দিয়ে আমরা সবাই ছবি তুলব। অরিত্রীকে বেশি বেশি তুলে দিব।”
আমার মনে হলো খুশিতে ঘি পড়েছে। দূরে কোথাও যাব আবার সাথে হেনা আন্টি আর নিশীথ ভাইয়াও থাকবে? আমি সেদিন থেকেই পরিকল্পনা সাজিয়ে ফেললাম। বাবাও অনুমতি দিলেন আমাদের যাওয়ার। এতে যদি মেয়েদের মন ভালো হয় তাহলে ঘুরেই আসুক নাহয়। জাহিদ ভাই তো যাচ্ছেই।
সোনারগাঁও যখন পৌঁছালাম এক মুক্ত হাওয়া গা ছুঁয়ে যেন আমাদের স্বাগতম জানাল। আমি কি ভেবে আজ শাড়ি পরেছি। হেনা আন্টি তো প্রশংসায় পঞ্চমুখ। উনি কখনোই আমাকে শাড়ি পরতে দেখেনি। সেলোয়ার-কামিজ আমার স্বস্তি, তাই সেভাবে এতটা ঘটা করে পরা হয়নি। তবে অনুভব করছিলাম নিশীথ ভাইয়ার নজর যেন সরছিলই না। আমার এত লজ্জা লাগছিল। মানুষটার এভাবে তাকানোর কি আছে? হেনা আন্টি পুরো রাস্তা আমার সাথে নিশীথ ভাইয়ার বোরিং জীবনের গল্প করলেন। একবারের এক কাহিনী শোনালেন,
–“আমাদের পাশের এক মেয়ে বুঝেছ। ওর বয়স তখন তোমার থেকেও কম। সেই মেয়ে ওকে পছন্দ করত। আমি তো ভাবলাম মেয়ে সুন্দরী, আমার ছেলেও সাড়া দিবে বা আমাকে জানাবে। কিন্তু সে উলটো আমাকে এসে বলে, ‘মা, ওর মায়ের কাছে জানাও তো আমাকে বিরক্ত করতে বন্ধ করতে।’ বোঝ! আমার ছেলের আজ অবধি কাউকে ভালো লেগেছে কিনা আল্লাহ জানে। সারাক্ষণ শুধু পড়া আর ডাক্তারি। অসহ্য! মা-টা যে বুড়ি হচ্ছে সে খেয়াল আছে তার?”
আমি মিষ্টি করে হেসেছিলাম। মনে মনে বলেছিলাম, ‘আন্টি.. আপনার এই বোরিং ছেলেটাই চোরা চোখে বারবার আমাকে দেখছে। আপনি এটা শুনলে কি বিশ্বাস করবেন?’
আমি সর্বপ্রথম সরদার বাড়ি দেখে মুগ্ধ হলাম। এত সুন্দর খোলামেলা। বাড়ির রাজকীয় কারুকার্জের পাশাপাশি অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে সামনের বিরাট পুকুরটা। আমাকে কেউ ইতিহাস বলবে কি, আমি নিজেই বিরতীহীন ইতিহাস আওড়ে যাচ্ছি। কিন্তু যখন থামলাম, তখন দেখি কেউ আমাকে শুনছে না। একমাত্র হেনা আন্টি এবং নিশীথ ভাইয়া ব্যতীত। আপারা তখন অন্যদিকে ব্যস্ত। আমার অভিমান হলো, গাল ফুলালাম। পরবর্তীতে মিনমিন করে বললাম,
–“পর’রাই আপন হয়।”
নিশীথ ভাইয়া আমার সেই গাল ফুলানো ছবি তুলল আমি টেরই পেলাম না। হঠাৎ ভাইয়া বলল,
–“সুন্দর করে দাঁড়াও তো অরিত্রী, ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড সুন্দর আসছে।”
ব্যাস, আমি অস্বস্তিতে টইটম্বুর। দাঁড়াতে হয় কেমন করে সেটাই যেন ভুলে বসলাম। আমার পছন্দের মানুষটা আমার ছবি তুলবে আমি পোজ দিব, এ যে অরিত্রীর জীবনে চরম অসম্ভব কিছু। নিশীথ ভাইয়াও যেন আমার এই অস্বস্তি বুঝল। তাই তিনি আর বলল না। হঠাৎ হঠাৎ -ই ছবি তুলল। এটাকে বুঝি বলে— ‘ক্যান্ডিড’। এই নতুন শব্দ শুনেছিলাম আমার বান্ধবীর থেকে। ও প্রচুর বিদেশি সিনেমা দেখে। এত সিডি যে কোত্থেকে কেনে। অথচ আমার দেশীয় কত সুন্দর সুন্দর ছবি আছে। আমার তো দারুণ পছন্দের নায়ক হচ্ছে সালমান শাহ। তার সিনেমাতে কথোপকথন, সংলাপ, আবেগ খুব সুন্দর গোছানো। আমার হঠাৎ টনক নড়ল। ডাক্তার সাহেবও যে খুব সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলতে জানে। লজ্জা লাগল এই পর্যায়ে এসে। সালমান শাহ বেঁচে থাকলে হয়তো কোনো একদিন দেখা করে বলতাম,
‘আপনার মতোই বচনভঙ্গির একজন মানুষ পেয়েছি জানেন? তবে সে আপনার মতো অভিনয় করে না, সে একজন ভদ্র ডাক্তার।’
পানাম নগরে এসে আমি আমার আশেপাশের সবাইকে ভুলে বসলাম। ঘুরতে ঘুরতে অনেকটা এগিয়ে এসেছি টেরই পাইনি। একসময়ের সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ রাজধানী ছিল এটা। অথচ এখন তার কিচ্ছুটি নেই। সব সুনশান, পরিত্যক্ত। অথচ শত বছর আগেও মানুষ কতটা যত্ন নিয়ে প্রতিটা দালানের কারুকার্জ করেছিল। কতশত গল্প লেপ্টে আছে একেকটা দেয়ালে, একেকটি ইটের ভাজে। সময়ের ব্যবধানে সেই চাকচিক্য, গল্প সবই ইতিহাস হয়ে গিয়েছে। তবে আমাকে অবাক করল এখানে এখনো কিছু কিছু মানুষজন বসবাস করছে। হঠাৎ পেছন থেকে ভেসে এলো,
–“তুমি তো বলোনি এখানে এখনো কিছু মানুষ বসবাস করছে?”
আমি চমকে গেলাম। খেয়ালই করিনি নিশীথ ভাইয়া আমাকে একা ছাড়েনি, আমার সাথেই ছায়া হয়ে ছিল। আমি আমতা আমতা করে বললাম,
–“পড়েছিলাম বইয়ে। তবে মিথ্যে ভেবেছিলাম। বিশ্বাস হয়নি এই শহর এখনো বসবাসের উপযোগী হতে পারে স্থানীয়দের জন্য।”
নিশীথ ভাইয়া আচমকা হাসল। খুবই ক্ষুদ্র, স্বল্প সেই হাসি। পানাম নগরের গলির মাঝামাঝি দিয়ে উপরের মুক্ত আকাশ দেখা যাচ্ছে। সেখানে কতশত সাদা মেঘের ভেলা। এইটুকু মুহূর্ত আমারই খুব ইচ্ছে করল ক্যামেরাবন্দী করার। কিন্তু ক্যামেরা যে নিশীথ ভাইয়ের হাতেই। মানুষটা কী আদৌ জানে, সে কত সুন্দর করে হাসতে জানে? হাসি দিয়ে চমকে দিলে কী খুব বেশি ক্ষতি হয়ে যায়? আমি মুখ ফসকে বলে বসলাম,
–“আপনার হাসিটা সুন্দর।”
নিশীথ ভাই আমার আচমকা মুখ ফসকানোতে হয়তো হতবিহ্বল হলো। আমি দ্রুত মুখ চেপে ধরলাম। নিশীথ ভাইয়া লজ্জা পেল না। সে মুচকি হাসি দিয়েই বলল,
–“থ্যাঙ্কস ফর কমপ্লিমেন্ট।”
ভাইয়ার এটুকু লাইতে আমি কিছুটা সাহস পেলাম। আমার পরীক্ষা সন্নিকটে। খুব বেশি দেরী তো নেই। এভাবে লুকোচুরি কতদিন? আমারও তো জানা দরকার ভাইয়া আসলেই আমাকে ঘিরে অনুভব করে কিনা। আমি বড্ড সাহস নিয়ে প্রশ্ন করলাম,
–“আপনি কি আমাকে পছন্দ করেন?”
আমার হঠাৎ প্রশ্নে নিশীথ ভাইয়ার অবাক হবার কথা ছিল। তিনি হলেন না। কিন্তু অবাক হওয়ার পালা যেন আমার ছিল। আমাকে হতভম্ভ করে জবাব দিল,
–“হুঁ।”
–“কিহ?”
নিশীথ ভাইয়া মেপে মেপে বলল,
–“পছন্দ করি।”
আমি খুব বেখাপ্পা প্রশ্ন করব বসলাম,
–“কেন?”
–“পছন্দ হতে কারণ লাগে মেয়ে?” নিশীথ ভাইয়া হাসল।
–“আ-আমিই কেন?”
–“তার উত্তর জানা নেই।”
–“আমি.. মানে, কেন মনে হলো আমাকেই পছন্দ হয়েছে? আন্টির থেকে শুনেছি আপনি অসংখ্য মেয়ের চিঠি পেয়েছেন। এমনকি গোলাপবাড়িতে এসেও বেশ কয়েকটা পেয়েছেন, সেটা তো নিজ চোখেই দেখা।”
নিশীথ ভাইয়াকে এবার হতাশ দেখাল। সে মাথা চুলকাল। সর্বোচ্চ আত্মবিশ্বাসী পুরুষ আজ প্রেমের বেলায় এসে ধরা খেয়ে গিয়েছে। কীভাবে গুছিয়ে বলবে, কীভাবে প্রেমে পড়েছে এসব কিছুই সে বিশেষ গুছাতে পারল না। বোঝা গেল, আমরা দুজনই একই স্বভাবের। কেউই অনুভূতি কথা দিয়ে বোঝাতে পারি না। কিন্তু আমার এতে হতাশা আসল না, বরং সবচেয়ে সুখী মানুষটি মনে হলো। হ্যাঁ, নিশীথ ভাইয়া অনেক দায়িত্ববান, কর্মঠ, সবকিছুতেই একশো শতাংশ দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে তার অনুভূতি ব্যক্ত না করতে পারার খুঁত আছে। তবুও আমার এই মানুষটিকেই পছন্দ। তার ব্যক্তিত্ব, ঘামে ভেজা মুখটা, ক্লান্ত মুখের নির্লিপ্ত চাহনি সবটাই আমার হৃদয় কেড়ে নিয়েছে। এই টুকটাক খুঁতে কি আসে যায়?
নিশীথ ভাইয়া নিজমনে শব্দ গুছিয়ে বলার চেষ্টা করল,
–“কারণ, ওরা তুমি ছিলে না অরিত্রী। আমার জানা নেই কেন, সবচেয়ে বিরক্তিকর মেয়েটাই আমার সবচেয়ে প্রিয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তুমি সাইলেন্টনেসই সম্ভবত আমার আগ্রহ কেড়েছে।”
–“তারপর?” মিনমিন গলা।
–“তুমি চেষ্টা করতে জানো। কিছু না পারলেও সেটা ঠিক ভাবে করার চেষ্টা করতে। এরপর তুমি দুঃখী মুখটা.. প্রায়ই ইচ্ছে হতো ফুঁ দিয়ে তোমার দুঃখগুলোকে উড়িয়ে দেই। আগে কখনো এই অদ্ভুত অনুভূতি হয়নি অরিত্রী। আমি পরিণত বয়সী। শুরুর দিকে না বুঝলেও ইদানীং বুঝি এই অনুভূতির নাম।”
অস্ফুট স্বরে আওড়াই,
–“কি নাম তার?”
–“ভালোবাসা, সঙ্গ দেয়া।”
আমার হঠাৎ-ই চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠল, নজর নেমে গেল পায়ের কাছে। নিশীথ ভাইয়া নিজেকে সামলাতে ব্যর্থ হয়ে কাঁপা হাতটা বাড়িয়ে দিল। খুব আলতো করে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
–“কিন্তু তুমি যে এখনো ছোটো। তোমাকে বড়ো হতে হবে, রিত্রী। আমি অপেক্ষা করছি।”
সেই শেষ লাইনটার ঘোরে আমি এইচএসসি দিয়ে ফেললাম। রেজাল্টের অপেক্ষা করতে করতে ভাবলাম মেডিকেলের প্রস্তুতি নিব। আপা তো তাই চায়। সাথে নিশীথ ভাইয়ের কথাও রাখতে হবে। আমাকে বড়ো হতে হবে। এতদিনে খুব উপলব্ধি হয়েছে। আমার মানুষটাকে চাই। আপার এতদিনে ডেলিভারির ডেট এগিয়ে এসেছে। আমি আপাকে তটস্থ হয়ে বললাম,
–“আপা, মেডিকেলের জন্য কিছু বই আনাতাম।”
আপা এখন পুরো বিশ্রামে থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু কাজের ভূত তাকে ছাড়তে চায় না। আমি তাও জোর করে আপার হাত থেকে বাড়ির কাজ নিয়ে নিয়েছি। যতটা সম্ভব আমি করি, আর বাকিটা কাজের খালা করে দিয়ে যান। জাহিদ ভাইয়ের নির্দেশ, এখন আপাকে কিছুতেই রান্নাঘরে যাওয়া চলবে না। ভাইয়া বলেছে ডেলিভারির আগে দিয়ে ছুটি নিয়ে আসার চেষ্টা করবে। ভাইয়া সেই যে গেল, আর আসতে পারেনি।
ইতি আপা আমার দিকে চেয়ে আচমকা বলল,
–“মেডিকেলের দরকার নেই।”
আমি চমকে গেলাম। আপা থেমে বলল,
–“তোর যেটাতে পড়লে মনে হবে তুই আগ্রহ পাবি সেটাই পড়বি। শুধু নিজের শখকে কখনো বিসর্জন দিবি না।”
আমার কি হলো হঠাৎ কে জানে। আপাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললাম,
–“মেডিকেল তো তোমার স্বপ্ন ছিল আপা।”
–“আমার বোনের জন্য আমার স্বপ্ন জরুরি নয়, আমার বোনের স্বপ্নটা জরুরি। এটা বুঝতে হয়তো কিছুটা দেরী করে ফেলেছি, তাই বলে এতটাও দেরী হয়নি। নিজের মতো করে জীবন সাজিয়ে নে আমার বোন। ভুল হলে শুধরে দেয়ার জন্যে তো আমরা আছি।”
আমরা বলতে যে আপা নিশীথ ভাইয়াদেরও বুঝিয়েছে তা বুঝতে বাকি নেই আমার। আমার বাম হাতের অনামিকায় যে এখন নিশীথ ভাইয়ার নামের আংটি জ্বলজ্বল করছে। বলেছে আমার পড়াশোনা শেষ হলেই আমাকে উঠিয়ে নিবে। ডাক্তার সাহেবের ডিউটি না থাকলে সেই আমাকে নিয়ে চলাফেরা করে, আমাকে একা না ছাড়ারই চেষ্টা করে বেশি। আজকাল সে বিভিন্ন চেম্বারে বসে, সন্ধ্যার পর। এছাড়া সারাদিন ছুটি। ভাইয়া আমাকে কোচিং এ নিয়ে যায়, আবার ফেরত নিয়ে আসে। কোচিং এর কেউ ওনার কথা জিজ্ঞেস করলে আমার লজ্জা নিয়ে ‘আমার হবু বর’ বলতে ভালো লাগে। আমি কেন যেন চাই সবাইকে শোনাতে, এই মানুষটার সাথে আমার বিয়ে হতে চলেছে। আসার পথে তার সাথে হাওয়াই-মিঠাই, ঝালমুড়ি, ফুচকা কতকিছুই খাওয়া হয়। উনি ফুলসহ কতকিছু কিনেও দেয়। প্রায়ই বেলিফুলের মালা দেখিয়ে বলবে,
–“বিয়ের পর রোজ তোমাকে বেলির মালা পরিয়ে দেব হাতে অথবা চুলের খোঁপায়। ততদিন অবধি আরেকটু অপেক্ষা।”
ডাক্তার সাহেব তো মাঝেমাঝে ঘুরতে ঘুরতে বলবে,
–“ভাগ্যিস আমার চাকরি আছে অরিত্রী, খালি পকেটে তোমাকে এত লাই দিতাম কেমন করে? তোমাকে এটা সেটা কিনে দিতে আমার ভালো লাগে। মনে হয় এই জীবনে যেন আমার কোনো আফসোস নেই।”
আমি বলতে চেয়েছিলাম,
–“আপনি কোনো কিছু না কিনে দিলেও আপনি আমার ততটাই আপন থাকবেন, যতটা আপন এ জনমে কাউকে অনুভব হয়নি।”
তাকে আজকাল আর ভাইয়া ডাকি না। একসময় শিক্ষক ছিলেন এটাও মানি না। উনিও মানতে চান না। বারবার বলবেন, “ওটা পড়া দেখিয়ে দেওয়া বলে, কোনো শিক্ষক টিক্ষক ছিলাম না আমি।”
আমি তখন মন খারাপ করে বলতাম,
–“তাইতো, আমি তো কখনো আপনাকে স্যারই বলিনি। কিন্তু এটা তো মিথ্যে নয়, আপনি আমাকে পড়ানোর বেতন নিতেন।”
এতে নিশীথকে আরও হতাশ দেখাত।
–“ইতি আপু জোর করে দিত। কি আর করার?”
ওনাকে আমি এখন ডাক্তার সাহেবই ডাকি। এমনকি তার নাম্বারটাও ছোটো করে ‘Dr. mine’ দিয়ে সেভ করা। উনি কখনো দেখলে চরম লজ্জা পাব।
রেজাল্ট আমার তুলনামূলক ভালো হলো। পদার্থ বিজ্ঞানে এ মাইনাস আসলেও আমার একটুও দুঃখ হয়নি। ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে একদিন বাড়িতে ফিরে চমকে গেলাম। আমার বাড়িতে হেনা আন্টি, ডাক্তার সাহেব বসা। সঙ্গে একজন হুজুর। তখনো আমি বুঝতে পারিনি উনি কাজি হবে। আজ আশ্চর্যজনক ভাবে আমার বাবাও আছেন।
হঠাৎ হেনা আন্টি অধৈর্য হয়ে বলল,
–“আমার ধৈর্যে কুলাচ্ছিল না রে মা। তোকে আমার বাড়ির বউ করে চাই-ই চাই।”
আন্টির থেকেও বড়ো অধৈর্য দেখাল নিশীথ সাহেবকে। তবে সে বোঝাতে পারল না। মাথা চুলকে মিনমিন করে বলল,
–“পড়াশোনা বিয়ের পরেও করা যাবে অরিত্রী। আমি নিজ খরচেই তোমাকে পড়াব। তবে আমার বাড়িতে থেকে। কেন যেন তোমাকে বিয়ে করার লোভ সামলাতে পারছি না।”
নিশীথ ভাইয়ার সহজ স্বীকারোক্তিতে উপস্থিত সবাই হেসে ফেলল। আমি পড়লাম চরম লজ্জায়। আপা আমাকে রুমে নিয়ে দূর্বল হাতে তৈরি করে দিল। আমাদের ঘরে নতুন ছেলে সদস্য এসেছে আজ পনেরোদিন। সেই উপলক্ষে জাহিদ ভাইয়াও আজ এই সভায় উপস্থিত। আপা আমাকে বউ সাজিয়ে দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
–“অবশেষে মায়ের কথা আমি রাখতে পেরেছি। তোকে যোগ্য হাতে তুলে দিতে পারছি, এর থেকে খুশির আর কী আছে?”
হঠাৎ-ই আমাদের দুই বোনের চোখে পানি জমল। অবশেষে নয় আগস্ট ২০০৮ সালের এক বৃ্ষ্টিমুখর দুপুরে আমি কবুল পড়লাম ড. নিশীথের নামে। আমাদের পালাই পালাই প্রেমের অপেক্ষা মিটল। পূর্ণতা পেল দুটি হৃদয়ের। বিয়ের পর আমার সদ্য বিবাহিত স্বামী আমার কানে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,
–“তুমি কী রাগ করেছ?”
–“কেন করব?”
–“এইযে, হুট করে বিয়ে করে ফেললাম। ওয়াদা ভেঙে ফেললাম।”
আমি মুচকি হেসে বললাম,
–“ডা. নিশীথ ইউসূফ কখনো অরিত্রীর রাগের কারণ হতেই পারে না। ওয়াদা না ভাঙলে বিয়ের সুখ সুখ অনুভূতিটা পেতাম কেমন করে? আপনার সদ্য বিবাহিত স্ত্রী আপনার ক্ষমা হাসি-মুখে মঞ্জুর করে নিল।”
সমাপ্ত।
